ওয়েডিং স্টোরি পর্ব-৩৪+৩৫

0
890

#ওয়েডিং_স্টোরি
#পর্ব_৩৪
#আভা_ইসলাম_রাত্রি

সময়ের গতিধারায় কেটে গেলো আরো দু সপ্তাহ! আভার এখন পুরোটাই সুস্থ, বলা চলে। শুধু, অতিরিক্ত হাঁটা চলা করলে পায়ে সামান্য ব্যথা হয়। তবে, ব্যথাটা ক্রমশ সহনীয়!
আভার সুস্থতার উপর ভিত্তি করে মিনহাজের বিয়ের তারিখ ঠিক করা হলো, পাঁচদিন পর। মিনহাজের কথামত, ডেস্টিনেশন ওয়েডিং হবে। আসলে, এই ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ের প্ল্যানটা আভার। অনেকদিনের শখ তার, ভাইয়ের বিয়ে খুব ধুমধাম করে আয়োজিত হবে। সেজন্যেই, সবাই ব্যাগ-ট্যাক বাঁধাই করে বেরিয়ে পড়লো, কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে। সেখানে, হোটেল বুক করা হয়েছে সবার জন্যে।

আভাদের বাসার নিচে সবাই দাঁড়িয়ে আছে। সবাই একে একে গাড়িতে উঠছে। বাড়ীর পুরুষেরা, সবগুলো গাড়িতে ব্যাগপত্র রাখছে।
এবার, যাত্রা শুরু করার পালা! সব কাজিন, আর আভার বন্ধুরা একটা গাড়িতে উঠলো। একজন আরেকজনের উপর একদমই ঢলে পড়ছে। গাড়িতে বিন্দুমাত্র জায়গা নেই বসার। তবুও, তারা বসবে। যত কষ্টই হোক, সবাই একসাথে জার্নি করার মজাটাই আলাদা! আভা সব কাজ শেষ করে গাড়ির দরজা খুললো। সঙ্গেসঙ্গে গাড়ীর মধ্যে এমন গাদাগাদি অবস্থা দেখে, আভার চোখ চড়কগাছ! সাথী খিলখিলিয়ে হেসে বললো,
— ” এই আবা, তুই জিজুর গাড়িতে করে চলে যা। এখানে জায়গা নেই, দেখছিস না? ”
আভা সবার দিকে একনজর চোখ দিলো। একজনের কোলের উপর আরেকজন বসে আছে। মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে, কষ্ট হচ্ছে খুব! কিন্তু, এতেই খুশি তারা! সবার কথার ভাঁজে, গাড়ির প্রতিটা কোণা মুখরিত! আভা তবুও দাঁত খিঁচালো। বললো,
— ” আমি কেনো উনার ওর গাড়ি করে যাবো। দেখি, বের হ তুই। আমি বসবো এই গাড়িতে। বের হ! ”
আভার কথা শুনে সাথীর মুখটা চুপসে গেল। মুখখানা যদি এক বেলুন হতো, তবে চুপসানোর সেই করুন শব্দও কানে আসতো! তারা গাড়ীর ভিতর থেকে মুখ দেখালো। এবং, স্বভাবসুলভ খোঁচা মারলো,
— ” তোমারে জামাইর সাথে বসতে দিসি, তাই ভাল্লাগেনা, তাইনা? একটা থাপ্পর মারবো, শরীর গিয়ে পড়বে আহনাফ জিজুর গাড়িতে। ঢং কম করো। যাও এখন! ”
আভা তারার কথা শুনে চোখ রাঙালো। এই মেয়েটা কেনো বুঝতে পারছে না, আহনাফের সাথে আভার ঝগড়া চলছে। তাও, যেনো তেনো ঝগড়া না। একদম, জবরদস্ত ধরনের ঝগড়া। দুজনেই যেন পণ করে বসে আছে, ‘ অপরপক্ষের সাথে যেঁচে কথা বলাটা পাপ! ঘোর পাপ! ‘ আর সেই পাপকে প্রশ্রয় দিয়ে আহনাফের গাড়িতে উঠবে ও? অসম্ভব! কোনোমতেই না! আভা নাছোড়বান্দার মত বললো,
— ” এই সাথী, তুই নাম। নাহলে, আজকে আমি তোর ওই ব্রেইনলেস মাথাটা এক মাইর দিয়ে ফাটিয়ে ফেলবে। নাম তুই। ”
সাথী যেনো শুনলই না সেকথা! বরং, আভার ওমন শক্তপোক্ত ধমকিকে এককথায় হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে সিনথিয়ার সাথে কথা বলতে লাগলো। আভা আর কোনো উপায় খুঁজে পেলো না। গাড়ির দরজা ধাম করে লাগিয়ে বিড়বিড় করলো,
— ” সবকটা স্বার্থপর! ‘

অন্যান্য গাড়ি বেরিয়ে পড়েছে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে। শুধুই, আহনাফের গাড়িই বাকি আছে। আভা গটগট পা ফেলে আহনাফের গাড়িতে উঠে বসলো। দরজা ধাম করে বন্ধ করে চুপচাপ সামনে তাকিয়ে রইলো। আহনাফ আভার এমন রাগ দেখে আড়ালে মিটমিটিয়ে হাসলো। গাড়ি চালু না করে খুব রয়ে সয়ে পকেট থেকে সেন্টার ফ্রুট বের করে মুখে পুড়ল। বেশ খানিকসময় পাড় হয়ে গেলো। গাড়ি চালু করার নাম নেই, আহনাফের। আভা একসময় বিরক্ত হলো। সেই বিরক্ত যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালো, তখন আভা আহনাফের দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বললো,
— ” গাড়িতে ঘুমানোর ইচ্ছা আছে? ”
আহনাফ মাথা নাড়ালো। যার অর্থ, না! আভা কণ্ঠে রাগের আভাস নিয়ে বলে উঠলো,
— ” তো গাড়ি চালাচ্ছেন না কেনো? ”
আহনাফ বাঁকা হাসলো। যা দেখে আভার রাগে শরীর জ্বলে অঙ্গার হলো। এই ছেলে নির্ঘাত মাথায় কোনো বদ বুদ্ধি আঁটছে! আহনাফের বাঁকা হাসি মানেই, আস্ত এক বদ বুদ্ধির কারণ! আভা আর কিছু বলবে তার আগেই আহনাফ গাড়ি চালু করলো। আভা মুখের কথা গলাধঃকরণ করে জানালার দিকে মুখ করে বসে রইল চুপচাপ।
গাড়ি শহর ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। আভা মোবাইল থেকে গান ছেড়ে কানে হেডফোন গুঁজে দিলো। এবার শান্তি!
হঠাৎ গাড়ির স্পিড বাড়তে লাগলো! ধীরে ধীরে গাড়ীর স্পিড একশো ক্রস করলো। আভা গানের জগৎ ছেড়ে বাইরে তাকালো। ইয়া আল্লাহ! এত স্পিড! মুহুর্তের মধ্যে যেকোনো অ্যাক্সিডেন্ট হতে পারে! আভা পাশ ফিরলো। আহনাফ একহাত দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে, অপরহাত দিয়ে মাথার চুল ঠিক করছে। তার চোখ-মুখ অত্যন্ত স্বাভাবিক। আভা আহনাফের ওমন বেপরোয়া ভাব দেখে আর চুপ থাকতে পারলো না। দাঁত খিঁচিয়ে বলে উঠলো,
— ” গাড়ীর স্পিড কমান। ”
আহনাফ স্পিড কমালো না। বরং, তার উল্টোটা করলো। স্পিড বাড়িয়ে আরামসে মুখের সেন্টার ফ্রুট চিবুতে লাগলো। গাড়ীর এহেন স্পিড দেখে, আভার ভয়ে আত্মা লাফাচ্ছে। যেখানে, গাড়ীর স্পিড আশি ক্রস করলেই আভা ভয়ে জান শুকিয়ে যায়, সেখানে এই মুহূর্তে স্পিড একশো দশের উপরে। আভা ভয়ার্ত চোখে আহনাফের দিকে তাকালো। বললো,
— ” পাগল হয়ে গেছেন আপনি? গাড়ীর স্পিড কমান। আমার ভয় করছে। প্লিজ, স্পিড কমান। ”
আহনাফের চোখে কোনো ভয়-ডর নেই। সে নিতান্তই স্বাভাবিক ভাবে গাড়ী চালাচ্ছে। আভা পুনরায় একই কথা বললে আহনাফ এক অদ্ভুত কথা বলে বসে,
— ” স্পিড কমাবো এক শর্তে! ”
আভা কোনো দিগ্বিদিক চিন্তা করার অবকাশ পেলো না। উদ্ভান্তের মত বলে উঠলো,
— ” বলুন, বলুন কি শর্ত! আমি সব শর্ত মানবো। সব! ”
— ” বলো, আভা একটা নির্বোধ মেয়ে। তার নির্বুদ্ধিতার কারণে, আহনাফ কষ্ট পাচ্ছে। দি নির্বোধ বালিকা আভার উচিত, তার সব দোষ স্বীকার করে, সব রাগ ভুলে, আবারও আহনাফের সাথে কথা বলা। বলো এখন! ”
আহনাফের কথা শুনে আভার প্রচন্ড রাগ লাগলো। কি সাংঘাতিক লোক! আভা মুখ ফুলালো। বললো,
— ” কক্ষণো বলবো না। আপনি দোষ করেছেন তাই আমি রাগ করেছি। সো, আমি এসব বলবো না। ”
— ” ওকে, ফাইন! ”
আহনাফ ভাবলেশহীন ভাবে কথাটা বলেই গাড়ীর স্পিড বাড়াতে শুরু করলো। আভা পড়লো মহাফ্যাসাদে! এই ছেলে এত শেয়ানা কেনো? কখনই, নিজের দোষ স্বীকার করবে না। আর আভা যখন রাগ করে, তখন তো আরো না। বরং, সব দোষ আভার ঘাড়ে চেপে, নিজেকে মহান সাজিয়ে, কতশত অদ্ভুত উপায়ে আভার রাগ ভাঙাবে! এবারও তাই হলো। কিন্তু, আভা এবার কিছুতেই নিজের দোষ স্বীকার করবে না। বারবার, ও আহনাফের কাছে হেরে যাবে না। কিছুতেই না।
কিন্তু, আভার এই ভয়ঙ্কর পণ বেশিক্ষণ টিকলো না। বরং, আভার ভয়ার্ত মন সেসব পণকে জলাঞ্জলি দিলো। আভা জানালার দিকে তাকালো। আহনাফের গাড়ি বারবার ওভারটেক করছে। নিঃসন্দেহে, পরিস্হিতি ভয়াবহ! আর আভা ভয়ও পাচ্ছে। আভা একসময় চোখ খিঁচে একদমে বলে ফেললো,
— ” আভা একটা নির্বোধ মেয়ে। তার নির্বুদ্ধিতার কারণে আহনাফ কষ্ট পাচ্ছে। দি নির্বোধ বালিকা আভার উচিৎ, সব দোষ স্বীকার করে, সব রাগ ভুলে আবার আহনাফের সাথে কথা বলা। বলে দিয়েছি? এবার হয়েছে, শান্তি? এখন তো গাড়ির স্পিড কমান। প্লিজ! ”
আহনাফ বাঁকা হাসলো। ধীরে ধীরে গাড়ীর স্পিড কমে এলো।এবার, আভার প্রাণে যেনো পানি এলো। আভা সিটে হেলান দিয়ে লম্বা, লম্বা নিঃশ্বাস নিতে লাগলো। আহনাফ তা দেখে হাসলো শুধু। গাড়ির সামনে থেকে একটা পানির বোতল নিয়ে আভার দিকে এগিয়ে দিলো। আভা বোতল দেখে চক্ষে স্ফুলিঙ্গ নিয়ে আহনাফের দিকে তাকালো। আহনাফ বরাবরের মতন, ভাবলেশহীনভাবে বললো,
— ” শ্বাস নিতে নিতে ক্লান্ত হয়ে গেছো। পানি খাও। ঠিক হয়ে যাবে। ”
আভা পানি নিলো না। বরং, ত্যাড়াভাবে বলে উঠলো,
— ” আপনি জানেন, আপনি একজন প্রচন্ড খারাপ লোক? ”
আহনাফ হাসলো। আভার কোলে পানির বোতল রেখে দিয়ে বললো,
— ” আর তুমি সেই খারাপ লোককেই ভালোবাসো, মিস বউফ্রেন্ড! ”
আভা স্তব্ধ হয়ে গেলো। কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বের হলো, অজস্র! আভা তো কখনো বলেনি আহনাফকে নিজের অনুভূতির কথা! তাহলে,আহনাফ তা জানলেন কি করে? তবে কি আহনাফ অন্তর্যামী?
— ” প্রেমিকার মন পড়তে পারে না যে ছেলে, সে আবার কিসের প্রেমিক? ”
পাশ থেকে আহনাফ বলে উঠলো। আভা চুপ হয়ে গেলো। ঠোঁটের কোনে ফুটলো গোলাপের ন্যায় এক হাসি! ইশ! কি সুন্দর সে হাসি! আহনাফ তো পাগল হয়ে গেলো! এক ভয়ঙ্কর সর্বনাশ ডেকে আনলো আহনাফের বুকে!

#চলবে

#ওয়েডিং_স্টোরি
#পর্ব_৩৫
#আভা_ইসলাম_রাত্রি

আজ রঙ খেলা হবে। রঙ-বেরঙে সেজে উঠবে বিয়ের বাড়ির প্রতিটা সদস্য। হোটেলের রুফটপে বিশাল তোড়জোড় চলছে। ছাদের একপাশে সারি বেধে রাখা হয়েছে, লাল, নীল, হলুদ, গোলাপী রং! অন্যপাশে একটা ফুলে ফুলে সাজানো সাদা রঙের দোলনা! যেখানে মিনহাজ আর আরোহীর রঙ মেখে বসবে। ফটোশট হবে। ছাদের আনাচে কানাচে গোলাপ ফুলের পাঁপড়ি ছড়িয়ে রাখা। একপাশে, ডেকোরেশন করা সেলফি স্টেজ! সর্বপরি, মারাত্মক আয়োজন বলা চলে। কিন্তু, এসবের মধ্যে আভা কোথায়? উত্তর হলো, আভা ঘুমিয়ে আছে। নিজের জন্যে বরাদ্দকৃত রুম লক করে শুয়ে আছে। সবাই ছাদে বসে আড্ডা দিচ্ছে। মাঝেমধ্যে একে অপরের দিকে রঙ ছুঁড়াছুঁড়ি করছে। হঠাৎ, তারার বোধ হলো, আভা কই? তারা চারপাশে চোখ বুলালো। নাহ, আভা তো নেই! তারা সাথীকে জিজ্ঞেস করলো,
— ” সাথী, আভা কোথায়? ”
সাথী ফুলের মালা বানাচ্ছিল। সুতোতে একে একে ফুল পুড়তে পুড়তে সাথী উত্তর করলো,
— ” আবা? ও তো ঘুমাচ্ছে। ”
তারা বিরক্ত হলো, বটে। আজ এত মজা হচ্ছে আর এই আভার বাচ্চা আভা ঘুমাচ্ছে। মাইর দেওয়া উচিৎ একে। তারা কোলের উপর থেকে সব ফুল মাটিতে ফেলে উঠে দাঁড়ালো। সিনথিয়াদের দিকে তাকিয়ে বললো,
— ” তোরা মালা বানা। আমি আসছি। ”
— ” কই যাস? ”
সিনথিয়া প্রশ্ন করলো,
— ” কুত্তারে ডাকতে। ওর মরার মত ঘুমানো বের করছি আমি। ওয়েট! ”
তারা চলে গেলো।
তারা আভার রুমে কয়েকবার বেল বাজালো। কিন্তু, ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই। তারা ডাকও দিলো দুবার। কিন্তু, নিরুত্তর আভা। একসময় তারা হাল ছেড়ে দরজায় লাথি দিয়ে আবার ছাদে চলে এলো।
তারাকে একা ফিরে আসতে দেখে, বাকি সবাই একটু অবাক হলো। তাহমিদ জিজ্ঞেস করলো,
— ” আভা আসেনি? ”
তারা ধাম করে বসে পড়লো। হাতে একটা ফুল নিয়ে অযথাই তার সকল পাঁপড়ি ছিঁড়ে হাত দিয়ে উড়িয়ে দিলো। কন্ঠে তেজ নিয়ে বললো,
— ” না। দরজাই খুললো না। বিরক্তিকর! ”
আবারো সবাই কাজে মন দিলো। আজকে প্রায় দশটা মালা বানাতে হবে। দুটো কনে আর বরের জন্যে। বাকিগুলো আভারা একে একে গলায় দিয়ে ছবি তুলবে। শুধু, বাড়তি মজার উদ্দেশ্যে!
হঠাৎ, তারার চোখ গেলো ছাদের একপাশে আহনাফের দিকে। আহনাফ একজন স্টাফকে দোলনায় কি করবে, কি করবে না সেটা বুঝাচ্ছে। তারার মুখে এবার হাসি ফুটলো। তারা এক মুহুর্তে দাঁড়িয়ে গেলো। তারপর, এক দৌঁড়ে চলে গেলো আহনাফের কাছে।

–” জিজু, জিজু! ”
পাশ থেকে হাপাতে হাপাতে বললো তারা। আহনাফ তারার দিকে তাকালো। চোখের ইশারায় স্টাফকে বিদায় দিয়ে তারার মুখোমুখিও হলো। ডান ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
— ” কিছু বলবে, শালিকা? ”
তারা তাকালো আহনাফের দিকে। নিজের দু গাল ফুলিয়ে অভিযোগ করলো,
— ” আভা ঘুমাচ্ছে! ”
আহনাফ শুনলো। তবে, বুঝল না কিছু। ডান ভ্রু আগের ছেড়ে আরো একটু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
— ” তো? ঘুমাচ্ছে, ঘুমাক! ”
— ” আরে জিজু, আপনি বুঝছেন না। আরেকটু পরই রঙ খেলা শুরু হবে। আমাদের হাতে বেশি সময় নেই। আভা ঘুম থেকে উঠবে কখন, আর রঙ খেলবেই বা কখন? আমাদের রঙ খেলা তো মাঠে মারা পড়বে তখন। বুঝতে পারছেন, আমি কি বলছি! ”
তারার মুখখানা ছোট হয়ে এটুকু হয়ে গেলো। চোখে কি নিদারুণ অসহায়ত্ব! যেন, আজ আভাকে ঘুম থেকে তোলাই তার একমাত্র ধর্ম। যে ধর্ম পালন না করলে ঘোর অনর্থ হয়ে যাবে। আর সেটা তারা কিছুতেই হতে দিবে না। এটা যেনো তার সংকল্প! আহনাফ তারার এমন অবস্থা দেখে হাসলো। ঠোঁট টিপে বললো,
— ” জ্বী, বুঝতে পারছি তোমার অবস্থা। আচ্ছা, যাও। আমি দেখছি। নো টেনসন! ”
তারার মুখে এবার হাসি ফুটলো। আহনাফের দিকে তাকিয়ে প্রায় লাফিয়েই বলে উঠলো,
— ” থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ! ”
তারা চলে গেলো। আহনাফ ফুস করে এক নিঃশ্বাস ফেলে এবার পা বাড়ালো রিসিপশনের দিকে।
_____________________
আজ গরম পড়েছে খুব। রোদও উঠেছে! কিন্তু, সবচেয়ে বিরক্ত লাগে তখন, যখন রোদের হলদে আলো একদম মুখের চারপাশে লুটোপুটি খায়। তেমনি, আভা। ঘুমাচ্ছিল কি শান্তিমতে। কিন্তু, শান্তির মায়ের শুরু হলো অশান্তি! তাই, রোদ দিয়ে জ্বালিয়ে আভার ঘুম ভাঙিয়ে দিলো। আভা মিটিমিটিয়ে তাকালো। কিন্তু, ওর দম বন্ধ লাগছে কেন? শ্বাস নিতে পারছে না। তবে কি, আভা মারা যাচ্ছে? মৃত্যুর কথা মাথায় আসতেই আভা তুমুল ভয় পেলো। তৎক্ষণাৎ মস্তিষ্কে চাপ দিতে লাগলো। ঘুমের ছোঁয়া কাটতে লাগলো, শরীর থেকে। আভার মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে সক্রিয় হতে লাগলো। চোখ খুলেই দেখলো, আভার পেটের উপর কারো হাত। হাত’টাকে একটু ভালো করে লক্ষ্য করলো আভা। লোমশ, পুরুষালি এক হাত। আভা ভয় পেয়ে গেলো।
‘ আল্লাহ!! ‘ বলে এক চিৎকার করে বড়বড় চোখ দিয়ে পাশে তাকালো। পাশের মানুষটিকে দেখে আভার ভয় পাওয়া চোখ শীতল হলো। বরং, সেই চোখে ভর করলো রাজ্যের বিরক্তি! আহনাফ আভাকে দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে চোখ বুজে আছে। উনি কখন এলেন? দরজা তো লক করা। তবে? আভা আহনাফের থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো। তবে, পারলো না। বরং, আহনাফ আরো শক্ত করে আভাকে জড়িয়ে ধরলো। আভার মনে হচ্ছে, আর একটু হলেই সে আহনাফের বুকের ভিতরে ঢুকে যাবে। আহনাফের ভারে পিষ্ট হয়ে যাচ্ছে ও। এসবের কোনো মানে হয়? কেউ দেখলে কি ভাববে? ছিঃ! আভা এবার আহনাফের কানের কাছে চিৎকার করলো,
— ” ছাড়ুন আমায়। শুনছেন, ছাড়ুন। ”
আহনাফ ভ্রু কুঁচকে ফেললো। এক সমুদ্র বিরক্তি নিয়ে চোখ খুলে তাকালো। তার চোখের আকৃতি দেখেই মনে হচ্ছে, চোখ মেলে তাকাতে যেনো তার বিরাট আলসেমি! আভা ভ্রু কুঁচকে রাগ নিয়ে বললো,
— ” এটা কি ধরনের অসভ্যতা! আপনি আমার রুমে, আমার বিছানায় কিকরে এলেন? দরজা ত লক করা ছিলো! ”
আহনাফ আভাকে একহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরা অবস্থায় অন্য হাতে দিয়ে পকেট থেকে চাবি বের করলো। আভার চোখের সামনে চাবিটা ঝুঁলিয়ে বাঁকা হেসে বললো,.
— ” ডুপ্লিকেট চাবি! ইউ নো হোয়াট, বুদ্ধি থাকলে উপায়ের অভাব হয়না! কিন্তু আফসোস! তোমার মাথায় সেটা নেই। সো..! ”
আভা চোখ সরু করে আহনাফের দিকে তাকালো। ঝগড়া করার মতো মুড তার নেই। তাই ও ছটফট করে বললো,
— ” হ্যাঁ, আমি জানি আপনি অনেক বুদ্ধিমান। মিস্টার ইন্টেলিজেন্ট, এবার আমাকে ছাড়ুন। আপনি রুম থেকে বের হন। কেউ দেখে নিলে খারাপ ভাববে। সো, গো! ”
আহনাফ হাসলো। আভার দিকে খানিক ঝুঁকে এসে শান্ত সুরে জিজ্ঞেস করলো,
— ” কেউ দেখলে কি ভাববে? ”
আহনাফের ওমন ফিসফিসানি আওয়াজ শুনে আভার শিরদাঁড়া কেঁপে উঠলো। ঘন ঘন চোখের পল্লব ফেললো ও। বললো,
— ” আ.আপনি একটু দ.দূরে স.সরুন। ”
আভার কণ্ঠ তিরতির করে কাঁপছে। একটা শব্দ আরেকটা শব্দের সাথে মিশে নতুন এক ছন্দ তৈরি করছে। আহনাফ আভার দিকে আরও একটু ঘন হয়ে পুনরায় ফিসফিসালো,
— ” বলো..! কেউ দেখলে কি ভাববে? ”
আভার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেছে। আহনাফের ফিসফিস আওয়াজ তার বুকের ভিতরে ঝড় তুলছে। মনে হচ্ছে, আর কিছুক্ষণ আহনাফ এমন করলে আভা নির্ঘাত মারা যাবে আভা তাকালো আহনাফের দিকে। স্থির চোখে তাকিয়ে ঠোঁট নাড়ালো,
— ” ভাববে…ভাববে, আমরা…আমরা..”
আভা হঠাৎ আহনাফের বুকে ধাক্কা দিয়ে আহনাফকে নিজের উপর থেকে সরিয়ে পাশে ফেলে দিলো। আচমকা আভার এমন ধাক্কায় আহনাফের কিছুটা সময় লাগলো নিজেকে সামলাতে। ততক্ষণে, আভা বিছানা ছেড়েছে। ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে পিছন ফিরে একবার বললো,
— ” মানুষের ভাবার দিন শেষ, নারীশক্তির বাংলাদেশ! ”
আভা হেসে ওয়াশরুমে চলে গেলো। আহনাফ হতভম্ভ চোখে ওয়াশরুমের দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। এই মেয়েটা এত ফাজিল কেনো? আহনাফ উঠে দাঁড়ালো। বিছানা, রুম গুছিয়ে আভার উদ্দেশ্যে একটা চিরকুট লিখলো। তারপর, ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে দরজা লক করে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে।

#চলবে