#এক_মুঠো_চাঁদের_আলো
#লেখনীতে_নুসরাত_ফারিয়া
#পর্ব_৪৫
জ্যোৎস্না ভরা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থেকে আধার খান আজ বন্ধুর নিজের ভালোবাসার ব্যাখ্যা করল। যেটা শুনে মৃন্ময় নিঃশব্দে হেঁসে বলল,
-“ট্রাস্ট মি আধার! আমি কখনো কল্পনাও করিনি, তুই কাউকে ভালোবাসবি, তাও এতটা গভীরভাবে। তোরা দুজন সারাজীবন এমন করেই একসাথে থাক এবং তোদের এই ছোট্ট সংসারটা সুখ-শান্তিতে ভরে উঠুক।”
আধার হেঁসে কফি শেষ করে শান্ত গলায় বলল,
-“নিজের জীবনটা কবে গোছাবি? বয়স তো আর কম হলো না!”
-“তুই কি আমাকে বুড়ো বলছিস? আমি বুড়ো হলে তুইও বুড়ো। আফটার অল…উই আর দ্য সেম এইজ!”
-“আমার বউ আছে, কয়েকবছর পর ওপরওয়ালা চাইলে বাবাও হবো। কিন্তু তুই? তোর কি আছে?”
মৃন্ময় আকাশের দিকে তাকিয়ে স্নান হেঁসে বলল,
-“এ জীবনে কারোর প্রয়োজন নেই। আমি একাই ভালো আছি!”
-“আর কত নিজেকে এইভাবে কষ্ট দিবি? কেউ না জানলেও আমি জানি, তুই আজও ওই মেয়েটাকে ভুলতে পারিসনি। অথচ মেয়েটা স্বামী, সন্তানকে নিয়ে সংসার করছে। আর তুই দেবদাসের মতো চলাফেরা করছিস!”
মৃন্ময় শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শুধাল,
-“ধর—তুই যাকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসিস, মানে ভাবীজান যদি তোকে ছেড়ে চলে যায় কিংবা ধোঁকা দেয়, তাহলে কি তুই পারতিস ভুলে যেতে? প্রেয়সীকে ভুলে অন্য কারোর সাথে সংসার করতে পারতি? নিজের মনে অন্য মেয়েকে জায়গা দিতি? ভাবীজান ব্যতীত তুই কারোর হতি?”
এক মূহুর্তের জন্য আধার থমকাল। সে এইগুলো কখনো ভাবতেই পারে না, আর না নিজের ভালোবাসার মানুষটির জায়গায় অন্য কাউকে বসাতে পারবে। সে যদি মেয়েটাকে না ভালোবাসত, তাহলে হয়তো এখন অনেক বড় বড় কথা বলত, ভালোবাসার বিরুদ্ধে জ্ঞান দিত। কিন্তু…এখন সে নিজেই এই অসুখের মধ্যে পড়ে গেছে৷ যেখান থেকে চাইলেও আর বের হতে পারবে না।
বন্ধুকে চুপ করে থাকতে দেখে মৃন্ময় হাসল।
-“আই নো! এইগুলো প্রশ্নের উত্তর নেই তোর কাছে। কারণ তুইও কাউকে ভালোবাসিস, আর তাকে ছাড়া থাকতেও পারবি না। তাহলে ভাব! আমি কীভাবে আমার ভালোবাসাকে ভুলে যাবো? ও নাহয় বেইমান ছিল, কিন্তু আমি? এই আমিটা তো ওকে পাগলের মতো ভালোবেসেছি। ওর জন্য কি-না কি করেছি? অথচ, দিনশেষে আমাকে শূন্য হাতে ফিরে আসতে হয়েছে। তুই কল্পনাতেও ভাবতে পারিস না তোর ভালোবাসার মানুষটি অন্য কারোর হোক, কিন্তু আমি…নিজের চোখের সামনে আমার ভালোবাসাকে অন্য কারোর হতে দেখেছি। এই অসহনীয় যন্ত্রণা কই রাখি, বল তো?”
আধারের মুখে কোনো কথা নেই। কি জবাব দিবে, সেটাও খুঁজে পেল না। তার হৃদয়ের মাঝেও অজানা ব্যথায় পুড়ছে। সেও অনুভব করতে পারে, ভালোবাসার মানুষটিকে হারানোর বেদনা ঠিক কতটা কষ্টের! আধার আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ভাবতে লাগল—মৃন্ময়ের অতীত।
সেসময় তারা দুজন ক্লাস টেনে ছিল। প্রাইমারি থেকে কলেজ অবধি মৃন্ময়ের সঙ্গে পড়াশোনা করেছে সে। ছোটবেলা থেকেই একে অপরকে চিনত তারা! ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে ভাব হয় এবং একসময় খুব ভালো বন্ধুও হয়ে ওঠে। এমন কোনো কথা ছিল না, যেটা তারা একে অপরের সাথে শেয়ার করত না। পুরো স্কুল জুড়ে এই একটা ছেলেকে সে আপন ভেবেছিল নিজের মা’কে হারানোর পর। সে কথা খুব কম বলত, আর তার বিপরীত ছিল মৃন্ময়। সারাক্ষণ তার পিছু পিছু ঘুরত। এবং ভীষণ জ্বালাত। ছেলেটা খুবই চঞ্চল ছিল৷ একদম উগ্র স্বভাবের।
ক্লাস নাইন থেকেই একটা মেয়েকে পছন্দ করত মৃন্ময়। এক বছর লাইন মা’রার পর ক্লাস টেনে উঠে মেয়েটাকে প্রপোজ করে দেয়। তাও এক প্লেট ফুচকা, আইসক্রিম, চকলেট ও ফুল দিয়ে। মেয়েটা সেসময় ক্লাস সেভেনে পড়ত। হয়তো আবেগে পড়ে নয়তো মৃন্ময়ের বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখে প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল। ওইদিন ছেলেটা এতটাই খুশি হয়েছিল যে, পরণের টি-শার্ট খুলে স্কুলের মাঠের ঘুরেছিল, নেচেছিল। আর সে দূর থেকে বন্ধুর পাগলামি দেখেছিল আর হেঁসেছিল।
সবকিছু ভালোই চলছিল তাদের মধ্যে। একে অপরের সাথে জমিয়ে প্রেম করছিল। সময়ের সাথে সাথে সে আর মৃন্ময় কলেজে ওঠে এবং এইচএসসি পরীক্ষাও তাদের শেষ হয়। পরিবারের জন্য তো সে আর দেশে থাকতে পারেনি, বাধ্য হয়ে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল। ওইদিন ছেলেটার কি কান্না! যেন সে নয়, তার গার্লফ্রেন্ড তাকে ছাড়া চলে যাচ্ছে।
বন্ধুকে কোনোমতে বুঝিয়ে সে দেশ ছেড়েছিল। আর তার সাথে যোগাযোগও ছিল। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর এইভাবেই কেটে যায়। মৃন্ময় যখন গ্রাজুয়েশন ফাইনাল ইয়ারে ছিল, তখন হঠাৎই ছেলেটার সাথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় তার। ফোন বন্ধ, অনলাইনেও আসা বন্ধ করে দেয়। সে সপ্তাহ খানেক অপেক্ষা করেছিল, তাবুও ছেলেটার কোনো খবর না পেয়ে মিরার সাথে যোগাযোগ করে। আর তখনই জানতে পারে মৃন্ময় সুইসাইড করে হাসপাতালে ভর্তি আছে।
অপ্রত্যাশিত ঘটনা শুনে তার মাথায় পুরো আকাশটাই ভেঙে পড়ে। চেয়েও সে তখন দেশে ফিরতে পারেনি, আর না পেরেছে বন্ধুর পাশে থাকতে। সে সুইসাইড করার কারণটা জানতে চেয়েছিল, তখন সে জানতে পারে—মৃন্ময় যেই মেয়েটাকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবেসেছিল ওই মেয়েটা শেষ মূহুর্তে এসে ধোঁকা দেয় এবং অন্য কাউকে বিয়ে করে নেয়।
মৃন্ময় ছিল মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। বাবা পেশায় শিক্ষক আর মা গৃহিণী! মৃন্ময় টিউশনি করিয়ে নিজের ও বোনের লেখাপড়ার খরচ চালানোর চেষ্টা করত। তবে তার অর্ধেক উপার্জনই গার্লফ্রেন্ডের পিছনে যেত, হয়তো একটু বেশিই। শুরুতে সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও একসময় মেয়েটা নিজ থেকেই তাদের সম্পর্ক নষ্ট করে। এবং কারণ জানায়,তার পরিবার অন্য জায়গায় বিয়ে ঠিক করেছে। এটা শোনার পর মৃন্ময় নিজে ওর পরিবারের সাথে দেখা করে নিজের ভালোবাসার কথা জানায়। সে শুধু দুইটা বছর সময় চেয়েছিল, লেখাপড়া শেষ করে কোনো একটা জব খুঁজে নিবে। ছেলেটা ভেবেছিল আর কেউ না বুঝলে, তার প্রেয়সী তাকে বুঝবে। কিন্তু বোকা ছেলে! সে জানতোই না তার ভালোবাসার মানুষটি ওই বিদেশি টাকাওয়ালা লোকের সাথে বিয়ে করার জন্য নিজ থেকে রাজী হয়েছে৷
সেসময় মৃন্ময়ের ছিল শুধু রূপ, কিন্তু বড়লোক পরিবারের ছিল না। আর না তাদের অতিরিক্ত টাকাপয়সা, গাড়িঘোড়া আছে। মেয়েটা কি সুন্দর করে বলে দেয়, সে এতগুলো বছর জাস্ট টাইমপাস করেছে। কখনো মন থেকে ভালোই বাসেনি মৃন্ময়কে। শুধু ভালো লাগত, তাই রিলেশনে জড়িয়েছে। এছাড়া আর কিছুই না! ওইদিন মৃন্ময় একটা বড়সড় ধাক্কা খেয়েছিল। যাকে সে এতগুলো বছর মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবেসে এসেছে, সেই মেয়েটিই কিনা এইভাবে ধোঁকা দিল তাকে? এটা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছিল তার। বেহায়া, নির্লজ্জের মতো মেয়েটার হাত-পা ধরে কেঁদেকুটে নিজের ভালোবাসা ভিক্ষা চেয়েছিল। কারণ সে সত্যিই মেয়েটাকে ভীষণ ভালোবেসেছিল। নিজের বউ রূপে দেখার বড্ড ইচ্ছে ছিল। অথচ সে মেয়েটাকে অন্য কারোর বউ রূপে দেখেছে। এমনকি তার সামনেই মেয়েটা হাসিমুখে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল। এবং ওই রাতেই বাড়ি ফেরার পথে সুইসাইড করে। শুধুমাত্র ভাগ্যের জোরে বেঁচে গিয়েছিল।
মৃন্ময়ের মাথায় একটা কথায় গেঁথে গিয়েছিল, তার ভালোবাসার মানুষ তাকে টাকাপয়সা, সম্পত্তির জন্য ছেড়ে গেছে। এরপর থেকেই ছেলেটা বদলে যায়, লেখাপড়া ছেড়ে এদিক-সেদিক ঘুরে টাকা কামানোর চেষ্টা করে। ছোট বেলা থেকেই মৃন্ময়ের কণ্ঠস্বর মারাত্মক ছিল। স্কুলের অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গেয়ে প্রথম পুরুষ্কারও অনেক পেয়েছে। তার দূরসম্পর্কের এক আত্নীয় তাকে গান গাওয়ার জন্য অফার দিয়েছিল। কারণ লোকটার বেশ কিছু পরিচিত লোক ছিল, যাদের নিজস্ব মিউজিক ব্র্যান্ড আছে। মৃন্ময় প্রথমে মানা করে দেয়, কারণ সে নিজের গানের ওপর ভরসা করত না। ছেলেটাকে অনেক বোঝানো হয়েছিল, সেও বলেছিল একটা চান্স নিতে। গান হিট না হলে আর করতে হবে না। মৃন্ময় সবার কথা শুনে একটা ঝুঁকি নিয়েছিল। প্রাকটিস থেকে শুরু করে গানের ট্রেনিং, প্রেপারেশন সবকিছু নিয়ে নিজেকে দক্ষ বানিয়ে গেয়েছিল এবং পরবর্তীতে তার গানের অ্যালবামও বের হয়েছিল।
কেউই ভাবেনি ছেলেটার গাওয়া একটা স্যাড গান এতটা ভাইরাল হয়ে যাবে সোশ্যাল মিডিয়ায়৷ বিশেষ করে মেয়েরা প্রচুর সাড়া দেয়। সে তো ট্রেডিংয়ে ছিল, এবং অনেক মিউজিকের কোম্পানি থেকে অফার আসতে শুরু করে। মৃন্ময়ের তখন জেদ ছিল টাকাপয়সা কামানোর। কারণ এটার জন্যই সে তার ভালোবাসাকে পায়নি। তাই তো রাতদিন শরীরের র’ক্ত এক করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এবং একজন সাধারণ মৃন্ময় আহমেদ রাজ থেকে বিখ্যাত গায়ক এমএ তে রুপান্তরিত হয়েছে।
বর্তমানে ছেলেটার সবকিছু আছে। টাকাপয়সা, বাড়ি-গাড়ি, জায়গাজমির অভাব নেই। সে যেটা চেয়েছিল ওইটাই করে দেখিয়েছে। কিন্তু…তার সবকিছু থাকলেও ভালোবাসার মানুষ নেই। ঘুরেফিরে ওই একাকীত্বের মধ্যেই থাকতে হয়। সেইদিন শুধু একজন প্রেমিক পুরুষ হেরে যায়নি, বরং তার কিশোর কালের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা হেরে গেছে। উগ্র স্বভাবের ছেলেটা দিনশেষে এক ভুল মানুষকে ভালোবেসে আজ ছন্নছাড়া!
অতীত ভেবে আধার আবারো দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। এক বেইমানকে ভালোবেসে তার বোন ঠকেছিল, আর আরেক ছলনাময়ীকে ভালোবেসে এই ছেলেটা ঠকেছে।
-“সবাই তো আর এক না মৃন্ময়! অতীতে তুই ভুল মানুষকে চুজ করেছিস, তারমানে এই নয় যে তুই বারবার ঠকবি। দুনিয়া থেকে না পালিয়ে, একটু আশেপাশে চেয়ে দেখ, ওই মেয়েটার থেকে হাজারগুন ভালো মেয়ে পাবি। যে কিনা শুধুই তোকে ভালোবাসবে।”
আধার বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে শান্ত গলায় বলে। মৃন্ময় কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীর কণ্ঠে বিরবির করল,
-“আই হেট ফা’কিং লাভ!”
——————————————–
আধার একটু রাত করেই নিজের রুমে এল। এবং এসে বউকে দেখতে না পেয়ে কপাল কুঁচকে যায়। সে বারান্দা, ওয়াশরুম, বেডের নিচে চেক করেও মেয়েটাকে পেল না৷ সোফার মাঝে টুনা, টুনি ঘুমাচ্ছে৷ এরা বেশির ভাগ রুমে নয়তো বাগানেই থাকে। সে আশেপাশে আরেকবার নজর বুলিয়ে নিয়ে বাইরে চলে গেল। এতরাতে মেয়েটা আবার কোথায় আছে, কে জানে।
একটা রুমের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎই আধারের পা জোড়া থেমে যায়। সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে—তার বউয়ের খিলখিল করে হাসার শব্দ। তারমানে মেয়েটা এই রুমে তার বোনদের সাথে আছে।
আধার দাঁতে দাঁত চেপে বন্ধ দরজায় নক করল। কিছুক্ষণ পর ছায়া দরজা খুলে দিল। এবং দুলাভাইকে দেখে বলল,
-“কিছু বলবেন ভাইয়া?”
আধার দু’হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে শান্ত গলায় বলল,
-“তোমার আপুকে বলো, আমি ডাকছি।”
ছায়া মাথা চুলকিয়ে আড়চোখে বিছানার দিকে তাকায়। তারপর আমতাআমতা করল,
-“ইয়ে, আসলে আপু…না মানে…আসলে আপু…!”
আধার অধৈর্য হয়। সে ছায়াকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকে দেখে—তার বেয়াদব বউটা ঘুমিয়ে আছে। তার পাশে মায়াও আছে। তাদেরকে দেখে মনে হচ্ছে, গভীর ঘুমে মগ্ন। অথচ একটু আগেই সে এদের হাসির শব্দ শুনেছে।
এই দৃশ্য দেখে আধারের চোয়াল শক্ত হয়। তারমানে বেয়াদবটা আজ তার কাছে থাকবে না! আর এরজন্যই ঘুমের ভান করে পড়ে আছে৷ তার তো ইচ্ছে করছে, মেয়েটাকে মাথায় তুলে একটা আছাড় মে’রে সব নাটক বের করে দিতে। কিন্তু নাহ! সে মেয়েটাকে এইভাবে হার্ট করবে না, বরং অন্যভাবে শায়েস্তা করবে।
আধার মনে মনে শয়তানি হেঁসে শালী সাহেবার উদ্দেশ্যে বলল,
-“তোমার আপু তো ঘুমিয়ে গেছে। আচ্ছা থাক, ওকে বিরক্ত করতে হবে না। একদৃষ্টে এখানে থেকে ভালোই হয়েছে। আমি এখন গিয়ে মিরার সাথে আড্ডা দিতে পারব। মেয়েটা অনেকক্ষণ ধরে আবদার করছিল! যাইহোক, তুমিও ঘুমিয়ে যাও। গুড নাইট।”
একথা বলে আধার চলে গেল আর সঙ্গে সঙ্গে আলো এক লাফে উঠে বসল। তারমানে লোকটা ওই মেয়েটার সাথে আড্ডা দিবে? তাও এত রাতে?
মায়া শোয়া থেকে উঠে বসল। এবং বিরক্তিকর কণ্ঠে বলল,
-“ঠিক হয়েছে। আরো করো অভিনয়। এখন গিয়ে ভাইয়া অন্য কারোর সাথে সময় কাটাক, আর তুমি শুয়ে শুয়ে নাক ডাকো।”
বোনের কথা শুনে আলো খেঁকিয়ে উঠল,
-“চুপ কর বেয়াদব!”
মায়া মুখ ভেংচি কেটে বলল,
-“যেদিন তোমার বরকে অন্য কেউ ছিনিয়ে নিবে, তখন ঢঙ করার মজা বুঝবে।”
আলো রাগে গজগজ গজগজ করতে করতে বিছানা থেকে নামতে নামতে বলল,
-“তোকে আমি পরে দেখে নিচ্ছি, মীরজাফরের ছাও!”
★
আলো ড্রয়িংরুম থেকে শুরু করে ছাঁদ পর্যন্ত ঘুরে এল। পুরো বাড়িতে ভুতের মতো একটা চক্কর দিয়েও দুজনকে দেখতে পেল না। তারমানে কি তারা কোনো রুমে আছে? উমম…হতে পারে। কারণ সে তো বাইরে কাউকে খুঁজে পেল না। মেয়েটা আকাশপাতাল ভাবতে ভাবতে নিজেদের রুমের সামনে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু দরজা খুলে ভেতরে যায় না। বরং দরজার মাঝে কান ঠেকিয়ে আড়ি পাতার চেষ্টা করল। এবং সঙ্গে সঙ্গে ধপাস করে উবুড় হয়ে ফ্লোরের মাঝে মুখ থুবড়ে পড়ল।
আচানক এমন হওয়ায় আলো হতভম্ব হয়ে গেল। সে মুখের সামনে থেকে এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে মাথা তুলে উপরে তাকায়। আধার দু’হাত বুকে বেঁধে তীক্ষ্ণ চোখে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছে। আলো শুকনো ঢোক গিলে উঠার চেষ্টা করতেই শুনতে পেল,
-“এখানে কি? আর দরজায় পাড়ার মহিলাদের মতো আড়ি পাতছিলে?”
আলো উঠে দাঁড়িয়ে ভালো করে রুমের চারিদিকে নজর বুলিয়ে নিল। আধার সেটা লক্ষ্য করে বলল,
-“কেউ নেই।”
আলো হাসার চেষ্টা করে বলল,
-“টুনা-টুনিকে দেখতে এসেছিলাম। আর দরজায় আড়ি পাতব কেন? আমি তো খুলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তারআগে আপনিই খুলে ফেললেন হেহে।”
কথাগুলো বলে আলো তড়িঘড়ি করে পিছনে ফিরে দৌড় দিতেই, আধার ঝড়ের বেগে এসে দরজা বন্ধ করে দিল। ফলস্বরূপ ধরাম করে বেচারির কপালটা ঠুকে গেল দরজায়। আলো দু’হাতে কপাল চেপে ধরে মৃদুস্বরে আর্তনাদ করল,
-“আহহ….ব্যথা পেলাম তো। আপনি ইচ্ছে করে আমাকে হার্ট করেছেন।”
-“আমি দরজায় কান পাততে বলেছিলাম? নাকি চোরের মতো পালিয়ে যেতে বললাম? তুমি নিজের দোষে ব্যথা পেলে আমার কি?”
আলো পিছনে ঘুরে, ছলছল চোখে তাকিয়ে থেকে বলল,
-“হ্যাঁ, এখন তো এটাই বলবেন! আমি আপনার কে হই? আমি ব্যথা পেলাম নাকি পেলাম না, তাতে আপনার কি যায় আসে? আপনি তো আপনার মিরাকে নিয়ে ব্যস্ত। তাই তো এত রাতেও ওই মেয়েটার সাথে আড্ডা দেওয়ার প্ল্যান করেছেন। বউ একটু দূরে যেতে না যেতেই আপনি অন্য মেয়েদের কাছে যাওয়া শুরু করেছেন। তা এখানে কি করছেন? যান না যান, ওই মেয়েটার কাছে যান। আমি সকাল হলেই বাপের বাড়ি চলে যাবো।”
-“ঠিক আছে! সকালে যদি নিজ পায়ে দাঁড়াতে পারো, তাহলে যেও।”
আলো অবাক কণ্ঠে শুধাল,
-“এখন কি আমার পা-ও ভেঙে দিবেন?”
-“উঁহু, জাস্ট আদর দিবো।”
আলো চমকে উঠল। উল্টো দিকে ঘুরে দ্রুত হাতে দরজা খুলতে চাইলে, তার হাত চেপে ধরল আধার। এবং অন্য হাতের জায়গায় হলো তার কোমরে!
উন্মুক্ত ঘাড়ে নরম ঠোঁটের স্পর্শ পেয়ে আলোর শরীর কাঁপল। সে দু’হাতে পরণের জামা খামচে ধরে চোখ বুজে নিল। আধার মেয়েটাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে গ্রীবাদেশে মুখ ডুবিয়ে চুমু খেতে খেতে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“তুমি না ঘুমিয়ে ছিলে? আর তোমার তো ভাল্লুকের মতো ঘুম, তাহলে এত তাড়াতাড়ি ঘুম ভাঙল কি করে হুহ্?”
আলোর শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হয়ে এসেছে। সে ঘন ঘন শ্বাস নিতে নিতে বলল,
-“ছ…ছাড়ুন! আ…আমি বোনদের কাছে যাবো।”
-“হুম, যাবে তো! তবে কাল!”
একথা বলে অর্ধাঙ্গিনীকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে বিছানার দিকে যেতে যেতে পুনরায় হিসহিসালো,
-“তুমি নিজ থেকে এলেও—এখন যাবে আমার ইচ্ছেতে, জান।”
পিঠের নিচে নরম বিছানার স্পর্শ পেয়ে আলো চোখ পিটপিট করে বলল,
-“আমি যাবো না বাপের বাড়িতে।”
আধার ঠোঁট প্রসারিত করে হাসল। ঝুঁকে এসে অর্ধাঙ্গিনীর ললাটের মাঝে ভালোবাসার পরশ একে দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“তুমি চাইলেও আমি যেতে দিবো না।”
-“বন্দী করে রাখবেন?”
-“দরকার হলে তাই করব।”
-“আমি কিন্তু মামলা দিবো আপনার নামে।”
-“নো প্রবলেম জান! বউকে নিজের কাছে রাখার জন্য যদি জেলে যেতে হয়, সেটাও মনজুর।”
আলো মনে মনে হেঁসে ঘাড় কাত করে বলল,
-“আমি আপনার উপর রেগে আছি।”
আধার নিঃশব্দে মেয়েটার উন্মুক্ত গলার ভাঁজে মুখ ডুবিয়ে বলল,
-“আই নো, আর এটার জন্যই তুমি তখন ঘুমানোর নাটক করছিলে সেটাও জানি।”
একটু থেমে পুনরায় আওরাল,
-“আমার হৃদয় জুড়ে শুধু একমাত্র নারীর বসবাস! আর সেটা হচ্ছে—তুমি, শুধুই তুমি। এর বাইরে আমি অন্য কাউকে ভাবতেও পারি না! যেখানে তোমাতেই আমার সুখ, শান্তি…এভরিথিং! সেখানে অন্য কোনো নারীকে আমার প্রয়োজন নেই। তুমি আমার মানসিক শান্তি আর মনপিঞ্জরায় ছোট্ট দুষ্টু পাখি। এক জীবনে তোমাকে ছাড়া আমার আর কিছু চাই না, কিছুই না!”
আলো মুগ্ধ হয়। এই লোকটার বলা কথাগুলোতে জাদু আছে। সাথে ভীষণ মায়া! যার কারণে সে বারবার লোকটার প্রেমে পড়তে বাধ্য হয়৷ আলো মুচকি হেঁসে দু’হাতে স্বামীর উদোম পিঠ জড়িয়ে ধরে মৃদুস্বরে বলল,
-“কিন্তু আমার…আপনাকে ছাড়াও যে আরেকজনকে চাই।”
অর্ধাঙ্গিনীর মুখে এমন কথা শুনে আধার চট করে মাথা তুলে চোখে চোখ রাখল। তারপর চোয়াল শক্ত করে মেয়েটার দুগাল চেপে ধরে মুখটা এগিয়ে নিয়ে এসে হিসহিসিয়ে বলল,
-“কি বললে তুমি? আরেকবার বলো!”
আলো গালের ব্যথায় ছটফটিয়ে উঠে বলল,
-“আমার….আমার আপনার অংশকে চাই। মানে…বেবি চাই আমার!”
আধারের চোখের চাহনি শীতল হয়। হাতের বাঁধনও ঢিলে হয়ে যায়। সে ঠোঁটের কোণে শক্ত চুমু খেয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“এটা প্রথমে বললেই হতো, শুধু শুধু আমার হার্টবিট বাড়িয়ে দাও। আর বেবি নেওয়ার প্ল্যানিং করব, তোমার লেখাপড়া শেষে। নয়তো দেখা যাবে তোমরা দুজন মিলে আমাকে পাগল করে দিয়েছো। যেখানে আমি তোমাকেই সামলাতে পারি না, সেখানে আবার তোমার বিচ্ছু অংশ? নো ওয়ে!”
-“এখন আমার দোষ? আর আপনি মনে হয় খুব ভালো? কোনোভাবে যদি আপনার কার্বন কপি ডাউনলোড হয়, তাহলে আমি বনবাসে চলে যাবো। কারণ আপনারা দুজন মিলে আমার জীবনটা অতিষ্ঠ করে তুলবেন।”
-“বাকী ঝগড়াগুলো তুলে রাখলাম, কাল মনে করে দিও। তারপর এটা নিয়ে কথা বলা যাবে। এখন ভদ্র মেয়ের মতো স্বামীর আদর গ্রহণ করো।”
আলো আর ভদ্র? সে তো হাত-পা দিয়ে মানুষটাকে ঠেলতে ঠেলতে ঝাঁঝাল কণ্ঠে বলল,
-“লাগবে না আপনার অসভ্য আদর! আপনি বরং আমার লেখাপড়া শেষ হলেই কাছে আসবেন।”
আধার কোনো বাঁধা মানলে তো? সে তার অর্ধাঙ্গিনীকে চুমুতে ভাসিয়ে দিল। নরম ঠোঁটের অজস্র ভেজা চুমুতে আলো একসময় লাজুকলতার মতো নুয়ে পড়ল। তার পেটে সুড়সুড়ি লাগছে! সে হাসি চেপে রাখতেও পারছে না। ফলস্বরূপ খিলখিল করে হেঁসে উঠল। আধার অবাক হয় না, কারণ সে মেয়েটার সবরকম অদ্ভুত কান্ডে অভস্ত্য হয়ে গেছে। তাই তো ইচ্ছে করে পায়ের তালুতে সুড়সুড়ি দিল। এইদিকে স্বামীর এহেন কাজে আলো হতভম্ব হলো, একই সাথে পুরো রুম কাঁপিয়ে হাসতে হাসতে বিছানার মাঝে গড়াগড়ি খেতে খেতে মানুষটার চৌদ্দ গুষ্ঠি ধুয়ে দিল। আধার পা ছেড়ে দিয়ে ঠোঁট কামড়ে হেঁসে বলল,
-“আমার চৌদ্দ গুষ্ঠির মধ্যে কিন্তু আপনিও পড়েন, ম্যাডাম!”
হাসার ফলে আলোর চোখের কোণে অশ্রু জমেছে। সে জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে বালিশ দিয়ে লোকটাকে মে’রে চিল্লিয়ে উঠল,
-“আপনার কপালে বউ জুটবে না!”
আধার বালিশটা কেঁড়ে নিয়ে মেয়েটার মাথার নিচে গুঁজে দিয়ে, কাছে এসে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“আপনার মতো একটা মা’রকুটে বউ থাকলেই যথেষ্ট। এর বাইরে আর কারোরই প্রয়োজন নেই, মিসেস আধার খান!”
#চলবে
#এক_মুঠো_চাঁদের_আলো
#লেখনীতে_নুসরাত_ফারিয়া
#পর্ব_৪৬
নতুন দিনের নতুন সকালের আগমন ঘটেছে। পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে নাস্তা করতে বসেছেন। ডাইনিংয়ে সবাইকে দেখা গেলেও আধার ও আলোকে দেখা গেল না। শেফালির মাধ্যমে ডাকা হয়েছিল, কিন্তু রুমের ভেতর থেকে কারোর সাড়াশব্দ না পেয়ে চলে এসেছেন। হয়তো ঘুমিয়ে আছে, তাই আর বিরক্ত করেনি কেউই। ডাইনিং টেবিলে পিনপতন নীরবতা ছেয়ে আছে। মাঝেমধ্যে সোবহান খানের সাথে মতিউর রহমান ও মাহবুব রহমান টুকটাক কথাবার্তা বলছেন। উনারা আজই চলে যাবেন। কারণ উনাদেরও তো কাজকাম আছে! তারওপর ছায়াও সবে ভার্সিটিতে উঠেছে, মেয়েটার ইচ্ছে ছিল বড় বোনের ভার্সিটিতে পড়ার, কিন্তু একটুর জন্য মিস হয়ে গেছে। অগত্যা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হয়েছে।
মায়ার পাশে ছায়া বসে থেকে খাবার খাচ্ছে আর সামনে বসা ব্যক্তিকে দেখছে। লোকটা মাথা নিচু করে চুপচাপ নাস্তা করছে, একবারের জন্যও মুখ তুলে কোনো দিকে তাকায়নি। শুধু রাত ভাইয়ার সাথে একটু কথা বলেছিল। তারপর থেকেই মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে।
মৃন্ময় পানি খেয়ে সবজি নিতে চাইল। সে হাত বাড়ানোর আগেই কেউ একজন পাত্রটা এগিয়ে দিল তার সামনে। মৃন্ময় মাথা তুলে সামনে তাকায়। এক জোড়া মায়াবী চোখের সাথে দৃষ্টি বিনিময় হতেই সে নজর সরিয়ে নিল। এই পুচকে মেয়েটা বুঝল কীভাবে, সে সবজি নিতে চাচ্ছিল? নাকি মন পড়তে পারে? মৃন্ময় আবারো মেয়েটার দিকে তাকায়। গতকাল তার সাথে অনেক গল্প করেছে৷ মেয়েটা কবে থেকে তাকে চেনে, কবে ফ্যান হয়েছে, কবে তার গানে আসক্ত হয়েছে…ইত্যাদি ইত্যাদি সবকিছু বলেছে। আর সে এই প্রথম মনে হয় বোন ব্যতীত এই মেয়েটার সাথে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বকাবকি শুনেছে। এই মেয়েটা এত কথা বলতে পারে উফফ! একদম নিজের বড় বোনের মতো হয়েছে৷ প্রথম সাক্ষাৎ এই তাকে কোনো মেয়ে এইভাবে ধুয়েছে, তাও তারই বন্ধুর বউ ওরফে ভাবীজান। সে বুঝে গেছে এরা দুবোন ভীষণ সাংঘাতিক!
সবার নাস্তা করা শেষ হতেই আধার সিঁড়ি বেয়ে আস্তেধীরে নেমে এল। আলেয়া রহমান মেয়েকে দেখতে না পেয়ে কপাল কুঁচকালেন। তারমানে তার মেয়েটা এখানেও দেরিতে ঘুম থেকে ওঠে? মেয়েটা আস্ত একটা অলস, সাথে ঘুমকাতুরেও।
আধার চুপচাপ এসে নাস্তা করতে লাগল৷ মাংসের ঝোল ঠোঁটের কোণে একটু লাগতেই জ্বলে উঠল। সে টিস্যু দিয়ে কেটে যাওয়া রক্তিম ঠোঁট মুছে নিল। পাঁজি মেয়েটা ইচ্ছে করে কামড় দিয়েছে। আর একটু হলে তার গালেও লাভ বাইট দিত। ভাগ্যিস, আগেই মেয়েটার পরিকল্পনা বুঝতে সক্ষম হয়েছিল। নয়তো আজ আর কাউকে মুখ দেখাতে পারত না। মাক্স পরে থাকতে হতো!
তাহমিনা খান চেয়েছিলেন কিছু বলতে, কিন্তু বলতে পারলেন না বড় ছেলের কঠিন চেহারা লক্ষ্য করে৷ ছেলেটা ভীষণ রেগে আছে তার উপর। এবং এই রাগ করে থাকাটাও একদম স্বাভাবিক। তিনি না বুঝেশুনে একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করে ফেলেছেন। তাই তো আর কোনোরকম অশান্তি করেনি। কারণ তিনি চান না, এ বাড়ি থেকে আধার চলে যাক! নিজের স্বার্থের জন্য হলেও উনার বড় ছেলের এ বাড়িতে থাকাটা জরুরী। নয়তো এত এত সুখ, বিলাসিতা কীভাবে পাবেন? ছেলেটা চলে গেলে কি আর তাদের খরচ বহন করবে? তখন নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। তাদেরকে দেখার আর সময় হবে না। তাই আপাতত পরিবেশ শান্ত রাখতে হবে। নয়তো তীরে এসে সব ডুবে যাবে।
-“এটাকে বাপের বাড়ি পেয়েছো? যে দুপুর পর্যন্ত পড়ে পড়ে ঘুমাবে? তোমার শ্বাশুড়ি সকাল থেকে একা সবদিক দেখছেন, আর তুমি বাড়ির বড় বউ হয়ে কিনা ঘুমাচ্ছ? এই শিক্ষা দিয়েছি তোমাকে?”
আলো থমথমে মুখে মায়ের রাগান্বিত চেহারার দিকে তাকিয়ে আছে। সে মাত্রই ঘুম থেকে উঠে গোসল নিয়ে বাইরে এসেছিল। তখনই আলেয়া রহমান তার সামনে হাজির হোন। আর মেয়েটাকে কিছু কথা শোনায়। কারণ তিনি চান না, অন্যকেউ উনার মেয়েকে কথা শোনানোর সুযোগ পাক! হাজার হোক, এটা তার শ্বশুরবাড়ি। বউয়ের দায়িত্ব পালন করতেই হবে, যেখানে আজ বাড়ি ভর্তি মেহমান। আর সেখানে মেয়েটা ঘুম থেকে উঠল দুপুর বেলায়। কে কি ভাবছে কে জানে!
-“এখনো খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে আছো কেন? নিচে গিয়ে শ্বাশুড়িকে সাহায্য করো।”
আলো ঠোঁট উল্টে কিছু বলতে যাবে, তখনই পেছন ভেসে এল কিছু বাক্য—
-“আপনার মেয়েকে কাজের মেয়ে হিসেবে নিয়ে আসিনি মা। ও বাড়ির বড় বউ হওয়ার আগে আমার বউ! এটা তার শ্বশুরবাড়ি বলে এই না যে, নিজের সুখ-শান্তি, ঘুম, ইচ্ছা-অনিচ্ছা, চাওয়া-পাওয়া, স্বাধীনতা বিসর্জন দিবে। অন্তত আমি বেঁচে থাকাকালীন হতে দিবো না। কাজ করার জন্য লোক রয়েছে, দরকার হলে আরো দু’জনকে রাখব। এই খান বাড়ি শুধু আমার নয়, আপনার বড় মেয়েরও। ও যেভাবে থাকতে পছন্দ করে, সেই ভাবেই এখানে থাকবে। আর আপনার মেয়ে নিজের দায়িত্ব ভালোভাবেই পালন করে। আপনাদের ওখানে থাকাকালীন যেটা যেটা করেনি, তার সবটাই এখানে এসে করেছে। উমম…বলতে পারেন আমার বউ সবদিক থেকে একদম পারফেক্ট!”
ছেলেটার কথা শুনে আলেয়া রহমান মুগ্ধ হলেন। তিনি তো তার বড় মেয়ের জন্য এমনই একজনকে চেয়েছিলেন। যেই মানুষ তার মেয়েটার পাশে থাকবে, তাকে বুঝবে এবং সমস্ত পাগলামি সহ্য করবে। কারণ তিনি তার মেয়েকে ভালো করেই চেনেন, মেয়েটা কেমন!
আলেয়া রহমান একগাল হেঁসে ছেলেটার সামনে এসে শান্ত গলায় বলল,
-“আমার মেয়ে ভাগ্যবতী, তোমার মতো একজনকে স্বামী হিসেবে পেয়েছে।”
-“উঁহু, আপনার মেয়ে নয়, মা! বলুন আমি ভাগ্যবান, যে কিনা আপনার বড় মেয়েকে পেয়েছে।”
আলেয়া রহমান হাসলেন। ছেলেটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন
-“অনেক সুখী হও বাবা! আর আমার মেয়েটার পাশে সারাজীবন থেকো।”
-“ইনশাআল্লাহ মা! আপনার মেয়ে চাইলেও ওকে কখনো ছাড়ব না। আপনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন।”
আলেয়া রহমান হেঁসে সেখান থেকে চলে গেলেন। তখন আলো এসে দু’হাতে স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
-“ভালোই তো শ্বাশুড়িকে পটাতে পারেন দেখছি!”
আধার মেয়েটার কোমর চেপে ধরে আরো ঘনিষ্ঠ করে নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“আপনার মা শুরু থেকেই আমার সাথে ছিল। উনাকে আলাদা করে আর পটাতে হয়নি!”
আলো কিছু না মানুষটার কেটে যাওয়া ঠোঁটের দিকে তাকায়। তারপর আস্তে করে বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে ঠোঁট স্পর্শ করল।
-“ব্যথা?”
-“উঁহু, একটুও না!”
-“তাহলে আরেকবার দেই?”
আধার এক ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-“তুমি এই কামড়াকামড়ি ছাড়া আর কিছু পারো না?”
আলো হেঁসে স্বামীর নাকের সাথে নাক ঘষাঘষি করে বলল,
-“না। আমার সাথে থাকতে হলে কামড় খেতেই হবে, মিস্টার!”
আধার বাঁকা হেঁসে বলল, -“আর আমার কাছে থাকতে হলে, আপনাকে প্রতিদিন কষ্ট সহ্য করতেই হবে, মিসেস খান।”
আলো স্বামীর লাল হয়ে ওঠা ঠোঁটে চুমু খেয়ে, চোখে চোখ রেখে শান্ত গলায় বলল,
-“সকল কষ্ট মনজুর! তবুও দিনশেষে এই আপনিটাকেই চাই।”
ধীরে ধীরে সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। রহমান পরিবারের সবাই বিদায় নিয়ে বিকেলের দিকে বেরিয়ে পড়েছেন। এখন মৃন্ময় ও মিরা সবার থেকে বিদায় নিল।
-“আই হোপ, অতীত ভুলে নিজের জীবনকে আরেকটা সুযোগ দিবি।”
মিরা গাড়িতে বসেছে আর মৃন্ময় বাইরে দাঁড়িয়ে আধারের সাথে কথা বলছিল৷ বন্ধুর কথা শুনে মৃন্ময় চাবির রিং আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,
-“সিঙ্গেল লাইফ ইজ দ্য বেস্ট লাইফ!”
আধার দুইদিকে মাথা নাড়িয়ে কঠোর প্রতিবাদ করল,
-“ভুল! ম্যারেড লাইফ ইজ দ্য বেস্ট লাইফ।”
-“তোর কপালে ভালো বউ জুটেছে, তাই বেস্ট লাইফ মনে হচ্ছে। নেগেটিভ কেউ জুটলে, বুঝতি বিয়ের আসল মজা!”
-“তুই মুভ অন করবি কিনা সেটা বল?”
-“তোর শ্যামা পাখির মতো কাউকে পেলে ভেবে দেখব।”
আধার কিছু একটা ভেবে আনমনে বলল, -“একজন আছে!”
মৃন্ময় কপাল কুঁচকে জানতে চাইল, -“কে?”
আধার কিছু বলতে যাবে তখনই সেখানে রাত এসে উপস্থিত হয়। ভাইকে দেখে আর কিছু বলল না। রাত মৃন্ময়ের সাথে টুকটাক কথা বলল। একসময় মৃন্ময় ও মিরা তাদের থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়!
———————————-
কেটেছে মাসের পর মাস! এই তিনমাসে বদলেছে অনেক কিছুই। আধার আর আলোর সম্পর্ক আগের থেকেও গভীর হয়েছে। মেয়েটা আগের মতো রয়ে গেলেও আধার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। একসময় যেই মানুষটা সামান্য হাসাহাসি করত না, এখন সেই মানুষটাই কথায় কথায় বউয়ের সাথে হাসাহাসি করে। তাদের দুজনের ঝগড়াঝাটি, খুনসুটি পুরো খান বাড়িকে মাতিয়ে রাখে। আধার বাইরের জগতে ভিন্ন হলেও সে তার বউয়ের কাছে সম্পূর্ণ আলাদা এবং একান্তই একজন প্রেমিক পুরুষ। সময়ের সাথে সাথে তার জীবনের কালো অধ্যায়গুলো মুছে যেতে শুরু করেছে। তার অন্ধকার জীবনে এক মুঠো চাঁদের আলোর মতো মেয়েটা এসে আলোকিত করে দিয়েছে। একসময় এলোমেলো জীবনের থেকে পালাতে চেয়েছিল, আর এখন সেই জীবনের মাঝেই বড্ড থাকতে ইচ্ছে করে। অর্ধাঙ্গিনীর হাতে হাত রেখে বাকী পথটা একসঙ্গে পার করতে চায়। নিজের শেষ নিঃশ্বাস অবধি মেয়েটাকে ভালোবেসে যেতে চায়।
ছেলেটার পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছে সোবহান খান। উনি তো এতগুলো বছর এই দিনটা দেখার জন্যই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। এবং সেটা পূরণও হয়েছে। তিনি সবসময় চেয়ে এসেছেন, তার বড় নাতি ভালো থাকুক, সুখে থাকুক এবং তাকে কেউ একজন খুব করে ভালোবাসুক। নিজের ভালোবাসা দিয়ে ছেলেটার সব কষ্ট দূর করে দিক। উনার চাওয়া ওপরওয়ালা পূরণ করেছেন। এখন তার ছন্নছাড়া নাতিকেও কেউ একজন নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসে। আর সেই মানুষ হচ্ছে তার নাতবউ! তিনি বেছে বেছে নিজের নাতির জন্য সঠিক মেয়েই খান বাড়ির বড় বউ বানিয়ে নিয়ে এসেছেন।
এত এত সুখের মাঝেও দুঃখ রয়েছে। একমাস আগে তাহমিনা খান বাপের বাড়িতে যাওয়ার সময় এক্সিডেন্ট করেন এবং নিজের এক পা হারিয়ে ফেলেন। ভাগ্য ভালো হওয়ায় প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন, নয়তো তাহমিনা খানকে সারাজীবনের জন্য হারিয়ে ফেলতেন।
আধার এত মাস পরেও ছোট মায়ের সাথে স্বাভাবিক হয়নি। তবে সে নিজের দায়িত্ব পালন করে গিয়েছে। উনাকে দেখা শোনা করার জন্য দুজন মানুষও রেখেছে। আলো সেবাযত্ন করতে চাইলে সে কিছু কঠিন বাক্য শুনিয়েছিল মেয়েটাকে। কারণ সে ওইদিনের জঘ’ন্য অপবাদ ভুলে যায়নি। তবুও সে চেষ্টা করেছে বড় ছেলে হিসেবে দায়িত্ব পালন করার। খুব দরকার ছাড়া তাহমিনা খানের সাথে কথা বলে না। বর্তমানে পুরো সংসারের দেখাশোনা করে আলো।
রাতের মধ্যেও বেশ ভালোই পরিবর্তন এসেছে। ছেলেটা আজকাল বড় ভাই, দাদাজানের সাথে মসজিদেও যাওয়া শুরু করেছে। যাকে বলে এক কথায় ভদ্রলোক তৈরি হয়েছে। আর এতে আধার ওপরওয়ালার কাছে লাখো শুকরিয়া আদায় করে। অবশেষে তার ছোট ভাইয়ের মাথায় সুবুদ্ধি এসেছে। সে তো কম চেষ্টা করেনি, ভাইকে ভালো পথে নিয়ে আসার জন্য। কিন্তু…ছেলেটার গায়ে বিদেশি হওয়া লেগেছিল। খারাপ কিছু ছেলেদের পালায় পড়ে যবে থেকে নেশা করা শুরু করেছিল, ঠিক তবে থেকেই নষ্ট হয়ে গেছে। তারওপর খোলামেলা পরিবেশে আরো বিগড়ে গেছিল। কিন্তু এখন একটু দেরিতে হলেও নিজেকে শুধরে নিয়েছে। এমনকি তার বউকে ভাবীও বলে ডাকে। তবে তার সামনে বোম্বাই মরিচ ছাড়া ডাকে না। ছেলেটা আজকাল ভীষণ জ্বালায় তাকে।
-“হাই চাশমিস!”
খুব পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে ঈশিতা মাথা তুলে সামনে তাকায়। এবং বলে,
-“বাই পটেটো।”
রাত হাসল। হাতে থাকা কফির মগ বাড়িয়ে দিল। ঈশিতা সেটা নিয়ে ইশারা করে বসতে বলল। রাত সামনের চেয়ারে বসে মেয়েটার ল্যাপটপ নিয়ে দেখল, কি কাজ করছে। যেহেতু সে সিনিয়র আর কাজের অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাই নিজেই ফাইলটা রেডি করতে শুরু করল।
ঈশিতা চেয়ারে ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিয়ে কফির মগে চুমুক দিয়ে সামনে বসা মানুষটার দিকে তাকায়। তারা দুজন এখন খুব ভালো বন্ধু। প্রথম প্রথম একটু অস্বস্তি হলেও ধীরে ধীরে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেছে। সে একসময় যাকে চিনত না, জানত না, আর আজ সেই মানুষটাকেই মনের সব কথা বলে। ছেলেটা অন্যের চোখে কেমন তা জানে না, তবে তার চোখে ভীষণ ভালো। একদম অন্যরকম! যাকে সে ঝগড়ার মাঝে থাপ্পড় মা’রলেও কিছু মনে করে না, শুধু সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু…সূর্যের আলো ফুটতে না ফুটতেই তার বাড়ির সামনে বাইক নিয়ে হাজির। সে তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে থেকে ছেলেটার মজা নিত অনেক। একবার তো পানি ফেলে গোসলও করে দিয়েছিল। সে মানুষটাকে এত এত জ্বালায়, অথচ মানুষটা কখনো বিরক্ত হয়নি। বরং তার সবকিছুতে খুশিই হয়।
-“যেদিন স্যারের কাছে ধরা পড়ব, সেদিন আমাদেরকে ঘাড় ধরে বের করে দিবে।”
রাত কাজ করতে করতে কফির মগে চুমুক দিয়ে শান্ত গলায় বলল,
-“তুমি কি ভয় পাচ্ছো?”
-“ভয় পাওয়াটা কি অস্বাভাবিক কিছু? জব চলে গেলে কি করব আমি?”
-“কেন? বিয়ে করে সংসার করবে।”
বিয়ের কথা শুনে ঈশিতার মুখটা মলিন হয়ে গেল। সে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
-“সবার কপালে সব কিছু থাকে না, রাত!”
একটু থেমে পুনরায় আওরাল,
-“ছোট বোনকে বিয়ে দিতে হবে, তারপর ভাইটার লেখাপড়া শেষ হলে ও নিজের ক্যারিয়ার গড়লে তারপর নাহয় আমি নিজের জীবনের কথা ভাববো।”
-“ততদিনে বুড়ী হয়ে যাবে তুমি।”
-“সমস্যা নেই। একাই নাহয় জীবনটা পর করে দিবো।”
-“বিয়ের পরেও তো এসব করতে পারো? না মানে, তোমার তো একটা জীবন রয়েছে।”
-“বিয়ের পর যদি স্বামী জব করতে না দেয়? নিজের মা, ভাই-বোনকে দেখা শোনা না করতে দিলে তখন?”
-“সবাই তো আর এক নয়, ঈশু! একবার চেষ্টা করে দেখতে পারো। ইনশাআল্লাহ ভালো কাউকে পাবে।”
ঈশিতা কফি শেষ করে টেবিলের ওপর মগ রেখে বলল,
-“আমার কথা বাদ দাও! এখন বলো তুমি কবে বিয়ে করছো?”
-“আমার অতীত জানলে, বাঙালি মেয়েরা জুতা মে’রে চলে যাবে।”
একথা শুনে ঈশিতা শব্দ করে হেঁসে উঠল। অন্যদিকে, রাতের হাত জোড়া কিবোর্ডের ওপর থেমে গেছে। সে অপলক নয়নে হাসতে থাকা রমণীর পানে তাকিয়ে রইল। এবং বিরবির করে বলল,
-“তোমার হাসি খুব সুন্দর….!”
★
আলো চকলেট খেতে খেতে বাগানে এল। টুনা-টুনি কচি ঘাস খাচ্ছে আর এদিক-সেদিক লাফালাফি করছে। সোবহান খান দোলায় বসে থেকে চা খাচ্ছেন আর আধার স্যার সুইমিংপুলের পাশে দাঁড়িয়ে থেকে ফোনে কথা বলছে বোনের সাথে। একটু আগেই ভার্সিটি থেকে ফিরেছে লোকটা!
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই আলোর মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি এল। সে তাড়াতাড়ি চকলেট খেয়ে নিয়ে পা থেকে নূপুর জোড়া খুলে ওড়নার আঁচলে বেধে রেখে দিল। সে আগের মতো আর ভুল করতে চায় না। খুবই সাবধানে পা টিপে টিপে এগোতে লাগল। মেয়েটার হাবভাব দেখে সোবহান খান হাসলেন। তবে কিছু বললেন না। কারণ তিনি সবসময় মেয়েটার দলে।
আলো স্বামীর পিছনে দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস আঁটকে রাখল। এই বজ্জাত লোকটা গতকাল তাকে বাথটাবের পানিতে ফেলে দিয়েছিল, তাও মাঝরাতে! তাই এখন সেটার প্রতিশোধ নেওয়ার পালা। সে মনে মনে শয়তানি হাসি দিয়ে ধাক্কা দিতে যাবে, তখনই আধার পিছনে ফিরে মেয়েটার মাথা চেপে ধরে সুইমিংপুলের পানিতে ফেলে দিল।
ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটে যায় যে সোবহান খানের হাত থেকে চায়ের কাপ পড়ে যায়। তিনি আঁতকে উঠে নীলচে পানির মাঝখানে তাকালেন। বেচারির পানি খেতে খেতে অবস্থা খারাপ। কোনোমতে দেয়াল ধরে ভেসে উঠে হতভম্বের মতো স্বামীর দিকে তাকায়। লোকটা যে এমন কিছু করবে, ভাবতেই পারেনি। সে চোখমুখ মুছে কাশতে কাশতে দাদাজানের দিকে ছলছল চোখে তাকায়। নাকেমুখে পানি ঢুকে চেহারা রক্তিম হয়ে উঠেছে। সোবহান খান তড়িঘড়ি করে ছুটে এলেন।
-“এটা কি করলে তুমি? মেয়েটাকে ফেলে দিলে কেন?”
আধার কল কেটে কপাল কুঁচকে বলল,
-“তোমার নাতবউ যে আমাকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করছিল, তখন? তুমি তো সবটা দেখেও চুপ করে ছিলে।”
ধরা পড়ে সোবহান খান এদিকওদিক তাকাতে তাকাতে বললেন,
-“তাই বলে অসময়ে মেয়েটাকে পানিতে ফেলে দিবে?”
-“তুমি আমার দাদা নাকি ওর দাদা, হুহ্?”
-“ওর দাদা…ইয়ে না মানে, তোমাদের দুজনেরই।”
আধার শান্ত চোখে দাদাজানের দিকে তাকায়। সোবহান খান চলে যেতে যেতে বললেন,
-“মেয়েটাকে নিয়ে এসো।”
আধার ঘাড় ঘুরিয়ে আলোর দিকে তাকিয়ে বলল,
-“তুমি ভালো হবে না, তাই না?”
আলো কিছু না বলে সুইমিংপুল থেকে উঠে এল। তারপর জানতে চাইল,
-“আমি তো নূপুর খুলে রেখেছিলাম, তাহলে আপনি জানলেন কীভাবে?”
আধার এগিয়ে আসতে আসতে স্বাভাবিক গলায় বলল,
-“তোমার শরীরের ঘ্রাণ টের পেয়েছিলাম।”
একথা শুনে আলো নিজের শরীর শুকতে লাগল, কই সে তো কোনো ঘ্রাণ পাচ্ছে না! মেয়েটার কান্ড দেখে আধার ঠোঁট কামড়ে হেঁসে বলল,
-“ওটা তুমি অনুভব করতে পারবে না।”
আলো হতাশ হয়। তারপর কিছু একটা খেয়াল করে চিন্তিত মুখে বলল,
-“আমার নূপুর পানির মধ্যে রয়ে গেছে।”
আধার কপাল কুঁচকে এগিয়ে এসে সুইমিংপুলের ভেতর তাকায়। কোথাও নূপুর দেখতে না পেয়ে ভ্রু কুঁচকে কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবে, তার আগেই আলো ধাক্কা মে’রে পানির মধ্যে ফেলে দিল তাকে। তারপর খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলল,
-“নিন, এখন হিসাব বরাবর পঁচা স্যার।”
একথা বলে আলো নিজের জুতা হাতে নিয়ে দৌড়ে চলে গেল আর আধার খান পানির ভেতর থেকে উঠে চেঁচিয়ে উঠল,
-“তোমাকে আমি দেখে নেবো….শয়তান মেয়েএএএ!”
#চলবে

