#কাব্যের_আঁধার_২
#লেখনীতে: আঁধার চৌধুরী বর্ষা
#পর্ব-১
সময় যেমন কারোর জন্য থেমে থাকে না তেমনি মানুষের জীবনটাও থেকে না। ব্যর্থ প্রেমিক যেমন নিজের ব্যর্থতা ভুলে আবারও এগিয়ে চলে তেমনি জীবনটাও এগিয়ে চলে নিজের গতিতে।তবে কিছু কিছু মানুষের জীবন আজও সেখানে দাঁড়িয়ে আছে যেমনটা আগে ছিল। কেটে গেছে পাঁচ পাঁচটা বছর তবে কাব্যের জীবন আজও একই জায়গায় পরে আছে।কাব্য তার জীবনে অনেক উন্নতি করেছে। আজ একজন হার্ট সার্জন হিসেবে তার খ্যাতির অন্ত নেই তবে তার আজও ধারণা যে তার আঁধার তার জন্য পথ চেয়ে বসে আছে কিন্তু সত্যি কী তাই?? আঁধার কি এখনও তার অপেক্ষায় আছে??
কলেরিজ গার্ডেনের এক আলিশান ঘরে বছর ২৮ এর এক যুবক ঘড়ি পড়তে ব্যস্ত। ছেলেটা ঘড়ি পরে আরেকবার নিজেকে আয়নায় দেখে নেয়। ছেলেটার পরণে একটা ব্রাউন লেদার জ্যাকেট সাথে গেবাডিন এর প্যান্ট আর মাথায় একটা হ্যাট সাথে হাতে মোটা গ্লাভস কারণ লন্ডনে এখন অনেক ঠান্ডা পড়েছে বছর শেষের দিকে তাই। ছেলেটার চোখে আবার চিকন ফ্রেমের চশমা। ছেলেটা নিজের ব্যাগটা কাধে নিয়ে বেরিয়ে যায়।
কলেরিজের রাস্তা পেরিয়ে গাড়ি ক্রমশ এগিয়ে চলেছে লন্ডন এয়ারপোর্টের দিকে।সময় আপন গতিতে বয়ে চলেছে। একসময় চলন্ত গাড়ি এসে থামে লন্ডন এয়ারপোর্টের সামনে।ছেলেটা গাড়ি থেকে নেমে ব্যাগ কাধে নিয়ে হাঁটা দেয় ফ্লাইটের উদ্দেশ্যে। পা ক্রমশ ধীর হয়ে আসছে।কিন্তু আজ যে তাকে চলতেই হবে সমস্ত অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে। ছেলেটা চেকিং করে ফ্লাইটে নিজের সিট খুঁজে বসে পরে। ছারে এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস যা এতক্ষণ আটকে রেখেছিল। ছেলেটা একসময় বলে উঠে,
ছেলেটা, কাব্য আহমেদ খান অবশেষে ফিরে যাচ্ছে তার আঁধার চৌধুরী বর্ষার কাছে। আঁধার তোমার কাব্য তোমার কাছে ফিরে আসছে…..
হ্যাঁ সিটে যে বসে আছে সেই কাব্য। পাঁচ বছরে অনেক উন্নতি করেছে একজন হার্ট সার্জন হিসেবে।নাম, জস, খ্যাতির কোনো অভাব নেই তবে নেই মনে শান্তি কারণ তার আঁধার যে নেই কাছে। আজ টানা পাঁচ বছর পর দেশে ফিরছে। এই পাঁচ বছরে একদিনের জন্যও দেশে ফিরেনি।তবে নাদিরা আর শমসের এর সাথে কথা হয়েছে।কিন্তু বলেনি কথা আঁধার। শমসের আর নাদিরা একবারের জন্যও বলেনি যে আঁধারের সাথে কথা বলো। আর কাব্যও কথা বাড়ায় নি কারণ সে আঁধারের ভালই চায় কিন্তু সে এটা বুঝেনি এতে যে ওর ভালোর চেয়ে খারাপ বেশি হচ্ছে।
১৪ ঘন্টা পর,
রিপোর্টার, আজ বাংলাদেশে ফিরছেন পরিচিত এক মুখ আপনাদের প্রিয় কাব্য আহমেদ খান জিনি একজন হার্ট সার্জন হিসেবে এই দুই বছরে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেছেন। আজ প্রায় টানা পাঁচ বছর পর দেশের মাটিতে পা রাখছেন কাব্য আহমেদ খান। ফিরে আসছেন তার দেশের কাছে লোকটা এই কথা বলতেই দেখতে পায় এয়ারপোর্টের এন্ট্রান্স পেরিয়ে বেরিয়ে ব্যাগ হাতে কাব্য।সব রিপোর্টাররা ছুটে যায়। রিপোর্টার প্রশ্ন করে,
রিপোর্টার, এতদিন পর দেশে ফিরে আপনার কি অনুভূতি হচ্ছে??
কাব্য,এতদিন পর দেশে ফিরল একজন সাধারণ মানুষের যেমনটা লাগার কথা আমারও ঠিক তেমনটাই লাগছে এতে আলাদা হিয়ার কিছু নেই।
রিপোর্টার, না এই দুই বছরে একজন সার্জন হিসেবে সনি যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেছেন তাই হয়তো আর পাঁচজন মানুষের থেকে আপনার অনুভূতি আলাদা হতে পারে।
কাব্য,অবশ্যই না।আর পাঁচজন যেরকম মানুষ আমিও ঠিক তেমনই মানুষ তাই আমার আলাদা কোনো অনুভূতি হচ্ছে না। আপনাদের কি আর কোনো প্রশ্ন আছে??
রিপোর্টার, জি জী আসলে আমরা এটা জানতে চাচ্ছিলাম যে আপনি কি এখনই সিঙ্গেল মানে আপনি কি কোনো রিলেশনে আছেন??.
কাব্য, জী না আমি রিলেশনে গেলে আমার বৌ আমাকে মারবে তাই আমি রিলেশনে যাওয়ার চেষ্টাও করিনি কারণ বউয়ের হাতের ঝাঁটার বারি খাওয়ার ইচ্ছা আমার নেই। তাছাড়াও আমার বউকে আমি যথেষ্ট ভালোবাসি তাই কখনো প্রয়োজন পরে নি রিলেশনে যাওয়ার।
কাব্যর কথা শুনে রিপোর্টার ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় আর বলে,
রিপোর্টার, আপনার বউ মানে?? আপনি কি বিয়ে করেছেন নাকি?? আগে তো কখনো আপনার বিয়ের কথা শুনিনি?? নাকি আপনি রিসেন্টলি বিয়ে করেছেন?? নাকি আপনি আপনাদের বিয়ে কথা লুকিয়ে রেখেছেন??
কাব্য, অদ্ভুত ব্যাপার তো আমার বিয়ের কথা আমি লুকাবো কেন?? আমি বিয়ে করেছি এটাই সত্যি। আর আমি রিসেন্টলি বিয়ে করিনি আমার বিয়ে হয়েছে 5 বছর আগে তার মানে আমার বিয়ের অলরেডি পাঁচ বছর হয়ে গেছে। আর আমি আপনাদের কাছ থেকে কিছুই লুকোয়নি। আমার পার্সোনাল ইনফর্মেশন দেখলে আপনারা পেয়ে যাবেন যে আমি বিবাহিত। আর কাব্য আহমেদ খান কাউকে উত্তর দিতে বাধ্য নই। হয়েছে আপনাদের সময় শেষ এখন আমার যেতে হবে অনেকদিন পর দেশে ফিরেছি কে আপনাদের কথা শোনার জন্য?
কাব্যর বিয়ের কথা সাথে সাথে আগুনের মত ছড়িয়ে যায় পুরো বাংলাদেশ কারণ অনেকেই জাতির ক্রাশ বলে মানে আর তার কারণও আছে। কাব্য দেখতে শুনতে যথেষ্ট হ্যান্ডসাম। একজন পুরুষ হিসেবে কাব্য প্রত্যেকটা মেয়ের স্বপ্নের রাজকুমার কারণ সে সব দিক থেকেই যথেষ্ঠ নম্র ভদ্র এক ধরনের মানুষ।
কাব্য রিপোর্টারদের ডিঙিয়ে নিজের গাড়ির কাছে এসে দাঁড়ায় কিন্তু রিপোর্টাররা ওকে আরও প্রশ্ন করবে সেই ভয়ে কাব্য তারাতারি করে গাড়িতে উঠে বসে আর স্টার্ট দিয়ে এয়ারপোর্ট ত্যাগ করে।
গাড়ি এগিয়ে চলেছে নিজের আপন গতিতে। আজ কেউ যেন হার মানছেনা।সময় ক্রমশ বয়ে যাচ্ছে কিন্তু অপেক্ষার প্রহর শেষ হচ্ছে না। কাব্য যে আর অপেক্ষা করতে পারছে না।
খান বাড়িতে,
একটা মেয়ে তারস্বরে চেঁচিয়ে চলেছে কারণ সে তার পরনের ঘড়ি খুঁজে পাচ্ছে না।
মেয়েটা, মা…. ও….. মা….. খুঁজে দাওনা…… পাচ্ছি নাতো।
ততক্ষণে মাঝ বয়সী এক মহিলা হাতে খুন্তি নিয়ে এসে হাজির হয় ঘরে আর গলা চরিয়ে বলে,
মহিলা,এই আঁধার তুই তো ঘরের সব কাজ নিজে করতে পারিস তাহলে নিজের জিনিস গুলো কেন খুঁজে বের করতে পারিস না?? সব কাজ করার ক্ষমতা আছে কিন্তু নিজের জিনিস খুঁজে বের করার টাইমে আন্ডা নাকি???
আঁধার, ও মা খুঁজে দাও না পাচ্ছি না তো খুঁজে। তুমি বলো আমি না পেলে কি করব? আমার না খুব দেরি হয়ে যাচ্ছে আজ,তাড়াতাড়ি করো না প্লিজ। কালকে থেকে আর জ্বালাবো না প্লিজ। আর তুমি কি হ্যাঁ??
মিসেস নাদিরা রহমান হয়ে নিজের মেয়েকে একটু খুঁজে দিতে পারছনা ঘড়িটা??
নাদিরা, তবে রে, নিজের মায়ের নাম ধরে ডাকিস?? আল্লাহ কিন্তু পাপ দিবে।
আঁধার, আচ্ছা বাবা সরি আর করব না। এখন তাড়াতাড়ি ঘড়ি টা খুঁজে দাও, আমার ফেভারিট ঘড়ি কিন্তু।
নাদিরা, দিচ্ছি বাবা দিচ্ছি একটু ওয়েট কর না।
আঁধার, সেটাইতো করতে পারছিনা মা। অনেক তাড়াহুড়ো আছে। আজ কলেজে টেস্ট আছে।
মিসেস নাদিরা ততক্ষণে মেয়ের ঘড়ি খুঁজে নিয়ে সেটা আঁধারের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলেন,
নাদিরা, ঠিক আছে ঠিক আছে সব পড়ে নিয়েছিস তো?? আর একদম চিন্তা করবে না, কোন চিন্তা করার কারণ নেই বুঝলি। বেশি স্ট্রেস নিলে কিন্তু পরে লিখতে পারবে না এটা বলে দিলাম আর হ্যাঁ কাল থেকে যদি ঘড়িটা ঠিকমত না রাখে স্বামী এসে তোকে পিটিয়ে যাব আধাঘন্টা।
নাদিরার কথা শুনে আঁধার একটা হাসি দিয়ে নাদিরা কে জড়িয়ে ধরে বলে,
আঁধার, আরে মা শুধু শুধু রাগ করছ। তুমি কি ভুলে গেলে বল?? আমিতো জানি আমার ঘড়িটা কোথায় কিন্তু তোমাকে দিয়ে খুজে তোমার হাতে নিজের হাতে পরা টা আমার ভালো লাগে তাই তো রোজ তোমাকে খুঁজে দিতে বলি। আর তোমার মেয়েকে তুমি এত টুকু চিন্তে পারেনা এত বছরে??
To be continued….