#তার_শহরের_মায়া ২
#পার্ট_৬
#Writer_Liza_moni
গায়ে হলুদের রাতের মতো এখন আর বাড়িতে মানুষের ভীড় নেই।বড় খালামনি আজ সকালেই চলে গেছেন।বাড়িতে তার কাজ আছে।
অনু বিছানার মাঝে গালে হাত দিয়ে মন খারাপ করে বসে আছে। আগামী কাল আবার ঢাকা চলে যেতে হবে।সবাই কে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না তার।আজ আবার তনু কে ও বিদায় দেওয়া হবে।বউ ভাতের আয়োজন করা হয়নি।এত ভেজালের মধ্যে। আরাফাতের মা আগে থেকেই তনু কে পছন্দ করতেন।তাই এই বিয়েতে তার কোনো অসম্মতি প্রকাশ করেন নি।হাসি মুখে তনুকে ছেলের বউ হিসাবে মেনে নিয়েছেন।
কলাপাতা রঙের একটা শাড়ি পড়ে সারা বাড়িতে ঘুর ঘুর করছে তনু।মন খারাপ লাগছে খুব।আজ এই বাড়ি থেকে চলে যাবে। ছোট থেকেই এই বাড়িতে বেড়ে উঠা।এই বাড়ির আনাচে কানাচে কতো সুন্দর সুন্দর মুহূর্তের স্মৃতি জড়িয়ে আছে।
ভাবতেই মনটা আরো বেশি খারাপ হয়ে গেল।
এই দিকে আরাফাতের আব্বু আম্মু তাড়া দিচ্ছে বাড়ি যাওয়ার জন্য। তাদের বড় মেয়ে আরিয়া তার হাসবেন্ড নিয়ে চিটাগাং আসবে।রওনা দিয়ে দিয়েছে কিছুক্ষণ আগেই।আর খাগড়াছড়ি থেকে চিটাগাং যেতে ও অনেক সময়ের প্রয়োজন।
প্রায় সকাল নয়টার দিকে তনুকে বিদায় দিয়ে আহাজারি করছেন তনুর মা।বড় মেয়েটাকে ছাড়া বাড়িটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।
আগামীকাল তো অনু ও চলে যাবে। তখন বাড়িটা আরো বেশি খালি খালি লাগবে।
.
.
বেলকনির গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে অনু। ভেজা চুল থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে।আলসেমি করে গোসলের পর চুল না মুছে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে।ভাল্লাগছে না তার।তনু কে খুব মিস করছে।
মনের মাঝে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সেই তনুর বিয়ের দিন থেকে।সেটা হলো,,
তনু কী করে জানলো মাহির আর তার রিলেশনের
কথা?অনু কখনো বলেনি এই বিষয়ে তনু কে।
এই অনু কয়টা বাজে দেখেছিস? দুপুরের খাবার কী রাতে খাবি?এখনো খাবার খেতে আসলি না কেন?
আসছি আম্মু।
ডাইনিং টেবিলে বসে আছেন অনুর আব্বু, ছোট খালামনি, ছোট ফুফু, তানিশা, মনিষা, আর ছোট্ট পরি। ছোট খালামনির মেয়ে এই পরি।
অনু কে দেখেই হাসলো পরি।অনু চেয়ার টেনে বসলো বাবার পাশে।
বাবা এক পলক অনুর মুখের দিকে তাকিয়ে ভাত মাখতে মাখতে বললো,,
তুমি ও তো চলে যাবা আগামীকাল সকালে।
অনু প্লেটে ভাত নিতে নিতে ছোট্ট করে বললো হুম।
আমি রাতে তোমার জন্য টিকেট কেটে রাখবো। সকাল ৭টায় বাস স্ট্যান্ডে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে থেকো।
আচ্ছা আব্বু।
পড়ালেখা হচ্ছে তো ঢাকায়?নাকি অন্য কিছু তে মেতে আছো? তুমি আমার ছোট মেয়ে। তোমাকে আর তনু কে দুই জনকেই সমান ভালোবাসি আমি। তুমি ঢাকায় থেকে পড়ছো তাতে আমার সমস্যা নাই। কিন্তু সব সময় একটা কথা মাথায় রাখবা।এই সমাজে আমার একটা সম্মান আছে।সেটা যেনো নষ্ট না হয়। আমি যেনো সবাইকে গর্ব করে বলতে পারি,,
আমার দুই মেয়ে হিরের টুকরো।এরা আমার বেস্ট সন্তান।
বাবার বলা কথা গুলো গিলছে অনু। চুপ করে কথা গুলো গিলা ছাড়া এখন আর তার কোনো কাজ নেই।
.
.
বিকেলের দিকে ছোট খালামনি ও চলে যান অনুর নানু বাড়িতে। তানিশা, মনিষা আর ছোট ফুফুকে যেতে দেয়নি অনু।
তারা চলে গেলে বাড়ি একদম খালি হয়ে যাবে।
অনু চলে গেলে তারাও চলে যাবে।
সন্ধ্যা ৭টার দিকে অনুর রুমের বিছানায় বসে আড্ডা দিচ্ছে তানিশা, মনিষা আর অনু।
তাদের আড্ডার টপিক হলো,,মনিষার বয় ফ্রেন্ড।
তানিশা আর অনু মিলে মনিষার প্রেমের গল্পই শুনছে।আর মাঝে মাঝে খিল খিল করে হেসে উঠছে।
তোদেরই কপাল বোন। ইন্টারে পড়ে ও প্রেম করিস।আর আমি অর্নাস তৃতীয় বর্ষে পড়ে ও এখনো সিঙ্গেল রয়ে গেলাম।
তুই ও কিন্তু ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে থাকতে মাহির ভাইয়ার সাথে প্রেম করতি হুঁ।
অনু মুচকি হেসে তানিশার পিঠে একটা কিল মেরে বললো,,
হুসসস মাইয়া।ওটাকে প্রেম বলে নাকি? আবেগ,সবই আবেগ। আবেগের বসে মানুষ কিনা করে?
সত্যি বলতে মাহির ভাইয়ার প্রতি এখন আর আমার তেমন কোনো অনুভূতি কাজ করে না। এই বার ঢাকা থেকে এসে উনাকে দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে আমি কান্না ও করে ফেলে ছিলাম।আর এখন বর্তমানে সেই সব কিছু মনে পড়লে আমার এমন হাসি পায় কী বলবো। এত্ত টা বোকা ছিলাম আমি?
বলেই হাসতে লাগলো অনু।
.
.
মাহিরের সাথে তার মা ছাড়া আর কেউ তেমন কথা বলছে না।এই দিকটা খুব খারাপ লাগছে তার নিজের কাছেই।সবাই তাকে হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে সে ভুল করেছে। অনেক বড় ভুল করেছে।
নিজের রুমের বিছানায় কপালে হাত রেখে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে মাহির।রাত প্রায় ১১টার কাছাকাছি।রাতে না খেয়েই শুয়ে পড়েছে।
তনুর কথা খুব করে মনে পড়ছে। কিন্তু তনু তার দিকে ফিরে ও চাইবে না।তা সে খুব ভালো করেই জানে।আর তার চেয়ে ও বড় কথা হলো,,তনু এখন অন্য কারো বিয়ে করা বউ।এক রাশ বিষন্নতা নিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করতে লাগলো সে।
.
.
মোবাইলের ভাইব্রেশনের কারনে পুরো বিছানা কেঁপে উঠায় অনু দরফরিয়ে শোয়া থেকে উঠে বসে চিল্লাতে লাগলো,,
আম্মু, ভূমিকম্প হচ্ছে,,
হঠাৎ চুপ করে,
চোখ কচলে মোবাইল হাতে নিয়ে দেখলো সিম কোম্পানি থেকে কল করেছে। মেজাজ চটে গেছে তার।এত শান্তির ঘুম টা এত সকালে নষ্ট করে দেওয়ার কোনো মানে হয়?
এই সিম কোম্পানির মালিকরে পাইলে এক বালতি পানিতে চুবিয়ে মারবো। অসহ্য যন্ত্রণা।যখন তখন কল করবে।
মোবাইল রেখে আবার ও ঘুমানোর জন্য বালিশে মাথা রাখতেই এলার্ম বেজে উঠলো।
অগত্যা অনু বিরক্ত হয়ে ঘুমের চিন্তা বাদ দিয়ে ওয়াস রুমের দিকে চললো ফ্রেশ হতে।
ফ্রেশ হয়ে এসে মোবাইলে টাইম দেখে নিলো। সকাল ছয়টা ১২ বাজছে।
জলদি তৈরি হয়ে নাস্তা করে বাস স্ট্যান্ডে যেতে হবে।
এক পাহাড় মন খারাপ এসে ভীড় করলো তার মনে।এত দিন এখানে থাকার ফলে এখন আর যেতে ইচ্ছে করছে না ঢাকায়।
.
.
বাবা বাসে বসিয়ে দিয়ে নেমে গেলেন বাস থেকে।বাস ছেড়ে দিলে অনু জানালা দিয়ে মাথা বের করে বাবাকে বিদায় জানালো।
আবারো একা একা এত বড় শহরে তাকে থাকতে হবে।
তবে নিজের জেদের জন্যই সেখানে একা থাকতে হবে তাকে।
বাস চলছে নিজের গতিতে।অনু চোখ বন্ধ করে বাসের সিটে হেলান দিয়ে বসে আছে। মাথা ব্যথা করছে হঠাৎ করেই।
.
.
সাড়ে ১২টার দিকে বাস এসে থামে বনানীতে।অনু সুইট কেস নিয়ে বাস থেকে নেমে আসে। অসহ্য মাথা ব্যথা করছে।ম্যাসে যেতে এখান থেকে ২০ মিনিট লাগবে।
একটা সিএনজিতে উঠে বসলো অনু। পেসেঞ্জার চার জন না হলে সিএনজি চালাবেন না বলে দিলো সিএনজি চালক।
অনুর বিরক্তির মাত্রা বেড়ে গেলো আরো কয়েক ধাপ।
কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে লম্বা চওড়া সুন্দর একটা চাপ দাঁড়ি ওয়ালা সুদর্শন এসে সিএনজি চালক কে জিজ্ঞেস করলেন,,
মামা যাবেন?
হ যামু।
ছেলে টা সিএনজির ভেতরে ঢুকতে গিয়ে দেখলো একটা মেয়ে সেখানের এক পাশে বসে আছে। ছেলে টা কিছু না বলে ডোন্ট কেয়ার ভাব করে অনুর পাশে গিয়ে বসলো।
আরো দুজন পেসেঞ্জার চলে আসায় সিএনজি স্টার্ট দিল সিএনজি চালক।
ছেলেটা গুন গুন করে গান গাইতে থাকে।
এক মুরুব্বি বলে উঠলো,,
গুন গুন করে না গেয়ে একটু জোরে গাও আমরা ও শুনি।
ছেলেটা মুচকি হেসে গাইতে লাগলো,,
চলে যাই দুচোখের পথে,,
বলে যাই কথা তোরি যে,,
মন আমার ভবঘুরে,যাবে দূরে তোকে না পেলে।
কেন তুই দূরে দূরে বল
আকাশে উড়ে উড়ে চল
মিশে যাই এই আকাশে
তোর বাতাসে
পাখনা মেলে।
দিন শুরু তোর কথায়
তুই ছাড়া নামে না রাত
চাঁদ থেকে।
আকাশের বৃষ্টি তোর
বৃষ্টি তোর
মনে মেঘ জমে।
জানালার হাওয়াতে চাওয়াতে
মনের রোদ কমে।
ছেলেটার গাওয়া এইটুকু গান শুনে মন ছুঁয়ে যায় অনু্র।
বাহ বাহ তুমি তো খুব সুন্দর গান গাও।
ধন্যবাদ আঙ্কেল।
মুচকি হেসে বললো ছেলেটা।
তা বাবা তোমার নাম কী?
তূর্য,,,,
তাওহীদ তূর্য।
চলবে,,,, 🍁
(আসসালামুয়ালাইকুম 💜
ভুল ক্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)