#তুই_যে_আমারই
#আঁখি আজমীর নুরা
part 2
সকালে ঘুমের মধ্যে কারো ঝাঁকুনিতে চোখ দুটোকে আর এক রাখতে পারলাম না। চোখ মেলে দেখলাম আজিফা আপু ডাকছে। উফফ আপু, দিলেতো স্বাদের ঘুমটার বারোটা বাজিয়ে। এতো সকাল সকাল ডাকতে হবে তোমার। তোমার এই রোজ রোজ ডাকানির জন্য আমি একটা দিন ও শান্তিতে ঘুমোতে পারি না। ধ্যাত! আজিফা আপু আমার কান ধরে বলে উঠলো, তবেরে তোর ঘুমের ডিস্টার্ব আমি করি? নাকি উপকার করি। কটা বাজে জানিস? কেন কটা, প্রত্যেক দিন যে পাঁচটায় ডেকে দাও, নিশ্চয় পাঁচটা 🙄🙄…
জ্বী নাহ এখন বাজে সাতটা। কিহহহহ, সাতটা মানে কী? তুমি আমাকে এখন ডাকলা, আজকেতো সকালের নামায কাযা হয়ে গেলো। এখন কী হবে? আয়াজ ভাইয়া তো আজকে গুণে গুণে ২বেত দিবে। আজিফা আপু বলে উঠলো হ্যাঁ খালি তুই একা বকা খাবি নাকি, আমারোতো কাযা… আমিও আজকে ভাইয়ার কাছে বকা খাবো। হুম শুধু বকাইতো মাইরতো দিবে না। আমাকেতো মারবে। তুই ছোটো যে তাই তোকে মারবে, আমার মতো বড়ো হ মাইর ও আর খাবি না। আপু তুমি আমার সাথে মজা করছো? মুখ ফুলিয়ে বলে উঠলাম… আপু হাহাহাহা করে হেঁসে উঠলো। হাসি থামিয়ে আপু বলল আর বলিস কালকে মোবাইল টিপতে টিপতে রাত দুটো বেজে গেছিলো টেরই পাই নি। তাই ইয়ার ভোরে আর জাগতে পারেনি। ওহ আপনাদেরতো বলাই হয় নি, আসলে খালামনির বাসায় সবাইকে পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করতে হয়। নয়তো আয়াজ ভাইয়া ভিষণ রেগে যায়, ভাইয়ার মতে খালি দুনিয়ার পিছনে ছুটলে হবে না। আল্লাহ কেও ডাকতে হবে। আর আমিতো সেই ছোট্ট বেলা থেকেই এখানে আছি। পরিবারে যেহেতু সবার ছোট মেম্বার আমি, তাই আমার ক্ষেত্রে নিয়মটাও একটু ভিন্ন। মানে এক ওয়াক্ত নামায কাযা করলে দুই বেত। এবং একদিন কুরআন পাঠ না করলে তিন বেত। একদম সেই ছোট্ট থেকে। যাইহোক এবার উঠে নামায কাযা আদায় করে নিলাম।
নিচে গেলাম সবাই ব্রেকফাস্ট করে নিলাম। ড্রয়িংরুমে বসে বসে টিভি দেখছি। কারণ আজকে ফ্রাইডে। স্কুল অফ তাই কোনো কাজ নেই কি আর করবো, কারণ এখন বাজেই আটটা। আর একটু বেলা হলেই মাঠে খেলতে যেতে পারতাম। সো টিভি দেখা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। তখনই দেখি পাশে আয়াজ ভাইয়া নিউজপেপার নিয়ে বসেছে। আর মনোযোগ দিয়ে পেপার পড়ছে। পেপার শেষ হতেই আমাকে আস্ক করে বসল, কিরে কোনো পড়াশোনা নেই, হলিডে বলে কি আজকে পড়া সব অফ নাকি, চোখ লাল করে বলে উঠলো বই খাতা নিয়ে রুমে আয়।
এবার আমার কেঁদে দিতে মন চাচ্ছে। চোখের পানি টলমল করছে। অসহায় চোখে খালামনির দিকে তাকালাম। খালামনির পরম মমতায় আমাকে জরিয়ে ধরলো। আর বলল কী হয়েছে মামনি, আদর পেয়ে আমি এবার কেঁদেই দিলাম। আর বললাম তোমার ছেলেটা খুব পঁচা। সারাক্ষণ খালি রুলস আর রুলস। ভালো লাগে না। রোজিনা চৌধুরী ও আর কি বলবে, কারণ ছেলেটা যে একরোখা। যা বুঝে একটাই। অমনি উপর থেকে চিল্লানির আওয়াজ আসলো, আমিও খালামনিকে ছাড়িয়ে এক দৌড়ে উপরে চলে গেলাম।
রুমের সামনে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে বললাম ভাইয়া আসবো? ড্রয়িংরুম থেকে আমার রুমে আসতে এতো সময় লাগে? ধমক খেয়ে আমি কেঁপে উঠি। আমাকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভাইয়া বলে ওঠলো কি হলো ওখানে ওমন খুঁটির মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যা গিয়ে বই খুল।
আমার খুব কান্না পাচ্ছে, কারণ আমি একটা পড়াও শিখি নি। গতরাতে আমি পরতে বসিনি। হোমওয়ার্ক, প্যারাগ্রাফ কিছুই শিখি নাই। তার উপর সকালের নামায ও কাযা করেছি। ভয়ে রীতিমতো বুকের ভিতর ঢিপঢিপ করছে।
ম্যাথগুলো বের কর? আমাকে চুপ মেরে থাকতে দেখে ভাইয়া জোরে ধমক দিয়ে ওঠে। আমি এবার ভয়ে ভয়ে বললাম আআয়াজ ভবভাইয়া আ আসলে ম্যাথ ব্যাস আর বলতে হলো না করিসনি তাইতো। আমি মাথা নিচু করে চুপ করে থাকলাম। ভাইয়া এবার বললো প্যারাগ্রাফ বল, এবার ও চুপ থাকতে দেখে ভাইয়া স্টিলের স্কেল দিয়ে টেবিলের উপর এক বারি মারলো। শিখি নি ভাইয়া। সকালের নামায কাযা করেছিস কেন? একটা দিন ও কি আজিফার ডাকা ছাড়া নিজে ওঠতে পারিস না। কালকে থেকে নিজে নিজে উঠবি, যদি শুনেছি তো আজিফা ডেকে উঠিয়েছে মাইর একটাও মাটিতে পরবে না।
এবার হাত পাত? কি হলো হাত বারা। আমি হাত দিতেই স্টিলের স্কেল দিয়ে চঠাসস চঠাসস পরলো কয়েকটা। হাতটা ভিষণ জ্বলছে। কান্না যেন বাঁধই মানছে না। এবার ভাইয়া বলল পড়া শিখিস নি তাই কান ধরে ১০০বার উঠবস কর। নয়তো শাস্তি আরো কঠিন হবে। কি আর করা। আস্তে আস্তে উঠবস করতে লাগলাম। কিন্তু ৪০বার করার পর পা যেন আর চলতেই চাই না। একটু দাড়াতে চাইলেই বলেন, দড়ালে আরো ১০বার বেশি করতে হবে। তাই টানা করে যেতে হচ্ছে। এবার যেন আর পারছিই না। কান্নার কারণে নাকের পানি চোখের পানিতে একাকার। ১০০ শেষ হতেই আর আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। ধপাস করে বসে পরলাম। এরপর আয়াজ ভাইয়া বলল কী হলো ওখানে ওমন বসে আছিস কেন? বাকি পড়া কমপ্লিট কে করবে। আমিও ভয়ে আস্তে আস্তে উঠে পড়ার টেবিলে গেলাম। পড়ছি আর কাঁদছি। কাঁদতে কাঁদতে একেবারে হিঁচখি উঠে গেছে। আয়াজের এবার যেন খুব খারাপ লাগলো। তাই ভাইয়া আর বেশিক্ষণ পড়ালো না। যা রুমে যা। কিন্তু আমি যেই না উঠে দাঁড়াবো অমনি বসে পরলাম। পা টা ভিষণ জিমজিম করছে।
ভাইয়া ব্যাপারটা বুঝতে পেরে, আমাকে কোলে উঠিয়ে নিলো, আর আমাকে রুমে দিয়ে আসলো। আর ভাইয়া হাতে একটা পেইন কিলার দিলো। খেয়ে নে এটা। আমিও চুপচাপ খেয়ে নিলাম নয়তো অবাধ্য হলে গালের উপর ঠাসস তো আছেই। আমার চোখের পানি গুলো আলতো হাতে মুছে দিলো। রাগি গলায় বলে উঠলো আর কখনো যেন এমন না হয়। তারপর রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।
আসলে ভাইয়ার মার বকা শাসন করলেও ভাইয়ার এই নিরবে কেয়ারিং গুলো সবকিছু ভুলিয়ে দেয়।
এদিকে, আরহাম চৌধুরী বড্ড ভুল করেছিস আমার কাজে বাঁধা দিয়ে। তুই নিজেও জানিসনা তুই কার সাথে পাঙ্গা নিয়েছিস। এর পরিনাম যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে তুই নিজেও ধারণা করতে পারবি না। এই রিয়াদ সরকার কি জিনিস সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাবি। গেট রেডি বলেই আরহাম এর ছবির উপর একটা ধারালো ছুরি দিয়ে বসিয়ে শয়তানের মতো হাসতে থাকে।
রাতে, বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছি। আর ভাবছি পিচ্চিটার কথা। সেই ছোট্ট বেলার কথা। যেদিন পিচ্চিটা জন্ম হয় সেদিন মনে হয় পৃথিবীর সব থেকে বেশি আমিই খুশি হয়েছিলাম। তখন আমার বয়স সবে আট কি নয় বছর। যখন আমাকে কোলে দেওয়া। প্রথম হাসি সেদিন মনে হয় আমার কোলেই হেসেছিল। নরম তুলতুলে গাল, ছোটো ছোটো হাত পা আঙ্গুল আর মুখে সেই ভুবন ভোলানো হাসি। পিটপিট চোখে একবার তাকাচ্ছিস তো আবার বন্ধ করছিস। চোখগুলো অসম্ভব সুন্দর ছিলো। তাইতো তোকে আমি আঁখি বলে ডাকতাম। আমি তখন খুশিতে বার বার তোর মুখে চুমু খাচ্ছি আর একে ওকে ডেকে বলছি দেখো কতো কিউট বাবু। কত্তো আদুরে। সেদিন আমার পাগলামো দেখে সবাই হাসছিল। এরপর থেকে সবসময় তোকে আমি আগলিয়ে রাখতাম….. কিন্তু এইতো সেদিনের কথা মনে পরলে এখোনো চোখ ভিজে উঠে… নাহ আর ভাবতে পারছি না। কিছুই হতে দিবো না আমি তোর।
নিজের জীবন দিয়ে হলেও তোকে সবসময় রক্ষা করে যাবো। সেদিন…
চলবে