সূচনা_পর্ব
#তোমার_খোলা_হাওয়া
#Sumaiya_Sumu(লেখিকা)
“বিয়ের ধুম পড়েছে আজ চৌধুরী বাড়িতে। তাদের একমাত্র কন্যা ঊষা চৌধুরীর আজ বিয়ে। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে ঊষা কিন্তু তবুও একমাত্র মেয়ের বিয়ে বলে কথা। কোথাও কোনো কমতি রাখতে চায় না কেউ। যতটুকু সম্ভব সবাই মিলে বিশাল আয়োজন করেছে। সবাই মিলে ঊষা’কে সাজাচ্ছে। কিন্তু ঊষার সাজতে ভালো লাগছে না। এতো সাজে কেন মানুষ? একটা নরলাম শাড়ি পড়ে কি বিয়ে করা যায় না? ওর মো’চ’ড়া’নো দেখে পার্লারের লোকরা প্রচন্ড বিরক্ত হচ্ছে। ঊষার কাজিন’রা ঊষা’কে ধরে বেঁধে বসিয়ে রেখেছে। ওদের প্রতিও ঊষার রাগ হচ্ছে শুধু মুখে কিছু বলছে না। কিছুক্ষণ পর পার্লারের লোকরা বিরক্ত হয়ে ঊষা’কে ছেড়েই দিলো। ওরা ছাড়তেই ঊষা যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। ঊষা’র সাজ শেষ হতেই ঊষা’র মা রুমে আসলেন। মেয়ের দিকে কিছুক্ষণ মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে কেঁদে উঠলেন”। ঊষা অস্থির হয়ে ওর মা’কে জড়িয়ে ধরে বললো….
‘কি হয়েছে মা? কাঁদছো কেন’?
‘আমার মেয়েটা কত বড় হয়ে গেলো? আজ আমাদের ছেড়ে চলে যাবে’?
‘এভাবে বলছো কেন মা? আমি তোমাদের ছেড়ে কোথাও যাবো না। আমি যখন খুশি তোমার কাছে চলে আসবো’।
‘দেখা যাবে’।
‘তুমি একদম কাঁদবে না মা, তাহলে কিন্তু আমিও কেঁদে ফেলবো’।
‘না, না কাঁদিস না। মেকাপ নষ্ট হয়ে যাবে তো’।
‘তাহলে তুমি কাঁদছো কেন’?
‘আচ্ছা বাবা আর কাঁদবো না’।
“ঊষা কিছু না বলে ওর মা’কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বুকে লেপ্টে রইলো। এর মধ্যেই সবাই হইহই করতে করতে এসে বললো ‘ঊষা, ঊষা তোর বর চলে এসেছে’। ঊষা কিছু না বলে লজ্জায় মাথা নুইয়ে ফেললো। বুকের মধ্যে কেমন যেনো শীতল হাওয়া বয়ে গেলো। এমন অনুভুতি কেন হলো উষা’র অজানা। ঊষা’র বরের নাম হচ্ছে উজান আহমেদ। উজান জয়েন ফ্যামিলিতে থাকে। উজানের বাবা’রা তিন ভাই। সব ভাইরা একসাথে এক বাড়িতে থাকে। তাদের স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে সব মিলিয়ে প্রায় ২০ জনের মতো। এতো বড় ফ্যামিলিতে ঊষা’র বিয়ে দিতে চায় নি কেউ কিন্তু ঊষা’র ইচ্ছে সে জয়েন ফ্যামিলিতেই বিয়ে করবে। এখনকার যুগে ছোট ছোট টোনাটুনির সংসার ঊষা একদম অপছন্দ করে। জয়েন ফ্যামিলিতে থাকার মজাই আলাদা। সুখে-দুঃখে সবাই পাশে এসে দাঁড়ায়। বিপদের দিনে পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেয় এসব ভেবেই ঊষা’র জয়েন ফ্যামিলিতে বিয়ে করার শখ। একমাত্র মেয়ের ইচ্ছের প্রধান্য দিতেই আজ এতো বড় পরিবারে ঊষা’র বিয়ে ঠিক করেছে। যাই হোক কিছুক্ষণ পরে ঊষা’কে নিয়ে গিয়ে স্টেজে উজানের পাশে বসিয়ে দিলো। ঊষা আঁড়চোখে একবার উজানের দিকে সাথে সাথে চোখ নামিয়ে ফেললো। কেমন যেনো লজ্জা কাজ করছে। আর বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে উজান’ই বা তাকে কেমন ভাববে? এসব ভেবে ঊষা মিটমিট করে হাসছিলো। এদিকে উজানের মধ্যে তেমন কোনো ফিলিংস নেই। সে মূর্তির মতো চুপ করে বসে আছে। মনে হচ্ছে জোড় করে তাকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। কিছুক্ষণ পর কাজি সাহেব এসে বিয়ে পড়ানো শুরু করলেন। দুই পরিবারের সম্মতিতে ওদের বিয়ে’টা সম্পন্ন হয়ে গেলো। আনন্দ করতে করতেই সারাদিন কে’টে গেলো। সময় হয়ে গেছে বিদায়ের। এটাই তো মেয়েদের জীবন। যেখানে ছোট থেকে বড় হলো সেই বাড়ি ছেড়েই পরের বাড়িতে চলে যেতে হবে। পরের বাড়িকেই আপন করে নিজের বাড়ি মনে করতে হবে। বিদায়ের সময় ঊষা’র কান্না দেখে একসাথে আকাশ বাতাসও মনে হয় কেঁদে উঠেছিলো। ঊষা’র কান্নার সাথে সাথে আকাশও হয়তো উষা’র কান্নার সাক্ষী হয়ে থাকতে চেয়েছিলো, তাই তো সমগ্র ভূপৃষ্ঠ কাঁপিয়ে বৃষ্টি নেমে গেলো। সবাই বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করছিলো। কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি কিছু’টা কমলে সবাই নতুন বউকে নিয়ে শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার জন্য রওয়ানা দিলো। গাড়িতে ঊষা, ঊজান আর ঊজানের এক বন্ধু ছিলো, বাকি সবাই অন্য গাড়িতে আসছে। গাড়িতে উজান একটা কথাও বলে নি ঊষা’র সাথে। ঊষা’র মনও খুব খারাপ তাই এই ব্যাপারে আর মাথা ঘামায় নি। দেখতে দেখতে সবাই নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছে গেলো। ঊষা’র একটু ভয় হতে লাগলো এতো বড় পরিবারে মানিয়ে নিতে পারবে তো? সবার মন জয় করতে পারবে? এসব ভাবছিলো এর মাঝেই তার শ্বাশুড়ি মা এসে তাকে বরণ করে ঘরে নিয়ে গিয়ে বসালেন। উজানের ছোট এক বোন আছে। সে এসে ভাবি,ভাবি করে ঊষা’কে পা’গ’ল করে দিচ্ছে। ঊষা’র অবশ্য ভালোই লাগছে। খুব তাড়াতাড়ি’ই যেনো সবার সাথে মিশে গেলো উষা। সবাই ওকে আপন করে নিয়েছে”।
“উষা’কে নিয়ে গিয়ে সবাই উজানের রুমে বসিয়ে দিয়ে এসেছে। ঘড়িতে বাজে রাত ১২.১০। এখনো ওরা উজান’কে রুমে আসতে দেয় নি। ঊষা একরাশ ভয়, আনন্দ, লজ্জা নিয়ে চুপ করে খাটে বসে আছে। যখন ওর বাবা উজানের ছবি দেখিয়েছিলো তখনই উজানকে ওর পছন্দ হয়ে যায়। এমন সুদর্শন যুবক কার না ভালো লাগে? উজানকে প্রথম দেখায় ঊষা প্রেমে পড়ে যায়। এসব ভেবে ঊষা মিটমিট করে হাসছে হঠাৎ দরজার বাহির থেকে হইচই এর আওয়াজ ভেসে এলো। সবাই উজান’কে আটকে রেখেছে। টাকা ছাড়া কেউ ভেতরে আসতে দিবে না। উজান এসবে প্রচন্ড বিরক্ত হচ্ছে কিন্তু মুখ ফুঁটে কিছু বলতে পারছে না। শেষ পর্যারে অনলাইন পেমেন্ট করে দিয়ে রুমে এসেছে। রুমে এসেই উজান হেঁটে বেডের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো”। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে উঠলো…..
‘দেখুন আমার এখন বিয়ে করার কোনো ইচ্ছে ছিলো না। শুধু পরিবারের জোড়াজুড়িতে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছি তাই এখন আমার কাছে কোনো স্ত্রী’র অধিকার চাইবেন না। আমার সময় লাগবে’।
‘মুহুর্তেই ঊষা’র মনটা খারাপ হয়ে গেলো। বিয়ের রাতেই এমন কথা কয়জন মেয়ে সহ্য করতে পারে? তবুও কিছু না বলে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো, আ..আপনার কি অতীত আছে’?
‘ছিলো। ওর পরিবার আমার কাছ থেকে ওকে কেঁড়ে নিয়েছে। ওকে জোড় করে অন্যত্র বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। আমি ভেবেছিলাম কখনো বিয়ে করবো না। ওর জায়গা আমি কাউকে দিবো না কিন্তু পরিবারের জন্য তা পারলাম কই’?
“এটুকু বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঊষাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই উজান হনহন করে ওয়াশরুমে চলে যায়। উষা এখনো আগেই মতোই বসে আছে। কত আশা নিয়ে এই বাড়িতে এসেছিলো কিন্তু মুহুর্তেই সব শেষ হয়ে গেলো। উষা’র চোখ ছলছল করছে, মনে হচ্ছে এখনই সব কষ্ট অশ্রু হয়ে বের হয়ে আসবে। উজান বের হয়ে এসে দেখে ঊষা এখনো বসে আছে। উজান কোনো কথা না বলে সোফায় গিয়ে শুয়ে পড়লো। ঊষা সেই দৃশ্য দেখে চোখের কোণ দিয়ে দু’ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। কিছুক্ষণ পর ঊষা বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে লাগেজ থেকে একটা শাড়ি বের করে আস্তে আস্তে ওয়াশরুমে চলে গেলো। কিছুক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে এসে সোফায় ঘুমন্ত উজানের দিকে এক পলক তাকিয়ে বেডের এক কোণে গুটিশুটি মে’রে শুয়ে পড়লো। ঘড়িতে বাজে রাত ৩.২৫। ঊষা’র দু’চোখে ঘুম নেই। বিয়ের প্রথম রাতেই এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে কারো চোখেই ঘুম থাকার কথা না, ঊষাও তার ব্যতিক্রম নয়। ঊষা চলন্ত সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে আছে তার দু’চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু’রা ঝড়ে পড়ছে। এই রাতে একটা মেয়ের কত স্বপ্ন থাকে কিন্তু ঊষা’র সাথে এমন হলো কেন? সে কি পারবে উজানের মন জয় করে নিতে? এসব আকাশ-পাতাল ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমের দেশে তলিয়ে গেলো সে বুঝতেই পারে নি”।
“চোখে-মুখে সূর্যের রশ্মি পড়তেই ঊষা’র ঘুম উধাও হয়ে গেলো। ঊষা পিটপিট করে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করলো সে কোথায় আছে। কালকে রাতে কাঁদার জন্য মাথা ভার হয়ে আছে। হঠাৎ কালকে রাতের উজানের কথাগুলো মনে পড়তেই সে লাফ দিয়ে উঠে বসলো। সোফায় তাকিয়ে দেখে উজান নেই। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো বাজে মাত্র সকাল ৬.২০। ঊষা একটু অবাক হয়ে ভাবতে লাগলো এতো সকালে মানুষ’টা কই গেলো? বিছানা থেকে নেমে রুমের চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখো, বেলকনিতে উঁকি দিয়ে দেখলো, ওয়াশরুমে পর্যন্ত দেখলো কিন্তু নাহ্ কোথাও উজান নেই। ঊষা ভাবলো হয়তো উনি বসার ঘরে সবার সাথে আছে তাই বেশি কিছু না ভেবে ওয়াশরুমে চলে গেলো ফ্রেশ হতে। কিছুক্ষণ পর ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শাড়ি ঠিক করছিলো তখনই রুমের মধ্যে হুড়মুড়িয়ে কয়েকজন উষা’র জা, ননদ, আরও কিছু আত্নীয় চলে এলো। ঊষা একটু চমকে উঠে সবার দিকে তাকালো। সবাই একসাথে হইহই করে হেসে উঠলো”।
#চলবে…..