তুই আমার কাব্য পর্ব-০৮

0
2331

#তুই_আমার_কাব্য 🍂
#Writer: Anha Ahmed
#Part: 08
.
🍁
.

– আবির ভাইয়া?

দরজার সামনে আবিরকে দেখে মেঘলা থ মেরে দাঁড়িয়ে আছে। আবার কেমন জানি ভয় ভয় লাগছে। উনি কেনো এখানে? কেনো ওদের বাসায় আসলো? বাসা চিনলো কি করে? তাহলে কি আবির ওকে ফলো করছিলো? এসব ভাবতে ভাবতেই আবির মেঘলার মুখের সামনে তুরি বাজিয়ে বলে,

– কি ব্যপার? হা করে তাকিয়ে কি দেখছো? ভেতরে কি আসতে বলবে না? এখানেই দাঁড় করিয়ে রাখবে? মেহমানদের বুঝি এইভাবে দরজায় দাঁড়িয়ে রাখ?

– আআ না মানে আপনি?

– হ্যা আমি। কেনো আসতে পারি না?

– হ্যা হ্যা নিশ্চিয় পারেন। তবে আপনি আমার বাসা চিনলেন কি করে? ( ভ্রু কুচকে)

কলিং বেলের শব্দ পেয়ে মেঘলার মা এগিয়ে গিয়ে দেখে মেঘলা ঠায় দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে আবির দরজার বাহিরে। আবিরকে দেখে মেঘলার মা হাসি দিয়ে বলে ওঠলো,

– আরে আবির যে! তুমি বাহিরে কেনো বাবা? আসো আসো ভেতরে আসো। আয় মেঘলা তুই দাঁড়িয়ে আছিস কেনো ওভাবে? আর ছেলেটাকেও বাহিরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিস। ভেতরে আসতে দে। আদব কায়দা ভুলে গেছিস নাকি সব? সর

মেঘলা ওর মায়ের কথা শুনে আরো অবাক। ওভাবেই দাঁড়িয়ে থেকে জিজ্ঞাসা করে,

– মা তুমি চেনো ওনাকে?

– তো চিনবো না? আমার বান্ধবীর ছেলে আর আমি চিনবো না। সর এবার।

– বান্ধবী? ম মানে খালামনির ছেলে আপনি?

আবিরের দিকে তাকিয়ে কথাটা বললো। মেঘলার রিয়েকশন দেখে আবিরের পেট ফেটে হাসি পাচ্ছে। কিন্তু আপাতত তা দমিয়ে রেখে মুচকি হেসে ভেতরে এলো। মেঘলা দরজাটা বন্ধ করে বসার ঘরে গিয়ে যায়। আবিরের মা মেঘলাকে ডেকে পাশে বসিয়ে বলে,

– সারপ্রাইজ কেমন লাগলো?

– সত্যিই বিশাল সারপ্রাইজ ছিলো এইটা খালামনি।

– হুম তো পছন্দ হয়েছে বরকে?

মেঘলা আবিরের দিকে আরেকবার আবিরের মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,

– বর মানে?

– ওমা! বর মানে তোর বর।

– ওনি আমার বর হতে যাবেন কেনো?

– ওমা! আমাকে শ্বাশুড়ি বানাতে হলে আমার ছেলেকে বিয়ে করতে হবে না তোর?

মেঘলা অসহায় দৃষ্টি নিয়ে আবিরের দিকে তাকায়। আবির মিটমিট করে হাসছে। ওকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে ও এসবকিছু আগের থেকেই জানে। আর মেঘলাকেও এই সূত্রেই দেখেছে। আর তাই তো ওর বিহেভিয়ার অন্যরকম ছিলো। মেঘলা যেনো নিজের কথায় নিজেই ফেসে গেলো। ভাবতেই মেঘলার মুখ কাঁদো কাঁদো হয়ে এলো। মেঘলার এরকম চেহারা দেখে আবিরের মা আর মেঘলার মা দুজনেই হেঁসে দিলো।

সবাই বসে আছে একসাথে। আবিরের মা, মেঘলা, মোহনা, আর মেঘলার মা চারজনে বসে গল্প করছে। আর আবির একপাশে বসে ফোন ঘাটছে আর মাঝে মাঝে আড় চোখে মেঘলাকে দেখছে। আজ মেঘলাদের বাসায় আবিরদের দাওয়াত। তাই ওরা রাত পর্যন্ত থাকবে। আবিরের বাবা ও ভাই বিজনেস নিয়ে প্রচুর ব্যস্ত তাই রাতে আসবে সবাই।

রাতের খাবার টেবিলে। জমজমাট আড্ডা। সবার মনে যেনো ছোট খাটো ঈদ। সবাই খাচ্ছে আর হাসাহাসি করছে। এতো হাসির মাঝেও একজন মুখে একদম কুলো মেরে আছে। কেমন যেনো বিষয়টা হজম হচ্ছে না মেঘলার। আর মেঘলার এমন অবস্থা দেখে আবির মজা নিচ্ছে।আবিরের মা খেতে খেতে হঠাৎই বলে ওঠলো,

– রেনু, মেহেরের কি খবর রে? ও কি বাসায় আসে না? ঝামেলা মিটে নি?

এমন আনন্দঘন পরিবেশ মহূর্তেই থমথমে হয়ে গেলো আবিরের মায়ের এক কথায়। মেঘলার মায়ের অথাৎ রেনুর চোখ ছলছলিয়ে উঠলো। মেঘলা মেহেরের নাম শুনতেই চোখ বড় বড় করে একবার আবিরের মায়ের দিকে পরে নিজের বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। মেঘলার মা ও মেঘলার বাবার দিকে আছে। মেঘলার বাবা চোয়াল শক্ত করে গম্ভীর মুখে বসে আছে। আবিরের মা বুঝতে পারলো এখনো কোনো কিছু নরমাল হয় নি এবং এখানে এমন সময় এই কথা বলা তার ঠিক হয় নি। মেঘলার বাবা নিজের রাগ সংযত করে নরম কন্ঠে বললো,

– এ বাসায় মেহের নাম উচ্চারণ করা হয় না। মেহের নামের কাউকে চিনি না কেউ ছিলো বলেও মনে করি না। তুমি ভুল করে ফেলেছো। ইট’স ওকে। এরপর থেকে আর এমন ভুল করো না।

আবিরের মাকে উদ্দেশ্য করে কথাটা বলে পানি খেয়ে ওঠে চলে গেলো। সবাই চুপচাপ মাথা নিচু করে খাবার সামনে বসে রইলো। কিছুক্ষণপর আবিরদের বিদায় দিয়ে মেঘলা ঘুমিয়ে পড়লো।
.

খুব আওয়াজে মেঘলার কান ফেটে যাচ্ছে। একে তো মানুষের চিল্লাচিল্লি আর তারমধ্যে বক্সে গান বাজাচ্ছে। বিরক্ত হয়ে ঘুম থেকে ওঠে বসলো মেঘলা। চোখে মুখে ঘুম আর চরম বিরক্তির প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট। এই সাত সকালে গরুর বিবেক নিয়ে কে বসে আসে দেখার জন্য বিছানা থেকে গুটি গুটি করে হেটে বের হলো রুম থেকে। রুমের দরজা খুলেই দেখে বাড়ি ভর্তি মানুষ মাছির মতো ভনভন করছে। এতো মানুষ? হঠাৎ এতো মানুষ কি করে? কই থেকে? কোনো উৎসব নাকি ভাবতে লাগলো মেঘলা। নাহ্! কোনো উৎসব বলে বলে হচ্ছে না মেঘলার। আর যদি হয়েও থাকে তাহলে মানুষগুলোর কি কাজ নাই যে এতো সকালে অন্যের বাড়িতে। মনে তো হচ্ছে সকালে ব্রাশ না করেই এসে হাজির। আশ্চর্য! ঘুমুঘুমু চোখে ঢুলুঢুলু করে মাকে খোঁজে চলছে মেঘলা। কার্পেটের সাথে বেজে ধপাৎ করে পড়ে গেলো। বেশ ব্যথা পেলো। সকাল সকালই মেজাজ খারাপ করার জন্য এটাই যথেষ্ট ছিলো। সেদিকে খেয়াল না করে আশে পাশে তাকিয়ে দেখতে লাগলো কেউ দেখেছে কিনা। নাহ্! কেউ দেখেনি। বিরক্তিকর মুখোভাব নিয়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যেতেই মাকে খুঁজে পেলো।
মেঘলার মা প্রচুর ব্যস্ত। মেঘলাকে দেখেই তড়িঘড়ি করে বলে,

– আরে মেঘলা তুই এখানে কি করছিস? এখানে গরম প্রচুর যা যা এখান থেকে। আর এতো সকালে ওঠেছিস কেনো? আচ্ছা যাই হোক ওঠেছিস যখন তখন যাহ্ ফ্রেস হয়ে রেডি হওয়া শুরু কর ধীরে ধীরে। পরে তো তাড়াহুড়ো করে রেডি হতে হয় না হলে বর পক্ষ বসে থাকে। এর থেকে ভালো এখন থেকেই শুরু কর।

কাজ করতে করতে কথাগুলো বলে গেলো। বলেই অন্যদিকে যাচ্ছে তখনই আবার এসে বলে,

– শোন পার্লারের লোক আসবে না আর তোকেও যেতে হবে না। নিজে যা পারিস সিম্পলভাবে সাজবি। ওতো সাদা ভুত হওয়ার দরকার নেই। চেহারায় বুজা যায় না। হালকা ভাবে সাজবি। শাড়ি আমি এসে পড়িয়ে দেবো। সাজগুজ হলে ডাক দিস কেমন?

কথাগুলো বলেই হনহন করেই চলে গেলো। আর এদিকে মেঘলা আগাগোড়া কিছু না বুজে ড্যাব ড্যাব করে মায়ের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। ওর মায়ের সব কথা মাথার সারে পাঁচ ইঞ্চি উপর দিয়ে চলে গেছে। মোহনার মা আবার এসে ওকে ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ধমকে ওঠে,

– ওই তোকে কি বললাম কানে শুনলি না। ঠায় দাড়িয়ে কি দেখোস? ইস্! এমনিতেই আমি কাজে চোখে দেখছি না আর তুই দাড়ায়ে আছোস।

মেঘলা ওর মায়ের কাজ দেখে যেনো মাথা ভন ভন করছে। কিছু বুঝতে না পেরে প্রশ্ন করে,

– কি বলতেছো কিছুই বুঝতাছি না আম্মু আমি। কিসের সাজগুজ? কিসের বরপক্ষ? আর এতো মানুষইবা কেনো? একটু বসো তুমি রিলাক্সে আর আমাকেও একটু বুঝায়ে বলো?

– হ্যা! আমার বসার সময় আছে নাকি যে বসবো? রাজ্যের কাজ পড়ে আছে আমার সেগুলা কি তুই করে দিবি? আর এতো প্রশ্ন করা তো তোর কাজ না। যেইটা করতে বলছি সেইটা কর। দাড়ায়ে আছো তাও! তোরে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। দাড়া আমি মোহনাকে ডাকি। মোহনা! এই মোহনা! কোথায় গেলি রে?

– আম্মু শোনো না আগে আমার কথা। আগে তো বলো হচ্ছে টা কি?

– মেঘলা তুই আর একটা কথা বললে আমি খুন্তি নিয়ে আসবো।

-ধুর ভাললাগে না।

মেঘলা আর কথা বাড়ায়ে রাগে গটগট করতে করতে চলে যায় ওপড়ে। গিয়ে ফ্রেস হয়ে আয়নার সামনে বসে। বসতে বসতেই দেখে রেডি হয়ে গেছে। সে বেশ অবাক হয়ে যায়। এতো তাড়াতাড়ি রেডি? কি করে সম্ভব? মিষ্টি রঙের একটা শাড়ি পড়ে খোপা করে বেলি ফুল গাথা। এরি মধ্যে দেখে বিকেল হয়ে গেছে। ও নিচেও চলে গেছে। সবকিছু যেনো স্বপ্নের মতো উল্টাপাল্টা লাগতেছে। একদল মানুষও কই থেকে যেনো এলো। সব অচেনা মুখ। একজন মধ্য বয়স্ক লোক এসে ওর কাছ থেকে কি সব আম পাতা জোড়া জোড়া বসে সাইন করিয়ে নিলো। তারপর একজন হুজুর এসে যখন বলে কবুল বলতে তখন মেঘলার বোধ হয় তার বিয়ে। সে মাথা তুলে বলে ওঠে,

– না, কবুল না।

তবুও তাকে আবার কবুল বলতে বলা হলো। মেঘলা এবার ধুপ হয়ে ওঠে দাঁড়ালো। তবে আশ্চর্য হলো কেউ ওর দিকে না তাকিয়ে যার যার মতো আছে। মেঘলা দাঁড়িয়ে কোমরে দুই হাত দিয়ে বলে,

– কবুল বলবো না। বিয়ে করবো না।

তখন হুজুর বলে ওঠে,

– কেনো মা?

– কেনো করবো? আমার বর কে? আমার বর কে রা জেনে না দেখে বিয়ে করবো কেনো? পরে যদি বর পছন্দ না হয়? বরের যদি চোখ টেরা থাকে? সে যদি ল্যাংরা থাকে তখন? আমি আগে বর দেখবো।

– না মা। তুমি এখন বর দেখতে পারবে না। বিয়ের পর বর দেখার নিয়ম।

– মানি না। আমি বর দেখবোই। আপনারা ডাকবেন না তো। ঠিক আছে আমার বর আমিই দেখবো। বর ও বর ও বর গোওওও। কোথায় গো? সামনে আসো দেখি তোমায়। ওই বর ব্যাটা।

মেঘলার এমন ডাকে হঠাৎ একটা ছেলে এসে সামনে দাঁড়ালো। মেঘলা পা থেকে দেখতে দেখতে মুখের দিকে তাকাতেই চোখ একবার বন্ধ করে আবার তাকালো অবাক হয়ে। পাশে থেকে একজন বলে ওঠলো,

– দেখেছিস বর কে? দেখে নে ভালো করে বর একদম ফিট। কানা টেরা কিছুই না।

মেঘলা তাকিয়ে দেখে আবিরের মা। আবিরের মা মেঘলার কাছে গিয়ে জড়িয়ে বলে,

– তুই খুশি তো এবার? দ্যাখ তোর আর আমার দুজনেরই মনের আশা পূরণ হলো। আমি তোর শাশুড়ি হয়ে গেলাম আর তুই আমার আবিরের বউ।

মেঘলা এখনো স্ট্যচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ করেই অজ্ঞান হয়ে ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেলো মেঘলা। ওর এইভাবে পগে যাওয়া দেখে সবাই হেসে ওঠলো।

চলবে……. 💜