তোমার আসক্তিতে আসক্ত পর্ব-১০

0
445

#তোমার_আসক্তিতে_আসক্ত
#সুবহী_ইসলাম_প্রভা
#পর্ব-১০ (বিশেষ ধামাকা)

কালো গাড়ি থেকে কোর্ট প্যান্ট পরিহিত মধ্যবয়স্ক একটা ভদ্র লোক বের হয়।মধ্যবয়স্ক লোকের সাথে হালকা গোলাপি শাড়ি পড়া একটা ভদ্রমহিলা বের হয়।আর্শিকা তাকে দেখা মাত্রই রাগে ক্ষোভে ভেঙে পড়ে।নিজেকে সামলে রাখা খুব কষ্টের,এই তো সেই মানুষ যার জন্য আজ সে মাতৃহীন,যার জন্য আজ তার কোনো ভাই বোন নেই।রাগে কষ্টে আর্শিকার গলা শুকিয়ে আসছে।দূর থেকে একজোড়া চোখ আর্শিকাকে গভীর পর্যবেক্ষণ করছে।তার কাছে অজানা আর্শিকার এমন ব্যবহারের কারণ।

আজমল চৌধুরী আর্শিকা দেখা মাত্রই থমকে দাঁড়ালো।কতদিন পরই না সে তার মেয়েকে দেখছে,সেই মেয়ে যে কি না তার বাবার মুখের উপর একটা কথাও বলতো না। আজ সেই মেয়েটা কতটাই নাহ দূরে চলে গিয়েছে।ভাবতেই আজমল চৌধুরীর চোখে পানি চলে এসেছে।আজমল চৌধুরী আর্শিকার কাছে এলে ফুল দিয়ে আর্শিকা আজমল চৌধুরীকে অভিনন্দন জানায়।তারপর জয়াকে দিয়ে আজমল চৌধুরীকে ব্যাচ পড়িয়ে দেয়। তারপর আজমল চৌধুরীসহ বাকিরা চলে যেতে আর্শিকা যাওয়ার জন্য উদ্দেগ নেয়।বহু কষ্টে আর্শিকা তার রাগকে প্রতিহত করার চেষ্টা চালিয়েছে কিন্তু এই মুহুর্তে তা আর সম্ভব নয়।আর্শিকা যাওয়ার আগেই মেয়েলি কন্ঠস্বর শুনতে পায়।

“কেমন আছো মেহু?”

আর্শিকা পিছনে তাকিয়ে সুমনা চৌধুরীকে দেখতে পায়। আর্শিকা খেয়ালই করে নি সবাই চলে গেলেও সুমনা চৌধুরী রয়ে গেছে। আর্শিকা মুচকি হেসে বলে,

“খুব কি ভালো থাকার কথা ছিলো মিসেস চৌধুরী?”

“এখনো রাগ করে আছো?”

“রাগ তো সহজেই ভেঙে যায় কিন্তু অভিমান সেটা যে শত শত বছর ধরেই বিদ্যমান রয়ে যায়।”

“সেই অভিমানের দেওয়াল কি ভাঙা যায় না।”

“বর্তমানে হয়তো নয়।”

“বড্ড বদলে গেছো তুমি”

আর্শিকা কিছু বলে না শুধু মাত্র মুচকি হেসে চলে যায়।সুমনা চৌধুরী আর্শিকার এমন ব্যবহারে খুবই মর্মাহত। যতই হোক তিনি তো একজন মা’ই না।সুমনা চৌধুরী অনুষ্ঠানে হাজির হয়।

✨✨

বাতাসে বহিছে প্রেম,

নয়নে লাগিলো নেশা

কারা যে ডাকিলো পিছে,

বসন্ত এসে গেছে

মধুর অমৃতবানী বেলা গেল সহজেই

মরমে উঠিল বাজি বসন্ত এসে গেছে

থাক তব ভুবনের ধুলি মাখা চরনে

মাথা নত করে রব ..

বসন্ত এসে গেছে, বসন্ত এসে গেছে।

আর্শিকা জয়া পিহু আর নয়নার স্টেজ অনুষ্ঠান শেষ হলে নিচে নেমে যেতে নিলেই প্রিন্সিপাল স্যার আর্শিকাকে আটকায়।প্রিন্সিপাল আর্শিকার কাছে এসে বলে,

“আর্শিকা সবাইকে বরণ করলেও আরেকজন প্রধান অতিথিকে কিন্তু এখনো বরণ করা হয় নি।”

আর্শিকা অবাক হয়ে বলে,”কে স্যার?”

“এই ভার্সিটির কো-ফাউন্ডারের ছেলে।এখন এসেছে।বরণ করবে নাহ?”

আর্শিকা মুচকি হেসে বলে,”নিশ্চয়ই স্যার।”

প্রিন্সিপাল স্যার আর্শিকাকে একটা মাইক আর একটা কার্ড দেয়। আর্শিকা মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে সাবলীল ভাষায় বলতে থাকে।

“সম্মানীয় অভিভাবকবৃন্দ। আসসালামু আলাইকুম। আপনারা সবাই ভালো আছেন তো?আজ আমাদের ভার্সিটিতে বসন্ত উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে।আপনারা সবাই ভার্সিটির বসন্ত উৎসবে যোগদান দিয়েছেন যার জন্য আমরা সকলেই অতি মাত্রার আনন্দিত। বসন্ত উৎসবের প্রধান অতিথি আজমল চৌধুরী এবং তার অর্ধাঙ্গিনী সুমনা চৌধুরী।তবে আরেকজন অতিথিও আছে যাকে বরণ করতে আমাদের কিছু মাত্র ঘাটতি হয়েছে।সে আমাদের ভার্সিটির কো-ফাউন্ডারের ছেলে।”

এই বলেই আর্শিকা কার্ডটা খুললেই নাম দেখে চমকে যায়।আর্শিকা অস্ফুটস্বরে বলে উঠে,

“কির্শফ ইসলাম রাদাফ”

আর্শিকার বলা বাক্যটা শোনার সাথে সাথেই সাদা শার্টের উপর ব্লু কোর্ট পরিহিত একজন যুবক বেড়িয়ে আছে।চোখে সানগ্লাস, মুখে ক্লিন সেভ, চুল গুলো জেল দিয়ে সেট করা,মুখে রহস্যময় হাসি লেগে রয়েছে। পুরো হিরোর লুক নিয়ে আর্শিকার দিকে এগিয়ে আসছে।স্টেজের সবাই বিশেষ করে তিন বান্ধুবী রাদাফের নাম শোনার সাথে সাথে দাঁড়িয়ে পড়েছে।রাদাফের পুরো নাম আর রাদাফকে দেখার সাথে সাথে আর্শিকা চরম মাত্রার আশ্চর্যিত হয়েছে। আর্শিকার চোখ যেনো কোটর থেকে বেরিয়ে আসবে। হৃদপিণ্ড সজোরে ধাক্কা দিচ্ছে এই বোধহয় বক্ষপিঞ্জর থেকে বেরিয়ে আসবে।মস্তিস্ক শুধু একটা কথাই বলছে ছয় বছর পুরোনো ইতিহাসের ডেভিল কিং।

আর্শিকার ভাবনার মাঝেই রাদাফ স্টেজে পৌঁছে যায়। রাদাফ মুখে রহস্যময় হাসি বজায় রেখেই আর্শিকাকে বলে,

“কি মিস মেহেরজান মেহের আর্শিকা আমাকে স্বাগতম জানাবেন নাহ?”

আর্শিকা হতবম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাদাফের কথায় আর্শিকার কানে আসতেই আর্শিকা অগ্নিদৃষ্টিতে রাদাফের দিকে তাকায়।কিন্তু আর্শিকার অগ্নিদৃষ্টিকে উপেক্ষা করে রাদাফ আর্শিকা চোখ টিপ মারে।এতে আর্শিকা দ্বিগুন অবাক হয়।ইতিমধ্যেই আর্শিকার কাছে একটা মেয়ে ব্যাচ নিয়ে এলে আর্শিকা রাদাফকে সেই ব্যাচ পড়িয়ে দিয়ে স্টেজ ত্যাগ করছে।মাথাটা যে বড্ড ভাড় লাগছে আর্শিকার।এই সেই কির্শফ যাকে সে খু’ন করতেও প্রস্তুত অথচ সেই কির্শফ কি না এতোদিন তারই চোখের সামনে ছিলো অথচ সে টেরই পায় নি।আর্শিকা ভার্সিটির একটা ফাঁকা রুমে গিয়ে রাগে মাথা খিঁচে চোখ বন্ধ কথা থাকে।আপাতত তার রাগ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে কিন্তু না সে ব্যর্থ হচ্ছে।আর্শিকা রাগে বেঞ্চে উলট পালট করছে আর চিৎকার করে বলছে,

“মি.কির্শফ আই উইল কিল ইউ।খু’ন করে ফেলবো আপনায়।আপনার জন্য জাস্ট আপনার জন্য আমি সব ফিরে পেয়েও হারিয়েছি আপনাকে আমিইইইই……”

“কি করতে চাও তুমি?”

আর্শিকার কথার মাঝেই পুরুষালি কন্ঠ শুনতে পায়।আর্শিকা পিছনে ফিরলে রাদাফ অরুপে তার বিষাক্ত অতীতের কির্শফের দেখা মিলে। কির্শফকে দেখার সাথে সাথেই আর্শিকা ক্ষিপ্ত বাঘিনীর ন্যায় কির্শফের কলার ধরে বলে।

“কি ভেবেছেন কি আপনি এতো বছর পরে এসে আমাকে আবার ভেঙে গুড়িয়ে দিবেন?আপনাকে আমি ছাড়ছি না? মেরে ফেলবো আপনাকে আমি।”

“আমি তো সেই কবেই মরে গেছি যেদিন তোমার তীরবিদ্ধ চোখে নিজের দৃষ্টি দিয়েছি।আর কতবার মারতে চাচ্ছো আমায়?”

আর্শিকা রাগে কির্শফকে ছেড়ে দিয়ে নিজের রাগ সংবরণ করার চেষ্টা করছে।কির্শফ অরুপে রাদাফ আর্শিকার হাত ধরা মাত্রই আর্শিকা ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে সজোরে রাদাফের গালে চড় বসিয়ে দেয়।

“ডোন্ট ক্রস ইউর লিমিট মি.কির্শফ ইসলাম রাদাফ। আমাকে যদি আগের মেহেরজান ভেবে থাকেন তাহলে বড্ড ভুল করছেন।”

চড় খেয়েও রাদাফ মুচকি হেসে বলে,”তাই নাকি?”

“জ্বি।সো বি কেয়ারফুল।”

আর্শিকা তেজ নিয়ে বাহিরে চলে যায়। রাদাফ আর্শিকার যাওয়ার পথে তাকিয়ে থেকে মুচকি হেসে গালে হাত দিয়ে বলে,

“ইউ আর মাই সুইট পয়জন।যেটা খেয়ে হায় আমি মরে গেলেও খুশি।”

আর্শিকা ভার্সিটি থেকে বের হয়ে যেতে না যেতেই আবার কোন পুরুষালি কন্ঠ শুনতে পায়।পুরুষালি কন্ঠ শুনেই আর্শিকা থমকে দাঁড়ায় কারণ ব্যক্তিটা যে তার জন্মদাত্রী পিতা।আর্শিকা ব্রেন বলছে চলে যেতে কিন্তু মন সে যে মানছে না।আজমল চৌধুরী আর্শিকার কাছে এসে বলে,

“কেমন আছো মা?”

“সেটা কি আপনার জানা খুব দরকার মি.চৌধুরী?”

“আমাকে কি একবার বাবা বলা যায় নাহ?”

আর্শিকা মুচকি হেসে বলে,”আপনি নিজেই কি সেই অধিকার বহু বছর আগে হারান নি?”

“এখনো অভিমান করে আছিস?”

“সেটা থাকাটা কি বড্ড অনুচিত?”

আজমল চৌধুরী দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়ে।তার মেয়েটা যে এমন তেরা ব্যাকা কথা বলতে পারে তা তার জানা ছিলো না।আজমল চৌধুরী কিছু বলার আগেই আর্শিকা বলে,

“দেশে হটাৎ আশা?কোন কারণ আছে কি?”

“তোমাকে নিতে এসেছি।”

“আপনার ভাবনার তারিফ না করে পারলাম না।যে মেয়ে তার বাবাকে বাবাই মানে না সে তার সাথে অন্য দেশে যাবে এটা ভাবাই অনুচিত।আপনি তো আপনার টাকাকে ভালোবাসেন তাকে নিয়েই বিদেশে চলে যান।”

আর্শিকা রাগ করে চলে যায়।টাকার কথা বলতেই ছয় বছরের ইতিহাস আর্শিকার মাথায় ধরা দেয়।এখন একটা জায়গায় গেলেই আর্শিকা তার মাথা ঠিক রাখতে পারবে।আর্শিকা কোনো দিক চিন্তা না করেই সেখানে চলে যায়।

✨✨

আর্শিকা সোজা এতিমখানার কেয়ারটেকারের সাথে দেখা করে হাউমাউ করে কান্না করে দেয়।প্রায় এক ঘন্টা ধরে আর্শিকা রাগ নিবারণ করতে কেঁদেই চলেছে।কিছুতেই কেয়ারটেকার ম্যাডাম আর্শিকা থামাতে পারছে না।আর্শিকা কাঁদছে আর বলছে,

“আন্টি কেনো ওই দুই ব্যক্তি আমার জীবনে এলো?আমি তো ভালোই ছিলাম কেনো আমার জীবন নরক করতে তারা চলে এলো?”

“আর্শিকা শান্ত হও।”

“আমি শান্ত হতে পারছি না আন্টি।ছয় বছর আগের ঘটনা আমাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে।আমি নিজের রাগ সংবরণ করতে পারছি না।আমি মুক্তি চাই।”

“আর্শিকা চুপ করো।তুমি এখন অনেক বদলে গেছো তুমি না সাহসী তাই শান্ত হও মা।”

আর্শিকা কান্না থামিয়ে বলে,”আমি আর কাঁদবো না।যাদের জন্য আমি আমার সব হারিয়েছি কথা দিচ্ছি জীবন্ত লাশ বানিয়ে ছাড়বো তাদের।এই আর্শিকা চৌধুরী সমস্তকিছুর প্রতিশোধ নিবে।আর ওই ডেভিল কিং কির্শফ তার ইচ্ছা তো পূর্ণ হবেই সাথে শাস্তিও হবে।”

আর্শিকা শান্ত হয়।ম্যাডাম আর্শিকা বাড়ি পাঠিয়ে দেয়।আর্শিকার এখন এই এতিম খানায় থাকাও উচিত না কারণ এতে পুরোনো স্মৃতি আর্শিকা মস্তিস্কে তাড়া করবে।

#চলবে