এক মুঠো রোদ পর্ব-০৮

0
513

গল্প :- #এক_মুঠো_রোদ (০৮)
লেখক :- #A_Al_Mamun
.
–অস্বাভাবিক কিছু মনে হয়?
–হ্যা, কাল দুপুরে বারান্দায় বসে ছিলাম। লোকটাকে দেখলাম বাসার আশেপাশে পায়চারী করতেছে। কিন্তু যখন মিষ্টি বারান্দায় এলো, লোকটা মিষ্টির দিকে তাকিয়ে ছিলো। এমন মনে হলো যেনো লোকটা মিষ্টিকে চেনে।
–তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলে না? কেনো এভাবে তাকিয়ে থাকে? কিরকম দেখতে লোকটা?
–তোর বয়সি…
–আচ্ছা আমি দেখতেছি বিষয়টা। তুমি মিষ্টিকে কিছু বলিও না।
–ঠিক আছে।
মামুন অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। বাহিরে বের হয়ে দেখে একটা লোক সামনের বাসার গেইটের সামনের সিড়িতে বসে বারান্দার দিকে তাকিয়ে আছে।
মামুন সন্দের চোখে লোকটার দিকে তাকায়। মামুনকে সামনে দেখে লোকটা হাতে বাদাম নিয়ে চিবুতে চিবুতে এদিক ওদিক তাকিয়ে উঠে রাস্তা ধরে হাটা দেয়।
অফিসের তাড়া থাকায় লোকটার পেছনে সময় নষ্ট না করে অফিসের দিকেই রওয়ানা দেয় মামুন।
অফিস শেষে সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার সময় মামুন খেয়াল করে সেই লোকটা মামুনকে দেখে সোজা অন্যদিকে হাটা দেয়। সন্দেহটা যেনো আরো ঘাড়ো হতে থাকে।
কলিংবেল দেওয়ার পর মিষ্টি এসে দরজা খুলে হাসিমুখে মামুনের সামনে দাড়ায়।
মিষ্টির হাসিমুখটাও যেনো আজ মামুনকে খুশি করতে পারছে না। মনের মধ্যে কত প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
কে এই লোক? কার জন্য এখানে এসে দাড়ায়? মিষ্টির পরিচিত কেউ নয়তো? কেনো ক্ষতি করে ফেলবে নাতো?
–এই, কি ভাবছেন এতো? ভিতরেতো আসুন।
–হুম।
–ব্যাগটা দিন। এতো উদাস লাগছে কেনো আপনাকে?
–ক্লান্ত লাগছে। একটু পানি দিবে?
–আপনি রুমে যান, আমি নিয়ে আসছি।
–আচ্ছা।
.
মামুন রুমে এসে ভাবতে থাকে…
মিষ্টিকে কি একবার জিজ্ঞেস করে দেখবো সে এই ব্যাপারে কিছু জানে কিনা?
না থাক, পুরোনো কথা মনে করিয়ে দিলে হয়তো কষ্ট পাবে। আমি নিজেই দেখবো কে এই লোক।
–নিন লেবুর শরবতটা খেয়ে নিন।
–কষ্ট করে আবার এটা বানাতে গেলে কেনো?
–আপনাকে কেমন যেনো লাগছে। কিছু হয়েছে?
–না না, কি হবে? কাজের চাপে একটু ক্লান্ত লাগছে।
–ওও আচ্ছা, তাহলে খেয়ে এসে শুইয়ে পড়ুন।
–খাবারটা একটু এনে দিবে?
–আচ্ছা, আপনি হাত মুখ ধুয়ে নিন। আমি এনে দিচ্ছি।
–ঠিক আছে।
মামুন ঠিক করে নেয় কাল যে করেই হোক লোকটার পরিচয় জেনে নিবে।
কে সে? কেনই বা এই বাসার সামনে এসে ঘুরঘুর করে।
অফিস থেকে ১০ দিনের ছুটি নিয়ে আসে মামুন। একটাই প্ল্যান, সারাক্ষণ মিষ্টির সাথেই সময় কাটাবে সে। কিন্তু একটা চিন্তা কিছুতেই সেই কাজটা করতে দিচ্ছে না।
কোনো রকমে রাতটা পার করে পরদিন সকাল থেকে মামুন মায়ের বারান্দায় এসে বসে থাকে। মোটামুটি পুরোদিনই মামুন বারান্দায় এবং বাসার সামনের রাস্তার সময় কাটায়। কিন্তু লোকটাকে আর খুজে পাওয়া যায় নি।
.
–তোমায় কিছু কথা বলার ছিলো।
–জ্বি বলুন না।
–কাল তো শুক্রবার। কেনাকাটা করতে হবে না?
–যেমনটা আপনি ভালো বুঝেন।
–মাকে বলেছি, কাল আমরা শপিংয়ে যাবো।
–আমিতো এসব বুঝি না। রিয়াকে নিয়ে গিয়ে আপনি কিনে নিন।
–পাগলি, তোমার পছন্দের জিনিস তুমি কিনবে। রিয়া কি করে জানবে তোমার পছন্দ কি।
–আপনি নাহয় পছন্দ করে নিবেন।
–আমি মাকে বলে দিয়েছি, কাল সকালে তৈরী থেকো।
–আমার কেমন যেনো লাগে শপিংয়ে যেতে। সবার মাঝে নিজেকে কেনো যেনো তুচ্ছ মনে হয়। বাবাগো, ১ম যখন গিয়েছিলাম, এত বড় বিল্ডিং দেখে মনে হচ্ছিলো এই বুঝি মাথায় এসে পড়বে।
–কেনো এমন লাগে?
–প্রথমবার গিয়েছিলাম তো তাই হয়তো এমন লেগেছে।
–আর লাগবে না, সকালে রিয়াকে নিয়ে তৈরী থাকবে।
–আচ্ছা।
.
আজও প্রতিদিনের মত মিষ্টি নাস্তা বানানো শেষ করে মামুনকে ডাকতে আসে।
–শুনছেন? অনেক বেলা হলো তো, উঠুন।

–এই যে মিঃ(হালকা ধাক্কা দিয়ে)
–হুম।
–উঠবেন না?
–আজ অফিস নেই, আর একটু ঘুমাই।
–নাস্তা ঠান্ডা হয়ে গেলো।
–আর একটু পর উঠি।
–আমি এক্ষুণি মাকে ডাকতে গেলাম।
বলেই মিষ্টি পেছন ফিরে হাটা দিবে, এমন সময় মিষ্টির হাত ধরে নিজের দিকে একটা হেচকা টান দেয় মামুন।
নিজেকে সামলাতে না পেরে মিষ্টি গিয়ে মামুনের ওপর পড়ে।
দুহাত দিয়ে মিষ্টিকে নিজের বুকের ওপর শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে উল্টো দিকে ঘুরে যায় মামুন।
মামুন ওপরে আর মিষ্টি নিচে।
চোখ দুটো বন্ধ করে চুপ করে শুয়ে আছে মিষ্টি।
–কই যাচ্ছিলে? বিচার দিতে?

–চোখ খোলো।
–পারবো না।
–কেনো?
–ছাড়ুন প্লিজ।
–ছাড়ার জন্য কি ধরেছি? চোখ খোলো।
–না না… প্লিজ ছেড়ে দিন। দরজা খোলা, মা এসে পড়বে।
–আসবে না।
–তবুও, আমাদের এখনো বিয়ে হয়নি। কেনো এভাবে জড়িয়ে নিয়েছেন আমায়? আমার কেমন যেনো লাগছে। প্লিজ ছেড়ে দিন।
–কেমন লাগছে?
–শরীর কাঁপতেছে।
–একটা পাপ্পি দেই?
–একদম না।
–জোর করবো?
–পারলে করেন।
–না পারার তো কোনো কারন নেই। কিন্তু দিবো না।
–তাহলে ছাড়ুন।
–ছাড়বো, তবে একটা শর্ত আছে।
–কি?
–বিয়ের পর প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে জাগাতে আসলে আমার জড়িয়ে ধরে একটা পাপ্পি দিতে হবে।
–পারবো না।
–কেনো?
–আমার লজ্জা করে।
–বিয়ের পরও?
–হুম।
মিষ্টিকে ছেড়ে দিয়ে মামুন অন্য পাশে সরে যায়।
–ঠিক আছে যাও, লাগবে না।
–রাগ করেছেন?
–না।
–আচ্ছা করবো, আপনি যেভাবে চান।
–লাগবে না।
ওমনি মামুনকে জড়িয়ে ধরে একটা পাপ্পি দিয়ে বসে।
–প্লিজ আর রাগ করে থাকবেন না। আপনি যদি রাগ করেন তাহলে আমি কোথায় যাবো?
–এই পাগলি, আমিতো মজা করছিলাম। তোমার ওপর কি রাগ করা যায়?
–আপনি যা বলবেন আমি সব শুনবো, সব করবো। তবুও রাগ করে আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করবেন না। প্লিজ….
–ধুর, আমি কি এমনটা করতে পারি?
–কথা দিন, আমার সাথে কখনো কথা বলা বন্ধ করবেন না।
–কথা দিলাম। যত যাই হয়ে যাক, তোমার সাথে কথা বলা বন্ধ করবো না।
–মনে থাকে যেনো।
–জ্বি থাকবে।
–উঠুন, কত কষ্ট করে নাস্তা বানিয়েছি। সব ঠান্ডা হয়ে গেলো।
–৫ মিনিট, আমি আসতেছি।
–জলদি….।
–আচ্ছা।
.
নাস্তা শেষে বারান্দায় বসে মামুন পত্রিকা পড়ছিলো। এমন সময় খেয়াল করে সেই লোকটা আজও গেইটের সামনে পায়চারি করতেছে।
দ্রুত নিচে নেমে মামুন লোকটার সামনে এসে দাড়ায়।
–এই যে ভাই, কে আপনি? এখানে কি করছেন?
–কই? কিছু না।
–প্রতিদিন এই বাড়ির সামনে কেনো ঘুরঘুর করেন? কি চান?
–না ভাই, কিছু না। আমি আসি….।
বলেই লোকটা সামনের দিকে হাটা দেয়। মামুন দৌড়ে গিয়ে লোকটার সামনে দাড়ায়।
–এমনি এমনি ৪-৫ দিন ধরে কারো বাড়ির সামনে কেউ ঘুরঘুর করে না। কোনো কারন তো আছেই। কেনো ঘুরঘুর করছিলেন?
–এমনি সময় কাটাচ্ছিলাম। কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে আসিনি ভাই, সত্যি বলছি।
–আপনাকে দেখতে তো কোনো ভালো ফ্যামিলির ছেলে বলেই মনে হয়। কিন্তু যেই কাজ করতেছেন, এসে না জিজ্ঞেস করে যদি সোজা মারা শুরু করতাম, কিছু করতে পারতেন?
–ভাই, কি যে বলেন। কেনো এমন করবেন? আমি কি কারো ক্ষতি করেছি?
–ক্ষতি করেননি, কিন্তু করবেন না যে তার কি গ্যারান্টি আছে? ৪-৫ দিন যাবত সকাল-সন্ধ্যা একই বাসার সামনে ঘুরঘুর করতেছেন। এই বাড়ির কাউকে চেনেন? পুলিশে কমপ্লেইন দিবো?
–না না ভাই, আমি আর আসবো না।
–কেনো এখানে আসতেন?
–ওই বারান্দায় একটা মেয়েকে দেখেছিলাম। ওই মেয়েটাকে ভালো লাগে, তাই তাকে দেখতে আসি।
–মেয়ে? কোন মেয়ে?
–একটু আগেও এসেছিলো। এখন চলে গেছে।
–হালার ঘরে হালা ওইটা আমার বউ। থাপ্পড় চিনস? কানের নিচে এমন একটা দিমু আজীবন মনে রাখবি।
–সরি ভাই। আর আসবো না।
–যা ভাগ এখান থেকে।
— এক্ষুণি চলে যাচ্ছি।
–আর যেনো এই বাসার সামনে না দেখি।
–ঠিক আছে।
.
মামুনের ধমক খেয়ে লোকটা একটু তাড়াহুড়া করেই পালায়।
–কে ছিলো লোকটা?(সানু বেগম)
–তুমি দেখেছো?
–হুম, বারান্দা থেকে দেখলাম তার সাথে কথা বলছিলি। কে সে?
–আর বলো না, মিষ্টিকে মনে হয় এই বারান্দায় দেখেছে। তাই প্রতিদিন চলে আসে… তবে কথাবার্তা শুনে মনে হলো ভয় পাওয়ার মতো কোনো কারন নেই।
–এসব ছেলেদের কি কোনো কাজ নেই?
–বাদ দাও। এমন ধমক দিছি, আর আসবে না।
–না আসলেই ভালো।
–মিষ্টিকে একটু বলো না এক কাপ চা দিতে।
–পাঠাচ্ছি ওকে।
একটু পর হাতে চা নিয়ে মিষ্টি বারান্দায় আসে।
–চা চেয়েছিলেন?
–হুম, থ্যাংকস।
–আমাকেই ডাকতে পারতেন। মাকে কেনো অর্ডার দিলেন?
–অর্ডার দিলাম কই? তোমাকে বলতে বললাম।
–এরপর থেকে আমাকে সরাসরি ডাক দিবেন।
–আচ্ছা বাবা, সরি। বসো এখানে, তোমার সাথে কিছু জরুরি কথা ছিলো।
–কি কথা?
–তোমার বাড়ির ঠিকানা মনে আছে?
–কেনো?
–একবার গিয়ে দেখে আসতাম।
–কেনো?
–কেনো কি? তোমার বিয়ে, ওনাদের জানালে ভালো হতো না?
–ওরা আমার কেউ না। কেনো ওদের জানাবেন?
–শত হলেও তো তোমার মা। ছোট থেকে তোমায় মানুষ করেছে। অন্তত ওনারা জানুক যে তাদের মেয়ে স্বামীর বাড়িতে আছে।
–দেখুন, ওনাদের জানালেও কোনো লাভ নেই। আপনি ওসব ভুলে যান। এই পৃথিবীতে আমার আপনজন বলতে শুধু আপনারাই আছেন। আর কাউকে আমি চিনি না।
–আচ্ছা আমায় ঠিকানাটা তো দিতে পারো। ওনারা তো আর আমায় চেনে না। দুর থেকে দেখে আসবো ওনারা কেমন আছেন, কিভাবে আছেন।
–হঠ্যাৎ ওনাদের কথা মনে পড়লো কেনো?
–ওনারা ছোট থেকে তোমায় মানুষ না করলে আজ কি আমি তোমাকে পেতাম? তাই মন থেকে ওনাদের একটা ধন্যবাদ দিতে মন চাচ্ছে।
–লাগবে না।
–দাও না।
–ওনারা কখনোই আমার মঙ্গল চান নি। আর আমার শত বাবা অনেক খারাপ মানুষ। বিপদ বাড়ানোর দরকার নাই।
–আচ্ছা আমি তাদের সাথে কথা বলবো না। শুধু ঠিকানাটা দাও। দেখেই চলে আসবো।
–কথা বলবেন নাতো?
–না।
–ঠিক আছে। ঠিকানা “————”

সন্ধ্যায় মিষ্টি আর রিয়াকে সাথে নিয়ে মামুন শপিংয়ের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে।
বিয়ের বাকি আর ৭ দিন। মোটামুটি কিছু প্রতিবেশী আর মামুনের কিছু কাছের সহকর্মীকে দাওয়াত দেওয়া হয়ে গেছে।
এখন শপিং করা হয়ে গেলে প্রায় ৫০% কাজ এগিয়ে যাবে।
শপিং মলে পোছানোর ১০ মিনিটের মাথায় বাড়ি থেকে সানু বেগমের ফোন আসে।
–হ্যা মা বলো।
–কোথায় তুই?
–এইতো দোকানে, রিয়া আর মিষ্টি কাপড় দেখতেছে।
–বাড়িতে পুলিশ এসেছে।
–কিহ? কেনো?
–জানি না। ওরা আমার সামনেই বসে আছে, মিষ্টিকে খুজতেছে।
.
.
চলবে…….