টক ঝাল মিষ্টি পর্ব-১৩ (বিশেষ পর্ব-০১)

0
538

#টক_ঝাল_মিষ্টি (বিশেষ পর্ব- ১)

অনিকেত এবারই প্রথম শ্বশুরবাড়ি এসেছে ঈদ উদযাপন করতে। তবে লাবণ্য ওর উপরে ক্ষে*পে “ব্যো” “ম” হয়ে আছে। স্বভাবসুলভ কড়া মেজাজের বাইরে কথাই বলছে না। এটা নতুন কিছু নয় যদিও এর যুক্তিযুক্ত কারণও থাকে সবসময়।

দুজন একসাথে শপিং শেষ করে বাসায় এসেছিল রাতে। মাঝে একদিন চলে গেছে, এরপর বাড়িতে আসার জন্য সব গোছগাছ করতে গিয়ে দেখে লাবণ্য অনিকেতের জন্য এত ঘুরে ঘুরে খুব পছন্দ করে একটা পাঞ্জাবি কিনেছিল, সেটা নেই। যখন অনেক খোঁজাখুঁজি করেও সেই বস্তুর আর দেখা মিলল না, তখন সে অনিকেতকে গিয়ে ধরল,

“আমার যতদূর মনে পড়ে, শপিং ব্যাগটা তোমার হাতে ছিল। মনে করে বলো তো কোথায় রেখেছ?”

অনিকেত অবশ্য এত সহজে এই কথায় সম্মত হলো না, ওর আচমকা তখন মনে পড়েছে সেটা ওর হাতেই ছিল। বোধহয় অন্য কোথাও টাকা দিতে গিয়ে সেখানেই ফেলে এসেছে। তবে সেটা ওই মুহূর্তে স্বীকার করে নিজের বি*প*দ বাড়াতে চায়নি।

অত্যন্ত মিনমিনে গলায় সরলতার প্রতিমূর্তি সেজে সে বলেছিল, “আমার কাছে ছিল নাকি? মনে পড়ছে না তো? তুমি মনে হয় ভুল করছো!”

“আমার সাথে মিথ্যা কথা বলার চেষ্টা একদম করবে না অনিকেত। খুবই চাইল্ডিশ মনে হয় এসব। আর এতটা ইরেসপন্সিবল হওয়াটা তোমাকে এখন আর মানায় না।” চোখে দিয়ে যেন “ম” “র্টা” “র” “শে” “ল” নি””ক্ষে””প” করে হেঁটে বেরিয়ে গেল। তাতে অনিকেত কয়েকবার করে শেষ হয়ে গেল।

অনিকেত অবশ্য পরেরদিন বাড়িতে রওনা দেবার আগে গিয়েছিল খোঁজ করতে, কিন্তু মাঝে একদিন পেরিয়ে গেছে, কোথায় রেখে এসেছে তাও ঠিকঠাক মনে করতে পারছে না। তাই সেটা আর পাওয়া যায়নি। সেই পাঞ্জাবীর কাছাকাছি রঙের একটা পাঞ্জাবি কিনে ফিরে এসেছে।

বাসে উঠে আজ ইচ্ছে করে আদায় কামড় দেয়নি। প্রায় অনেকটা পথ যাবার পরে সে যখন বমি করতে শুরু করল, তখন লাবণ্য চিন্তায় উদগ্রীব হয়ে ওর বুকে পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল অস্থির হয়ে। এটাই অনিকেত চাইছিল। কিন্তু বিধি বাম। প্রতিবারের মতো এবারও ওর এই সূক্ষ্ম *কা*র*চু*পি ধরা পড়ে গেল।

অনিকেতের পায়ের কাছে পড়ে থাকা আদার অংশ লাবণ্যর তীক্ষ্ণ নজর এড়াতে পারল না। ইঁদুর কপালে ভাগ্য বুঝি একেই বলে! অনিকেত লাবণ্যর জেরার মুখে হতভম্ব হয়ে স্বগতোক্তির মতো কেবল বলল,

“এটা তো বাইরে ফেলেছিলাম, এখানে কী করে এলো?”

“ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। জানো না? তাও…”

এরপর-ই যে মেয়েটা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে আর সারা পথে একবারও ওর দিকে তাকায়নি। অনিকেতের আর বমিও হয়নি। নিজেকে সত্যি সত্যি মাকাল ফল বলে মনে হচ্ছিল ওর।

এই বাড়িতে পা রেখে সবার সাথে হাসিমুখে কথা বললেও অনিকেতের সাথে কাঠিন্য বজায় রেখেছে লাবণ্য। রাতে ঘুমাতে এসেও চুপচাপ শুয়ে পড়েছে। অনিকেত বারকয়েক কথা বলার চেষ্টা করল, কিন্তু লাভ হয়নি।

“কাল সকাল সকাল উঠতে হবে ঘুমিয়ে পড়ো।”

শ্বশুর বাড়িতে প্রথম ঈদ, ভেবেছিল সেটা কত আনন্দময় হবে। অথচ কেমন চোখ রাঙানি খেয়ে শুরু হলো। খালি ওর সাথেই এমন, একটু আগেও তো কাজিনদের সাথে হাতে মেহেদি পরা, এটা সেটা হৈ রৈ ঠিকই চলল। ওর কি অভিমান হয় না! হয়, এখন যেমন হয়েছে! ভীষণ ভীষণ অভিমান হয়েছে!

***
শোবার পর কতক্ষণ গেল লাবণ্য জানে না, তবে একসময় অনিকেতের নাক ডাকার মৃদু আওয়াজ কানে আসতেই সচকিত হলো। অনিকেতের দিকে পাশ ফিরল, মাথায় মুখে হাত বুলিয়ে যেন অব্যক্ত অভিমান ভাঙানোর চেষ্টা করছে মানুষটার অজ্ঞাতে।

অনিকেতের নিত্যনতুন ছেলেমানুষি ওর ভালো থাকার রসদ। কিন্তু মাঝেমধ্যে সেটা মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। এই মানুষটাকে সে তো খোলা বইয়ের মতোই পড়তে পারে, তবুও এই যে মিথ্যে বলার বৃথা চেষ্টা করে ঝগড়া থেকে বাঁচতে, এটা লাবণ্যর ভালো লাগে না। এত আত্মভোলা কেন, এটা নিয়ে ওর সবচাইতে বড় অভিযোগ। প্রায় ঘণ্টা খানেক ঘুরে একটা পাঞ্জাবি কিনেছিল, সেটাও রাখতে পারেনি। ওর পরিশ্রমের সাথে মেশানো যে ভালোবাসাটুকু ছিল, সেটার কি কোনো মূল্য নেই!

কখনো ছাতা, কখনো টিফিন বক্স হরহামেশাই রেখে আসে অফিসে। গত পরশু নাহয় একটা পাঞ্জাবি, কিন্তু পরে যে ভীষণ জরুরি কোনো কিছু এভাবে হারিয়ে ফেলবে না, তার নিশ্চয়তা কী! সে একটু শক্ত হলে যদি সুন্দর গাধাটার একটু সুমতি হয়, এটাই তো সে চেয়েছিল। কিন্তু কী করল!

বাসে যেন বমি হয় সেজন্য চেষ্টা করে গেল! কষ্টটা কার হলো! লাবণ্য রেগে গেলে যখন দেখে সেটা ভাঙানো সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে, তখনই এমন বোকা বোকা নিতান্ত আনাড়ি ছেলেমানুষি কর্মকাণ্ড করে বসে। নিজেকে কষ্ট কেন দিতে হবে! লাবণ্যর রাগ তো চিরস্থায়ী নয়, যে এসব করতে হবে। বেশিক্ষণ রাগ ধরে রাখতে পারে না, চেষ্টা করলেও সম্ভব হয় না। কিন্তু এটা বরং ওর মাথায় আরও আ/গু/ন /জ্বা/লি/য়ে দিয়েছে৷ এখন শান্তি হয়েছে নিশ্চয়ই!

ঘুমের ঘোরেই অনিকেত ওপাশ ফিরল, লাবণ্য সন্তর্পণে সরে এলো। এখন সহজ হলে প্রশ্রয় পেয়ে যাবে, তাই সেও উল্টো দিকে ঘুরে ঘুমানোর চেষ্টা করতে লাগল, অনিকেতের নাক ডাকার শব্দ চড়ছে। এখন আর এটা লাবণ্যর জন্য কোনো সমস্যা তৈরি করে না, বরং কোনো কারণে অনিকেত পাশে না থাকলেই ওর ঘুমের সমস্যা হয়! কী অদ্ভুত!

***
সবচাইতে বড় অঘটনটা ঘটল ঈদের দিন। মাঝরাত থেকেই বৃষ্টি পড়ছিল। ঈদগাহে যাবার আগে আগে সেটা থেমেছে। লাবণ্যর বাবা জামানের সাথে সে বেরিয়ে গেল।

লাবণ্য এরপর তৈরি হতে গেল। অনিকেত এই প্রথম ওর জন্য একটা শাড়ি কিনে এনেছে একা একা গিয়ে। কিন্তু শাড়ির রঙ একেবারে ক্যাটকেটে। ওর একেবারেই পছন্দ হয়নি। এমন হলুদ ওকে একটুও মানায় না বলে এটা সে পরল না, শাশুড়ির দেয়া শাড়িটা পরল।

মাত্রই পরা শেষ করেছে, তখন বাইরে হট্টগোল শুনে বসার ঘরে এসে দেখল অনিকেতের প্রায় সারা গা কাদায় মাখামাখি। তীব্র বিস্ময় নিয়ে বাবার দিকে তাকাতে তিনি বললেন,

“বৃষ্টি হয়েছে তো, ওইদিকের গলিতে রাস্তায় পিচ সরে গিয়ে গর্ত হয়ে গেছে। সেটায়…”

অনিকেত একেবারে গোবেচারা মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। শিশুরা কোনো দুষ্টুমি করতে গিয়ে অঘটন ঘটিয়ে ধরা পড়ে গেলে যেমন অভিব্যক্তি হয়, এখন অনিকেতকেও ঠিক তেমন লাগছে। একটুতেই ঠান্ডা লেগে যায় বেচারার, ইতোমধ্যে তার হাঁচি শুরু হয়ে গেছে। লাবণ্য আর রাগ ধরে রাখতে পারল না। ওর দুই কাজিন এসেছে, সকাল সকাল। পাশেই ওদের বাসা। সেখানে আজ দুপুরে দাওয়াত আছে। তারা এবার মুখ টিপে হাসতে লাগল।

লাবণ্য অনিকেতের হাত ধরে সোজা বাথরুমে ঢুকিয়ে দিল।

তবে এটা কেবল সূচনা। গুরুতর বিপত্তি বাঁধল ওর চাচার বাসায় দাওয়াতে গিয়ে। সকালে শায়লা ওদের বেশ যত্ন করে খাইয়ে দিয়েছেন। ঈদের দিনের এত আয়োজন, তার উপর প্রথমবারের মতো জামাই এসেছে। সবমিলিয়ে ভরপেটের উপরে খাওয়া হয়ে গিয়েছিল।

এখন দুপুর হতেই আবারও এমন আয়োজন দেখে অনিকেত শঙ্কিত বোধ করল। কিন্তু চাচা-চাচি এত আন্তরিকতার সাথে প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছিলেন যে অনিকেত নিষেধ করতে পারল না। কী না কী মনে করেন তারা! সেটাই কাল হলো।

খাওয়া শেষে আর নড়াচড়া করা সম্ভব হচ্ছিল না। ভীষণ অস্থিরবোধ করছিল। বিছানায় শুয়ে ছটফট করছিল। ঘেমে নেয়ে একাকার। লাবণ্যর চোখে পানি এসে গেল। অনিকেতের হাত শক্ত করে ধরে বসে রইল।

চাচা আর বাবা ডাক্তার ডাকতে বেরিয়ে গেছেন কিছুক্ষণ আগে। অনিকেত একবার লাবণ্যর উতলা দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে প্রায় অস্ফুটস্বরে বলল,

“শাড়িটা তোমার পছন্দ হয়নি, তাই না?”

লাবণ্য স্থির হয়ে গেল। উত্তর দিতে পারল না, তার আগেই ডাক্তার চলে এলো।

অনিকেত যখন প্রশ্নটা করল, তখন যেন শারীরিক যন্ত্রণা ছাপিয়ে ছেলেটার ভেতরের অভিমানটুকু প্রকট হয়ে উঠেছিল। লাবণ্যর চোখ ভেঙে জল গড়ালো। কান্নার শব্দ যাতে বাইরে না আসে তাই মুখে আঁচল চে*পে ধরল।
……..
নুসরাত জাহান লিজা

চলবে।