#তোমার_তুমিতেই_আমার_প্রাপ্তি
লেখক-এ রহমান
পর্ব ২৫
থমথমে পরিবেশ। সবার চোখে মুখে কৌতূহল। দৃষ্টি ইভানের দিকে স্থির। সেই দৃষ্টিতে এক রাশ প্রশ্নের সাথে অপেক্ষা। ইভান নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। সবার অপেক্ষার অবশান ঘটিয়ে ইভান সেই কাঙ্খিত বাক্যটা আবারো উচ্চারণ করলো
–আমার এই এঙ্গেজমেন্টে আপত্তি আছে।
ইমতিয়াজ রহমান সরু চোখে তাকিয়ে বলল
–কেন? এই নিয়মটা তো অনেক আগেই পালন করা হয়ে গেছে। এখন শুধু আমরা চাইছি একটা আয়োজন করে সবাইকে জানিয়ে দিতে যে এটা কোন জোর করে তৈরি হওয়া সম্পর্ক নয়। তোমরা দুজনি এই সম্পর্কটাকে শ্রদ্ধা করো। সবার মনের সন্দেহটা দূর করতেই এই আয়োজনটা। কিন্তু এখানে তোমার আপত্তির কারণটা ঠিক কি ইভান?
ইভান দৃষ্টি নিচে রেখেই বলল
–তুমি ঠিক বলেছ আব্বু। এই নিয়মটা একবার হয়েই গেছে এখন আর নতুন করে একি নিয়ম পালন করার তো দরকার নেই।
এবার ইভানের দাদি মুখ খুললেন। তিনি গম্ভীর ভাবে বললেন
–তুমি ঠিক কি বলতে চাইছ দাদু ভাই।
ইভান খুব শান্ত ভাবে বলল
–আমি আগামি শুক্রবার কোন এঙ্গেজমেন্ট না! বিয়ে করতে চাই। আমি ঈশাকে অনেক আগেই আংটি পরিয়েছি আর সেটা সবার সামনে। আমাদের সম্পর্কটা নিয়ে মোটামুটি সবাই জানে। অবশ্য জানার মাঝে অনেকেরই প্রশ্ন আছে। অনেকেই ভাবে জোর করে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। বিয়েটা হয়ে গেলেই এসব নিয়ে কারও আর কোন কথা থাকবে না। সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
ইভান থেমে গেলো। ঈশা শক্ত করে ওড়না খামচে ধরল। এই মানুষটাকে সে যত দেখে ততই অবাক হয়ে যায়। বারবার তার ভালবাসার নজির এমন ভাবে প্রকাশ করে যে ঈশার সমস্ত অনুভুতি সেসবের কাছে তুচ্ছ হয়ে দাড়ায়। বারবার ঈশাকে হার মেনে দমে যেতে হয় তার ভালবাসার কাছে। যত অপরাধ যত অভিযোগই থাকনা কেন দিনশেষে তার ভালবাসার ছায়াতলেই ঈশার ছোট্ট আবেগ অনুভুতির জায়গা হয়। সমস্ত রাগ অভিমান মনের গভির থেকে শ্রদ্ধা হয়ে বের হয়ে আসে। ইভানের কথা শুনে এতক্ষন সবাই চুপচাপ ছিল। ঈশার বাবা একটু চিন্তিত হয়ে বললেন
–কিন্তু ঈশার এখনো ফাইনাল পরিক্ষা বাকি আছে। ওর পড়ালেখা…।
ইভান তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল
–আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি আঙ্কেল। বিয়ের পরেও ঈশা পড়ালেখা করতে পারবে। আর আমি আপনাকে এতোটুকু গ্যরান্টি দিতে পারি ঈশা ও বাড়িতেও যেরকম ছিল এই বাড়িতেও ঠিক তেমনই থাকবে। এতোটুকু ভরসা আমার উপরে আপনার রাখাই উচিৎ।
ইভানের কথা শুনে ঈশার বাবা একটু লজ্জা পেলেন। লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল
–ছি! ছি! বাবা। আমি আসলে ওরকম কিছু ভেবে বলিনি। আমি তো শুধু বলতে চেয়েছিলাম যে পরীক্ষাটা শেষ হলে অনুষ্ঠান করার কথা ছিল। এই বাড়িতে আমার মেয়ে কতটা ভালো থাকবে সেটা আমিও হয়তো আন্দাজ করে বলতে পারব না। তুমি কিছু মনে করনা বাবা।
ইভান হাসল। শান্ত ভাবে বলল
–আমিও ঠিক ওভাবে বলতে চাইনি আঙ্কেল। আসলে আমাদের বিষয়টা নিয়ে সবাই কনফিউজড। অনেকেই সেসবের সুযোগ নিচ্ছে।
শেষের কথাটা দাতে দাত চেপে বলল। ঈশা হালকা কেঁপে উঠলো। তার বুঝতে বাকি নেই কেন কথাটা বলল ইভান। থেমে আবার বলল
–সে জন্যই আমি বুঝে শুনে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আর এই বিষয়ে আমি এবার কারও কোন আপত্তি শুনতে চাই না।
ইমতিয়াজ রহমান মাথা নিচু করে ভাবছেন। তিনি এখনো কোন কথা বলেন নি। ইভান তার দিকে তাকিয়ে বলল
–আব্বু তুমি জানো আমি না ভেবে কোন সিদ্ধান্ত নেই না। আমার এরকম সিদ্ধান্ত নেয়ার পেছনেও কোন না কোন কারন আছে। সব কারন খুলে বলা সম্ভব না। ধরে নাও সবার ভালোর কথা ভেবেই আমি এমন টা করতে চাইছি। এই বিষয়ে কারও কোন আপত্তি থাকলে আমি সত্যিই খুব হতাশ হবো। আর আমাকে আমার আর ঈশার ভালোর কথা ভেবে অন্য কোন উপায় খুজতে হবে। সেটা কারও জন্য ভালো হবে না।
ইভানের মামা বললেন
–আমরা তোমার কথা বুঝতে পারছি ইভান। কিন্তু এটা অনেক কম সময় হয়ে গেলো না? এতোটুকু সময়ে একটা বিয়ের আয়োজন করা অনেক কঠিন একটা ব্যাপার।
ইভান কোন উত্তর দিলো না। কারন সে তার কথা বলে দিয়েছে। এর পরেও আর কোন কথা বলার থাকে না। বেশ কিছুক্ষন পর ইমতিয়াজ রহমান মুখ খুললেন। বললেন
–সিদ্ধান্ত টা কি তোমার একার না দুজনের? ঈশাও কি তোমার সাথে একমত?
ইভান খুব স্বাভাবিক ভাবে বলল
–আমি ঈশার মতামতের গুরুত্ত দিচ্ছি না। আমি মনে করি ঈশা যেহেতু বিয়েতে রাজি তাহলে ওর কোন সমস্যা থাকার কথা না। কারন এক সপ্তাহ পরেই হোক বা এক বছর পরেই হোক বিয়েত আমাকেই করতে হবে। এখন তোমাদের যদি মনে হয় ওর মতামত নেয়ার দরকার আছে তাহলে তোমরা আলাদা করে ওকে জিজ্ঞেস করতে পারো।
ইমতিয়াজ রহমান ইভানের হঠাৎ করে এমন সিদ্ধান্তের কারন বুঝতে পারলেন না। কিন্তু তিনি এটা বুঝলেন তার ছেলে আবেগের বশে কোন ভুল সিধান্ত নিবে না। নিশ্চয় এমন কোন কারন আছে যার কারনে সে এরকম করতে চাইছে। তিনি গম্ভীর ভাবে বললেন
–আলাদা করে নয়। আমি ঈশাকে সবার সামনেই জিজ্ঞেস করতে চাই। ঈশা কি ইভানের সাথে একমত?
সবার সামনে এরকম হঠাৎ করে প্রশ্ন করায় ঈশা অপ্রস্তুত হয়ে গেলো। কি বলবে বুঝতে পারছে না। এর আগেও ঠিক এভাবেই ইভান জোর করে তার উপরে নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছিল। এবার কিন্তু সেরকম কিছুই নয়। সেও চায় ইভান কে বিয়ে করতে। এর মাঝেই ইভানের মা বলল
–ঈশা রাজি হয়ে থাকলেও একটু বেশিই তাড়াহুড়ো হয়ে যাচ্ছে। আমার মনে হয় আমাদের এটা নিয়ে একটু ভাবা উচিৎ। সব দিক বিবেচনা করে প্রস্তুতি নেয়া উচিৎ। একটা বিয়ে ছোট খাট কোন ব্যাপার না। অনেক আয়জনের ব্যাপার আছে। এর মাঝে ঈশাকেও একটু সময় দেয়া হোক ভাবার জন্য।
ইভান বাধা দিয়ে বলল
–আমি আর কোন সময় দিতে চাই না। এটাই অনেক বেশী হয়ে গেছে। আমার কোন প্রস্তুতির প্রয়োজন নেই। তোমাদের প্রয়োজন থাকলে সেটা এই সময়ের মধ্যেই শেষ করতে হবে। এটাই আমার শেষ কথা আম্মু।
ইমতিয়াজ রহমান এবার বেশ বিরক্ত হলেন। একটু ঝাঝাল গলায় বললেন
–এতো তর্ক বিতর্কের তো কোন প্রয়জন নেই। আর প্রস্তুতিরও কোন প্রয়োজন নেই। ওদের এই বিয়ে নিয়ে এমনিতেও নাটকীয়তার শেষ নেই। যদি ঈশাও ইভানের সাথে একমত হয় তাহলে ওরা চাইলে আজই বিয়ে দিবো। ওদের জীবন ওদের সুখ। আমি ঈশার কাছে এখনি জানতে চাই। ও কি চায়?
ঈশা শক্ত করে ওড়না খামচে ধরল। বুকের ভিতরের ঢিপঢিপ শব্দটা বেড়ে গেছে অনেক। হাত পা কাঁপছে। গা ঘেমে যাচ্ছে। কিন্তু এই মুহূর্তে আর চুপ করে থাকা যায়না। জোরে শ্বাস নিয়ে বলল
–আমার কোন আপত্তি নেই।
কথাটা কানে আসতেই এতক্ষনের শ্বাসরুদ্ধ কর পরিস্থিতিতে আটকে রাখা তপ্ত শ্বাসটা ছাড়ল ইভান। ঈশা বুঝতে পারলো ইভান মুখে যত কথাই বলুক তার এই ছোট্ট কথাটার জন্য অপেক্ষা করছিলো। সবাই ঈশার কথার উপর ভিত্তি করেই সিদ্ধান্ত নিলো। ইভানের বিয়ে আর ইফতি মিরার এঙ্গেজমেন্ট এক সাথেই হবে। ঈশার চোখ ছলছল করছে। চোখ বন্ধ করতেই কোলের উপরে পাতিয়ে রাখা হাতটার উপরে পানি টুপ করে পড়লো। ঈশা হাতটা বন্ধ করে ফেললেও ইভান সেদিকে আড় চোখে তাকাল। ঠোটের কোনে ক্ষীণ হাসি। আজ ঈশা আনন্দে কাঁদছে। আর এই আনন্দের কারন ইভান। এটা ভেবেই ইভানের মনটা হালকা হয়ে গেলো। ঈশাকে সে সব সুখ দিতে চায়। জীবনের সব চাওয়া পুরন করতে চায়। হয়তো শুরুটা হয়ে গেছে। যার কারনেই মেয়েটার চোখে আজ তার জন্য পানি। সবাই কথা শেষ করে উঠে গেলো। ঈশা আর ইভান পাশা পাশি বসে থাকলো। অনেক্ষন ধরেই দুজন চুপচাপ বসে আছে। কেউ কোন কথা বলছে না। দুজনের নিরব অনুভুতির আদান প্রদান চলছে। মাঝখানে মান অভিমানের খেলা। এটাকে মান অভিমান ঠিক কতোটুকু বলা চলে সেটাই প্রশ্ন। দুজন দুজনের মনের ভাষা ঠিকই বুঝতে পারছে। আর যেখানে মনের ভাষায় কথা হয় সেখানে মুখের ভাষা আদৌ কি গুরুত্বপূর্ণ? ঈশা ঘাড় ফিরিয়ে একবার ইভানের দিকে তাকাল। ইভান নিচের দিকেই তাকিয়ে আছে। দৃষ্টি খুব শান্ত। সে এখানে কেন বসে আছে সেটা ঈশা জানে। ইভান এখান থেকে উঠে চলে গেলে ঈশা মনের সুখে কাঁদতে শুরু করে দিবে। জতক্ষন না তার মনে হয়েছে এখন থামা দরকার ততক্ষন কাদতেই থাকবে। আর ইভান তার চোখে পানি কোনভাবেই মেনে নিতে পারেনা। হোক না সেটা খুশির কান্না। একফোঁটাই যথেষ্ট। এর বেশী সহ্য করা যে তার জন্য কষ্টকর। তাই তো অভিমান নিয়েই পাশে বসেই প্রেয়সীকে নিরব অনুভুতি দিয়েই শান্তনা দিচ্ছে “আমি আছি তো। তোমাকে সব সময় আগলে রাখবো।“
ঈশা ইভানের সাথে কথা বলার প্রস্তুতি নিলো মনে মনে। নিজের মুখ খুলে কিছু বলার আগেই ইভান সেটা বুঝে যায়। আর পাশ থেকে টিস্যু বক্সটা ঈশার হাতে ধরিয়ে দিয়ে উঠে চলে যায়। ঈশা হতাশ হয়ে বসে ইভান কে যেতে দেখছে।
সেদিনের ওই ঘটনায় কার দোষ কতোটুকু সেটা নিয়ে ইভানের মাথা ব্যাথা নেই। ঈশার প্রতি তার অভিযোগ ঈশা তাকে মিথ্যা বলেছে। ইভান অপ্রত্যাশিত ভাবে সেখানে না গেলে কিছুই জানতে পারতো না। আর যদি কোন বিপদ হতো সেটা থেকেই বা কিভাবে ঈশা নিজেকে বাচাত। ইভান সব সময় তাকে আগলে রাখতে চায়। কিন্তু ঈশা সেটা না বুঝেই সব সময় বোকামি করে। ইভান কে এভাবেই কষ্ট দেয়। তাই ইভান এবার ঈশার কাছ থেকে ইচ্ছা করেই নিজেকে দূরে রেখছে যাতে ঈশা ভবিষ্যতে কোন ভুল করার আগে বারবার ভাবে।
চলবে……
#তোমার_তুমিতেই_আমার_প্রাপ্তি
লেখক-এ রহমান
পর্ব ২৬
মধ্য রাতের আকাশে এক ফালি চাঁদের আশায় কাতর চোখে সেদিকে তাকিয়ে আছে ঈশা। হাতে ধোঁয়া উঠা গরম চায়ের কাপ। কিন্তু আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। চাঁদ তো দুরের কথা আকাশে তারার কোন আনাগোনাও নেই। ঈশার মনের আকাশেও কাল মেঘের ঘন ঘটা। মনটা বেশ খারাপ তার। চায়ের কাপে এক চুমুক দিয়ে ঠোট উলটে চোখ নামিয়ে নিলো। উলটা ঘুরে গেলো। গ্রিলে মাথা ঠেকিয়ে একটু ভাবল। তারপর ইভানের বারান্দার দিকে তাকাল। দরজা লাগানো। অন্ধকার ঘর। মনটা খারাপ করে ঘরে চলে গেলো। পর্দা সরানো বন্ধ জানালার ওপাশ থেকে ইভান এসব দেখে মুচকি হাসল। এই সপ্তাহটা ঈশার ছুটি। ১ সপ্তাহ পর তার টার্ম এক্সাম তাই ক্লাস অফ। সারাদিন বাড়িতেই থাকে। প্রায় সময়ই বারান্দায় এসে দাড়ায়। ইভান খুব ব্যস্ত। তবে যে টুকু সময় পায় এই ঘরে বন্ধ জানালার সামনে বসে তার প্রেয়সীকে দেখে মন ভরে। ইভান তার সাথে কথা বলেনা। ঈশার হয়তো মনে হচ্ছে যে সে তার সাথে বেশী করে ফেলছে। কিন্তু ইভানের কাছে মোটেও বেশী কিছু মনে হচ্ছে না। কারন ঈশার এই শাস্তিটা পাওয়া উচিৎ। ইভান ঈশার অনেক কিছুই মাফ করে দিয়েছে খুব সহজেই। যার কারনে ঈশা কোন কিছু না ভেবেই এমন অনেক কিছুই করে ফেলে যা ঠিক না। তাই ইভান এবার খুব স্ট্রিক্ট। যাতে ঈশা ওর ভুল বুঝতে পারে আর কোন কিছু করার আগে বারবার ভেবে দেখে। যা কিছু করবে সেটা যেন ইভান কে জানিয়েই করে। সেদিন যদি ঈশা ইভান কে সত্যি কথাটা বলতো ইভান নিজেই তাকে নিতে যেত। কিন্তু ঈশা অন্যায় করেছে। আর সেটা তাকে এবার নিজে নিজেই বুঝতে হবে। বারবার এভাবে সব কিছুতে মাফ পেতে থাকলে অনেক বড় কোন ভুল করার আগেও ভাববেনা।ঈশা ঘরে এসে বারান্দার দরজা লাগিয়ে দিলো। ঘরের লাইট অফ করে ঘুমিয়ে গেলো। ঘুমিয়ে গেলো বললে ভুল হবে। বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করতে লাগলো। এতো মন খারাপের মাঝে কি ঘুম আসে?
————–
অন্ধকার ঘরে হঠাৎ করেই আলো জলে উঠতেই ঈশা চোখ খুলে আবার বন্ধ করে ফেলল। চোখে আলো লাগাতে বিরক্ত হয়ে হাত দিয়ে চোখ ঢেকে ফেলল। ঈশার মা গলা নামিয়ে তাকে ধাক্কা দিয়ে বলল
–বেলা ১১ টা বাজে। মেয়ে এখনো ঘুমাচ্ছে। তাড়াতাড়ি ওঠ।
ঈশা আবার পাশ ফিরে শুয়ে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল
–অনেক রাত পর্যন্ত পড়েছি মা। আর একটু ঘুমাই না।
ঈশার মা আবার তাকে ধাক্কা দিয়ে বলল
–অনেক পড়ালেখা হইছে। আর না। শশুর বাড়ির লোকজন বাইরে বসে আছে। এখন বিয়ের প্রস্তুতি নাও। ওঠো।
ঈশা উঠে বসলো। মায়ের দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে বলল
–সবাই কেন এসেছে?
ঈশার মা দাত কেলিয়ে বলল
–৫ দিন পর তোমার বিয়ে সে হিসাব কি আছে? বিয়ের শপিং করতে যাবে। বাইরে বসে আছে।
ঈশা উঠে আলমারি খুলে কাপড় নিয়ে ওয়াশ রুমে যেতে যেতে বলল
–আমি এখনি আসছি মা। তুমি বল রেডি হচ্ছে। জাস্ট ১৫ মিনিট।
বলেই ওয়াশ রুমের দরজা লাগিয়ে মুচকি হাসল। সবাই এসেছে তার মানে ইভানও আছে। হেসে রেডি হয়ে বের হয়ে গেলো। বাইরে গিয়ে দাড়াতেই রুমা তার সামনে এসে দাঁড়ালো। ফিসফিস করে বলল
–কিছু খাবে না? না খেয়েই যাচ্ছ?
ঈশাও ফিসফিস করে বলল
–সময় নেই তো। পরে খাব।
বলেই এগিয়ে গিয়ে সবাইকে সালাম দিলো। চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখল ইভান নেই। তার মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেলো। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সবার সাথে চলে গেলো। নিচে নামার আগেও একটা ক্ষীণ আশা ছিল যে ইভান হয়তো গাড়ির সামনে দাড়িয়ে আছে। কিন্তু নিচে নেমে ইফতিকে দেখে তার মনটা আরও খারাপ হয়ে গেলো। রুমা ইফতি আর মিরা এক গাড়িতে উঠলো। বাকিরা অন্য গাড়িতে। অনেকটা রাস্তা পেরিয়ে গাড়ি দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালো। ঈশা এর মাঝখানে একটা কথাও বলল না। এমন কি নেমেও না। রুমা বলল
–তোমার আবার কি হয়েছে? এরকম অন্ধকার করে আছো কেন?
ঈশা কোন উত্তর দেয়ার আগেই ইফতি বলল
–মনের রোগ ভাবি। সে যার হয় সে বোঝে। তুমি বুঝবে না।
রুমা মুখ টিপে হাসল। ঈশা ভ্রু কুচকে তাকাল। তাদের উপরে বেশ বিরক্ত। দ্রুত পায়ে হাটা ধরল। দোকানের ভিতরে ঢুকে সামনে থাকা সব ড্রেসগুলো হাত দিয়ে ছুয়ে দিলো। কোন রঙ্গই মনে ধরছে না। মন খারাপ থাকলে মনে কি কোন রঙ আদৌ ধরে? ঈশা সব দেখে নিলো ভালো করে। চারিদিকে ঘুরে দেখতে লাগলো। এর মধ্যেই সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে কাপড় দেখতে। সবাই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। কে কোন রঙ পরবে। ঈশা নিজের মতো ঘুরেই বেড়াচ্ছে। এমন সময় ইভানের মা ঈশাকে সেদিকে ডাকল। ঈশা ধির পায়ে এগিয়ে গেলো। উনি ঈশার দুই পাশে দুইটা শাড়ি রাখলেন। পরখ করে দেখতে লাগলেন কোনটা ভালো লাগছে। বুঝতে না পেরে ঈশাকে জিজ্ঞেস করলো
–কোন রঙটা তোর বেশী ভালো লাগছে?
ঈশা ভ্রু কুচকে দুই দিকেই তাকাল। কোনটাই তার ভালো লাগছে না। এদিক সেদিক তাকাতেই সামনে একটা সবুজ শাড়ি দেখতে পেলো। একটু ঝুকে সেটা হাতে নিতেই আরেকজন সেটার এক পাশ ধরে টান দিলো। ঈশা একটু বিরক্ত হয়ে পাশে তাকাতেই চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। ইভান তার পেছন থেকে ঝুকে ওই শাড়িটার এক পাশে ধরে টানছে। ঈশা অবাক চোখে ইভানের দিকে তাকিয়ে আছে। ইভানের দৃষ্টি শাড়িটার দিকে। সে ঈশার পিছনে থেকে এমন ভাবে হাতটা বাড়িয়ে দিয়েছে যে তার হাত ঈশার হাত ছুয়ে গেছে। আর তার গাল ঈশার গাল ছুঁইছুঁই। ইভানের ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি। সূক্ষ্ম ভাবে দেখলেই সেটা বোঝা সম্ভব। ইভানও বেশ অবাক হয়েই ঈশার দিকে তাকাল। পরক্ষনেই আবার নিজেকে সামলে নিলো। ছেড়ে দিলো শাড়ীটা। ইভানের মা মুচকি হেসে শাড়ীটা হাতে নিয়ে বলল
–খুব সুন্দর। এটাই তাহলে বিয়ের জন্য ফিক্স।
ইভান কোন কথা না বলে ঘুরে দাঁড়ালো। একটু সামনে গিয়ে রুমার সাথে কথা বলতে লাগলো। ঈশা ইভানের দিকে তাকিয়ে আছে। সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে সামনে তাকাতেই মিরা এসে ঈশাকে একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিলো। ঈশা একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো
–এটা কি?
মিরা একটু হেসে বলল
–ভাইয়া দিয়েছে।
ঈশা মনে মনে খুশি হল। একটু হেসে প্যাকেট টা খুলতেই দেখল অনেক গুলা চকলেট। হাসিমুখে একবার ইভানের দিকে তাকাল। ইভান ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে। ঈশা চোখ ফিরিয়ে একটা চকলেটের প্যাকেট খুলতেই ইফতি এসে নিয়ে নিলো। মিরা একটু ধমকে বলল
–তুমি কেন নিয়ে নিলে? আপু সকাল থেকে কিছুই খায়নি। খেতে দাও।
ঈশা বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করলো
–তুমি কিভাবে জানলে আমি খাইনি?
–ভাইয়া বলেছে। এই জন্যই তো এগুলো দিয়েছে তোমাকে।
ঈশা আবারো ইভানের দিকে তাকাল। ইভান এখনো ফোনেই ব্যস্ত। সেই বা কিভাবে জানল ঈশা খায়নি। ঈশা একটু হেসে আরেকটা চকলেট বের করে খেতে শুরু করলো। এবার ইভান তার দিকে তাকাল। ঈশা ঘুরে ঘুরে দেখছে আর চকলেট খাচ্ছে। ইভান একটু হাসল।
—————-
রাত প্রায় ৮ টা বাজে। এখনো শপিং শেষ হয়নি। একদিনেই পুরো বিয়ে বাড়ির শপিং শেষ করা খুব একটা সহজ কথা না। তবে ঈশার শপিং শেষ। সেই সকালে বের হয়েছে। রাতে ভালো করে ঘুম না হওয়ায় আর সারাদিন রেস্ট নিতে না পারায় টায়ার্ড হয়ে গেছে। শরীর খারাপ লাগছে। ঈশা চুপচাপ একদিকে বসে আছে। ইভান তার মুখের দিকে তাকাল। ঈশার অবস্থা বুঝতে পেরে তার মার কাছে গিয়ে বলল
–আম্মু তোমাদের আরও একটু হয়তো সময় লাগবে। আমি বলছি কি ঈশা ইফতি আর মিরাকে নিয়ে বাড়ি চলে যাই। ইফতি আর ঈশার সামনে এক্সাম। ওদের পড়ালেখাও আছে। ওদের তো শপিং শেষ। অযথা সময় নষ্ট করে লাভ নেই।
ইভানের মা কিছু একটা বলতে যেয়েও থেমে গেলেন। একটু ভেবে বললেন
–ঠিক আছে।
ইভান ইফতিকে ডেকে বলল
–তোরা তিনজন আমার সাথে বাসায় চল।
বলেই সে নিচে চলে গেলো। ইফতি মিরা আর ঈশাকে নিয়ে নিচে নেমে গেলো। নিচে নেমে দেখল ইভান গাড়ির সাথে হেলানি দিয়ে দাড়িয়ে আছে। ইফতি গিয়ে দাড়াতেই সে সামনের দরজাটা খুলেও দাড়িয়ে গেলো। একবার ঈশার দিকে তাকাল। তারপর ইফতিকে উদ্দেশ্য করে বলল
–তুই ড্রাইভ কর। আমি ভীষণ টায়ার্ড।
ইফতি চাবি নিয়ে সামনে বসে পড়লো। মিরা তার পাশের সিটে বসে পড়লো। ইভান পিছনের দরজা খুলে দাড়িয়ে থাকলো। ঈশা এলোমেলো পায়ে এগিয়ে গিয়ে গাড়িতে বসে পড়লো। অনেক শরীর খারাপ লাগছে তার। ব্যালেন্স করতে পারছে না কিছুতেই। ইভান দরজা লাগিয়ে অন্য পাশের দরজা খুলে নিজেও বসে পড়ল। ইফতি ড্রাইভ শুরু করলো। ঈশা সিটে মাথা এলিয়ে দিয়ে বসে আছে। চোখ বন্ধ হয়ে আসছে তার। একটু চোখ বন্ধ করতেই পুরো শরীরের নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলল। মাথা এদিক সেদিক হেলে পড়তে লাগলো। ইভান একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিলো। ছোট ছোট চুলগুলো বাতাসে এলোমেলো হয়ে মুখে পড়ছে। ঈশা বিরক্ত হচ্ছে। কিন্তু ঠিক করার শক্তি নেই। হাত বাড়িয়ে ঈশার পাশের জানালাটা বন্ধ করে দিলো। ইফতি অনেক জোরে ড্রাইভ করছে। তাই এভাবে হেলে দুলে যাওয়ার কারনে ঈশার বেশ অসস্তি হচ্ছে। বিরক্ত হয়ে মাথা তুলে ঠিক হয়ে বসলো। ইভান এক হাত ঈশার পিঠের দিকে প্রশস্ত করে দিতেই ঈশা হাতের দিকে ঘুরে তাকাল। ইভান ঈশার একটু কাছাকাছি বসলো। ঈশা কারণটা বুঝতে পেরে ঠোট টিপে হাসল। ইভান সামনেই তাকিয়ে আছে। ঈশা দেরি না করে ইভানের ঘাড়ে মাথা রাখল। কখন ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝতে পারেনি। ইভান তাকে এক হাতে জড়িয়ে রেখেছে। আরেক হাতে ফোনে নিজের কাজ করছে। জ্যামে আটকে আছে তারা। ঈশা নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। জ্যাম ছাড়তেই ইফতি জোরে ড্রাইভ করতে শুরু করে। অনেকটা সময় স্থির থাকার পর হঠাৎ করে চলতে শুরু করায় ঈশা ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলে। আর ইভানও নিজের কাজে ব্যস্ত ছিল। তাই খেয়াল করেনি। সাথে সাথেই ফোনটা ফেলে ঈশাকে দুই হাতে শক্ত করে ধরে ফেলে। ঈশার ঘুম ভেঙ্গে যায়। কিন্তু উঠতে ইচ্ছা করছে না। ইভান সিট টা পিছনে হালাতে হালাতে ইফতিকে বলে
–ধিরে ড্রাইভ কর।
ইফতি কথাটা শুনেই স্পিড নামিয়ে নিলো। ইভান ঈশাকে এবার আরও শক্ত করে নিজের সাথে চেপে ধরল। ঈশা ইভানকে জড়িয়ে ধরে গুটি সুটি হয়ে আবার ঘুমিয়ে গেলো। ইভান ঈশাকে দেখছে। মাঝে মাঝে রাস্তার নিয়ন আলোয় তার মায়াবী মুখটা অপূর্ব লাগছে। এই রুপের বর্ণনা দেয়া তার পক্ষে অসম্ভব। এই অপূর্ব মায়াবতির রুপের মায়ায় সে ঠিক কবে জড়িয়ে পড়েছে সেটা তারও জানা নেই। শুধু জানে এই মায়াবতি তার মনের সমস্ত রাজ্য জুড়ে রয়েছে। ইভানের ভাবনার মাঝেই উচ্চ শব্দে ফোন বেজে উঠে। ফোনের শব্দে ঈশা কেঁপে উঠে। ইভান এক হাতে ফোনটা খুজে সাইলেন্ট করে ঈশার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল
–সরি সরি! ভয় পায়না। আমি আছি তো।
চলবে……।