তবু সুর ফিরে আসে পর্ব-৩৬+৩৭

0
2088

#তবু_সুর_ফিরে_আসে

৩৬ পর্ব

নিশালের এবারের ছুটিটা অনেক দিনের। ন‌ওশাদ এরকম ভাবে ছেলেকে আগে কখনো পায়নি। তাই ছেলের সঙ্গে বেশি বেশি সময় সে কাটাতে চাইছে। একটা ব্যাপার সে খেয়াল করেছে কোন জানি এবার নিশাল বীথির খুব একটা কাছে যাচ্ছে না ! অন্য সব বার ছুটিতে এসে নিশাল বীথির সঙ্গে থাকতে পছন্দ করতো। শপিং ঘুরাঘুরি বাহিরে খেতে যাওয়া সব বীথির সঙ্গে করতো । এখন সে বীথির সঙ্গে কোন প্ল্যান করছে না ।
ন‌ওশাদ ওদের নিয়ে আমেরিকা যাবে সেজন্য অফিসে অনেক সময় দিতে হচ্ছে কাজ গুছিয়ে রাখতে হচ্ছে। ফ্যাক্টরি , অফিস এসব করে আজ কয়েকদিন খুব ব্যস্ত সে। হেরা আর নিশালের সঙ্গে কথাই হচ্ছে না ভালো করে। বিশেষ করে হেরার সঙ্গে। ও সকালে ক্লাসে চলে যায় ন‌ওশাদ বের হ‌ওয়ার আগেই । ব্রেকফাস্টের সময় নিশালের সঙ্গে তবুও কথা হয় কিন্তু হেরার সঙ্গে রাতে ফিরেও কথা বলতে পারছে না । অনেক রাত হয়ে যাচ্ছে বাসায় ফিরতে ফিরতে তার । এত ক্লান্ত থাকে ডিনার করে রুমে ঢুকেই বিছানায় পড়েই ঘুম। কালকে হেরা একটু বিরক্ত হচ্ছিল বোঝা গেছে । বিছানায় শোয়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন ওর চোখ ঘুমে ভারী হয়ে যাচ্ছে হেরা বিরক্ত হয়ে বলল, আপনি তো দেখি বালিশ ঘুম মানুষ হয়ে গেছেন !
সেটা কেমন জিনিস হেরা ?
যে মানুষ বালিশে মাথা রাখার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে যায় তাদের বলে ।
সুখী মানুষের লক্ষণ এটা বুঝলে হেরা ! তোমার তো খুশি হ‌ওয়ার কথা তোমার স্বামী একজন সুখী মানুষ।
হেরা ওকে জড়িয়ে ধরে বলল, খুশি হতে পারছি না কারন আপনার সঙ্গে আমার কথা হচ্ছে না কয়দিন খেয়াল আছে !
সরি আমি খুব ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছি ! তোমাদের নিয়ে ঘুরতে যাব আমার কাজ তো ফেলে রাখা যাবে না ।
ঠিক তখনই নিশাল মামনি বলে ডাকতেই হেরা ওকে সরিয়ে দিয়ে চলে যেতে নিলো । ন‌ওশাদ যদিও দুষ্টুমি করে ওকে জাপটে ধরে রেখেছিল এক রকম ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বের হয়ে গিয়েছিল হেরা।
এলিনরা দুই বোন আর নিশাল, হেরা দারুন হৈচৈ করে বেড়াচ্ছে। গল্প, আড্ডায় বাসা খুব জমজমাট। শপিং, ঘুরাঘুরি বাসায় ছুটাছুটি করছে । হেরাকে সেরকম কিছুর জন্যই নিশাল ডেকে নিয়ে গেছে। হেরা ফিরে আসার আগেই ন‌ওশাদ গভীর ঘুমে অচেতন। রাতে কখন এসেছে হেরা সে টের‌ও পায়নি। মাঝরাতে একবার টের পেয়েছে হেরা যখন ওকে জড়িয়ে ধরেছে ঘুমের ঘোরে।
ন‌ওশাদের ভালো লাগছে খুব চারজনের দৌড় ঝাঁপ দেখে । এই যেমন এই মুহূর্তে চারজন সিনেপ্লেক্সে মুভি দেখতে গেছে। তারপর শপিং করে ফিরবে । হেরা ফোন দিয়েছিল রাতে ওরা বাহিরে ডিনার করবে সে ওদের সঙ্গে জয়েন করতে পারবে কিনা জানতে। একটা দাওয়াত আছে সে জন্য ন‌ওশাদ যেতে পারবে না । এখন ওরা চারজন‌ই ডিনার করবে বাহিরে। এত হৈচৈ আর আনন্দের ভিতরে আছে বলেই হয়তো নিশাল বীথির কাছে যাচ্ছে না । বীথি রাগে ফুঁসছে হয়তো। ন‌ওশাদ মনে মনে হাসলো।
ছেলেটার আনন্দ দেখে ‌ন‌ওশাদের খুব ভালো লাগছে। দুই বোন ও নিশালের বন্ধুর মত হয়ে গেছে। এদের জন্য আর হেরার জন্য ছেলে নিজের বন্ধুদের সঙ্গেও যাচ্ছে না খুব একটা। ভালোই হয়েছে ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরছে শুনলে ওর বুকে অজানা আশংকা ভর করে। ইয়াবা, নারী ঘটিত কুকর্মে এই বয়সী ছেলেরা যেভাবে ইনভল্বব হচ্ছে তারচেয়ে ঘরের মানুষের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে এটাই ভালো। হেরা নিশালের দ্বায়িত্বশীল মায়ের‌ও ভূমিকা পালন করছে দেখলো সেদিন।
নিশালের একটা বাজে অভ্যাস আছে পানি কম খায় এবং রাতে প্রায় সময়ই না খেয়ে ঘুমিয়ে যায়। হেরা কোন এক সময় আনারের মায়ের কাছ থেকে পানি কম খাওয়ার ব্যাপার টা শুনেছে এখন দেখা যাচ্ছে একটু পর পর ছেলের সামনে পানির গ্লাস ধরছে । না খেতে চাইলে জোর করছে। সেদিন রাতে খাবে না ঘোষণা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিশালকে ঝাড়িও দিলো । আবার কড়া গলায় বলল, নিশাল না খেলে সে নিজেও ডিনার করবে না। অগত্যা অনিচ্ছা স্বত্বেও নিশাল বাধ্য ছেলের মত ওদের পাশে বসে ডিনার করলো। নিশাল মাছ খায় না সেদিন হেরা ইলিশ মাছের কাটা বেছে প্লেটে তুলে দিলো নিশাল সেটা খেলো । হেরা বলল, ইলিশ মাছ না খাওয়া মানে বাঙালি হয়ে মাছ টাকে অপমান করা তাই এই মাছ তোমাকে খেতেই হবে, নিশাল আমি কাটা ফেলে দিচ্ছি তুমি খাও। দৃশ্যটা দেখে ন‌ওশাদের চোখে পানি চলে এলো। গীতি এরকম করতো নিশালের সঙ্গে ওর সঙ্গে।
ন‌ওশাদ তো এরকম একটা সংসার‌ই চেয়েছিল। তার সংসার টা আবার আগের মত হচ্ছে এটাই তাকে বেশি আনন্দ দিচ্ছে।
সেদিন জুম্মার গোরস্থানে গিয়েছিল নিশালকে নিয়ে সাধারণত গীতির কাছে গেলে সেদিন সারাক্ষণ নিশাল খুব চুপচাপ থাকে। কিন্তু ন‌ওশাদ এবার খেয়াল করলো নিশাল স্বাভাবিক আছে । বাসায় সবার সঙ্গে গল্প, হাসাহাসি করছে।
হঠাৎ মোবাইলে রিং এর শব্দে ন‌ওশাদ তাকিয়ে দেখে নিশালের ফোন।
হ্যালো পাপা।
বলো বাবা।
পাপা মামনি যদি ইউএসএ গিয়ে ওয়েস্টার্ন ড্রেস পরে তুমি কি রাগ করবে ?
ছেলের প্রশ্ন শুনে ন‌ওশাদের ভিমড়ি খাওয়ার মত অবস্থা ! বুঝলাম না বাবা কি বলতে চাইছো ? কোন টাইপের ওয়েস্টার্ন ড্রেস ?
এই যেমন ধরো জিন্স , টপস এসব !
তোমার মামনি কি পড়তে চাইছে ?
না ও পড়তে চাইছে না আমরা ওকে জোর করছি । মামনি বলছে তুমি রাগ করবে আর ওকে ভালোও নাকি লাগবে না। এখন তুমি আগে বলো তুমি রাগ করবে কিনা ? মামনি কে অনেক কিউট লাগবে তুমি দেখো পাপা।
যে পড়বে তার ইচ্ছা আমি রাগ করব কেন ? তোমার মামনি কি চায় সেটা খেয়াল করো ।
ঠিক আছে আমি ওকে বলছি তোমার কোন সমস্যা নেই।
ন‌ওশাদ মনে মনে হাসছে । নিশাল তোমরা কোথায় ?
পাপা আমরা বসুন্ধরা সিটিতে মুভি দেখলাম এখন মামনির জন্য শপিং করব । ও বেঁকে বসে আছে জিন্স কিনবে না তুমি রাগ করবে । আমি বারবার বলছি, পাপা ঐ টাইপের মানুষ না মাম্মাও তো দেশের বাহিরে গেলে পড়তো, না মামনি শুনছে না ।
ঠিক আছে মামনিকে বাঁকা থেকে সোজা করার দ্বায়িত্ব তোমার । মামনির জন্য জিন্স, টপস বাসায় চলে আসবে সমস্যা নেই আর তুমি যদি চাও নিজেরাই ঘুরে কিনবে তাহলে ওখানে আমাদের আউটলেটে নিয়ে যাও আমি ইনচার্জ কে বলে দিচ্ছি সে তোমাদের এটেন্ড করবে । আর একটা কথা মামনির ছবি পাঠাবে আমাকে দেখি ঘটনা কি দাঁড়ায়।
ঠিক আছে পাপা।
ফোন রেখে ন‌ওশাদ একা একাই হাসলো কিছুক্ষণ । তারপর শোয়েব কে ফোন দিয়ে বলল, বসুন্ধরা সিটিতে ওদের আউটলেট ইনচার্জ যেন নিশালদের এটেন্ড করে ।

হেরা কোন ভাবেই নিশাল আর এলিন, নাহিনদের বোঝাতে পারছে না যে সে কোন জিন্স পড়বে না। ওরা এক রকম জোর করেই ওকে ন‌ওশাদের কম্পানির ফ্যাশন আউটলেট ‘ হেরা’ তে নিয়ে এলো। বিশাল এক আউটলেট এখানে ছেলে, মেয়ে , বাচ্চাদের ফর্মাল, ক্যাজুয়াল , সব ধরনের তৈরি পোশাক পাওয়া যায় মেয়েদের শাড়ি ছাড়া। এই প্রথম হেরা র কোন আউটলেটে নিশাল আর হেরা এসেছে। আউটলেট ইনচার্জ ওদের এটেন্ড করার জন্য কর্মচারীদের নিয়ে দৌড় ঝাঁপ শুরু করে দিল।
তিনি খুব নার্ভাস হয়ে গেছেন দেখে নিশাল বলল, ভাইয়া প্লীজ আপনি অস্থির হবেন না আমরা অন্যান্য কাস্টমারদের মত দেখব যা পছন্দ হবে বলব, আপনি এরকম করলে সবার সামনে লজ্জায় পরে যাচ্ছি আমরা।
কি বলেন স্যার , আপনারা আর অন্য কাস্টমার কি এক !
ঠিক আছে ভাইয়া আপনি যেকোন একজনকে দিন তাহলেই হবে।
নিশালের অনুরোধের পরেও ইনচার্জ সহ পাঁচ জন হেরা, এলিন, নাহিনদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল।
সেলসগার্ল গুলো যখন হেরাকে নিয়ে ব্যস্ত হঠাৎ হেরার সেই বান্ধবী রিমার সঙ্গে দেখা ওর।
হেরা তুমি এখানে !
কেমন আছো রিমা ?
ভালো।
হেরা এলিন নাহিনদের পরিচয় করিয়ে দিল ওর বান্ধবীর সঙ্গে ।
তোমাকে যেখানেই দেখি অবাক হয়ে যাই সেদিন সিলেটে আজ এখানে ?
অবাক হচ্ছেন কেন , নাহিন প্রশ্ন করলো ?
আসলে ওর সঙ্গে আমার যখন পরিচয় হয় সেই হেরা আর এখন চোখের সামনে যে হেরা দুটোকে ভিন্ন মানুষ লাগে । বারবার চমকে যাচ্ছি! আপনারা কি তখনের হেরাকে দেখেছেন ,দেখলে আপনারাও অবাক হতেন!
হেরা রিমার হাত ধরে বলল, রিমা আকাশের সূর্য টা প্রতি সেকেন্ডে তার রং, তেজ, আলো, বদলায় মানুষ তারচেয়েও বেশি দ্রুত বদলায় । ধরে নাও আমিও তাই ।
তাই বলে এত বদল হেরা ! তুমি খুব সাধারণ একটা মেয়ে ছিলে, বোরকা, নেকাবের আড়ালে লুকিয়ে থাকা চুপচাপ একটা মেয়ে ! হ্যাঁ নেকাবটা খুললে তুমি সবার চেয়ে আলাদা ছিলে কারণ আমাদের ক্লাসে তোমার মত সুন্দরী আর কেউ ছিল না। তুমি ভালো স্টুডেন্ট ছিলে । সৌন্দর্য আর পড়াশোনা করা ছাড়া তোমার কোন বিশেষত্ব ছিল না। না মানে তুমি অন্য মেয়েদের মত ছিলে না !
আচ্ছা আপু বৌমনি কেমন ছিল গো, এলিন বলল? ওরা ঘুরে ঘুরে ড্রেস দেখছে আর কথা বলছে।
হেরা বুঝতে পারছে এলিন রিমাকে আজকে সাইজ দিবে ! রিমা বাঁকা কথা শুরু করেছে ও জানে না এলিন আর নাহিন হেরার মত না খোঁচা দিয়ে কথা বলা মানবে না।
আপনার বৌমনি কে অনালাইসিস করার মত সময়‌ই ছিল না আমাদের গ্রুপের । আমরা খুব মাস্তি করতাম । হৈচৈ করতাম।
আপনারা কি করতেন জানতে চাইনি তো । ও কি করতো সেটা বলেন ?
ও খুব চুপচাপ একটা কোনায় বসে থাকতো। খুব মনোযোগ দিয়ে ক্লাস করতো । স্যাররা প্রশ্ন করলে উত্তর দিতো । কখনো ক্লাসের বাহিরে ওকে দেখা যেতো না কোথাও।
ও আচ্ছা এসব কিছুই অস্বাভাবিকতা বলছেন , নাহিন বলল।
আসলে আমরা খুব মজা করতাম ও এসব করতো না ।
হয়তো বৌমনি অন্য কিছুতে মজা খুজে পেতো ।‌সব মানুষের মজা পাওয়ার জায়গা কি এক ?
সবচেয়ে অবাক লাগছে ওকে এখনের হেরা হিসেবে দেখে । তুমি তিন মাসের মত ক্লাস করে ডুব দিলে তারপর অনেক দিন পর অন্যরকম ভাবে পেলাম তোমাকে ।
এটা ঠিক বলেছো রিমা ! মানুষের জীবনে বিয়ে অনেক বড় একটা পরিবর্তন আমিও যা বদলেছি সে জন্যই বদলেছি।
কি কেনাকাটা করলে হেরা ?
দেখছি কি কেনা যায় !
ফিসফিস করে রিমা বলল, এখানে সব কিছু মারাত্মক দাম !
আমার‌ও তাই মনে হচ্ছে রিমা ! তুমি কি কিনতে এলে ?
আমার সামনে ম্যারেজ ডে ওর জন্য গিফট কিনতে এসেছি। এখানে জিনিস সুন্দর কিন্তু দাম বেশি ।
আচ্ছা হেরা একটা ব্যাপার সত্যি করে বলো তো , সেদিন সিলেটে তুমি বললে না তোমার হাজব্যান্ড এর রিসোর্ট এ আছো তুমি, এটা কি চাপাবাজি ছিল তাই না ? আমি তখন‌ই বুঝতে পেরেছি ! একটা রিসোর্টের মালিক মানে কি বুঝো তুমি হেরা ?
রিমা সত্যি বলেছো আমি ওসব কিছুই বুঝি না !
নাহিন, এলিন খুব মজা পাচ্ছে মেয়েটার কথায়।
আমার বর কে বললাম ও বলল , হয়তো হাজব্যান্ড বোকা সোকা ব‌উ পেয়েছে তাই চাপাবাজি করেছে তোমার বান্ধবীর সঙ্গে । হাসতে হাসতে রিমা গড়িয়ে পড়ছে। স্বামীরা কখনো কখনো ব‌উদের ইমপ্রেস করতে কত কি বলে !
হেরা ঠোঁটের সঙ্গে ঠোঁট কামড়ে তাকিয়ে আছে।
নাহিন হেরার কানে কানে বলল , শুনিয়ে দেই কয়টা কথা বৌমনি।
বাদ দাও।
ওদের কথার মাঝখানে সেলস গার্ল রা অনেক গুলো কুর্তি আর জিন্স নিয়ে এলো । হেরাকে আর নাহিন, এলিনদের দেখাচ্ছে খুব মনোযোগ দিয়ে। অন্য কাস্টমারদের থেকে ওদের প্রতি এত মনোযোগ দেখে রিমাও দাঁড়িয়ে দেখছে ব্যাপার টা।
একটুপর হেরা ট্রায়াল রুম থেকে বের হতেই নিশাল দৌড়ে এলো ওদের কাছে ছবি তুলল হেরার।
হেরা লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছে।
খুব স্মার্ট লাগছে তোমাকে বৌমনি।
নিশাল তুমি কোথায় ছিলে ?
মামনি আমি পাপা আর আমার জন্য কিছু নেয়া যায় কিনা দেখছিলাম।
এলিন, নাহিন ই পছন্দ করলো হেরার ড্রেস হেরার কোন আপত্তি কানে তুলল না ওরা ।
রিমা হেরার কাছে এসে বলল, তোমার সঙ্গিরা তোমাকে বিপদে ফেলছে হেরা তুমি কি ড্রেস গুলোর দাম খেয়াল করেছো । এত গুলো নিচ্ছ যে ! ছেলেটা কে হয় ?
কথাটা শুনেই নাহিন ফট করে বলে উঠলো এক্সকিউজ মী আপু একটা কথা বলি, শোরুমটার নাম টা খেয়াল করেছেন ?
হ্যাঁ এইচ ই আর এ
মানে কি দাঁড়ায় , হেরা । কার নামে এই ব্রান্ড টা জানেন ?
কার আমি কিভাবে জানব ?
কথা বলতে হলে অনেক কিছু জানতে হয় , না জেনে কথা বলে একমাত্র মুর্খরা । আপনি তো শিক্ষিত মানুষ তাহলে জানবেন না ! আপনার বান্ধবী যাকে একসময় খুব সাধারণ দেখেছেন তার নামে এই ব্রান্ড । এই সব প্রোডাক্ট তার হাজব্যান্ড এর কম্পানির । আর একটা কথা আপনার হাজব্যান্ড কে বলবেন সবাই চাপাবাজ হয় না ঠিক আছে । ঐ রিসোর্ট আপনার বন্ধুর‌ই আই মীন তার হাজব্যান্ডের ই । আপনার যদি কোন কিছু কিনতে ইচ্ছা করে ম্যানেজার কে বলে দিচ্ছে বৌমনির অনারে ডিসকাউন্ট দিয়ে দিবে আপনাকে।
রিমা অবাক চোখে তাকিয়ে আছে !
হেরা নাহিনকে হাত ধরে আটকানোর চেষ্টা করলো কিন্তু ও এসব রিমাকে বলেই গেল।
সরি রিমা তুমি কিছু মনে করো না । ও একটু এমন‌ই।
এসো তো বৌমনি বলে হেরাকে টেনে কাউন্টারে নিয়ে গেল নাহিন।
বিল মিটিয়ে ওরা বের হ‌ওয়ার সময় নিশাল বারবার প্রশ্ন করছিল কি হয়েছে তোমাদের ওখানে ?
কিছু না তোমার মামনি র বন্ধু ওকে দেখে খুব অবাক হয়েছে আমরা সেটা নিয়ে গল্প করছি।
ও ।
গাড়িতে বসে নিশাল বলল,
আমি পাপাকে মামনির ছবি পাঠিয়ে দিয়েছি ।
কি ? হেরা আঁতকে উঠলো !
কেন?
পাপা বলেছিল পাঠাতে । তোমাকে দেখতে চাইছিল।
ইস উনি কি বলল? হেরা জিব কাটলো লজ্জায়।
দেখো লাইক দিয়েছে ।
নাহিন বলল, আমি তো ভেবেছিলাম ভাইয়া একটা রেড লাভ পাঠাবে । বলেই দুই বোন হেসে দিলো।
হেরা চোখ পাকাচ্ছে নিশালের সামনে কি বলছো এসব তোমরা ।
এলিন ফিসফিস করে হেরার কানের কাছে এসে বলল, বাসায় ড্রেস গুলো পড়ে দেখাবে যখন তখন ভাইয়া কিস রিয়েকশন টা লাইভ দিবে তোমাকে ।
হেরা এলিনের মুখ চেপে ধরলো । চুপ বেশি কথা বলে।
দুই বোন হাসছে হি হি করে ।

রাতে ডিনার করে ওরা বাসায় ফিরে এসে দেখে ন‌ওশাদ আসেনি তখন‌ও ।
হেরা চেন্জ করে রুম থেকে বের হয়ে দেখে , দুই বোন লিভিং রুমে বসে টিভি দেখছে।
আচ্ছা তোমরা রিমাকে এত কথা না বললেও পারতে ও কি ভাবছে কে জানে ?
তুমি চুপ করো বৌমনি , যার যা ইচ্ছা তোমাকে বলে আর তুমি বাদ দাও বাদ দাও বলো! তুমি কি বলো তো ?
আমি এমন‌ই ঝামেলা ভালো লাগে না আমার!
সে জন্যই তো ঐ বীথি তোমাকে যখন ইচ্ছা তখন যা খুশি বলে যায় !
চুপ ! নিশাল শুনবে হেরা আশেপাশে তাকালো !
শোন বৌমনি আমরা যা বলি শুনে দেখো একবার, দুই দিনের মধ্যে বীথিকে জন্মের সাইজ দিয়ে দিতে পারবে , এলিন বলল !
আমাকে তো ভূতে পেয়েছে তোমাদের দুই বোনের কথা শুনি ! হেরা উঠে শ্বশুরের রুমে ঢুকে গেল ।
নাহিন ওরে দিয়ে কিচ্ছু হবে না বুঝলি , কিছু মানুষ দুনিয়াতে আসেই অন্য মানুষের কথা শোনার জন্য বৌমনি হলো এমন‌ই মানুষ।
ঠিক কথা বলেছো !
হঠাৎ সিঁড়ি দিয়ে ন‌ওশাদকে আসতে দেখে এলিনের মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল !
সে ন‌ওশাদ কে শুনিয়ে শুনিয়ে নাহিনকে বলা শুরু করলো,
বৌমনি বলেই এত কষ্ট হাসিমুখে সহ্য করছে আমি হলে খেয়েই ফেলতাম ঐ বীথি আপা কে বুঝলি নাহিন !
ঠিক বলেছিস এত কষ্ট কিভাবে দিতে পারে বৌমনিকে নরম, অসহায় পেয়েছে তাই দিচ্ছে।
ন‌ওশাদ ওদের কথা গুলো সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে শুনলো। তারপর ওদের সামনে এসে দাড়ালো !
এলিন !
জ্বি ভাইয়া ।
কি হয়েছে ?
কোথায় ?
বীথি হেরার সঙ্গে কি করেছে ? ন‌ওশাদ ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
এলিন দুই সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল, বৌমনি কে নিশালের বার্থডে পার্টিতে অনেক কথা শুনিয়েছে । বৌমনি খুব কেঁদেছে কিন্তু আপনাকে বলতে নিষেধ করেছে প্লিজ আমি টের পাইনি আপনি শুনছেন । সরি আপনাদের ফ্যামিলির ব্যাপারে কথা বলে ফেললাম কিছু মনে করবেন না ভাইয়া । বৌমনি অনেক নরম স্বভাবের তাই ওকে উনি কথা শোনায় সুযোগ পেলেই।
থ্যাংকস এলিন । তোমার বৌমনি কোথায় ?
নিশালের দাদার রুমে !
হুঁ । ন‌ওশাদ নিজের ঘরে ঢুকে গেল।
এলিন আর নাহিন খুব এক্সাইটেড এবার বীথি রানী মজা টের পাবে বুঝলি নাহিন।
হি হি ।
চল রুমে বৌমনি আসার আগে এখান থেকে কেটে পড়ি , নাহিন বলল।
চল।
হেরা কিছুক্ষণ পর নিজের রুমে ঢুকে দেখে ন‌ওশাদ চলে এসেছে !
আপনি কখন এসেছেন ?
এই তো দশ মিনিট হবে । ন‌ওশাদ সোফায় বসে টিভির চ্যানেল চেন্জ করছে। হেরা এসে ওর পাশে বসলো ।
খুব টায়ার্ড আপনি , মাথায় হাত বুলিয়ে দেই ?
লাগবে না আই এম ফাইন !
আমরা আজ অনেক মজা করেছি । খুব টায়ার্ড লাগছে এখন। নিশাল তো এসেই ঘুমিয়ে গেছে ।
ন‌ওশাদ চুপ করে আছে ।
হেরা উঠে গিয়ে রুমের আলো গুলো কমিয়ে দিলো ।
হেরা !
জ্বি ।
এদিকে এসো । আমার সামনে দাড়াও ।
হেরা ন‌ওশাদের সামনে এসে দাড়ালো ।
তোমার আমাকে কেমন মানুষ মনে হয় ?
কি হয়েছে ? হেরা চিন্তিত মুখে তাকালো ।
উত্তর দাও।
আমি আগেই বলেছি আমার দেখা সবচেয়ে ভালো মানুষ আপনি, হেরা খুব সুন্দর করে হাসলো ন‌ওশাদের দিকে তাকিয়ে।
সেদিন বললে আমি তোমার সবচেয়ে কমফোর্ট জোন তোমার বন্ধু তাই না ?
হুম। আপনি রাগ করেছেন ওসব জিন্স কেনাতে আমি জানতাম আগেই বারবার বলেছি ওদের এখন হলো তো !
ন‌ওশাদ ঝট করে দাঁড়িয়ে দুই হাত দিয়ে ঝাঁকুনি দিল হেরাকে তাকাও আমার দিকে !
হেরা বিস্ময় এবং ভয়ে ন‌ওশাদের দিকে তাকালো ! সে গত ছয় মাসে এমন শক্ত চোখ মুখ করে থাকতে দেখেনি ন‌ওশাদ কে ! ওর বিস্ময়ের ঘোর কাটছে না !
তোমাকে বীথি কি কি কথা শুনিয়েছে সব কথা একটা একটা করে আমাকে বলো এবং এই মুহূর্তে ।
হেরা চোখ নামিয়ে ফেলল।
বলো হেরা ! আমি মনে হয় তোমাকে বলেছিলাম তোমাকে কেউ কিছু বললে আমাকে বলতে ।
থাক না এসব কথা , হেরা বিড়বিড় করে বলল।
আমি শুনতে চাইছি হেরা ?
হেরা চুপ করে আছে।
বলো ।
হেরা বীথির বলা সব গুলো কথা বলল । ওর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে কথা গুলো বলার সময় । ন‌ওশাদ রাগে কাঁপছে ! হেরা এমন ন‌ওশাদকে আগে কখনো দেখেনি। ওর খুব ভয় লাগছে ।
ন‌ওশাদ হেরার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ তারপর আচমকাই হেরাকে বুকে জড়িয়ে ধরলো । সরি হেরা সেদিন রাতে অনেক কষ্ট পেয়ে আমাকে তুমি আঁকড়ে ধরেছিলে হয়তো, আমি বুঝতে পারিনি । আমার মাঝেই মগ্ন হয়ে ছিলাম। সরি ।
হেরা কাঁদতে কাঁদতে বলল , আমার মনে হচ্ছিল আপনি আমাকে একটু আদর করে দিলেই আমি সব কষ্ট ভুলে যাব।
তাহলে আমাকে সব বললে না কেন ? ন‌ওশাদ হেরার কপালে চুমু খেলো।
আপনি কষ্ট পাবেন তাই বলিনি আর আপনাদের মাঝে ঝামেলা হোক আমি চাই না।
আমি বীথিকে কালকেই ডেকে আনছি এত বড় বড় কথা তোমাকে শোনানোর অধিকার ওকে কে দিয়েছে আমি জানতে চাইব ?
আপনার কাছে আমার অনুরোধ আপনি উনাকে কিছুই বলবেন না ।
আশ্চর্য হেরা তুমি বলছো এই কথা !
হুঁ নিশালের কথাটা চিন্তা করেন ও ওর খালাকে খুব ভালোবাসে !
তাই বলে বীথি তোমার সঙ্গে যা ইচ্ছা তাই করবে আর বলবে ?
উনি বললেই হলো নাকি, আমাকে যখন বলেছে কথা গুলো তখন কষ্ট পেয়েছি এখন আমার মাঝে কোন কষ্ট নেই । বিশ্বাস করুন।
তাই বলে ও তোমাকে যা ইচ্ছা তাই বলতে পারে না হেরা।
আমার নানাভাই একটা কথা বলতো , কখনো কখনো আঘাত না করেও অনেক কঠিন জবাব দেয়া যায়।
আমি তোমার নানার মত সাম্যবাদী মানুষ না হেরা !
হেরা ন‌ওশাদকে বিছানায় বসালো দুই হাত দিয়ে ন‌ওশাদের মুখটা তুলে ধরে বলল, আমি দুই দিন উনার কথায় খুব কষ্ট পেয়েছি তারপর নানা ভাইয়ের কথাটা মনে হলো তখন আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি নিশালকে এতটা আদর আর ভালবাসা দিব যেন সত্যি সত্যি নিশাল আমাকে তার মায়ের জায়গাটা দিয়ে দেয় । এটাই হবে বীথি আপুর কথার জবাব।
কিন্তু আমার খুব কষ্ট লাগছে হেরা আমাদের যে বাচ্চা জন্ম‌ই নেয়নি তাকে কেউ এত টা বাজে গালি দিলো ! এই দুঃখ কোথায় রাখব তুমি বলো ?
হেরা ন‌ওশাদের চোখে চোখ রেখে বলল, সেরকম কেউ তো আসবে না আমাদের লাইফে , এত কষ্ট পাওয়ার কি আছে আমাদের !
মানে , বুঝলাম না ?
নিশাল ছাড়া আমাদের তো আর কোন সন্তান হ‌ওয়ার সম্ভাবনা নেই তাই না ? তাই খালি খালি মনে মধ্যে অশান্তি বোধ করে লাভ কি ?
আমাদের আর কোন সন্তান হবে না তোমাকে এই কথা কে বলল ? ন‌ওশাদ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে হেরার দিকে !
হেরা চোখ নামিয়ে ফেলল , আপনিই না বললেন কিছুদিন আগে ।
কি বলেছি বাচ্চা লাগবে না আমার ?
বাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে থাকতে হবে না আমাকে পড়াশোনা করতে হবে মনোযোগ দিয়ে ।
সেটাতো পড়াশোনা করা পর্যন্ত তাই বলে তোমার আমার কোন প্ল্যান থাকবে না সেটাতো বলিনি হেরা ! তুমি ভাবলে কিভাবে আমি তোমাকে এত বড় অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখব ! ন‌ওশাদ ধাক্কা দিয়ে হেরাকে বিছানায় শুইয়ে দিলো তারপর হেরার দিকে ঝুঁকে বলল, আমার তো ইচ্ছে করছে এই মুহূর্তে তোমাকে বুঝিয়ে দিতে আমি আসলে কি চাই !
কি চান আপনি ?
সময় হোক জানবে, ন‌ওশাদ হেরার ঠোঁটে আলতো করে চুমু খেলো।
ন‌ওশাদ হেরাকে নিজের বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো , হেরা আমার সত্যি সত্যি খুব শখ ছিল আমার তিন চারটা বাচ্চা থাকবে । গীতির নিশাল হ‌ওয়ার আগেই কমপ্লিকেসি ধরা পড়লো নিশাল‌ই ওর আমার অনেক দোয়ার ফসল । নিশালের পর অনেক ঝামেলা বাড়লো ওর শরীরে আমিই ওকে বলতাম আর বাচ্চাকাচ্চা লাগবে না আমার। ও যেন মনে কষ্ট নিয়ে না থাকে তাই ।
কিন্তু সত্যি কথা বলতে, আমার খুব ভালো লাগে বাচ্চাকাচ্চায় ভরা একটা বাড়ি। আমরা চার ভাই বোন ছিলাম, কাজিনরাও থাকতো খুব হৈচৈ করে জীবন পার হয়েছে । আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ আমাকে অনেক সম্পদ দিয়েছে আমি চাই আমার সন্তানরা এসব কিছু খুব আনন্দ নিয়ে ভোগ করবে আমি দেখব।
ন‌ওশাদ হেরার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, আমি যদি তোমার কাছে অন্তত দুইটা বেবি আশাকরি তুমি কি না করবে ?
হেরা মাথা নেড়ে না করলো লজ্জায় ওর ফর্সা মুখ লাল হয়ে গেছে। না করবো কেন?
তুমি মনে কষ্ট নিয়ে বসে থেকো না শুধু পড়াশোনা টা শেষ করো আগে তারপর যা হ‌ওয়ার হবে ইনশাআল্লাহ। একটা মেয়ে পরিপূর্ণ নারী হয় তখন‌ই ,যখন সে নিজের গর্ভ থেকে একটা সন্তানের জন্ম দেয়। আমি তোমাকে সেই পরিপূর্ণতা থেকে বঞ্চিত করে রাখার কেউ না । মেয়েদের সৃষ্টি কর্তা প্রচন্ড ক্ষমতা দিয়ে পাঠিয়েছেন তারা এই মানবসভ্যতা কে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে পুরুষের ভূমিকা সেখানে সামান্য ।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে র‌ইলো।
তুমি এত কষ্ট বুকে পুষে বসে ছিলে আমাকে বললে কি হতো ?
এখন আমার মনে কোন কষ্ট নেই , এই যে আপনি বুকে জড়িয়ে ধরে আছেন । হেরা শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো ন‌ওশাদকে।
হেরা আমি বীথির সঙ্গে এবার বোঝাপড়া টা করতে চাই তুমি বাঁধা দিও না।
প্লিজ আমার কথাটা শুনেন, যত কিছুই বলেন উনি নিশালের আপনজন আপনি বা আমি উনার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলে নিশাল কষ্ট পাবে। আর এটা তো সত্যি নিশালের মায়ের অনুপস্থিতিতে উনি নিশালকে মায়ের স্নেহ দিয়েছেন। অন্তত সেই জন্য উনাকে আমরা কিছু না বলি।
ঠিক আছে আমি কিছু বললাম না , কিন্তু তুমি আমাকে কথা দাও নেক্সট টাইম ও একটা কথা বললে তুমি ওকে দশটা জবাব দিয়ে দিবে।
ঠিক আছে দশটা না একটা কথার অন্তত একটা জবাব‌ই দিয়ে দিব।
গুড। তুমি এত সহজ কেন হেরা ?
কারণ আপনি অনেক ভালো তাই ! হেরা ন‌ওশাদের বুকে নাক ঘষতে ঘষতে বলল।
তাই ?
হুম।
এখন সত্যি করে বলুন তো আপনি এই কথা গুলো কোথা থেকে শুনলেন?
সব জানতে হয় না !
হয় । ঐ দুই বোন বলেছে ?
কে আমি কারো নাম ম্যানশন করি নাই !
প্লিজ বলুন না।
উহু বলব না।
প্লিজ।
চুপ এক দম চুপ। এখন কোন কথা হবে না হেরা।
শুনি না।
তোমার মুখ কিভাবে বন্ধ করতে হয় দেখাচ্ছি দাড়াও।
প্লিজ প্লিজ প্লিজ হেরা দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে আছে।

( চলবে)

#তবু_সুর_ফিরে_আসে

৩৭ পর্ব

হেরা জীবনে একটা সময় অনেক কষ্ট ,অনেক দুঃখ ভোগ করেছে বলেই হয়তো জীবন ওকে দুহাত উজাড় করে দিচ্ছে। যে হেরাকে এক সময় বুকে আগলে রাখতো ওর নানাভাই আজ ন‌ওশাদ তাকে স্বামীর আদরে, ভালোবাসায়, স্নেহে , আহ্লাদে ভরিয়ে রাখে। তার থেকে অর্ধেক বয়সের ছোট একটা মেয়ে বলেই ন‌ওশাদ ওকে দ্বায়িত্বের চেয়ে প্রশ্রয় দিতে পছন্দ করে। কিন্তু মেয়েরা স্বামীর নামের মানুষটার উপর অধিকার বোধ ফলাতে সবচেয়ে বেশি পারদর্শী হয়। হেরা ন‌ওশাদকে রীতিমতো শাসন করে। ওর জন্যেই হাজার কাজ থাকলেও রাত আটটার ভেতরে অফিস থেকে এসে পড়তে হচ্ছে। কিছুদিন কাজ বেশি করতে হচ্ছে বুবুর ওখানে যাবে বলে। একদিন অফিস থেকে এসে একটু অসুস্থ বোধ করছিল ক্লান্তিতে । হেরা তারপর থেকে তুলকালাম করে ফেলে আটটা বেজে গেলেই। একদিন তো নিশালকে নিয়ে অফিসের নিচে চলে এলো ন‌ওশাদ কে নেয়ার জন্য। সন্ধ্যা থেকেই হাজার বার ফোন দিবে কখন আসবেন বলেন। দেরি করলে গাল ফুলিয়ে রাখবে। সেই অভিমান ভাঙ্গাতে ন‌ওশাদের অনেক সময় ব্যয় করতে হয়।
নিশাল ও তার মামনির পক্ষ নিবে। ছুটিতে এসে সে পুরো মামনির ছেলে হয়ে গেছে।
সকালে ঘুম ভেঙ্গে ন‌ওশাদ দেখে হেরা বিছানায় নেই । ও একটু অবাকই হলো। ঘুম কাতুরে হেরা ছুটির দিনে উঠে গেছে সকাল সকাল ! কিন্তু ন‌ওশাদের আজ খুব আলসেমি ভর করে আছে । তার ইচ্ছে করছে না উঠতে । বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছে দেখেই হয়তো আরও বেশি আলসেমি ভর করে আছে।
হেরা কোথায় তুমি ? মনে মনে ভাবছে ন‌ওশাদ। ভাবতে ভাবতে অবার চোখ লেগে গেল ঘুমে। মিনিট দশেক পর ঘুমটা আবার ভেঙে গেল। তাকিয়ে দেখে শুভ্র সাদা জামিনে নীল পাড়ের একটা শাড়ি পড়ে হেরা ওর সামনে। চুল গুলো পুরো পিঠ ময় ছড়ানো। কপালে নীল টিপ । হাত ভর্তি চুড়ি ।
কি ব্যাপার ! এই পরী টা কোথা থেকে এলো সাত সকালে ?
কোথায় ?
আমার সামনে এই যে , আজ কোন বিশেষ দিন হেরা ?
কিছু না তো।
তাহলে আমার মাথা নষ্ট করার জন্য এই সাজ কেন !
মাথা নষ্ট করার জন্যই। হাসছে হেরা।
ন‌ওশাদ উঠে বসলো সত্যি কিন্তু মাথা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কোথাও যাচ্ছো তুমি ?
না আপাতত যাচ্ছি না কোথাও কিন্তু কেউ আমাকে কোথাও নিয়ে গেলে যেতে রাজি আছি।
সেই কেউ টা কি আমি ?
যে কেউ হতে পারে ।
কি যে কেউ হলেই যাবে , ও আমি আরো মনে মনে খুশি ই হচ্ছিলাম ব‌উ কে নিয়ে ঘুরতে চলে যাই আজ কোথাও ।
যখন যাওয়ার তখন যাওয়া যাবে এখন উঠেন প্লিজ।
আমার হাত ধরে তুলো।
আবার হাত ধরতে হবে কেন ?
আমার হাত ধরলে দেখো কি ম্যাজিক হয় ধরে দেখো !
ম্যাজিক হবে , ঠিক আছে দেখি হেরা ন‌ওশাদের হাত টা ধরলো।
ন‌ওশাদ হাত ধরার সঙ্গে সঙ্গে টান দিয়ে বুকের কাছে নিয়ে এলো । এত সুন্দর লাগছে তোমাকে মনে হচ্ছে সারাক্ষণ তাকিয়ে দেখি। হেরার কানের পিছনে ঠোঁট ছোয়ালো ন‌ওশাদ।
আমি জানতাম এই ম্যাজিক ই হবে !
প্লিজ ফ্রেশ হয়ে নিচে আসেন , আব্বা অপেক্ষা করছে খাবার টেবিলে।
ঠিক আছে আসছি যাও। কিন্তু আসল ম্যাজিক টা তো দেখালাম ই না তোমাকে হেরা।
আমি জানি কি ম্যাজিক দেখাবেন , সব ম্যাজিক পরে দেখব এখন নিচে আসেন তাড়াতাড়ি।
হেরা নিচে চলে গেল।

ন‌ওশাদ নিচে নেমে দেখে বাসার সবাই কিছু একটা নিয়ে কানাঘুষা করছে। ঘটনা যা শুনলো সে খুবই অবাক হলো !
আজ হেরার জন্মদিন হতে পারে। হেরা কাউকে বলেনি এলিন ধারণা করলো।
নিশাল মন খারাপ করছে আগে জানলে কত কি করা যেত।
এলিন নিশালের কানে কানে বলল, চলো ও যখন বলছে না নাটক করছে আমরা ওকে সারপ্রাইজ দেই ।
কিভাবে?
কেক -টেক নিয়ে আসি , পার্টি করি।
তুমি শিওর তো আজ মামনির জন্মদিন ফুপি ?
শিওর দাদাকে সালাম করতে দেখেছি রুমের ভেতরে । খালি খালি সালাম করবে কেন?
পাপাকে জিজ্ঞাসা করি ।
ন‌ওশাদ জানে না কিছু । সে নিজেও অবাক হেরাকে দেখে।
নিশাল থাক তোমার মামনি যতক্ষণ না বলে আমরা চুপচাপ থাকি তোমাদের কোন প্ল্যান থাকলে তোমরা করো ও আনন্দ পাবে।
তুমি জিজ্ঞেস করো না পাপা ?
বলবে না ।
খাওয়ার টেবিলে বসে ন‌ওশাদ মুচকি মুচকি হাসছে হেরার দিকে তাকিয়ে ।
হাসছেন কেন ? হেরা অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো ।
কেন হাসলে জরিমানা করবে ?
কারণ ছাড়া হাসলে করব ।
মামনি তুমি যে কারণ ছাড়া এত সুন্দর করে সেজে বসে আছো আমাদের কিছুই বলছো না তার জন্য কি জরিমানা হবে বলো?
কারণ টা কিছুই না সকালে উঠে মনে হলো এই শাড়িটা পড়ি এতটুকুই!
ন‌ওশাদ বলল, ঠিক আছে বলতে হবে না । হেরা তুমি আমাদের লাগেজ বের করে গোছগাছ শুরু করো আর তো মাত্র কয়দিন । ন‌ওশাদ কাজ আছে লান্চের আগেই চলে আসব বলে বের হয়ে গেল।
একটুপর এক এক করে নিশাল, এলিন, নাহিন‌ সবাই বাহিরে চলে গেল। হেরা খুব অবাক হলো ! কারণ ছুটির দিনে সকালে সবাই বাসায়‌ই থাকে ।‌ হেরা মন খারাপ করে নিজের ঘরে বসে র‌ইলো কিছুক্ষণ।
আসলে আজকে তার জন্মদিন । কিন্তু কোন দিন জন্মদিনে বিশেষ ভাবে কিছু করেনি। কাউকে বলতে তার খুব অস্বস্তি লাগছে।‌ আগে সকালে উঠে সে নানা কে সালাম করতো ।‌নানা তাকে কিছু টাকা দিতো সেটাই ছিল তার জন্মদিনের পাওয়া বিশেষ কিছু। আজ সকালে উঠে গোসল করে নতুন একটা শাড়ি পড়েছে ।‌ সুন্দর করে সেজেছে । শ্বশুর কে সালাম করেছে ।‌ শ্বশুর বলল, আজকে কি ঈদ বৌমা ?
না আব্বা !
এমনি মনে হলো আপনাকে সালাম করি !
বুঝেছি আজ তোমার জন্মদিন । তোমার শ্বাশুড়ি ও এভাবে জন্মদিনের দিন সালাম করতো । ওর জন্মদিন পহেলা শ্রাবণ ।
পহেলা শ্রাবণ এলে মনে করিয়ে দিও আমাকে ।
জ্বী আব্বা।
আর আমাদের বিবাহ বার্ষিকী পনের আষাঢ়। আষাঢ় মাসে কারো বিয়ে হয় বলো ! কিন্তু আমাদের হয়েছিল । অনেক বৃষ্টি ছিল বিয়ের দিন রাতে ।
হেরা অবাক হয়ে কিছুক্ষণ শুনলো শ্বশুরের কথা । কত ভালোবাসেন মৃত স্ত্রী কে গল্প শুনেই বোঝা যাচ্ছে।
একটু পর আনারের মায়ের সঙ্গে তিন তলায় গিয়ে স্টোর রুমে ঢুকলো হেরা , সঙ্গে পারুল ।
আম্মা এখানে এক সাথে দুইটা স্টোর রুম প্রথমে শুধু সুটকেস রাখার‌ই একটা ঘর । কত ধরনের সুটকেস যে আছে এখানে আপনে কোন টা নিবেন কন । সব নামায় দিব।
ভেতরের ঘরটা তে কি ?
আম্মা ঐখানে সব পুরাতন জিনিস। আগের আম্মার কাপড় রাখা আছে এক আলমারিতে । উনার ছবির ফ্রেম আছে । স্যার আর উনার ছবির এলবাম। উনার ব্যবহার করা জিনিস পত্র। সুন্দর ক‌ইরা গুছায় রাখা এই ঘরে।
হেরা ঘর টাতে ঢুকলো । আলমারি খুলে গীতির শাড়ি , থ্রী পিস সুন্দর করে টাঙ্গিয়ে রাখা ছুঁয়ে দেখলো সে। গীতি আর ন‌ওশাদের ছবির এলবাম । হেরা এলবাম গুলো খুলে দেখলো কিছুক্ষণ। নিশালের ছোটবেলার ছবি তার মায়ের সঙ্গে। ফর্সা সুন্দর একটা ছোট বাচ্চা কোলে ন‌ওশাদ । দেখেই বোঝা যাচ্ছে নিশাল। ওদের তিন জনের ছবি ফ্রেমে বাঁধানো।
এগুলো এখানে কেন আনারের মা ?
আম্মা মারা যাওয়ার পরও সব ওয়ালেই টাঙ্গানো আছিন । একদিন বড় এক হুজুর ক‌ইলো মারা যাওয়া মানুষের ছবি টাঙ্গায় রাখলে তার কষ্ট হয় । তারপর স্যার সব খুলছে। যেদিন ছবি গুলা খুলছে সেদিন স্যারের কি মন খারাপ আছিন আম্মা ! নিজে যত্ন ক‌ইরা তুইলা রাখছে এইখানে। তারপর ফিসফিস করে বলল, আম্মার মৃত্যু বার্ষিকী র দিন স্যার এই ঘরে ঢুকে সব কিছু নিয়ে বসে থাকে । ছবি দেখে। আলমারির ভেতরে চিঠিপত্র ও আছে স্যার ব‌ইসা পড়ে চোখের পানি ফেলে ।
চলেন আম্মা বাইর ‌হ‌ই এই ঘরটাত ঢুকলে দম বন্ধ লাগে আমার, এত জিনিষ এক জায়গায়।
চলো। হেরা নিশাল আর ন‌ওশাদের ছবিটা সঙ্গে নিয়ে এলো। এত সুন্দর একটা ছবি । ছোট্ট নিশাল একটা লাল গেঞ্জি পড়ে তার পাপার বুকের উপর শুয়ে আছে তার পাপা খালি গায়ে জড়িয়ে ধরে আছে ছেলেকে।‌ হেরা মনে মনে ভাবছে তাদের যখন একটা বাবু হবে এভাবেই পাপার কোলে শুয়ে একটা ছবি তুলবে তারপর দুটো ছবি পাশাপাশি টাঙ্গিয়ে রাখবে তাদের ঘরে। হেরা ছবিটা তার আলমারির ড্রয়ারে রেখে দিলো।
অনেকক্ষণ পর নিজের ঘর থেকে বের হয়ে নিচে নেমে অবাক!
সবাই ওর জন্য কেক নিয়ে হাজির। নিশাল কানের কাছে বাঁশি ফুঁ দিয়ে বিকট শব্দ করে বলল, তুমি না বললেও আমরা বুঝেছি আজ তোমার বার্থডে মামনি !
মোটেও না !
ঢং করো না তো বৌমনি ,নাহিন বলল।
এলিন নাহিনদের যেসব বন্ধুদের সঙ্গে হেরার খুব ভাব তারাও এসেছে । হেরা ওদের ছেলে বন্ধুদের সাধারণত এড়িয়ে চলে । তবে আগের মত এতটা ভয় আর জড়তা নেই এখন । ওরাও এসেছে কয়জন।
মাহাদি এগিয়ে এসে বলল, হ্যাপি বার্থডে লজ্জাবতী ফুল।
হেরা তাকিয়ে শুধু হাসলো।
ছেলেটা প্রথম দিন থেকেই তাকে লজ্জাবতী ফুল বলে দুষ্টামি করে। ওর খুব অস্বস্তি লাগে । কিন্তু নাহিনের খুব ভালো বন্ধু সে। একটা জিনিস খেয়াল করেছে ছেলেটা দুষ্ট কিন্তু সবাইকে খুব আন্তরিকতার সঙ্গে সাহায্য করে। সেটা বন্ধু হোক কিংবা ক্যাফেটেরিয়ার মামা। একদিন এক মামা খুব অসুস্থ হয়ে গেল । মাহাদি নিজের বাইকে করে সেই মামাকে নিয়ে গিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ কিনে দিলো। সবার সঙ্গে ফাজলামি, দুষ্টামি করলেও হেরার সঙ্গে করে না । শুধু দেখা হলে বলবে, লজ্জাবতী ফুল।
তোমার বাসাটা খুব সুন্দর লজ্জাবতী !
ধন্যবাদ। আপনি বসুন ।
হুঁ।
হেরা নিশালের কাছে গিয়ে দাড়ালো । তোমার পাপা কোথায় বাবা ?
পাপার খবর তো জানি না ! ফোন দিব ?
না থাক লাগবে না।
একটুপর নিশাল এসে বলল, পাপার আসতে সময় লাগবে চলো কেক কাটো মামনি ।
আসুক পাপা ।
ফোন দিয়ে বলল দেরি হবে আমাদের বলেছে কেক কেটে খাওয়া দাওয়া করতে।
অগত্যা হেরাকে ছেলেকে খুশি করতেই ন‌ওশাদকে রেখে কেক কাটতে হলো। অন্য সবাইকে নিয়ে খাওয়া‌ও খেতে হলো। নিশাল মাহাদির সঙ্গে বসে গিটার বাজালো।
ভাইয়া আপনি তো দারুন বাজান !
সবার জন্য দারুন বাজাই না তোমার মামনির জন্য বাজালাম আজকে। বলেই মাহাদি হেরার দিকে এমন ভাবে তাকালো হেরার খুব অস্বস্তি বোধ হলো। ওর দৃষ্টিতে কেমন একটা ভাষা আছে হেরা ঐ ভাষাটা কে ভয় পায়। ঐ ভাষায় কামনা থাকলেও এতটা ভয় লাগতো না কিন্তু হেরার কেন যেন মনে হয় মাহাদির চোখের ভাষায় অন্য কিছু আছে যেটা হেরা ন‌ওশাদ ছাড়া আর কারো দৃষ্টিতে দেখতে চায় না তার জন্য।
সবাই খুব করে ধরেছিল গান গাইতে সে কোন ভাবেই রাজি হয়নি। ন‌ওশাদ সামনে নেই তার ইচ্ছে নেই গান গেয়ে অন্যদের মনে আনন্দ দিতে। তার সকল গান এখন শুধু ঐ মানুষটার জন্য।
কিন্তু মানুষটা কোথায় গিয়ে বসে আছে হেরা বুঝতে পারছে না ।
সবাই সন্ধ্যা হ‌ওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চলে গেছে। হেরা এবার একটু মন খারাপ করলো, ন‌ওশাদ লান্চের কথা বলে গেছে কিন্তু সন্ধ্যা হ‌ওয়ার পরেও খবর নেই।
নিজের ঘরে অভিমান করেই বসে র‌ইলো সে।
ন‌ওশাদ যখন ফিরেছে তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমে গেছে শহরে।
হেরা চুপচাপ ব‌ইয়ের পাতায় ই মনোযোগ রাখার অভিনয়ে ব্যস্ত।
ন‌ওশাদ ঘরে ঢুকেই ওর কাছে এসে দাঁড়ালো , হাতে দারুন একটা ফুলের তোড়া আচ্ছা আজ কি কারো জন্মদিন ছিল?
জানি না!
অনেক বেশি রাগ করে আছো নাকি অল্প একটু ?
হেরা ব‌ইয়ের থেকে চোখ না সরিয়েই বলল, অনেক রাগ করে থাকলে কি হবে ?
অনেক বেশিবার সরি বলব !
থাক সরি বলার দরকার নেই। আমি রাগ করে নেই । আপনি লাঞ্চ করবেন বলে গেলেন আর এখন এসেছেন আপনি তো এরকম কখনো করেন না !
হুম আজকে যখন করেছি নিশ্চয়ই কারণ আছে । শুনবে না কারণ টা কি ?
না থাক নিশ্চয়ই বড় কোন কারণ আমার শোনার দরকার নেই ।
ন‌ওশাদ বুঝতে পারছে মুখে না বললেও বোঝা যাচ্ছে অভিমানে বুক ভার হয়ে আছে হেরার। হাত ধরে সোফা থেকে টেনে সামনে দাঁড় করালো হেরাকে । জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা তোমাকে ! তারপর হেরার কপালে চুমু খেলো । অনেক দোয়া রইল তোমার জন্য। আচ্ছা আগে বললে কি হতো আজ তোমার জন্মদিন।
আসলে আমার জন্মদিন টা কখনো কারো কাছে বিশেষ কোন দিন নয় তাই আগ বাড়িয়ে বলতে ইচ্ছে করেনি।
কিন্তু আমার কাছে তো তোমার জন্মদিন বিশেষ একটা দিন। তুমি আগে বললে আমার কষ্ট একটু কম হতো।
কি কষ্ট করলেন আপনি ? হেরা অবাক হয়ে তাকালো!
তাহলে চোখ বন্ধ করে রাখো , সারপ্রাইজ কি তুমি একা দিতে পারো আমিও পারি একদম চোখ বন্ধ করে কোন নড়াচড়া না করে দাঁড়িয়ে থাকবে যতক্ষণ না আমি চোখ খুলতে বলব।
ঠিক আছে।
ন‌ওশাদ হাঁটুর উপর ভর দিয়ে হেরার পাশে বসলো । তারপর হেরার কমড়ে খুব সুন্দর একটা চেইনের মত চিকন মিনার কারুকাজ করা সোনার সাউথ ইন্ডিয়ান কমড়পাট্টা পড়িয়ে দিলো। এগুলোর মতো আরও জাঁকজমক পূর্ণ টাকে বাংলায় বিছা বলে।
হেরা অবাক হচ্ছে!
তাকাবে না হেরা ।
তাকাচ্ছি না কিন্তু হচ্ছে টা কি ?
একটু অপেক্ষা করো ,হুম এখন দেখো কি হলো।
ও আল্লাহ ! হেরা হাসতে হাসতে শেষ হয়ে যাচ্ছে।
হাসছো কেন ?
আপনি এই জিনিস কোথায় পেলেন ?
আমার কত পরিশ্রম গিয়েছে জানো এই জিনিস খুঁজতে !
এটা কি ?
এটা সাউথ ইন্ডিয়ান মেয়েরা কোমড়ে পড়ে। এটা একমাত্র গয়না আমি জীবনে এক কি দুইবার মেয়েদের পড়তে দেখেছি এবং আমার খুব ভালো লাগে । সত্য কথা বলব একটা !
হুম বলেন।
তখন ভার্সিটিতে পড়ি আম্মাকে নিয়ে চেন্নাই গিয়েছিলাম চিকিৎসার জন্য ওখানে সব বিবাহিত মেয়েরা এই জিনিস পড়ে। কোন মেয়ে দেখলেই আমার চোখ চলে যেত ওদের কোমড়ে । জিনিস টা এত সুন্দর চোখের আর কি দোষ বলো তখন বয়স কম ছিল বলেই কথাটা ন‌ওশাদ হাসা শুরু করলো। বাঙালি মেয়েরা এই জিনিস পড়ে না ।
হেরা বলল, ভাগ্যিস পড়ে না । তাহলে আপনার চোখ কোথায় থাকতো অনুমান করছি ।
ওরে মেয়ে জেলাস ।
অবশ্যই ।
আমি অবশ্য এই জিনিস পড়ার জন্য সুন্দর কোমড়‌ও দেখি না ।
আপনার চোখ মেয়েদের কোমড়ে যায় বুঝি ! হেরা হাসতে হাসতে বলল।
হঠাৎ হঠাৎ তো যায়ই পুরুষ মানুষ না আমি।
বুঝলাম।
তোমার পছন্দ হয়েছে?
খুব , কিন্তু কেমন সুরসুরি লাগছে ।
হেরা এটা তুমি শুধু আমার সামনে পড়বে এই ঘরের বাহিরে পড়ে যাবে না।
তাই , কেন ?
আমি চাইনা কারো চোখে পড়ুক।
পজেসিভনেস ।
খুব।
ঠিক আছে।
আমি তখন‌ই একটা কিনে এনেছিলাম গীতির জন্য কিন্তু ওকে যদি বলতাম এটা আমি চেন্নাই এ মেয়েদের পড়তে দেখেছি আমার খুব ভালো লেগেছে ও আমাকে মেরেই ফেলতো। ও খুব সেনসেটিভ ছিল আমার বিষয়ে। হাসলো ন‌ওশাদ।
তারপর দেননি উনাকে এই জিনিস।
না ও পছন্দ করতো না ।
এটাই কি সেটা ?
না । ওটা হারিয়ে গেছে অনেক আগেই । কোথায় রেখেছিলাম মনেই নেই। আজ অনেক গুলো জুয়েলারি শপ ঘুরে এটা পেলাম।
থ্যাংকস আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আপনার উপহার গুলো আপনার মত‌ই বেতিক্রম।
তোমার জন্য আরো একটা উপহার আছে । আমার মনে হয় এটা দেখলে তুমি আরো বেশি খুশি হবে।
কি দেখি ?
ন‌ওশাদ একটা খাম বের করে হেরার হাতে তুলে দিলো।
জিনিস টা দেখে হেরা চুপ হয়ে গেল । ওর চোখ দিয়ে পানি পড়া শুরু হলো ।
নানাভাইয়ের ছবি ! আপনি কোথায় পেলেন ।
আনালাম তোমার বাড়ি থেকে । এটা যাকে দিয়ে আনালাম ঢাকা আসতে তার দেরি হয়ে গেল তাই আমারও বাসায় আসতে দেরি হয়ে গেল।
হেরা ন‌ওশাদকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। এরচেয়ে ভালো গিফট আর হতেই পারে না আমার জন্মদিনে। আপনি এত ভালো কেন বলেন তো ।
আমি মোটেও ভালো ন‌ই দেখলে না মেয়েদের কোমড়ের দিকে তাকাই বলেই ন‌ওশাদ হো হো করে হাসছে।
হেরা ন‌ওশাদকে জড়িয়ে ধরে চোখের পানি ফেলছে।
এই বোকা মেয়ে কান্না বন্ধ করো আমি কেক নিয়ে এসেছি চলো কেক কাটি দুইজন।
দুইজন কেন নিশাল কে ডেকে আনি ।
আমি আর তুমি কাটি । তোমার আমার সেলিব্রশন হোক।
না ছেলেও থাকুক।
ঠিক আছে যাও নিয়ে আসো ওকে।

পরদিন বিকেলে হঠাৎ বীথি ল্যান্ড ফোনে ফোন দিয়ে হেরার খোঁজ করল । আনারের মা ফোন ধরেছে।
আনারের মা হেরা কোথায়?
আম্মা আছে নিজের ঘরে ,দিতাম।
হ্যাঁ দাও।
আনারের মা ছুটে এসে ফোনটা হেরার হাতে দিয়ে গেল।
কে?
বীথি খালাম্মা।
জ্বী বীথি আপু বলেন।
নিশাল কোথায় ?
ঘুমাচ্ছে ডেকে দিব ?
না ডাকতে হবে না। হেরা তুমি ছেলেটাকে কি বোঝাচ্ছো বলো তো ?
বুঝলাম না আপু কি বলতে চাইছেন?
নিশালকে আমার বাসায় আসতে বললে আসছে না , দুপুরে খেতে বললাম বলল কাজ আছে!
আমি কি বোঝাব আপু আপনার বোনের ছেলে আপনি এত বছর বড় করেছেন !
কিন্তু এখন তো দেখছি সে তোমার কথায় উঠছে বসছে !
আমার সেরকম কোন ইচ্ছে নেই যে নিশালকে আমার কথায় উঠা বসা করাব। আপনি ভুল ভাবছেন ।
দুলাভাই তো তোমার হাতের মুঠোয় ঢুকে গেছে তাই না।
দেখুন আপু আমার হাজব্যান্ড আমি হাতের মুঠোয় রাখব না মাথায় রাখব এটা আমাদের বিষয় এটা নিয়ে আপনি দয়া করে কথা বলবেন না। আপনার যা বলার নিশালকে বলবেন ও ঘুম থেকে উঠলে আমি ফোন দিতে বলছি ।
খুব কথা জানো তো দেখছি মেয়ে।
এতদিন আপনার কথা শুনেছি এখন মনে হচ্ছে কিছু কথা আপনার ও শোনা এবং বোঝা উচিত। রাখছি ভালো থাকবেন ।
হেরা লাইন কেটে দিল। ওর খুব খারাপ লাগছে । কিসের এত আক্রোশ উনার হেরা বুঝতে পারে না ।

তিনদিন পর ওরা চার জন এয়ার পোর্টের ভিআইপি লাউঞ্জে বসে আছে । ন‌ওশাদ তার আব্বাকে নিয়ে যথেষ্ট চিন্তিত এই বয়সে এত দূর প্লেনের জার্নি করতে কষ্ট হবে কিনা ভাবছে।
হেরা নিশালের সঙ্গে গল্প করছে। মোবাইল এ ছবি তোলার সময় হেরা খেয়াল করলো মাহাদির মেসেজ।
এই ছেলেটাকে সে ফ্রেন্ডলিস্টে নিতে চায়নি, এত চালাক ছেলেটা সেদিন নিশালের সামনে বলে উঠলো, আমি তোমাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছি হেরা একসেপ্ট করো !
হেরা যখন বলল পরে করব ।
সঙ্গে সঙ্গে বলে এখন কি সমস্যা ?
নিশাল তখন বলে উঠলো করো মামনি ! আমার সঙ্গেও ভাইয়া আছে ফেসবুকে।
অগত্যা হেরাকে করতেই হলো ! কেন জানি ছেলেটা এক কি দুইবার দেখা হ‌ওয়াতেই নিশালকে খুব পটিয়ে ফেলেছে। ওর কথায় , কাজে নিশাল খুব মজা পায় ।
এমনিতেই এই ফেসবুক সে এতটা বুঝে উঠতে পারেনি এখনও। নিশাল‌ই ওর ছবি আপলোড করে দেয়। তার দুই তিনজন ক্লাসমেট, এলিন , নাহিনদের বান্ধবীরা যারা ওর‌ও বন্ধু শুধু তারাই। এখন এই মাহাদির মেসেজ দেখে এই মুহূর্তে ওর কেমন অস্বস্তি হচ্ছে।
মেসেজ অন করে দেখে । ওর জন্মদিনের দিন তোলা ওর একটা ছবি পাঠিয়েছে । কখন তুলেছে মাহাদি সে জানে না। নিচে লিখেছে, ‘ মানুষ এত সুন্দর হয় কিভাবে? সৃষ্টিকর্তা কারো প্রতি এত উদার আর আমাদের প্রতি এতটা কৃপণতা করলো ?’
হেরা মেসেজ টা দেখেই মন খারাপ করে ফেলল। ছেলেটা কি চায় ?
হেরা একবার ভাবলো নিশালকে বলবে ওকে লিস্ট থেকে বাদ কিভাবে করব দেখিয়ে দাও ‌তারপর চিন্তা করলো এটা বললে নিশালকে ব্যাখ্যা করতে হবে কেন ?
ভালো বিপদ হয়েছে এখন ! অসহ্য।
ইমিগ্রেশন এর ফর্মালিটিজ শেষ করে ন‌ওশাদ ওর পাশে এসে বসলো । কি ব্যাপার কাঠবিড়ালী তোমার মুড অফ কেন ?
মুড অফ না ।
এখন বলো মন খারাপ কেন ?
হেরা মাহাদির মেসেজ টা দেখালো ন‌ওশাদকে ।
ন‌ওশাদ মেসেজ টা পড়লো, হুম কি সমস্যা ?
ঐ ছেলে এই মেসেজ কেন পাঠাবে ?
আমি তো কোন সমস্যা দেখছি না। বন্ধু বন্ধুর প্রশংসা করেছে এতে মন খারাপ করার মত কি দেখলে ?
এসব লিখার কি দরকার বলেন ?
হেরা ছেলেটা তোমাকে বন্ধু ভেবে লিখেছে আমি এখানে দোষের কিছু দেখছি না । তুমি খালি খালি আপসেট হচ্ছো ! বন্ধুর প্রশংসা করে কত সুন্দর কয়টা লাইন লিখেছে। তুমি ধন্যবাদ লিখে দাও। শেষ।
ধন্যবাদ লিখে দিব?
হুম দিবে।
না কিছু লিখব না আমি ।
আচ্ছা কিছু লিখার দরকার নেই । এখন মুড ঠিক করো। এক জায়গায় যাচ্ছি মন খারাপ করে থাকলে ভালো দেখায় বলো ?
হেরা ন‌ওশাদের হাত ধরলো আমি জীবনে কখনো ভাবিনি আমেরিকা যাব জানেন!
জীবনে অনেক ঘটনাই ঘটে যা আমরা কখনো কল্পনাও করি না। কিন্তু ঐ যে আকাশে একজন আছেন তিনি সব লিখে রেখেছেন তার প্ল্যানিং এ সব চলে।
সেটাই তিনিই তো আপনাকে পাঠালেন আমার জন্য ! আর আমার জীবন টা বদলে গেল ।
ন‌ওশাদ চশমা টা খুলে হেরার দিকে তাকালো ।‌ আমাদের জীবন আরো বদলে যাবে দেখো ।
হ্যাঁ।
নিশাল তার দাদাভাইকে হুইলচেয়ারে ঠেলে নিয়ে এলো ওদের কাছে।
পাপা চলো একটা সেলফি তুলি আমরা চারজন ।
ঠিক আছে তুলো।

( চলবে )