#তোমার_তুমিতেই_আমার_প্রাপ্তি
লেখক-এ রহমান
পর্ব ২৯
নিজের বিছানায় মাঝখানে বসে পুরো ঘরের চারিদিকে অস্থির দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে ঈশা। সবার উপরে খুব বিরক্ত সে। বিয়েটা তার সেটা যেন সবাই ভুলে গেছে। সেই জন্যই তো নিজেদের মধ্যে সাজগোজের প্রতিযোগিতায় মেতেছে। কে কতো সাজতে পারে। কাকে কতো সুন্দর লাগছে। এসব নিয়েই কথা বলতে ব্যস্ত। ঈশাকে এই মুহূর্তে কেউ দেখতেই পাচ্ছে না। সেই সন্ধ্যা বেলা হলুদ কিন্তু এই সকাল থেকেই সবার সাজগোজের আয়োজন। হবেই না বা কেন। যেখানে অনুষ্ঠানটা হবে সেটা বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে। তাড়াতাড়ি বের হতে হবে নাহলে দেরি হয়ে যাবে। আর ওদিকেও তো অনেক কাজ পড়ে আছে। যার কারনেই এতো তাড়া। ঈশা মুখ ফুলিয়ে বসে আছে। নিজের সাজ শেষ করে রুমা এসে মোটামুটি চিৎকার করে বলল
–ওমা! তুমি এখনো বসে আছো। গোসল করনি। রেডি হবে কখন? সবাই রেডি।
সবাই ঈশার দিকে ফিরে তাকাল। ঈশা দাত কেলিয়ে বলল
–আমার কথা মনে আছে তোমাদের?
ঈশার এমন প্রশ্ন শুনে সবাই যেন আকাশ থেকে পড়ল। একবার ঈশার দিকে তাকিয়ে তারপর নিজেদের দিকে তাকাল। বেশ কিছুক্ষন পিন পতন নিরবতা চলল। তারপর রুমা দাত কেলিয়ে বলল
–মজা করছ? তোমার এসব মজা দেখার মতো সময় আছে এখন?
ঈশা এবার রাগ করলো। মুখ ঘুরিয়ে নিলো। রুমা হাত ধরে টেনে উঠে দিলো তাকে। রাগি চোখে তাকিয়ে বলল
–এখনি ওয়াশ রুমে যাও। একদম দেরি করবে না। ওই বাড়িতেও সবাই রেডি ঈশা। আমরা একসাথে সবাই রওনা দিবো।
ঈশা দাড়িয়েই থাকলো। রুমা এবার রাগ করে ঈশাকে ধাক্কা দিয়ে ওয়াশ রুমে ঢুকে দিলো। সবাই আবার নিজেদের মতো সাজতে ব্যস্ত হয়ে গেলো। অনেকটা সময় নিয়ে ঈশা বের হয়ে এলো। কাঁচা হলুদ রঙের সবুজ পেড়ে একটা শাড়ি পরেছে। রঙটা ঈশাকে বেশ মানিয়েছে। ঈশা বের হতেই রুমা তাড়া দিয়ে বলল
–তাড়াতাড়ি চল। তোমার জন্য নিচে গাড়ি দাড়িয়ে আছে। তোমাকে ওখানে গিয়ে সাজাবে। পার্লার থেকে মেয়েরা সব ওখানেই যাবে।
বলেই আর অপেক্ষা করলো না। হাত ধরে টেনে নিচে নিয়ে এলো। ঈশা নিচে নামতেই মিরা দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। রুমা মিরাকে উদ্দেশ্য করে বলল
–আজ সারাদিনের দায়িত্ব কিন্তু তোমার। মনে আছে?
মিরা হেসে ঈশার হাত ধরে বলল
–একদম। আমি আমার দায়িত্ব ভালো করে পালন করবো।
রুমা ঈশাকে বলল
–তুমি যাও। আমি একটু পরে আসছি। আমার আরও কাজ আছে।
ঈশাকে কোন কথা বলার সুযোগ দিলো না। মিরা টেনে গাড়িতে বসাল। ইফতি ড্রাইভ করছে। পিছনে মিরা আর ঈশা। ইফতি হাতে ঘড়িটা দেখে নিয়ে বলল
–এখন দোয়া কর সময় মতো পৌছাতে পারলেই হয়। নাহলে……।
কথাটা শেষ না করেই থেমে গেলো। ঈশা ভ্রু কুচকে বলল
–নাহলে কি হবে?
ইফতি ঘাড় বেকিয়ে পিছনে তাকিয়ে বলল
–তোর জল্লাদ যতক্ষণ বেশী সময় ধরে অপেক্ষা করবে সেই সময়টা আমার কাছ থেকে কিভাবে পুষিয়ে নিবে সেটা ধারনা করার ক্ষমতাও আমার নাই।
বলেই আবার ড্রাইভ করতে শুরু করলো। তার মানে ইভান চলে গেছে। ঈশা একটু অভিমানি কণ্ঠে বলল
–এতো আগে যাওয়ার কি দরকার ছিল? আগে গেলে তো অপেক্ষা করতেই হবে।
ঈশার কথা শুনে ইফতি আর মিরা দুজনেই মুচকি হাসল। ঈশা ভ্রু কুচকে একবার মিরার দিকে তাকাল তারপর সামনের আয়নায় ইফতির দিকে। কিছু বুঝতে না পেরে চুপ হয়ে গেলো। ঈশার এখন খুব বিরক্ত লাগছে। সবার উপরে সে খুব বিরক্ত। এতো অসস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হবে সেটা জানলে এভাবে বিয়েই করতো না। ইভান কে কোন ভাবে ম্যানেজ করে কাজি অফিস অব্দি নিয়ে যেত। তারপর সাধারন ভাবে বিয়ে করে নিত। কোন ঝামেলা হতোনা। এতো নিয়ম রীতি। কোনটাই ঈশার ভালো লাগছে না। অতিস্ট হয়ে উঠেছে সে। দম বন্ধ হয়ে আসছে তার। কমিউনিটি সেন্টার টাও অনেক দূরে। ঈশার আর বসে থাকতেই ইচ্ছা হচ্ছে না। আর মাত্র দুইদিন। কিন্তু এই দুইদিন যেন ঈশার গলার কাঁটা হয়ে গেলো। উফ! সিটে মাথা এলিয়ে দিলো। আর ভাবতে পারছে না। মাথাটা প্রচণ্ড ব্যাথা করছে। চোখ বন্ধ করে থাকলো।
—————–
স্ট্যাচু হয়ে আয়নার সামনে বসে আছে ঈশা। দুইটা মেয়ে সেই কখন থেকে তাকে এদিক সেদিক ঘুরে ফিরে সাজাচ্ছে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেলো। বাইরে অনেক সোরগোল শোনা যাচ্ছে। সবাই এসে গেছে মনে হয়। ঈশার খুব ইচ্ছা করছে সবার সাথে জমিয়ে আড্ডা দিতে। খুব মজা করতে। কিন্তু এটা তো সম্ভব নয়। কারন বিয়েটা তো তার। এটা কেমন কথা নিজের বিয়ে বলে কি সে মজা করতে পারবে না। তার তো নিজের বিয়ে উপলক্ষে আরও বেশী করে মজা করা উচিৎ। সবার থেকে বেশী। চাপা কষ্টটা মনের মাঝে রেখেই একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সে। একজন মেয়ে বলল
–একবার দেখে নিন তো সব ঠিক আছে কিনা?
ঈশা চোখ তুলে আয়নায় দেখল। হালকা মেকাপ দিয়েছে। সারা গায়ে তাজা ফুলের গয়না। আশ্চর্যের বিষয় হল সব গুলোই ঈশার পছন্দের বেলি ফুলের তৈরি। সারা শরীরে ফুলের ঘ্রানে মৌ মৌ করছে। যেন আস্ত বেলি ফুলের গাছ। এই ঘ্রাণটা ঈশার বেশ লাগে। চোখ বন্ধ করে একবার বুক ভরে শ্বাস টেনে নিলো। ঘ্রাণটা নাকে লাগতেই অদ্ভুত ভালো লাগা ছড়িয়ে গেলো মনে। এতক্ষনের বিরক্তি ভাবটা কেটে গেলো। মিরা ঈশার ঘাড়ে হাত রেখে বলল
–বাহ! তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে।
ঈশা হেসে মিরার দিকে তাকাল। সেও হালকা করে সেজেছে। মিরার গালে আলতো করে হাত রেখে বলল
–তোমাকেও অনেক সুন্দর লাগছে।
মিরা বলল
–তুমি একটু বস। আমি দেখে আসি বাইরে সব রেডি হল কিনা?
ঈশা মাথা নাড়তেই সে বাইরে চলে গেলো। অনেকটা সময় পরে এসে বলল
–চল। সব রেডি। শুধু তোমার অপেক্ষা।
ঈশার বুকের ভিতরে ঢিপঢিপ শব্দটা যেন বেড়ে গেলো। মিরা হাত ধরে তাকে টেনে তুলল। তারপর হালকা টেনে বাইরে নিয়ে এলো। সিঁড়ির পাশে দাড়িয়ে ঈশা নিচে সবাইকে দেখে নিলো। সবাই নিজেদের মতো কাজে ব্যস্ত। ইভান স্টেজের এক পাশে দাড়িয়ে ঈশাকে দেখছে। এই হালকা সাজেও ঈশাকে যে এতো সুন্দর লাগবে সেটা তার ধারনাতেও ছিল না। ঈশা সিঁড়ি বেয়ে নামতেই ইভান একদম সিঁড়ির শেষ প্রান্তে এসে দাড়িয়ে গেলো। ঈশা শেষ সিঁড়িটা পার হতেই ইভান দুই হাতে ঈশার গাল চেপে ধরল। সবাই তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ঈশা লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ফেলল। ইভানের এমন কাজে মাঝে মাঝে ঈশা খুব অসস্তিতে পড়ে যায়। সবার সামনে এরকম কিছু করার মানেই হয়না। ইভানের স্পর্শ না পেয়ে ঈশা চোখ খুলে ফেলল। একটু দূরে ইভান দাড়িয়ে ঠোট টিপে হাসছে। ঈশা ইভানের হাসির কারন বুঝতে না পেরে ভ্রু কুচকে তাকাল। ইভানের দাদি এগিয়ে এসে তার কান ধরে টেনে রাগি গলায় বলল
–এটা কি করলি তুই? কেন ওকে আগে হলুদ মাখালি? সব কিছুর একটা নিয়ম আছে। বিয়ের নিয়ম এভাবে ভাংতে নেই।
ঈশা ওনার ঝাঝাল কথা শুনেই বুঝতে পারলো ইভান তাকে হলুদ মাখাতেই দুই গালে হাত রেখেছিলো। আর তার এমন কাজে তার দাদি যে খুব রেগে গেলো। তিনি নিয়ম রীতি এসবকে সব কিছুর আগে গুরুত্ত দেন। আর তার ধারনা ইভান আগেই ঈশাকে এভাবে হলুদ লাগিয়ে নিয়ম ভেঙ্গে ফেলেছে। এটা ঘোরতর অন্যায়। তিনি ইভানের কান ছেড়ে তীক্ষ্ণ চোখে ঈশার দিকে তাকিয়ে বলল
–এটা একদম ঠিক হল না। বিয়েটা অন্তত নিয়ম মতই হওয়া উচিৎ। এটা সারাজীবনের ব্যাপার। অনেক কিছু মেনে চলতে হয়।
ইভান তার রাগের কারণটা বুঝতে পেরে তাকে জড়িয়ে ধরে বলল
–রিলাক্স দাদু। এতো টেনশনের কিছুই নাই। এসব শুধুই নিয়ম। জিবনের কিছুই এসব নিয়ম দিয়ে চলে না। বিয়ের মতো সম্পর্ক টিকে রাখতে হলে দুজনের স্বতঃস্ফূর্ত ভালবাসা আর মনের মিলটা থাকা প্রয়োজন। দুজনের মধ্যে ভালবাসা না থাকলে এসব নিয়ম কোন কাজেই আসবে না। কোন নিয়মই দুটো মানুষকে এক সাথে ধরে রাখতে পারেনা। আর না কোন নিয়ম দুজনকে আলাদা করতে পারে। তুমি একদম নিশ্চিন্তে থাকো। সব ঠিক থাকবে।
ইভানের কথায় তার দাদি কতোটুকু শান্ত হতে পারলো সেটা নিজেই ভালো জানেন। কোন কথা বললেন না তিনি। ইভান আবারো বলল
–এতো ভেবনা। এসব নিয়ম কোনভাবেই ম্যাটার করেনা। সব থেকে বড় যে বিষয়টা ম্যাটার করে সেটা হল তোমার দোয়া। তোমাদের সবার দোয়া আমাদের জিবনে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সুখের জন্য তোমরা মন থেকে দোয়া করো। আমরা অবশ্যই সুখী হবো।
ইভানের দাদি তার মাথায় হাত রাখল। তার চোখে পানি টলমল করছে। তার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে তিনি বেশ ভয় পাচ্ছেন। ভয়টা কিসের তিনি নিজেও জানে না। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন
–তোমরা দুজন সারাজীবন একসাথে থাকো। আমি মন থেকে দোয়া করি। কখনও আলাদা হবে না।
ইভান একটু হেসে বলল
–ইভানের খাচা থেকে পাখি উড়ে যাওয়া এতো সহজ না। সেই ছোটবেলা থেকে অনেক মজবুত করে খাচা বানিয়েছি। এখান থেকে পাখি চাইলেও উড়তে পারবে না। আমি বেঁচে থাকতে তো পাখি কোনদিনই মুক্তি পাবে না। এই জনমে তো নয়ই।
ইভানের কথা শুনে সবাই ঠোট টিপে হাসতে লাগলো। থমথমে পরিবেশ আবার প্রাণোচ্ছল হয়ে উঠলো,। ইভান ঈশার সামনে দাড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো। ঈশা একবার হাতের দিকে তাকাল। তারপর আশে পাশে সবার দিকে তাকাল। কিছুক্ষন আগেই ইভানের নিয়ম ভাঙ্গা নিয়ে তার দাদি রাগ করেছিলো। আবার হাত দিলে যদি রাগ করে বসে। না জানি আরও কোন নিয়ম আছে কিনা? ঈশা হাতের দিকে তাকিয়ে ভাবছে। ইভান ভ্রু কুচকে বলল
–ধরবি নাকি অন্য কাউকে দিয়ে দিবো?
ইভানের কথা শুনেই ঈশা একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো। সবাই শব্দ করে হেসে ফেলল। ঈশা লজ্জায় মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছে। ইভান একটু হেসে তাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো স্টেজ পর্যন্ত। ঈশা ইভান পাশাপাশি বসে আছে। ইভান হালকা হলুদ রঙের একটা পাঞ্জাবী পরেছে। মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে অনেক খুশি। সবাই একে একে দুজন কে হলুদ মাখাল। সব পর্ব শেষ করে এবার বাসায় ফেরার পালা। কাল আরও অনেক ব্যস্ততা। ইফতি মিরার এঙ্গেজমেন্ট আবার ইভান ঈশার বিয়ে। তাই সবাই এক এক করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। ঈশা ওয়াশ রুমে গিয়ে হালকা করে হলুদ গুলো মুছে ফেলল। বাড়ি যাওয়ার আগে ইভানের দাদি ঈশাকে কঠিন ভাবে আদেশ করে গিয়েছে নতুন বউ যাতে এভাবে হলুদ লাগিয়ে বেশিক্ষন বাইরে না থাকে। সোজা বাসায় চলে যায় আর গোসল করে তাড়াতাড়ি যেন হলুদ তুলে ফেলে। নাহলে নাকি ভুত চেপে ধরার সম্ভাবনা থাকে। এমন কথা শুনে ঈশা মনে মনে হেসেছে। রুমা ঈশাকে নিজের সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য নিচে নামালে মিরা এসে বাধা দেয়। মুখে হাসি টেনে বলে
–বাড়ি পৌঁছে দেয়া অব্দি ঈশা আপুর দায়িত্ব আজ আমার।
রুমা একটু ভ্রু কুচকে তাকায়। কিন্তু কি ভেবে ঠোট টিপে রহস্যময় হাসি দিয়ে বলে
–দায়িত্বটা তাহলে ভালভাবে পালন করো। সময় মতো পৌঁছে দিও কেমন?
দুজনি হাসল। ঈশা দুজনের দিকেই তাকাল। রুমা চলে গেলো। মিরা ঈশাকে নিয়ে গেলো আরেকদিকে। পিছনের দরজা দিয়ে ঈশা বের হয়ে দেখে ইভান গাড়িতে হেলানি দিয়ে দাড়িয়ে আছে। মিরা ইভানের হাতে ঈশার হাত ধরিয়ে দিয়ে বলল
–ভাইয়া আমার দায়িত্ব আপাতত শেষ। আর হ্যা দাদি বলেছে হলুদ লাগানো অবস্থায় নতুন বউ যেন বাইরে না থাকে। ভুত ধরতে পারে।
ইভান শব্দ করে হেসে ফেলল। ঈশার দিকে তাকিয়ে বলল
–ওর জিবনে আমার থেকে বড় ভুত আর নেই। আগে আমার অত্যাচারটাই সহ্য করুক তারপর বাকিটা ভাবা যাবে।
বলেই ঈশাকে নিয়ে গাড়িতে উঠলো। সবার দৃষ্টির অগোচরে গাড়ি নিয়ে একটা ফাকা জায়গায় থামাল। ঈশা এতক্ষন চুপ করে দেখছিল। এখন কিছু বুঝতে না পেরে প্রশ্ন করেই বসলো
–আমরা এখানে কেন?
ইভান ঈশার কাছে এসে গালে হাত রেখে বলল
–তোকে অনেক মিস করছিলাম তো তাই।
ঈশা ভ্রু কুচকে ফেলল। মিস করার তো প্রশ্নই আসেনা। এতক্ষন একসাথেই ছিল। ঈশার এমন চাহুনি দেখে ইভান হেসে ফেলল। ঈশাকে নামতে বলে নিজেও নেমে গেলো। ঈশা নেমেই দেখল নদির পাড়ে দাড়িয়ে আছে। ইভান একটু এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো। একটা নৌকা এসে থেমে গেলো। ইভান নৌকায় উঠে ঈশার দিকে হাত বাড়াল। ঈশা কিছু না বুঝেও হাত বাড়িয়ে দিলো। ঈশাকে নৌকায় তুলে খুব যত্ন করে বসাল। এক হাতে জড়িয়ে সামনে তাকিয়ে বলল
“কোন এক শ্রাবনের রাতে চাঁদ ভাসবে আকাশে আর আমি ভাসব নদীতে। চাঁদের সাথে যেখানে পানি মিলেমিশে একাকার সেখানেই তোমার সাথে নিবিড় সান্নিধ্যে বসে জ্যোৎস্না স্নান করবো। দুজনের নিরব অনুভুতি সেদিনও মিলে যাবে গোপনে। চেনা শহর চেনা মানুষের কাছ থেকে হারিয়ে যাবো কিছু সময়ের জন্য দুজন। নিজেদের মতো কাটাবো কিছু মুহূর্ত। কিছু সময় পরে মেঘে ঢেকে যাবে চাঁদ। শুরু হবে প্রেমের বর্ষণ! ভালবাসাময় কিছু মুহূর্ত থমকে যাবে। আর সেই ভালাবাসার সাক্ষী হবে বৃষ্টির পবিত্র ফোটা।”
কথাটা বলেই থামল ইভান। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল
–আজও সেদিনের মতো মিসিং থেকেই গেলো।
ঈশা ঘোরের মধ্যে আছে। সে এখনো বুঝতে পারছে না কি হচ্ছে। ইভান এক হাত ঈশার গালে রাখতেই চমকে গেলো। ইভানের দিকে তাকাল করুন চোখে। ইভান অসহায়ের মতো বলল
–এখন বৃষ্টিটা হলে কি খুব ক্ষতি হতো? তোর এই ইচ্ছাটা অন্তত পুরোপুরি ভাবে পুরন হয়ে যেত। আমার খুব ভালো লাগত।
ঈশা কেদে ফেলল। ইভানের হাত চেপে ধরে বলল
–আমার চাইনা কিছুই। আমার শুধু তোমাকে চাই। আমার সব কিছু এই তুমিতেই।
ইভান হাসল। ঈশার চোখে পানি মুছে দিয়ে বলল
–আর এই তোমার_তুমিতেই_আমার_প্রাপ্তি।
চলবে………
#তোমার_তুমিতেই_আমার_প্রাপ্তি
লেখক-এ রহমান
পর্ব ৩০
‘বিয়ে’ জীবনের এমন একটি ধাপ যেখানে মুহূর্তেই সব কিছু পরিবর্তন হয়ে যায়। কবুল বলার সাথে সাথেই নিজের উপরে অধিকার অর্ধেক হয়ে যায় আর দায়িত্ব হয় দিগুন। অনেক নতুন সম্পর্ক জুড়ে যায়। দুইটা মানুষ একে অপরের সব কিছু হয়ে উঠে। একে অপরের সাথে সারাজীবন কাটানোর অঙ্গীকারবদ্ধ হয়।
রুমা দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল। ঈশা আয়নার সামনে দাড়িয়ে আছে। সাথে তার কাজিনরা আর এক পাশে মিরাকে সাজানো হচ্ছে। রুমা ঈশাকে ভালো করে পুরোটা দেখে নিলো। একটু হেসে বলল
–ইভান আর ঈশার কাবিনটা শেষ করে তারপর মিরা আর ইফতির আংটি পরানো হবে।
তারপর মিরার দিকে তাকিয়ে বলল
–রেডি হতে আর কতো সময়?
পার্লারের মেয়েটা বলল
–এই তো আপু হয়ে গেছে।
মিরাকে ছেড়ে সরে দাঁড়াল মেয়েটা। রুমা তাকে ভালো করে দেখে বলল
–বাহ! খুব সুন্দর লাগছে তো।
মিরা হাসল। ঈশাকে আজ একটু ভারি সাজ দেয়া হয়েছে। বউ বলে কথা। মিরাও সেজেছে তবে হালকা। মিরার মা ভিতরে ঢুকে বলল
–সব কিছু রেডি। একটু পরেই বিয়ে পড়াবে। এখানে কতদুর?
রুমা হেসে বলল
–সব রেডি মামি। চাইলে এখনি পড়াতে পারে।
মিরার মা বলল
–ঠিক আছে আমি বলছি।
তিনি ঘুরে দাড়াতেই দরজায় কেউ নক করলো। রুমা দরজার দিকে তাকাল। কাউকে ঢুকতে না দেখে নিজেই গিয়ে দরজা খুলে দিলো। দরজা খুলেই চোখ মুখ কুচকে বলল
–তুমি এখানে?
–আমার বউকে নিতে এসেছি।
ইভানের গলা শুনে ঈশার মুখে হাসি ফুটে উঠলো। কিন্তু বাকি সবাই অবাক হয়ে গেলো। ইভানের মামি একটু এগিয়ে গিয়ে বলল
–কি শুরু করেছ? সবাইকে কি বকা খাওয়াতে চাও? কাল হলুদ মাখান নিয়েই তোমার দাদি কতো রাগ করেছিলেন আর এখন তুমি এখানে এসেছ সেটা জানতে পারলে খুব রাগ করবে। আর তো একটু সময় বাবা। বিয়েটা পড়ানো হোক। তারপর যা ইচ্ছা করিও।
ইভান কোন উত্তর দিলো না। সে যে কারও কথাই শুনবে না সেটা ঠিক করে তবেই এসেছে। রুমা বলল
–বিয়ে পড়ানো পর্যন্ত তোমাকে অপেক্ষা করতেই হবে। এখন তুমি এখান থেকে যাও। কাজি সাহেব আসবে এখন।
ইভান হাত গুঁজে দাড়িয়ে কঠিন গলায় বলল
–কাজি সাহেব এখানে আসবে না। স্টেজে বিয়ে হবে। আর আমি এখান থেকে ঈশাকে নিয়ে যাবো নিজের সাথে।
ইভানের মামি অসহায়ের মতো বললেন
–বিয়ের আগে এভাবে বউকে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি তোমার নাই। আমি আগে বাইরে যাই সবটা ভালো করে শুনে আসি। তারপর যদি নিয়েই যেতে হয় তাহলে আমরা নিয়ে যাবো। অযথা কথা বাড়ায়ও না।
ইভান তার মামিকে দুই হাতে ধরে পিছনে ঘুরিয়ে দিলেন। তারপর তাকে নিয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন
–ঈশাকে আমি নতুন দেখছিনা। সেই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি মামি। তাই আমি এখন দেখলেও কোন প্রবলেম নাই। আর বউ হওয়ার আগে ঈশা আমার হার্ট বিট! আমার নিঃশ্বাস! আমার অস্তিত্ব! আর আমার অস্তিত্বকে আমি নিজের সাথেই স্টেজ পর্যন্ত নিয়ে যাবো। তারপর সেখানে বিয়ে পড়ানো হবে।
ইভানের কথা শুনে তার মামি পিছনে ঘুরেই ইভানের গালে আলতো করে একটা থাপ্পড় মেরে বললেন
–আমার সামনে এসব কথা বলতে লজ্জা করেনা?
ইভান অতি বিস্ময় নিয়ে বলল
–লজ্জার কি আছে? বিয়ের সময়ে তুমি লজ্জা পেয়েছিলে বলে কি লজ্জার কারনে তোমার বিয়ে আটকে ছিল? সময় মতো তো ঠিকই বিয়ে করেছ।
ইভানের এমন উলটা পাল্টা কথা শুনে তার মামি মাথায় হাত দিয়ে বললেন
–কি নির্লজ্জ ছেলে রে বাবা। এখানে থাকলে আমার মান সম্মান সব চলে যাবে।
বলেই তিনি দ্রুত পায়ে বের হয়ে গেলেন। সবাই হেসে ফেলল। রুমা একটু হেসে বলল
–ইভান তুমি যাও আমি ঈশাকে নিয়ে আসছি।
ইভান ঈশার দিকে তাকিয়েই বলল
–যে যাই বলুক ঈশা তো আমার সাথেই যাবে।
বলেই ঈশার দিকে হাত বাড়াল। ঈশা হেসে ইভানের হাত ধরল। ইভান তাকে নিজের সাথে নিয়ে গেলো। স্টেজে সবাই অপেক্ষা করছে। ঈশা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমেই বুঝতে পারলো ইভান সবাইকে ম্যানেজ করে তবেই উপরে গিয়েছে। ঈশার পিছনে পিছনে ঘর থেকে সবাই নিচে চলে এসেছে। ইভান ঈশাকে তার পাশে বসিয়ে দিলো।
অবশেষে সেই বিশেষ মুহূর্ত এলো। ঈশার কবুল বলার পালা। কিন্তু এতক্ষন হাসি খুশি থাকলেও এখন মনে হচ্ছে গলায় কথা আটকে যাচ্ছে তার। হাত পা কাঁপছে। কাজি সাহেব কয়েকবার করে বলেছে কবুল বলতে। কিন্তু ঈশার গলায় কোথায় যেন জটলা পেকে আছে। ঢোক গিলে জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে প্রস্তুতি নিলো কবুল বলার কিন্তু তবুও কেন জানি কথা বের হল না। আটকে থাকলো গলায়। ইভান ভ্রু কুচকে তাকাল ঈশার দিকে। চোখ বেয়ে অঝরে পানি পড়ছে। ঈশা আড় চোখে ইভানের দিকে তাকাল। ইভানের দৃষ্টি খুব শান্ত কিন্তু স্থির। ঈশা চোখ বন্ধ করে ফেলল। নিজের বুকে সাহস সঞ্চয় করে এক নিঃশ্বাসে বলল ‘আলহামদুলিল্লাহ কবুল’। সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর ইভান গড়গড় করে কবুল বলে দিলো। দুজনে সাইন করে নিলো কাবিন নামায়।
—————-
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেলো। বিয়ের যাবতীয় কাজ শেষ। এবার ইফতি আর মিরার আংটি পরানোর পালা। ইভানের মা ঈশার হাতে আংটির থালাটা দিয়ে মুচকি হেসে বলল
–এবার বড় ভাবির দায়িত্ব পালন করো।
ঈশা লাজুক ভঙ্গিতে হাসল। এগিয়ে গিয়ে ইফতি আর মিরাকে আংটি গুলো ধরিয়ে দিলো। ইফতি আর মিরা একে অপরকে আংটি পরানোর মধ্য দিয়ে শেষ হল অনুষ্ঠান। এখন প্রায় রাত হয়ে গেছে। সবাই সব কাজ শেষ করে বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে নিলো। বিদায়ের কথা ভেবেই ঈশার মা মুখে আচল চেপে কাঁদতে শুরু করলেন। নিঃসন্দেহে ইভান ভালো ছেলে। আবার মেয়ে কাছাকাছিই থাকছে। তবুও জন্ম থেকে বড় করে মেয়েকে অন্যের অধিনে ছেড়ে দেয়াটা একজন মায়ের কাছে কি সহজ কথা? নিজের কলিজা ছিঁড়ে আরেকজনকে দিয়ে দেয়ার মতো এই নিয়ম অসহনীয়। তবুও মানতেই হবে। ইভানের মা এগিয়ে এসে ঈশার বাবাকে বললেন
–এবার যেতে হবে। নাহলে দেরি হয়ে যাবে।
ঈশার বাবা এগিয়ে এসে ইভানের হাতে ঈশাকে তুলে দিলেন। কিন্তু তিনি কোন কথা বলতে পারলেন না। কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। এক মাত্র মেয়েটা আজ অন্যের বাড়ি চলে যাচ্ছে। তার কাধে দায়িত্ব পড়ে যাচ্ছে। এতক্ষনের নিরব কান্নাটা ঈশা আর সামলে রাখতে পারলো না। বাবার বুকে আছড়ে পড়ল। হুহু করে কেদে উঠলো। ঈশার এমন কান্না দেখে সবাই নিরবে চোখে পানি ফেলছে। ঈশাকে এভাবে কাঁদতে দেখে ইভানের খুব কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু তারই বা কি করার। কান্নাকাটির পালা শেষ করে ঈশাকে গাড়িতে তুলে দিলো সবাই। ইভান তার পাশে বসলো। ঈশা এখনো ফিকরে ফিকরে কাঁদছে। অনেকটা সময় কাদার ফলে শরীর ঝাকুনি দিয়ে হেচকি উঠছে। ইফতি ড্রাইভিং সিটে বসলো। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গাড়ি চলল তাদের গন্তব্যে। তাদের গাড়ির পিছনে পিছনে ঈশার বাবা মায়েরাও চলে এসেছে। ইভান কোন কথা বলছে না। ঈশার অবস্থা বোঝার চেষ্টা করছে। ঈশা জানালার কাচে মাথা ঠেকাল। ইভান একটু নড়েচড়ে বসে অভিমানি কণ্ঠে বলল
–আমি এখনো বেঁচে আছি। আর কাছেই আছি। এতো তাড়াতাড়ি আমাকে ভুলে গেলে হবে?
ইভানের কথার মানে ঈশা বুঝতে পেরে ইভানের ঘাড়ে মাথা রাখল। ইভান আলতো করে এক হাতে ঈশাকে জড়িয়ে ধরে বলল
–খারাপ লাগছে?
ঈশা কোন কথা বলল না। ইভান একটু বিরক্ত হয়ে বলল
–তোর আচরন দেখে মনে হচ্ছে আমি তোকে তুলে নিয়ে যাচ্ছি।
ঈশা বিরক্ত হল। এমনিতেই তার মন খারাপ তার উপরে মানুষটা এসব কথা বলছে। ইভান ঈশাকে চুপ করে থাকতে দেখে আবার বলল
–বিয়ে করার ইচ্ছা নেই আগে বললেই হতো।
ঈশা এবার খুব বিরক্ত হয়ে মাথা তুলে কঠিন দৃষ্টিতে তাকাল ইভানের দিকে। কঠিন ভাবে বলল
–কেন এরকম উলটা পাল্টা কথা বলছ?
ইভান ভ্রু কুচকে বলল
–আমি কোন উলটা পাল্টা কথা বলিনি। আর আমি সবটা দেখেছি। কবুল বলার সময় কি করেছিস সেটাও দেখেছি। বলতেই চাচ্ছিলি না। আর একটু হলে তো বলেই দিতিস আমি বিয়ে করবো না।
ঈশা এবার খুব রেগে গেলো। ইভানের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল
–তুমি এসবের কি বুঝবে? মেয়েরা অনেক ইমোশনাল হয়। ওই সময়টাতে কেমন লাগে তুমি কিভাবে বুঝবে?
ইভান এবার তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলল
–আচ্ছা? খুব ইমশন না? আমাকে ভালবাসার সময় কই থাকে এসব? তখন তো লজ্জায় মরে যাস।
ঈশা বিরক্ত হল ইভানের উপরে। ঘাড় ঘুরিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকলো। ইভান একটু হেসে তাকে দুই হাতে জড়িয়ে নিয়ে ঘাড়ে মুখ রেখে বলল
–সরি জান। দুষ্টুমি করছিলাম।
ঈশা হাসল। ইভান মুখটা ঘুরিয়ে বলল
–কেদে কেদে কি অবস্থা করেছসি বল তো? এভাবে কেউ কাদে। আমি কি তোকে সারাজীবনের জন্য আটকে রাখবো।
ঈশা ইভানের বুকে মাথা রাখল। ইভান তাকে জড়িয়ে নিয়ে বলল
–তুই কাদলে আমার খুব কষ্ট হয় জান।
ঈশা ইভান কে জড়িয়ে ধরে বলল
–সরি।
ইভান আরও শক্ত করে ঈশাকে জড়িয়ে ধরল।
—————–
গাড়ি বাড়ির সামনে এসে থামল। ইভান নেমে হাত বাড়িয়ে দিলো। ঈশা ইভানের হাত ধরে নেমে গেলো। বাড়ির সামনে সবাই দাড়িয়ে আছে নতুন বউকে বরন করে নিতে। সব রকম নিয়ম শেষ করে ঈশাকে ভিতরে নিয়ে গেলো। সোফায় কিছুক্ষন বসতে দিয়ে ইভানের মা এসে তার কাজিনদের উদ্দেশ্য করে বলল
–ওকে ঘরে নিয়ে যাও।
সবাই ঈশাকে ঘরে নিয়ে গেলো। ঘরে ঢুকেই ঈশা চারিদিকে ভালো করে দেখতে লাগলো। আসার পর ইভান হঠাৎ করেই কোথায় যেন হারিয়ে গেলো। হয়তো বন্ধুদের সাথে আছে। ইভানের কাজিনরা ঈশার সাথে নানা রকম গল্পে মেতে উঠেছে। কিন্তু ঈশার প্রচণ্ড ক্লান্ত লাগছে। বিছানায় হেলে বসে আছে। একটু পর ইভানের মা এসে ঈশাকে খাইয়ে দিলো। কিছুক্ষন বসে গল্প করলো তার সাথে। তারপর ঈশাকে রেস্ট নিতে বলে চলে গেলো। অনেকটা সময় কেটে গেলো ইভান এখনো আসছে না। ক্লান্ত ঈশা পিঠের পিছনে বালিশ দিয়ে তাতে হেলানি দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। অনেক সময় পর ইভান আসলো। ঈশাকে এতক্ষন অপেক্ষা করানর জন্য তার মধ্যে অপরাধ বোধ কাজ করছে। ধির পায়ে এগিয়ে এসে দেখল ঈশা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। ইভান নিজের কাপড় নিয়ে সোজা ওয়াশ রুমে চলে গেলো। ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে এসেও ঈশাকে ওভাবেই থাকতে দেখে তার সামনে বসে পড়ল। ভালো করে দেখে বুঝে গেলো ঘুমিয়ে পরেছে। একটু বিরক্ত হল সে। বিরক্তিকর শব্দ করে ঈশার গায়ের গয়না গুলো অতি সাবধানে খুলতে খুলতে বলল
–এই মেয়ে নাকি হবে ডক্টর! এখনো নিজের খেয়াল রাখতেই শেখেনি। এতো টায়ার্ড রাখছিল চেঞ্জ করে নিলে কি হতো। এসব পরে কি ঘুমানো যায়? আর শাড়ি পরে এমনিতেই ঘুমানোর অভ্যাস নাই। তার উপরে এতো ভারি শাড়ি!
খুব সাবধানে গয়না গুলা খুলে ফেলল। ওড়নাটাও খুলে নিলো। তারপর সাবধানে করে কোলে তুলে ঠিক করে শুয়ে দিলো। এসিটা অন করে গায়ে পাতলা কম্বল টেনে দিলো। ঈশা একটু আরাম পেতেই ভালো করে কম্বল জড়িয়ে নিয়ে ঘুমিয়ে গেলো। ইভান মুচকি হেসে ঈশার কপালে একটা চুমু দিলো। নিজের কিছু কাজ শেষ করে নিজেও শুয়ে পড়ল।
————–
সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে ইভান খেয়াল করলো ঈশা কোথাও নেই। উঠে বসলো। ভাল করে এদিক সেদিক তাকাল। ঈশা ঘরে কোথাও নেই।তার মেজাজ টাই খারাপ হয়ে গেলো। ঘুম থেকে উঠার পর ঈশার চেহারা দেখবে সেটাই আশা করেছিলো সে। কিন্তু সেটা আর হল কই? উঠে ওয়াশ রুমে গেলো। ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে দেখে ঈশা চায়ের কাপ হাতে দাড়িয়ে আছে। ইভান ঈশাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে দেখছে। ভেজা চুল থেকে টুপটুপ করে পানি পড়ছে। ইভান হাত থেকে চায়ের কাপটা নিয়ে নিলো। বিছানায় বসে পড়ল। ঈশা ঘুরে আবার চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। ইভান ঈশার দিকে তাকাল। চুলের পানিতে পিছনের কোমর পর্যন্ত ভিজে গেছে। মাথায় ওড়না টেনে দেয়া থাকলেও চুলের নিচের অংশটা বের হয়ে আছে। ইভান চায়ে চুমুক দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল
–এতো সকালে উঠে গোসল করার মতো কিছুই হয়নি। তবুও কি করার দরকার ছিল?
ঈশা থেমে গেলো। তীক্ষ্ণ চোখে ইভানের দিকে তাকাল। ইভান নিজের হাসিটা চেপে রেখে গম্ভীর ভাব এনে বলল
–ঘরে এক রকম আর বাইরে আরেক রকম! সবার কাছে ভালো বউ হওয়ার প্রচেষ্টা আর ঘরে বরের কোন খেয়াল নেই। বরের সব ইচ্ছাতে এক বালতি পানি ঢেলে ঘুমিয়ে রাত পার করে এখন আদর্শ বউ হওয়ার অভিনয়ে ব্যস্ত।
ঈশার দৃষ্টি আরও তীক্ষ্ণ হল। ইভান নিজের মতো চায়ে চুমুক দিয়ে যাচ্ছে। এমন সময় দরজায় নক করতেই ঈশা শান্ত কণ্ঠে বলল
–খোলা আছে।
মিরা দৌড়ে এসে ঈশাকে জড়িয়ে ধরল। ঈশা হেসে মিরাকে জড়িয়ে ধরে বলল
–কখন এসেছ?
–একটু আগেই। তোমাদেরকে খুব মিস করছিলাম। তাই চলে এলাম।
ঈশা একটু দুষ্টুমির সুরে বলল
–আমাদেরকে মিস করছিলে?
মিরা তার কথার মানে বুঝতে পেরে লজ্জা পেলো। পরিস্থিতি সামলাতে ইভানের দিকে তাকিয়ে বলল
–ভাইয়া তুমি তো আমাদেরকে ভুলেই গেছো।
ইভান ভ্রু কুচকে বলল
–ভোলার মতো কিছু হলে না ভুলতাম। সেরকম তো কিছুই হল না। আর আমি ভুলতে না চাইলেও তোরা জোর করে ভুলিয়ে দিচ্ছিস।
ঈশা মিরা দুজনই ভ্রু কুচকে তাকাল। মিরা কথার মানে বুঝতে না পারলেও ঈশা ঠিকই বুঝতে পারলো। কিন্তু কোন উত্তর না দিয়ে মিরার সাথে বের হতে যাবে তখনই ইভান শান্ত কণ্ঠে ডাকল
–ঈশা।
ঈশা থেমে গেলো। মিরা একটু হেসে বাইরে চলে গেলো। ইভান উঠে এসে সামনে দাঁড়ালো। হাত বাড়িয়ে মাথার ওড়না ফেলে দিলো। আরও একটু কাছে এসে দাঁড়ালো। ইভানের ঠোট ঈশার কপাল ছুঁইছুঁই। ঈশা জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে চোখ নামিয়ে নিলো। ইভান মাথায় তোয়ালে টা ঘোমটার মতো রেখে বলল
–চুলটা ভালো করে মুছে নিস। ঠাণ্ডা লেগে যাবে।
বলেই ঠোট চেপে হেসে বের হয়ে গেলো। কিন্তু সেই হাসি ঈশার চোখে পড়ল না। ঈশা তীক্ষ্ণ চোখে তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকলো।
চলবে………