#এক_মুঠো_চাঁদের_আলো
#লেখনীতে_নুসরাত_ফারিয়া
#পর্ব_৩৭
-“আ…আমি! আমি একজনকে ভালোবাসি ভাবী। আর তাঁকেই বিয়ে করতে চাই।”
ননদের মুখে এমন কথা শুনে আলোর চোখদুটো বড়বড় হয়ে গেল। সে কোনোমতে নিজেকে সামলিয়ে বলল,
-“তুমি যাকে ভালোবাসো, সে-ও কি তোমাকে ভালোবাসে? মানে তোমরা রিলেশনে আছো?”
তিথি মাথা নাড়িয়ে জবাব দিল,
-“হ্যাঁ, তিহানও আমাকে খুব ভালোবাসে৷ আর আমরা আড়াই বছর ধরে রিলেশনে রয়েছি।”
-“বুঝলাম। তা ছেলে কি করে?”
-“ও এবার মাস্টার্সে ভাবী। আপাতত বেকার!”
আলো কিছুক্ষণ চুপ থেকে শান্ত গলায় বলল,
-“মা এই বিয়ের প্রস্তাবে রাজী এবং অনেক খুশী। তুমি এই বিষয়টা তোমার ভাইদের বলো। উনারা নিশ্চয়ই তোমাকে বুঝবে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিবে।”
ভাইদের কথা মনে হতেই তিথি তড়িঘড়ি করে বলল,
-“বড় ভাইয়া যদি জানে আমি প্রেম করছি, তাহলে আমাকে মে’রে শেষ করে দিবে। ভাইয়া মোটেও ভালোবাসা, প্রেম পছন্দ করে না। আমাকে পইপই করে নিষেধ করেছে, আমি যেন কখনো এই ভালোবাসার চক্করে না পড়ি। কিন্তু…আমি ভাইয়ার কথা রাখতে পারলাম না ভাবী। আমিও দিনশেষে নিজের মনের কাছে হেরে গেলাম। আর ছোট ভাইয়াকে বলেও কোনো লাভ হবে না। মা যেটা বলবে, যেটা করবে সেটাতেই রাত ভাইয়ার মত রয়েছে। বলতে পারো, মায়ের বাধ্য ছেলে। তাকে বললে উল্টো তিহানকে পেটাবে, সাথে আমাকেও!”
আলো চিন্তায় পড়ে গেল। এখন সে কি করবে ঠিক বুঝতে পারছে না। কারণ তিথির কেসটা বেশ জটিল! একদিকে পরিবারের সবাই এই বিয়েতে রাজী, অন্যদিকে মেয়েটা আবার অন্য কাউকে ভালোবাসে। তাহমিনা খান এটা সহজে মেনে নিবে না। আর না শান্ত থাকবে৷ সে এসব ভেবে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
-“মনে সাহস নিয়ে তোমার বড় ভাইয়াকে একবার বলে দেখতে পারো। উনি এখন আগের মতো নেই, একটু হলেও ভালোবাসায় বিশ্বাস করতে শিখেছে। আর উনি মা’কে বুঝাতে পারবেন। তবুও যদি সমস্যা হয়, তাহলে দাদাজানকে বলো৷ আশা করছি তোমার পাশে থাকবে।”
-“তুমি কিছু করো না ভাবী? আমার খুব ভয় করছে।”
-“দেখো তিথি, আমি তোমার মনের অবস্থাটা বুঝতে পারছি। কিন্তু আমি কি করব বলো? মা এমনিতেই আমাকে পছন্দ করে না, আমি যদি উনাকে গিয়ে কিছু বলি—তাহলে দেখা যাবে আমাকেই বাড়ি থেকে বের করে দিবে।”
তিথি কিছু না বলে নীরবে কাঁদতে থাকল। না পারছে পরিবারের অবাধ্য হতে আর না পারছে নিজের প্রিয় মানুষটাকে ভুলে যেতে। সে এখন কি করবে নিজেই জানে না। শুধু জানে সে কিছুতেই তিহান ব্যতীত অন্য কারোর হবে না, কিছুতেই না।
আলো মেয়েটার চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বলল,
-“কাঁদে না তিথি। আমি দেখছি, কি করতে পারি!”
আলো তিথিকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ঘুম পারিয়ে তবেই রুম থেকে বের হলো। দরজা চাপিয়ে দিয়ে পিছনে ফিরতেই দেখতে পেল, আধার স্যার রক্তিম চোখে তাকিয়ে আছে। আলোর কপাল কুঁচকে গেল। সে কিছু একটা ভেবে নিজের দিকে তাকায়। নাহ, সবকিছু ঠিকঠাক আছে। তাহলে মানুষটা এমন রাগান্বিত চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কেন? তাহলে কি সবকিছু শুনে নিয়েছে?
-“ক’টা বাজে?”
পুরুষালী গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনে আলো ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এল। সে আশেপাশে তাকিয়ে ঘড়ি খুঁজতে লাগল। কিন্তু কোথাও দেখতে না পেয়ে বলল,
-“জানি না।”
আধার দাঁতে দাঁত পিষলো। কিছু না বলে হনহনিয়ে চলে গেল। আর আলো বেকুবের মতো হা করে দাঁড়িয়ে রইল। মনে মনে ভাবল—এই লোকটার আবার কি হলো আশ্চর্য!
আলো হামি তুলে রুমে এসে ঘড়ির দিকে তাকাতেই চমকে উঠল। রাত একটা বেজে পার হয়ে গেছে। অথচ সে এখনো ঘুরঘুর করছে। ওইদিকে টুনা, টুনিও খেয়েদেয়ে কাউচের ওপর ঘুম দিয়েছে। এরা সারাদিন খায় আর পড়ে পড়ে ঘুমায়! এছাড়া আর কোনো কাজ নেই।
-“রুমে এলে কেন? এতক্ষণ যেখানে ছিলে, সেখানেই থাকতে।”
আলো মুখ ভেংচি কেটে বলল,
-“এটা আমারো রুম, সো আমি যখন-তখন আসতে পারি, তাতে আপনার কি?”
-“নাথিং!”
একথা বলে আধার সোফায় শুয়ে পড়ল। এটা দেখে আলোর ভ্রু কুঁচকে যায়। সে কাছে এসে জিজ্ঞেস করল,
-“হঠাৎ এখানে শুলেন কেন?”
-“আমার সোফা, আমার শরীর, আমার মন, আমার ইচ্ছে। তাতে আপনার কি?”
আলোর মুখ গোমড়া হয়ে গেল। সে পাশে বসে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“রাগ করেছেন?”
-“…………”
-“আচ্ছা সরি!”
এবারেও আধার কিছু বলল না। আলো কিছুক্ষণ চুপ থেকে রুমের বাতি নিভিয়ে আবারো সোফার কাছে এল। তারপর বলল,
-“ঠিক আছে, আপনি এখানে থাকলে আমিও থাকব!”
সোফায় বেশি জায়গা নেই। তবুও আলো ঠেলেঠুলে শুয়ে পড়ল। কিন্তু তার ছোট্ট শরীরটার জায়গা ঠিকমতো হলো না। ফলস্বরূপ সে সোফা থেকে পড়ে যেতে লাগল, কিন্তু শেষমেশ পড়ল না। উল্টো, নিজের ওপর লোকটাকে আবিষ্কার করল।
আধার শরীরের সমস্ত ভার ছেড়ে দিতেই আলো হকচকিয়ে উঠে বলল,
-“উমম…শুটকি মাছের ভর্তা হয়ে গেলাম।”
আধার ওড়না সরিয়ে উন্মুক্ত গলায় মুখ ডুবিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“আই লাভ শুটকির ভর্তা!”
আলো সামান্য নড়াচড়াও করতে পারছে না। সে ঘাড় কাত করে জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে বলল,
-“কাল সকালে বানিয়ে দিবো, এখন উঠুন।”
-“আমি নই, তুমি এসেছো আমার কাছে। আর এখন আমাকে সহ্য করো!”
আলোর শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হয়ে এল। সে দু’হাতে খামচে ধরল মানুষটার পিঠ! পুরুষালী রুক্ষ হাতের গাঢ় স্পর্শে তার শরীরটা থরথর করে কাঁপছে। আলো বারবার শুকনো ঢোক গিলে নিচে চাপা পড়া অবস্থায় ছটফট করছে। হঠাৎই কিছু একটা অনুভব করে অস্ফুটস্বরে বলল,
-“প….প্লিজ না!”
সঙ্গে সঙ্গে আধারের নেশা কেটে গেল। একই সাথে অজানা ঘোর থেকেও বেড়িয়ে এল। তবুও সে শুধাল,
-“নো??”
আলো কোনো জবাব দিল না। আধার চোখ বুজে লম্বা শ্বাস নিয়ে, নিজের সূক্ষ্ম ইচ্ছেটাকে দমিয়ে রেখে চুপচাপ সরে গেল। আলো আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিচ থেকে ওড়না নিয়ে শরীরে জড়িয়ে সোজা ওয়াশরুমে চলে যায়। তারপর ফিরে এসে মানুষটাকে দেখতে না পেয়ে আলোর খারাপ লাগল। সে ইচ্ছে করে তখন বাঁধা দিতে চায়নি, কিন্তু তার হাতে কোনো উপায় ছিল না। আলো আবারো দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। লোকটা নিশ্চয়ই রেগে আছে তার উপর, নয়তো বিরক্ত হয়েছে। সে আস্তেধীরে হেঁটে বিছানায় গিয়ে আধশোয়া হয়ে বসল। হেড বোর্ডে মাথা ঠেকিয়ে চোখদুটো বন্ধ করে নিল। কিছুসময় পর পেটের ওপর গরম কিছুর অস্তিত্ব অনুভব করে চকিতে তাকায়। আধার হট ব্যাগের দিকে ইশারা করে শান্ত গলায় বলল,
-“এটা পেটে ধরে রাখো, আরাম পাবে।”
আলো বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। সে অবিশ্বাস চোখে মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইল। একসময় জানতে চাইল,
-“আ…আপনি কীভাবে বুঝলেন?”
আধার হাসলো। ঝুঁকে এসে কপালের মাঝে ঠোঁট ছুঁয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“এই পুরো তুমি-টাকে পড়তে শিখে গিয়েছি, সাথে তোমার চোখের ভাষা এবং মনটাকেও!”
একটু থেমে পুনরায় আওরাল,
-“আমি খারাপ হলেও এতটা খারাপ নই, যে তোমার কষ্ট বুঝব না৷ আমার কাছে সবার আগে তুমি। তারপর বাকী সব!”
আলো আজ আবারো লোকটার প্রেমে উস্টা খেয়ে পড়ল। এই পঁচা স্যারকে এত ভালো হতে কে বলেছিল হুহ্? সে যে প্রতিবার লোকটার প্রেমে মুখ থুবড়ে পড়ে। এটা কী জানে অসভ্য পুরুষটা?
মেয়েটাকে নিজের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে আধারের মনে দুষ্টু বুদ্ধি এল। সে ঝড়ের বেগে মাথা নিচু করে শুকনো ঠোঁটে চুমু খেয়ে কামড় দিল। আলো পাশ থেকে পুতুলটা নিয়ে স্যারের গায়ে মে’রে চিল্লিয়ে উঠল,
-“বদমাশ লোক কোথাকার।”
আধার ঠোঁট কামড়ে হেঁসে এইড বক্স খুলে পেইন কিলার নিয়ে এসে, আলোর সামনে পানির গ্লাস ও ঔষধ বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
-“খেয়ে নাও!”
আলো ভদ্র মেয়ের মতো ঔষধ খেয়ে নিল। আধার গ্লাস টি-টেবিলের ওপর রেখে চুপচাপ পাশে এসে শুয়ে পড়ল। আলো কিছুক্ষণ বসে থেকে স্বামীর বুকের ওপর মাথা রাখল। আধার অর্ধাঙ্গিনীকে আলিঙ্গন করে চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে বলল,
-“ঘুমাও!”
-“আপনাকে কিছু বলার ছিল।”
-“আজ নয়, কাল শুনব।”
-“কিন্তু….!”
-“হুঁশশশশশ! কোনো কিন্তু নয়। এখন চুপচাপ ভদ্র মেয়ের মতো ঘুমাও। নয়তো বেলকনি থেকে ফেলে দিয়ে আসব।”
আলো চোখমুখ কুঁচকে পাশে ফিরে, বিরবির করে বলল,
-“আপনি খুব খারাপ।”
আধার আনমনে হেঁসে মেয়েটাকে পিছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল এবং কাঁধে মুখ গুঁজে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“আই নো, আমি খারাপ। আর তোমার কাছে সারাজীবন খারাপই হয়ে থাকতে চাই, মিস কালো।”
—————————————–
আলোর ঘুম ভাঙল দুপুর বেলায়। এতে মেয়েটা বেশ বিরক্ত। এতদিন ভার্সিটিতে যেতে পারেনি, পড়ালেখা সব ভুলে বসেছে সে। আর আজ আবারো যেতে পারল না৷ মানুষটাও তাকে ডেকে দেয়নি! যদি ডাকত, তাহলে কী আর এইভাবে নাকে তেল দিয়ে আরামসে ঘুমাত? উঁহু, মোটেও না। আলো একরাশ বিরক্তি নিয়ে ওয়াশরুমে গেল। একেবারে গোসল নিয়ে তবেই বেরিয়ে এল।
রুম থেকে বের হতেই তিথির সাথে দেখা হয়ে যায়৷ এক রাতেই মেয়েটার চেহারার বারোটা বেজে গেছে। নিশ্চয়ই রাতে আবারো কেঁদেছে।
-“তুমি ঠিক আছো?”
ভাবীর কথা শুনে তিথি মাথা নাড়িয়ে ছোট্ট করে বলল,
-“হু!”
আলো আর কথা বাড়ায় না। চুপচাপ তিথির সাথে গিয়ে ডাইনিংয়ে বসে পড়ল। তারপর নিজ হাতেই মেয়েটার প্লেটে খাবার বেড়ে দিল। ততক্ষণে সোবহান খান, তাহমিনা খানও হাজির।
-“রাতে ঘুমাওনি? নিজের চেহারার কি হাল করেছো? আর ক’দিন পর তোমার বিয়ে, সেদিকে কোনো খেয়াল আছে?”
মায়ের কথা শুনে তিথি মাথা নিচু করে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“আমি এখনই বিয়ে করতে চাই না আম্মু। আমার আরো সময়ের প্রয়োজন!”
ব্যস! তাহমিনা খানের খাওয়া থেমে গেল এবং মূহুর্তেই ডাইনিং টেবিলে পিনপতন নীরবতা ছেয়ে যায়। আলো পানি দিয়ে কোনোমতে মুখের ভাত গিলে খেল। তারপর আড়চোখে শাশুড়ী মায়ের থমথমে মুখের দিকে তাকাল।
-“তোমার বয়সী মেয়েরা বিয়ে করে এক-দুই বাচ্চার মা হয়ে গেছে। আর তুমি চাও আরো সময়?”
তিথির তখন বলতে ইচ্ছে করল—”আমিও বিয়ে করতে চাই আম্মু, কিন্তু আমার ভালোবাসার মানুষটিকে। এছাড়া আর অন্য কাউকে নয়!”
তবে মুখে বলল,
-“আমি এখনো বিয়ের জন্য প্রস্তুত নই।”
-“ঠিক আছে, যতদিন ইচ্ছে ততদিন সময় নাও। কিন্তু…তোমার ও অনিমেষের এনগেজমেন্ট হবে। আর সেটা আগামী সপ্তাহেই!”
তিথি অসহায় চোখে ভাবী ও দাদাজানের দিকে তাকায়। আলো কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারছে না। কারণ সে জানে, যদি এখন কিছু বলে—তাহলে সব ঝড় তার উপর দিয়েই যাবে। তবুও সে চুপ থাকতে পারছে না। আড়চোখে দাদাজানের দিকে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“তুমি তো কিছু একটা বলো দাদাজান। উমম…বিয়েটা এখানেই ভেঙে দাও!”
নাতবউয়ের কথা শুনে সোবহান খানের কপালে চারটে ভাজ পড়ল। তিনি ধীর কণ্ঠে শুধালেন,
-“হঠাৎ বিয়ে ভাঙব কেন? আর শাহ্ পরিবার তো যথেষ্ট ভালো। ওখানে তিথি সুখে থাকবে!”
-“কিন্তু….মেয়েটা তো চায়না বিয়ে করতে!”
-“সবাই কি তোমার মতো বিয়ে করব, বিয়ে করব বলে লাফালাফি করবে আর ইচ্ছে করে পরীক্ষায় ফেল করবে?”
আলোর মুখ কালো হয়ে গেল। ফিসফিস করে বলল,
-“আমি যদি এমন না করতাম, তাহলে আমাকে নাতবউ হিসেবে কীভাবে পেতে হুহ্?”
সোবহান খান ভাবুক হয়ে বললেন,
-“তাও ঠিক।”
-“এখন তাড়াতাড়ি বিয়ে ভাঙার ব্যবস্থা করো। নয়তো হিতে বিপরীত হয়ে যাবে গো দাদাজান!”
-“কোনো সমস্যা?”
-“তোমার নাতনি অন্য একজনকে ভালোবাসে। আর তাকেই বিয়ে করতে চায়।”
অপ্রত্যাশিত কিছু বাক্য শুনে মূহুর্তেই ভীষম খেলেন সোবহান খান। আলো তড়িঘড়ি করে পানির গ্লাস এগিয়ে দিল। সোবহান খান এক নিঃশ্বাসে পানি খেয়ে, নাতবউয়ের দিকে বড়বড় চোখে তাকান। আলো মাথা চুলকিয়ে হাসার চেষ্টা করল। এখন কী হবে কে জানে!
সোবহান খান কিছুক্ষণ থম মে’রে বসে থেকে ছোট বউমার উদ্দেশ্যে বললেন,
-“এত তাড়াহুড়ো করছো কেন? মেয়েটা যখন চাচ্ছে না বিয়ে করতে তখন জোর করো না। ওর মতো ওকে থাকতে দাও। আর আজকাল মেয়ের পছন্দ, অপছন্দ বলেও কিছু আছে। তুমি কি একবারও জিজ্ঞেস করেছো, মেয়েটা কাউকে পছন্দ করে কি-না?”
কথাগুলো শুনে আলো মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল। যাক বাবা, দাদাজান অন্তত তাদের পাশে রয়েছে। এখন এ বাড়ির বড় ঘাড়ত্যাড়াকে নিজেদের দলে নিয়ে আসার পালা। তাহলেই কাজ হয়ে যাবে। তার মতো তিথিও মনে মনে বেশ স্বস্তি পেল। অবশেষে কেউ তো তাকে বুঝতে পারল। আর এটাই তার কাছে অনেক।
-“আমার মেয়ের প্রতি আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস রয়েছে বাবা। ও কখনো এমন কাজ করবে না, যেখানে আমার মাথা হেঁট হবে। আর পছন্দের কথা যদি বলেন, তাহলে ওর জন্য অনিমেষ একদম পারফেক্ট। ছেলেটা সবদিক থেকেই আমাদের বাড়ির একমাত্র মেয়ে জামাই হওয়ার যোগ্যতা রাখে। আর আমি তো এখনই বিয়ে দিতে চাচ্ছি না, শুধু এনগেজমেন্ট করিয়ে রাখতে চাচ্ছি। এতে সমস্যা কোথায়? আপনার বড় নাতিরও এই বিয়েতে মত আছে, কারণ সে ব্যক্তিগত ভাবে অনিমেষকে চেনে। তারা দুজন অস্ট্রেলিয়ায় একই ভার্সিটিতে পড়াশোনা করেছে। শুধু সিনিয়র ও জুনিয়র ছিল।”
তাহমিনা খানের কথা শুনে সোবহান খান আর কি বলবেন ভেবে পেলেন না। আগে বড় নাতিকে বলতে হবে, নয়তো কিছু করা যাবে না। অন্যদিকে, আলো মিনমিন করে বলল,
-“লোকটার বয়স বেশি না?”
তাহমিনা খান বিরক্তিতে বললেন,
-“কোথায় বেশি দেখলে? মাত্র তো উনত্রিশ বছর। আর তোমার স্বামীর থেকে দু বছরের জুনিয়র! সেখানে বয়স বেশি দেখলে কোথায়?”
আলো কিছু না বলে চুপ থাকল। তিথি সজোরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
-“আমি এই বিয়ে করব না আম্মু। আর না এনগেজমেন্ট করব। আমি কাল সকালেই ফিরে যাচ্ছি চট্টগ্রামে।”
একথা বলে খাবার না খেয়েই চলে গেল তিথি। আর তাহমিনা খান রাগান্বিত চেহারায় মেয়ের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
—————————————-
আজ অফিসে একজনের সাথে রাতের বেশ ঝামেলা হয়েছে। সে মূলত লাঞ্চের জন্য ক্যান্টিনে এসেছিল। লাঞ্চ শেষে কফি খেতে খেতে ফোন দেখছিল আর সামনে হাঁটছিল। তখনই অসাবধানতার কারণে একটা টেবিলের সাথে ধাক্কা খায় এবং সঙ্গে সঙ্গে তার হাতের কফি গিয়ে পড়ে একটি ফাইলের উপর। সেখানে একজন রমণী বসে থেকে নিজের কাজ করছিল। সকাল থেকে একটানা কাজ করে মাত্র ফাইলটা চেক করছিল। কারণ একটু পরই বসকে জমা দিতে হবে। নয়তো কথা শুনতে হবে। কিন্তু তা আর হলো কই? এক মূহুর্তেই তার সব কষ্ট বিফলে চলে গেল।
রাত সরি বলেছিল মেয়েটাকে। কিন্তু মেয়েটা রাগে-দুঃখে, কষ্টে, যা নয় তাই বলে সবার সামনে অপমান করে তাকে। সবটা সময় ধরে রাত শুধু রাগ-ক্ষোভে ফুঁসে গিয়েছে। অফিস হওয়ার জন্য সে বেশিকিছু বলতে পারেনি মেয়েটাকে। শুধু মুখ বুঁজে চুপচাপ সয়ে গেছে।
-“কি হয়েছে ঈশু? কোনো সমস্যা?”
বান্ধবীর কথা শুনে ঈশু কান্না আটকিয়ে বলল,
-“আজ মনে হয় এই অফিসে লাস্ট দিন আমার।”
পাপিয়া চমকে উঠল। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
-“আবার কী করেছিস তুই?”
ঈশু দুপুরের ঘটনা সবটা খুলে বলল। সবকিছু শুনে নিজের কপাল চেপে ধরে পাপিয়া অস্ফুটস্বরে বলল,
-“স্যার তোকে শেষবারের মতো একটা সুযোগ দিয়েছিল। অথচ এটাও গেল। এখন কি হবে ওপরওয়ালা জানে!”
ঈশু আড়ালে চোখের পানি মুছে নিল। অনেক কষ্টে এই জবটা পেয়েছিল সে৷ পারিবারিক সমস্যার জন্য মাস্টার্স করতে পারেনি। শুধু গ্রাজুয়েশন কোনোমতে শেষ করেছে। পরিবারের বড় মেয়ে হওয়ায় সব দায়িত্ব তার কাঁধে। বাবা বিহীন সংসার তাকেই সামলাতে হয়। আগে টিউশনি করিয়ে সংসার ও নিজের লেখাপড়া চালিয়েছে। আর এখন এই জবটা পেয়েছে, কিন্তু এটাও হারানোর পথে।
-“মিস ঈশিতা! আপনাকে স্যার ডাকছেন।”
অফিসের ম্যানেজার এসে ঈশুর উদ্দেশ্যে বাক্যটি বলে। মেয়েটা জোরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে যেতে লাগল। তখনই রাত এসে একটা ফাইল দিয়ে বলল,
-“নিন, আপনার ফাইল।”
ঈশিতা চমকে উঠল। তড়িঘড়ি করে ফাইল নিয়ে চেক করে দেখল, সব কাজ কমপ্লিট করা আছে। এমনকি তার করা কাজের থেকেও এটা কয়েকগুণ নিখুঁত। ঈশিতা অবিশ্বাস্য কণ্ঠে শুধাল,
-“এ….এটা আপনি করেছেন?”
-“নো, আপনার বয়ফ্রেন্ড এসে করে দিয়ে গেছে।”
একথা বলে রাত হনহনিয়ে চলে যায়। মেয়েটা সামান্য ধন্যবাদটুকুও দিতে পারল না। তবে সে এসব না ভেবে জলদি বসের কেবিনে চলে গেল।
আলো নাস্তার প্লেট সাজিয়ে নিয়ে রুমে এসে টি-টেবিলের ওপর রাখল এবং খেয়াল করল, মানুষটা গোসল নিয়ে বেরিয়েছে। আধার তোয়ালে সোফার ওপর রেখে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়ায়। তখন অনুভব করে, একজোড়া কোমল হাত তাকে জড়িয়ে ধরেছে। আধার ঠোঁট কামড়ে হেঁসে হাতের ওপর হাত রেখে বলল,
-“আজ সূর্য কোনদিকে উঠেছে?”
আলো কোনো জবাব দিল না। সে আগের মতোই পিছন থেকে স্বামীকে জড়িয়ে ধরে পিঠে মুখ গুঁজে আছে৷ একসময় জিজ্ঞেস করল,
-“ভালোবাসায় বিশ্বাস করেন?”
আধার বিছানায় বসে, আলোকে নিজের এক রানের ওপর বসিয়ে নিয়ে শান্ত গলায় বলল,
-“আগে যদি এই প্রশ্নটা করতে, তাহলে উত্তর আমার না হতো। আর এখন…”
-“এখন?”
-“হ্যাঁ, আমি বিশ্বাস করি ভালোবাসায়।”
আলোর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। সে দু’হাতে স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরে গালে টুপ করে চুমু খেল। আধার সরু চোখে তাকিয়ে সন্দিহান কণ্ঠে শুধাল,
-“তোমার মতলব আমার ঠিক লাগছে না। কথায় আছে, অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ!”
আলো মুচকি হেঁসে মানুষটার গালে হাত রেখে জানতে চাইল,
-“ভালোবাসেন আমায়?”
আধার ঝুঁকে এসে ঠোঁটে শক্ত চুমু খেয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“উঁহু, একটুও না।”
আলো নিঃশব্দে হেঁসে কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে বলল,
-“আমি যদি আপনার কাছে কিছু চাই, তাহলে দিবেন?”
একথা শুনে আধারের মনটা খচখচ করল। সে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“আমার থেকে কখনোই মুক্তি পাবে না।”
-“আমার মুক্তি চাই না। আমি সারাজীবন আপনার কাছে থাকতে চাই।”
আধার মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল। সে তো এক মূহুর্তের জন্য ভয় পেয়ে গেছিল।
-“বলো, কি চাই তোমার? আমার সাধ্য থাকলে অবশ্যই এনে দিবো।”
আলো একটু সময় নিয়ে বলে উঠল,
-“তিথির বিয়েটা ভেঙে দিন। ও অন্য একজনকে ভালোবাসে! আর তাকেই বিয়ে করতে চায়।”
#চলবে
#এক_মুঠো_চাঁদের_আলো
#লেখনীতে_নুসরাত_ফারিয়া
#পর্ব_৩৮
কিছু কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এবং অপ্রত্যাশিত বাক্য মূহুর্তেই ব্যক্তিকে থমকাতে, চমকাতে, ও স্তব্ধ করতে বাধ্য করে। ঠিক তেমনই আজ আলোর মুখে ছোট বোনের ব্যাপারে এমন কথা শুনে আধার কয়েক মিনিটের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। মেয়েটার কোমর আঁকড়ে ধরা হাত দুটোও ঢিলে হয়ে গেল। আলো নিজের ব্যালেন্স ঠিক রাখার জন্য মানুষটার টিশার্টের গলা খামচে ধরল। খেয়াল করল, লোকটার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে। সাথে দুচোখের সাদা অংশও লালচে ধারণ করেছে। আলোর হঠাৎই বুকটা ধক করে উঠল। তাহলে কি সে ভুল জায়গায় কথাগুলো বলল? কিন্তু…একটু আগেই তো তিনি বললেন যে, উনি ভালোবাসায় বিশ্বাস করেন। তাহলে এখন এমন অস্বাভাবিক রিয়াকশন কেন?
আলোর ভাবনার মাঝেই আধার তাকে বিছানায় রেখে, দ্রুত পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আলো হতবাকের মতো কয়েক সেকেন্ড বসে থেকে মূহুর্তেই দৌড়ে বাইরে যায়।
-“এই তিথি? দরজা খোল!”
আধার বোনের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে দরজায় নক করছে। কিন্তু ভেতর থেকে কোনোরকম সাড়াশব্দ এল না। আর না মেয়েটা দরজা খুলে দিল। আধারের মনটা অস্থির হয়ে যায়। চোখের পাতায় পুরোনো স্মৃতি ভেসে উঠছে। সে হাসফাস করতে করতে আরো কয়েকবার ডাকল বোনকে। কিন্তু ফলাফল আগের ন্যায় শূন্য।
অন্যদিকে আধারের চিল্লাচিল্লি শুনে তাহমিনা খান ও সোবহান খান হন্তদন্ত হয়ে দোতলায় উঠে এলেন। ততক্ষণে আলোও এসে পাশে দাঁড়িয়েছে। আধারের পক্ষে আর ধৈর্য ধরা সম্ভব হলো না। দরজার কাছ থেকে আলোকে দূরে সরিয়ে দিয়ে,সে চোখের পলকেই দরজাটা ভেঙে ফেললো। তড়িঘড়ি করে রুমের ভেতরে এসে সবাই দেখল—তিথি বিছানার মাঝে এলোমেলো ভাবে শুয়ে আছে৷ আধার ছুটে এসে বোনের দু’গালে হাত রেখে ডাকতে শুরু করল। কিন্তু মেয়েটা চোখ মেলে তাকাল না!
তাহমিনা খান খুব ভয় পেয়ে যান। একমাত্র আদরের মেয়ে উনার। তার কিছু হলে তিনি কিছুতেই সইতে পারবেন না। তিনি ছুটে এসে মেয়েটার মাথা কোলের ওপর নিয়ে ডাকতে থাকলেন। সোবহান খান চিন্তিত মুখে নাতনির পাশে বসলেন। আলো কপালের ঘাম মুছে আশেপাশে তাকায়। তিথির শরীরে কোনোরকম ক্ষত নেই! নিঃশ্বাসটাও পড়ছে খুবই ধীরে। তার এলোমেলো দৃষ্টি গিয়ে আঁটকায় টি-টেবিলের ওপর রাখা ঔষধের পাতায়। আলো ছুটে এসে ঔষধের পাতা হাতে নিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলল,
-“তিথি তিনটে ঘুমের ঔষধ খেয়েছে।”
আধার চমকে উঠল। সে কাউকে কিছু না বলে তিথিকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে রুমের বাইরে ছুটল। উদ্দেশ্যে তার হাসপাতালে যাওয়া। কারণ সে তার বোনকে নিয়ে কোনোরকম ঝুঁকি নিতে চায় না।
-“তোমাকে যেতে হবে না। তুমি বাড়িতে থাকো!”
আলোকে গাড়িতে উঠতে দেখে আধার শান্ত গলায় বলে। এমনিতেই মেয়েটার শরীর ভালো নেই, তারওপর হাসপাতালে গেলে আরো শরীর খারাপ করবে। তাই সে চাচ্ছে না মেয়েটা তাদের সাথে যাক। আলো পাশে ফিরে অস্থির কণ্ঠে বলল,
-“না, আমিও যাবো।”
-“ভেতরে যেতে বলেছি!”
-“আপনি এমন করছেন কেন? আমি তিথির সাথে যাবো।”
আলো জেদি কণ্ঠে বলে গাড়ির ডোর খুলে ভেতরে প্রবেশ করার চেষ্টা করলে, আধার তেড়ে এসে হাতের বাহু শক্ত করে চেপে ধরে এক ঝটকায় বাহিরে নিয়ে এসে গর্জে উঠল,
-“তোমাকে আমি যেতে না করেছি। তারপরেও এত জেদ করছো কেন? তুমি কি বুঝতে পারছো না? তোমার জন্য আমাদের সময় নষ্ট হচ্ছে!”
বাজখাঁই গলার ধমকে আলো কেঁপে উঠল। একই সাথে হাতের ব্যথায় ও মানুষটার এমন ব্যবহারে চোখদুটো ছলছল করে ওঠে। আধার আজ দেখেও না দেখার ভান করে আলোকে ছেড়ে গাড়িতে উঠে বসল, তারপর গাড়ি স্টার্ট দিয়ে হাওয়ার বেগে ছুটে চলে গেল। আলো মাথা নিচু করে ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকিয়ে রাখার বৃথা চেষ্টা করল। সে তো একটু যেতেই চেয়েছিল। তাই বলে মানুষটা এমন করবে?
হঠাৎই আলোর পেটের ভেতরটা গুলিয়ে উঠল। সে একহাতে মুখ চেপে ধরে বাড়ির ভেতরে ছুটে যায়। কোনোমতে রুমে এসে ওয়াশরুমে গিয়ে বমি করতে লাগল। মেয়েটার শরীর ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে গেল। সে মুখ ধুয়ে একহাতে মাথা ও আরেক হাতে নিজের পেট চেপে ধরে, চোখ বুজে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মাথাটা তার হালকা ঘুরছে! কিছুক্ষণের মধ্যে আবারো পেট গুলিয়ে উঠল। মেয়েটা আরেকদফা বমি করল এবং একসময় তার শরীরটা নেতিয়ে পড়ল।
🌸
অফিসে অনেকটা দেরি হয়ে যায় রাতের। সব দোষ ওই বেয়াদব মেয়েটার। নিজের কাজ ফেলে রেখে মেয়েটার ফাইল রেডি করেছে। তাই তো এখন নিজের কাজ করতে করতে লেট হয়ে গেল। রাত বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে সবকাজ শেষ করে, হাতে ব্যাগ নিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে এল। পার্কিং প্লেস থেকে নিজের বাইকে উঠে গেট দিয়ে বেরিয়ে কিছুদূর আসতেই ব্রেক কষলো। কারণ সামনে রাস্তার পাশে ল্যাম্পপোস্টের নিচে ওই বেয়াদব মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো রিকশা খুঁজতেছে।
রাত বাইকের ওপর বসে থেকে অচেনা মেয়েটাকে দেখছে। একটা রিকশাওয়ালার সাথে ভাড়া নিয়ে ঝগড়া করছে। রাগারাগি করার ফলে উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণের চেহারাটা হালকা লালচে হয়েছে। নাকের পাতা দুটো বারবার ফুলে উঠছে। মেয়েটার ঝগড়া করার অঙ্গভঙ্গি দেখে অজান্তেই ঠোঁট কামড়ে হাসল রাত। এই মেয়েলোকগুলো এত ঝগড়া করতে কীভাবে পারে? এদের কি মুখ ব্যথা করে না? সারাক্ষণ হাঁসের মতো প্যাক প্যাক করতেই থাকে।
নিজের ভাবনার মাঝে খেয়াল করল—মেয়েটার বকাবকি শুনে রিকশাওয়ালা চলে গিয়েছে। রাত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাইক নিয়ে মেয়েটার সামনে থামল। মাথায় হেলমেট পরে থাকার জন্য ঈশিতা প্রথমে চিনতে পারল না। যখন যুবকের সর্বাঙ্গে নজর বুলিয়ে নিল, তখনই চিনতে পারে এই ব্যক্তি কে।
-“সামান্য কয়েকটা টাকার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে ঝগড়া করছেন, মিস?”
রাতের কথা শুনে ঈশিতা তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
-“বড়লোকের ছেলেরা কি বুঝবে টাকার মূল্য! তারা তো দু’হাতে টাকাপয়সা উড়ায়।”
মেয়েটার বলা কথাগুলো রাতের বড্ড গায়ে লাগল। কারণ সে এতগুলো বছর ধরে বড় ভাইয়ের টাকা নষ্ট করে এসেছে। আগপাছ কিছুই ভাবেনি! অথচ সে এখন একটু হলেও উপলব্ধি করতে পারছে, টাকা কামানো কতটা কষ্টের।
রাত নিজেকে সামলিয়ে হেলমেট খুলে শান্ত গলায় বলল,
-“লিফটের প্রয়োজন?”
-“থ্যাংকস! বাট…আমার লিফটের প্রয়োজন নেই। আমি চলে যেতে পারব।”
-“ওকে ফাইন।”
একথা বলে রাত পুনরায় হেলমেট পরে বাইকের চাবি ঘুরিয়ে, স্টার্ট দিয়ে বাতাস চিঁড়ে ছুটে চলে যায়। ঈশিতা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সামনে হাঁটতে শুরু করল। এই রাস্তাটা শুনশান হওয়ায় তেমন গাড়িঘোড়া পাওয়া যায় না।
ঈশিতা আনমনে হাঁটতে হাঁটতে খেয়াল করল, সামনে থেকে একটা রিকশা আসছে এবং এসে সোজা তার সামনেই থামল। ঈশিতা নিজের ঠিকানা বলে—জিজ্ঞেস করল যাবে কি’না। লোকটা সাথে সাথে হ্যাঁ বললেন। এবং এটাও জানালেন, সে যা ভাড়া দিবে ওইটাই নিবে। এতে ঈশিতার মনে খটকা লাগে। এই লোকটার আবার কোনো খারাপ মতলব নেই তো? দেখে তো তেমন কিছু মনে হচ্ছে না। কিন্তু তার মন বলছে, কিছু একটা গন্ডগোল আছে। তাই সে সরাসরি নাকচ করে দিল। যাবে না ওই রিকশায়।
লোকটা হয়তো মেয়েটার সন্দেহ বুঝতে পরেছেন। তাই তিনি হেঁসে বললেন,
-“ভয় পাবেন না। আমি খারাপ লোক নই। আর আপনাকে সুস্থ অবস্থায় বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার জন্যই আমাকে একজন পাঠিয়েছে।”
লোকটার কথা শুনে ঈশিতার পা জোড়া শ্লথ হয়ে যায়। সে চমকে উঠে পিছনে ফিরে অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
-“কে সেই ব্যক্তি?”
-“সেটা তো বলতে পারব না। এখন শুধু আপনাকে আপনার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমার।”
ঈশিতা দ্বিধায় পড়ে গেল। সে এখন কি করবে না করবে, ভাবতে ভাবতেই উঠে পড়ল রিকশায়। এরপর যা হবে দেখা যাবে। লোকটা তার কথামতো একদম একটা পুরাতন বিল্ডিংয়ের সামনে রাখল। ঈশিতা মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে নেমে পড়ল। ভাড়া দেওয়ার সময় লোকটা বললেন,
-“উনি আগেই ভাড়া দিয়ে দিয়েছেন। আপনাকে আর দিতে হবে না!”
একথা বলে লোকটা রিকশা নিয়ে চলে গেলেন। আর ঈশিতা হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইল। মনে মনে ভাবতে লাগল—কে এই অচেনা শুভাকাঙ্ক্ষী?
————————————–
পরেরদিন সকালে হাসপাতাল থেকে তিথিকে নিয়ে খান বাড়িতে ফিরল আধার। রাতেই তাহমিনা খান ও সোবহান খানকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিল। শুধু শুধু হাসপাতালে থেকে শরীর খারাপ করার কোনো মানেই হয় না। তারওপর মেয়েটাকেও একা বাড়িতে রাখতে চায়নি। বিশেষ করে ছোট ভাইয়ের জন্য। তাই সে নিজে আসতে না পারলেও তাদেরকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে পাঠিয়ে দেয়।
তিথি এখন কিছুটা সুস্থ আছে। ঔষধগুলো খুব বেশি ইফেক্ট ফেলতে পারেনি তার শরীরে৷ কারণ আধার সঠিক সময়েই হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছে। তারপর ডাক্তার স্টমাক ওয়াশ করে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে জ্ঞান ফিরে আনেন।
পুরো একটা রাত নির্ঘুম কাটিয়ে আধার বড় বড় পা ফেলে নিজের রুমে এল। রাতে মেয়েটাকে অনেকবার কল দিয়েছিল। এমনকি এসএমএসও করেছিল। কিন্তু মেয়েটা কোনো রেসপন্স করেনি, আর না কল ধরেছে। হয়তো তখনকার ঘটনা নিয়ে অভিমান করে আছে। আধার জোরে শ্বাস ফেলে রুমে এসে দেখে, আলো পুতুল চেপে ধরে গুটিসুটি মে’রে ঘুমিয়ে আছে। তার আশেপাশে টুনা, টুনিও শুয়ে আছে। আধার অপলক নয়নে মেয়েটার ঘুমন্ত কিউট চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকল। কাছে আসতে চেয়েও কিছু একটা ভেবে এল না। এখন তার গোসল নেওয়ার প্রয়োজন। কারণ হাসপাতাল থেকে এসেছে। আর এই শরীরে মেয়েটার কাছে যাওয়া যাবে না। তাই সে আলমারি থেকে জামাকাপড় নিয়ে দ্রুত ওয়াশরুমে চলে গেল।
ঘুমের ঘোরে নরম ঠোঁটের স্পর্শ পেয়ে আলো মৃদুস্বরে গোঙাল। চোখেমুখে গরম নিঃশ্বাস আছড়ে পড়তেই ব্রেন সজাগ হলো। কিন্তু পুরোপুরি ঘুম ছুটে গেল না। হঠাৎই তার মনে হলো, বাড়িতে আধার স্যার নেই। তাহলে তাকে কে এইভাবে চুমু খাচ্ছে? তারমানে এটা ওই প্লে-বয় নয় তো?
ব্যস! আলোর সব ঘুম মূহুর্তেই উড়ে গেল। একই সাথে রুমের পিনপতন নীরবতা ভাঙল—এক জোড়ালো থাপ্পড়ের শব্দে।
-“আ….আপনি!”
আলোর কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল। সে ভয়ে ভয়ে সামনে ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে বারবার শুকনো ঢোক গিলছে। এতবড় একটা ভুল কীভাবে করতে পারল সে? একবার তো চোখ মেলে তাকিয়ে দেখার উচিত ছিল। তাহলে হয়তো এই সর্বনাশটা ঘটত না।
অন্যদিকে, আধার নিজের বাম গালে হাত রেখে স্তব্ধ হয়ে আছে। তার চোখের দৃষ্টি সামনে বসে থেকে ভয়ে কাঁপতে থাকা রমণীর পানে। এই প্রথম বউয়ের নরম হাতের গরম থাপ্পড় খেয়ে সে বাকরুদ্ধ, হতভম্ব, হতবাক, আহাম্মক, হতবিহ্বল ইত্যাদি ইত্যাদি সবকিছু হয়ে থম মে’রে বসে আছে। সে এতোটাই শকড যে, নিজের ভাষায় হারিয়ে ফেলেছে।
-“স….সরি! আ-আমি ইচ্ছে করে এমনটা ক…!”
আলো বাকী কথাগুলো আর বলতে পারল না। কারণ লোকটা উঠে চলে গিয়েছে বাইরে। আলো ছলছল চোখে নিজের ডান হাতের দিকে তাকায়। এই হাতটা দিয়েই কি-না সে তার প্রিয় মানুষটিকে আঘাত করেছে। উনি নিশ্চয়ই মনে মনে খুব কষ্ট পেয়েছেন। সে এটা কীভাবে করতে পারল? কীভাবে?
তাহমিনা খান নিজ হাতে মেয়েকে হালকাপাতলা নাস্তা করিয়ে দিয়ে ঔষধ খাইয়ে দিলেন। তিনি মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ধরা গলায় বললেন,
-“মায়ের ওপর এত অভিমান তোমার?”
তিথি কিছু বলতে যাবে তখনই তার গালে পুরুষালী হাতের থাপ্পড় পড়ল। মেয়েটা ছিটকে বিছানায় আছড়ে পড়ে! তাহমিনা খান চমকে উঠে মেয়েকে আগলে নিয়ে চিল্লিয়ে উঠল,
-“রাতততত!”
রাতের চেহারা অসম্ভব রকমের লাল হয়ে আছে। সে রাতে কিছু জানতে না পারলেও সকালে সবটা জেনেছে। তারপরই শরীরের র’ক্ত মাথায় অবধি উঠে গেছে। রাত রাগে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
-“মেয়েকে এই করতে চট্টগ্রামে পাঠিয়েছিলে? রাতে যদি ভাই সঠিক সময়ে ওকে হাসপাতালে না নিয়ে যেত, তাহলে কি ঘটতে পারত—একবারও সেটা ভেবে দেখেছো?”
তিথি মা’কে জড়িয়ে ধরে শব্দ করে কাঁদছে। তাহমিনা খান মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে গম্ভীর কণ্ঠে ছেলের উদ্দেশ্যে বললেন,
-“তাই বলে তুমি এইভাবে মা’রবে অসুস্থ মেয়েটাকে?”
-“মা’রব, হাজার বার মা’রব। ওর না খুব ম’রার শখ? আজ নাহয় এটা আমি নিজ হাতেই পূরণ করব। তারপর তোমার মেয়ের সো কোল্ড বয়ফ্রেন্ডকেও দেখে নিবো!”
রাত চিল্লিয়ে কথাগুলো বলে তিথির হাতের বাহু চেপে ধরে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যেতে লাগল। কতবড় সাহস মেয়েটার! অন্য কারোর জন্য নিজের জীবন দিতে চলেছিল।
-“রাত!”
বড় ভাইয়ের গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনে রাত থেমে গেল। তিথি কাঁদতে কাঁদতে অসহায় চোখে ভাইয়ের দিকে তাকায়৷ আধার কিছু না বলে এগিয়ে এসে রাতের হাতের বাঁধন থেকে বোনের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে চোখের পানি মুছে দিল। তিথি বড় ভাইকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল।
-“আ…আমি! আমি এমনটা করতে চাইনি ভাইয়া। আমি শুধু একটু ঘুমানোর জন্য ঔষধ খেয়েছিলাম৷ কিন্তু…বুঝতে পারিনি এতে সমস্যা হবে৷”
আধার বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আস্তেধীরে নিচে নেমে এল। এবং তিথিকে সোফায় বসিয়ে দিয়ে সে সামনে হাঁটু ভেঙে বসল।
-“তুই কাউকে ভালোবাসিস? আর এটার জন্যই কি এই বিয়ে করতে চাচ্ছিস না?”
ড্রয়িংরুমে সবাই উপস্থিত! তিথি চোখের পানি মুছে মাথা নিচু করে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
-“হ…হ্যাঁ!”
-“ছেলেটাও কি তোকে ভালোবাসে?”
-“খুউউউউব!”
-“তোর সাথেই পড়ে?”
-“হুম, কিন্তু ও এবার মাস্টার্সে।”
-“ঠিক আছে। আমি আধার কথা দিলাম, তোর বিয়ে তোর ভালোবাসার মানুষটার সাথেই হবে। আর অনিমেষের সাথে বিয়ে ক্যান্সেল! এবার হ্যাপি?”
বড় ভাইয়ার কথা শুনে মূহুর্তেই তিথির ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে চট করে ভাইয়ার গলা জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“আমি খুব খুশি ভাইয়া, খুউউব।”
আধার হাসল। ওইদিকে তাহমিনা খান কিছু বলার জন্য ছটফট করছেন। কিন্তু শশুর মশাইয়ের জন্য কিছু বলতে পারছেন না। আধার বোনের কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে আদর করে দিয়ে বলল,
-“এখন রুমে গিয়ে রিল্যাক্সে ঘুম দিবি। একদম মন খারাপ কিংবা কান্নাকাটি করবি না। নিজের শরীরের প্রতি খেয়াল রাখ, আফটার অল সামনে তোর বিয়ে। সো জাস্ট চিল!”
তিথি মন খুলে হাসল। হঠাৎই তার নজর ভাইয়ের বাম গালের দিকে গেল। যেখানে লাল হয়ে আছে। সে আলতো হাতে গাল স্পর্শ করে বিচিলিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
-“এখানে কি হয়েছে ভাইয়া? কেউ মে’রেছে?”
আলো সিঁড়ির মাঝখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। লোকটার বলা কথাগুলো শুনে তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলেও ননদের কথা শুনে মূহুর্তেই হাসিটা গায়েব হয়ে গেল।
-“উঁহু, জাস্ট বিচ্ছু একটা পোকা ছুঁয়েছে। তাই লাল হয়েছে। তুই এসব নিয়ে না ভেবে রুমে গিয়ে রেস্ট নে। শেফালি চাচি ওকে নিয়ে যান!”
আধারের কথা শুনে তিথি আর কিছু বলল না। চুপচাপ শেফালি চাচির সাথে চলে গেল।
-“এটা তুমি কি করলে আধার? চেনা নেই যা নেই, হুট করে একটা বেকার ছেলের সাথে বিয়ে ঠিক করে দিলে?”
আধার শান্ত চোখে তাহমিনা খানের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“তো কি করতাম? বলুন আমি কি করতাম? আপনি নিশ্চয়ই অতীত ভুলে যাননি। আমি একবার আমার বোনকে হারিয়েছি, দ্বিতীয় বার আর বোনকে হারাতে পারব না।”
-“তাই বলে একটা বেকার ছেলের সাথে….!”
-“আপনার মেয়ে ওই বেকার ছেলেকেই ভালোবাসে, আর তাকেই বিয়ে করতে চায়। মেয়েটাকে একবার দেখছেন? ওর কি হাল হয়েছে? এখনো বিয়ে ঠিক হয়নি, জাস্ট কথাবার্তা চলছিল! এতেই মেয়েটা কেমন রিয়াক্ট করল সেটা তো জলজ্যান্ত প্রমাণ পেলেন। আর কি চাই আপনার বলুন তো? সারাক্ষণ টাকা আর টাকা করেন। তা আপনি টাকা কি কবরেও সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন? ছেলেটা এখন না-হয় বেকার আছে, নিজের লেখাপড়া শেষ করলে অবশ্যই একটা ব্যবস্থা করবে। আর আমি লোক লাগিয়ে দিবো সবকিছু জানার জন্য। ওই ছেলেটা যদি খারাপ হয়, তাহলে কখনোই তিথির সাথে বিয়ে দিবো না। এইটুকু বিশ্বাস রাখতে পারেন আমার ওপর। আমি আর যাই করি না কেন, কখনো আপনার ছেলে-মেয়ে কোনো ক্ষতি চাইনি। বরং তাদেরকে ভুল পথে যাওয়া থেকে সাবধান করেছি। কিন্তু আপনার ছেলে-মেয়ে কেউ-ই আমার কথা শোনেনি। এখন আপনি ভাবুন কি করবেন৷ টাকাপয়সা নিবেন নাকি নিজের মেয়েকে জীবন্ত অবস্থায় চোখের সামনে দেখবেন।”
একনাগাড়ে কথাগুলো বলে থামল আধার। তারপর রাতের সামনে গিয়ে দু’হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“বোনকে তো কখনো আগলে রাখতে দেখলাম না তোকে। তাহলে এখন এত দরদ কই থেকে আসছে হুহ্? মেয়েটাকে যেই থাপ্পড়টা মে’রেছিস না? ওটা তোকে মা’রা উচিত। নিজের চরিত্র ঠিক নেই আর এসেছে অন্যকে জাজ করতে।”
একটু থেমে পুনরায় হিসহিসালো,
-“আই উইশ….ছেলেটা যেন তোর মতো না হয়!”
রাত ভাইয়ের চোখে চোখ রেখে বলল,
-“আমি নিজেকে শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করছি। তুমি চাইলে খোঁজখবর নিতে পারো।”
আধার হালকা হেঁসে বলল,
-“আমি আমার দায়িত্ব সবসময় পালন করি। এখন না-হয় তুই একটু দায়িত্ব পালন কর।”
-“বলো কি করতে হবে?”
-“চট্টগ্রামে গিয়ে ছেলেটার চৌদ্দ গুষ্ঠির খবর বের কর, সাথে পুরো বায়োডেটা! ভুলভাল যদি কোনো ইনফরমেশন আনিস, তাহলে ওইদিন তোকে আমি জুতা দিয়ে পেটাবো। আশা করছি মন দিয়ে কাজ করবি!”
রাত হালকা ঝুঁকে এসে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“সে না-হয় করব! কিন্তু তুমি তো নিজেই বউয়ের হাতে মা’র খেয়ে বসে আছো। সেখানে আমাকে মা’রবে কি? উল্টো বোম্বাই মরিচ তোমাকেই উত্তম-মধ্যম দিবে। উমম….অলরেডি দেওয়া শুরু করেছে!”
একথা বলে রাত দাঁত কেলিয়ে হাসল। আধার রাগে দাঁতে দাঁত পিষলো। সেখান থেকে চলে যাওয়ার সময় শুধু বলল,
-“দোয়া করি, তোর কপালে এমন একটা মেয়ে জুটুক যে কি-না তোকে তিনবেলা সর্ষে ফুল দেখাবে!”
———————————
সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে এসেছে। আলো গুটিগুটি পায়ে খাবারের প্লেট নিয়ে ননদের রুমে এসে দেখে, তিথি মাত্র গোসল নিয়ে বেরিয়েছে। সে টি-টেবিলের ওপর প্লেট রেখে পিছনে ফিরতেই তিথি দু’হাতে ঝাপটে জড়িয়ে ধরল তাকে। আলো প্রথমে হকচকিয়ে গেলেও পর মূহুর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে, মেয়েটার পিঠে হাত রাখল।
-“তোমাকে এত্ত এত্ত থ্যাংঙ্কিউউউ ভাবী! আজ সবকিছু তোমার জন্য হয়েছে।”
তিথি একগাল হেঁসে কথাগুলো বলে। আলো মুচকি হেঁসে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“আমি কিছুই করিনি তিথি। যা করেছে ওপরওয়ালা এবং তোমার বড় ভাইয়া। এখন চুপচাপ খাবার খেয়ে নাও, তারপর ঔষধ খেতে হবে।”
তিথি ভাবীকে ছেড়ে দিল। আলো এলোমেলো হয়ে থাকা বিছানাটা সুন্দর করে গুছিয়ে দেয়। তিথি সোফায় বসে থেকে খাবার খেতে খেতে জিজ্ঞেস করল,
-“তোমার মন খারাপ ভাবী?”
আলো একপলক মেয়েটার দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিল। আসলেই তার খুব মন খারাপ। ওই লোকটা তার সাথে একটুও কথা বলেনি। এমনকি ভার্সিটিতে যাওয়ার সময় তার কাছেও আসেনি। অন্যসময় তাকে আদর করে যেত, অথচ আজ আশেপাশেও ঘেঁষেনি। কোথায় ভেবেছিল সে অভিমান করে মানুষটার থেকে দূরে থাকবে। কিন্তু এখন ওই লোকটাই একটা থাপ্পড়ের জন্য তার থেকে দূরে থাকছে। মানছে তার থাপ্পড় মা’রাটা একদম উচিত হয়নি! কিন্তু সে তো আর ইচ্ছে করে মা’রেনি। ভুলবশত হয়ে গেছে। তারজন্য এইভাবে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিবে? এটা কেমন কথা?
-“তুমি ঠিক আছো ভাবী?”
তিথির কথায় আলোর ধ্যান ভাঙল। সে চটপট চোখের পল্লব ঝাপটিয়ে জবাব দিল,
-“হ্যাঁ, আমি ঠিক আছি। আর আমার মন খারাপ হবে কেন? আমি তো অনেক হ্যাপি। বিশেষ করে তোমার জন্য। অবশেষে তুমি তোমার ভালোবাসার মানুষটিকে পেতে চলেছো।”
তিথি লাজুক হেঁসে বলল,
-“তুমি কখনো কাউকে ভালোবাসোনি?”
-“আমি সবসময় নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। এসব প্রেম, ভালোবাসায় পড়ে ছ্যাকা খেয়ে বাঁকা হয়ে থাকার কোনো ইচ্ছে ছিল না৷ কারণ আমার দ্বারা প্রেম সম্ভব নয়। বয়ফ্রেন্ডকে যেই সময়টা দিতাম, ওটা নিজেকেই দিয়েছি। আর এখনকার কথা যদি বলো, তাহলে আমি আমার স্বামীকে ভালোবাসি! উনিই আমার প্রথম এবং শেষ ভালোবাসা।”
-“ভাইয়া অনেক লাকি, তোমার মতো একজনকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়েছে।”
-“উঁহু, তোমার ভাইয়াকে পেয়ে আমি লাকি। কারণ উনিই আমার সব পাগলামি, ত্যাড়ামি, অত্যাচার সহ্য করে।”
তিথি শব্দ করে হেঁসে উঠে বলল,
-“মানতেই হবে, বড় ভাইয়ার প্রচুর ধৈর্য!”
আলো মুচকি হেঁসে আরেকটু গল্প করে চলে গেল।
-“দাদাজান আসব?”
সোবহান খান নামাজ পড়ে খাওয়াদাওয়া করে রুমে এসে বসেছিলেন। তখন আলো উঁকি দিয়ে দরজায় নক করল। তিনি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলেন। আলো ভেতরে এসে দাদাজানের পাশে বসতে বসতে বলল,
-“একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”
-“শুধু একটা কেন? একশোটা জিজ্ঞেস করো।”
আলো কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীর কণ্ঠে আওরাল,
-“তোমার আরো একটা নাতনি ছিল?”
নাতবউয়ের মুখে এহেন কথা শুনে সোবহান খান থমকে গেলেন। বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে এদিকওদিক তাকালেন। আলো অধৈর্য হয়ে বলল,
-“বলো না দাদাজান? তোমার বড় নাতি সকালে কেন বললেন, উনি তার বোনকে হারিয়েছেন? কি হয়েছিল উনার বোনের সাথে? প্লিজ বলো আমায়।”
সোবহান খান টেবিলের ড্রায়ার খুলে পুরোনো দুটো ছবি বের করে নাতবউয়ের পাশে বসলেন। আলো উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করল। প্রথম ছবিতে দুজন ছেলে-মেয়েকে দেখা যাচ্ছে। পুতুলের মতো দেখতে মেয়েটাকে কোলে নিয়ে হাসিমুখে বসে আছে ছেলেটা। আর ছোট মেয়েটা দু’হাতে কেক মাখিয়ে দিয়ে খিলখিল করে হাসছে। ফানি ছবিটা দেখে আলোর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। দ্বিতীয় ছবির দিকে তাকাতেই চমকে উঠল। হাসি মুখে বিড়াল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রমণীকে চিনতে না পারলেও তার পাশে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটাকে দেখে চিনতে একটুও অসুবিধা হলো না। আলো অপলক নয়নে তাকিয়ে থেকে অস্ফুটস্বরে বলে উঠল,
-“আধার স্যার….!”
সোবহান খান ছলছল চোখে ছবির দিকে তাকিয়ে বললেন,
-“হ্যাঁ, আধার আর ওর বোন আফরিন।”
একটু থেমে পুনরায় বলতে শুরু করলেন,
-“আধারের দু বছরের ছোট আফরিন! আর পাঁচটা সংসারের মতো বড় বউমার সংসারও ছিল সুখের। আমরা সবাই ভালোই ছিলাম। আধারের যখন চার বছর পূর্ণ হয় তখন আমার ছেলে ও বউমার মধ্যে একটা ঝামেলা হয়। আশরাফ বিদেশি কোম্পানির সাথে অনেক বড় একটা ডিল সাইন করে এবং ওটার সব দায়িত্ব তার বন্ধু ওরফে ম্যানেজারকে দেয়। এটা নিয়ে বড় বউমা আপত্তি করেছিলেন। কারণ তার ওই লোকটাকে পছন্দ নয় আর সুবিধারও মনে হয় না। কিছু না কিছু গন্ডগোল পাকায়! আমি মেয়েটার পক্ষেই ছিলাম। এই নিয়েই তাদের মধ্যে বড়সড় ঝামেলা সৃষ্টি হয়। আশরাফ রাগের মাথায় মেয়েটার গায়ে হাত তুলেছিল। অথচ মেয়েটা সেসময় প্রেগন্যান্ট ছিল।
মরিয়ম রাগে-দুঃখে ছেলে-মেয়েকে রেখে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। কারণ তার যাওয়ার কোনো জায়গা ছিল না, তাই সে নিজের সাথে সন্তানদের নেয়নি। ভেবেছিল আশরাফ তাকে বাঁধা দিবে, কিন্তু দেয়নি। আমি আশরাফকে বোঝানোর অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু ও নিজের ইগোতে অনড় ছিল। সে সাফসাফ জানিয়ে দিয়েছিল বড় বউমা কে আর ঘরে তুলবে না। ওপরওয়ালা তার কথা রেখেছে। ওইদিনের পর আর কখনো বড় বউমা জীবিত অবস্থায় খান বাড়িতে ফেরেনি। শেষ বার তার মৃ’তদেহ দেখেছিলাম। বাসে করে গ্রামে ফিরছিলো, কিন্তু শেষ অবধি আর পৌঁছাতে পারেনি। মাঝপথেই অন্য একটা বাসের সাথে বাসটার এক্সিডেন্ট হয়। এবং অর্ধেক যাত্রীই নিহত হয়। তাদের মধ্যে আমার বড় বউমাও ছিল।”
সোবহান খান থামলেন। চোখের পানি মুছে জোরে শ্বাস নিয়ে পাশে বসা নাতবউয়ের দিকে তাকায়। আলো পাথরের ন্যায় থমকে আছে। অথচ তার রক্তিম চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সে এতদিন জানত, স্বাভাবিক মৃ’ত্যু! কিন্তু এখন জানতে পারল, অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে স্যার তার মা’কে সারাজীবনের জন্য হারিয়ে ফেলেছে। ইশশ! ওইদিন যদি উনার বাবা একটু বাঁধা দিত, তাহলে হয়তো এমনটা কখনো হতো না৷ বেঁচে যেত দুটো প্রাণ!
-“মা, ভাইকে হারিয়ে আধার প্রায় উন্মাদ হয়ে গেছিল। ওইটুকু বয়সে এই হারানোর শোক সইতে পারেনি ছেলেটা। ফলস্বরূপ একমাসের মতো হাসপাতালের বেডে ছিল। ছোট ছেলে-মেয়ে দুটো বিশ্বাসই করতে পারেনি তাদের মা আর নেই এই পৃথিবীতে। আমাকে শক্ত থাকতে হয়েছিল, শুধু আমার নাতি-নাতনির জন্য। আমি ভেঙে পড়লে তাদেরকে কে দেখত? ওরা তো তখন খুবই ছোট ছিল। এরমধ্যে আশরাফ আরো একটা অঘটন ঘটিয়ে দেয়। বড় বউমার মৃ’ত্যুর কয়েক মাস পরেই তাহমিনাকে বিয়ে করে এ বাড়িতে নিয়ে আসে। আমি দ্বিতীয় বারের মতো আমার ছেলের গায়ে হাত তুলেছিলাম। আশরাফ বলেছিল সে যা করেছে সবটা ছেলে-মেয়ের জন্য। কারণ তাদের মা প্রয়োজন। আমি প্রথমে মেনে না নিলেও আস্তে আস্তে মেনে নিয়েছিলাম। কারণ ছোট বউমা আধার ও আফরিন আদর করত, ভালোবাসত। একজন মায়ের দায়িত্ব সবকিছুই পালন করত। এসব দেখে আমার মন নরম হয়। এবং একসময় মেনেও নিই।
সবকিছু ঠিক থাকলেও যখন বছর ঘুরিয়ে রাতের আগমন ঘটল তখন হুট করেই ছোট বউমা পাল্টে গেল। ছোট মেয়েটা অত কিছু বুঝত না, কিন্তু আধার একটু হলেও তাদের প্রতি মা-বাবার অবহেলা বুঝতে পারত। বড় হওয়ার সাথে সাথে সে নিজেই বোনকে মানুষ করতে শুরু করে। একই সাথে আশরাফের প্রতি ঘৃণাটাও আরো বেড়ে গেল। আধার ওর বোনকে খুব ভালোবাসত। নিজের শখ, আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে বোনটার সব ইচ্ছে পূরণ করত। ওর স্বপ্ন ছিল বোনকে ডাক্তার তৈরি করার। কারণ এটা তার মায়েরও ইচ্ছে ছিল। আধার নিজেও চেয়েছিল এইচএসসি পরীক্ষার পর মেডিক্যালে এডমিশন দিবে। তারপর দুই ভাই-বোন একসাথে পড়াশোনা করবে। কিন্তু বেচারার সেই ইচ্ছেটা আর পূরণ হলো না।
রাতকে মা’রার কারণে আশরাফ সেই দিন ছেলেটাকে অনেক মে’রছিল এবং অনেক কথা শুনিয়েছে। এরপরই আধার বোনের ভবিষ্যতের কথা ভেবে দেশ ছেড়ে চলে যায়। এবং ওখানে থেকেই সমস্ত খরচ ও বহন করে। সে চেয়েছিল বোনকেও নিজের কাছে নিয়ে যাবে। কিন্তু আফরিন মেডিক্যালে চান্স পাওয়ার জন্য ভাইয়ের কাছে যেতে চায়নি। আর আধারও জোর করেনি।
সবটা স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। আধার যখন ছুটি নিয়ে চার বছর পর দেশে ফিরেছিল বোনকে দেখার জন্য, তখন এসে জানতে পারল তার বোনটা আর নেই। সে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিল বোনকে, কিন্তু দেশে ফিরে ও নিজেই সারপ্রাইজ পেয়ে যায়। ওইদিন বোনের করব আঁকড়ে ধরে বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কেঁদেছিল। পাগল মেয়েটা একজন ভুল মানুষকে ভালোবেসে নিজের জীবনটাই দিয়ে দিয়েছে। অথচ আমরা টের অবধি পাইনি। ওই বেইমান ছেলেটার বিয়ের দিনই আফরিন সুইসাইড করে। আধার সবকিছু জানার পর ওই ছেলেটাকে রাস্তায় জনগণের সামনে মে’রেছিল। উদ্দেশ্য ছিল জানে মে’রে ফেলার।
আশরাফ কোনোমতে ছেলেকে টেনেটুনে বাড়িতে নিয়ে এসেছিল। তারপর খান বাড়িটা মূহুর্তেই ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়। আধার সবকিছু ভেঙেচুরে আশরাফ কে শাসিয়ে ও চলে যায়। ছেলেটার অভিশাপ লেগেছিল আশরাফের। তার কয়েক মাস পরই সে ধীরে ধীরে ধ্বংস হতে শুরু করে। তার প্রাণপ্রিয় বন্ধুই একদিন তার সবকিছু ছিনিয়ে নেয় এবং একসময় ওর অস্তিত্বই পৃথিবী থেকে মুছে যায়। সবকিছু জেনেশুনেও আধার কিছুই করেনি। এমনকি মৃ’ত বাবাকে শেষ বারের জন্য দেখতেও আসেনি। তার কাছে অনেক আগেই তার বাবা ম’রে গেছিল।
আধার তার বাবাকে ঘৃ’ণা করলেও কখনো তাহমিনাকে ঘৃ’ণা করেনি৷ অপছন্দ করত কিন্তু খারাপ ব্যবহার করেনি। তাহমিনা তাকে না ভালোবাসলেও আফরিন কে একটু হলেও ভালোবাসত। আর এটার জন্যই আধার কোনোদিন মানুষটাকে ঘৃ’ণা করতে পারেনি। সেও ছোট বেলায় মায়ের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য তাহমিনার শাড়ির আঁচল ধরে ঘুরঘুর করত। কিন্তু আফসোস! এতিম ছেলেটা কখনোই ভালোবাসা পায়নি আর না পরিবারের সুখ পেয়েছে। সে তার ভালোবাসার মানুষদের কে হারিয়ে আজ নিঃস্ব। ওর যতই কষ্ট হোক, তবুও কখনো মুখ ফুটে বলবে না। এইজন্যই সে সহজে কাউকে ভালোবাসতে চায় না।”
ধরা গলায় কথাগুলো বলে থামল সোবহান খান। ওইদিকে আলোর চোখের পানি কিছুতেই থামছে না। সে নিজেকে আর সামলাতে পারল না। মূহুর্তেই দাদাজানের বুকে মুখ লুকিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। তার কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে। অথচ লোকটা এত কষ্ট কীভাবে মনের মাঝে নিয়ে আছে? ওই লোকটার জায়গায় সে থাকলে হয়তো এতদিনে স্ট্রোক করেই ম’রে যেত।
আলো কাঁদতে কাঁদতে ওপরওয়ালার উদ্দেশ্যে চিল্লিয়ে বলে উঠল,
-“মানুষটাকে এত দুঃখ-কষ্ট না দিলেও পারতে….!”
#চলবে

