#ওয়েডিং_স্টোরি
#পর্ব_৩২
#আভা_ইসলাম_রাত্রি
রাতের আঁধার কেটে সকাল হলো। কালো আকাশ সাদা রঙে সাজলো। আভা মাত্রই ঘুম ছেড়ে উঠলো। ফ্রেশ হতে হবে এখন। কিন্তু, আভা কারো সাহায্য ছাড়া একা হাঁটতে পারে না। আভা বিছানা থেকে সজোরে ডাক দিলো,
— ” মা, মা! ”
আভার ডাক দেওয়ার প্রায় এক মিনিট পর আভার মা আঁচলে হাত মুছতে মুছতে রুমে প্রবেশ করলেন। আভার পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
— ” ফ্রেস হবি? ”
আভা মাথা নাড়লো। হ্যাঁ, ফ্রেস হবে। আভার মা আভার হাত ধরে বিছানা থেকে নামতে সাহায্য করলেন। বাথরুম পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন,
— ” একা পারবি? আমি আসবো ভিতরে? ”
আভা মানা করলো। বললো,
— ” না, লাগবে না। পারবো আমি।তুমি রুমেই থেকো কিন্তু। ”
আভার মা সম্মতি দিলেন। আভা বাথরুমে চলে গেলো।
পাঁচ মিনিটে ফ্রেশ হয়ে বের হলো আভা। আভার মা মেয়েকে বিছানা পর্যন্ত নিয়ে আসলেন। আভা বিছানায় বসলো। আভার মা জিজ্ঞেস করলেন,
— ” নাস্তা নিয়ে আসি? ”
— ” আচ্ছা! ”
আভার মা চলে গেলেন। আভা দু হাত দিয়ে পা বিছানার উপরে তুললো। বাম পায়ে ফ্র্যাকচার বেশি হয়েছে। সে পায়ে হাঁটু অব্দি লম্বা সাদা রঙের ব্যান্ডেজ। যা ধীরে ধীরে ঈষৎ হলদে রঙ ধারণ করেছে। পায়ের দিকে তাকিয়ে আভার তুমুল মন খারাপ হলো। নিজেকে পঙ্গু, পঙ্গু মনে হচ্ছে। কবে নাগাদ ওর পা ঠিক হবে, বলা মুশকিল! কিন্ত, এভাবে অক্ষম হয়ে বসে থাকতেও বিরক্ত লাগছে। কিন্তু, ওই যে, কপাল! কপালে না থাকলে ঘি, ঠকঠকালে হবে কি?
আভার মা রুমে আসলেন। এক হাতে প্লেট, অন্য হাতে পানির গ্লাস। পানির গ্লাস টি টেবিলে রেখে আভার মা আভার পাশে বসলেন। আভা প্লেটের দিকে তাকালো। প্লেটে একটা ডিম অমলেট আর পরোটা। আভার মা আভাকে মুখে তুলে খাইয়ে দিতে লাগলেন। আভা খেতে খেতে প্রশ্ন করলো,
— ” আমার ফোন কোথায়, মা? ”
আভার মা কঠোর কণ্ঠে বললেন,
— ” ভেঙে গেছে। ”
‘ ফোন ভেঙে গেছে ‘ শুনে আভার রাগ লাগলো। এই ফোন কতশত অনুরোধ আর কাকুতি-মিনতির ফল ছিলো! কিন্তু ভেঙে গেলো। ধ্যুর! আভা মাকে আদুরে কণ্ঠে বললো,
— ” নতুন ফোন কিনে দিবে না? ”
— ” না। ”
আভার মায়ের স্পষ্ট উত্তর। আভার দুঃখ দুঃখ লাগলো। ফোন না পেলে ওর মৃত্যু নিশ্চিত। ফোন ছাড়া আজকাল চলা যায় নাকি? আভা মাকে মাখন দিতে লাগলো। বললো,
— ” মা, দেখো আমার অনলাইন কত কাজ থাকে। সেগুলো করবো কিভাবে? তাছাড়া, একবার অভ্যাস হয়ে গেলে, ফোন ছাড়া চলা যায় নাকি? তুমিই বলো। ”
প্লেটের খাবার প্রায় শেষের দিকে। আভার মা, আভার দিকে পানি এগিয়ে দিলেন। আভা পানি খেয়ে আবারো মায়ের দিকে তাকালো। আভার মা উঠে দাঁড়ালেন। থমথমে গলায় বললেন,
— ” অ্যাডমিশনের রেজাল্ট দিক। মেডিক্যালে চান্স পেলে, ভালো মোবাইল কিনে দিবো। এখন এভাবেই থাকো। ”
আভার মা বেরিয়ে গেলেন রুম থেকে। আভা কপাল চাপড়ালো। মা একবার যা বলেছেন, সেটা হাজারবার বললেও পরিবর্তন হবে না। কিন্তু, যদি চান্স না পায়? তবে?
__________________
বিকেল হয়ে এসেছে। আভা বিছানায় বসে মায়ের মোবাইল দেখছে। মায়ের মোবাইল হচ্ছে আস্ত এক মসিবত! মায়ের ভাই-বোনের কলের যন্ত্রণায় ফোন ব্যবহার করা মুশকিল। কিন্তু, ঐ যে, উপায় নেই!
— ” হ্যাই ননদিনী..! ”
আরোহীর গলা শুনে আভা মোবাইল থেকে চোখ সরিয়ে দরজার দিকে তাকালো। দরজায় আরোহীকে দেখে আভা একপ্রকার লাফিয়ে উঠলো। মোবাইল একপাশে রেখে উচ্ছাস নিয়ে বললো,
— ” আরে ভাবী। তুমি? আসো, আসো। ”
আরোহী রুমে প্রবেশ করলো। আভার পাশে বসে আভাকে জড়িয়ে ধরলো। আভা জিজ্ঞেস করলো,
— ” কতদিন পর তোমাকে দেখলাম। তুমি তো আসোই না আমাদের বাসায়। ”
আরোহী হেসে জবাব দিলো,
— ” বিয়ের আগে শশুরবাড়ি বেশি আসতে নেই, ননদিনী। নজর লাগে। ”
আভা মুখ ফুলালো। বললো,
— ” আমার জন্যে তোমাদের বিয়েটা পিঁছিয়ে গেলো। খারাপ লাগছে। ”
আরোহী হাসলো। উজ্জ্বল ফর্সা মুখে হাসিটা ভারী সুন্দর দেখালো। ঠোঁটের হাসি বজায় রেখে বললো,
— ” একদিন থেকে ভালোই হয়েছে। আমারও এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করার ইচ্ছে নেই। ”
আভা অবাক হলো। বললো,
— ” কেনো? কেনো? ”
— ” ফ্যামিলিকে ছেড়ে আসতে মন চাইছে না। ”
— ” আরে, চিন্তা করো না তো। আমাদের ফ্যামিলিও তো এখন থেকে তোমার ফ্যামিলি। আর, তোমার প্রেমিকপুরুষ আছে না। সে থাকতে, এত চিন্তা কিসের? ”
মিনহাজের কথা শুনেই আরোহী লজ্জা পেলো। তবে, বাইরে সেটা প্রকাশ করলো না। বরং, আড়াল করলো। আভা আবারও বললো,
— ” তুমি জানো, আব্বু যখন তোমাদের ব্যাপারটা মেনে নিয়েছিল, ভাইয়া তো রীতিমত আব্বুকে জড়িয়ে ধরেছিলো। কেঁদেও ছিলো একটু। বুঝতে পারছো, কত গভীর প্রেম তোমাদের। আহা! জিও হোক এমন প্রেমের! ”
আরোহী লজ্জায় মিঁইয়ে গেলো। মিনহাজ কেঁদেছিলো ওর জন্যে? অসম্ভব ব্যাপার-স্যাপার, বটে। আরোহী আভার কাধে একটা চাপর দিয়ে হেসে বললো,
— ” দিন দিন পাজি হচ্ছো তুমি। দাঁড়াও, আহনাফকে বলে তোমার বিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। তখন বুঝবে, প্রেম কাহাকে বলে! ”
আরোহীর কথা শুনে আভা হেসে দিলো। কে বলবে, আজই তাদের প্রথম কথা বলা? প্রথম একত্রে বসা? প্রথম মন খুলে গল্প করা? সবটাই সম্ভব হয়েছে, দুজনের মধ্যকার সরল মনের জন্যে। মন পরিষ্কার, তো সব ভালো। মন কুলষিত, তো সব খারাপ। এটাই সত্যি!
— ” আরোহী, তোমাকে মা ডাকছেন। ”
দরজা থেকে মিনহাজের কণ্ঠ শুনে আভা আরো আরোহী দুজনেই সামনে তাকালো। মিনহাজের এক হাতে ফোন মুষ্টিবদ্ধ করে রাখা, ওপর হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকানো। চুলগুলো ভিজে কপালে লেপ্টে আছে। শরীরে মিষ্টি পারফিউমের গন্ধ, যা শুঁকে আরোহী মাতাল হয়ে উঠলো। মিনহাজের কথা শুনে আভা ভ্রু কুঁচকালো। বললো,
— ” বলে দাও,আমরা গল্প করছি। পরে আসছে। ”
মিনহাজ মানলো না। বরং, ত্যাঁছরাভাবে বললো,
— ” বেশি কথা বলিস কেন? মাকে আমি এসব বলতে পারবো না। আরোহী, যাও। দেখে আসো, মা কি
বলেন। ”
মিনহাজের কথায় আরোহী কালবিলম্ব না করে দাঁড়াতে চাইলো। কিন্তু সঙ্গেসঙ্গে আভা হাত দিয়ে আটকে আরোহীকে বসিয়ে ফেললো। আরোহী অবাক হয়ে আভার দিকে তাকালে, আভা মিনহাজের দিকে তাকিয়ে ভ্রু উঁচিয়ে বললো,
— “ভাই, সত্যিই কি মা ডাকছেন? হুঁ? ”
আভার কথায় মিনহাজ ভ্যাবেচেকা খেয়ে গেলো। থতমত হয়ে বলে উঠলো,
— ” বড় ভাইয়ের সাথেও ফাজলামি করিস, বেয়াদব। ওকে ছাড়। দেখে আসুক, মা কি বলে। ”
মিনহাজের এমন শক্ত কথায় আরোহী ভরকে গেলেও একবিন্দুও ভরকালো না আভা। আরোহী আভার দিকে চেয়ে বললো,
— ” আভা, আমি গিয়ে দেখে আসি। মা পরে খারাপ ভাববেন। ”
আভা আরোহীর দিকে তাকিয়ে আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বললো,
— ” আরে আমার ভোলাবালা ভাবী। তোমাকে কেউই
ডাকছে না। এসব ভাইয়ার প্ল্যান। তাইনা, ভাইয়া? ”
মিনহাজ কাঁচুমাঁচু হয়ে গেলো। আভার দিকে শক্ত চোখে তাকিয়ে বললো,
— ” তোরে আমি পরে দেখছি। ”
অতঃপর আরোহীর দিকে চেয়ে এক শক্তপোক্ত চাহনি দিলো। যার ভঙ্গিমা এমন ‘ একবার হাতের নাগালে পাই, খবর আছে তোমার। ‘ মিনহাজ চলে গেলো। মিনহাজের ওমন চাহনী আরোহী খুব ভালো করেই বুঝতে পারলো। ও ভয়ও পেলো। আভা আরোহীর ছটফটানি দেখে আলতো হাসলো। আরোহীর হাত ছেড়ে দিয়ে হেসে বললো,
— ” যাও, শুনে আসো তোমার পাগল প্রেমিক কি বলে। ”
আরোহী লজ্জা পেয়ে হেসে ফেললো। আভাকে আরো একবার জড়িয়ে ধরে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।
মিনহাজ আর আরোহীর কাণ্ড দেখে আভা জোরেই হেসে ফেললো। ভাবলো,’ ভাই তার ফেঁসে গেছে। হায়! ‘ হঠাৎ আভার মায়ের ফোন কল এলো। হয়তো, মামাদের মধ্য থেকে কেউ দিয়েছেন। আভা বালিশের কাছ থেকে ফোন হাতে নিলো। অচেনা নাম্বার। আভা ভ্রু কুঁচকিয়ে ফোন রিসিভ করে কানে ধরে সালাম দিলো। কিন্তু কেউ সালামের উত্তর দিলো না। বরং, ওপাশ থেকে কেউ ভরাট কণ্ঠে বললো,
— ” আপনার রেজাল্ট দিয়েছে, মিস আভা। ”
আহনাফের কণ্ঠ! আভা অবাক হলো। কিন্তু, তার থেকেও বেশি অবাক হলো, রেজাল্টের কথা শুনে। বুকের ভিতরে ধকপক করছে। আভা কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
— ” রেজাল্ট কি এসেছে? ”
আহনাফ আগের থেকেও দ্বিগুণ থমথমে গলায় বললো,
— ” দুঃখজনকভাবে, আপনি মেডিক্যালে চান্স পান নি। ”
#চলবে
#ওয়েডিং_স্টোরি
#পর্ব_৩৩
#আভা_ইসলাম_রাত্রি
— ” দুঃখজকভাবে, আপনি মেডিক্যালে চান্স পান নি। ”
কথাটা শুনে আভা পাঁচ সেকেন্ডের জন্যে ‘ থ ‘ হয়ে গেলো। মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিলো তার। চক্ষে জমলো দু ফোঁটা জল! চোখের সামনে নিজের এতদিনের স্বপ্ন ধুলিস্যাৎ হতে দেখলো ও। আভা কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
— ” আ.আপনি সত্যি বলছেন? আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। ”
আহনাফ বুঝলো, আভার মন ভেঙে গুড়িয়ে গেছে। এখন আরো নেগেটিভ কথা বললে হয়তো আভার ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ শোনা যাবে। আহনাফ চোখ বুজে লম্বা শ্বাস টানলো। ফোনের ওপাশ থেকে শান্ত সুরে বুঝালো,
— ” দেখো আভা, তোমার মার্ক খুব ভালো এসেছে। জাস্ট, পয়েন্ট ফাইভের জন্যে সরকারিতে চান্স হয়নি। ওয়েটিংয়ে আসতো। ওয়েটিং আসার কথা ছিল। কিন্তু, কেনো আসলো না, সেটাই বুঝতে পারছি না। এতে মন খারাপ করার কিছু হয়নি। তুমি চাইলে, ঢাকার নামকরা বেসরকারি মেডিক্যালে পড়তে পারবে। চিন্তা করো না। ”
আভা আর শুনলো না। ধাম করে ফোন কেটে দিলো। ফোন বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে দুহাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। কতশত স্বপ্ন ছিলো তার, এই মেডিক্যাল নিয়ে। কিন্তু, এখন? চোখের সামনে তার হার যেনো খিলখিলিয়ে হাসছে। আঙ্গুল উঁচিয়ে জানান দিচ্ছে, ‘ তুমি হেরে গেছো, আভা। তুমি পারো নি। তোমার দ্বারা কিছুই হবে না। ‘ নিজেকে পরাজিত, ঘৃণিত মনে হচ্ছে। এমন হওয়া কি খুব দরকার ছিলো?
আহনাফ বেসরকারি মেডিক্যালে ক্লাস নিচ্ছিলো। মূলত, মেডিক্যালটা আহনাফের বাবার তৈরি। আহনাফ ঢাকা মেডিক্যালে থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখানেই প্র্যাকটিস করছে। একটু আগে ক্লাস নেওয়ার সময়, দু-তিনজন কথা বলছিলো,অ্যাডমিশন রেজাল্ট নিয়ে। সেটা শুনেই আহনাফ আর দেরি না করে আভার রেজাল্ট দেখে। আভা চান্স পায় নি দেখে, আহনাফ কিছুটা হতবম্ব হয়ে পড়েছিল। আভার মার্ক যথেষ্ট ভালো। শুধু পয়েন্ট ফাইভের জন্যে আভার স্বপ্ন একদম মাঠে মারা পড়লো।
আহনাফ নিজের কেবিনে বসে আছে। হাতে ফোন। আভার ফোন কেটে দেওয়ার পর থেকে, কয়েকবার আভাকে কল করেছে। কিন্তু, বারবার বন্ধ দেখাচ্ছে। আহনাফ একসময় হাল ছেড়ে দিয়ে ফোনটা পকেটে রেখে উঠে দাঁড়ালো। এই মুহূর্তে, আভার সাথে দেখা করাটা দরকার তার। না জানি, আভা কোন পরিস্থিতে আছে? এই মেয়েটা না যা করে! ওকে কখনো শান্তি দিবে না, পণ করে রেখেছে যেনো! আহনাফ আর দেরি করলো না। লিফট দিয়ে নিচে নেমে, পার্কিং এরিয়া থেকে বাইক বের করলো।
___________________
প্রায় আধ ঘন্টা যাবৎ আভা দরজা বন্ধ করে বসে আছে। রুমে বসে আছে চুপটি করে। দরজার বাইরে থেকে, সবাই কতবার ডাকলো, তার এক উত্তর, ‘ আমি ঠিক আছি। আমাকে সমবেদনা দিতে হবে না। ‘ আভার মা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আভাকে ডাকছেন বারবার। তার এই কথা,
— ” আভা, মন খারাপ করিস না, মা। বের হ। তোর মার্ক ভালো ছিলো। এত মন খারাপ করিস না। বের হ। ”
জুনায়েদ, রেহানাকে বুঝাচ্ছেন, ‘ আভা নিজেকে সামলালে এমনিই বের হবে। এখন ওকে একা থাকতে দেও। ‘
কিন্তু রেহেনা তা শুনতে একদম নারাজ। উল্টো, তিনি এসব বুঝার পরিবর্তে স্বামীর উপর ক্রমশ রেগে যাচ্ছেন। মেয়ে দরজা বন্ধ করে বসে আছে, বাবা সেখানে বলছে ‘ একা ছেড়ে দাও? ‘ কি পাষাণ দিল! আভার বাবা একসময় হাল ছেড়ে মা-মেয়েকে একা ছেড়ে রুমে চলে গেলেন। মিনহাজ বাসায় নেই। আরোহীকে ওর বাসায় পৌঁছে দিতে গেছে। আভার মা পড়েছেন মহা মসিবতে। তিনি জানেন, আভা চেষ্টা করেছে। তিনি নিজে অ্যাডমিশন নিয়ে আভাকে স্ট্রাগল করতে দেখেছেন। কিন্তু, সবই কপাল! আল্লাহ-তায়ালা যা লিখেছেন ভাগ্যে, তাই হবে। ভাগ্যকে খন্ডন করা কারো সাধ্য নেই।
কলিং বেল বেজে উঠলো। কলিং বেলের আওয়াজ শুনে রেহেনা ফুস করে এক নিঃশ্বাস ফেলে দরজা ছেড়ে বসার ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। এখন আবার কে এলো? দরজা খুলে আহনাফের বিদ্ধস্ত চেহারা দেখে উনি যারপরনাই অবাক হলেন। আহনাফ অস্ফুট সুরে সালাম দিয়েই জিজ্ঞেস করলো,
— ” আন্টি, আভা কোথায়? ”
রেহানা দরজা ছেড়ে পাশে দাঁড়ালেন। বললেন,
— ” ভিতরে আসো, বাবা। আভা রুমেই আছে। দরজা বন্ধ করে বসে আছে কখন থেকে। আমি কতবার বললাম, খুললোই না। তুমি একটু দেখো তো। ”
আহনাফ ভিতরে প্রবেশ করলো। আভার মায়ের দিকে চেয়ে আশ্বস্ত করে বললো,
— ” আপনি চিন্তা করবেন না, আন্টি। আমি দেখছি। ”
আহনাফ কথাটা বলেই আভার রুমের দিকে পা বাড়ালো। আভার মা, আহনাফের পিঁছু পিঁছু আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরে ভাবলেন, মেয়ে জামাই কে একা ছেড়ে দেওয়াই উত্তম। এই বয়সে আর লজ্জায় পড়ার ইচ্ছে তার নেই। আভার মা রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন। কিছু বানানো যায় কিনা, আপাতত সেটাই তার মুখ্য চিন্তা! মেয়ে জামাই এসেছে বলে কথা!
আহনাফ আভার রুমের সামনে দাঁড়ালো।এই মেয়ে কি কখনোই শুধরাবার না? পরপর দুবার দরজায় টোকা দিয়ে হাক ডাকলো,
— ” আভা, দরজা খুলো বলছি। ”
ভিতর থেকে আভার কান্নামাখা আওয়াজ ভেসে আসলো,
— ” আমাকে একা থাকতে দিন, প্লিজ। আই নিড সাম পিস। প্লিজ। ”
আহনাফ এবার গলার সুর কড়া করলো। বললো,
— ” আভা, আমি লাস্টবার বলছি। দরজা খুলো। নাহলে, আমি কি করে বসবো আমি নিজেও জানিনা। আই সে ওপেন দ্য ডোর, ড্যাম ইট। ”
আহনাফের ধমক শুনে আভা একপ্রকার কেঁপে উঠলো। এই ছেলে এমন কেনো? এই যে আভা কষ্ট পাচ্ছে, কোথায় এসে নরম গলায় কথা বলবে। তা না! এসেই ধমকা-ধমকি! এই বদ মানুষের কাছে এটাই আশা করা যায়, বৈকি! পুনরায়, ওপাশ থেকে আহনাফের রাম ধমক শুনে আভা ব্যান্ডেজকৃত পা নিয়ে কষ্ট করে দরজা খুললো।
আহনাফ আভার দিকে তাকালো। তার চোখে-মুখে রাগের স্ফুলিঙ্গ! যেকোনো মুর্হুতে, সেই স্ফুলিঙ্গে দাহ হয়ে আভা ছাই হয়ে যেতে পারে। আভা দরজা খুলে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, ঠায়। মুখে কুলুপ এঁটে পা দিয়ে মাটি খুটছে। এখনো, কান্নার প্রভাব শরীর জুড়ে। আভার এমন ধ্বংসাত্বক অবস্থা দেখে আহনাফের তুমুল রাগ কমে হুরহুর করে শূন্যের কোটায় নেমে এলো। একদিন কি অবস্থা করেছে চেহারার! চোখ মুখে শুষ্ক মরুভূমির ন্যায়! তবে, এটাই কি ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ? আহনাফ শান্ত সুরে জিজ্ঞেস করলো,
— ” প্রবলেম কি তোমার? এভাবে দরজা বন্ধ করে কি প্রমাণ করতে চাইছো? টেল মি? ”
আভা কিচ্ছু বললো না। বরং, ব্যান্ডেজকৃত পা এক হাত দিয়ে ধরে বিছানায় এসে বসলো। আহনাফ আভার পিছু পিছু বিছানায় বসলো। বেশ কিছুসময় দুজনের মধ্যে চললো, নীরব খেলা! একসময় আহনাফ নীরবতা ভাঙতে যাবে তার আগেই আভা ভেজা কণ্ঠে বলে উঠলো,
— ” আমি হেরে গেছি, আহনাফ! পারি নি আমি। আমি অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু, পারি নি। আমার এক্সাম ততটা খারাপ ছিলো না। কিন্তু, কেনো এমন হলো? আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। আমি চেষ্টা করেছিলাম। ”
আহনাফ আভার কথা শুনে ব্যথিত হলো। একজন স্টুডেন্টের কাছে, অ্যাডমিশন এক্সাম কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা সে বুঝে। সেক্ষেত্রে, আভার এমন করে ভেঙে পড়া যুক্তিযুক্ত! কিন্তু, একটু আগে আভা আহনাফকে নাম ধরে ডেকেছে, অন্যমনস্ক থাকায় ব্যাপারটা আহনাফ প্রায় ভুলেই গেলো। সে আলতো করে আভার হাত নিজের মুঠোয় পুড়ে নিলো। আভা এখনো নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। আহনাফ ছোট্ট করে এক শ্বাস ফেলে বললো,
— ” ভুলে যাও এসব। সরকারি মেডিক্যালে পড়তে পারো নি ত কি হলো? জীবনে একজন ভালো ডাক্তার হতে পারাটাই কি মুখ্য নয়? আর কে বলেছে, তুমি হেরে গেছো? বেসরকারি থেকে ডাক্তার হও, আর সরকারি থেকে। দিনশেষে তুমি একজন ডাক্তার। সেটাই তোমার পরিচয়। এখন এসব নিয়ে মন খারাপ করে না, লক্ষ্মীটি। ভুলে যাও এসব। ওকে? ”
আহনাফের ওমন কথা শুনে কে মন খারাপ করে থাকতে পারে? ঠিক তাই, কেউ পারে না। তেমনই, আভাও পারে নি। আহনাফের দিকে চেয়ে আভা আলতো হাসলো। তবুও, যেনো দুঃখ সারে নি তার। মনে স্পষ্ট কিছু কষ্ট, চোখে ছলছল কিছু জল! তবুও, তার মুখে স্নিগ্ধ এক হাসি। আভার হাসিটা তবুও আহনাফের ভালো লাগলো। আহনাফের বুকের উপর থেকে এবার যেনো পাথর সরে গেলো। প্রিয়তমার হাসি যেনো শুধু হাসি নয়, আস্ত এক সুঁচ। হৃদয়কে ছিঁড়ে একদম এফোর-ওফোঁড় করে দেয়।
______________________
অবশেষে, সকল হারকে উপেক্ষা করে এবার শুধু জিতের পালা! আভার বাবা আর আহনাফের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আভাকে, আহনাফদের মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করানো হলো। পড়াশোনার ফাঁদে পড়ে, এবার থেকে সপ্তাহে ছয়দিন হবে, প্রিয়তমের সঙ্গে দেখা।আভার এই হার কি অন্য এক সুখকর জিতের কারণ? আভা-আহনাফ তবে কি এখন আরো কাছাকাছি আসতে চলেছে?
#চলবে