#এ_তুমি_কেমন_তুমি
#সূচনাপর্ব
#জোহা_ইসলাম(ছদ্মনাম)
“কবুল” বলার ঠিক আগ মুহুর্তে! বিয়ের আসরে নিজের প্রাক্তন স্বামীকে দেখে ঠোঁট জোড়া দিয়ে “কবুল” শব্দটা বের হলো না হিয়ার। কপালের বা-পাশ হালকা রক্তের রেশ। ঠোঁটের কোণেও জ্বলজ্বল করছে রক্তের আবেশ। বাম গালেও বেশ কাটা স্থান থেকে রক্ত ঝড়তে ঝড়তে শুকিয়ে রক্ত লেপ্টে আছে। বিয়ে-বাড়ির আলো ঝকঝকে পরিবেশে আহিরকে এমতাবস্থায় দেখে পুরোনো অনুভূতি সব মাথা চারা দিয়ে উঠলো। আসলেই অনুভূতি কী পুরোনো? নাকি প্রতিদিনে ন্যায় নতুন। সে তো কী সুন্দর করে বলেছিল আহিরকে, যে তার অনুভূতি কোনদিনও আহিরের জন্য পুরোনো হবে না। তবে আজ কেন আবার তার অঙ্গে নববধুর সাজ উঠলো?
‘এই ছেলে? তুমি এখানে কী করছ? আজকের দিনেই তোমার আমার বাড়িতে পা দিতে হলো? সিকিউরিটি এই সিকিউরিটি! তোমাদের এই ছেলের ছবি দেখিয়ে বলা ছিল না! এই ছেলে আসলে ভেতরে যেন ঢুকতে দেওয়া না হয়!’
হিয়ার বাবা হামিদ চৌধুরীর হুংকারে মুহুর্তে বিয়ে বাড়ির পরিবেশ যেন আরও থমথমে অবস্থায় পরিণত হলো। হিয়া চমকালো বাবার কথায়। নিজের ভাবনার জগত থেকে বেরিয়ে আসলো। মেয়ের ২য় বিয়ে হলে কী হবে? উনি যে আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন করেছেন! তাতে চারপাশের মানুষ যেন ফ্রি-তে তামাশা দেখার সুযোগ পেয়ে গেল। হিয়ার মুখোমুখি স্টেজে বসে থাকা তার নতুন হবু বর জিহাদ দৃষ্টি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে একবার হিয়াকে তো একবার হিয়ার প্রাক্তনকে দেখছে। সে জানে হিয়ার এর আগে একবার বিয়ে হয়েছিল। দেড় বছরের মাথায় ডিভোর্স-ও হয়েছে। ডিভোর্সের আসল কারণ জিহাদ কখনও ঘেটে দেখেনি। হিয়ার কাছে জানতেও চায়নি। সে হিয়াকে ৬টা বছর ধরে ভালোবেসে। যখন আপন করে নেওয়ার সুযোগ হয়েছে! সে সে-ই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে চেয়েছে বলেই তো আজ এই পরিণতি; বিয়ের আসর। কিন্তু এই আসরে হিয়ার প্রাক্তন নামক অমাবস্যা কেন নামলো? বঁধু সাজে পূর্ণিমার চাঁদের মতো জ্বলজ্বল করতে থাকা হিয়ার বদন জুড়েও যে এখন অমাবস্যার অন্ধকার দেখছে জিহাদ। সে তার বাবা-মাকে অনেক কষ্ট করে এই বিয়ে-তে রাজী করিয়েছে। অবিবাহিত ছেলে নয়ে ডিভোর্সড একটা মেয়ে-কে সে বিয়ে করবে! তার বাবা মা মোটেও মেনে নিতে রাজী ছিলেন না। হাতে পায়ে ধরে রাজী করিয়েছে জিহাদ। এই এত কষ্টের ফল যদি হাত ফস্কে বেরিয়ে যায়! জিহাদ বাঁচবে কী আঁকড়ে? সে পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুতপদে নেমে আসলো স্টেজ থেকে। তার হবু শ্বশুর মশাই সিকিউরিটির দিকে তেড়ে গেছেন ডাকতে। বোধ হয় আহিরকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দিবেন। কিন্তু সে আহিরকে এত অপমানিত হতে দেয় কী করে? শত হোক প্রাণপ্রিয় বন্ধু থেকে শত্রুতে রুপান্তরিত হয়েছে তো! শত্রু-ই বলা চলে। সে দেশের বাইরে চলে গেছে। সেই সুযোগে তার ভালোবাসার মানুষ-টিকে ভালোবাসার জালে জড়িয়ে বিয়ে করে নিয়েছিল! জানতো জিহাদ হিয়াকে ভালোবাসে। তবুও এই হীন কাজ-টা বেস্টফ্রেন্ড হয়ে! কী করে করেছিল আহির! জানার চেষ্টা করেনি জিহাদ। শুধু কষ্টে! বন্ধুত্বের অপমানের দূরত্ব টেনেছিল। পড়াশোনা শেষ করে ফেরেনি আর দেশে। কিন্তু যখন দেখল, হিয়াকে পাওয়ার একটা সুযোগ হয়েছে! সে ছুটে এসেছে দেশে। কিন্তু আজকের এই এত আনন্দের দিনে আহিরের কেন আসতে হলো?
এসব আকাশকুসুম চিন্তা করতে করতে জিহাদ থমথমে মুখে এসে দাড়ালো আহিরের সামনে। গম্ভীর ভরাট কণ্ঠে বলল,
‘আজকের দিনেই তোকে এখানে আসতে হলো?’
‘দেখতে আসলাম, এক নারী বেইমানী করে কী করে অন্য একজন পুরুষকে বিয়ে করছে! আরও একটা বিষয় দেখতে আসলাম! আমার প্রাণপ্রিয় বন্ধু কী করে পারছে! বন্ধুর প্রাক্তন স্ত্রী-কে বিয়ে করতে!’
‘কিন্তু আমি একটা বিষয় মিস করে গেছিলাম জানিস! আমি দেখতে পারিনি, আমার প্রাণপ্রিয় বন্ধু! যে জানতো আমি হিয়াকে ভালোবাসি। তারপরও বন্ধুর ভালোবাসাকে নিজের ভালোবাসায় ভুলিয়ে বিয়ে কী করে করেছিল!’
‘আমিও হিয়াকে ভালোবাসতাম জিহাদ।’
‘এই তো নিজেই বললি, ভালোবাসতিস! এখন বাসিস না। তাই ভালো মতো বলছি, এতশত মানুষের মাঝে নাটক না করে চলে যা। আমি চাচ্ছি না তুই এই আঘাতপ্রাপ্ত শরীরে আবারও সিকিউরিটির ধাক্কা খেয়ে বের হবি এখান থেকে।’
‘ইশ রে আমার দয়ার সাগর বন্ধু। উপরের ক্ষত দেখছিস! ভেতরের রক্তক্ষরণ কী তোর চোখে পরছেনা?’
‘ওটা ভেতরের বিষয়। যার কষ্ট! তার অনুভব করার বিষয়। আমার নয়।’
কথাটুকু আহিরের বুকে এসে বিধলো। তবে কী জিহাদেরও এমন লেগেছিল সেদিন! যেদিন হিয়া আর তার বিয়ে হয়! এবং জিহাদ তার কাছে ফোন দিয়ে জিগাসা করেছিল, “আহির কী করে পেরেছিল হিয়াকে ভালোবাসতে! যেখানে সে জানতো জিহাদ হিয়াকে ভালোবাসে! ভেতরে যে রক্তক্ষরণ হচ্ছে! তার কি আহির বেস্টফ্রেন্ড হয়ক বুঝলোনা!” সেদিন তো এই একই কথা বলেছিল। তবে কী ভাগ্য গুণেগুণে কাটায় কাটায় তার কর্মের ফল তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে! কিন্তু সে তো হিয়াকে ভালোবাসেনি সত্যিকারের! তবে হিয়ার বিয়ের খবর কানে পৌঁছাতে এত যাতনা কেন হলো? সেই যাতনার ভাড় সইতে না পেরে একদম বিয়ের আসরে এসে উপস্থিত হলো। সিকিউরিটি ঢুকতে দিবেনা বলে ধাক্কাধাক্কি করার দরুণ পাকা রাস্তায় পরে গিয়ে কপাল, গাল, ঠোঁটের কোণায় কেটে বসেছে। কিন্তু আহির তো এমন কিছু হোক চায় নি! সে তো নিজেই চেয়েছে হিয়া তার জীবন থেকে সরে যাক। তার একটু শান্তির দরকার। কই! হিয়া চলে আসার পর সেই শান্তি কই? আহির ঠোঁট খুলল, ধীর স্বরে বলল,
‘বিয়ে শেষ হওয়া অব্দি একটু বসি? প্রেয়সীর বিদায়বেলা দেখি একটু? কতটা যন্ত্রণা তোকে সহ্য করতে হয়েছিল? একটু নিজে ফেইস করি! অনুমতি পাবো?’
‘না পাবেনা। এখুনি বেরিয়ে যাও। নতুবা সিকিউরিটি তোমায় বের করে দিবে।’
আহির হাসলো হামিদ চৌধুরীর কথায়। হেসেই বলল,
‘আঁটকানোর চেষ্টা তো করেছিল মিঃ চৌধুরী। পেরেছে কী? চলেই তো এসেছি । থাকি না হয় একটু! ওয়াদা করছি কোনো ঝামেলা করবো না। শুধু বসে বসে বিয়ে দেখবো। নতুন বর-বউয়ের সাথে বসে ভরপেট খেয়ে চলে যাবো ‘
হামিদ চৌধুরীর রাগ তড়তড়িয়ে বেড়ে চলল। আহির নিশ্চিত পাগল হয়েছে। নয়তো প্রাক্তন স্ত্রীর বিয়ে হচ্ছে! তা কেন সে বসে দেখবে? আহির উনার কোনো কালের-ই পছন্দের ছিলেন না৷ মেয়ে তার পালিয়ে বিয়ে করে কষ্ট ভুগে উনার কোলে ফিরেছেন। মা মরা আদরের একমাত্র কন্যা হওয়ার দরুণ মুখ ফিরিয়ে থাকতেও পারেননি। এতক্ষণ সিকিউরিটি কেন আহিরকে আঁটকাতে পারেনি! তা নিয়ে চিল্লাচিল্লি করে আসলেন উনি। জিহাদ এবার হামিদ চৌধুরী এবং আহিরের কথার মাঝে মুখ খুললো। আহিরের দিকে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে বলল,
‘থাকুক আংকেল। দেখতে চাচ্ছে দেখুক একটু। আমিও দেখি ওর ধৈর্য শক্তি কত! আপনি কাজী সাহেবকে বিয়ের বাকি কার্যক্রম শুরু করতে বলুন।’
হামিদ চৌধুরীর বেশ পছন্দের পাত্র জিহাদ। তাই তার কথায় অমত করলেন না তিনি। মেয়ের কাছে এগিয়ে গিয়ে মেয়ের পাশে বসলেন। কাজী সাহেবকে বললেন, বিয়ের কার্যক্রম শুরু করতে। হিয়ার চোখ বেয়ে নোনাজলের স্রোত চলে এসেছে এতক্ষণে। নরম, ভীতু গোছের মেয়ে-টি জীবনে ২০টা বসন্ত কাটিয়েছে বাবার বুকে লুকিয়ে। বাকি দেড়-টা বছর! আহিরের সাথে কত রঙিন ভাবে কাটিয়েছে! এরপর তো এক বছরের বিচ্ছেদ। কত যন্ত্রণা সয়েছে। অবশেষে বাবার জেদের কাছে হার মেনে বিয়েতেও মতামত দিয়েছে৷ সেসব মনে আসতেই হিয়ার হাউমাউ করে কান্না করতে ইচ্ছে হলো। । ছোট্টবেলাকে বড্ড মিস করছে সে। আজ ছোট্ট থাকলে ইচ্ছে মতো গড়াগড়ি করে কাঁদতে পারতো সে। আহির দুই স্টেজের মাঝখানে সারিবদ্ধ করা চেয়ারের একটায় বসে হিয়ার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। হিয়া খেয়াল করেও এড়িয়ে যেতে চাইলো। কাজী সাহেব আবারও কবুল বলতে বললে সে সবাইকে অবাক করে দিয়ে জোড় গলায় বলে উঠল,
‘আমি এই বিয়ে করবো না৷ আমি পারবোনা এই বিয়ে করতে। বাবার জোড়াজুড়িতে রাজী হয়েছিলাম। আমার গলা দিয়ে কবুল নামক শব্দটা বের হচ্ছে না। সো আমি পারবোনা বিয়ে করতে।’
মানুষজনের মাঝে এতক্ষণ আহিরকে দেখে কথার গুঞ্জন ইতিমধ্যে শুরু হয়েই গিয়েছিল। হিয়ার কথায় যেন সবাই আরও একটু মশলা পেলো তিলকে তাল বানানোর জন্য। জিহাদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পরলো। হিয়া কী তার ভালোবাসা এ জীবনে বুঝবেনা? আহিরের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো জয়ের হাসি। জিহাদের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বোঝালো তার ভালোবাসার জোড়৷ জিহাদের বাবা জহির আহমেদ এত ঘটনার মাঝে এতক্ষণ অতিথি আসনে গম্ভীর মুখে বসেছিলেন। ছেলে তার কানাডা থেকে মাস্টার্স করে এসেছে। কত ভদ্র-অর্থবিত্তশীল পরিবার থেকে ছেলের বিয়ের সমন্ধ এসেছে। ছেলে তার সবকিছু নাকচ করে শেষমেশ বেছে নিয়েছিল হিয়া নামক ডিভোর্সি মেয়ে-টিকে। ছেলের খুশির জন্য মুখ বুঁজে সব মেনে নিয়েছিলেন। গম্ভীর স্বভাবের দরুণ সব ঝামেলা এড়িয়ে সুষ্ঠুভাবে বিয়ে-টা হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। এরপর আর এক মুহুর্ত দেরি না করে পুত্র এবং পুত্রবধু নিয়ে বিয়ের আসর ছাড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরপর দুবার ছেলের অপমান উনার সহ্য হলো না। এই মেয়ে কী পেয়েছে উনার ছেলেকে! বাবার জোরের মুখে বিয়েতে হ্যাঁ বলে এখন প্রাক্তন স্বামীকে দেখে কী ভালোবাসা উতলে আসলো? উনি এই অপমানের জবাব দেবেন বলে উঠে দাড়ালেন। গম্ভীর, থমথমে মুখে বললেন,
‘আসলেই এই বিয়ে হবে না। যে মেয়ের বিয়ের দিন তার প্রাক্তন এসে বিয়েতে বাঁধ সাধে! সে বিয়ে হওয়ার নয়। জিহাদ! বাবা হয়ে তোকে আদেশ করছি। চল এখান থেকে।’
এসব ঘটনার মাঝে জিহাদ পরলো অকূলদরিয়ায়। সে যে হিয়াকে ভালোবাসে! তাকে পাওয়ার এত কাছাকাছি এসেও ছেড়ে যায় কী করে? হিয়াকে বোঝানোর একটা সুযোগ কী সে পাবেনা? হিয়া রাজী হয়ে মানা কেন করছে এখন? তবে কী আহিরকে দেখে তার মন গললো? আহিরকে এখানে থাকার অনুমতি দিয়ে! সে কী ভুল করলো? জিহাদ কাতর দৃষ্টিতে একবার হিয়ার দিকে তাকালো। আনমনে ভাবলো,
‘এ তুমি কেমন তুমি হিয়া?’
চলবে?