কাব্যের আঁধার পর্ব-০৬

0
836

#কাব্যের_আঁধার
#লেখনীতে: আঁধার চৌধুরী বর্ষা
#পর্ব-৬ ( অন্তিম পর্ব )

কাব্য, ভালো তো তোমাকে আমি বাসি।কিন্তু এই দুনিয়া যে বড়ই স্বার্থপর, তুমি যদি নিজের পায়ে না দাড়াও তাহলে যে কেউ তোমায় মূল্য দিবে না।আর তোমাকে নিজের পায়ে দাঁড় করানোর জন্য যদি আমাকে এই দেশ ছাড়তে হয় তাহলে আমি তাই করবো।ভালো আমি তোমাকে সেই ছোটো থেকে বাসি যখন তোমায় প্রথম আশ্রমে দেখেছিলাম।তোমার রূপ কোনদিনই আমার নজরে খারাপ লাগেনি কারণ ভালো আমি তোমাকে বেসেছি তোমার রূপকে নয়। এত বড় একটা ছেলে হয়েও তোমার মত পিচ্চি বাচ্চাকে ভালোবেসেছি আর এটার জন্যই খুব কষ্টও হয়েছে।কিন্তু কি করব বল?? ভালবাসাত ভালোবাসা,সেটাকে তো আর বদলানো যায় না আমার মনে তোমার প্রতি ভালোবাসাও বদলাতে পারেনি। অনেক চেষ্টা করেছিলাম তোমাকে আমার মন থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার কিন্তু পারিনি।
তুমি জানো আমার লাইফে সবচেয়ে সুন্দর দিন কোনটা?? যেদিন আমার তোমার সঙ্গে বিয়ে হয়। সেদিন সুন্দর দিন ছিল বটে তবে কষ্টের দিনও ছিল কারণ আমি চাইনি তোমায় এই বয়সে বিয়ে করতে। বিয়ে করার জন্য তোমার বয়সটা যথেষ্ট নয় তাই চাইনি তোমায় অল্প বয়সে বিয়ে করতে।মা বাবাকে অনেক বুঝিয়েছিলাম যে এই বয়সে তোমার মত ছোট্ট মেয়েকে আমি বিয়ে করবো না কিন্তু পারলাম না, শুনেনি কারণ তারা চেয়েছিল তাদের মেয়েকে বাড়ির বউ করে একবারে নিয়ে আসতে কিন্তু আমি এটা চাই নি বলো। আমি চেয়েছিলাম তুমি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে নিজের যোগ্যতা সবাইকে দেখিয়ে দিতে পারো।

বিশ্বাস করো বিয়ের দিন রাত্রে যখন তোমায় মেরে ছিলাম তখন মনের ভেতরটা ছারখার হয়ে যাচ্ছিল। নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছা করছিল কিন্তু কি করবো বলো পারিনি সেটা করতে। তোমাকে যখন এই হাতটা দিয়ে থাপ্পর মেরে ছিলাম তখন এই হাতকে গুরিয়ে দিতে ইচ্ছে করছিল কিন্তু পারিনি তা করতে। কারণ একটাই তুমি যথেষ্ট বুদ্ধিমতি মেয়ে আমি যদি নিজেকে কিছু করতাম তাহলে তুমি ঠিকই সন্দেহ করতে। আর আমি চাই না তুমি এখনই কিছু জেনে যাও। আমি চাইনা এই অল্প বয়সে ভালবাসার মত অনুভূতি পেয়ে তুমি নিজে একটা ক্যারিয়ার টাকে নষ্ট করো। তাই জন্য হয়তো আমি তোমায় ছেড়ে চলে যাব। হয়তো কি বলছি চলে যাব কিন্তু চলে গিয়েও তোমার কাছে থেকে যাবো।

নিজের ভালোবাসাকে কি কখনো ছেড়ে যাওয়া যায় আদৌ?? আমিও পারবো না তোমার ভালোবাসাকে ছেড়ে যেতে কিন্তু আমাকে যে যেতেই হবে। আমি চলে যাব ঠিকই কিন্তু আবার ফিরে আসবো ততদিনে হয়তো তুমি অনেক বড় হয়ে যাবে অনেকটা বুঝতে শিখে যাবে তবুও আমার পিচ্চির জন্য ফিরে আসবো। সেই পিচ্চি যাকে ভালোবেসে আমি ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম। হয়তো আমি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তুমি আমায় ঘৃণা করবে কিন্তু ফিরে এসে আবার তোমার মনে আমার প্রতি ভালোবাসা জাগাবো। আর এটা কাব্য আহমেদ খানের প্রতিজ্ঞা রইলো তোমার কাছে।আমি চলে যাওয়ার পর যদি তুমি আমার জায়গা অন্য কাউকে দাও তাও আমি ফিরে এসে নিজের জায়গা ফিরিয়ে নিবো।আর আমার বিশ্বাস তুমি আমার জায়গা কাউকে দেবে না কারণ তুমিও যে আমাকে ভালোবাসো সেটা আমি বুঝতে পেরেছি।

লোকে বলে বিয়েটা মেয়েদের জন্য অনেক বড় একটা জিনিস তাই হয়তো বিয়ের একদিন হওয়ার পর পরই তুমি আমায় ভালবেসে ফেলেছ এজন্য আমার দেওয়া আঘাত গুলো আড়ালে কষ্ট দেয় তোমায়। কিন্তু আমি যে নিরুপায়। তবে তুমি একটু বড় হলে আমাকে আর এই কষ্ট গুলো তোমায় দিতে হবে না কারণ তখন তুমি নিজের ভালো-মন্দ বুঝতে শিখবে। আমি চলে যাওয়ার পর তুমি যখন বড় হয়ে যাবে তখন তো আমি ঠিকই ফিরব আর ফিরে আমার বাচ্চা বউকে নিজের করে নেব। সে তুমি আমাকে যতই অপছন্দ করো, যতই ঘৃণা করো তোমাকে আমারই হতে হবে কারণ তুমি যে #কাব্যের_আঁধার।

কাব্যর হুস ফিরে শমসের এর কথায়। শমসের বলে,
শমসের, অ্যাকসিডেন্ট হলো কিভাবে?? আর তুই আমাদের আগে বলিস নি কেন??

নাদিরা, এই কাব্য আমার মেয়েটা ঠিক হয়ে যাবে তো?? বল না বাবা।

কাব্য, আরে মা এত চিন্তা করার কিছু নেই। জাস্ট একটা মাইনর ইনজুরি হয়েছে। ডক্টর বলেছে সাতদিন বেড রেস্ট নিতে আর stress-free রাখতে। আর বলেছে কয়েকদিন বেড থেকে নামতেই না।

নাদিরা, সেতো আমি এমনিতেও ওকে নামতে দিবো না।কিন্তু ও ঠিক হয়ে যাবে তো?? কোন সিরিয়াস কিছু হয়নি তো??

কাব্য, আরে না না কোন সিরিয়াস কিছু হয়নি। আর হ্যাঁ তোমরা তো এখন চলে এসেছ কাছে থাকো আমাকে আবার চলে যেতে হবে আজ আমার ফ্লাইট আছে না।
নাদিরা, তুই কত পাষাণ রে?? মেয়েটার এই অবস্থা তোকে বাঁচাতে গিয়ে আর তোর কোনো মায়া নেই।তুই ওকে এই অবস্থায় ফেলে যাচ্ছিস।

কাব্য, তো আমি কী বলেছিলাম এসো আঁধার এসো আমাকে বাঁচাও তাহলে ও আমাকে বাচাল তাতে আমার কি?? আমি কি একবারও ওর পায়ে পড়েছিলাম যে বাঁচাও বাঁচাও কই নাতো?? আমার তো সেরকম কিছু মনে পড়ছে। তাহলে আমাকে বাঁচাতে গিয়ে ওর কি হল না হল তার দায়ভার কি আমি নিব। সেরকম যদি তুমি ভেবে থাকো তাহলে মা তুমি ভুল ভাবছো কারণ আমি কিন্তু আঁধারকে নিজের বউ হিসেবে মেনে নেয়নি।

শমসের, ওকে যেতে দাও নাদিরা। ওর মত একটা কুলাঙ্গার ছেলের আমার কোন দরকার নেই। ওর মত অপদার্থ কে যে কি করে জন্ম দিয়েছি আমি সেটাই ভাবছি। তুই যা বাবা তুই যা তোকে আর দেখতে চাই না আমি। তুই চলে যাওয়ার পর আমি আঁধারের জীবন নতুন করে শুরু করতে বলবো তোকে ওর জীবনে কোন দরকার নেই।

শমসের এর কথা শুনে কাব্য আকাশ থেকে পড়ে কিন্তু নিজেকে যতটা সম্ভব সামলে রেখে বলে,
কাব্য, তোমার যা ইচ্ছা তুমি করো। এই মেয়েটা নিজের জীবন কিভাবে শুরু করলো কি না করলো তাতে আমার কিছু যায় আসে না আমি গেলাম এই বলেই কাব্য বেরিয়ে যায়।

বেরিয়ে গিয়ে দরজার আড়ালে দাড়িয়ে ঘুমন্ত আঁধারকে দেখতে থাকে।চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রুবিন্দু,

বায়ুবীয় প্রেম
আকাশ পাতাল সমতল,
বাস্তবতায় খাবী খায় শুধু
হারায় না তার মনোবল।
তোমাকে ছোঁয়ার নেইতো আমার সাধ্য
দেখতে পাওয়া সেই তো বড় ভাগ্য,
মনটা অবাধ্য, হচ্ছে প্রায়শ
কষ্টের বোঝা বেড়েই, যাচ্ছে ক্রমশ।
ঘুম চলে যায়
তোমার চোখে বেড়াতে,
পারিনা তাকে কোন ভাবে ফেরাতে।।

কাব্য চোখের পানি মুছে ওখান থেকে চলে যায়। চলে যায় বহুদূর যেখানে কেউ পাবে না তাকে খুজে। হয়তো বা পেলেও চিনবে না।নিজের ভালোবাসার মানুষকে ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট একমাত্র তারাই জানে যারা তাদের ছেরে যায়।

আমি পারিনি তোমাকে
আপন করে রাখতে
আমি পারিনি তোমাকে
আবার আমার করে রাখতে
তুমি বুঝোনি, আমি বলিনি
তুমি স্বপ্নতে কেন আসোনি
আমার অভিমান তোমাকে নিয়ে
সব গেয়েছি…..

কিছুক্ষণ বাদে আঁধার চোখ খুলে। ধীরে ধীরে তার দৃষ্টিকোণ সহজ হয়। পাশেই দেখতে পায় নাদিরা আর শমসের কে। আঁধার ধীরে ধীরে কোনো ভাবে বলে,
আঁধার, আমি কোথায়?? উনি ঠিক আছেন তো?? উনাকে দেখতে পাচ্ছিনা??

নাদিরা কাদতে কাদতে বলে,
নাদিরা, ও যে নেই আঁধার।চলে গেছে তোকে ছেড়ে, আমাদের ছেরে।চলে গেছে ও লন্ডন।
নাদিরার কথা শুনে আঁধারের চোখ বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রুকণা বেরিয়ে আসে আর অস্ফুটে বলে উঠে,
আঁধার, যার যাওয়ার সে তো যাবেই, তাকে কি আর ধরে রাখা যায়।সবাই কে আটকানো সাজে না।
ফ্লাইটে বসে নিজের মন কে শান্তনা দিয়ে কাব্য বলে উঠে,

কাব্য, আমি ফিরবো তোমার কাছে আঁধার।আর তখন সবসময়ের মত নিজের করে নিবো তোমার সব অভিমান ভুলিয়ে দিয়ে……

( সমাপ্ত )