#তবু_সুর_ফিরে_আসে
৩৮ পর্ব
নওশাদের ফ্লাইট দোহা হয়ে যখন মিয়ামি পৌছালো তখন সেখানে সন্ধ্যা পার হয়েছে। ভাগ্নে ইরফানকে আগেই সে জানিয়েছিল কখন আসছে তারা । ইরফান যথা সময়েই এয়ার পোর্ট চলে এসেছে। ইরফান ছাড়া আর কেউ জানে না যে ওরা আসছে। এয়ারপোর্ট থেকে বের হতেই ওদের দেখেই ইরফান ছুটে এলো । নওশাদকে জড়িয়ে ধরলো।
মামা, নানাভাইকে দেখলে আম্মা সবচেয়ে বেশি সারপ্রাইজ হবে !
সেজন্যই বলি নাই তোর আম্মাকে।
নিশাল আর হেরা হুইলচেয়ারে করে ফরহাদ আজমিকে নিয়ে এলো ।
কেমন আছেন নানা ভাই ইরফান পা ছুঁয়ে সালাম করলো তার নানাকে।
ভালো অনেক লম্বা জার্নি করলাম রে।
আপনাকে দেখলে আম্মা খুব অবাক হবে !
তোর আম্মা কোথায় ?
আম্মা তো বাসায় । চলেন অনেকক্ষণ সময় লাগবে বাসায় যেতে।
মামি কেমন আছেন ?
হেরা হেসে বলল,জ্বি ভালো।
নওশাদ বলল, হেরা ও ইরফান বুবুর বড় ছেলে । বুঝলে ও ছোটবেলা থেকেই আমার খুব নেওটা ।
এত দুষ্ট ছিল কি বলবো তোমাকে !
মামা আপনিও কম দুষ্টামি বুদ্ধি দিতেন না আমাদের। আপনার দেয়া বুদ্ধিতে কত দুষ্টুমি করতাম আর আম্মার হাতের মার খেতাম আমরা দুইভাই।
নওশাদ হাসছে।
আপনার কথা শুনেছি বুবুর কাছে অনেক , হেরা বলল।
আম্মা তো ঢাকা থেকে আসার পর আপনার কথা প্রতিদিন গল্প করে মামি।
নিশাল কি খবর তোর অনেক বড় হয়ে গিয়েছিস?
ভাইয়া দারুন তুমি কেমন আছো?
গাড়িতে উঠে হেরা অবাক হয়ে দেখছে আশেপাশটা। এ যেন এক নতুন জগৎ ওর কাছে।
কতক্ষণ লাগবে জান্নাতের বাসায় যেতে বাবু ?
আব্বা আর বেশি সময় লাগবে না ঘন্টা খানেক এর মধ্যে আমরা পৌঁছে যাব ।
মামা নানাকে নিয়ে আসবেন সত্যিই কল্পনার বাহিরে ছিল।
আব্বা হঠাৎ করে বলল , বুবুর বাসায় যাবে আমি আব্বার ইচ্ছে গুলো পূরণ করার চেষ্টা করি । দেখলাম ভিসাও পেয়ে গেছি নিয়ে চলে এলাম।
খুব ভালো করেছেন মামা।
নিশাল হেরাকে আশেপাশের যা চোখে পড়ছে কোনটা কি বুঝাচ্ছে। হেরা অবাক বিস্ময়ে দেখছে।
এক ঘন্টার উপর লাগলো ওদের ওয়েস্ট প্লাম বীচ এলাকায় নওশাদের বোন জান্নাতের বাসায় আসতে।
একটা ডুপ্লেক্স বাড়ির সামনে গাড়ি থামলো । এখানে বড় ছেলে ইরফানের সঙ্গে থাকেন জান্নাত আজমী। আজ পনের বছর হবে এই দেশে স্থায়ী হয়েছেন। দুই ছেলের মধ্যে ছোট ছেলে বউ বাচ্চা নিয়ে থাকে নেপোলস এ ।
দীর্ঘ জার্নি করে ফরহাদ আজমী খুব ক্লান্ত । নওশাদ আর ইরফান ধরে ধরে গাড়ি থেকে নামালো তাকে।
নিশাল তাদের লাগেজ নামাতে নামাতে বলল, পাপা আমরা এক কাজ করি দাদা ভাই কে দরজায় দাড় করিয়ে রাখি ফুপি এসে দেখলে কি করে দেখি।
নওশাদ ছেলের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, ঠিক আছে ।
ভাইয়া ফুপিই খুলবে তো দরজা ?
আম্মা, ছাড়া এখন বাসায় বড় কেউ নেই । আব্বা হাঁটতে যায় এই সময় । তাই আম্মাই খুলবে, ইরফান বলল।
ওরা ফরহাদ আজমী কে দরজায় দাড় করিয়ে রেখে কলিং বেল দিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে রইলো।
দুবার কলিং বেল বাজার পর জান্নাত আজমী দরজা খুলে চিৎকার দিয়ে জড়িয়ে ধরলো তার আব্বাকে।
ফেলে দিবি তো জান্নাত , ফরহাদ আজমী মেয়েকে ধরে বললেন।
নওশাদকে দেখে বুবু বলে উঠলো, তুই আগের মতই আছিস এরকম সারপ্রাইজ কেউ দেয় । আমি কোন দিন ভাবি নাই আব্বাকে আমার বাসায় দেখব চোখে পানি চলে এসেছে জান্নাত আজমীর। তোরা সবাই আসবি ইরফান জানতো তাই না ?
আম্মা মামা বলল তোমাকে সারপ্রাইজ দিবে তাই বলি নাই।
হেরা বুবুকে জড়িয়ে ধরলো।
তুমিও বললে না হেরা ?
বুবু আমিও আপনাকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছি আপনার ভাইয়ের মত। আর এই আইডিয়া হলো আমাদের নিশালের । আপনি ঢাকায় যখন ছিলেন তখনই প্ল্যান হয়েছে ওর ছুটিতে আমরা এখানে আসব।
তাই ! আমার আজ মনটা খুব খারাপ ছিল তোমাদের দেখে মনে হচ্ছে অনেকদিন পর সুন্দর একটা দিন এসেছে।
মন খারাপ কেন বুবু দুলাভাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে , নওশাদ বোনকে ধরে হাসতে হাসতে বলল।
না রে বাবু এখানে আমাদের এক পরিচিত ভাবি অসুস্থ তাই মনটা খারাপ। খুব হাসিখুশি মানুষ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে গেছেন তাই মনটা খারাপ ছিল।
এক নিমিষে পুরো বাসা আনন্দে ভরে গেল ওদের। হেরা নতুন পরিবেশে নতুন মানুষদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে খুব আনন্দ পাচ্ছে। নতুন লোকজনের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। সবাই ওকে কত সহজে আপন করে নিচ্ছে। ইরফানের স্ত্রী মৌ তার থেকে কয়েক বছরের বড় হবে মেয়েটা ওকে দেখে খুশিতে আত্মহারা।
হেরাকে ধরে বলল, আম্মা বাংলাদেশ থেকে আসার পর শুধু আপনার কথা গল্প করে মামি। এত তাড়াতাড়ি দেখা হবে কল্পনাও করিনি।
পরদিন সকালে নওশাদ উঠলেও জেট ল্যাগ এর জন্য হেরা কখনো ঘুমে কখনো ঘুমের ঘোরের মধ্যে আছে।
সকালে নিশাল এসে দরজায় নক করলো যখন তখন নওশাদ জেগে গেছে , পাপা আসব?
এসো বাচ্চা।
পাপা দাদা ভাইয়ের জন্য ঘুমাতে পাচ্ছি না !
কেন?
আমাকে বারবার ধাক্কা দিয়ে বলছে তোর স্কুল নেই বাবু উঠ স্কুলে যা। আবার আমাকে ভেবেছে তুমি । ঘুম ঘুম চোখে নিশাল বলল। আমি এখানে সোফায় ঘুমাই ?
নওশাদ হাসতে হাসতে বলল, ঠিক আছে সোফায় কেন ঘুমাবে আমার পাশে এসে শুয়ে পড়ো বেড টা তো যথেষ্ট বড়।
নিশাল নওশাদের পাশে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লো।
নওশাদ ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। অনেক বছর পর ছেলে এসেছে ওর সঙ্গে ঘুমাতে। ক্যাডেট কলেজে যাওয়ার পর রাতে ছেলের ঘরে সে ঘুমাতে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে । ছেলে লজ্জা পেতো । গীতি যাওয়ার পর রাতে প্রায় সময় সে নিশালের রুমে গিয়ে ওর পাশে ঘুমাতো। আজ অনেক দিন পর ছেলে নিজে থেকেই এসেছে পাপার কাছে ঘুমাতে। নওশাদ ঘুমন্ত ছেলের মুখটা দেখছে। কত মায়া একটা মুখকে ঘিরে।
নিশাল যতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিল নওশাদ ছেলের মুখের দিকে তাকিয়েই রইলো। ঘন্টাখানেক ঘুমিয়ে নিশাল উঠে পড়লো।
কি ঘুম শেষ তোমার?
হুম টাইমিং চেন্জ হয়েছে না, বারবার ঘুম ভেঙ্গে যাচ্ছে। উঠেই পড়ি।
ঠিক আছে আমি ও উঠব এখন।
মামনির কি অবস্থা ?
যা দেখছো ও উঠতে পারবে না খুব টায়ার্ড হয়ে আছে। প্লেনে ঘুমাতে পারেনি ।
নিশাল উঠে চলে গেল রুম থেকে।
নওশাদ ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে দেখে বুবুর সঙ্গে তার দেবর আহসান ভাইয়ের বউ রুমানা ভাবি কিচেনে । রুমানা ভাবিরা এখানেই ফ্লোরিডাতে অনেক বছর। বুবুর বাসায় আসলে দেখা হতো আগে। গীতিকে নিয়ে যখন আসতো গীতি রোমানা ভাবির সঙ্গে সময় কাটাতে পছন্দ করতো । ঘুরতে যেতো, হৈচৈ করতো। গীতি আর ভাবির অন্য রকম একটা সম্পর্ক ছিল যতদিন বেঁচে ছিল। গীতি মারা যাওয়ার পর এই প্রথম ভাবির সঙ্গে নওশাদের দেখা হলো।
নওশাদকে দেখে রোমানা এগিয়ে এলো, কেমন আছেন নওশাদ ভাই?
ভালো আছি । অনেক দিন পর আপনার সঙ্গে দেখা। আপনি ঢাকায় যান কিন্তু আমার বাসায় যান না এই সেই বাহানা দিয়ে চলে আসেন ভাবি।
না ভাই খুব কম সময়ের জন্য গেছি তাই আপনার বাসায় যেতে পারিনি।
বুবু আর তার ছেলের বউ মৌ নওশাদকে ব্রেকফাস্ট খেতে দিতেই রোমানা ভাবির সঙ্গে আর কথা এগোলো না।
ব্রেকফাস্টের পর নওশাদ বাসার পিছনের বেক ইয়ার্ডে রাখা চেয়ারে এসে বসলো। ছায়ায় বসে আশেপাশটা দেখছে। নিশাল রোমানা ভাবির ছেলে অহির সঙ্গে ঘুরছে । কাছাকাছি বয়সী তাই ভাব ওদের আগে থেকেই।
একটুপর রোমানা ভাবি দুই কাপ চা নিয়ে নওশাদের কাছে এগিয়ে এলো ।
সামনে রাখা চেয়ার টাতে বসতে বসতে বলল, অনেক বছর পর আপনার সঙ্গে দেখা নওশাদ ভাই।
হ্যাঁ । আমি ইউএসএ আসলে বছরে একবার কি দুইবার বুবুকে দেখতে আসি কিন্তু এখন আপনার সঙ্গে দেখা হয় না কেন জানি !
আমার বাসায় তো যান না , দেখা কিভাবে হবে বলেন ?
ভাবি আসি শুধু বুবুকে এক নজর দেখতে । একদিন থেকেই চলে যাই তাই দেখা হয় না। আপনি তো ঢাকা যান বাসায় আসেন না কেন?
নওশাদ ভাই আসলে ইচ্ছে করে যাই না , ঠান্ডা গলায় বলল রোমানা । গীতি নেই বাসাটা দেখতে ইচ্ছে করে না। তাই যেতাম না ।
রোমানার চোখ ভিজে গেছে সে অন্য দিকে তাকিয়ে কথা গুলো বলছে। এখানে যখন আপনি গত ছয় বছরে যত বার এসেছেন, ইচ্ছে করে আপনার সামনে আসিনি। গীতি ছাড়া আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করতো না। আপনার কষ্ট ভরা মুখটা দেখতে ইচ্ছে করতো না ভাই। কারণ আমি তো জানি আপনারা দুজন দুজনার কি ছিলেন ।
নওশাদ পিছনের খোলা মাঠটার দিকে তাকিয়ে আছে। আর চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে চুপচাপ।
আপনাদের বিয়ের পর আমি আর গীতি একই মনের যন্ত্রণা নিয়ে বড় ভাবির বাসায় অনেক দিন ছিলাম বলেই আমাদের দুজনের সম্পর্ক টা অন্য রকম ভাবে তৈরি হয়ে ছিল। ও আপনাকে কাছে পেতো না আমি আহসান কে পেতাম না । দুজনের কষ্ট এক রকম ছিল তাই মনের মিল হতে বেশি সময় লাগেনি আমাদের। আমি এখানে চলে আসার পরেও গীতির সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ থাকতো আপনি তো জানেনই।
হ্যাঁ । ও আপনার বন্ধু হয়ে গিয়েছিল আমার চেয়ে ভালো আর কে জানে।
এমন কোন দিন যেতো না আমার সঙ্গে ওর কথা হতো না। আমি দেখা গেছে নিজের বোনদের ফোন দিতাম না প্রতিদিন ,কিন্তু গীতির সঙ্গে প্রতিদিন কথা না হলে খালি খালি লাগতো আমার। আপনাকে গীতি কতটা ভালোবাসতো, আমার তো মনে হয় এক আপনি জানেন আরেক আমি জানি। ওর সব কথা শুরু হতো নওশাদ দিয়ে শেষ হতো নওশাদে গিয়ে।
কিন্তু দেখেন আপনার বন্ধু স্বার্থপরের মত আমাকে রেখে চলে গেছে ভাবি , দীর্ঘ শ্বাস ফেলল নওশাদ !
মৃত্যুর কাছে আমরা সবাই স্বার্থপর ভাই।
জানি না ভাবি ।
একটা কথা গত ছয় বছর আমি আমার মাঝে নিয়ে বেড়াচ্ছি আপনাকে বলতে পারিনি ।
কি কথা ভাবী ? নওশাদ তাকালো রোমানার দিকে।
রোমানা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো তারপর বলা শুরু করলো , যেদিন গীতি মারা যায় ওর সঙ্গে আমার শেষ কথা হয়। ও নিজেই ফোন দিয়েছিল সেদিন, এই সেই কথার মধ্যে হঠাৎ আমাদের মধ্যে মৃত্যু নিয়ে কথা উঠলো । গীতি বলে উঠলো আমি যদি মরে যাই আগে, আমি অন্য বউদের মত চাইব না আমার নওশাদ একা আমার বিরহে জীবন পার করুক আমার সৃত্মি নিয়ে।
আমি হেসে তখন গীতিকে বললাম ,কি বলো এসব ! আমি আহসান কে বলি সাবধান বিয়ে করবা না । আমার ঘরে আরেকজন কে নিয়ে ফুর্তি করবা তা হবে না।
গীতি বলল, না ভাবি নওশাদ কোন দিন একা থাকতে পারবে না। আমি চাইনা এই ঘর টাতে নওশাদ একা কষ্টে কষ্টে জীবন কাটাক। ছেলে, ছেলের বউ ওকে করুনা করুক বৃদ্ধ বয়সে আমি চাই না। নওশাদ আমার শরীরটা না ঘেঁষে ঘুমাতে পারে না , সেই মানুষ একা এই সংসার কিভাবে সামলাবে ? ও অফিস থেকে বাসায় ফিরে যদি দেখে আমি নেই কোন কারণে, ফোন করে করে অস্থির করে দিবে। কারন ও শূন্য ঘরে থাকতে পারে না। আমি ওকে ছাড়া কোথাও গিয়ে থাকলে ও ঘুমাতে পারে না, খেতে পারে না। এই যে এত বিদেশ ঘুরে বেড়ায় যত দিন থাকবে বাহিরে, তার চোখে ঘুম নেই, খেতেও পারে না কিছু। তাই আমি চাই আমি মারা গেলে নওশাদ আবার বিয়ে করুক। একটা মানুষ খুঁজে নিক যে ওর একাকীত্বের সঙ্গী হবে, ওর ঘুমের, ওর খাওয়ার, ওর সুখে দুঃখের সব কিছুর সঙ্গী হবে । ওর যত্ন করবে, ওকে খুব ভালোবাসবে। যাকে আঁকড়ে ধরে নওশাদ বেঁচে থাকবে। কথা গুলো বলছে আর রোমানার চোখ দিয়ে পানি ঝড়ে পড়ছে।
গীতির মৃত্যুর খবরটা আমাকে অসুস্থ করে দেয়। আমি মেনেই নিতে পারিনি । যার সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা আগে কথা বললাম হঠাৎ সে নেই ! ও কি বুঝতে পেরেছিল তাই এই কথা গুলো আমাকে বলল আমি ভেবে কূল পাই না এখনো। আপনি হয়তো জানেন না আমি অসুস্থ হয়ে হসপিটালে পর্যন্ত ভর্তি হয়ে গিয়েছিলাম তখন। এত বড় আঘাত ছিল আমার জন্য।
আমি আপনাকে কিভাবে গীতি বিহীন দেখব সেই চিন্তা করে আসতাম না আপনার সামনে। দেশে গেলে যেতাম না আপনার বাসায়। গীতির সাজানো সংসার টা গীতিকে ছাড়া দেখতে আমার কষ্ট হোক আমি চাইতাম না।
নওশাদ চুপ করে শুনছে রোমানার কথা গুলো।
আমি এই ছয় বছরে আপনাকে বলতে পারিনি গীতি কি চাইতো। শুনতাম আপনি এত সৃত্মিকাতর ছিলেন গীতিকে নিয়ে আমার সাহস হতো না গীতির ইচ্ছে টা আপনাকে বলতে। শুধু ভাবিকে বলতাম নওশাদ ভাইকে বিয়ে করিয়ে দেন একটা। মনে মনে মেয়েও খুঁজতাম আপনার জন্য । কিন্তু আপনার উপযুক্ত, আপনাকে খুব ভালোবাসবে এমন মেয়ে পাইনি। কারো উপর আস্থা রাখতে ভয় হতো।
কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো রোমানা । আপনি বিয়ে করেছেন শুনে খুব খুশি হয়েছি। বড় ভাবি ঢাকা থেকে এসে বলল, বউ খুব যত্ন করে আপনার কিন্তু বয়স টা একটু কম । তখন খুব স্বস্তি পেয়েছি। এখন সত্যি করে বলেন তো কেমন আছেন ভাই ?
নওশাদ রোমানার দিকে মুখ তুলে তাকালো। ভাবি আছি আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। আপনার বন্ধু কি চাইতো এত দিন জানতাম না । কিন্তু এখন যখন শুনলাম তাই বলছি, আপনার বন্ধু যেমন চাইতো তাই আছি । খুব ভালো আছি। মেয়েটার বয়স খুব কম তারপরেও আমাকে ভালোবাসতে সময় নেয়নি । আমিও ওকে আঁকড়ে ধরে ভালো আছি। প্রথম প্রথম অনেক দ্বিধা ছিল কিন্তু একটা সময় আর দূরে থাকতে পারিনি। ওকে ওর অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারিনি।
শুনে খুব ভালো লাগছে ভাই । একটা কথা কি জানেন প্রকৃতিই কোন শূন্য স্থান রাখে না।
না ভাবি গীতির শূন্যতা আজীবন আমার মাঝে থাকবে। ওর জন্য হাহাকার আমার ভেতরে নিয়েই আমি মরব একদিন। তবে হ্যাঁ হেরা কে আমি ভালোবাসি । ও ওর একটা আলাদা জায়গা নিয়ে আমার মাঝে বসবাস করে।
খুব ছোট মেয়ে তাই না।
হুম কয়দিন আগে বাইশ বছর হলো । সারাক্ষণ প্রজাপতির মত উড়ে বেড়ায় আমার আশেপাশে। কোন চাহিদা নেই। সবচেয়ে পজেটিভ ব্যাপার টা হলো নিশাল ওকে আপন করে নিয়েছে।
আমিও এটা নিয়ে চিন্তায় ছিলাম নওশাদ ভাই। যাই হোক ভালো হয়েছে আপনার ছন্নছাড়া সংসার টা দেখার একজন মানুষ এসেছে। সবচেয়ে বড় কথা গীতি যা চাইতো তাই হয়েছে, আপনার একা জীবনের সঙ্গী কেউ হয়েছে। বড় ভাবি আপনাকে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় থাকতো । এবার দেখলাম খুব রিল্যাক্স ।
বুবু আমাকে খুব ভালোবাসে তাই সব সময় চিন্তা করে।
আপনি এসেছেন শুনে সকাল সকাল চলে এসেছি । আপনাকে আর আপনার বউ কে দেখব বলে। আচ্ছা মেয়েটা গীতির ব্যপারে কেমন সহনশীল? মানে গীতিকে নিয়ে কোন সমস্যা নেই তো?
না গীতিকে নিয়ে সমস্যা থাকবে কেন ? আপনি দেখলেই বুঝবেন কেমন ।
শুনলাম গীতির বোনরা খুব আপসেট আপনার বিয়ে নিয়ে ।
স্বাভাবিক না । ওদের কথা বাদ দেন । সব ঠিক হয়ে যাবে ভাবি।
ওদের কথার মাঝখানে হেরা নওশাদকে খুঁজতে খুঁজতে এগিয়ে আসছে।
ঐ যে হেরা আসছে ভাবি ।নওশাদ বাসার পিছনের দরজার দিকে ইশারা করলো।
মাসাআল্লাহ নওশাদ ভাই খুব সুন্দর বউ পেয়েছেন যতটা শুনেছি তার থেকেও বেশি সুন্দর।
নওশাদ হাসছে রোমানার কথা শুনে।
হেরা কাছে আসতেই নওশাদ বলে উঠলো, হেরা এই হলো রোমানা ভাবি বুবুর দেবর আহসান ভাইয়ের ওয়াইফ।
হেরা টুপ করে বসে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে ফেলল রোমানাকে।
আরে না না আমাকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে হবে না, রোমানা হেরাকে বুকে জড়িয়ে ধরলো। ওর মেয়ে রুহি র চেয়ে দুই বছরের বড় একটা মেয়ে । রোমানা মুগ্ধ হয়ে দেখছে।
সত্যি খুব মিষ্টি একটা মেয়ে নওশাদ ভাই !
নওশাদ হাসলো হেরার দিকে তাকিয়ে। তোমার ঘুম কমপ্লিট।
আরো ঘুমাতে ইচ্ছে করছে , হেরা বলল।
আর ঘুমাতে হবে না এখন উঠে আশে পাশটা দেখো কত সুন্দর জায়গা , নওশাদ বলল!
নিশাল কোথায় ?
ভাবির ছেলের সঙ্গে ঘুরছে আশেপাশে কোথাও।
হেরা পাশে রাখা চেয়ারটাতে বসলো।
রোমানা বলল, আপনারা ঘুরতে যাওয়ার কি প্ল্যান করেছেন নওশাদ ভাই ?
ভাবি সবে এলাম দেখি আজ হয়তো বীচে বসেই কাটাব। অরলেন্ডো যাব এই সপ্তাহে। তারপর কোথায় কি, সব ঠিক করেছে ইরফান। ওকেই দ্বায়িত্ব দিয়েছিলাম।
কিছুক্ষণ পর হেরাকে সঙ্গে নিয়ে গল্প করতে করতে রোমানা ভাবি বাসার ভেতরে ঢুকে গেল। নওশাদ চুপচাপ বসে রইলো অনেকক্ষণ। রোমানা ভাবির কথা গুলো অনেক দিন পর নাড়িয়ে দিলো নওশাদকে।
মনে মনে ভাবছে , গীতি সত্যি তুমি এভাবে ভাবতে? তাই বুঝি আল্লাহ আমাকে এভাবে বিয়েটা করতে বাধ্য করলো। তা না হলে তো কখনো আমি বিয়ে করবো ভাবতে পারিনি !
নওশাদ আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো উদাস হয়ে।
দুপুরের পর নওশাদ তার আব্বা, হেরা, নিশাল, বুবু, দুলাভাই , ইরফান আর তার নয় মাসের ছেলেকে নিয়ে ফ্লোরিডার বিখ্যাত প্লাম বীচে এসে হাজির হলো । হেরা মুগ্ধ হয়ে দেখছে তার সামনে বিশাল আটলান্টিক । আটলান্টিকের নীল জলের ঢেউ তার মনের ভেতরে যেন আছড়ে পড়ছে। পৃথিবীটা সত্যি ই খুব সুন্দর! সাদা বালুর সৈকতে নানান দেশের মানুষ মুগ্ধ হয়ে মহাসাগরের বিশালতার দিকে তাকিয়ে আছে। কেউ কেউ পানিতে নেমেছে। দুটো চাদর বিছিয়ে ওরা একটা গাছের ছায়ায় বসলো। সমুদ্রের পানি এখান থেকে যথেষ্ট দূরে কিন্তু দৃষ্টিসীমা যত দূর যায় তারচেয়েও বহু বহু দূর পর্যন্ত শুধু নীল আর নীল। দূরে ইয়ট গুলো সাদা বকের মত মনে হয়। সীগাল উড়ে যাচ্ছে মাথার উপর দিয়ে। সব মিলিয়ে এ যেন এক স্বর্গ । হেরা চাদরে বসে তাকিয়ে শুধু নীল সমুদ্র আর আকাশ টাই দেখছে।
নিশাল আর ইরফান চলে গেছে পানির কাছে। বুবু আব্বাকে ধরে ধরে হাটাচ্ছে আর দুলাভাই ব্যস্ত নাতিকে সামলাতে। ওর মা আসতে পারেনি আজ, ওর কাজের জায়গায় একটা পার্টি আছে তাই।
হেরাকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে নওশাদ এসে পাশে বসলো।
কি ব্যাপার চুপচাপ কেন ?
হেরা নওশাদের কাঁধে মাথা রাখলো , এত বিশাল সমুদ্র দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল।
ওমা মন খারাপ হলো কেন , অবাক হয়ে নওশাদ জিজ্ঞাসা করল?
এই সমুদ্রের কাছে আমরা কত ক্ষুদ্র তাই না !
হুম । মানুষ সমুদ্রের কাছে তো ক্ষুদ্রই।
কিন্তু আমরা নিজেরা সেটা মানতে চাই না।
কেউ মানতে চায় না । আচ্ছা এত ভারী ভারী কথা কেন বলছো ?
এমনি । হেরা নওশাদের হাতটা ধরলো আপনাকে ধন্যবাদ দেয়ার ভাষা আমার জানা নেই এত সুন্দর পৃথিবী টা আপনি আমাকে দেখাচ্ছেন !
ভাষা যেহেতু জানো না তাহলে ধন্যবাদ টা দিও না । খুব ধন্যবাদ দেয়া শিখেছো তাই না ! নওশাদ হেরার গাল টেনে দিলো।
নামবে তুমি সমুদ্রে ?
না ! আমি এখানে আপনার ঘাড়ে মাথা রেখে শুধু তাকিয়ে দেখব এই সমুদ্র।
ঠিক আছে দেখো যেভাবে তোমার ভালো লাগে।
নিশাল আর ইরফান কিছু ছেলের সঙ্গে বালুর উপর বল নিয়ে দৌড়ালো কিছুক্ষণ। তারপর পানিতে নেমে ঝাঁপাঝাঁপি করলো।
হেরা নওশাদ , আব্বা ,বুবু আর দুলাভাইয়ের সঙ্গে বসে রইলো। কিছুক্ষণ ইরফানের ছেলেকে কোলে নিয়ে হাটলো সে।
সূর্যাস্তের সময় নওশাদ হেরাকে নিয়ে পানির কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। হেরার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে বিশাল সমুদ্রের বুকে রক্তিম সূর্য টাকে ডুবে যেতে দেখলো।
যখন নওশাদের হাত ধরে হাঁটছে হেরা, ওর বারবার মনে হচ্ছিল ওর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময় এটা। এ যেন স্বর্গের সুখ।
সন্ধ্যার অনেক পর ওরা বাসায় ফিরে এলো । ইরফান আগামীকাল থেকে ওরা কোথায় কোথায় ঘুরতে যাবে সব বুঝিয়ে দিলো নওশাদকে। নওশাদ আসবে বলার পর সে অফিস থেকে সেভাবেই ছুটি নিয়ে রেখেছে।
এই কয়দিন পুরো ফ্যামিলি একটা ভেকেশন কাটানোর প্ল্যান করে ফেলল।
পরদিন আব্বাকে রোমানাদের বাসায় রেখে ওরা রওনা হলো কেনেডি স্পেস সেন্টারের উদ্দেশ্যে। ওদের গাড়ি বিস্তৃর্ণ মাঠের পাশ দিয়ে যাচ্চে কখনো, রাস্তার পাশে কখনো কমলা বাগান, কখনো লেক। স্বচ্ছ জলের সেই লেক গুলোতে কুমির থাকে বলতেই হেরা অবাক হয়ে তাকালো নওশাদের দিকে।
সত্যি বলছেন !
মামি আমাদের বাসার আশেপাশে যত লেক দেখেছেন ওখানেও আছে কুমির। হঠাৎ হঠাৎ দেখবেন মাটিতে শুয়ে রোদ পোহাচ্ছে।
কি সংঘাতিক!
একটু সামনে যে ঘন জঙ্গল দেখবেন এই রাস্তা ধরে যাওয়ার সময় জঙ্গল থেকে বের হয়ে কালো প্যান্থার গাড়িতেও কখনো কখনো আক্রমণ করে।
সত্যি ?
হ্যাঁ।
গল্প করতে করতে আর নতুন সব কিছু দেখতে দেখতে হেরা কেনেডি স্পেস সেন্টারে পৌঁছে গেল।
সেখানের থ্রি ডি হলে শো দেখে শুধু হেরা না নিশাল ও মুগ্ধ। হেরার কাছে মনে হচ্ছে, বইয়ে পড়েছিল সেই নীল আর্মস্ট্রং এর চাঁদে যাওয়ার গল্প। আজ সেখানের মাটিতে সে দাঁড়িয়ে আছে!
কি অদ্ভুত সেই অনুভূতি। হেরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে সব দেখছে।
মামনি !
হুম।
কেমন লাগছে তোমার ?
অদ্ভুত । আমার বিশ্বাস ই হচ্ছে না আমি এখানে এসেছি !
অনেক ছবি তুলেছি । তোমার ছবি তুলে দেই দাঁড়াও তুমি।
নিশাল হেরার প্রচুর ছবি তুলে দিলো।
ওদের দিনটা কেটে গেল স্পেস সেন্টারে ঘুরে। আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল ওরা বাসায় যাবে না সোজা অরলেন্ডো চলে এলো। হোটেল আগেই ইরফান বুক করে রেখেছিল। রাতটা ওরা হোটেলেই কাটালো।
পরদিন সকাল সকাল ওরা ডিজনি ল্যান্ড দেখতে বের হয়ে গেল।
নওশাদ গাড়িতে বসে বলল, এখানে আসা শুধু নিশালের জন্য। ছোট ছিল যখন তখন ও একবার এসেছিল। আবার নিয়ে আসতে হবে সেই প্রমিজ ও ওর মাম্মার কাছ থেকে আদায় করে নিয়েছিল। ওর মাম্মার প্রমিজ রক্ষার্থে ই এখানে আসা।
নিশাল বলল, পাপা আমার মনে নেই মাম্মা কি প্রমিজ করেছিল।
তোমার মাম্মা বলেছিল এখানে আবার তোমাকে আনবে তাই এবার নিয়ে এলাম।
হেরা বাচ্চাদের চেয়েও বেশি মজা পেলো ডিজনি ল্যান্ডে। নওশাদ অবাক হয়ে হেরাকে দেখছে । মনে হচ্ছে একটা কিশোরী মেয়ে যা দেখছে তাতেই মজা পাচ্ছে। খিলখিল করে হাসছে। ওর উচ্ছাস দেখে নওশাদ একবার বলল, তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তোমার বয়স কমে গেছে। বাচ্চাদের এসব দেখে তুমিও বাচ্চা হয়ে গেছো।
সত্যি আমার খুব আনন্দ লাগছে !
তোমাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
নওশাদ কার্টুন চরিত্র গুলোর সঙ্গে হেরার ছবি তুলে দিলো।
পরদিন ওরা ফিরে এলো বাসায়।
এর মাঝে একদিন রোমানার বাসায় দাওয়াতে গেল সবাই। সবাই যখন গল্পে ব্যস্ত এক ফাঁকে রোমানা হেরার কাছে এসে বসলো।
জানো হেরা আমি আর গীতি খুব ভালো বন্ধু ছিলাম।
হেরা রোমানার দিকে তাকালো।
আমার বিয়ের পর আহসান বড় ভাবির কাছে আমাকে রেখে এখানে ফিরে এলো। তখন নওশাদ ভাই হুট করে একদিন গীতিকে বিয়ে করে ভাবির বাসায় নিয়ে হাজির হয়। আমার আর গীতির বন্ধুত্বের সম্পর্ক তখন থেকে।
আমি শুনেছি সেই গল্প ভাবি !
নওশাদ ভাই বলেছে ?
জ্বী উনি বলেছেন আপনি উনাদের জন্য কি করেছেন।
রোমানা হাসলো । আমি আর গীতি এক সঙ্গে ঘুমাতাম। কত রাত জেগে গল্প করতাম। কিভাবে নওশাদ ভাই ওকে দেখতে ক্যাডেট কলেজ থেকে ছুটি পেলে আসতো। কত বকা খেয়েছে সে তার মায়ের কাছে আরো কত গল্প। গীতি খুব ভালো বাসতো নওশাদ ভাই কে ! নওশাদ ভাইকে ঘিরে ওর পৃথিবীটা ছিল। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত শুধু নওশাদ ভাইয়ের চিন্তা করে গেছে। তুমি নওশাদ ভাইয়ের খেয়াল রেখো হেরা উনি অনেক ভালো মানুষ।
হেরা রোমানার হাত ধরলো , ভাবি আমার পৃথিবী টাই উনি। উনি যে কতটা ভালো মানুষ আমার চেয়ে বেশি আর কে জানে! আমি বেঁচে আছিই উনার জন্য।
খুব ভালো লাগলো তোমার কথা শুনে।
হেরা দূর থেকে নওশাদকে দেখছে। অন্যদের সঙ্গে বসে হেসে হেসে গল্প করছে। হেরা মুগ্ধ হয়ে দেখছে ।
ভাবি আমিও আপনার বন্ধুর মতো উনাকে অনেক ভালোবাসি । উনি ছাড়া এই পৃথিবীতে আমার নিজের বলে আর কেউ নেই । আমার জন্য উনি সব কিছু। আমার পৃথিবীর সব আলো, সব আনন্দ,সব সুর,সব কিছু এই মানুষটা।
শুনে খুব খুশি হলাম হেরা। আসলে কি জানো কপালের লিখা কেউ এড়াতে পারে না।
তোমার কপালে নওশাদ ভাই ছিলেন। গীতি মারা যাওয়ার পর কেউ উনাকে রাজি করাতে পারেনি বিয়ের জন্য। কিন্তু দেখো তোমার সঙ্গে ভাগ্য লিখা ছিল । তাই হঠাৎ করে বিয়ে হয়ে গেল তোমাদের। বয়স, সমাজ কিছুই বাঁধা হয়নি ।
জ্বী ভাবি।
রোমানাকে কেউ একজন ডাকতেই রোমানা সেদিকে ছুটে গেল।
হেরা উঠে ওদের বাসার বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। বাসার পিছন দিকের এই বারান্দায় দাঁড়ালে লেকের বাতাস এসে গায়ে লাগে। বাতাসে হেরার চুল গুলো উড়ছে। ও দাঁড়িয়ে নিজের কথা চিন্তা করছে। কোথাকার হেরা আমি কোথায় চলে এসেছি। সবই নির্ধারণ করা ছিল ।
হঠাৎ নওশাল পিছন থেকে জড়িয়ে ধরতেই ও চমকে উঠলো !
এখানে একা দাঁড়িয়ে অন্ধকারে কি দেখছো ?
খুব একটা অন্ধকার না দেখুন কি সুন্দর চাঁদ আকাশে !
হুম, তোমার মত সুন্দর স্নিগ্ধ একটা চাঁদ। একা একা চাঁদ দেখছো তুমি।
ভাবছি !
কি?
কোথাকার হেরা কোথায় চলে এসেছি। সাত সমুদ্র পার হয়ে । ভাগ্য আমাকে কোথায় নিয়ে এসেছে! আমার ভাগ্যে আপনি ছিলেন বলেই সব বদলে গেল।
কোন জিনিসটা আমাদের এক সূতোয় বেঁধেছে জানো হেরা?
কি?
তোমার এই দুটো চোখ , নওশাদ হেরার চোখে চুমু খেলো। এক মাত্র তোমার চোখ আমাকে সেদিন অস্থির করেছিল।আল্লাহ ই চেয়েছিল। তা না হলে যে আমি নিজেকে আর কোথাও জড়াবো না ভেবেছিলাম কেন এই চোখের কাছে ধরা খেয়ে যাই ?
সেজন্যই আমার চোখ ও আপনাকে দেখে শান্তি পায়।
তাই বুঝি?
জ্বি।
নওশাদ হেরার হাত ধরলো । চলো কাছেই বীচ হেঁটে আসি।
এখন এই রাতে!
সমস্যা কি ? খুব ভালো লাগবে চলো !
ঠিক আছে চলুন।
( চলবে)
#তবু_সুর_ফিরে_আসে
৩৯ পর্ব
নিশাল ভেকেশন টা খুব দারুন কাটাচ্ছে। অহির সঙ্গে ওর দারুন ভাব হয়েছে। অহিকে সঙ্গে নিয়ে সাইকেল চালাচ্ছে, সুইমিং করছে, কখনো বীচে গিয়ে ফুটবল খেলছে, শপিং করছে। এর মাঝে দুই দিনের জন্য ওরা ক্রুজে গিয়েছিল।
বিশাল বড় জাহাজ দেখে হেরা পুরো হতভম্ব! নিশালও এই প্রথম এত বড় জাহজ দেখলো। দুই দিন ওরা চারজন আটলান্টিকের নীল জলের উপর ভেসে বেড়ালো।
জাহাজ বড় হয় শুনেছি তাই বলে বড় এত বিশাল ! হের অবাক হয়ে নওশাদকে বলল।
নওশাদ হেরাকে বলল, এর চেয়েও বড় জাহাজ আছে। এটা তো মোটামোটি বড় একটা জাহাজ।
আচ্ছা আপনার তো জাহাজ আছে সেগুলো কি এটার মত ?
না হেরা আমার গুলো মাঝারি সাইজের বানিজ্যিক জাহাজ। এগুলো তো বিলাসবহুল জাহাজ।
আমার কাছে এটাকে একটা শহর মনে হচ্ছে !
বলতে পারো এটা একটা শহর, কি নেই এখানে সুইমিং পুল, বার, মুভি থিয়েটার, ক্যাসিনো, রেস্টুরেন্ট সব আছে।
তাই তো দেখছি , হেরা অবাক হয়ে জাহাজের চারিদিকটা ঘুরে ঘুরে দেখছে।
সন্ধ্যায় নিশাল ইরফানের সঙ্গে থ্রি ডি মুভি দেখতে চলে গেল।
নওশাদ হেরাকে নিয়ে ক্যাসিনোতে এসে ঢুকলো।
এখানে কি হবে ?
হেরা এখানে তুমি ইচ্ছে করলে তোমার ভাগ্য যাচাই করে দেখতে পারো ।
কিভাবে ?
জুয়া খেলে ।
কি বলছেন ছিঃ ! জুয়া খেলে ভাগ্য যাচাই করব কেন ?
আরে এসো তো দেখি কি হয় ! আমি নিজেও কোনদিন খেলিনি কিন্তু খুব ইচ্ছে করতো। গীতিকে নিয়ে একবার লাস ভেগাসে ঘুরতে গেলাম কিন্তু ও আমাকে একটা ডলার নিয়েও ক্যাসিনোতে ঢুকতে দিলো না । ওর ভয়েই এই ইচ্ছে টা আমার অপূর্ণ রয়ে গেছে। চলো তোমার সঙ্গে আমার এই ইচ্ছে পূরণ করব।
না এত কষ্টের টাকা জুয়া খেলে উড়ানোর দরকার নেই হেরা বলল ।
প্লিজ হেরা প্লিজ চলো । এক স্লট খেলব !
এক স্লট শুধু মনে থাকে যেন।
ঠিক আছে আমি এক স্লট তুমি এক স্লট।
ঠিক আছে চলুন।
নওশাদ পরপর তিন বারে আঠারোশ ডলার হারলো । কিন্তু তার খেলার নেশা জিদে পরিনত হয়েছে। না জিতা পর্যন্ত নাকি সে থামবে না। হেরা টেনেও তাকে আনতে পারছে না।
এখন তুমি খেলবে হেরা এসো ।
না আমি খেলব না খেলব না , হেরা অনড় হয়ে রইলো।
কেন ?
আপনি আমার কথা শুনছেন না আমিও শুনব না । হেরা গাল ফুলিয়ে ফেলল।
আচ্ছা ঠিক আছে তুমি একবার খেলবে তারপর আর একবার খেলব আমি তারপর হারি জিতি আর খেলব না প্রমিজ।
সত্যি !
একদম জেন্টলম্যান প্রমিজ।
ঠিক আছে ।
আলো ঝলমলে ক্যাসিনো । আশেপাশে পুরুষ, মহিলা ডলার হাতে নিয়ে স্লট মেশিনের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। হেরা নওশাদের খেলা দেখেছে। হেরে নওশাদ আরো বেশি ডলার বাজি রাখতে চাইছিল । হেরার চোখ রাঙ্গানি দেখে আঠারশো ডলারেই আপাতত স্থির আছে।
হেরা খেলার জন্য দাঁড়ালো। নওশাদ খুব এক্সাইটেড হেরার ভাগ্যে কি আছে দেখার জন্য ! কয়েন দিয়ে স্লট মেশিনে খেলা শুরু হলো। হঠাৎ মেশিনের উপর লাল বাতি জ্বলে উঠলো আর বিকট শব্দে সাইরেন বাজা শুরু হলো। হেরা ভয় পেয়ে গেল! সে নওশাদের দিকে ভীত চোখে তাকাচ্ছে। নওশাদ হেরাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে উঠলো, তুমি জ্যাকপট জিতেছো হেরা !
হেরা হাসছে , সত্যি আমি তো ভাবলাম ভুল কোন বাটনে চাপ দিয়ে ফেলেছি আর সাইরেন বাজছে।
ক্যাসিনোর দুজন চাইনিজ মহিলা এসে চাবি দিয়ে সাইরেন বন্ধ করলো আর মেশিন থেকে একটা প্রিন্টেড কুপন বের করে হেরার হাতে দিয়ে বলল কাউন্টার থেকে ভাঙ্গিয়ে আনতে। হেরা নয়শ ডলারের কুপন জিতে গেল। হেরার চেয়ে বেশি নওশাদ এক্সাইটেড !
এবার জিতা হয়েছে চলেন প্লিজ।
আর একবার শুধু একবার।
না।
প্লিজ প্লিজ শেষবার।
শেষ , সত্যি করে বলছেন তো নিশালের পাপা?
সত্যি।
হেরা আর নওশাদ আবার এসে দাঁড়ালো মেশিনের পাশে। মেশিন ঘুরছে।
হেরা আর একবার সবাইকে চমকে দিয়ে এবার সে দুই হাজার ডলারের জ্যাকপট জিতে গেল। নওশাদ হেরাকে জড়িয়ে ধরে বাচ্চাদের মত লাফাচ্ছে ! আমি জানতাম কাঠবিড়ালী তুমি জিতবেই।
কুপন ভাঙ্গিয়ে ঊনত্রিশ শো ডলার নিয়ে হেরা ক্যাসিনো থেকে বের হতে নিলো। নওশাদ হেরাকে টানছে ! হেরা প্লিজ দান দান তিন দান আর একবার।
অসম্ভব। আপনি থাকেন এখানে যা খুশি করেন আমি এই জুয়া খেলায় আর নেই।
একবার !
একদম চুপ সোজা আমার সঙ্গে উপরে আসেন। অনেক হয়েছে আপনার ভাগ্য নির্ধারণ।
তুমি এত বেরসিক কেন হেরা ! আজ কিন্তু তোমার দিন ছিল।
আমি এমনই। কোন দিন টিন না আজাইরা কথা বলবেন না তো। আসেন আমার সঙ্গে। হেরা টেনে নওশাদকে ক্যাসিনো থেকে বের করলো।
আপনার মত নামাজী মানুষ এই জুয়া খেলে ! আল্লাহ কত গুনাহ দিবে।
একটু মজা নিলাম।
এই মজা নিতে গিয়েই পাপ টা হয় বুঝলেন।
আচ্ছা আপনি পানির মত ডলার খরচ করছেন এই দেশে এসে ,এই ঊনত্রিশ শো ডলার তো আপনার কাছে কিছু ই না তবুও আপনি খুশিতে লাফাচ্ছে। আর আঠারোশ ডলার হারাতে রাগে পাগল হয়ে আরো খেলতে চাইছিলেন কেন ?
এটাই তো ক্যাসিনোর মজা ! দেখবে মধ্য প্রাচ্যের শেখ রা আসে ব্যাগ ভরে ডলার নিয়ে তারপর হেরে চোখ মুখ চুপসে ভোর বেলায় হোটেলে ফিরে, পরদিন আবার আসে। এটা একটা নেশা।
আপনি ওদের মত না। আপনার কষ্টের একটা টাকাও আমি চাইনা জলে পড়ুক। অন্তত পাপ কেনার জন্য তো অবশ্যই না।
জীবনে প্রথম খেললাম আজ হেরা।
এটাই জীবনের শেষ বার। নিশালের পাপা, দেখুন দেশে কত বাবা মা আছে টাকার অভাবে সন্তানের চিকিৎসা করাতে পারে না ওদের কাছে এই আঠারশো ডলার অনেক টাকা ! আপনার কাছে যা কিছুই না।
সরি বললাম তো আর খেলব না। নওশাদ হেরার হাত ধরে ব্রীজ সাইডে উঠে এলো।
আমি এই পাপের ডলার কিছু করব না তারচেয়ে কোন অভাবগ্রস্ত মানুষ কে দিয়ে দিব।
তুমি যা বললে সেরকম কোন বাবা মা কে দিয়ে দিও দেশে গিয়ে ঠিক আছে।
হুম ঠিক আছে।
এখন মুড ঠিক করো। হাসো।
হুঁ।
রাতের বেলায় আলো ঝলমলে জাহাজটাকে একটা দ্বীপের মতো লাগছে। কত দেশের কত রকম মানুষ। ঘুরছে। আনন্দ করছে।
ওরা হাঁটতে হাঁটতে পুল সাইডে এসে রেলিং এর পাশে দাঁড়ালো। অনেক বাতাস এই জায়গায় । হেরার চুল উড়ছে। নওশাদ হেরার হাত ধরে গল্প করছে । হেরা কখনো হাসতে হাসতে ওর গায়ে গড়িয়ে পড়ছে নওশাদের কথা শুনে।
একটুপর নিশাল আর ইরফান মুভি দেখা শেষ করে ওদের কাছে এসে হাজির হলো। নওশাদ ছেলেকে দেখে বলল, তোমার মামনি আজ দারুন কাজ করেছে !
কি পাপা ?
ক্যাসিনোতে পর পর দুইটা জ্যাকপট জিতেছে । কিন্তু আমি হেরেছি আঠারোশ ডলার।
ওয়াও মামনি গ্রেট, নিশাল দারুন এক্সাইটেড হয়ে গেল।
মামি আপনি তো দারুন লাকি ! আমি জীবনে যতবার খেলেছি শুধুই হেরেছি।
পাপা আমি কি খেলতে পারব ? নিশাল অনুরোধে র স্বরে বলল।
না নিশাল জুয়া খুব বাজে একটা খেলা তোমার পাপাকেই আমি বকেছি।
না বাবা ওখানে বাচ্চাদের যেতে দেয় না , তুমি বড় হয়ে যেও।
নিশালের পাপা কেমন বাবা আপনি , ছেলেকে বুদ্ধি দিচ্ছেন বড় হয়ে ক্যাসিনোতে যেতে ? ছিঃ!
হেরা আমি আমার ছেলের বন্ধুর মত আমি চাই ও একবার হলেও এই মজা টা নিক। এক কাজ করব আমরা ,আমি আর নিশাল একসঙ্গে খেলব !
আপনি না প্রমিজ করলেন আর কখনো ঢুকবেন না ক্যাসিনো তে।
নিশাল আমার সঙ্গে এসো বাবা পাপার কথা শুনতে হবে না জুয়া খেলা ভালো না । আল্লাহ গুনাহ দিবে। হেরা ছেলেকে হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
মামনি মামনি আমি এখন তো যাচ্ছি না ক্যাসিনোতে । তুমি চিন্তা করো না। আগে বড় হই তারপর দেখা যাবে।
বড় হলেও যাবে না। তোমার পাপা শুধু দুষ্ট বুদ্ধি দেয়।
নওশাদ আর ইরফান হেরাকে দেখে হাসছে।
দুই দিন খুব আনন্দ করে ওরা বাসায় ফিরে এলো। নওশাদের ছোট ভাগ্নে ইশরাক নেপোলস থেকে বউ বাচ্চা কে নিয়ে এসেছে সবার সঙ্গে দেখা করতে ছুটি কাটাতে।
ওরা আসার পর বাসার আনন্দ যেন আরো বেড়ে গেল। সবাই মিলে মিয়ামি বীচ থেকে শুরু করে বিখ্যাত সব জায়গায় ঘুরে বেড়ালো।
দেখতে দেখতে ওদের ফিরে যাওয়ার সময় হয়ে এলো। বুবু ঘোষণা দিলো আর বাহিরে ঘোরাঘুরি র দরকার নেই। এখন বাকিদিন গুলো বাসায় থেকে সবাই মিলে সময় কাটাবে।
ইরফানের স্ত্রী মৌ ব্যাঙ্কার। কিন্তু ওর খুব বেকিং এর শখ। সে বেকিং এর উপর বিভিন্ন কোর্স করেছে। তার খুব ইচ্ছে একটা কেক, পেস্ট্রির শপ দিবে। ব্যাঙ্কের চাকরি তার ভালো লাগে না।
সে প্রতিদিন নানান রকমের কেক বানিয়ে খাওয়াচ্ছে সবাই কে। হেরা ওর কাছ থেকে দেখে শিখার চেষ্টা করছে।
একদিন হেরা মৌ এর কাছ থেকে শিখে কেক বানিয়ে খাওয়ালো সবাই কে। নওশাদ তো মুগ্ধ হেরার বানানো কেক খেয়ে!
বুবু বলল, তোর বউ প্রথম বানিয়েছে খুব ভালো হয়েছে এখন ওকে একটা গিফট দিতে হয় তো আমাদের। তুই কি দিবি বাবু?
আমি গিফট তো একটা দিবই , কিন্তু সেটা হেরাকে যে শিখিয়েছে তাকে। নওশাদ ঘোষণা করলো মৌ তুমি পেস্ট্রি শপ যখন দিবে আমি ফিন্যান্স করব তোমাকে। ইনভেস্টমেন্ট আমার , বাকি কাজ তোমার।
মৌ খুব খুশি হয়ে গেল, থ্যাংকস মামা আমি আপনাকে জানাব ।
ঠিক আছে।
ওদের চলে আসার দুই দিন আগে থেকেই জান্নাত আজমী চোখের পানি ফেলা শুরু করলেন।
বাসাটা আনন্দে ভরে ছিল! আবার খালি হয়ে যাবে।
নওশাদ বলল, তুমি চলো আমাদের সঙ্গে।
বললেই কি যেতে পারি নাতি টা ছোট ওকে রাখবে কে ? ডে কেয়ারে দিব না এত ছোট বাচ্চা।
আচ্ছা ঠিক আছে ও একটু বড় হোক তখন ওকে নিয়ে তুমি চলে এসো বুবু।
বাবু আমি যে কথাটা বলে এসেছিলাম মনে আছে তোর ?
কোন কথা ?
ঐ যে তোর আর হেরার বাচ্চা নেয়ার কথা ।
বুবু হেরার গ্রেজুয়েশন টা আগে হোক ,সময় তো রয়েছেই!
ঠিক আছে মাথায় রাখিস তুই।
আচ্ছা বুবু আমার মাথায় না থাকলেও তুমি ফোন দিয়ে দিয়ে মনে করিয়ে দিবে আমাকে আমি ভালো করেই জানি, নওশাদ হাসতে হাসতে বলল।
তোকে নিয়ে চিন্তায় থাকি !
আর কেন দুশ্চিন্তা করো আমাকে নিয়ে আমি তো এখন ভালো আছি বুবু ? তুমি খালি খালি চিন্তা করে ব্লাড প্রেসার বাড়াও।
শোন হেরা কোন গুড নিউজ দিলেই আমি সঙ্গে সঙ্গে দেশে চলে যাব !
কেন , নওশাদ অবাক হয়ে তাকালো বোনের দিকে?
কেন আবার ওর যত্ন করার জন্য । তোর বাসায় একটা কেউ আছে ওর খেয়াল রাখার জন্য।
কি বলো বাসা ভর্তি কাজের লোকজন !
কাজের লোকজন রাখবে ঐ অবস্থায় হেরার খেয়াল ? কি যে বলিস বাবু ! গীতির সময় আম্মা বেঁচে ছিল, গীতির মা ছিল বোনরা ছিল কিন্তু হেরার তো ইহ দুনিয়ায় তুই ছাড়া কেউ নেই । তুই রাখবি খেয়াল তাহলে তো হয়েছে !
কেন আমি খেয়াল রাখতে পারব না , তোমার কি মনে হয় ?
পারবি না । তুই ওকে রেখে দেশ বিদেশ করে বেড়াবি সে আমি ভালো করেই জানি !
ঠিক আছে বুবু যখনের টা তখন দেখা যাবে । ওসব অনেক দেরি আছে । আর একটা কথা তুমি এসব কথা হেরাকে বলতে যেও না ও খুব লজ্জা পাবে ।
আচ্ছা বলবো না যাহ।
কিন্তু দেখ কি খারাপ লাগছে চলে যাবি তোরা এটা ভেবেই।
যেতে তো হবেই বুবু ! তুমি মন খারাপ করো না ।ভিডিও কলে দেখা হচ্ছে তারপর আর কেন মন খারাপ করে থাকা বলো ।
হুম এখন তো ভিডিও কল ই ভরসা ।
দেশে চলে আসার পর নওশাদ তার বিজনেস নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল। হেরার ভার্সিটিতে সামার ভেকেশন চলছে। এলিন, নাহিন গিয়েছে ওর বাবা মায়ের কাছে। নিশাল আর বীথির অস্ট্রেলিয়া যাওয়া আপাতত মনে হয় হচ্ছে না। ওরা দেশে আসার আগেই বীথির স্বামী হাসিব সিঁড়িতে পিছলে পড়ে পা ভেঙ্গে গেছে। দেশে এসে নওশাদ হেরা আর নিশালকে সঙ্গে নিয়ে বীথির বাসায় গিয়ে দেখে এসেছে হাসিব কে ।
ডাক্তারের ভাষ্যমতে মাস দেড় মাস লেগে যেতে পারে প্লাস্টার খুলতে ।
বীথির সঙ্গে নিশালের আর যাওয়া হলো না অস্ট্রেলিয়া ।
নিশালকে তবুও নওশাদ বলল, তুমি যদি যেতে চাও নানুকে দেখতে তাহলে আমি প্লেনে তুলে দেই মামা তোমাকে রিসিভ করতে তো আসবেই । যাবে তুমি ?
থাক পাপা । পরে যাওয়া যাবে ।
নিশাল তার বাকি ভেকেশন বাসায় অলস সময় পার করেই কাটাচ্ছে। হেরা আর ও প্রায় সময়ই ঘুরতে বের হয়। শপিং করে।
এলিন, নাহিন ছুটি শেষ করে বাসায় আসতেই আবার বাসায় হৈচৈ শুরু হয়ে গেল।
নওশাদ একদিন ওদের হৈচৈ দেখে হেরাকে বলল, তোমরা যা করছো এবার নিশাল কলেজে গেলে ওর খারাপ লাগবে । ওর মন পরে থাকবে তোমাদের এই হৈচৈ করাতে।
আমারো তাই মনে হচ্ছে । আমার যে কি খারাপ লাগবে নিশাল চলে গেলে।
ভার্সিটি খুলতেই হেরাও ক্লাস নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল। এলিন, নাহিনদের সঙ্গে ক্যাফেতে বসে আড্ডা দেয়া হচ্ছে না তার। একদিন ক্লাস শেষে বাসায় আসার সময় ডিপার্টমেন্টের সামনে মাহাদীর সঙ্গে দেখা ।
কি খবর লজ্জাবতী তুমি এভাবে ডুব দিলে যে দেখাই পাচ্ছি না ! মেসেঞ্জারে মেসেজ ও সীন করো না ।
হেরা কি বলবে বুঝতে পারছে না । শুধু বলল,আমি ফেসবুকে খুব একটা বসি না ।
তোমার ফ্লোরিডা ট্রীপের ছবি দেখলাম দারুন ইনজয় করেছো দেখে ই বোঝা যাচ্ছে।
ফ্যামিলি সঙ্গে থাকলে এনজয়মেন্ট অনেক বেশি হয় এটাই তো স্বাভাবিক।
আমি অবশ্য এত কিছু দেখিনি ,আমি মুগ্ধ হয়ে তোমার ছবি দেখেছি !
জ্বি !
কিছু না। তোমার ক্লাস শেষ চলো ক্যাফের দিকে যাই ।
না আমাকে বাসায় ফিরতে হবে , তাড়া আছে ।
তোমার বিজনেস ম্যান হাজব্যান্ড নিশ্চয়ই এই দুপুর বেলা তোমার পথ চেয়ে বসে নেই , তাহলে এত তাড়া কিসের ?
হাজব্যান্ড ছাড়াও তাড়া থাকতে পারে না। বাসায় আমার ছেলে আছে লাঞ্চে ও অপেক্ষা করবে আমার জন্য।
তোমার ছেলে, দারুন বলেছো । কথাটা বলেই মাহাদী হো হো করে একটা ব্যঙ্গ অট্টোহাসি দিলো।
হেরা তাকিয়ে রইলো তীব্র চোখে । গাড়ি নিয়ে সবুজ চলে আসতেই সে গাড়িতে উঠে গেল।
মাহাদি ওখানেই হাসি মুখে দাঁড়িয়ে রইলো ওর দিকে তাকিয়ে।
সন্ধ্যায় হেরা এলিন, নাহিনের সঙ্গে মাহাদীকে নিয়ে ওর অস্বস্তির প্রসঙ্গ তুলল। সব শুনে ওরা খুব একটা পাত্তা দিলো না ।
বৌমনি দেখো ও অনেক ভালো একটা ছেলে তুমি চিন্তা করো না ও সবার সঙ্গে এমন করে, নাহিন বলল।
কিন্তু আমার ভালো লাগছে না নাহিন।
আশ্চর্য তুমি এভাবে রিয়েক্ট করছো কেন বন্ধুর সঙ্গে একটু মজা করেছে ! আর তোমার কত সুন্দর ছবি তুলেছে দেখো। ইসস ও যদি এত সুন্দর একটা ছবি আমাকে তুলে দিতো তাহলে তো আমি খুব খুশি হতাম।
আমি কেন জানি খুশি হতে পারছি না নাহিন ।
এলিন হেরাকে বলল, ঠিক আছে আমি বলে দেবো ও যেন তোমার অনুমতি ছাড়া ছবি না তোলে ।
আর এমন মেসেজ যেন না পাঠায় , তোমাদের মত নিশালের পাপাও পাত্তা দিলো না ব্যাপারটা !
কি ! বৌমনি তুমি এই কথা ভাইয়ার সঙ্গেও বলে ফেলেছো ? নাহিন অবাক হয়ে বলল!
হ্যাঁ উনার কাছে আমি কিছু গোপন করি না !
তাই বলে এগুলোও বলতে হবে ?
নাহিন আমি সম্পর্কের মধ্যে স্বচ্ছতা থাকাটাকে বেশি প্রাধান্য দেই।
বৌমনি তোমাকে কি জান্নাতুল ফেরদৌসেই যেতে হবে আর কোন ছোটখাটো বেহেস্তে গেলে হবে না , হাসতে হাসতে নাহিন বলল ?
হ্যাঁ আমাকে ওখানেই যেতে হবে বলে হেরাও হেসে দিলো।
নিশালের যেদিন রেজাল্ট বের হলো সেদিন ছিল গীতির মৃত্যুবার্ষিকী । অন্য বার নওশাদ দিনটা নিজের মতো কাটায়। সকালে কবরস্থানে যায়। অনেকক্ষণ গীতির কবরের পাশে বসে থাকে। তারপর বাসায় এসে চুপচাপ নিজের ঘরেই থাকে। শোয়েব সেদিন খুব ব্যস্ত থাকে। কারণ তাকেই করতে হয় এতিমখানায় এতিমদের খাবার পাঠানোর জন্য সব কিছু । নওশাদের সকল ফ্যাক্টরিতে লেবারদের সেদিন খাবার দেয়া হয় দোয়া পড়ানো হয়। নওশাদ ওসব কিছুর মধ্যে থাকে না সে নিজের ঘরে একা থাকতেই পছন্দ করে। ওকে সেদিন কেউ ডাকাডাকি করে না। যুথী,বীথি বাসায় আসে নওশাদ সেদিন ওদের সামনেও আসে না। কিন্তু নিশাল বাসায় থাকলে ছেলেকে নিয়ে যায় কবরস্থানে। নিশাল তার পাপার মতো এতটা শোকাহত হয়ে থাকে না। সে তার স্বাভাবিক জীবনযাপনই করে ।
আজ সকাল থেকে হেরা একটু বিচলিত সে কি করবে তাই চিন্তা করছে। সকালে তার পরীক্ষা ছিল তাই সে ভার্সিটিতে চলে গিয়েছিল। যাওয়ার আগে দেখেছে নওশাদ ফোনে কথা বলাতে ব্যস্ত তাই সে আর কোন কথা বলেনি। কাছে দাঁড়িয়ে শুধু বলেছে, আমি আসলাম।
নওশাদ চোখে শুধু ইশারা করলো আর কিছু বলেনি।
পরীক্ষা শেষে বাসায় এসে দেখে নওশাদ আর নিশাল বাসায় নেই ওরা কবরস্থানে গিয়েছে।
আনারের মা ওকে দেখে কাছে এসে বলল, স্যার সকাল থেকে খায় নাই কিছু আম্মা।
নিশাল খেয়েছে ?
ভাইয়ারে জোর কইরা খাওয়াইছি আমি।
আনারের মা আমি বুঝতে পারছি না তোমার স্যারকে কি বলব ? খাওয়ার কথা বললে কি উনি রাগ করবেন ?
না আম্মা রাগ করতো না তবে খাওয়ার সম্ভাবনা নাই। স্যারের আজ মনডা খারাপ। এদিকে পারুল শয়তান মাইয়া, দাদারে কইছে আজ আম্মার মৃত্যুবার্ষিকী স্যার কবরস্থানে গেছে কিন্তু দাদা শুনছে আইজ আম্মা মারা গেছে সবাই কবর দিতে গেছে এখন দাদা কানতাছে কবরস্থানে যাইব ডাকাডাকি করতাসে সবাইরে। কি করতে মন চায় পারুলরে কন আম্মা ?
থাক আজ বাসায় চিল্লাচিল্লি করো না ,আমি আব্বার সঙ্গে কথা বলে ঠান্ডা করছি।
হেরা শ্বশুরের রুমে গিয়ে শ্বশুর কে বুঝিয়ে বলল আজকে কোন দিন। হেরার কথা শুনে শ্বশুর বুঝেছে কিন্তু কান্নাকাটি করতে করতে বললেন, তুমি যাও বাবুকে এখানে আসতে বলো আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেই আজ ওর অনেক কষ্টের দিন।
জ্বি আব্বা আমি আপনার ছেলেকে পাঠিয়ে দিচ্ছি কিন্তু আপনি কাঁদলে উনি কষ্ট পাবেন আপনি আগে কান্না বন্ধ করুন।
আমার দাদু ভাই কে আসতে বলো ওর ও আজ অনেক কষ্টের দিন।
সবাই কে আসতে বলব আপনি শান্ত হোন আগে।
ঠিক আছে বৌমা।
হেরা শ্বশুরের রুম থেকে বের হয়ে দেখে নিশাল লিভিং রুমের সোফায় শুয়ে মোবাইলে গেমস খেলছে।
তোমার পাপা চলে এসেছে, হেরা নিশালের পাশে বসতে বসতে বলল ?
হ্যাঁ পাপা রুমে ।
হেরা নিশালের মাথায় হাত রাখলো, তোমার কি অনেক বেশি মন খারাপ বাবা ?
অনেক বেশি না কিন্তু খারাপ লাগছে মামনি। এই জন্য না যে আজ মাম্মার মৃত্যুবার্ষিকী !
তাহলে কেন মন খারাপ ?
আমার রেজাল্ট দিয়েছে মামনি কিন্তু মাম্মা সেটা জানতে পারলো না তাই মন খারাপ। আজ মাম্মা থাকলে অনেক খুশি হতো। অনেক হৈচৈ করতো। কিন্তু দেখো মাম্মার মৃত্যুবার্ষিকীর দিনই রেজাল্ট পাবলিশ হতে হলো !
তোমার মাম্মা ঠিকই জানতে পেরেছে তোমার রেজাল্ট ।
কিভাবে ? নিশাল উঠে বসে হেরার দিকে তাকালো।
যেসব বাচ্চাদের মা তাদের ছোট রেখে মারা যায় তারা বড় না হওয়া পর্যন্ত তাদের মায়েদের আত্মা বাচ্চাদের কাছাকাছিই থাকে ।
সত্যি ?
হুঁ।
তাহলে তো বড় হয়ে যাওয়াটা ঠিক হবে না কি বলো?
কখন শুনলে রেজাল্ট ?
মাত্রই ফ্রেন্ড ফোন দিয়ে বলল।
পাপাকে বলেছো ?
না , পাপার মন খারাপ থাক এখন বলার দরকার নেই।
এক কাজ করো নিশাল, তুমি পাপার কাছে গিয়ে পাপাকে বলে এসো দেখবে পাপার মন ভালোও হয়ে যেতে পারে ।
আজকে পাপা অনেক আপসেট মামনি ।
সেজন্যই বলছি চলো আমরা যাই ভালো খবরটা দিয়ে আসি।
হেরা নিশালকে নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকলো ! ঘর অন্ধকার করে নওশাদ ইজি চেয়ারে শুয়ে আছে।
হেরা নওশাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো নিশালকে সঙ্গে নিয়ে। নওশাদ চোখ মেলে দুজনকে দেখে বলল, কিছু বলবে ?
নিশাল একটা সুখবর দিতে এসেছে আপনাকে । শুনলে আপনার মন ভালো হয়ে যাবে।
সুখবর , কি ?
পাপা আমার রেজাল্ট দিয়েছে আমি গোল্ডেন ফাইভ পেয়েছি ।
নওশাদের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল ছেলের মাথায় হাত রাখলো কনগ্রচুলেশন বাবা । এটাতো দারুন খবর তোমার কি লাগবে বলো। পাপা তুমি যা চাও তাই দিবে ।
আমার কিছু লাগবে না পাপা ।
এটা কেমন কথা কিছু লাগবে না ! ভালো রেজাল্ট করেছো তোমাকে অবশ্যই আমি একটা ভালো গিফট দিব।
পরে দেখা যাবে । পাপা তুমি রেস্ট নাও আমি রুমে যাচ্ছি।
ঠিক আছে।
নিশাল বের হয়ে যেতেই হেরা নওশাদের পাশে এসে বসল। মাথায় হাত রাখলো।
নিশাল কিছু খেয়েছে হেরা ?
সকালে ব্রেকফাস্ট করেছে আপনি তো সেটাও করেননি।
ইচ্ছে করছে না।
নিশালের খুব মন খারাপ। আমাকে বলল, আজ মাম্মা থাকলে রেজাল্ট শুনে খুব আনন্দ করতো, হৈচৈ করতো ।
নওশাদ চুপচাপ শুনছে কথা গুলো।
হেরা কিছুক্ষণ চুপচাপ নওশাদের পাশে বসে থেকে উঠে গেল। নওশাদের ডাকে আবার কাছে এসে দাঁড়ালো ।
হেরা ।
জ্বি।
একটা কাজ করবে ।
বলুন।
ছেলেটার জীবনে একটা বিশেষ দিন আজ এত ভালো রেজাল্ট করলো তুমি কিছু একটা করবে যেন ওর মন ভালো হয়ে যায়।
আমি বলি কি আপনি ওকে কাছে ডেকে ওর সঙ্গে স্বাভাবিক একটা দিনের মত সময় কাটান দেখবেন ওর মন ভালো হয়ে যাবে। ছেলের সঙ্গে বসে লাঞ্চ করেন ওর মাম্মাকে নিয়ে দুইটা কথা বলেন দেখবেন ওর মন খারাপ টা কমে যাবে। আপনার যেমন কষ্টের দিন আজ তো ওরও কষ্টের দিন । দুজন একসঙ্গেই কষ্টটা ভাগাভাগি করে নিন তাহলে দেখবেন ওর ভালো লাগবে।
আমার কিছু করতে ইচ্ছে করছে না হেরা।
আপনি চাইছেন ছেলের মন ভালো করতে আর ছেলে মন খারাপ করে বসে আছে কারণ তার পাপার মন আজ খুব খারাপ । তাহলে কিভাবে হবে?
ওর রেজাল্ট দিলো তাই বলছিলাম হেরা।
ঠিক আছে কি করা যায় দেখি। হেরা রুম থেকে বের হয়ে এলো।
একটুপর নওশাদ নিজেই রুম থেকে বের হয়ে নিশালকে ডেকে নিয়ে একসঙ্গে লাঞ্চ করলো। হেরা তাকিয়ে দেখছে এত বছর যে মানুষটা নিজের কষ্ট নিজের মাঝে নিয়ে দিন কাটাতো আজকের দিনে । সেই মানুষটা ছেলেকে নিয়ে স্বাভাবিক দিনের মত খাচ্ছে গল্প করছে। নিশালও তার পাপার সঙ্গে স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলছে।
সন্ধ্যার আগে আগে সুমনা আর রেজোয়ান একটা কেক নিয়ে এলো নিশালের জন্য।
সুমনা নিশালকে জড়িয়ে ধরে বলল, মিষ্টি মুখ না করাই কেক মুখ তো করাতেই পারি ছেলেটাকে ।
নওশাদ তাকিয়ে দেখে নিশালের চোখে মুখে আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে। ওর ভাইয়েরাও তাদের ফ্যামিলি নিয়ে এসেছে নিশালকে কনগ্রাচুলেট করতে।
সুমনার কাছে এসে নওশাদ বলল, থ্যাংকস সুমনা আমার ছেলেটা খুব মন খারাপ করে ছিল তোমরা এসে ওর মন ভালো করে দিলে। আমার সামনে নরমাল দেখাচ্ছিল নিজেকে কিন্তু আমি তো জানি ওর ভেতরে কত কষ্ট হচ্ছিল।
নওশাদ থ্যাংকস আমাকে না হেরাকে দিও , ও আমাকে ফোন দিয়ে বলল নিশালের জন্য একটা কেক নিয়ে যেন আসি আমরা । ওর খুব মন খারাপ।
নওশাদ দূর থেকে হেরাকে কৃতজ্ঞ চোখে তাকিয়ে দেখছে । হেরা নিশালের মুখে কেক তুলে দিচ্ছে। নওশাদের মনে হচ্ছে গীতি থাকলেও আজ হয়তো এভাবেই ছেলের মুখে মিষ্টি তুলে দিতো। নওশাদের বারবার মনে হচ্ছে ,ভেতরে ভালোবাসার অনুভূতি টুকু ধারন করতে পারলেই সম্পর্কের নাম যাই হোক একটা ভালোবাসার বন্ধনে বাঁধা পড়বেই।
হেরা ভেবেছিল অনেকদিন গ্যাপ ছিল তার পড়াশোনার তাই হয়তো সে খুব একটা ভালো করতে পারবে না । কিন্তু প্রথম সেমিস্টার টা কোন রকম রেজাল্ট করলেও দ্বিতীয় সেমিস্টারে সে আশানুরূপ ভালো রেজাল্ট করলো। আজ রেজাল্ট দেখে ওর এত খুশি লাগছে তার ইচ্ছে করছে নওশাদের কাছে দৌড়ে এসে খবর টা দিতে । কিন্তু উনি অফিসের কাজে চায়না গেছেন। এবার যাওয়ার সময় হেরাকেও নিয়ে যেতে চেয়েছিল কিন্তু নিশালের পেরেন্টস মিটিং ছিল তাই ইচ্ছে করে হেরা যায়নি। হেরা কখনো নিশালের পেরেন্টস মিটিং গুলো মিস করতে চায় না। নওশাদও যায় সঙ্গে। অনেক দিন পর নওশাদ এবার থাকতে পারেনি। খুব ইচ্ছে ছিল তার কিন্তু কোনভাবেই চায়না ট্রীপটা পোস্টপন করা গেল না।
গত এক বছরে নওশাদ বিজনেস এর কাজে দেশের বাহিরে যেখানে যায় হেরাকে সঙ্গে নিয়ে যায়। হেরার ও খুব ভালো লাগে নওশাদের সঙ্গে নতুন নতুন দেশে ঘুরতে। অফিসের কাজে যে সময়টা নওশাদ ব্যস্ত থাকে সেই সময়টুকু হেরা হোটেলেই কাটায় বাকি সময়টা দুজন ঘুরে বেড়ায়। নওশাদ যদি কোন কারণে হেরাকে না নিয়ে যায়, নিশাল খুব রাগ করে পাপার উপর। তার খুব ভয় করে বীথি খালামনি কে নিয়ে।
ইদানিং খালামনির হাবভাব সে বুঝতে পারে না। নিশাল যে তার কাছ থেকে দূরত্ব তৈরি করে নিয়েছে সেটা দেখে মনে হচ্ছে খুব সহজে মেনে নিয়েছে কিছু বলছে না। তাই আরো বেশি ভয় হচ্ছে নিশালের।
গত ছুটিতে নিশাল বীথির বাসায় একদিন সারাদিন ছিল। বীথি তাকে একবারও কেন ছুটির সময়টা বেশি বেশি ওর কাছে কাটাচ্ছে না এসব কিছু বলেনি। খুব নরমাল ব্যবহার করেছে।
নিশালই আগ বাড়িয়ে বলল, বুঝলে খালামনি কলেজে উঠে দেখি অনেক পড়া। পড়তে পড়তে আমার জীবন শেষ।
বীথি হেসে বলল তাই বুঝি ?
কি বলবো এই যে বাসায় এসেছি কোন ছুটি আছে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজি, ম্যাথ টিচারদের কাছে পড়তে পড়তে দিন পার হচ্ছে।
ভালো রেজাল্ট করতে হলে পড়াশোনা তো করতেই হবে নিশু।
সেটাই।
হেরার রেজাল্ট দেখে এলিন, নাহিন খুব খুশি হলো।
বৌমনি ট্রীট দাও । দুইবোনের সঙ্গে ওদের বন্ধুরাও হেরার পিছনে লেগে গেল। চলো আজই খাওয়াবে।
হেরা অবাক হয়ে বলল, আজ !
কোন সমস্যা বৌমনি , এলিন প্রশ্ন করলো?
না কোন সমস্যা নেই।
মাহাদি কাছে এসে বলল, তোমাকে খাওয়াব , না আমাদের খাওয়াবে কোনটা বলো যা হবে আজই।
হেরার এই ছেলের এই অধিকার বোধ নিয়ে কথা বলাটা ভালো লাগে না।
আমিই খাওয়াবো সমস্যা নেই চলো তোমরা কোথায় খাবে।
সবাই মিলে হৈচৈ করতে করতে রেস্টুরেন্টে চলে গেল।
মাহাদি হেরার কাছে এসে বলল, তুমি বড়লোকের বৌ তাই দামী রেস্টুরেন্টেই নিয়ে এলাম সমস্যা নেই তো ?
না সমস্যা নেই । তুমি মনে রেখো কথাটা আমি কারো বৌ তাহলেই হবে মাহাদি ।
ও মাই গড লজ্জাবতী ফুল দেখি কথা জানে ? মাহাদি হেসে বলল।
মাহাদি লজ্জাবতী ফুল দেখেছো ওর গায়ের কাঁটা গুলো দেখোনি ? প্রয়োজনে ও কিন্তু কাঁটা ফুটিয়েও দিতে পারে হেরা হেসে বলল।
আমি ভয় পাচ্ছি হেরা।
কিছুটা ভয় থাকা ভালো মাহাদি। এলিন বলে উঠলো হয়েছে হয়েছে আর তর্ক করতে হবে না। এখন খাবারের মনোযোগ দাও তোমরা।
হেরা এখন আর মাহাদি কিংবা কারো কথাই গুটিয়ে যায় না। সম্ভব হলে কিছু উত্তর দিয়ে দেয় সে।
নাহিন এগিয়ে এসে বলল, কোল্ড ড্রিংকস তো কোকই খাবে তুমি বৌমনি। ঠান্ডা কোক খাও মেজাজ ঠান্ডা হবে।
মেজাজ ঠান্ডা আছে আমার আমি কোন কোল্ড ড্রিঙ্কস খাব না কয়েকদিন থেকে কোল্ড ড্রিঙ্কস, পানি খেতে অসহ্য লাগছে। মনে হয় গলা দিয়ে নামছে না। পানি দেখলেই রাগ লাগছে। তোমার বন্ধু মাহাদিকে দাও ঠান্ডা কোক ওর মাথা হয়তো গরম হয়ে গেছে।
ও কঠিন চীজ তোমার এসব কথায় ওর কিছু হবে না। নাহিন হাসছে।
তুমি লেমোনেড নাও অন্তত , নাহিন হেরার দিকে গ্লাস এগিয়ে দিলো।
এগুলো আরো অসহ্য লাগছে খেতে।
আমার মনে হয় বৌমনি তোমার ঠান্ডায় টনসিল ফুলেছে তাই পানি গিলতেও অসহ্য লাগছে।
হতে পারে।
কি জানি ভাইয়া দেশে নেই সেই বিরহে তুমি আবার অসুস্থ হয়ে গেছো হয়তো। বলেই নাহিন হেসে দিলো ওর সঙ্গে বাকি সবাইও হাসছে । শুধু মাহাদি ছাড়া।
( চলবে)