#তুই_আমার_কাব্য 🍂
#Writer: Anha Ahmed
#Part: 09
.
🍁
.
মেঘলার ওভাবে পড়ে যেতে দেখে সবাই হেসে ওঠে। আবির মেঘলার কাছে গিয়ে মেঘলাকে ঝাঁকিয়ে ডাক দিতে থাকে। তখনই মেঘলাও ধরফরিয়ে ওঠে। ওঠে দেখে মোহনা ডাকছে ওকে। মেঘলার ওভাবে ধরফরিয়ে ওঠা দেখে মোহনাও কিছুটা চমকিয়ে ওঠে। মোহনা মেঘলার কাছে গিয়ে কাঁধে হাত রেখে বলে,
– কি হলো আপি? ওভাবে ওঠলি যে? আমি তো তোকে ভালোমতোই ডাক দিয়েছি। তুই ঠিক আছিস তো?
মেঘলা আশেপাশে ভালো করে তাকিয়ে দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ভাবতে থাকে,
– ওফ্! যাক বাবা স্বপ্ন ছিলো। কি আজব স্বপ্ন রে বাবা। অবশ্য স্বপ্নেই এরকম ওল্টা পাল্টা কাজ সম্ভব। সব যেনো মাথার ওপর দিয়ে গিয়েছিলো। এক মুহূর্তের জন্য তো স্বপ্নতেই নিজেকে বাস্তবে মনে হচ্ছেছিলো। ভাবা যায় এগুলা?
মেঘলা কথা গুলো ভাবতে ভাবতেই মোহনার ডাকে আবার সজ্ঞানে আসে,
– ওই আপি! আবার কি ভাবছিস?
– নাহ্ কিছু না।
মেঘলা আনমনা হয়ে কথাটা বলে ওঠতে যাবে তখন আবার বসে ভাবতে শুরু করলো,
– আচ্ছা! স্বপ্নটা যদি সত্যি হয় তখন কি হবে? সত্যি সত্যি যদি আবির ভাইয়ার সাথে বিয়ে দেয় আমাকে? খালামনিকে যে শ্বাশুড়ি বানাবো দুষ্টুমি করে বলেছিলাম ওইটা যদি সিরিয়াসলি নিয়ে বিয়ে দিয়ে দেয়? দুর ছাই! ভালো লাগে না। আগে যদি জানতাম তবে কথা ফিরিয়ে আনতাম, এ জ্বালা আর মাথায় সয় না।
মেঘলা কথাগুলো ভাবতে ভাবতে মুখোভাব বিষন্ন আর কাঁদো কাঁদো করে ফেলে। মেঘলার ওরকম ফেস এক্সপ্রেশন দেখে মোহনা এবার মেঘলাকে এক হাত দিয়ে ধাক্কা দেয়। মেঘলা মোহনার ধাক্কায় ভাবনা বন্ধ করলেও রাগ দেখানো অন করে দেয়। মেঘলা দাঁড়িয়ে গিয়ে মোহনার সামনে দাঁড়ায়ে ধমকিয়ে ওঠে,
– ওই কিচ্ছে তোর? এভাবে ধাক্কা দিচ্ছিস কেনো?
– তো কি করবো? কখন থেকে ডাকছি। উত্তরই নিস না। দেখছিস কয়টা বাজে? আম্মু তার অস্ত্র যখন আনবে তখন বুঝবা কেমন লাগবে। এতো বেরা করে ঘুমানো তোর লাটে ওঠাবে।
মেঘলা আবারো বিছানায় গিয়ে ধপাস করে শুয়ে কোলবালিসটা দু হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে পাশ ফিরে কোলবালিশে মুখ গুজে জিজ্ঞাসা করে,
– কয়টা বাজে রে?
– জ্বি মহারানি রাণী এলিজাবেথের ছেলের বউ আপনার অনুগ্রহের জন্য জানানো যাচ্ছে এখন প্রায় বারোটা বাজে।
– ওহ্!…….. কিইইইইইইইইি?? বাআআআআরোটা?
মেঘলা কথাটা শুয়ে ধুম করে ওঠে রিয়েকশন দেওয়ার পর বলে,
– আগে ডাক দিস নি কেনো? ইস্! আমার ক্লাস গেলো আজকে। তোর জন্য আমার ক্লাস মিস হলো। আজকে আর ভার্সিটি যাওয়া হলো না।
কথাটা ভেবে কিছুক্ষণ কষ্ট পেলেও আবার শুয়ে পড়ে বলে,
– মিস যখন গেছেই তখন আরেকটু ঘুমিয়ে নেই।
মোহনা কোমরে দুই হাত রেখে বিরক্ত স্বরে বলে,
– নাহ্! ঘুমানো যাবে না।
– কেনো?
– আজকে বাড়িতে অনেক কাজ। বাড়িতে কয়েকজন মেহমান আসবে।
মেহমানের কথা শুনে মেঘলা আবার ওঠে বসে ব্যস্ত কন্ঠে বলে ওঠে,
– মেহমান! কোন মেহমান? কেনো আসবে? কখন আসবে? আমাদের বাড়িতে কি কাজ?
– আপি তুই এইসব কি জিজ্ঞাসা করছিস? তোর মাথাটা গেছে। মেহমান আবার কেনো আসে? মেহমান তো মেহমানই। আর তারা আব্বুর মেহমান। মেহমান বললে ভুল হয় আসলে তারা কাজের জন্য আসবে কিসের যেনো। তাই পুরো বাড়ি ঘুছাতে হবে। আসমা ( কাজের মেয়ে) আজকে সকালর আসবে না, বিকেলে আসবে ।
-হুহ! ওরও আজকেই ছুটি নিতে হলো। আচ্ছা যা আসতেছি।
এদিকে সারাদিন মেঘলাকে না দেখে এক জোড়া চোখ অস্থির হয়ে আসে। মেঘলা কেনো আজ ভার্সিটি নেই তা খোঁজ নিয়েও জানা গেলো না। আবিরও তনুকে জিজ্ঞাসা করেছে কিন্তু তনুর আজকে দেরি হওয়াতে মেঘলাকে ফোন দিতে টাইম পায় নি। আবির ফ্রেন্ডদের সাথে কথা বলতে বলতে হাঁটছে আর ওদিকে কাব্য খুবই বিচলিত হয়ে ফোনে কথা বলতে বলতে আসে। দুজনের কারোরই খেয়াল না থাকায় ধাক্কা খাওয়ায় কাব্যর ফোনটা পড়ে যায়। কাব্য ফোনটা ওঠিয়ে রেগে আবিরকে বলে,
– চোখ থাকতেও অন্ধ হওয়া ব্যপারটা কোনোদিন যাবে না।
– মাইন্ড ইউর ল্যাঙ্গুয়েজ। অন্ধ কে, কে ছিলো কে আছে তা অধিকাংশই জানে। সো যা নিজে তা অন্যকে বলা বন্ধ কর।
– ওহ্ রিয়েলি! আমি কি তা কে জানে কে না জানে আমি জানি না। তবে হ্যা আমার ম্যাটার অধিকাংশ লোকই জানবে এতোটা সরকারি না যতোটা না তুই।
– তুই কিন্তু ডেলিভারেটটি অপমান করছিস।
– কেউ যেচে অপমানিত হতে আসলে আমি কি করতে পারি?
– ইউউউ….
– কিপ ইউর ভয়েস ডাউন ওকে?
কাব্য ওখান দেখে চলে আসে। আবির পেছনে রাগে ফুঁসতে থাকে। কাব্য ওখান থেকে সোজা ক্যাফেতে বসতেই রাহুল আর অনি কাব্যের জন্য একটা চেয়ার ছেড়ে বসে। কাব্য এসে পায়ে পা দিয়ে বসে ফোন হাতে নেয়। বসতে বসতেই অনি বলে ওঠে,
– আবিরের সাথে আবারো জগড়া করে আসলি? কেনো করিস বল তো? আচ্ছা আবার কি আগের মতো সম্পর্কটা ঠিক করে নেয়া যায় না?
আবির অনির কথায় রেগে ওঠে পা নিচে নামিয়ে টেবিলে বারি দিয়ে বলে,
– হোয়াট? হোয়াট হ্যাভ ইউ সেইড? আগের মতো সম্পর্ক? লিসেন ভেরি কেয়ারফুলি, যে সম্পর্ক ভাঙ্গে তা কখনোই আগের মতো জোড়া লাগানো যায় না। আর ওর সাথে তো প্রশ্নই আসে না। তোদের ইচ্ছা হলে তোরা ফ্রেন্ডশীপ রাখতেই পারিস। আমি তো তোদেরকে কিছু করতে ফোর্স করি নি। তোরা কার সাথে কেমন সম্পর্ক রাখবি তা তোদের ব্যপার আর আমি কার সাথে সম্পর্ক রাখবো না তা সম্পূর্ণ আমার ব্যপার। সো এখানে তোদের ইন্টারফেয়ার না করাই ভালো। ইস দিজ ক্লিয়ার?
কথাগুলো বলে আবার আগের মতো করে বসে। অনি রাহুলের দিকে তাকিয়ে আবার কাব্যের দিকে তাকিয়ে করুণ দৃষ্টি নিয়ে বলে,
– কিন্তু তোরা তো কত্ত ভালো বেষ্টফ্রে…
– স্টপ! ওখানেই থেমে যা। যা ছিলাম তা ছিলাম। এখন আমি আর শুনতে চাই না। এখন কি সেইটাই বড় কথা। এখন আবির আমার প্রতিপক্ষ আর এটাই একটা সম্পর্ক।
আবির রেগে কথাগুলো বলে ওঠে চলে যায়। অনি আর রাহুল একটা নিশ্বাস ফেলে কাব্যের দিকে তাকিয়ে থাকে।
বিকেল। মেঘলা মায়ের সাথে নাস্তা রেডি করছে। রেডি করতে করতেই মেহমানরা চলে আসে। মেঘলার বাবা দ্রুত বের হয়ে মেহমানদের ওয়েলকাম করে,
– হ্যালো মি. আহমেদ। ওয়েলকাম টু মাই হাউজ। আস্তে কোনো অসুবিধা হয় নি?
– নো মি. রহমান। অল ওকে এন্ড পারফেক্ট।
– ইটস গুড টু হেয়ার। সো প্লিজ সিট ডাউন। লেটস স্টার্ট দা মিটিং।
– ইয়াহ্ হোয়াই নট। যা করতে এসেছি তা আগে করে নেওয়াই উত্তম।
মেঘলার বাবা ওনাদের নিয়ে রিডিং রুমে চলে গেলেন। মিটিং শেষে দুজনে হাত মিলিয়ে ডিল কনফার্ম করে ফেলে। এরপর তাদের নিয়ে ড্রয়িং রুমে গিয়ে বসে। আসমা গিয়ে ওদের নাস্তা সার্ভ করে দেয়। তখন মি. আহমেদ বলে,
– সো মি. রহমান, হোয়ার ইজ ইউর ফ্যামিলি?
– বাড়িতেই আসে। ওয়েট।
মেঘলা তখনই কোনো একটা কাজে বেরে হচ্ছিলো। বাবার ডাক শুনে সামনে গিয়ে সবাইকে সালাম দিয়ে বাবার কাছে গেলেন। তখনই মেঘলার বাবা শফিক রহমান পরিচয় করিয়ে দেয়,
– হেয়ার ইজ মাই প্রিন্সেস।
মি. আহমেদ মেঘলাকে ওর নাম জিজ্ঞাসা করে। মেঘলা সুন্দর করে জবাব দেয়,
– শাফাকাত আনজুম মেঘলা
– মাশাল্লাহ! ভারি মিষ্টি নাম। তো মি. আহমেদ আপনার মেয়ে কি একটাই?
মেঘলার বাবার মুখটা মলিন হয়ে গেলো। তবুও জোড় করে হাসি এনে বলে,
– না। আমার দুই মেয়ে। এইটা বড় মেয়ে।
মেঘলারও মুখটা মলিন হয়ে যায়। চোখের কোণে পানি জমে যায়। ওখান থেকে বিদায় নিয়ে মায়ের কাছে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে বলে,
– আম্মু আব্বু কেনো আপুকে এখনো মেনে নিচ্ছে না। যা হবার তা তো হয়েই গেছে। একটাবার খোঁজও নিলে না কেউ। বেঁচে আছে কি মরে গেছে তাও জানা নেই। কেনো এতো রাগ জমিয়ে রেখেছো তোমরা। ভুল করেছে মানলাম তবুও কি ক্ষমা করা যায় না? ফিরিয়ে আনো না আপিকে। আপিকে ছাড়া ভালো লাগে না।
মেঘলার মা চুপ করে চোখের পানি ফেলে শুধু। কারণ মেঘলার কথার জবার তার নিজের কাছেও নেই। মন তো তারও পুরছে। শত হোক নাড়ি কাটা ধন তো তার।
মি. আহমেদ তার কর্মচারিকে নিয়ে গাড়িতে ওঠতেই একটা ফোন আসে। ফোনের ওপাশ থেকে বলে,
– হ্যালো ড্যাড? হোয়াটস আপ?
– ইয়াহ্ মাই সান। ইটস গুড বাট নট সো গুড।
– কি বুঝলে?
– বুঝলাম বেশ কিছুই। খুবই কঠোর মনের ব্যক্তি। সন্তানকে অস্বীকার ক্ষমতা যিনি রাখেন তিনি কেমন কঠোর আশা করি তুমি বুঝতে পারছো।
– মানে?
– মানে সে বলছে তার দুই মেয়ে এবং মেঘলা তার বড় মেয়ে।
– তাহলে কি ড্যড সমস্যার সমাধান কখনোই হবে না? এদিকে তো ওর অবস্থাও খারাপ। যতই খুশি থাকুক কিন্তু এতোটা দিন বাবা মা ছাড়া ও খুবই ভেঙ্গে পড়ছে। আমি ওকে এভাবে দেখতে পারছি না ড্যাড। ইউ নো না হাও মাচ আই লাভ হার?
– আই নো বাট ইউ হ্যাভ টু কিপ পেসেন্ট। আমি ট্রাই করছি তো? আর মেহেরও তো আমার মেয়েও তাই না? সো ডোন্ট ওয়ারি। আই উইল ফিক্স এভরিথিং।
– আই নো ড্যাড। সো ড্যাড বাই। সি ইউ।
– সি ইউ।
পরের দিন কলেজে। মেঘলা বাদাম চিবুতে চিবুতে ক্যাম্পাসে ঢুকছে। তখনই সেই দিনের সেই ছেলে যে স্প্রে এবং মেঘলাকে সারপ্রাইজ রুমে দেওয়ার জন্য ডেকেছিল সে এসে হাজির। সামনে এসেই বলে,
– ভাবি তোমার জন্য তোমার ফ্রেন্ড পাঠাগারে অপেক্ষা করছে। তুমি আসলে তোমায় বলতে বলেছে তাই বললাম।
আকষ্মিক এভাবে অচেনা কারো মুখে ভাবি ডাক শুনে মেঘলা বেশ থতমত খেয়ে যায়। মেঘলা বিচলিত হয়ে ছেলেটাকে ডাক দেয়,
– এই এই শোনো! তোমার নাম কি?
– জ্বি রনি।
– আচ্ছা রনি। আমি তোমার জনমের ভাবি?
– হা হা। এই জনমেরই ভাবি।
– তা তোমার কোন ভাইয়ের বউ আমি?
– কার আবার কাআআ
– কাআআ কি? বলো?
– আ আ কারো না। তোমাকে দেখে আমার খুব ভাবি ডাকতে মন চাইলো। আর ভাবি মানে কত সম্মানের ডাক বলোতো? তুমি যাকে বিয়ে করবে তাকেই ভাই বানাবো তাহলেই তুমি আমার ভাবি হয়ে গেলে।
বলেই মানে মানে কেটে পড়লো। কিছুদুর গিয়ে চিল্লিয়ে বললো,
– পাঠাগারে যেতে ভুইলেন না। অপেক্ষায় আছে কিন্তু। না গেলে পরে আবার রাইগা যাবে।
মেঘলা রনির কথা শুনে সামন্য হেসে দিলো। ছেলেটা কি একটা লজিক দিয়ে গেলো? অবশ্য খারাপ না লজিকটা। মেঘলা হাসতে হাসতে আবার বাদাম খেতে খেতে হেটে লাইব্রেরির দিকে গেলো। ভেতরে যেতেই তনুকে ডাকতে লাগলো। কারণ ওর ফ্রেন্ড বলতে তনুই আছে। তাই তনুকে ডাকছে। মেঘলা বুজতে পারছে না লাইব্রেরীটা এতো নিস্তব্ধ আর অন্ধকার কেনো। বইয়ের ওই সাইডে একটা জ্বলছে। বইয়ের একটা সারিতে ডুকতেই সেই লাইটটাও বন্ধ হয়ে গেলো। মেঘলা ভয়ে চিৎকার দিতে যাবে তখনই বুজতে পারে সে আর চিৎকার দিতে পারছে না। মুখের উপর কারো হাতের স্পর্শ পেলো। কেউ তার মুখ আটকে রেখেছে। মেঘলা দুই হাত দিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করছে হাতটা সরানোর। কিন্তু বেচারি ব্যর্থ। তখনই ঘাড়ে কারো উষ্ণ নিশ্বাসের উপস্থিতি টের পায়। মেঘলার হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসে। কানের কাছে একটা শব্দ শুনতে পায়,
– মেঘবতী…..
একটা শীতল স্রোত শরীরের শিরা উপশিরা দিয়ে বইয়ে যায় মেঘলার। অদ্ভুত একধরনের ভালোলাগা। ভালোলাগাতে চায় না তবুও যেনো ভালোলাগছে। কি অদ্ভুত এক মায়া, টান এই শব্দটাতে। মেঘলা একচুলও নরতে পারছে না নাকি চাচ্ছে না। যেমন আছে তেমনই যেনো আবেশে ঘিরে রেখেছে তাকে।
চলবে…. ❤