
#তোমার_আসক্তিতে_আসক্ত
#সুবহী_ইসলাম_প্রভা
#পর্ব-২৪
ডাক্তার এসে বলে,”পেসেন্ট কি কোনো কিছু নিয়ে মানসিকভাবে কষ্ট পাচ্ছে?”
আর্শিকা এগিয়ে গিয়ে বলে,”কেনো ডাক্তার?”
“সে তো রোজ ঘুমের ওষুধ খেতো।তারই সাইড ইফেক্ট স্বরুপ অজ্ঞান হয়ে গেছে।”
কথাটা শোনা মাত্রই কায়ান দাঁড়ানো থেকে বসে পড়ে।আর্শিকা তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করে,
“ডাক্তার পেসেন্টের কি জীবন ঝুঁকি আছে?”
“না না পেসেন্ট এখন মুক্ত কিন্তু আর কিছুদিন ঘুমের ওষুধ নিলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তো। এমনিই এখন সে অপুষ্টির স্বীকার হয়েছে।তাই ওনাকে একটু খাবার আর সময় দিন।মানসিক দূর্বলতা থেকে উনাকে বের করুন।”
কায়ান কথার মাঝেই বলে,”আমি কি পেসেন্টের সাথে দেখা করতে পারি ডক্টর?”
“পেসেন্ট তো এখন ঘুমাচ্ছে ওকে কিন্তু একজনই যেতে পারবে।”
রাদাফ রাগ দেখিয়ে বলে,”কোনো দরকার নেই তোর যাওয়ার।আর্শিকা তুমি যাও।”
“প্লিজ আমাকে একবার যেতে দে।”
আর্শিকা মলিন কন্ঠে বলে,”ঠিক আছে আপনি যান।”
কায়ান আর একমুহুর্তও দেরি না করে ছুটে পিহুর কেবিনে যায়।রাদাফ রেগে আর্শিকাকে বলে,
“ওই ইডিয়েটটাকে কেনো যেতে দিলে?দেখবে গিয়ে এমন কিছু কথা বলবে যে পিহু হাইপার হয়ে যাবে।”
“হবে না।বরং কায়ান স্যারকে দেখলে ওর আরও ভালো লাগবে।কারণ কায়ান স্যারকে ও ভালোবাসে।আর কায়ান স্যারও এই মুহুর্তে ওকে কিছু বলবে না আর বললে এমন কিছুইই বলবে যাতে ওর ভালো হয়।এই মুহুর্তে যদি কায়ান স্যারকে পিহুর কাছে না যেতে দিতাম তাহলে উনার অবস্থাও পিহুর মতোই হতো।”
রাদাফ ঠান্ডা মাথায় আর্শিকা কথা গুলো শুনে বলে,”সবার ভালোবাসা বুঝো, সবার কষ্ট বুঝো তাহলে আমার বেলায় এতো অবুঝ কেনো তুমি?”
রাদাফের ঠান্ডা কথায় আর্শিকা শরীরে শিহরণ উঠে যায়।সত্যিই তো সবার বিষয়ে জ্ঞানী হলেও সে জেনে রাদাফকে বুঝতেই চায় না।আর্শিকা কথা না বাড়িয়ে চলে যায়।
✨✨
জয়া আর নয়নার সামনে আহিল দাঁড়িয়ে আছে।দাঁড়িয়ে থাকার একটাই উদ্দেশ্য নয়নাকে সেভলি বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আর্শিকা তার ভাই আহিলকে দিয়েছে।কিন্তু দু’জন রমনী একসাথে থাকলে কিছুতেই তো নিরব থাকবে না। জয়া নয়না এতো বেশি বকবক করছে যে ইতিমধ্যে আহিলের মাথা ধরে গেছে।বিরক্ত হয়ে আহিল বলে,
“এই তোমরা কি একটু চুপ চাপ হাঁটতে পারো না?”
আহিলের প্রশ্নে নয়না উত্তর দেয়,”কেনো আমরা তো চুপ করেই হাঁটছি।”
“তোমরা যদি চুপ করে হাঁটো তাহলে মাছের বাজার খুললো কে?”
জয়া অবুঝ মনে প্রশ্ন করে,”আপনি কি চোখে একটু বেশি দেখেন নাকি?এই ব্যস্ত রাস্তায় মাছের বাজার পেলেন কোথায়?”
“উফফফ আল্লাহ,আমি জানতাম আমার বোন যেমন বুদ্ধিমতি তার বান্ধুবীগুলোও বুদ্ধিমতি হবে কিন্তু তারা যে এতো মাথা মোটা তা তো জানতাম নাহ?”
জয়া আর নয়না একসাথে ক্ষেপে বলে,”কিইইই আমরা মাথা মোটা?”
“না তোমাদের মাথা অত্যন্ত চিকন যা দিয়ে সরু বুদ্ধিও ঢুকে না।”
জয়া রেগে টিটকানি মেরে বলে,”আমাদের মাথা না’হয় চিকন আপনার মাথা তো ভালো তাইলে এই দুই মেয়ের সাথে কেনো হাঁটছেন?কেনো এসেছেন এখানে?”
“এসেছি কি আর সাঁধে নেহাৎ আমার বোন বলেছে।”
নয়না বলে উঠে,”ওর বোন প্রীতি,যান আপনি বরং চলে যান আমরা আপনার বোনকে কিছু বলবো না।”
“তোমার সাথের জন তো আমার বোনকে কিছু না বলে থাকতেই পারে না?দেখবো পেট ফেটে সব বলে দিবে।”
জয়া ক্ষিপ্ত হয়ে বলে,”এই আপনার কি আমাকে পেট ফাঁটা বান্দরনী মনে হয় যে আমি সব বলবো?”
আহিল হাঁসতে হাসঁতে নয়নাকে বলে,”দেখেছো নয়না তোমার বান্ধবী কিন্তু পুরোপুরি মাথা মোটা না।একটু একটু বুদ্ধিমতীও আছে নইলে কি আর নিজেকে নিজে চিনতে পারে হা হা হা।”
জয়া আহিলের কথাগুলো তাজ্জব বনে শুনে নয়নার দিকে তাকাতেই দেখে নয়নাও মুচকি মুচকি হাসছে।জয়া হাসি দেখে মাথায় আগুন ধরে যায়। অগ্নিদৃষ্টিতে নয়নার দিকে তাকিয়ে বলে,
“শেষে তুইও।যা সর এখান থেকে।”
বলেই তড়িঘড়ি করে চলে গেলো।নয়না পেছন থেকে জয়াকে কয়বার ডাক দিয়েও লাভ না হয়ে সামনের দিকে ছুট লাগায়।আহিল মুচকি হেসে বলে,
“ইসস ওই অগ্নিদৃষ্টি আমার মন কেড়েছে,হায়।”
✨✨
রাদাফ আর আর্শিকা ক্যান্টিনে বসে আছে।আর্শিকার রাদাফের সামনে বসে থাকতে প্রচুর অস্বস্তিকর অনুভব হচ্ছে।কারণ রাদাফ সেই কখন থেকে আর্শিকার দিকে এক ধ্যানে তাকিয়েই আছে মনে হচ্ছে নজর সরালেই আর্শিকা পালিয়ে যাবে।আর্শিকা বিব্রত বোধ করে বলে,
“আপনার কফি এসে ঠান্ডা হয়ে গেছে।খাবেন নাহ?”
“খেতে ইচ্ছে করছে না যে তোমাকেই দেখতে ইচ্ছে করছে।”
“কিইই?”
“কিছু না। তোমার চা’ও তো ঠান্ডা হয়ে গেছে খাচ্ছো না যে?”
“এভাবে কুম্ভকর্ণের মতো তাকিয়ে থাকলে কে কি’ই বাহ খেতে পারবে?”
“কেনো আমার দৃষ্টিতে বুঝি তুমি আসক্ত হচ্ছো?”
“আমার কি খেয়ে দেয়ে কাজ নেই যে আপনার দৃষ্টিতে আসক্ত হবো?”
“হতে বুঝি খুব সমস্যা?”
“কিছু কিছু মানুষ আছে যাদের ভালোবাসলেও ক্ষমা করা খুব কঠিন।”
“তার মানে তুমি আমাকে ভালোবাসো?”
কথাটা আর্শিকা না বুঝেই বলে ফেলে। রাদাফের প্রশ্নে আর্শিকা আড়চোখে রাদাফের দিকে তাকিয়ে এলোমেলো চাহুনিতে ভাবতে থাকে।
“সত্যিই তো আমি হটাৎ করে এটা বললাম কেনো?আমি তো তাকে ভালোবাসি না,ইনফেক্ট তাকে তো সহ্যই করতে পারি না তাহলে?কেনো আমার সাথে এসব হচ্ছে?”
রাদাফ আর্শিকার চাহুনি বুঝতে পেরে বলে,”ঠিক আছে তুমি সময় নেও।কিন্তু আর্শিকা সবসময় মাথার না কিছু কিছু সময় মনের কথাটাও শুনো কারণ এই মনটা একমাত্র নিজের কথা ভাবে আর কারোর নয়।”
রাদাফ বিল পেমেন্ট করতে গেলেই আর্শিকা আড়চোখে রাদাফের দিকে তাকিয়ে বলে,”যদি এ মন নিজের কথাই শুনে তাহলে শত চেষ্টা করেও কেনো পারছে না আপনাকে ক্ষমা করতে?”
রেস্টুরেন্ট থেকে বের হতে না হতেই আর্শিকা কোনো এক আগুন্তকের সাথে বেশ সজোরে ধাক্কা খায়।আর্শিকা একটু রেগে তাকে কিছু বলার আগেই আকাশ সমান অবাকতার সামনে পড়ে।কারণ তার সামনে ছিলো তার বেইমান প্রাক্তন প্রতীক।
“প্রতীক তুমি এখানে?”
“ওয়াও গ্রেট তুমিও দেখছি এখানে?এতো বড় রেস্টুরেন্টে তুমি এ যে অকল্পনীয়?”
“সবকিছু প্রকাশ করতে নেই প্রতীক। কিছু কিছু অকল্পনীয়ই শ্রেয়।”
তখনই রাদাফ আর্শিকার পাশে এসে বলে,”আর্শিকা চলো।”
রাদাফকে দেখে প্রতীক বলে উঠে,”ওয়াও নিউ মোরগ নাকি আর্শিকা?তাই তো বলি তোমার মতো মেয়ের এই রেস্টুরেন্টে আসার সক্ষমতা হয় কি করে?”
রাদাফ রেগে বলে,”হাও ডেয়ার ইউ?”
“ও ব্রো দাঁড়াও আমি তোমার ভালোই করছি।এই মেয়েকে তুমি চিনো না, এই মেয়ে এক নাম্বারের নিচু জাতি। রোজ ছেলে পটানো ওর স্বভাব।”
“শাট আপ। তোমাকে তো আমিই….”
বলেই রাদাফ প্রতীককে মারতে উদ্যত হলে আর্শিকা থামিয়ে বলতে শুরু করে,
” কে নিচু আর কে উঁচু জাতি তা তো সময়ই বলে দিবে প্রতীক মির্জা।আই উইস আপনার সাথে আমার আর না দেখা হয়।প্রথম বার ছেড়েছি, দ্বিতীয়বার ছেড়েছি,তৃতীয়বার কোনো চান্সই নেই।”
“তাই বুঝি তোমার মতো মেয়ে আমার কি’ই বাহ করতে পারো শুনি?”
আর্শিকা মুচকি হেসে প্রতীকের কাছে গিয়ে বলে,”বিয়ের তিনদিন পরে বাজারে গিয়ে উচ্চমাধ্যমে গণধোলাই কারা দিয়েছিলো?খবর নিয়েছিলেন?আমি কিন্তু সব খবরই রাখি?”
প্রতীক অবাক চোখে আর্শিকার দিকে তাকায়।কারণ বিয়ের ৩ দিন পরে সত্যি সত্যি প্রতীক বাজারে গিয়ে হাওয়া হয়ে গিয়েছিলো।কারা যেনো প্রতীককে ধরে নিয়ে টানা দু’দিন বেধারম মে/রে হাসপাতালে ভর্তি করে চলে যায়।প্রতীক নিজেও এর কোনো রহস্য উদ্ভাবন করতে পারে নি।
আর্শিকা মিষ্টি হেসে প্রতীককে বলে,”আমার কাছ থেকে দূরে থাকুন। কারণ জ্বলন্ত অগ্নির আশেপাশে সবকিছুই কিন্তু দ্রবীভূত হয়ে যায়।”
বলেই প্রতীককে সাইড কাটিয়ে আর্শিকা রাদাফের হাত ধরে টেনে বাহিরে নিয়ে যায়।বাহিরে যাওয়ার সাথে সাথেই রাদাফ আর্শিকার হাত ছেড়ে প্রশ্ন করে,
“এই ওই ছেলেটা কে হে?”
“আমার প্রাক্তন।”
“কি’ইইই তোমার প্রাক্তনও ছিলো?”
“হে আপনি প্রেম করেন নি দেখে কি আমি প্রেম করবো নাহ?”
রাদাফ রেগে আর্শিকাকে ধরে বলে,”লিসেন তোমার লাইফে পাস্টে কে ছিলো আই ডোন্ট কেয়ার বাট ফিউচার আর প্রেসেন্ট এই কির্শফ ইসলাম রাদাফই থাকবে মাইন্ড ইট।”
“আর যদি ফিউচার প্রেসেন্টে আপনাকে না রাখি তখন?”
“তখন আর কি করার আবার সবকিছু ছেড়ে চলে যাবো।বাই দ্য ওয়ে, আমার ফুল লাইফ জুড়ে কিন্তু একটা নামই ছিলো ❝ক্রেজি কুইন❞ আর সেই থাকবে।আমাকে একবার মেনে নেও নাহ ক্রেজি কুইন নিজের সবটা দিয়ে তোমায় আগলে রাখবো প্রমিজ।”
আর্শিকা কিছুই বলে না।কেনো জানি রাদাফকে আর্শিকার যেমন ভালো লাগে ঠিক তেমনই অতীত মনে করলে রাদাফকে সহ্য করতে পারে না।
✨✨
কায়ান পিহুর হাত ধরে বসে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে।পিহুকে অক্সিজেন মাস্ক পড়িয়ে স্যালাইন দিয়ে রাখা হয়েছে।পিহুকে দেখতে বিধ্বংস লাগছে।চোখ ফুলে একাকার অবস্থা, মুখটা ফ্যাকাসে। কায়ান পিহুর হাত ধরে শুধু কান্না করছে,মাঝে মাঝে পিহুর হাতে নিজের ওষ্ঠ ছুইয়ে দিচ্ছে। কায়ান কান্না করতে করতে বলে,
“প্লিজ পিহুরাণী চোখ খুলো,আমার এই স্বল্প জীবনে তোমাকে যে বড্ড প্রয়োজন।আমি যে ক্রমেই আসক্ত হয়ে পড়েছে, #তোমার_আসক্তিতে_আসক্ত হয়ে পড়েছি।”
#সমাপ্ত