Home "ধারাবাহিক গল্প "গোধূলী লগ্নে তুমি গোধূলী লগ্নে তুমি পর্ব-১১

গোধূলী লগ্নে তুমি পর্ব-১১

0
1

#গোধূলি_লগ্নে_তুমি
#কলমে_ফাহিমা_ইসলাম
#পর্ব_১১

[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ🚫]

সময় গড়িয়ে চলেছে চোখের পলকের অন্তরালে। একটা দিন নিঃশব্দে বিলীন হচ্ছে, তার পরেই আরেকটা দিনের আগমন, অথচ সেই চলমান সময়ের স্রোত যেন ইনায়ার জীবনে কোনো পরিবর্তনের বার্তা বয়ে আনছে না। দেখতে দেখতে একটা সপ্তাহ অতিবাহিত হয়ে গেলো। এই দীর্ঘ সাত দিনে ভুল করেও মেসের চৌহদ্দি অতিক্রম করেনি ইনায়া। হয়তো তার মনেই নেই, চার দেওয়ালের এই ক্ষুদ্র পরিসরের বাইরেও বিশাল এক পৃথিবী বিস্তৃত হয়ে আছে।কিন্তু আজ আর ঘরের অন্তরালে লুকিয়ে থাকার উপায় নেই। একটা মাসের সমাপ্তি ঘটেছে, নতুন মাসের সূচনাও হয়েছে। আজ তার প্রেগ্ন্যান্সি চেকআপ। বাইরে না বেরোনোর পেছনে এতদিন যে একমাত্র কারণটা তাকে আটকে রেখেছিল, আজ সেই কারণটাই তাকে ঘরের গণ্ডি পেরোতে বাধ্য করছে।

চারদিক থেকেই যেন তার পথ রুদ্ধ। হাতে আপাতত মাত্র দুই হাজার টাকা। অল্প অল্প করে যতটুকু সঞ্চয় করেছিল, সবটুকুই ল্যাপটপ কেনার পেছনে ব্যয় হয়ে গেছে। হাতে থাকা দুটো কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আগাম পারিশ্রমিক পাওয়ারও কোনো সম্ভাবনা নেই। অথচ আজকের চেকআপের জন্যও অর্থ প্রয়োজন। এই সামান্য টাকাটুকুও যদি চিকিৎসার পেছনে শেষ হয়ে যায়, তবে পরবর্তী দিনগুলোর জন্য তার হাতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।
নিজের সন্তানের ব্যাপারে কখনোই অর্থের হিসাব কষতে চায়নি ইনায়া। মাতৃত্বের কাছে অর্থের অঙ্ক বরাবরই তুচ্ছ। কিন্তু বাস্তবতা বড় নির্মম। যদি আজ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় হয়ে যায়, তবে চাইলেও সে সেই অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে পারবে না। সেই দ্বিধা, উৎকণ্ঠা আর অদৃশ্য আশঙ্কাকে সঙ্গী করেই অবশেষে বেরিয়ে এলো ইনায়া।

মেসের বাইরে পা রাখতেই দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা শীর্ণ মুখশ্রী আচমকাই তার দৃষ্টির সীমানায় এসে ধরা দিলো। কেমন উষ্কখুষ্ক হয়ে আছে চুলগুলো। চোখের নিচে জমে থাকা কালি যেন কয়েক রাতের অনিদ্রার নিঃশব্দ সাক্ষ্য বহন করছে। মুখখানি এমন বিবর্ণ যে দেখলেই মনে হচ্ছে, মানুষটা বুঝি দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে চলেছে। ইনায়া সঙ্গে সঙ্গেই দৃষ্টি নামিয়ে নিলো। পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময়টুকুতেই বুঝতে তার বিন্দুমাত্র বিলম্ব হলো না, মানুষটি সত্যিই অসুস্থ। সে ভেবেছিলো, একটানা এতগুলো দিন ইনায়াকে বাইরে না দেখে আয়াশ হয়তো আসা বন্ধ করে দেবে। কিন্তু তার সমস্ত অনুমানকে ভুল প্রমাণ করে এই অসুস্থ শরীর নিয়েও মানুষটা আজ এখানে দাঁড়িয়ে আছে। ইনায়ার পেছনে পেছনে, বরাবরের মতোই আয়াশও হাঁটতে শুরু করলো।

ইনায়া একটা রিকশা দাঁড় করালো। রিকশায় উঠে বসার পর অনিচ্ছা সত্ত্বেও একবার আয়াশের দিকে তাকালো। মানুষটার দৃষ্টি তখনও নিবদ্ধ তার দিকেই। ইনায়ার চোখেমুখের কঠোরতা আরও গাঢ় হয়ে উঠলো। আয়াশের চোখ দুটো অস্বাভাবিক লাল হয়ে আছে। এমন দৃষ্টি যেন সহ্য করাও কঠিন। জ্বর যে বেশ ভালোভাবেই শরীরটাকে কাবু করে ফেলেছে, তা বুঝতে কোনো বিশেষজ্ঞতার প্রয়োজন হলো না। ইনায়া দ্রুত দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো। সামনের দিকে তাকিয়েই কাঠ কাঠ স্বরে বলে উঠলো-

“ অসুস্থ হলে ডাক্তার দেখান, এইভাবে এখানে দাঁড়িয়ে থাকার কোনো মানে হয় না।”

আয়াশ ক্ষীণভাবে হাসলো। হাঁটতে তার কষ্ট হচ্ছে। গত কয়েকদিন ধরেই এই জ্বর নিয়েই নিজেকে টেনে নিয়ে বেড়াচ্ছে সে। অথচ একসময় তার জ্বর মানেই ছিল ইনায়ার অস্থিরতা। কখন কী প্রয়োজন, কখন কী লাগবে, তা নিয়ে মেয়েটা ব্যাকুল হয়ে থাকতো। আয়াশের অসুস্থতা যেন ইনায়ার নিজের আত্মাকেই অসুস্থ করে তুলতো। দুশ্চিন্তায় ঠিকমতো আহার করতেও ভুলে যেতো মেয়েটা।সেই দিনগুলো আজ কেবলই স্মৃতির অতল গহ্বরে চাপা পড়ে আছে।

“ আমার হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে!”

ইনায়ার চোখেমুখের গাম্ভীর্য আরও কঠিন হয়ে উঠলো। অন্তরের কোনো এক গোপন কোণে মানুষটার জন্য ব্যথা জেগে উঠলেও তার সামান্যতম বহিঃপ্রকাশ ঘটতে দিলো না। আবার এমন অসুস্থ অবস্থায় মানুষটাকে একা ফেলে চলে যেতেও মন চাইছে না। কিন্তু তাদের মধ্যবর্তী দূরত্বটা আর কেবল কয়েক হাতের নয়। অদৃশ্য এক বেড়াজাল তাদের দুজনকে এমনভাবে আবদ্ধ করে ফেলেছে, যেটা অতিক্রম করে আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে ওঠা এখন আর সম্ভব নয়।ইনায়া পুনরায় কঠিন স্বরে বললো-

“ হাঁটতে বলেছে কে? ডাক্তারের কাছে যান, এইখানে না দাঁড়িয়ে থেকে।”

“ উহুম! দরকার নেই। এমনি ঠিক হয়ে যাবে।”

ইনায়ার ভেতরটা রাগে কেঁপে উঠলো। অথচ সেই রাগও প্রকাশ করার অধিকার যেন হারিয়ে ফেলেছে সে। এখন অবধি হয়তো মানুষটা ঠিকমতো মেডিসিনও নেয়নি, এটা সে ভালোভাবেই জানে। আয়াশ বরাবরই ভীষণ মেডিসিনচোর। তাকে প্রায় জোর করেই ওষুধ খাওয়াতে হয়। কিন্তু এখন তো তার পাশে কেউ নেই। এখানে এমন কেউ নেই, যে কড়া গলায় শাসন করে মানুষটাকে ওষুধ খাওয়াবে। কেউ নেই, যে তার অসুস্থ শরীরের প্রতি একটুখানি অবহেলাও সহ্য করবে না।

“ কোথায় যাচ্ছেন?”

“ যেখানে যাই না কেনো, সেই তো পিছনেই আসবেন। তো তখনই দেখবেন।”

কাঠ কাঠ, রুক্ষ স্বরে উত্তর দিলো ইনায়া। আয়াশের অদ্ভুতভাবে ভালো লাগলো ইনায়ার এই রাগিনী রূপটা। এর আগে তো কখনো তাকে এভাবে দেখেনি সে। ইনায়া বরাবরই তার কাছে ছিল শান্ত, স্নিগ্ধ এক নদীর মতো। অথচ আজ সেই শান্ত নদীর বুকেই যেন প্রবল স্রোত। মেয়েটাকে সে একসময় পাগল বলতো। অথচ সেই মেয়েটাই আজ কী অনায়াসে তাকে উপেক্ষা করে চলে যাচ্ছে।

“ আজ তো টাকা নেই, বলে দাও কোথায় যাচ্ছেন আপনার পিছু পিছু আসচ্ছি।”

ইনায়া বিশ্বাস করলো না। আয়াশ তখন নিজের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে দেখালো। সেখানে টাকা বলতে পড়ে আছে মাত্র পাঁচ টাকার একটি কয়েন। দৃশ্যটা দেখে ইনায়ার মেজাজ আরও খারাপ হয়ে গেলো। তার নিজের কাছেও বাড়তি অর্থ নেই। চাইলেও মানুষটাকে সঙ্গে নিয়ে ডাক্তার দেখানোর মতো সামর্থ্য তার হাতে নেই।

“ তো আমি কি করবো? নেই তো বিকাশ থেকে তুলে নিন।”

“ টাকাই নেই এই মুহুর্তে। আচ্ছা আপনি যান আমি পিছু পিছু আসচ্ছি।”

“ ও আপা যাইবেন নাহি, এইখানে থাকবেন?”

হঠাৎই বিরক্তি মেশানো কণ্ঠে রিকশাওয়ালা মামা বলে উঠলো। ইনায়া বিব্রত হয়ে গেলো। রিকশা চলতে শুরু করলো। কয়েক মুহূর্ত পরেই অনিচ্ছা সত্ত্বেও পেছনে তাকালো সে। দেখলো, আয়াশ বেশ বেগ পেতে পেতে রিকশাটার পেছনে হেঁটে আসছে।হৃদয়ের কোথাও যেন অদৃশ্য কোনো কাঁটা বিঁধে গেলো।

“ একটু দাঁড়ান মামা।”

বলেই গম্ভীর মুখে আয়াশের উদ্দেশ্যে বললো-

“ হয়েছে আসুন, হসপিটালে যাচ্ছি। নাহলে ফিরে যান।”

আয়াশ যেন ঠিক এই কথাটুকুরই অপেক্ষায় ছিলো।

মুহূর্তের মাঝেই তার মুখের ক্লান্তির সমস্ত ছাপ যেন মিলিয়ে গেলো। অসুস্থ শরীরটাকে উপেক্ষা করে প্রায় ঝড়ের গতিতে এগিয়ে এসে ইনায়ার একেবারে পাশ ঘেঁষে বসে পড়লো।
রিকশাওয়ালা সেই দৃশ্য দেখে রিকশা চালাতে শুরু করলো। মুখে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বললো-

“ সামীরে এতো ভালাপান তয়, কেন রাগ করে আছেন আপা?”

রিকশাওয়ালার কথায় ইনায়া বেশ বিব্রত হলো। কোনো উত্তর দিলো না।অন্যদিকে আয়াশ বারবার তার দিকে তাকাচ্ছে।ইনায়ার পাশে বসার পরপরই তার নাসারন্ধ্রে এসে আছড়ে পড়লো সেই পরিচিত কোমল সুবাস। কতদিন পর এই গন্ধের সান্নিধ্য পেলো সে! কত রাত, কত নিঃসঙ্গ মুহূর্তে যে এই সুবাসকে মনে করেছে, তার হিসাব নেই।ইনায়ার শরীর থেকে ভেসে আসা পরিচিত গন্ধটুকু আয়াশ চোখ বন্ধ করে গভীরভাবে টেনে নিলো। দুর্বলতায় অবসন্ন শরীরটা যেন এক অদ্ভুত আকাঙ্ক্ষায় আচ্ছন্ন হয়ে উঠলো। এই মুহূর্তে তার সমস্ত সত্তা চাইছে, ইনায়াকে বুকের অন্তস্তলে লুকিয়ে নিয়ে এইভাবেই কোনো এক গভীর নিদ্রার দেশে তলিয়ে যেতে। কিন্তু জ্বরের প্রখরতা ততক্ষণে সম্পূর্ণভাবে রাজত্ব কায়েম করেছে তার শরীরের উপর। আয়াশের মাথাটা ধীরে ধীরে হেলে এসে ঠেকলো ইনায়ার কাঁধে।

আকস্মিক এই স্পর্শের জন্য বিন্দুমাত্র প্রস্তুত ছিল না ইনায়া। সে কিছু বলতে উদ্যত হতেই আচমকা অনুভব করলো, তার কাঁধের একটি স্থান ক্রমশ ভিজে উঠছে।
ইনায়া স্তব্ধ হয়ে গেলো। আয়াশ কি কাঁদছে? কিন্তু কেন?
সে কি এতটাই অসুস্থ? নাকি অন্য কোনো ব্যথা মানুষটাকে এভাবে ভেতর থেকে ভেঙে দিচ্ছে? ইনায়া কিছুই বুঝতে পারলো না। আয়াশ আরও গাঢ়ভাবে তার শরীরের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে নিলো। ওড়নার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসা কেশরাশিগুলো বারবার এসে তার চোখেমুখে আঘাত করছে। অথচ সেদিকে তার বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। চোখের কোণ বেয়ে নেমে আসা অশ্রুগুলোর কারণ খুঁজে পাচ্ছে না আয়াশ নিজেই। শেষ কবে তার চোখ এভাবে অশ্রুসিক্ত হয়েছিল, সেটাও তার স্মৃতিতে নেই।

অথচ এই মুহূর্তে তার মনে হচ্ছে, ইনায়াকে ছাড়া তার জীবনে আদৌ আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। এতকাল এই শান্তির নীড়টির মূল্য বুঝতে পারেনি সে। কতটা অধম হলে একজন মানুষ নিজের শান্তিকে নিজ হাতেই পায়ের নিচে পিষে দিতে পারে! আজ সেই উপলব্ধিটা যেন বুকের ভেতর অসহনীয় ভার হয়ে জমে উঠছে। আয়াশের ইচ্ছে হলো, এই মুহূর্তটুকুকেই যদি অনন্তকাল পর্যন্ত ধরে রাখা যেতো। কিন্তু সে জানে, ইনায়া আবারও দূরে সরে যাবে তার কাছ থেকে।
এই ভাবনাটুকুই যেন তাকে আরও অসহায় করে তুললো।আরও নিবিড়ভাবে ইনায়ার পাশে গা ঘেঁষে বসে রইলো সে।
ইনায়া নীরবে সমস্তটা হজম করলো।আয়াশ এমনই করে।
যখনই সে অসুস্থ হয়, যখনই ইনায়া তার পাশে থাকে, মানুষটা কেমন করে তার বক্ষে মাথা রেখে গভীরভাবে তাকে জড়িয়ে রাখে। কোনো বাক্য ব্যয় করে না, কোনো শব্দও উচ্চারণ করে না। কেবল তার গ্রীবাদেশে মুখ লুকিয়ে নীরবে পার করে দেয় সময়টুকু। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না।
ইনায়ার ইচ্ছে করলো, সবকিছু ছেড়ে এই রিকশা থেকে নেমে কোথাও পালিয়ে যেতে। তিক্ততায় তার সমগ্র সত্তা কেমন করে কেঁপে উঠছে। অথচ মানুষটার শরীরের উত্তাপ যেন সেই তিক্ততার মধ্যেও তাকে অস্থির করে তুলছে।
অসম্ভব রকম গরম আয়াশের শরীর। কত ডিগ্রি জ্বর বাঁধিয়েছে মানুষটা, তা একমাত্র আল্লাহই জানেন।

“ মামা দ্রুত চলুন একটু।”

ইনায়া তাড়া দিলো। নিজের চেকআপ পরে করিয়ে নেবে, আগে আয়াশকে চিকিৎসকের সম্মুখে নেওয়াটাই অধিক জরুরি। কবে থেকে মানুষটার জ্বর, সেটুকুও তো সে অবগত নয়। যদি সাধারণ জ্বর না হয়ে অন্য কোনো জটিলতার আভাস থাকে, তবে বিপদ আরও ঘনীভূত হতে পারে।
হাসপাতালের সম্মুখে এসে ইনায়া ভাড়ার টাকা মিটিয়ে দিলো। আয়াশকে বেশ কয়েকবার ডাকলেও মানুষটার কাছ থেকে কোনো প্রত্যুত্তর এলো না। তার তুলনায় আয়াশ দ্বিগুণেরও অধিক বৃহৎকায়। এমন বিশাল দেহটাকে একা সামলাতে গিয়ে ইনায়াকে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। কোনো রকমে তাকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে বসালো। অতঃপর সিরিয়ালের অপেক্ষায় রইলো।

ভিড় তেমন একটা নেই। তবুও ইনায়া আর তার পাশে গিয়ে বসলো না। কিন্তু আয়াশের মাথাটা কেমন যেন বারবার ঢুলে পড়ছে। বিষয়টা চোখে পড়তেই ইনায়া দ্রুত তার পাশে গিয়ে বসলো। পুনরায় মাথাটা নিজের কাঁধের উপর তুলে নিলো। আয়াশও যেন সেই আশ্রয়ের অপেক্ষাতেই ছিল। মুখখানা ডুবিয়ে দিলো তার কাঁধের কাছে। আশেপাশে বসে থাকা কয়েকজনের দৃষ্টি ইতোমধ্যে তাদের দিকে নিবদ্ধ। ইনায়ার অস্বস্তিতে সমগ্র অবয়ব সংকুচিত হয়ে এলো, তবুও নিজেকে সামলে নিলো। কিছুক্ষণ পর তাদের সিরিয়াল এলো। ইনায়া আয়াশকে সঙ্গে নিয়ে চিকিৎসকের কক্ষে প্রবেশ করলো।

আয়াশকে ডাক্তারকে দেখানোর পর তাকে সঙ্গে নিয়ে বাইরে এলো ইনায়া। মানুষটা নিজের পায়ে হাঁটছে ঠিকই, কিন্তু তাকে ধরে রাখা প্রয়োজন হচ্ছে। আজ যদি সে হাসপাতালের পথে বের না হতো, তবে মানুষটা এতক্ষণে হয়তো সেখানেই পড়ে থাকতো। নিজের চেকআপ আজ আর করাবে না ইনায়া। হাতে টাকা এলে একবারেই করিয়ে নেবে। আয়াশকে নিয়ে এগিয়ে যেতে উদ্যত হতেই হঠাৎ আয়াশ তার হাত ধরে আটকালো।

“ কি হয়েছে আবার?”

“ চেকাআপ করাবেন তো? তাহলে যাচ্ছেন কেনো?”

“ আমারটা আমি বুঝে নিবো, এবার চলুন।”

আয়াশ আর কোনো কথা বললো না। বরং এগিয়ে গিয়ে চিকিৎসকের ভিজিটের জন্য প্রয়োজনীয় ফি পরিশোধ করে দিলো।

ইনায়ার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেলো। আয়াশের কাছে টাকা দেখে বিস্ময়ে তার সমগ্র মুখশ্রী বদলে গেলো। এই মানুষটাই তো বলেছিল তার কাছে টাকা নেই। তবে এখন কীভাবে পরিশোধ করছে? রাগে ইনায়ার মুখাবয়ব কঠিন হয়ে উঠলো। সে সাহায্য করতে এসেছিল এমন একজন মানুষকে, যার আদৌ কোনো সাহায্যের প্রয়োজনই ছিল না।
কোনো কথা না বলেই ইনায়া সেখান থেকে বেরিয়ে গেলো। এখানে দাঁড়িয়ে থাকার আর কোনো অর্থ খুঁজে পেলো না সে। ইনায়াকে চলে যেতে দেখে দুর্বল শরীর নিয়েই তাকে আটকানোর জন্য পিছু নিলো আয়াশ।

“ ইনায়া যাবেন না। শুনুন!”

ইনায়া কিছুই শুনলো না। অন্ধের মতো সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। দৃশ্যটা দেখে আয়াশ দ্রুত এগিয়ে এসে ফট করে ইনায়ার হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো। রক্তিম চোখে আয়াশের দিকে তাকালো ইনায়া।

“ হাত ছাড়ুন, এতো নাটক করার কি দরকার ছিলো? টাকা থাকা সত্বেও বললেন আপনার কাছে টাকা নেই!”

“ সরি, বাট আপনার সান্নিধ্যে আসার কোনো সুযোগ মিস দিতে চাচ্ছিলাম না।”

ইনায়ার দৃষ্টি আরও কঠিন হয়ে উঠলো।

“ পেয়েছেন সান্নিধ্য? এবার ছাড়ুন।”

“ আমার উপরে রাগ দেখিয়ে নিজে কেনো চেক-আপ করছেন না?”

ইনায়া কোনো উত্তর দিলো না। তার কাছে পর্যাপ্ত অর্থ নেই যে নিজের চেকআপ করাবে। অথচ নিজের এই অসহায়ত্বটুকু আয়াশের কাছে প্রকাশ করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই তার।

“ আমার দরকার হবে যেদিন,সেদিন করাবো।”

“ ইনায়া প্লিজ!”

“ কিসের প্লিজ? বলেছি হাত ছাড়ুন। আমি বলেছি আপনার টাকা দিয়ে আমি চেকআক করাবো? আপনি কেউ নন আমার, সময় হলে আমি ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দিবো। ততোদিন দয়া করে আমাকে আর বিরক্ত করবেন না।”

আয়াশ অসহায় দৃষ্টিতে ইনায়ার মুখপানে চেয়ে রইলো। মেয়েটা সত্যিই বদলে গেছে। একসময় যে মানুষটা তার সামান্য কথাতেও নরম হয়ে যেত, আজ সেই মানুষটাই কী অবলীলায় এত কঠিন কথা বলে যাচ্ছে।

“ ওর আর আপনার উপর কি আমার কোনো অধিকার নেই?”

“ না,নেই। ও আমার, শুধুই আমার বুঝেছেন।”

“ ও আমারও অংশ!”

“ হ্যাঁ আপনারও অংশ, তবে ভালোবাসাহীন এই অংশের ওপর আপনার কোনো অধিকার নেই। থাকার কথাও নয়।”

আয়াশ আহত দৃষ্টিতে ইনায়ার কঠোর মুখশ্রীপানে তাকিয়ে রইলো। সেই দৃষ্টিতে অভিমান ছিল, ছিল অসহায়ত্ব, আর ছিল নিজের ভুলের ভারে নুয়ে পড়া এক পুরুষের নির্বাক অনুতাপ।

“ এতোটা নিষ্ঠুর হবেন না আমার প্রতি ইনায়া।”

“ আমি নিষ্ঠুর কই হলাম? সত্যিটাই তো বলেছি, ও কি আদৌ আমাদের ভালোবাসার ফলে এসেছে? আমি ভালোবেসেছি শুধু,তাই অধিকারও আমার একা।”

“ আচ্ছা ঠিক আছে, তবুও এতোটা হাইপার হবেন না৷ শ্বাস নিন, আপনার কষ্ট হচ্ছে।”

ইনায়ার গাল বেয়ে নিঃশব্দে দু ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। অথচ এই সামান্য অশ্রুতে তার অন্তরে জমে থাকা দীর্ঘদিনের যন্ত্রণার এক বিন্দুও যেন ধুয়ে গেলো না।

“ দরকার নেই।”

“ ইনায়া প্লিজ!”

বলেই পুনরায় ইনায়াকে ধরতে উদ্যত হলো আয়াশ। কিন্তু এবারও ইনায়া তাকে সেই সুযোগ দিলো না। হাতটি ঝাটকা মেরে সরিয়ে দিয়ে ভাঙা কণ্ঠে উচ্চারণ করলো-

“ বলছি তো আমায় ছাড়ুন! আমার সহ্য হচ্ছে না এইসব।”

আয়াশ সঙ্গে সঙ্গেই ইনায়ার হাত ছেড়ে দিলো। তার একমাত্র ভয়, তার কারণে ইনায়া যেন পুনরায় কোনো কষ্টের ভেতর দিয়ে না যায়। এতদিনে সে বুঝেছে, নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করতে না পারার প্রতিটা মুহূর্ত কীভাবে এই মেয়েটার অন্তরে ক্ষত তৈরি করেছে।ইনায়া রক্তিম চোখে আয়াশের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর বহুদিনের স্তব্ধ যন্ত্রণার দুয়ার যেন আচমকাই ভেঙে গেলো তার কণ্ঠে।

“আপনার ভালোবাসাবিহীন স্পর্শগুলোয় আমার রুহু অব্দি কাঁদতো৷ ভীষণ কষ্ট হতো আমার, যতোবার আমায় আপনি স্পর্শ করেছেন ততোবার আমার রুহু অব্দি কেঁদেছে৷ আমাকে ভেঙে এক এক করে প্রতিনিয়ত। তবুও ছিলাম, এই আশায় একদিন আমায় ভালোবাসবেন। অথচ আপনার মনে জায়গায় করে নেওয়ার জন্য তিনটা বছর কম ছিলো৷”

কথাগুলো উচ্চারণ করেই ইনায়া আর কোনো দিকে ফিরে তাকালো না। নিঃশব্দ পায়ে সামনে এগিয়ে গেলো। পেছনে পড়ে রইলো আয়াশ, এক অসহায় পথিকের মতো স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো প্রিয় মানুষটার দূরে সরে যাওয়া অবয়বের দিকে। এবার আর পা বাড়ালো না তার পিছু।
যদি যায়, হয়তো মেয়েটার কষ্ট আরও বাড়বে। আয়াশ ইচ্ছে করেই বলেছিল তার কাছে টাকা নেই। সে জানতো, এমন অবস্থায় তাকে একা ফেলে যাওয়ার মতো কঠোরতা ইনায়ার মধ্যে নেই। নিজের অজান্তেই সে নিশ্চিত ছিল, ইনায়া তাকে ছেড়ে যাবে না। কিন্তু ইনায়া চলে যাওয়ার পর এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, হয়তো তার সমস্ত ধারণাই ভুল।
তারপর যখন ইনায়া আবার ফিরে এসে তাকে ডাকলো, সেই মুহূর্তে তার চেয়ে অধিক সুখী মানুষ বোধহয় এই পৃথিবীতে আর কেউ ছিল না।

এতক্ষণে নীরবে ইনায়ার সান্নিধ্যে নিজেকে সঁপে দিয়েছিল সে। কেবল এই মেয়েটার কাছে থাকার আকাঙ্ক্ষাটুকু সামলাতে না পেরেই মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছিল। অথচ নিজের অজান্তেই সেই মানুষটাকেই বারবার কষ্ট দিয়ে গেছে, যে মানুষটা তার কাছ থেকে ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই চায়নি।আজ ইনায়ার প্রতিটা শব্দ আয়াশের অন্তরের গভীরে গিয়ে আঘাত করছে। এতদিন যে সত্যিটা সে বুঝতে চায়নি, আজ সেই সত্যিই তার সামনে নগ্ন বাস্তবতার মতো দাঁড়িয়ে রইলো। ভালোবাসা পেতে ইনায়ার তিনটা বছর যথেষ্ট ছিল না, অথচ তাকে হারানোর জন্য তার নিজের কয়েকটা ভুলই যেন যথেষ্ট হয়ে গেলো।

——

কান্নায় অবদমিত সমগ্র পথটুকু অতিক্রম করে অবশেষে এসে দাঁড়ালো ইনায়া। পথের প্রতিটা ধূলিকণা যেনো তার ক্লান্ত পায়ের সঙ্গে সঙ্গে বহন করে এনেছে অসংখ্য অনুচ্চারিত দীর্ঘশ্বাস। কিছুই ভালো লাগছে না তার। শরীরের সমস্ত শক্তি যেনো নিঃশেষ হয়ে এসেছে, অথচ আবারও কোনো অপরিচিত শহরের অচেনা গলিঘুঁজিতে নিজেকে আড়াল করে ফেলার মতো সামর্থ্যও অবশিষ্ট নেই।
আর কতদিন এভাবে পালিয়ে বেড়াবে সে আয়াশের নিকট থেকে?

জীবনটা আর আগের মতো নেই। আগের সেই ইনায়া নেই, যে অনায়াসে এক শহর থেকে অন্য শহরে ছুটে বেড়াবে, নিজের অস্তিত্বকে আড়াল করার জন্য প্রতিনিয়ত নতুন কোনো আশ্রয়ের সন্ধান করতে পারবে। এখন তার প্রতিটা পদক্ষেপের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরেকটা ক্ষুদ্র প্রাণের অস্তিত্ব। অথচ আয়াশকে আজকাল যতবার চোখের সামনে দেখে, ততবারই পুরোনো ক্ষতগুলো যেনো নতুন করে রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। বিস্মৃতির গভীরে যত্ন করে চাপা দিয়ে রাখা ব্যথাগুলোও মানুষটার একটা মাত্র উপস্থিতিতে পুনরায় জেগে ওঠে। যতই সে আয়াশের সান্নিধ্য থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিতে চায়, নিয়তির নির্মম পরিহাসে আয়াশ যেনো ততই তার নিকটবর্তী হয়ে পড়ে।

হঠাৎ করেই নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হলো ইনায়ার। বুকের ভেতর জমে থাকা ভারটুকু সরিয়ে ফেলতে সে দীর্ঘ করে শ্বাস টেনে নিলো। তার সমস্ত জীবন, সমস্ত সংগ্রাম, সমস্ত প্রতিকূলতা এখন আর নিজের জন্য নয়। এই পৃথিবীতে তার বেঁচে থাকার সমস্ত অর্থ যেনো একটা মাত্র ক্ষুদ্র প্রাণকে ঘিরে।
ধীরে ধীরে নিজের স্ফীত উদরের উপর হাত রাখলো ইনায়া।
প্রতিটা দিন সে অপেক্ষা করে। কখন তার শরীরের অন্তরালে বেড়ে ওঠা এই ক্ষুদ্র অস্তিত্বটি পৃথিবীর আলো দেখবে, কখন তাকে নিজের কোলজুড়ে আগলে রাখার সুযোগ পাবে। কখন ছোট্ট দুটি হাত তার আঙুল আঁকড়ে ধরবে, কখন সেই নিষ্পাপ মুখখানি বুকের কাছে এনে সমস্ত পৃথিবীর দুঃখ ভুলে যেতে পারবে। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে উঠলো সে-

“ মা খালি কেঁদে তোমায় কষ্ট দেই তাই না? মা খুব সরি কেমন, তাড়াতাড়ি চলে এতো মায়ের বুকে। তোমাকে খুব করে বুকের সঙ্গে মিশিয়ে রাখতে ইচ্ছে হচ্ছে তো মায়ের।”

কথাগুলো উচ্চারণ করতে করতেই কান্নায় ভেঙে পড়া কণ্ঠটি স্তব্ধ হয়ে এলো। যেনো তার অশ্রুসিক্ত স্বরটুকুও ভেতরে থাকা ক্ষুদ্র প্রাণটার কাছে পৌঁছে গেলো। পরক্ষণেই উদরের ভেতর হালকা এক নড়াচড়া অনুভব করলো ইনায়া।
স্থির হয়ে গেলো সে। তারপরই অশ্রুর আড়াল ভেদ করে ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো এক টুকরো নির্মল হাসি। কান্নার মাঝেও মাতৃত্বের সেই ক্ষুদ্রতম স্পর্শটুকু তার সমস্ত বিষণ্ণতার উপর যেনো শীতল প্রলেপ হয়ে নেমে এলো।
আবারও উদরের উপর হাত বুলিয়ে মুগ্ধ কণ্ঠে বললো-

“ মায়ের সব কথা শুনছো বুঝি?”

কথাটি শেষ হতে না হতেই ভেতর থেকে আরেকটি মৃদু ধাক্কা এলো।ইনায়া আবারও হেসে উঠলো। কী আশ্চর্য এই অনুভূতি! ভেতরে থাকা এই ক্ষুদ্র অস্তিত্বটা যখন এভাবেই নিজের উপস্থিতির জানান দেয়, তখন পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ, সমস্ত অভিমান, সমস্ত না-পাওয়া যেনো মুহূর্তেই বিবর্ণ হয়ে যায়। যে কষ্টগুলো এতক্ষণ বুকের ভেতর পাহাড়সম ভার হয়ে ছিল, মাতৃত্বের একটিমাত্র স্পর্শেই সেগুলো কত সহজে তুচ্ছ হয়ে যায়! মাতৃত্বের চেয়ে অধিক পরম সুখ আর কী-ই বা হতে পারে? স্ফীত উদরের উপর ধীর হাতে আদর বুলাতে বুলাতে ইনায়া মৃদুস্বরে বলে উঠলো-

“ক্যান ইউ বি মাই স্ট্রোং বয় ওকে? আমরা কি একা থাকতে পারি না? তোমার কি বাবাকেও লাগবে? তোমার বাবা তো থাকবে, কিন্তু আমাদের সঙ্গে নয়। আমরা একাই থাকবো কেমন? মা আছি তো!”

—-

“শ্রেয়া আর কিছু বলবে?”

“তুমি অনেকটা পাল্টে গেছো।”

বিষণ্নতার গাঢ় ছায়া মেখে থাকা মুখে এক টুকরো ক্ষীণ হাসির আভাস ফুটিয়ে আয়াশ বলে ওঠে-

“সময় যেমন পরিবর্তনশীল,তেমনিই মানুষও পরিবর্তনশীল।”

“প্রিয়া হয়তো খুশি হবে। ও তো জানতো ও না ওকে তুমি কতটা ভালোবাসতে।”

শেষের কথাটুকু উচ্চারিত হলো ভীষণ আফসোসের ভারে। কথাগুলো শ্রেয়া বললেও তার প্রতিটা শব্দ যেনো আয়াশের বহুদিনের চাপা পড়ে থাকা কোনো অনুভূতির দরজায় করাঘাত করলো। আয়াশ ধীরে ধীরে চোখ বুজে নিলো। অনুভূতির ভাষা প্রকাশে সে বরাবরই বড় অক্ষম। প্রিয়াকে সে ভালোবেসেছিলো একান্ত একতরফাভাবে। কোনোদিন মেয়েটার সামনে দাঁড়িয়ে বলা হয়ে ওঠেনি, সে তাকে ভালোবাসে। বলার আগেই প্রিয়া অন্য কারো হয়ে গিয়েছিলো। ফলে তার সেই অনুচ্চারিত অনুভূতি সারাজীবন ধামাচাপা পড়ে রইলো হৃদয়ের কোনো এক নির্জন কোণে, যেখানে স্মৃতিরাও নিঃশব্দে ধুলো জমিয়ে বসে থাকে।

প্রিয়া তখন অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রী, আর আয়াশ তৃতীয় বর্ষে। কোনো বিশেষ কারণ ছাড়াই প্রিয়া নামক মেয়েটাকে সে নিজের হৃদয়ের অন্তঃপুরে বন্দী করে ফেলেছিলো। মেয়েটা এমন আহামরি কিছুই ছিলো না, তবুও কী এক অদৃশ্য মায়াজালে আয়াশ জড়িয়ে পড়েছিলো তার অস্তিত্বের গোলকধাঁধায়। প্রিয়ার কণ্ঠে ছিলো অদ্ভুত এক মায়া। ভীষণ সুন্দর গান গাইতো মেয়েটা। তার কণ্ঠের সুরেই প্রথম মুগ্ধ হয়েছিলো আয়াশ। ক্যাম্পাসে নতুন এসেই কয়েকদিনের মাথায় একদিন গান গেয়েছিলো প্রিয়া। রবীন্দ্রনাথ সংগীত। চারপাশের কোলাহল যেনো মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো সেই সুরের আবেশে। গোটা ক্যাম্পাস মুগ্ধ হয়ে শুনেছিলো মেয়েটার গান। অথচ আয়াশ এর আগে কোনোদিন এতো গভীর মনোযোগ দিয়ে কোনো সংগীত শোনেনি। সেই প্রথম, কীভাবে কীভাবে যেনো প্রিয়া নামক মেয়েটা তার সমগ্র সত্তাকে নিঃশব্দে গ্রাস করে নিয়েছিলো।

আজ সেসবই অতীতের বিবর্ণ পৃষ্ঠায় জমে থাকা স্মৃতি। আয়াশ আজকাল আর অতীতের অলিগলিতে ঘুরে বেড়ায় না। অতীতের শূন্যস্থানটুকু ইনায়া এসে দখল করে নিয়েছে। হয়তো তার হৃদয় বহু পূর্বেই ইনায়াকে গ্রহণ করে নিয়েছিলো। কেবল সেই পথহারা পথিকের মতো নিজের অজান্তে সে এতদিন ধরে খুঁজে ফিরেছে সেই মানুষটাকেই।
শ্রেয়া আর প্রিয়া জমজ। অবয়বে দুজনের মাঝে আশ্চর্য সাদৃশ্য থাকলেও ব্যক্তিত্বের বিচারে তারা যেনো দুই ভিন্ন পৃথিবীর অধিবাসী।

“আচ্ছা রাখছি, দোয়া করছি ইনায়া যেনো ফিরে আসে। মেয়েটাকে আর কষ্ট দিও না।”

সত্যিই কি ইনায়া এতো সহজে ফিরে আসবে তার কাছে? ফেরা কি আদৌ এতো সহজ?প্রশ্নগুলো আয়াশের মস্তিষ্কের ভেতর অদৃশ্য ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়তে লাগলো। সে আবারও চোখ বন্ধ করে নিলো। জ্বরের ঘোরে চারপাশের সমস্ত অস্তিত্ব কেমন ধীরে ধীরে অন্ধকারের অতলে ডুবে যাচ্ছে। শরীরের ভার যেনো ক্রমশ অসহনীয় হয়ে উঠেছে। মাথাটুকুও আর তুলে রাখার শক্তি অবশিষ্ট নেই। চোখের পাতার অন্তরালে হঠাৎ ভেসে উঠলো ইনায়ার ক্রন্দনরত মুখশ্রী। অশ্রুসিক্ত সেই চোখদুটো যেনো অসহায় আকুতি নিয়ে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। আয়াশ হাত বাড়িয়ে তাকে ছুঁতে চাইলো, সেই অশ্রুগুলো মুছে দিতে চাইলো। অথচ ইনায়া তার ধরাছোঁয়ার সম্পূর্ণ বাইরে।

যতবার তাকে কাছে টানতে চায়, ততবারই সে যেনো আরও দূরে সরে যায়। আয়াশের সাধ্যের সীমারেখা অতিক্রম করে কেমন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে থাকে প্রিয়তম সেই মুখটা।
আর আয়াশ অসহায় দৃষ্টিতে কেবল তাকিয়েই থাকলো, হারিয়ে যেতে থাকা ইনায়াকে আর একবার ছুঁয়ে দেখার ব্যর্থ আকাঙ্ক্ষা বুকে নিয়ে।

#চলবে