#ওয়েডিং_স্টোরি
#পর্ব_৩০
#আভা_ইসলাম_রাত্রি
হাসপাতালের স্যাঁতস্যাতে পরিবেশে এতদিন ধরে পড়ে থাকা কারো জন্যেই সুখকর নয়। তেমনই, আভা। বছরে একবারও যে মেয়ে হাসপাতালের চৌকাঠে পা দিত না, সেই মেয়ে গত এক সপ্তাহ ধরে হাসপাতালে শুয়ে আছে। আভা এখন অনেকটাই সুস্থ। তার মাথায় আপাতত একটাই চিন্তা ঘুরছে, ও বাসায় যাবে। কেবিনে এখন শুধু মিনহাজ বসে আছে। বাকি সবাই বাসায় ফ্রেশ হতে গেছে। আভার মা যেতে চান নি। কিন্তু আভা’ই উনাকে বুঝিয়ে সুজিয়ে বাসায় পাঠিয়েছে। আভার মা বরাবর খুব পরিষ্কার মানুষ। হাসপাতালের বিষাক্ত জীবাণু তার কখনোই সহ্য হয়না। একটা গোসল নিতে পারলে ভালো লাগবে তার। মিনহাজ একটা চেয়ারে বসে ল্যাপটপে কাজ করছে। আভা সেদিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে এক নিঃশ্বাস ফেললো। শুয়ে থাকতে থাকতে কোমর ধরে এলো, পুরো। আভা বসার চেষ্টা করলো। কিন্তু পায়ে আর কোমরে ফ্র্যাকচার হওয়ায় নিজে থেকে বসতে পারলো না। শেষ পর্যন্ত, হাল ছেড়ে দিয়ে বেডে গা এলিয়ে দিলো। মিনহাজের দিকে চেয়ে আভা আস্তে করে ডাক দিল,
— ” ভাইয়া..! ”
মিনহাজ আভার ডাক শুনে তাড়াহুড়ো করে ল্যাপটপ রেখে আভার কাছে এলো। জিজ্ঞেস করলো,
— ” কিছু লাগবে? শরীর খারাপ করছে? কিছু কি খাবি? ”
আভা অবাক হলো ভীষন! যে ভাই তার সাথে দিনের চব্বিশ ঘণ্টাই ঝগড়া করে, সেই ভাই এখন তার এত খেয়াল রাখছে। এটাই হয়তো, ভাই-বোনের মধ্যকার আদর,ভালোবাসা! আভার চোখে লাল-নীল মুগ্ধতা ছড়ালো। আভা আস্তে করে বললো,
— ” আমাকে উঠাও একটু। বসবো। ”
মিনহাজ আলতো করে আভার কাঁধ ধরে আভাকে আস্তে করে বসালো। আভার পিঠের দিকে একটা বালিশ দিয়ে দিলো। বসার সঙ্গেসঙ্গে আভার কোমর ব্যথায় কুঁকড়ে এলেও ও দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করলো। ডাক্তার বলেছে, আঘাতপ্রাপ্ত জায়গা যত বেশি নড়াচড়া করা যাবে, ততই ভালো। এতে তাড়াতাড়ি সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। মিনহাজ জিজ্ঞেস করলো,
— ” আর কিছু লাগবে? ”
আভা মানা করলো। না, কিছুই লাগবে না। মিনহাজ কব্জিতে থাকা কালো রঙের ঘড়ি’টায় চোখ বোলালো। আভার ঔষুধ খাওয়ার সময় হয়ে গেছে। মিনহাজ আর দেরি করলো না। বেডের লাগোয়া টেবিল থেকে একটা বক্স বের করে প্যাকেট থেকে ঔষধ খুললো। তিনটা গোল ঔষুধ আভার হাতে ধরিয়ে দিয়ে পানি এগিয়ে দিলো। আভা ঔষুধ খেয়ে পানি খেলো। মিনহাজ পানির গ্লাস টেবিলের উপর রেখে আভার দিকে ফিরলো। জিজ্ঞেস করলো,
— ” এখন শুয়ে পড়বি? ”
আভা এবারও মাথা ডানে-বায়ে নাড়ালো। যার অর্থ, না। আভা বললো,
— ” তুমি তোমার কাজ শেষ করে ফেলো। আমি ঠিক আছি।”
মিনহাজ আবারও সোফায় বসলো। ল্যাপটপ পুনরায় কোলের উপর রেখে কাজ করা শুরু করলো। বোনের অসুস্থতার কারনে, সাত দিনের ছুটি নিয়েছে ও। কিন্তু বসের কড়া নির্দেশ অনুযায়ী, ঘরে বসে অনলাইনে কাজ করতে হবে। নাহলে, এক সপ্তাহের বেতন কেটে যাবে। বেতন নিয়ে মিনহাজের কোনো কালেই মাথা ব্যাথা ছিলো না। কিন্তু সামনে বিয়ে তার। আরোহীকে একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ দিতে, এটুকু কষ্ট তো করতেই হবে।
আভার মন খারাপ। সেদিনের পর, আরো দুদিন কেটে গেলো। আহনাফ এখনো আসেনি। আভার রাগ লাগছে। সেই রাগটা ধীরে ধীরে দুঃখে পরিণত হচ্ছে। সেই দুঃখ বয়ে আনলো, এক উত্তাল-পাত্থাল কান্না! আভা বহু কষ্ট কান্না থামালো। বড় ভাইয়ের সামনে নিজের হবু স্বামীর জন্যে চোখের জল ফেলা, বড্ড লজ্জাজনক। আভা বেডের চারপাশ হাতড়ালো। ওর ফোন কোথায়? কিন্তু, ফোন পাওয়া গেলো না। হয়তো, সেদিনের অ্যাক্সিডেন্টের কারণে, ফোন নষ্ট হয়ে গেছে। এখন? আহনাফকে কল দিবে কি করে? আভা মিনহাজের দিকে তাকালো। মিনহাজ ভ্রু কুঁচকে খুব মনোযোগ দিয়ে কাজ করছে। ভাইয়াকে বলবে, তার ফোনটা দেওয়ার কথা? কিন্তু কি বলে ফোন চাইবে? মায়ের কথা বলা যেতে পারে। আভা মিনহাজকে ডাক দিলো। মিনহাজ ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে আভার দিকে তাকালে আভা জড়তা নিয়ে বললো,
— ” তোমার ফোনটা একটু দাও না। মা’কে কল দিবো। ”
মিনহাজ কোনোরূপ বাক্য ক্ষয় না করে, সোফার উপর থেকে ফোন নিয়ে আভার দিকে এগিয়ে দিলো। আভা এক ঢোক গিলে ফোন হাতে নিলো। কিন্তু, আহনাফের নাম্বার কি দিয়ে সেভ করা? এত এত নাম্বারে, খুঁজবে কি লিখে? একবার আহনাফ লিখে সার্চ দিলো। আহনা নামে আরও তিনটা নাম্বার দেখালো। এখানে কোন নাম্বারটা আহনাফের? ও নাম্বার তো মুখস্তও করেনি। ইস! বড্ড খারাপ হলো ব্যাপারটা। বাসায় যাওয়ার পর আহনাফের নাম্বার একদম মুখস্ত, টুতস্থ ,কণ্ঠস্ত সবশেষে আত্বস্থ করে ফেলতে হবে। কোনো ছাড় নেই!
— ” লাস্টে ৪৫ যেটা, ওটাই আহনাফের নাম্বার। ”
আভা চমকে তাকালো মিনহাজের দিকে। মিনহাজের চোখ এখনও ল্যাপটপের দিকে। যেনো, একটু আগে সে কিছুই বলেনি। আভা এক ঢোক গিললো। বড্ড লজ্জা লাগছে ওর। ইশ, ভাই কি ভাবলো? আভা খুঁজে আহনাফের নাম্বার বের করলো। কল বাটনে চাপ দিয়ে ফোন কানে লাগিয়ে বসে রইলো।
একটু পর, মিনহাজ সোফা ছেড়ে উঠে গেলো। ল্যাপটপ আবারও সোফায় রেখে আভার দিকে তাকিয়ে বললো,
— ” আমি একটু বাইরে যাচ্ছি। চা খাবো। ভয় পাস না। একটু পরই চলে আসবো। ”
আভা মাথা নেড়ে সায় দিলো। ও খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে, মিনহাজ কেনো আভাকে একা রেখে চলে গেলো। বড় ভাইয়ের সামনে আহনাফের সাথে কথা বলতে হয়তো আভার সংকোচ হবে। সেজন্যেই, খুব কৌশলে মিনহাজ বেরিয়ে গেলো কেবিন থেকে। বাহ্!
একটু পর কল রিসিভ হলো। ওপাশ থেকে আহনাফ ব্যস্ত গলায় বললো,
— ” আসসালামুআলাইকুম ভাইয়া, আভা কেমন আছে? ”
আহনাফের কণ্ঠস্বর শুনে আভার নিঃশ্বাস আটকে এলো। বুকের ভিতর’টা ধরফর করছে। আভা সামলাতে ঠোঁট কামড়ে ধরলো। আহনাফ কিছুক্ষণ নীরব থেকে আলতো সুরে ডাক দিলো,
— ” বউফ্রেন্ড..! ”
আভা যেনো কেঁপে উঠলো।ইস! এই ডাকটা কতদিন পর শুনলো আভা? এক বছর পর, নাকি কয়েক যুগ পর? আভার চুপ থাকার কারন আর ওর বড় নিঃশ্বাস ফেলার কারণ দুটোই আহনাফ জানে। তবুও, আহনাফ নিজেকে এক শক্ত খোলসের ভিতর আবৃত করে বললো,
— ” কেনো ফোন দিয়েছ, জলদি বলো। আমার একটু পর বাইরে যেতে হবে। ”
আহনাফের ওমন কঠোর ব্যবহারে আভা মোটেও অভ্যস্ত নয়। আহনাফ বরাবরই আভার প্রতি নম্র! কিন্তু, আজ কি হলো? কেনো করছে এমন উনি? আহনাফ কি জানেনা,তার এই শক্ত ব্যবহার আভাকে জ্বালিয়ে দিচ্ছে। আভা ভস্ম হয়ে, ছাই হয়ে যাচ্ছে। হয়তো আহনাফ জানে। জানে বলেই, সে এমন করছে। কারণটা মূলত আভার বেখেয়ালি আচরন, আভার নিজের প্রতি উদাসীনতা! আভাকে একটা কঠিন শিক্ষা দিতেই আহনাফ নিজেকে শক্ত চাদরে মুড়িয়ে রেখেছে। হয়তো আহনাফ জানে, তার এক শিক্ষা আভাকে আর কোনোদিন ইমমিচিউর কাজ করতে বাঁধা দিবে। আহনাফ বললো,
— ” কিছু বলবে? বলার হলে জলদি বলো, আমার বেরুতে হবে। ”
আভা এবার চোখ-মুখ মুছে শক্ত গলায় বললো,
— ” আপনার কাছে আমার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেছে, তাইনা? আজকাল, নতুন কাউকে মনে ধরেছে? আমি অসুস্থ। তা জানা সত্ত্বেও, আমি একবারও আমাকে দেখতে আসেন নি। এই আপনার ভালোবাসা? ”
আভার এমন মনোভাব আহনাফ হতবাক হয়ে গেলো। তার এই শাস্তি, আভা এমন করে নিচ্ছে? আহনাফ অবাকও হলো, বটে! তবুও সে অত্যন্ত শান্ত গলায় উত্তর করলো,
— ” তুমি খুব ভালো করেই জানো, তুমি আমার জন্যে কি? তবুও, এমন মনোভাব? ওকে, জাস্ট ফরগেট ইট। ঔষধ-গুলো ঠিকমতই খেয়ে ঘুমাও। রাখছি। ”
আভা যেনো তেঁতে উঠলো এমন উত্তরে। আহনাফের শান্ত উত্তরে আভা দ্বিগুণ তেজ নিয়ে বললো,
— ” একদম মিষ্টি কথায় আমাকে ভুলাবেন না। আপনি জানেন, এ কদিন আমি ঠিক কিসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। না, আপনি জানবেন কেনো? আপনার তো অন্য কেউ জুটে গেছে। আমি অসুস্থ। আমাকে আপনার কি দরকার, তাইনা?”
আহনাফ আভার এমন কথায় নীরব থাকলো। এক রত্তিও কথা বললো না। প্রচন্ড শান্ত সুরে বললো,
— ” এতগুলো কথার শাস্তি পাই-পাই করে ফিরিয়ে দেবো। রেডি হও। আমি আসছি। ”
কথাটা বলেই আহনাফ ধাম করে ফোন কেটে দিলো। আভা ফোন কান থেকে নামিয়ে হতবাক হয়ে চেয়ে রইলো। এখন কি হবে? আবেগের বশে এত বড়বড় কথা বলে ফেললো! এবার? আহনাফের রাগ তো ওকে কাঁচা খেয়ে ফেলবে। ইয়া আল্লাহ! রক্ষা করো! রক্ষা করো!
#চলবে
#ওয়েডিং_স্টোরি
#পর্ব_৩১
#আভা_ইসলাম_রাত্রি
রাত নেমেছে শহরে। রাতের প্রতীক হিসেবে আকাশে উঠেছে বিশাল এক চাঁদ। ঈষৎ হলদে রং তার! রাতের হিম আভার গায়ে ছোঁইয়ে দিতেই আভার ঘুম ভাঙ্গলো। আহনাফের রাগের কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে চোখ লেগে এসেছিল, বলা মুশকিল! আভা চোখ খুললো। আড়মোড়াও ভাঙ্গলো।
— ” বসে থাকা অবস্থায় কেউ ঘুমিয়ে পড়ে, ডাফার? ”
পাশ থেকে এক ভরাট কণ্ঠস্বর শুনে আভা হুড়মুড়িয়ে পাশ ফিরলো। আহনাফ সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে। হাতে নতুন এক ফোন। এই ফোনটা কবে কিনলেন? আগে তো দেখেনি। যায় হোক, উনি কখন আসলেন? আমি ঘুমিয়ে যাওয়ার পর? হবে, হয়তো। আভা কোনো কথা বললো না। বরং, সকল ভয়কে প্রশ্রয় না দেওয়ার ভয়ংকর এক পণ করে চুপ করে রইলো। মুখে বিশাল এক কুলুপ এঁটে ভাবলো, ‘ এই নিষ্টুর মানুষের সাথে কথা বলাই উচিৎ না। মোটেও না! ‘
কিন্তু, এতে আহনাফের মধ্যে কোনো ভাবাবেগ’ই লক্ষ্য করা গেলো না। সে ধীরে-সুস্থে হাতের ফোনটা পকেটে রেখে উঠে দাঁড়ালো। বেডের লাগোয়া টেবিল থেকে আভার মেডিক্যাল রিপোর্ট হাতে নিয়ে আভার পাশটায় বসলো। ফাইলটা খুলে উল্টে-পাল্টে দেখলো। ভ্রুযুগল কুঁচকানো, দাত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে আছে সে। এই গম্ভীর অবস্থায় আহনাফকে পাক্কা এক চকলেট বয় লাগছে। যা দেখে, আভার ছোট্ট মনটা হাঁসফাঁস করে উঠলো। বুকের ভিতর ভয়ংকর ঝড় সবকিছু তছনছ করে দিতে লাগলো। ইশ! মানুষটা এত সুন্দর কেন? একটু বদসুরুত হলে কি এমন দোষ হতো? উফ! আর তাকানো যাচ্ছে না! মনে হচ্ছে, তাকালেই একটা-দুটি ভুল করা যাবে অনায়াসে। হয়তো, এ কারণে আভা নিজের পণ রক্ষা করতে পারবে না। তখন? না, না! তাকানো যাবে না। আভা চোখ ফেরালো। আহনাফ ফাইল বন্ধ করে বালিশের পাশে রাখলো। আভার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলো,
— ” কোমর আর পায়ের ব্যথা কেমন এখন? ”
আভা ছোট্ট করে বললো,
— ” ভালো। ”
আহনাফ একটু পিছিয়ে পায়ের কাছে বসলো। পায়ের ফ্র্যাকচার হওয়া জায়গায় আস্তে করে আঙ্গুল চেপে ধরলো। আভা কিছুটা ব্যথা পেলো। তবে, ব্যথাটা সহনীয়! আহনাফ জিজ্ঞেস করলো,
— ” ব্যথা হচ্ছে? ”
আভার হঠাৎ করেই রাগ উঠলো। মনকে ক্ষতবিক্ষত করে, এখন বাহ্যিক ব্যথার কথা জিজ্ঞেস করছে? আশ্চর্য! আভা দাত খিঁচিয়ে বলে উঠলো,
— ” আমার ব্যথার কথা আপনাকে চিন্তা করতে হবে না। ছাড়ুন আমার পা। ”
আভা কথাটা বলে পা বটে নিতে চাইলো। কিন্তু আহনাফ হাত দিয়ে পা আটকে নিলো। আভার দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে বললো,
— ” যেটুকু জিজ্ঞেস করেছি, সেটুকুর উত্তর দাও। বেশি কথা বলো কেন? ”
আভা মুখ বাঁকিয়ে অন্যদিকে তাকালো। ফ্র্যাকচার হওয়া জায়গায় আহনাফ দুটো আঙ্গুল আরো একটু চেপে ধরে জিজ্ঞেস করলো,
— ” এবার ব্যথা করছে? ”
আভা ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলেও, মাথা ডানে-বায়ে নাড়ালো। যার অর্থ, ও হার মানবে না। তবে, আভা মানা করলেও আহনাফ সেটা বুঝতে পারলো। আভার রন্ধ্র-রন্ধ্র ওর চেনা! আহনাফ এবার বাঁকা হেসে আরো জোরে আঙ্গুল চেপে ধরলো। আভা এবার সজোরে চিৎকার করে উঠলো। রেগে বলে উঠলো,
— ” মেরে ফেলতে চান, নাকি? মেরেই ফেলুন। একটা গেলে আরেকটা আসবে। তাইনা? ”
আহনাফ পা থেকে আঙ্গুল সরালো। এগিয়ে এসে আভার পাশে বসলো। আভা এখনো চোখ খিচে আহনাফের দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে, ওর দুচোখ দিয়ে আহনাফকে ভস্ম করে দিলেই ওর শান্তি! আহনাফ আভার চোখের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে হাসলো। নরম গলায় বললো,
— ” মেরেই তো ফেলতে চাই। তাহলে, আর জ্বালাবে না আমাকে। স্বপ্নেও এসে ধরা দিবে না। চোখ খুললেও তুমি হাসবে না। মেরেই ফেলবো একদিন! ”
আভা কি বলবে, কি প্রতিক্রিয়া দেখাবে, খুঁজে পেলো না। তবে কি, ওর মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া বাটন নষ্ট হয়ে গেলো? আভা চোখ সরালো। তাকালো, অন্যপাশে। আহনাফের ওমন স্থির চোখের দৃষ্টিতে আভাকে মেরে ফেলছে। আভা নিজের মনের ধ্বংস দেখতে পায়, ওই দুচোখে! আহনাফ বেড ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। ড্রয়ার থেকে ঔষুধের বক্স বের করে আবারও বেডে বসলো। ঔষুধের বক্স থেকে দেখে শুনে ঔষধ বের করতে করতে জিজ্ঞেস করলো,
— ” এত জেলাসির কারণ কি? আগে তো এমন ছিলে না।হুট করে এত পরিবর্তন? কাহিনী কি? ”
আভা আহনাফের প্রশ্নে থতমত হয়ে গেলো। সে কি, সত্যিই জেলাস? কিন্তু, কেনো? আহনাফকে নিয়ে তার জেলাসির কারন কি? আভা আমতা আমতা করে বললো,
— ” কে জেলাস? ”
আহনাফ ইতিমধ্যে ঔষধ বের করে আভার দিকে এগিয়ে দিয়েছে। চোখের ইশারায় ঔষধ নিতে বললো। আভা আহনাফের হাত থেকে ঔষুধ নিলো। আহনাফ পানি এগিয়ে দিতে দিতে উত্তর করলো,
— ” তুমি খুব ভালো করে জানো, আমি কার কথা বলছি। ”
আভা একদমে ঔষধ খেয়ে ফেললো। আহনাফের কথায়, তার বড্ড অস্বস্তি লাগছে। সে জেলাস, ভাবতেই কেমন যেনো লাগছে। এক অদ্ভুত অনুভূতি! যেই অনুভূতির সাথে ও মোটেও পরিচিত নয়। আভা মিথ্যে বললো,
— ” হুহ! আমি মোটেও জেলাস না। আর আপনাকে নিয়ে জেলাসির কি আছে? ”
আহনাফ হাসলো তার প্রটিউত্তরে! তবে, এর বিপরীতে কোনো কথা বললো না। পকেট থেকে ফোন বের করে কাকে কল দিলো। ওপাশ থেকে কল রিসিভ হতে আহনাফ বললো,
— ” ৩১৪ নাম্বার রুমের রোগীর ডিসচার্জের ব্যবস্থা করো। ”
— ” ওকে, স্যার। ”
আহনাফ ফোন কেটে দিলো। আভা একটা জিনিস লক্ষ্য করলো, আহনাফ যখন ওর সাথে কথা বলে, তখন মনে হয় আহনাফ খুব উচ্ছল মনের ছেলে। কিন্তু,যখন বাইরের মানুষের সাথে কথা বলে, তখন মনে হয় ও খুব গম্ভীর প্রকৃতির। এক মানুষের দুই রূপ? বড়ই অদ্ভুত!
আহনাফ আভার ঔষধ পত্র গুছাতে গুছাতে এক ভয়ঙ্কর কথা বললো,
— ” আমার শাস্তি কিন্তু এখনো শেষ হয়নি। সো, বি প্রিপায়ার্ড বেবী। ”
আহনাফের কথা শুনে আভার আত্মারাম লাফিয়ে উঠলো। একটু আগে হেসেহেসে কথা বলা দেখে আভা ভেবেছিল, আহনাফ সব ভুলে গেছে। কিন্তু, এ তো দেখছি খুব শেয়ানা!
________________________
আভা বাসায় এসেছে, প্রায় দুঘন্টা হলো। ওদের বাসার অবস্থা রমরমা। আভার অসুস্থতার খবর শুনে অনেকেই দেখতে এসেছে আভাকে। আভা বিছানায় বসে ফল খাচ্ছে। আম, নাশপাতি, আপেল টুকরো টুকরো করে কেটে থালাভর্তি করে আভার সামনে রাখা হয়েছে। আভা একটা একটা করে ফল খাচ্ছে আর সবার কথা শুনছে। প্রচুর ঘুম পাচ্ছে তার। কড়া ডোজের ঔষধের ফলস্বরূপ! কিন্তু, বাসায় ঘুমানোর কোনো পরিবেশ নেই। তার রুমে কয়েকজন বসে আছে। সবাই গল্প গুজবে মগ্ন। এদের ফেলে আভা ঘুমাবে কি করে?
হঠাৎ রুমে আভার মা প্রবেশ করলেন হন্তদন্ত হয়ে। এসেই সবার উদ্দেশ্যে বললেন,
— ” ভাবি, আপনারা আমার রুমে চলে আসেন। আভা একটু রেস্ট নিক। জার্নি করেছ তো। ”
আভার মায়ের কথা শুনে সবাই একে একে রুম থেকে চলে গেলেন। আভার মা যাওয়ার আগে আভাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। আস্তে করে বললেন,
— ” আহনাফ না বললে আমি তো জানতেই পারতাম না , তোর যে এখন ঘুমের সময়। তুইও তো একবার বলতে পারতি। ”
আভা মায়ের দিকে চেয়ে বললো,
— ” তুমি তো রান্নাঘরে ছিলে। কিভাবে বলতাম? ”
আভার মা হাসলেন। আভার মাথায় আরো দুবার হাত চালিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। আভা মায়ের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে হাসলো। থাক! তার জীবনে নিজের পরিবার ছাড়াও আরো একজন যত্ন নেওয়ার মানুষ আছে। আচ্ছা, আহনাফের পারেন কিভাবে? এতদিক তার খেয়াল থাকে কি করে? ক্লান্ত হন না উনি? সবদিক সামলিয়ে হাঁপিয়ে উঠেন না?কিন্তু আভা এটা জানলো’ই না, ভালোবাসলে সবই পারা যায়। ভালোবাসার শক্তি, পৃথিবীর সকল শক্তিকেও হার মানায়!
#চলবে