এ তুমি কেমন তুমি পর্ব-০৩

0
346

#এ_তুমি_কেমন_তুমি
#পর্বঃ৩
#জোহা_ইসলাম(ছদ্মনাম)

ভোর বেলায় ঘুম ভাঙতেই আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলো হিয়া। পরনের সুতি শাড়িটার আঁচল ঠিক করে চারপাশে তাকাতেই জিহাদকে নজরে পরলো খাটের অন্য মাথায়। মনে পরলো রাত্তিরের কথা। বড় খাট-টার প্রস্থের এক মাথায় হিয়া শুয়েছিল, অন্য প্রস্থে জিহাদ। সম্পর্কের টানাপোড়েনে নতুন জীবনের সূচনায় হয়তো একে-অপরকে মেনে নিতে সময় লাগবে। কথা-টা একটু ভুল হয়ে গেলো। একে অপরকে নয়! শুধু হিয়ার-ই জিহাদকে মেনে নিতে সময় লাগবে। জিহাদ তো হিয়াকে অন্ধের মতো ভালোবাসে। যার ফলে তার মতো খুঁতওয়ালা মেয়েকে বিয়ে করতে পাগল হয়েছিল। কিন্তু জিহাদ তার সবটুকু জানার পর আদৌও এই ভালোবাসা টুকু তার প্রতি জিইয়ে রাখতে পারবে তো! সবকিছু ভাবতে গিয়ে কেমন একটা ভোঁতা কষ্ট মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো হিয়ার। কপালের দু-পাশে দুহাতে চেপে ধরে বসলো। হাঁটু মুড়ে বসে হাঁটুর ভাঁজে মাথা গুঁজে দিলো হিয়া। অসহনীয় যন্ত্রণায় চোখ ফেটে জল আসতে চাইলো। কান্না-রা ভেতরে ভেতরে দলা পাকিয়ে আসলো। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো হিয়া। জিহাদের ঘুম এমনি অনেক পাতলা। হালকা শব্দেই তার ঘুম ভাঙে। হিয়ার ফোপাঁনোর শব্দ কিছু সময় কানে যেতেই ঘুম-টা ভেঙে আসলো তার। ড্রিম লাইটের আলোয় বিছানায় লাল সুতি শাড়ি পরহিত রমণী তার স্ত্রী আর সে ফুঁপিয়ে কাঁদছে! বাবাকে ছেড়ে এসেছে বলে কাঁদছে বোধ হয়। জিহাদ দুহাতে চোখ ডলতে ডলতে বললো,

‘ঘুম কখন ভাঙলো? গতকাল ক্লান্ত ছিলে অনেক। এত তাড়াতাড়ি উঠার প্রয়োজন ছিল আদৌও?’

জিহাদের কণ্ঠস্বর কানে যেতেই হিয়া মুখ তুলে তাকালো। ততক্ষণে জিহাদ বিছানা ছেড়ে উঠে দাড়ালো। লাইট জ্বালিয়ে দিলো। হিয়ার দিকে তাকিয়ে আবার বললো,

‘কান্নাকাটি ফুরোলে ফ্রেশ হয়ে ফজরের নামাজটা পড়ে নাও উঠেছো যখন।’

হিয়া একপলক জিহাদকে দেখে নিয়ে ফ্রেশ হওয়ার জন্য ওয়াশরুমের দিকে যাবে বলে এক পা দিতেই মনে হলো গোসল করা জরুরী। ক্লান্ত শ্রান্ত শরীরটা আর চলতে চাইছেনা। গতকাল রাতে লেহেঙ্গা পাল্টে ফ্রেশ হয়ে শাড়ি পরে বাসর রাত্রির আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নামাজ টুকু পড়েই ঘুমে নেতিয়ে পরেছিল সে। পা ঘুরিয়ে আলমারির পাশে পরে থাকা নিজের লাগেজ থেকে কাপড় বের করার জন্য উদ্দ্যত হতেই জিহাদ বলে উঠলো,

‘গতকাল রাতে কী বলেছিলাম?’

হিয়া বুঝলোনা জিহাদের কথা। ভ্রুকুটি করে তাকালো। জিহাদ নিজের আলমারী খুলে মিষ্টি কালার একটা জামদানী বের করে বললো,

‘এটা পড়ে নাও শাওয়ার নিয়ে।’

হিয়া চুপচাপ জিহাদের দেওয়া শাড়ি-টা হাতে নিলো। মনে পরলো, জিহাদ তার জন্য সব রকমের কাপড় কিনে আলামারিতে গুছিয়ে রেখেছে। পুরো রুম-টাকেই এমন ভাবে সাজিয়েছে! যেন তার কোনো সমস্যা না হয়। গতকাল বিদায়ের পর শ্বশুড় বাড়িতে পা দেওয়ার পর সব নিয়ম কানুন শেষে জিহাদের বোন আর ভাবী যখন রুমে দিয়ে যায়! তার আধঘন্টা পর জিহাদ রুমে আসে টুকটাক কথা জিগাসা করল। ফ্রেশ হওয়ার কথা বললে! আলামরী থেকে তার জন্য শাড়ি বের করে দেয়। তারপর রুম ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখায় জিহাদ তার জন্য কি কি রেডি করেছে। সেসব ভেবে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে হিয়া। নিজের রুম-টাকে মিস করছে খুব৷ দেড় বছর ধরে ভালোবেসে একটা সংসার তো সুন্দর করে গুছিয়ে নিয়েছিল। এখানে এই সম্পর্কে তো ভালোবাসা নেই। এই সংসার গুছিয়ে তুলতে পারবে তো! সে যে বড্ড খারাপ মানুষ। না ভালো মেয়ে হতে পেরেছে! না কারোর বউ। জেনেশুনে জিহাদের জীবন টাও নষ্ট করে দিলো। একটু জোড় খাঁটিয়ে বিয়ে-টা ভেঙে দিলে হয়তো সাময়িক অপমানিত হতো! তবে একটা সময় গিয়ে সবাই বুঝতো হিয়া ভুল কিছু করেনি। এত স্বার্থপর হলো সে। এর পরিণতি কি হবে? ভাবতেই রুহ কাঁপলো হিয়ার। ফাঁকা ঢোক গিললো বার কয়েক৷ চিন্তা ভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ালো। নতুন বউ যেহেতু! শাড়ি পরেই বের হতে হবে। জিহাদ এতক্ষণ নিশ্চুপ ভাবে হিয়াকে দেখছিল। একহাতে আরেক হাত কচলিয়ে বলে উঠলো,

‘ভাবী-রা হয়তো রাতে কিছু হয়েছে কিনা! এসব নিয়ে হাসিমজা করবে। প্লিজ একটু শান্তভাবে সামলে নিও।’

জিহাদ অসস্তি নিয়ে কথাগুলো বললো। হিয়া শুনেও জবাব দিলো না। শাওয়ার নিতে ঢুকে পরলো ওয়াশরুমে। জিহাদ যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। মেয়ে-টা এত শান্ত! এতগুলো কথা সে একাই বলে গেলো। তবুও টু শব্দটি করলোনা। এটা মেয়ে না রোবট! বিরবির করে বললো জিহাদ। এরপর হাত পা ঝেড়ে আলসেমি ভাঙার ভঙ্গিতে বারান্দার দরজা খুলে বারান্দায় গিয়ে দাড়ালো জিহাদ। ভোরের আলো চারদিকে ছড়িয়ে পরতে শুরু করেছে৷ জিহাদ বারান্দার গ্রিলে হাত রাখলো। ক্লান্ত অশান্ত মনে বয়র কয়েক লম্বা শ্বাস টানলো ভোরের নির্মল বাতাসে। চোখ বন্ধ করে এক হাত মুঠো করে নিয়ে বিরবির করে বলে উঠলো,

‘অনেক ঝড়ঝাপ্টার পর আপনাকে পেয়েছি হিয়া। আপনার নিজেকে এভাবে গুটিয়ে রাখা! নিজের সমস্যার জন্য নিজেকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে রাখা! সবকিছুই আমি আল্লাহ চাইলে খুব দ্রুত সমাধান করে ফেলবো। আমি সব জানি হিয়া, সবকিছুই জানি। জেনেশুনে আপনাকে পাওয়ার জন্য ডেস্পারেট হয়েছিলাম। এখন সেসবের মানও আমার রাখতে হবে। সব ঝামেলা কাটিয়ে উঠি; আপনাকেও জানিয়ে দিবো, আমার অজানা কিছুই নয়। তবুও আমার আপনাকেই চাই। আপনার বিকল্পও চাইনা। আপনি ব্যতিত বেটার কাউকেও আমার চাইনা। আমার আপনাকে লাগবে মানে আপনাকেই লাগবে। আর আপনাকে এত অবসাদে ডুবিয়ে দেওয়া আহির চৌধুরীকে এবার থেকে হারতে হবে সবক্ষেত্রেই৷ ওর করা প্রতিটা অন্যায়ের শোধ আমি তুলবো। এই ভোর সাক্ষী করে এটা আমার নিজের কাছে নিজের-ই ওয়াদা।’

কথাগুলো বিরবির করে জিহাদ গ্রিলে কপাল ঠেকিয়ে নিজের রাগ সামলানোর চেষ্টায় নামলো। আহিরের কৃতকর্মের কথা মনে আসতেই আহিরকে খু*ন করার মতো জেদ চাপলো জিহাদের। আহির যে তার বেস্টফ্রেন্ড ছিল! এটা ভাবতেই নিজের প্রতি নিজের ঘৃণা জাগছে জিহাদের।

‘ভেজা কাপড়গুলো কোথায় মেলে দিবো?’

হিয়ার গলার স্বরে কথাগুলো কানে আসতেই জিহাদ নিজের ধ্যান ভাঙলো। পিছন ফিরে হিয়াকে দেখে বললো,

‘বারান্দায় এই যে দড়ি! আপাতত এখানে মেলে দিন৷’

কথাটুকু বলেই জিহাদ বারান্দা ছাড়লো। হিয়াকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় তাকালো না হিয়ার দিকে। এই মেয়ে-টা তাকে উপেক্ষা করে কষ্টকে বেছে নিয়েছিল। ভাবতেও হিয়ার উপর জেদ চাপছিল জিহাদের। সে তো এত ভালো নয়! যে, হিয়া তাকে কষ্ট দেবে! অবহেলা করবে! আর সে তা মুখ বুঁজে মেনে নেবে। অবহেলা করলে সেও হিয়াকে বুঝিয়ে দিবে অবহেলা করার কষ্ট। হিয়াকেও বুঝতে হবে, সে এখন জিহাদের স্ত্রী৷ তাকে তার অতীত আঁকড়ে বসে থাকলেই চলবেনা। বাবার পায়ে অব্দি পরেছে সে হিয়াকে নিজের করে পাওয়ার জন্য। এই সবকিছুর বিনিময় হিসেবে হিয়াকেও ভালোবাসা দিতেই হবে।

রুমে এসে নিজের জন্য কাপড় বের করতে করতে এসব ভাবলো জিহাদ। হিয়া কাপড় মেলে দিয়ে এসে জিহাদকে ভাবুক উদাসীন দেখে আনমনে ভাবলো,

‘চঞ্চল মানুষ-টা আজকাল বেশিই ভাবুক হয়েছে। এত কি ভাবে! কে জানে? আগে তো এমন ছিল না।’

জিহাদ কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে যাওয়ার আগে আগে হিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো,

‘যা খুশি হয়ে যাক, নিজেকে ডিভোর্সি, ঘৃণিত, করুণার পাত্রী! হ্যান ত্যান ভাবার একদম দরকার নেই। তুমি জিহাদ আহমেদের বউ! এটাই তোমার পরিচয়। আর আমার বউ হয়ে নিজেরও একটা পরিচয় বানানোর জেদ টা আনো দয়া করে। এভাবে মনমরা হয়ে ঘুরে বেড়ালে আমার থেকে খারাপ কেউ হবেনা হিয়া।’

শাসনের সুরে কথাগুলো বলে জিহাদ ওয়াশরুমে ঢুকে পরলো। কথাগুলোর মাঝে কিছু-টা ধমকানোর সুরও মেশানো ছিল। হিয়া চমকালো। জিহাদ তাকে শাসন করলো! এই বুঝি স্বামীর অধিকার! আচ্ছা এমন শক্ত হয়ে কথাগুলো বলার কোনো দরকার ছিল? এ কেমন মানুষ বাপু! নতুন বউকে এভাবে ধমকায়! অদ্ভুত।

চলবে?

আসসালামু আলাইকুম। ভুলগুলো মার্জনীয়, ক্ষমা করে দেবেন