গল্প :- #এক_মুঠো_রোদ (১২)
লেখক :- #A_Al_Mamun
.
বলেছিলাম না একদিন তোমার লজ্জা ভাঙাবো! আজ সেই দিন চলে এসেছে।
–কিসের দিন?
–আজ তোমার লজ্জা ভাঙাবো।
–কিভাবে?
–দেখবে?
–হুম।
মামুন ধীরেধীরে মিষ্টির ঘোমটা সরিয়ে মুখটা উপরে তোলে।
সাধারণত মিষ্টি একটুও সাজগোছ করে না। তাতেই মিষ্টিকে অপ্সরীর মতো লাগে।
কিন্তু আজ মিষ্টি সেজেছে, একটা লাল বেনারসি, সাথে হালকা মেকাপ আর লাল লিপস্টিক। এতেই মামুনের নাজেহাল অবস্থা। যেনো সর্গের কোনো পরী এসেছে মামুনকে জ্বালাতে।
চোখ দুটো বন্ধ করে মিষ্টি চুপ করে বসে আছে। আর মামুন এক নজরে মিষ্টির দিকে তাকিয়ে আছে।
–চোখ বন্ধ করে আছো যে?
–খুব লজ্জা করছে।
–একটু তাকাও।
ধীরেধীরে চোখ খুলে মামুনের দিকে তাকায় মিষ্টি। দুজন দুজনকে এমনভাবে দেখছে, যেনো কখনো এই দেখার শেষ হবে না। দুজন অনেকটা কাছাকাছি এসে বসে।
–মাকে একবার জিজ্ঞেস করা উচিত ছিলো দোয়াটার ব্যাপারে।
–কিসের দোয়া?
–কারো নজর যেনো না লাগে সেই দোয়া।
–কেমন লাগছে আমায়?
–এতটা মিষ্টি লাগছে যে ইচ্ছে করছে খেয়ে ফেলতে।
–যাহ, মুখে কিছু আটকায় না বুঝি?
–চেষ্টা তো করছি, কিন্তু আটকিয়ে রাখতে পারছি না।
–পারবেন।
–সত্যিই ইচ্ছে করছে।
–কি?
–মিষ্টি টেস্ট করতে।
–ইসসসসসস।
–ভাবছি আমার ডায়াবেটিস না হয়ে যায়।
–কেনো হবে?
–বেশি মিষ্টি খাওয়া তো ভালো না। ডায়াবেটিস হয়ে যাবে।
–তো কম খাবেন।
–এমন মিষ্টি কি কম খাওয়া যায়?
–আজ রাতটা নিয়ে আপনার কোনো প্ল্যান নাই?
–ছিলো অনেক, সব ভুলে গেছি। তোমার আছে?
–হুম।
–শুনি তো।
–ছাদে যাবেন?
–এত রাতে?
–চাঁদ দেখতে ইচ্ছে করছে।
–কালই তো দেখলে।
–চলুন না, আজও দেখবো। আপনি আমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকবেন। আর আমি আপনার চুলে বিনি কেটে দিবো। চাঁদ দেখবো আর গল্প করবো।
–আচ্ছা চলো।
.
মিষ্টিকে কোলে নিয়ে মামুন ছাদে এসে এক কোণায় বসে।
মামুন আজও মিষ্টির কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে।
–দেখুন, চাঁদটা কত সুন্দর।
–হুম, খুব সুন্দর।
–উপরে দেখুন না।
–হুম।
–গাঁধা আমাকে না, আকাশে।
–আমার চাঁদতো তুমিই। আমি শুধু তোমাকেই দেখবো।
–এত দেখার কি আছে?
–মন ভরে না যে, শুধু দেখতেই ইচ্ছে করে।
–আচ্ছা দেখুন।
–চলো না।
–কোথায়?
–রুমে।
–মাত্রই তো আসলাম।
–চাঁদ তো দেখা হয়ে গেছে।
–চলে যাবেন?
–হুম।
–আচ্ছা চলুন।
মিষ্টিকে কোলে করে আবার রুমে আনা হয়।।
–আপনি না বললেন আমার লজ্জা ভাঙাবেন?
–হুম।
–কই?
–আচ্ছা,,,,! আমার বউ তাহলে প্রস্তুত?
–সেই কবে থেকে। আপনি ভালোবেসে কাছে টেনে নিবেন, এই আসায় কতরাত ঘুমাতে পারিনি। চোখ বন্ধ করলেই আপনাকে দেখতাম। আর আজ আপনি আমার এতটা কাছে। আপনাকে বোজাতে পারবো না এমন সময় একটা মেয়ের অনুভূতি কেমন থাকে।
–কেমন থাকে?
–লজ্জা সরমের মাথা খেয়ে এত কিছু বলেছি, আর পারবো না।
মিষ্টির দিক থেকে সবুজ সংকেত পেয়ে মামুন মিষ্টির দিকে এগিয়ে যায়।
(এইবার কি হয় সেটা আর না বলি)
.
সকালে মুখে পানি ছিটায় ঘুম ভাঙে মামুনের। জানালা দিয়ে একটা নতুন সকাল উকি দিচ্ছে। বাহিরে এখনো আলো ফুটে নি।
বিছানার পাশেই মিষ্টি বসে চুলের পানি মুছতেছে।
মামুনের আর বুঝতে বাকি রইলো না এটা কিসের পানি।
সামনের ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে আয়নায় নিজের দেখছে মিষ্টি। পেছন থেকে আয়নায় মিষ্টিকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মামুনকে জেগে উঠতে দেখে মিষ্টি মামুনের পাশে এসে বসে।
–উঠে গেছেন?
–তোমার চুলের পানি কি আর ঘুমাতে দিলো?
–পানি পড়েছে বুঝি?
–হুম।
–সরি সরি।
–হবে না।
–তাহলে?
মামুন ওমনি মিষ্টিকে ঝাপটে ধরে বিছানা ফেলে দেয়। ভেজা চুলগুলোতে একটা পাতলা তোয়ালে পেচানো।
চেষ্টা করেও মামুনের হাত থেকে নিজেকে ছাড়াতে পারছে না সে।
–ছাড়ুন, মাত্র গোসল করেছি, আর পারবো না।
–তাহলে এমন ভেজা চুল নিয়ে আমার সামনে কেনো এসেছো?
–আমার ইচ্ছা।
–এখন আমারও ইচ্ছা।
–যাহ, ছাড়ুন।
–তোমার মধ্যে একটা মিষ্টি ঘ্রাণ আছে। যা আমার পাগল করে দেয়।
–কেমন ঘ্রাণ?
–এটা এমন একটা ঘ্রাণ যা শুধু আমিই পাই।
–আচ্ছা!
–বলেছিলে সকালে জড়িয়ে ধরে আমার ঘুম ভাঙাবে।
–আপনি ঘুমাচ্ছিলেন, তাই ভাবলাম না জাগাই।
–এখন তো এর মূল্য দিতে হবে।
–কি মূল্য?
–মিষ্টি দাও।
–যাহ, সকাল সকাল কি শুরু করলেন। ছাড়ুন, মা উঠে যাবে। নামাজ পড়ে রান্না ঘরে যেতে হবে।
–একটা দাও না, আর কিছু লাগবে না।
–দিবো, তাহলে উঠুন। গোসল করে নামাজটা পড়ে নিন।
–আগে দাও, এরপর উঠবো।
–আপনি যেই শয়তান, এমনিতেই নামাজ পড়েন না। এখনতো আপনার ওপর আমার পুরো অধিকার আছে। উঠে নামাজ পড়বেন। এরপর যা চাইবেন তাই দিবো।
–বাবারে।
–উঠেন, আজ থেকে আর নামাজ বাদ দেওয়া যাবে না।
–উঠছি তো।
–না, এক্ষুণি উঠুন। আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করছি, একসাথে নামাজ পড়বো।
মামুনকে একপ্রকার জোর করেই বিছানা থেকে তুলে গোসল করতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
.
সানু বেগম নামাজ শেষ করে রান্না ঘরে এসে দেখে মামুন রুটি বানাচ্ছে। আর মিষ্টি মামুনকে সাহায্য করতেছে।
নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে না পেরে দুইবার নিজেকে নিজে চিমটি কাটে।
–কে রে এটা?(সানু বেগম)
মাকে এভাবে সামনে দেখে মামুন লজ্জা পেয়ে রুটি বানানো ছেড়ে একটু দুরে গিয়ে দাড়ায়।
–আব্বা, আজ এত সকাল সকাল কিভাবে?
–এমনিই ঘুম ভেঙে গেলো। তাই ভাবলাম মিষ্টিকে একটু সাহায্য করি।
–২৮ বছর ধরে আপনার মা একা একা রুটি বানিয়েছে, কখনো তো আপনার ঘুম ভাঙেনি।
–ধুর,আমি গেলাম।
বলেই মামুন মাকে পাশ কাটিয়ে নিজের রুমের দিকে চলে যায়।
–মিষ্টি, আজ তোমার আসার প্রয়োজন ছিলো না। আমি পারতাম।
–কেনো মা? আমি কি নতুন? আমি সেই মিষ্টি, নতুন কেউ না তো।
–ধুর পাগলি, আমি কি সেটা বলছি? অন্তত আজ তো বিশ্রাম করতে পারতে।
–সমস্যা নেই মা। আপনি গিয়ে বিশ্রাম করুন।
–আমি রুটি বানাই দাও। পাগলটা আজ এত তাড়াতাড়ি উঠে গেলো কিভাবে? আবার এসে রুটিও বানাচ্ছে।
–তুলে নিয়ে আসলাম। নামাজ পড়ালাম, এরপর রান্না ঘরে নিয়ে আসলাম।
–মাশা-আল্লাহ, প্রতিদিন এভাবে তুলে নামাজ পড়াইবা।
–দোয়া করবেন মা।
.
নাস্তা শেষে রিয়া মিষ্টিকে নিয়ে নিজের রুমে চলে যায়।
–কি খবর ভাবি?
–হুম ভালো(মুচকি হেসে)
–এক রাতেই আমায় ভুলে গেলা?
–ওমা, ভুললাম কই?
–আমায় ডাকতেও আসলে না আজ।
–তুমি তো ঘুমাচ্ছিলে, তাই ভাবলাম বিরক্ত না করি।
–আচ্ছা বাদ দাও, কেমন কাটলো কাল রাত?
–সবার যেমন কাটে।
–বাব্বাহ, সবার কেমন কাটে সেটা তুমি কিভাবে জানো?
–বললাম আরকি, ভালোই কেটেছে।
–আমাদের সবারই মনের আসা পূরণ হলো। তুমি চেয়েছিলে পরিবার, আর আমরা তোমায়।
–হুম, আজ আমি খুব খুশি। আল্লাহর কাছে এই দুনিয়ায় আমার আর কিছুই চাওয়ার নাই। না চাইতেও আমি সব পেয়ে গেছি।
–ওমা, চাওয়ার নেই মানে? আমাদের একটা বাবু লাগবে না?
–আল্লাহ চাইলে আমাদের বাবুও হবে। চিন্তা করো না।
–খুব তাড়াতাড়ি চাই কিন্তু। এরা আমায় বাড়ি থেকে তাড়ানোর প্ল্যান করছে। যাওয়ার আগে যেনো বাবুর সাথে খেলাধুলা যেতে পারি।
–তাই বুঝি?
–হুম। গিয়েই ভাইয়াকে বলবে আমাদের সবার একটা বাবু লাগবে, তাড়াতাড়ি।
–আচ্ছা বলবো।
.
মিষ্টির খুশিতে পুরো বাড়ি যেনো খিলখিল করছে। সানু বেগম তো সোজাসুজি বলে দিয়েছেন। “এবার আমি শুধু বিশ্রাম নিবো। তোমার সংসার তুমি সামলাও” মিষ্টিও মুচকি হেসে শাশুড়ির কথায় শায় দেয়।
স্বামী সংসার নিয়ে মিষ্টির এখন অনেক চিন্তা।
একটা সময় নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হতো মিষ্টিকে, কিন্তু এখন এই সংসারের ভবিষ্যৎ নিয়েও তাকে ভাবতে হয়।
ধীরেধীরে দিনগুলো পার হতে থাকে। এমনি একদিন অফিস শেষে মামুন বাসায় ফিরে দেখে পুরো ঘর নিস্তব্ধ, রিয়া নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত, মা নিজের রুমেই বসে আছে। আর মিষ্টি বিছানার এক কোনায় জড়ো হয়ে বসে আছে।
মামুন কিছুটা আন্দাজ করতে পারছে আজ ঘরের মধ্যে কিছু একটা হয়েছে। যার জন্য সবাই চুপ করে আছে।
–কিগো? আজ দরজা খুলতেও আসলে না। দরজা দেখি আগে থেকেই খোলা।
–আমিই খুলে এসেছিলাম।
–কিছু হয়েছে?
–হুম।
–কি?
–আমি বলতে পারবো না। মাকে জিজ্ঞেস করুন।
–মা বকেছে?
–না।
–মুখ দেখেতো মনে হচ্ছে কেঁদেছিলে।
–একটু।
–ঝগড়া হয়েছে?
মিষ্টি মামুনের দিকে মুখ তুলে তাকায়…
–কি বলছেন এসব?
–তাহলে এভাবে চুপ করে আছো কেনো?
–আমি বলতে পারবো না। মাকে জিজ্ঞেস করুন।
–মাত্রই অফিস থেকে আসলাম। এসেই এটা নিয়ে মাকে জিজ্ঞেস করা যায়?
–ফ্রেস হয়ে নিন, খাবার খান, এরপর যান।
–কি হয়েছে সেটা তো বলবে।
–মা বলবে।
–তুমি বললে সমস্যা?
–আমি বলতে পারবো না।
–ধুর….।
মামুন কিছুটা রাগ মাথায় নিয়ে মায়ের রুমে এসে দাড়ায়, সানু বেগম তখনো নামাজের পাটিতে বসে তাজবিহ পড়ছেন।
মামুনকে নিজের রুমে আসতে দেখে জিজ্ঞেস করেন,
–কিরে বাবা, চলে এলি?
–হুম।
–আয় বস।
–বসবো না, খুদা লেগেছে।
–আচ্ছা খেয়ে আয়।
–মিষ্টি বললো তুমি নাকি আমাকে কিছু বলবে।
–সে বলেনি?
–না।
–আচ্ছা বস এখানে। আমিই বলছি।
–মিষ্টি কি ঝগড়া করেছে?
–ধুর গাধা, তোর কি মনে হয় সে ঝগড়া করতে পারে?
–তাহলে?
–দুপুরে রান্নার সময় হঠ্যাৎই মিষ্টি মাথা চক্কর দিয়ে পড়ে যায়। কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছিলাম কি হতে চলেছে। তবুও শিওর হওয়ার জন্য ডাক্তারকে খবর দেই। ডাক্তারও সেটাই বললো যেটা আমি ভেবেছিলাম।
–কি হয়েছে মা?
–আমাদের ঘরে নতুন মেহমান আসবে।
–কে?
–বলদ, তুই বাবা হতে চলেছিস?
–অ্যাহ! সত্যি?
–হুম
–তাহলে মিষ্টি বললো না কেনো?
–মেয়েটা সারাদিন কেঁদেছে।
–কেনো?
–ওকে গিয়েই জিজ্ঞেস কর।
–তা তো করবোই। তোমার ঘরের চেরাগ আসতেছে। আগে জানালে আসার সময় তো মিষ্টি নিয়ে আসতাম।জানালে না কেনো?
–কাল আনিস। এখন মিষ্টির কাছে যা।
–আচ্ছা।
.
.
চলবে………..