তোমার খোলা হাওয়া পর্ব-০৪

0
409

#তোমার_খোলা_হাওয়া
#পর্ব_০৪
#Sumaiya_Sumu(লেখিকা)

“সকালবেলা এতো সুন্দর তেলাওয়াত শুনে উজানের ঘুম ভে’ঙে গেলো। সে আঁড়মোড়া দিয়ে উঠে বসে দেখলো ঊষা জায়নামাজে বসে তেলাওয়াত করছে। মেয়েটার তেলাওয়াতের কন্ঠ মাশাআল্লাহ। উজান মুগ্ধ হয়ে উষা’র তেলাওয়াত শুনতে লাগলো। ঊষা তেলাওয়াত শেষ করে উঠতে গিয়ে দেখলো উজান এক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ঊষা কিছু বলতে যাবে তার আগেই উজান একপ্রকার পালিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো। উজানের যাওয়ার পানে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে একটা তপ্ত শ্বাস ফেলে জায়নামাজ গুছিয়ে রেখে রান্নাঘরে চলে গেলো উষা। রান্নাঘরে গিয়ে দেখে উষা’র শাশুড়ী মা রান্নাঘরে চা বানাতে এসেছেন। উষা’কে দেখেই মিষ্টি করে হাসি দিলেন”। উষাও মুচকি হাসি দিয়ে বললো….

‘মা আপনি যান আমি সবার জন্য চা করছি’।

‘না, না বউমা তোমার কিছু করতে হবে না। আমি করছি’।

‘এভাবে কেন বলছেন মা? আমি কি করতে পারি না? আমার ইচ্ছে হয়েছে আজকে সবার জন্য সকালের নাস্তা, চা আমিই করবো। আপনি ঘরে যান তো’।

“শাশুড়ী মা’কে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ঠেলে-ঠুলে রান্নাঘর থেকে বের করে দিয়ে পুরো দমে সবার জন্য রান্না করায় লেগে গেলো। সবার জন্য পরোটা, ডিম ভাজি, আলু ভাজি আর চা করে নিলো। ততক্ষণে সবাই ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে খাবার খেতে চলে এসেছে। উষা হাসি মুখে সবাইকে খাবার বেড়ে দিলো। সবাই খাবার খেয়ে ঊষা’র রান্নার অনেক প্রশংসা করলো কিন্তু উজান একটা কথাও বলে নি। চুপচাপ রোবটের মতো খেয়ে উঠে চলে গেলো। উষা অসহায় চোখে উজানের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো। উষা’র শাশুড়ী মা হয়তো উষা’র মনের অবস্থা বুঝলো তাই উষা’র সামনে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। ঊষা একবার শাশুড়ী মায়ের দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে রইলো। শাশুড়ী মা আশ্বাস দিয়ে বললেন ‘ধৈর্য্য ধরো মা। আল্লাহ তায়ালা সব ঠিক করে দিবেন। এখন আর মন খারাপ করো না, যাও রেডি হয়ে নাও আজকে তো ওই বাড়ি যেতে হবে’। ঊষা শাশুড়ী মায়ের কথায় সায় দিয়ে রুমে চলে গেলো। রুমে গিয়ে দেখলো উজান ফোনে কার সাথে যেনো কথা বলছে। উষা কিছু না বলে ফ্রেশ হতে চলে গেলো। কিছুক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে এসে রেডি হতে লাগলো”। উজান ফোনের কথা শেষ করে অফিসের জন্য রেডি হয়ে বললো…

‘আমি কি রেডি’?

‘জ্বী’।

‘তাহলে চলুন আপনাকে ড্রপ করে দিয়ে আমি অফিস চলে যাবো’।

‘আচ্ছা’।

“উষা সবাইকে বিদায় জানিয়ে উজানের সাথে বের হলো। গাড়িতে কেউ কারো সাথে কোনো কথা বলে নি। বার কয়েক উষা আঁড়চোখে উজানের দিকে তাকিয়েছিলো কিন্তু কিছু বলে নি”। নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছেই উজান বললো….

‘এসে গেছি’।

‘হুম’।

‘যান তাহলে আর যেদিন ওই বাড়িতে যাবেন আমাকে বলবেন আমি এসে নিয়ে যাবো কিন্তু যদি যেতে না চান তাহলেও বলবেন আমি সব ফর্মালিটি করে দিবো’।

‘মানে’?

‘মানে আপনাকে মুক্তি দিয়ে দিবো’।

‘উজানন’?

‘আমাকে ভেবে জানাবেন আসি’।

“এটুকু বলেই উজান গাড়ি চালিয়ে চলে গেলো। ঊষা সেখানেই কিছুক্ষণ থম মে’রে দাঁড়িয়ে থেকে আস্তে আস্তে বাসার ভিতরে ঢুকে কলিংবেল বাজালো। উষা’র মা এসে দরজা খুলতেই ঊষা’কে দেখে অনেক খুশি হলেন। সে কিছু বলতে যাবে ঊষা ওর মা’কে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। চাপা কষ্টগুলো যেনো চোখের পানির মাধ্যমে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। ঊষা’র হঠাৎ এমন কান্না দেখে ওর মা একটু ঘাবড়ে গেলেন। তাহলে কি তার মেয়ে ভালো নেই? উষা’র মা মুহুর্তেই অশান্ত হয়ে উঠলেন”। অস্থির হয়ে বললেন…

‘কি হয়েছে মা তোর? এভাবে কাঁদছিস কেন? কিছু হয়েছে ওই বাড়িতে? তুই একা কেন? জামাই কই? তুই কি ভালো নেই’?

‘ঊষা বুঝতে পারলো তার মা অস্থির হয়ে গেছে আমার কষ্টের কথা শুনলে আরও বেশি অসুস্থ হয়ে যাবে তাই চোখ মুছে ঠোঁটে মিথ্যে হাসি ফুটিয়ে বললো, কিছু হয় নি মা। কি হবে? আসলে এতোদিন পর তোমাদের কাছে পেলাম তো তাই কান্না চলে আসছে। আর তোমার জামাই আমাকে নামিয়ে দিয়ে গেছে আসলে উনার অফিসে আজ জরুরি কাজ আছে তাই আসতে পারে নি’।

‘তুই সত্যি বলছিস তো’?

‘হ্যা মা। আমি কি কখনো তোমাকে মিথ্যে বলেছি বলো’?

‘ঠিক আছে আয় ভিতরে আয়’।

“ঊষা ভিতের গিয়ে বাবার সাথে দেখা করলো। সারাদিন সবার সাথে অনেক আনন্দ করেছে কিন্তু মা যতবার জামাইয়ের কথা জানতে চেয়েছে ততবারই এড়িয়ে গেছে বিষয়’টা। কি করবে? এসব কথা কাউকে বলা যায় নাকি? এসব বললে তো শ্বশুর বাড়ি মান-সম্মান নষ্ট হবে। সারাদিন যেমন তেমন করে কাটিয়ে দিলো। রাত ১০.০৮। ঊষা রুমে বসে বসে হুমায়ুন আহমেদের একটা বই পড়ছে আর বারবার ফোনের দিকে তাকাচ্ছে যদি একবার উজানের ফোন আসে? কিন্তু আদৌও কি আসবে? উজানের বলা কথাগুলো বারবার কানে বাজছে। বাঁধন থেকে মুক্ত করে দিবে কিন্তু এতোই কি সহজ বাঁধন থেকে মুক্ত করে দেওয়া? বিয়ে হচ্ছে একটি হালাল সম্পর্ক যা আল্লাহ প্রদত্ত। সেটা ভে’ঙে দেওয়ার সাধ্য কার আছে? ঊষা বিরবির করে বলতে লাগলো ‘আমি কি এতোই অযোগ্য? একটুও ভালোবাসা যায় না আমাকে উজান। আমি যে আপনাকে ভালোবাসতে চাই। আপনার সাথে সারাটা জীবন কাটাতে চাই’। হঠাৎ ফোনের রিংটোনের আওয়াজে ঊষা’র ধ্যান ভা’ঙ’লো। তার চোখ চকচক করে উঠলো সে ভাবলো হয়তো উজান ফোন দিয়েছে তাই খুশি মনে ফোনের দিকে তাকাতেই মুখটা চুপসে গেলো কারণ উজান ফোন দেয় নি। ফোনের স্ক্রিনে তার বান্ধবী রুনা’র নামটা জলজল করছে। তার কলেজ লাইফের বান্ধবী কিন্তু এখন কথা বলতে ইচ্ছে করছে না তাই ফোন’টা সাইলেন্ট করে রাখলো। আসলে মন ভালো না থাকলে কিছুই ভালো লাগে না”।

————-

কে’টে গেছে ৩ দিন। সবাই ফোন করতেছে ঊষা’কে ওই বাড়ি যাওয়ার জন্য। কিন্তু এই ৩ দিনে উজান একবারও ফোন দেয় নি। আজ নিজে থেকেই উজানকে ফোন দিয়েছিলো। বাসায় যাবে তাই উজানকে নিয়ে যেতে বলছে। উজানও রাজি হয়েছে। তিনবার রিং হওয়ার পর রিসিভ করে বলছে ‘আসসালামু আলাইকুম। কে বলছেন’? এই কথাটা ঊষা’র খারাপ লেগেছে। তার মানে ওর নাম্বারও উজান সেভ করে নি। এতোটাই মূল্যহীন সে? তার নাম্বারও উজানের ফোনের এক কোণে জায়গা হয় না তাহলে সে কিভাবে উজানের মনে নিজের জন্য জায়গা তৈরি করবে? কিন্তু সে তো হার মানলে চলবে না। তার বাবা সবসময় শিখিয়েছে কোনো কিছু টার্গেট করলে সেটা একদম কমপ্লিট করতে। আর এখন ঊষা’র একমাত্র টার্গেট হচ্ছে উজানে মন জয় করা আর ঊষা সেটা করেই ছাড়বে যেভাবেই হোক”।

“পুরো আকাশ নীল, সাদা, লাল হয়ে গেছে। বিকালের শেষ ভাগ,গোধূলি লগ্ন। এই সময়টা ঊষা’র ভীষণ প্রিয়। ঊষা বেলকনিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সময়টা উপভোগ করছে। কিছুক্ষণ পর মাগরিব আযানের ধ্বনি কানে ভেসে আসলো তাই ঊষা গিয়ে ওজু করে নামাজ আদায় করে নিয়ে সব কাপড়চোপড় গুছিয়ে নিজেও রেডি হয়ে নিলো। ঊষা রেডি হতে হতেই উজান ফোন দিয়ে বললো, সে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে উষা যেনো নিচে যায়। ঊষা বাড়ির সবার থেকে বিদায় নিয়ে বেড়িয়ে গেলো। ঊষা’র মা অবশ্য উজানকে ডাকতে চেয়েছিলেন কিন্তু ঊষা বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে না করে দিয়েছে। উজান যদি এখানে এসে আবার কোনো খারাপ ব্যবহার করে তাহলে তো তার মা-বাবা সব জেনে যাবে কিন্তু তাদের জানতে দিলে হবে না। তাদেরও তো বয়স হয়েছে। এখন একটু মেয়ের বিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছেন কিন্তু এখন যদি আবার মেয়েড অশান্তির কথা জানে তাহলে একদম শেষ হয়ে যাবে। তবে ঊষা’র মা হয়তো কিছুটা বুঝতে পেরেছেন যতই হোক মা বলে কথা। মেয়ের কোনো সমস্যা হলে সবার আগে মায়েরাই বুঝতে পারেন। যাই হোক উষা বাড়ি থেকে একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখে উজান গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। উষা’কে দেখেই কোনো কথা না বলে গাড়িতে গিয়ে বসে পড়লো। উষা একটা তপ্ত শ্বাস ফেলে নিজেও গাড়িতে গিয়ে বসলো। উজান গাড়ি স্টার্ট দিলো। গাড়ি চলছে আপন গতিতে। গাড়িতে দু’জন বসে আছে দু’দিকে মুখ করে। দু’জন যেনো দুই মেরুর”।

#চলবে…..

(ভুল-ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন ধন্যবাদ।)