Home "ধারাবাহিক গল্প "গোধূলী লগ্নে তুমি গোধূলী লগ্নে তুমি পর্ব-০৮

গোধূলী লগ্নে তুমি পর্ব-০৮

0
1

#গোধূলি_লগ্নে_তুমি
#কলমে_ফাহিমা_ইসলাম
#পর্ব_৮

[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ 🚫]

দিগন্তের গাঢ় নীলিমায় বিকেল ক্রমশ ঢলে পড়ছে, সময়ের স্রোত আপন গতিতে সন্ধ্যার দিকে এগিয়ে চলেছে। বাইরে থেকে এইমাত্র ফিরেছে ইনায়া। প্রচণ্ড গরমে শরীর ঘামে একাকার, ক্লান্তিতে অবসন্ন হয়ে পড়েছে প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। ঘরে ঢুকেই গা থেকে বোরখাটি খুলে ফেলল সে। অতঃপর নিস্তেজ শরীরটাকে বিছানার উপর ছেড়ে দিতেই মনে হলো, এতক্ষণ যেন কেবল এইটুকু আশ্রয়ের অপেক্ষাতেই ছিল দেহটা। নাওমি তখন পড়াশোনায় নিমগ্ন ছিল। ইনায়ার দিকে তাকাতেই মুখে হাসির রেখা ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করল-

“ আজকে এতো দেরি হলো যে? কাজ বেশি ছিল?”

ইনায়া মাথাটা সামান্য উঁচু করল। অধরকোণে ক্লান্ত অথচ স্নিগ্ধ একটুকরো হাসি ফুটে উঠল। এই তিনটি মেয়ের সঙ্গে থাকতে এখন আর তার ভেতরে আর কোনো দ্বিধা অবশিষ্ট নেই। বরং অদ্ভুত এক স্বস্তি অনুভব করে সে। অচেনা শহরে, অচেনা মানুষগুলোর ভিড়ে এই মেয়েগুলোই যেন ধীরে ধীরে তার আপন হয়ে উঠছে। নিজেদের মতো করে তার যত্ন নেয়, খেয়াল রাখে; নিঃসঙ্গতার দীর্ঘ করিডোরে তাদের উপস্থিতিই যেন খানিকটা আলো এনে দিয়েছে।

“ হুম পর পর একসঙ্গে তিনটা কাজ এসে জমা হয়েছে। একদিন গ্যাপ পর পর দিতে হবে তাই আরকি।”

নাওমি ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল। ইনায়ার শারীরিক অবস্থা তার অজানা নয়। সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা শরীর নিয়ে এভাবে অবিরাম পরিশ্রম করাটা যে মোটেই স্বাভাবিক নয়, সেটা বুঝতে তার খুব বেশি বুদ্ধির প্রয়োজন হলো না।

“ তোমায় বললাম, মেহরীন আপুর ল্যাপটপটা ইউস কর। এই শরীর নিয়ে এতো কাজ করা ঠিক না।”

ইনায়া মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। নিজের সীমাবদ্ধতাগুলো সে জানে, তবুও অন্যের উপর বোঝা হয়ে থাকতে তার মন সায় দেয় না। এমনিও ছোট থেকেই নিজেই নিজের পায়ে দাড়িয়ে কাজ করে পেট চালিয়েছে, তাই এখনোও সেটা করার মতো শ্রমশক্তি আল্লাহ তাকে দিয়েছে।

” তা কি করে হয় বল, ওরও তো অফিসের কাজ রয়েছে। তাছাড়া এবার পেমেন্ট করে দিলে একটা ল্যাপটপ কিনে নিবো। ওকে আর সমস্যা ফেলবো কেনো বল।’

কথা শেষ হওয়ার আগেই নাওমি যেন হঠাৎ কিছু মনে করে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। উৎসাহিত কণ্ঠে বলে উঠল-

“ চল কালকে শপিং এ যাই, বেবির জন্য কিছু জামা-কাপড় কেনা হবে। ওরও তো আসার সময় হয়ে আসচ্ছে।”

ইনায়ার মুখশ্রীতে মৃদু হাসি খেলে গেল। সময় যত গড়াচ্ছে, নিজের শরীরটাকে ততই ভারী ও অপরিচিত বলে মনে হচ্ছে। সাত মাসে পা দিয়েছে সে। উদর ক্রমশ স্ফীত হয়ে উঠেছে, চলাফেরায় আগের মতো স্বাচ্ছন্দ্য নেই। পায়ের পাতায় পানি জমে থাকে, রাত নামলেই শুরু হয় একরাশ যন্ত্রণা। তবুও সবকিছু নীরবে সহ্য করে নিতে হয়। এই মুহূর্তে তার সামনে আর কোনো পথও তো নেই। সে একা। নিজের সঙ্গে নিজের ভেতরে বেড়ে ওঠা ছোট্ট প্রাণটির সম্পূর্ণ দায়িত্বও এখন তারই কাঁধে। আল্ট্রাসনোগ্রামের মাধ্যমে জানা গেছে, তার সন্তান ছেলে। খবরটা জানার পর ইনায়ার মনে অদ্ভুত এক আনন্দের ঢেউ উঠেছিল। তবে ছেলে কিংবা মেয়ে, সন্তান তো সন্তানই; দুটোই আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া অপার রহমত। পেটের উপর আলতো করে হাত রেখে ইনায়া মৃদু হাসল।

“ উমম যাওয়াই যায়। ওরও কিছু কেনাকাটা করা দরকার।”

নাওমির চোখেমুখে তখন কৌতূহলের ছাপ।

“ নাম কি রাখবে সেটা ভেবেছো? ইসস আমার তো তর সইছে না ও কবে আসবে।”

ইনায়া নাওমির হাস্যোজ্জ্বল মুখশ্রী পানে তাকিয়ে ক্ষীণ হাসল। অথচ সেই হাসির আড়ালেই কোথাও যেন জমাট বেঁধে ছিল অদৃশ্য এক আতঙ্ক। সময় যত এগিয়ে আসছে, ভয়টাও তত ঘন হয়ে উঠছে। আল্লাহ না করুক, তার যদি কিছু হয়ে যায়, তবে তার বাচ্চাটার কী হবে? সবচেয়ে বড়ো সত্যিটাই তো এখনো সে কাউকে জানায়নি। ওই বাড়ির কাউকেই নয়। কেউ জানে না, ইনায়ার শরীরের ভেতরে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে আরেকটি অস্তিত্ব।

দীর্ঘ তিনটা বছরে সন্তান ধারণ করার সাহস তার হয়নি। যে সম্পর্কে ভালোবাসার অস্তিত্ব নেই, সেখানে ভালোবাসাহীন কোনো নতুন প্রাণকে পৃথিবীতে আনার ইচ্ছেটুকুও কখনো জন্ম নেয়নি তার মনে। অথচ নিয়তির লিখন বোধহয় মানুষের সমস্ত হিসাবনিকাশের ঊর্ধ্বে। হঠাৎ করেই একদিন জানতে পারল, সে সন্তানসম্ভবা। সেই মুহূর্তে যেন সমগ্র পৃথিবী থমকে গিয়েছিল তার সামনে। স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল ইনায়া। জানাবে কি জানাবে না, সেই দ্বিধার দোলাচলে কেটে যেতে লাগল একের পর এক দিন। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তাদের বিবাহবার্ষিকীতেই আয়াশসহ সবাইকে জানাবে এই সংবাদ। হয়তো সেই দিনটাই হয়ে উঠেছিল তার জীবনের নতুন কোনো অধ্যায়ের সূচনা। কিন্তু নিয়তি বোধহয় অন্য কিছু লিখে রেখেছিল। আল্লাহ হয়তো চাননি এই সংবাদটা আর কারও জানা হোক।

প্রতিবারের মতো এবারও বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে আয়াশের জন্য আয়োজন করছিল ইনায়া। বিশেষ কিছু নয়, ঘরেই আয়াশের পছন্দের সমস্ত খাবার নিজের হাতে রান্না করবে। তার পছন্দের জিনিসগুলো দিয়ে সাজাবে চারপাশ। আর নিজেকে সাজাবে সবুজে। সবুজ রংটা আয়াশের পছন্দ।
যেদিন থেকে এই কথাটা জানতে পেরেছিল, সেদিন থেকেই তার নিত্যব্যবহারের জিনিসপত্রেও সবুজ রঙের উপস্থিতি ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছিল। যেন অজান্তেই নিজের জীবনটাকে সে আয়াশের পছন্দের রঙে রাঙিয়ে তুলেছিল।
সেদিনও নিজের জন্য একটি শাড়ি কিনতেই মার্কেটে গিয়েছিল সে। পথে হঠাৎ ক্ষুধা অনুভব হওয়ায় একটা রেস্তোরাঁয় ঢুকে পড়েছিল। অথচ কে জানত, সেই সামান্য বিরতিটুকুই তার জীবনের দীর্ঘতম সিদ্ধান্তের সূচনা হয়ে দাঁড়াবে? হয়তো আল্লাহও চেয়েছিলেন, আয়াশের জীবন থেকে তার সরে আসাটাই উত্তম।

তাই হয়তো সেই রেস্তোরাঁতেই আয়াশকে দেখেছিল ইনায়া।
তার সঙ্গে ছিল একজন নারী। একেবারে সাধারণের মাঝেও যার উপস্থিতি আলাদা করে চোখে পড়ছিল। প্রিয়া। ইনায়া কোনোদিন সামনাসামনি দেখেনি তাকে। শুধু আয়াশের দেখানো একটি ছবির মাধ্যমে পরিচিত হয়েছিল সেই মুখটির সঙ্গে। জানত, এই নারীটিকে আয়াশ ভালোবাসে। ভীষণ ভালোবাসে। কিন্তু সেদিন প্রথমবার নিজের চোখে দেখেছিল সেই ভালোবাসার ছায়া। আয়াশের অধরকোণে লেপ্টে ছিল এমন এক প্রাণভোলানো হাসি, যে হাসির দর্শন ইনায়া বিগত তিন বছরেও লাভ করেনি। চোখের সামনে নিজের স্বামীকে এভাবে প্রাণ খুলে হাসতে দেখে ইনায়ার ভালো লাগার চেয়ে কষ্টই বেশি হয়েছিল। বুকের ভেতর কোথাও যেন নিঃশব্দে ভেঙে পড়েছিল কিছু একটা।

কারণ আয়াশ কোনোদিন তার সামনে এভাবে হাসেনি।
হয়তো সে আয়াশের সেই হাসির কারণ ছিল না বলেই কোনোদিন সেই হাসি দেখার সৌভাগ্য তার হয়নি। প্রিয়া নামের সেই নারীটির ভাগ্যকে মনে মনে ঈর্ষা করেছিল ইনায়া। কতটা ভাগ্যবতী হলে একজন নারীর ভালোবাসার মানুষ হতে পারে আয়াশের মতো কেউ? সে জানত, আয়াশের হৃদয়ে যে স্থানটি প্রিয়া দখল করে আছে, সেখানে নিজেকে বসানোর কোনো সম্ভাবনাই নেই তার। তবুও মানুষ বোধহয় আশার কাছে বড়ো অসহায়। ইনায়াও মিথ্যে আশার সূক্ষ্ম সুতোয় নিজেকে বেঁধে রেখেছিল। হয়তো একদিন আয়াশ তাকেও ভালোবাসবে। যেভাবে প্রিয়াকে ভালোবেসেছে। আয়াশ কোনোদিন ইনায়াকে কষ্টে রাখেনি। তার না চাওয়া গুলোও, মানুষটা সেটুকুও এনে দিত। তার বেলিফুলের মালা পছন্দ। আগে সেটা কেনার সামর্থ্য না থাকলেও ইনায়ার পছন্দের কথা জানার পর থেকে প্রতিদিন বাড়ি ফেরার পথে একটি করে বেলিফুলের মালা নিয়ে আসত আয়াশ। প্রতি সপ্তাহে কাঁচের চুড়িও এনে দিত।
ইনায়ার জ্বর হলে পাশে বসে সেবা করত। মাঝে মাঝে তাকে শাড়ি কিনে এনে দিতো নিজ পছন্দের, তারপর কপালে টিপ৷ ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই আয়াশ নতুন একটা কিনে নিঃশব্দে ডেসিংটেবিলে রেখে দিতো।

এমন যত্নশীল একজন পুরুষের ভালোবাসা কে না চাইবে?
তাই তো ধীরে ধীরে লোভী হয়ে পড়েছিল ইনায়া। যত্নগুলোকে সে দায়িত্বের সীমা পেরিয়ে ভালোবাসার দিকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। মনে হয়েছিল, হয়তো একদিন এই মানুষটির হৃদয়ে তার জন্যও কোনো অনুভূতি জন্ম নেবে।
হয়তো দায়িত্ব থেকে শুরু হওয়া এই যত্ন একদিন ভালোবাসায় রূপ নেবে। কিন্তু হায়, নিয়তি তার জন্য সেই পরিণতি লিখে রাখেনি। আয়াশকে এভাবে হাসিখুশি দেখে সেদিন ইনায়ার মনে হয়েছিল, স্ত্রী হিসেবে সে ব্যর্থ। যে নারী নিজের স্বামীর মুখে সেই অমূল্য হাসিটুকু ফুটিয়ে তুলতে পারে না, সে আবার কেমন স্ত্রী? দীর্ঘ তিন বছরের মায়া তাই এক মুহূর্তে যেন অর্থহীন হয়ে গিয়েছিল। সংসারটা তার ছিল। কিন্তু সেই সংসারের কর্তা কোনো কালেই সে ছিল না।
সে ছিল কেবল একজন সহবাসী মানুষ, একজন স্ত্রী নামের পরিচয়, আয়াশের জীবনের এমন এক অধ্যায়, যেটি হয়তো কোনোদিন মন দিয়ে পড়াই হয়নি।

ইনায়া জানত না প্রিয়া আর আয়াশের মধ্যে ঠিক কী ঘটেছিল, কী কারণে তাদের বিচ্ছেদ হয়েছিল। কিন্তু আয়াশকে সেদিন এভাবে হাসতে দেখে তার মনে হয়েছিল, এই সংসার তার নয়। কোনোদিনই ছিল না। সে শুধু একটি অধ্যায়ের পৃষ্ঠা মাত্র। যে পৃষ্ঠা আয়াশ কোনোদিন মন দিয়ে পড়েনি, অনুভব করেনি। তাই তৃতীয় বিবাহবার্ষিকীতে আয়াশকে উপহার হিসেবে মুক্তি দিয়েছিল ইনায়া। চলে এসেছিল সেই মায়ার সংসার ছেড়ে। জানানো হয়নি তাদের ভালোবাসাহীন দাম্পত্যের ভেতরে নিঃশব্দে জন্ম নেওয়া আরেকটি অস্তিত্বের কথা। আয়াশ জানতেও পারল না, তার নিজেরই একটি অংশ ইনায়ার ভেতরে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে। সবকিছু ছেড়ে চলে এসেছে সে। কেবল নিজের সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল এক অনাগত প্রাণ, আর বুকের গহিনে চাপা দিয়ে রাখা অসংখ্য না বলা কথা।

এসব ভাবতে ভাবতেই ইনায়ার চোখের পাতা ভারী হয়ে এলো। সামান্যতেই এখন শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসে অবশেষে যখন শরীরটুকু একটু আরামের আশ্রয় পেয়েছে, এখন তন্দ্রার নরম আবরণ ধীরে ধীরে তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলতে শুরু করেছে। বাইরে বিকেল আরও গাঢ় হয়ে আসছে। আর বিছানার উপর নিস্তব্ধ হয়ে শুয়ে থাকা ইনায়ার মুখশ্রীতে জমে আছে এমন এক ক্লান্ত প্রশান্তি, যার নিচে চাপা পড়ে আছে তিন বছরের মায়া, অপ্রাপ্ত ভালোবাসা আর এক অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে অগণিত অনুচ্চারিত শঙ্কা।

—–

দিবাকরের ক্লান্ত প্রহর পেরিয়ে ধরণীর বুকে ততক্ষণে রাত্রির নিবিড় আঁধার নেমে এসেছে। ব্যস্ত নগরী অবশ্য থেমে থাকার মানুষ নয়, আপন গতির অবিচ্ছিন্ন স্রোতে ছুটে চলেছে নিরন্তর। সেই কোলাহলমুখর পথের একপাশে ছোট্ট একটি ফুলের দোকান, আর ঠিক তার সম্মুখেই এসে থামলো আয়াশের গাড়িটা।প্রতিদিনের মতো আজও।
এই পথ দিয়ে ফেরার সময় দোকানটির সামনে দাঁড়ানো এখন আর নিছক অভ্যাস নয়, বরং গত তিনটি বছর ধরে তার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন কারো জন্য একগুচ্ছ বেলিফুলের মালা নিয়ে ঘরে ফেরা, এই সামান্য নিয়মটুকু আজও বদলায়নি। আয়াশ গাড়ি থেকে নামতেই দোকানদারও যেন তার আগমনের পূর্বাভাস পেয়ে যাওয়া মানুষের মতো হাসিমুখে এগিয়ে এলেন।

আয়াশের উপস্থিতি যে তার কাছে আজ আর অপরিচিত নয়। বরং মানুষটার আসার সময়টুকুও যেন মুখস্থ হয়ে গেছে। তিনি এগিয়ে এসে বললেন-

“ আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।”

কথা শেষ করেই হাতে থাকা বেলিফুলের মালাটি এগিয়ে দিলেন তিনি। একেবারে সদ্য প্রস্ফুটিত ফুলের স্নিগ্ধ সুবাসে ভরা মালা। আয়াশের নির্দেশই এমন, ফুলগুলো যেন কোনোভাবেই বাসি না হয়। তাই প্রতিদিন তার আসার পূর্বেই দোকানদার নতুন করে ফুল আনিয়ে মালাটি গেঁথে রাখেন। অন্যান্য মালার তুলনায় এটা আলাদা। কারণ এতে আয়াশের পছন্দমতো গুচ্ছ গুচ্ছ বেলিফুল জড়িয়ে থাকে, যেন প্রতিটি ফুলের পাপড়ির ভাঁজে কারো প্রতি নীরব মমতা লুকিয়ে রাখা হয়েছে। মালাটি হাতে নিয়ে আবারও বাড়ির পথে গাড়ি ছুটিয়ে দিলো আয়াশ। গত তিন মাস ধরেই তো এভাবেই চলছে।

মালা সে নিয়ে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু যাকে ঘিরে এই প্রতিদিনের আয়োজন, তার হাত পর্যন্ত আর পৌঁছে দিতে পারছে না। চোখ দুটো বন্ধ করে বুকভর্তি দীর্ঘ এক নিশ্বাস টেনে নিলো সে। পাশেই রাখা আরেকটি ছোট প্যাকেটের দিকে দৃষ্টি পড়তেই বুকের ভেতর কোথাও যেন অদৃশ্য কোনো হাহাকার নড়েচড়ে উঠলো। একজোড়া কাঁচের চুড়ি, সঙ্গে টিপের পাতা। গত তিন বছর ধরে এগুলোও সে ইনায়ার জন্যই কেনে। অথচ এই তিন মাসে প্রতিদিনের মতো কিনে নিয়ে ফিরলেও দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা সেই স্নিগ্ধ হাসিমাখা মুখটি আর দেখা হয় না। ড্রেসিং টেবিলের আরশির গায়ে যত্ন করে সাজিয়ে রাখা টিপের পাতাটিও আর কারো কপাল ছুঁয়ে সৌন্দর্য হয়ে ওঠে না। কেমন যেন প্রাণহীন হয়ে পড়েছে তার ঘর।

আগের সেই পরিচিত প্রশান্তিটুকুও আর ঘরে ফেরার পর আয়াশের হৃদয় খুঁজে পায় না। বাড়ির মানুষগুলোও যেন হঠাৎ করেই নৈঃশব্দ্যের আবরণে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে। বাবা, মা, কেউই আর আগের মতো তার সঙ্গে কথা বলেন না। একই ছাদের নিচে থেকেও মনে হয়, প্রত্যেকের মাঝখানে যেন অদৃশ্য কোনো দূরত্বের প্রাচীর দাঁড়িয়ে আছে।
আয়াশ বাড়িতে ফিরেও দরজার সামনে সেই চিরচেনা দৃশ্যটি খুঁজে পেলো না। একসময় যে নারীটি তার অপেক্ষায় লেবুজলের গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে থাকতো, আজ সেই নারীটির কোনো অস্তিত্ব নেই এই ঘরে। ইনায়ার হাতের রান্নায় অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া মানুষটি গত তিন মাসে কবে পরিপূর্ণ তৃপ্তি নিয়ে ভাত খেয়েছে, তা নিজের কাছেই মনে করতে পারছে না। ইনায়া নামের মেয়েটি চলে যাওয়ার পর যেন তার সঙ্গে তার জীবনের যাবতীয় স্বস্তিও কোথাও হারিয়ে গেছে।

ক্লান্ত, অবসন্ন দেহটি বিছানার উপর নিস্তেজভাবে এলিয়ে দিলো আয়াশ। পাশে পড়ে রইলো সদ্য কেনা জিনিসগুলো। একবারও আগ্রহ নিয়ে সেদিকে তাকালো না সে। অথচ মেয়েটি এই সামান্যতেই কী ভীষণ খুশি হয়ে যেত! প্রতিবার এমন তুচ্ছ উপহার হাতে পাওয়ার পর ইনায়ার অধরের কোণে যে হাসির রেখাটা ফুটে উঠতো, সেটি যেন কিছুতেই মুছে যেতে চাইতো না। সামান্য কয়েকটি কাঁচের চুড়ি, কয়েকটি বেলিফুল, কিংবা এক পাতার টিপই তার কাছে হয়ে উঠতো অমূল্য কোনো প্রাপ্তি। টেবিলের উপর শুকিয়ে যাওয়া বেলিফুলের নিরানব্বইটি মালা পড়ে রয়েছে সেভাবেই। কাঁচের চুড়িগুলোও পড়ে আছে। তেরোটি চুড়ি এতদিনে চৌদ্দতে গিয়ে ঠেকেছে। তবুও যাকে ঘিরে এই সমস্ত সঞ্চয়, তার কোনো সন্ধান মেলেনি।

হঠাৎ টেবিলের উপর রাখা ছবিটির দিকে হাত বাড়ালো আয়াশ। ছবিটি তুলে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো সে। তার চুলগুলো আগের তুলনায় অনেকটা বেড়ে এলোমেলো হয়ে গেছে। মুখজুড়ে অযত্নে বেড়ে ওঠা দাড়ি। গালের মাংসও যেন আগের তুলনায় অনেকটাই শুকিয়ে গিয়েছে। একসময় যে মুখটিতে প্রাণের ছাপ ছিল, আজ সেখানে কেবল ক্লান্তি আর দীর্ঘ প্রতীক্ষার ছায়া।আয়াশ ছবিটির দিকে তাকিয়ে বিষণ্নতামিশ্রিত স্বরে বলে উঠলো-

“অনেকটা বড়ো হয়েছো তাই না? তুমি তো জানো না আমি কতটা ব্যর্থ একজন স্বামী। সঙ্গে ব্যর্থ বাবাও, রাগ করেছো নিশ্চয়ই মায়ের মতো? বাবাকে একবার দেখাও দিবে না? তোমাদের ছাড়া বাবারও খুব কষ্ট হচ্ছে থাকতে। তবুও আছি, নাহলে তোমার মা আরো রাগ করে দূরে চলে যাবে।”

ছবিটার উপর ধীর হাতে আঙুল বুলিয়ে দিলো সে। যেন কাগজে বন্দী সেই অস্তিত্বকে স্পর্শের মধ্যেই নিজের হারিয়ে যাওয়া অস্তিত্ব খুঁজে ফিরছে। দৃষ্টি সরলো না এক মুহূর্তের জন্যও। ঘরের নিস্তব্ধতা আরও গাঢ় হয়ে উঠলো। ঠিক তখনই বিছানার উপর অবহেলায় পড়ে থাকা ফোনটি হঠাৎ একটানা বেজে উঠলো।

স্ক্রিনের বুকে ভেসে উঠলো তুষার নামটি। স্কুলজীবনের শুরু থেকেই মানুষটা আয়াশের ছায়াসঙ্গী, সময়ের দীর্ঘ পরিক্রমায় বন্ধুত্বটি পেরিয়েছে অগণিত ঋতুর সীমানা। ফোনটা কর্ণসংলগ্ন করতেই অপর প্রান্ত থেকে তুষার গমগমে স্বরে বলে ওঠে-

“ আয়াশ, ইনায়ার খোঁজ পেয়েছি।”

শব্দগুলো কর্ণকুহর স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গেই আয়াশ যেনো দীর্ঘ প্রতীক্ষার ঘোর থেকে জেগে উঠলো। মুহূর্তের মধ্যেই সটান হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো সে। গত তিনটা মাস ধরে মেয়েটার কোনো সন্ধান নেই, কোনো সংবাদ নেই, এমনকি তার অস্তিত্বের ক্ষীণতম আভাসটুকুও পায়নি সে। তাই এতোদিন পর হঠাৎ তার খোঁজ পাওয়ার সংবাদটা আয়াশের কাছে যেনো মরুভূমির বুকে হঠাৎ আবির্ভূত কোনো মরীচিকার ন্যায় বিস্ময়কর।

“ কোথায়, ও ঠিক আছে? বলা কোথায়?”

উদ্বেগে কণ্ঠস্বর পর্যন্ত কেঁপে উঠলো তার।

” আরে বাবা আমায় বলতে তো দিবি। ইনায়া খুলনায় আছে।”

খবরটি যেনো মুহূর্তেই আয়াশের দীর্ঘদিনের নিস্তেজ অস্তিত্বে প্রাণের সঞ্চার করলো। এতদিনের অস্থিরতা, উৎকণ্ঠা আর নির্ঘুম রাতগুলোর অন্তরালে যে একটিমাত্র নাম প্রতিনিয়ত ধ্বনিত হয়েছে, ইনায়া বেঁচে আছে, নিরাপদে আছে, এই সংবাদটুকুই যেনো তার কাছে আপাতত সমগ্র পৃথিবীর সমান মূল্যবান।

“ ও..ও ঠিক আছে তো?”

অজান্তেই কণ্ঠে মিশে গেলো উৎকণ্ঠার নরম কম্পন।

“ ঠিক না থাকলে কাজ করছে কিভাবে বলদ।”

“কাজ? কি কাজ? এই অবস্থায় ও কি করছে?”

ইনায়ার কথা উঠতেই আয়াশের দৃষ্টি অস্থির হয়ে উঠলো। মেয়েটা কেমন আছে, কীভাবে আছে, কোথায় আছে, এতদিন কীভাবে কাটিয়েছে, প্রতিটি প্রশ্ন যেনো একযোগে এসে তার মস্তিষ্কের ভেতর তীব্র আলোড়ন তুললো।

“ ফ্রিল্যান্সিয়ের কাজ, আমি একটা অ্যাপের জন্য খুঁজছিলাম। তখনই আমার একটা কলিগ ওর নাম বললো৷ তারপর ওর ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করে বুঝতে পারলাম, ও ইনায়া।”

কথাগুলো শুনে আয়াশ কয়েক মুহূর্তের জন্য নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেলো যেনো। বুকের ভেতর জমে থাকা উৎকণ্ঠা হঠাৎ প্রবল স্রোতের মতো ছুটে বেড়ালো শিরা উপশিরায়। ইনায়া কোথাও আছে, নিজের মতো করে জীবনটাকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে, এই সামান্য সংবাদটুকুও তার কাছে যেনো বহুদিনের তৃষ্ণার পর এক ফোঁটা বারিধারা।

“ তুই কোনো ভাবে ওর নাম্বারটা জোগার করে দিতে পারবি? প্লিজ তুষার! আর ও যাতে বুঝতে না পারে এটা তুই।”

“ আচ্ছা দাঁড়া আমি দেখছি, ওর থেকে নাম্বারটা নেই। টাকা দেওয়ার বাহানায় নাম্বারটা নিতে পারবো।”

” প্লিজ জলদি কর।”

কথোপকথন থেমে গেলো। অথচ আয়াশের ভেতরের অস্থিরতার যেনো কোনো অন্ত নেই।

তুষারের সঙ্গে কথা শেষ করেই আর স্থির হয়ে বসে থাকা সম্ভব হলো না তার। সমগ্র কক্ষজুড়ে শুরু হলো অস্থির পায়চারী। কখনো জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে, কখনো আবার অকারণে ফিরে আসছে ঘরের মাঝখানে। মনের ভেতর একটামাত্র আকাঙ্ক্ষা ক্রমশ প্রবল হয়ে উঠছে, ইনায়ার কাছে পৌঁছাতে হবে।
খুলনা। শহরটার নামটুকুই যেনো তার কাছে এখন কোনো দূরবর্তী গন্তব্য নয়, বরং দীর্ঘ প্রতীক্ষার শেষ সীমানা।নাম্বারটা হাতে পাওয়া মাত্রই সেটি ট্র্যাক করতে হবে। মেয়েটা যদি কোনোভাবে জানতে পারে সে তাকে খুঁজছে, তাহলে আবারও হয়তো নিজের অবস্থান পরিবর্তন করার চেষ্টা করবে। ইনায়াকে সে চেনে। নিজের চারপাশে দেয়াল তুলে নিয়ে নিঃশব্দে দূরে সরে যাওয়ার অভ্যাসটা তার অজানা নয়। কিছুসময় পর তুষার একটি নাম্বার সেন্ট করলো। স্ক্রিনে অপরিচিত সংখ্যাগুলোর সারি ভেসে উঠতেই আয়াশের বুকের ভেতরটা কেমন তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠলো। কতদিন পর সে ইনায়ার কণ্ঠস্বর শুনবে! কণ্ঠস্বরটুকুর জন্যই যেনো এতদিন ধরে তার সমস্ত অপেক্ষা। তবুও এখন কোনো ভুল করা চলবে না। অতি দ্রুত নিজের প্রথম সিমটি বের করে নিলো সে। বহু বছর আগেই এই নাম্বারটা ব্যবহার করা ছেড়ে দিয়েছে। ইনায়া এই নাম্বার চেনে না। তাই অন্তত প্রথমবারের যোগাযোগে তার পরিচয় আড়ালেই থাকবে।

ইনায়া তখন ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। কিছুক্ষণ আগেই কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে একজন পেমেন্ট করেছে। হাতে বেশ ভালো টাকাই জমেছে। দীর্ঘদিনের প্রয়োজনটাও এবার পূরণ করা সম্ভব হবে। কালকে একটা ভালো ল্যাপটপ কিনবে সে।
তাহলে আর প্রতিদিন বাইরে যেতে হবে না। এখানেই নির্জনতাতেই বসে মনোযোগ দিয়ে কাজ করা যাবে। জীবনটাকে যেভাবে ধীরে ধীরে নিজের মতো করে গুছিয়ে নিচ্ছে, তাতে এই সামান্য অর্জনটুকুও ইনায়ার কাছে কম কিছু নয়। ঠিক সেই সময় আচমকাই ফোনের পর্দায় ভেসে উঠলো একটি অচেনা নাম্বার। রাত এখনো খুব গভীর হয়নি। তবুও অপরিচিত নাম্বার দেখে ইনায়া কয়েক মুহূর্ত দ্বিধায় পড়ে রইলো। শেষপর্যন্ত কৌতূহল আর স্বাভাবিক শঙ্কার মাঝখানে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফোনটি তুলে নিলো।

“ আসসালামু আলাইকুম! জ্বী কে বলছেন?”

অপর প্রান্তে নেমে এলো সম্পূর্ণ নৈঃশব্দ্য। কোনো উত্তর নেই। ইনায়া কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে আবারও কণ্ঠ তুললো-

“ হ্যালো? কে বলছেন?”

আবারও নিস্তব্ধতা।কোনো শব্দ নেই, কোনো সাড়া নেই। ইনায়ার ভ্রু কুঁচকে গেলো। অচেনা নাম্বার থেকে ফোন করে এভাবে নিশ্চুপ থাকার অর্থটাই বা কী? বিরক্তি ধীরে ধীরে তার কণ্ঠে স্পষ্ট হয়ে উঠলো।

“ আরে কথা বলছেন না কেনো? ফোন দিয়েছে অথচ কথা বলছেন না!”

ইনায়া আরও কয়েক সেকেন্ড নীরবে অপেক্ষা করলো। হয়তো অপর প্রান্তের মানুষটা কোনো কারণে কথা বলতে পারছে না। কিন্তু দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরও যখন কোনো উত্তর এলো না, তখন বিরক্তির বশেই ফোনটি কেটে দিলো সে।

অপরদিকে, এতদিন পর ইনায়ার কণ্ঠস্বর শুনে আয়াশ যেনো নিজের অস্তিত্বের হারিয়ে যাওয়া কোনো অংশ ফিরে পেলো। মাত্র কয়েকটি শব্দ, অথচ সেই কণ্ঠস্বরই তার দীর্ঘ তিন মাসের শূন্যতার ওপর একফালি আলো হয়ে নেমে এলো। কথা বলতে পারেনি সে। পারেনি নিজের পরিচয়টুকুও দিতে। তবুও কণ্ঠস্বর শুনেছে। এটাই যেনো আপাতত তার কাছে যথেষ্ট।ঠিকানা পাওয়া মাত্রই ইনায়ার উদ্দেশ্যে ছুটবে সে। আর কোনো বিলম্ব নয়। এতদিনের অপেক্ষার অবসান এবার নিজের চোখেই করতে চায় আয়াশ।নীরব কক্ষে দাঁড়িয়ে ফোনের পর্দার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ধীর, অথচ দৃঢ় স্বরে উচ্চারণ করলো-

“ আপনার সঙ্গে অনেক হিসাব-নিকাশ বাকি ইনায়া। হয়তো অধিকার নেই, তবুও আপনাকে কৈফিয়ত দিতে হবে।”

#চলবে