#এ_তুমি_কেমন_তুমি
#পর্বঃ২
#জোহা_ইসলাম(ছদ্মনাম)
‘হিয়া, এসব কি শুরু করেছো তুমি? আমি তোমার ভালোর জন্য জোড় করেছিলাম বিয়েতে৷ এখন তুমি এরকম অভদ্র মেয়ের মতো সর্বসম্মুখে অপমান কেন করলে আমায়?’
‘তুমি তোমার মেয়ের ভালো বুঝলে বাবা! অথচ জিহাদ তো নিরপরাধ, সহজ, সরজ একটা ছেলে। তার কাছে সত্যি-টা আড়াল করে ঠকিয়ে! বিয়ে কেন দিতে চাচ্ছো বলো? আমি পারছিনা সত্যি-টা আড়াল করে মিথ্যা দিয়ে একটা সম্পর্ক শুরু করতে। আমি আহিরকে ডিভোর্স দিতে এমনি এমনি রাজি হইনি বাবা! আমার সমস্যা জেনেই আমি সরে এসেছি। নয়তো যার জন্য তোমায় ছেড়ে যাওয়ার মতো দুঃসাহস করেছিলাম! তাকে এত সহজে ছেড়ে কেন দিবো বলো তো?’
হামিদ চৌধুরীর রাগ কিছু-টা শীতল হয়ে আসলো। উনি মাথায় হাত রেখে বিছানায় বসে পরলেন। হিয়া বিয়ের জন্য গায়ে চড়ানো ভারি লেহেঙ্গা-টা দুহাতে চেপে ধরে ফ্লোরে বসে কান্নায় ভেঙে পরলো। বিয়ের আসরে ওভাবে উচ্চস্বরে বাবাকে অপমান করে কথা বলার পর হিয়া বাবা হিয়ার হাত ধরে বিয়ের আসর থেকে টেনে হিয়ার রুমে এনে ছেড়ে দিয়ে উক্ত প্রশ্ন করেন। উত্তরে হিয়ার বলা কথায় উনি চুপসে গেলেন। আসলেই নিজের মেয়ের ভালোর কথা ভেবে জিহাদের মতো উচ্চশিক্ষিত! উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন ঘরের ছেলের জীবন-টার কথা একটুও ভাবেননি। আহিরের সাথে ডিভোর্সের পর মেয়ে-টা দেড়টা বছর ধরে নিজেকে রুমবন্দী করে রেখেছে। শুধু পড়াশোনার জন্য যতটুকু বাইরে যেতে হতো! ততটুকুই গিয়েছে। হিয়ার মা হিয়াকে জন্ম দেওয়ার সময়-ই মারা গেছেন। সেই থেকে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বিয়ে অব্দি করেননি হামিদ চৌধুরী। সেখানে মেয়ের এত যন্ত্রণা সহ্য কী করে করতেন উনি! এজন্য তো জিহাদ যখন উনার মেয়েকে পাগলের মতো অনুরোধ করে চেয়ে বসলো! উনি মানা করতে পারেননি৷ উনার মেয়ের খুঁত আছে! সেই খুঁতের সাথে জুড়ে গিয়েছে ডিভোর্সি নামক শব্দ-টা। আর আমাদের এই সমাজ তো মেয়েও যদি স্বামী ছেড়ে দেয়! তবুও শুনতে হয় মেয়ের-ই সমস্যা৷ নয়তো স্বামীর সাথে মানিয়ে সংসার করতে পারলো না কেন? তার মেয়ে-টা অসম্ভব রকম সুন্দরী। জিহাদ অবিবাহিত, এবং দেশের বাইরে থেকে পড়াশোনা শেষ করে আসা উচ্চশিক্ষিত এক ছেলে। জিহাদের সাথে উনার ডিভোর্সি মেয়ের বিয়ে হলে মেয়ে-কে শ্বশুর বাড়ির লোকজনের পাশাপাশি কিছু মানসিক ভাবে বিকারগ্রস্ত মানুষজন বলবে, রুপ দিয়ে জিহাদকে ফাঁসিয়েছে হিয়া। সবকিছুই হামিদ চৌধুরী চিন্তা করে দেখেছেন অবশ্য। কিন্তু সুখের ছায়ায় যে মেয়ে-কে বড় করেছেন! সেই মেয়ের দুঃখ সরাতে মেয়ের বড় খুঁত-টা হামিদ চৌধুরী সাহস করে জিহাদকে বলতে পারেননি। এতে যদি জিহাদ মানতে না পারে! জিহাদের ভালোবাসার জোড়ে না হয় ধরা যায় সে মেনে নেবে। কিন্তু কথাগুলো জিহাদের বাবা-মা! পরিবারের বাকি সদস্য-রা জানলে! হিয়াকে তারা আদৌও মানতো তো! এমনিই ডিভোর্সী হওয়ার ফলে কম ঝড়-ঝাপ্টা সামলিয়ে জিহাদ তার পরিবারকে রাজী করায়নি! এরমাঝে হিয়ার এত বড় এক কমতি জানলে! উনারা মানতেন-ই না। এজন্য হামিদ চৌধুরী আড়াল করে গেছেন বিষয়-টা। এত এত চিন্তা করার পরও! মেয়ের কথায় আবার যেন উনার টনক নড়ে উঠলো। বিয়ের আসরে জিহাদের বাবার হাতে পায়ে ধরে অনুরোধ করে; উনার রাগ কমিয়ে বসিয়ে রেখে এসেছেন তিনি। বলে এসেছেন মেয়ের মতামত ঠিকঠাক ভেবে জেনে গিয়ে জানাবেন বিয়ে-টা হবে নাকি হবে না! এখন গিয়ে যদি বলেন, বিয়ে-টা হবে না! তাহলে বিষয়-টা কি সম্মান জনক হবে আদৌও? ভেবেচিন্তে সেই ভুল সিদ্ধান্ত-টাই নিলেন হামিদ চৌধুরী। এখন কী করবেন উনি! দোটানায় পরে গেলেন হামিদ চৌধুরী। হিয়ার কান্নামাখা মুখপানে তাকালেন। মেয়ে তার ফ্লোরে বসে লেহেঙ্গা দুহাতে মুঠো করে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে কান্না দমনের প্রয়াস চালাচ্ছে। যা হয় হবে! তা পরে দেখা যাবে। আপাতত বিয়ে-টা হোক। যদি ঝামেলা হওয়ার-ই থাকে! তবে বিয়ের পর না হয় ২য় বার আবার সংসার ভাঙবে৷ ভাঙতে ভাঙতে একদিন তো তার মেয়ে-টা ভালো থাকবে! তবে সেটাই হোক। কিন্তু জিহাদের ভালোবাসার উপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে। হিয়াকে সে ভালো রাখবে৷ হামিদ চৌধুরী বিছানা থেকে উঠে দাড়ালেন। হিয়া আশার আলোয় দীপ্তপূর্ণ চাহনীতে তাকালো বাবার দিকে। হামিদ চৌধুরী মেয়ের মনের ভাব হয়তো বুঝলেন। বলে উঠলেন,
‘যা হওয়ার হয়ে যাক। বিয়ের আসরে যেন মুখ দিয়ে না শব্দ-টা যেন না বের হয়। আমি চাইনা, বিয়ে-টা ভাঙুক আর ২পরিবারের সম্মানহানী হোক আরও। যা হওয়ার তা তো হয়েই গেলো। বাকি-টা আর ধুলোয় মিশিও না৷ নতুবা ভুলে যাবো তুমি আমার মেয়ে। একবার সম্মান লুটিয়ে পালিয়ে বিয়ে করলে! আবার সম্মান লুটিয়ে ডিভোর্সি তকমা নিয়ে বাবার কাছে ফিরে আসলে! এবার অন্তত সম্মান-টা রক্ষা করো। আমিও তো মানুষ নাকি! আমারও তো কষ্ট হয়! বাবাকে একটু বুঝো এবার!’
হিয়ার আশার আলো দপ করে নিভে গেলো। দুচোখ বন্ধ করে নিলো। চোখের জল গাল বেয়ে অঝড় ধারায় বয়ে চললো। বাবার সাথে পা মিলিয়ে বেরিয়ে আসলো বিয়ের আসরে। হিয়াদের নিজস্ব বাড়ি। বাড়ির সামনে বড় লন টায় বিয়ের সব আয়োজন করা হয়েছে। বাবার নিজস্ব গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি থাকার দরুণ আর্থিক দিয়ে তারা যথেষ্ট সচ্ছল। কিন্তু এতকিছু থাকার পরও তো কিছু একটায় কমতি তো থাকতেই হতো। মাুষ যে সবদিকে পরিপূর্ণ হয়না৷ তার ক্ষেত্রেও হয়তো সেই ঘটনায় ঘটেছে। বিয়ের আসরে পা ফেলতেই জিহাদের দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিললো হিয়ার। জিহাদ আকুতিভরা দৃষ্টিতে যেন হিয়ার আশাতেই তাকিয়েছিল দরজার পানে৷ জহির আহমেদ মুখ থমথমে অবস্থায় দাড়িয়েছিলেন ছেলের পাশে। উনি যখন বিয়ের আসর ছেড়ে ছেলেকে নিয়ে চলে যেতে চাইলেন! উনার ছেলে নিজেই বাধ সেধেছিল। জহির আহমেদের কাছে ছেলের সুখ-টাই সব৷। এজন্য এক্ষেত্রেও মান সম্মান বিষয়-টা সরিয়ে ধৈর্য ধরে দাড়িয়েছিলেন। হামিদ চৌধুরী মেয়ের সাথে একান্তে কথা বলার জন্য বিয়ের আসর ছাড়ার অনুমতি চাইলেও! উনি নিরবে মেনে নিয়েছেন৷ বিয়ের সাথে আসা বরপক্ষ! নিকট আত্মীয়স্বজনের কটু কথা! তুচ্ছতাচ্ছিল্য সব মুখ বুঁজে মেনে নিয়ে দাড়িয়েছিলেন। হামিদ চৌধুরী আসতেই উনি নিজের স্বভাব বজায় রেখে শুধালেন,
‘বিয়ে-টা কী হবে আদৌও? নয়তো স্পষ্ট সব জানিয়ে দিন। আমরা বিদায় হতাম।’
হামিদ চৌধুরী সলজ্জিত ভাবে ক্ষমা চাইলেন। বললেন,
‘আমার মেয়ের জন্য আপনাদের যথেষ্ট অপমানিত হতে হলো। মন থেকে ক্ষমাপ্রার্থী আমি। দয়া করে আমায় ক্ষমা করে দেবেন। যদি অনুমতি দেন! তবে বিয়ের কাজ এবার শুরু হোক!’
জিহাদের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো। ভালোবাসা মানুষকে অন্ধ করে দেয়! তা জিহাদকে দেখে আরও একবার বুঝলো হিয়া৷ নিজেকে দেখে বুঝেছিল একবার। যখন আহিরকে তার বাবা মানবেনা বলে আহিরের হাত ধরে পালিয়েছিল! এরপর ভেবেছিল, বিয়ে যখন হয়েছে! বাবা তো মানবেই। কিন্তু তার বাবা যে আঘাত টা পেয়েছিল! তার জেদ বজায় রেখে তার আর আহিরের বিয়ে-টা তখন তিনি মেনে নেননি। তখন হিয়া বুঝেছিল, ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে! বাবাকে কত বড় আঘাত সে দিয়ে বসেছিল। আজ আবার বুঝলো জিহাদকে দেখে। এতবার ফিরিয়ে দেওয়ার পরও তার ভালোবাসাট একফোঁটা কমতি দেখলোনা হিয়া। আজ আবার এত অপমান করে ছাড়লো। তবুও বিয়ে না করে যেতে রাজী নয় জিহাদ। জিহাদের মুখপানে তাকিয়ে এসব ভাবতে ভাবতে ফের স্টেজে এসে বসলো হিয়া। হামিদ চৌধুরী হাত ধরে নিয়ে মেয়েকে বসিয়ে দিলেন স্টেজে৷ জিহাদও নিজের জায়গায় ফিরে গিয়ে বসলো। শুরু হলো বিয়ের কার্যক্রম। আহির এরমাঝে নিরব দর্শক হয়ে বসে রইলো। বুকের মাঝে আগুনের মতো যেন অনুভূতিগুলো সব জ্বলতে লাগলো। যে আগুনে পুড়ে চললো তার মন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিয়ের আসর ছাড়ার জন্য উদ্দ্যত হলো সে। তখন-ই হিয়ার ক্ষীণ স্বরে বলা কবুল শব্দ-টাও যেন তীড়ের মতো এসে বুকে বিধলো আহিরের। চোখ বন্ধ করে হাত মুষ্টিমেয় করে নিজেকে সামলানোর বৃথা প্রয়াস চালালো। আনমনে ভাবলো,
‘আমি তোমায় বুঝতে পারিনি বলে আমায় ছেড়ে এসেছিলে হিয়া৷ যে যাতনায় একটা বছর পুড়লাম! তার ছায়াও যেন তোমার উপর না পরে। জিহাদের সাথে তুমি খুব ভালো থাকো। খুব ভালো থাকো।’
এদিকে বিয়ের কার্যক্রম শেষ হওয়ায় আনন্দের জোয়ার বয়ে গেলো বিয়ের আসরে। হিয়ার দুই চাচা মিলে সবার মাঝে খুরমা বিলিয়ে দিতে শুরু করলেন। আহির তা আরও একবার দেখে হিয়াকে একপলক দেখে জোড় কদমে পা চালিয়ে বিয়ের আসর ছাড়লো। হিয়া তা একপলক নিজেও দেখলো। জিহাদকে ততক্ষণে এনে তার পাশে বসিয়ে দিয়েছে তার চাচাতো ভাই-বোনেরা। চোখ নামিয়ে নিলো হিয়া। আনমনে ভাবলো,
‘সব তো শেষ-ই হয়ে গিয়েছে আহির। এখানে এসে এমন সিনক্রিয়েট করার কোনো দরকার আদৌও ছিল?’
চলবে?
আসসালামু আলাইকুম। ভুলগুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইলো।