তোমার নিরব অভিমানীনি পর্ব-১৪+১৫

0
584

#তোমার_নিরব_অভিমানীনি(১৪)
#Israt_Bintey_Ishaque(লেখিকা)
(কার্টেসি ছাড়া কপি নিষিদ্ধ)

স্যার ফাইলটি সাইন করেছেন?
স্যার শুনতে পাচ্ছেন?
স্যার আপনার কি শরীর খারাপ করছে?

অফিসের একজন এমপ্লয়ে জিসান আহমেদ সাহেব একটা ফাইল চেক করে সাইন করে দেওয়ার জন্য দিয়েছেন রাদ শাহমাত কে। অথচ রাদ শাহমাত এক দৃষ্টিতে ফাইলের দিকে তাকিয়ে আছে। নড়াচড়া নেই কিছু নেই। এরকম অবস্থা দেখে বিচলিত হয়ে জিজ্ঞাসা করে জিসান আহমেদ সাহেব।
রাদ শাহমাত শুকনো কাশি দিয়ে বলল,
—” না কিছু হয়নি আপনি বিচলিত হবেন না।
তারপর রাদ শাহমাত সাইন করে ফাইল দিয়ে দিলে জিসান আহমেদ সাহেব চলে যান।
রাদ তার নরম চেয়ারে মাথা হেলিয়ে রাখে। গতকাল রাতের নজরাত এর মুখশ্রী বার বার তার মানসপটে ভেসে ওঠে। অফিসে মন বসে না তার।
_______
সন্ধ্যা বেলা রাদ শাহমাত অফিস থেকে ফিরেই নজরাত কে রুমে ডেকে পাঠালো।
নজরাত ইউটিউব ভিডিও দেখে সন্ধ্যার নাস্তা তৈরি করছিল। পাশে মণি তাকে সাহায্য করছে। তখন রাহা এসে বলল,
—” ভাবীমণি তোমাকে ভাইয়া জরুরি ভিত্তিতে তলব করেছে। তুমি তারাতাড়ি গিয়ে তাকে শান্ত কর হা হা হা।
নজরাত ভিডিও দেখতে দেখতে বলল,
—” মজা করছো না?
—” মোটেও না সত্যি বলছি আমি তুমি গিয়ে দেখে আসো গিয়ে।
নজরাত ফোনের ভিডিওটি অফ রেখে বলল,
—” কাউকে হাসাবার উদেশ্যেও কৌতুক করে মিথ্যা বলা বৈধ নয়। মহানবী (সঃ) বলেছেন, “সর্বনাশ সেই ব্যক্তির, যে লোককে হাসাবার উদেশ্যে মিথ্যা বলে। তাঁর জন্য সর্বনাশ, তাঁর জন্য সর্বনাশ।[১]

(সহিহুল জ’মে ৭০১৩ নং)

রাহা মন খারাপ করে বলল,
—” তুমি আমাকে বিশ্বাস ই করছো না। আমি সত্যি বলছি ভাইয়া তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছে।
রাহা এবার বিশ্বাস করলো। ফোন রেখে বলল,
—” আমাকে কেন ডাকবেন তিনি? কখনো তো এভাবে ডাকেন নি।
—” এখন থেকে ডাকবে বুঝছো? এবার যাও।
নজরাত যেতে নিলে রাহা বলল,
—” ধন্যবাদ ভাবীমণি, এভাবে হাদীসের আলোকে ব্যাখ্যা দিয়ে বলার জন্য। আমি আমার বন্ধুদের সাথেও কখনো দুষ্টুমি করে মিথ্যা বলবো না ইনশা আল্লাহ।
নজরাত ক্ষীণ একটু হেসে উপরের দিকে গেল।

রাদ শাহমাত দুই হাতে মুখশ্রী চেপে ধরে সোফায় বসে আছে। চুল গুলো এলোমেলো হয়ে আছে। গায়ে পরিহিত ব্লেজার টা বিছানায় ছুড়ে ফেলে রেখেছে। এতো শীতের মাঝেও যেন তার শীত অনুভব হচ্ছে না।
নজরাত আসতে উঠে দাঁড়ায় সে। শুকনো ঠোঁট জিভ দিয়ে ভিজিয়ে বলল,
—” আমি পাপী! ভীষণ পাপী। সবকিছু জেনেও কেন পরে আছেন এখানে? চলে যান এখান থেকে। নিজের মতো করে বাঁচুন। প্লিজ আমাকে মুক্তি দিন প্লিজ?
নজরাত আজকে নিজেকে সংযত করতে পারল না। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে তার। রাদ শাহমাত এর সার্ট এর কলার চেপে ধরে তেজী চোখে চেয়ে বলল,
—” এখন কি পর নারীতে আসক্ত হয়ে আছেন? আমি চলে গেলে আপনার পথ ক্লিয়ার হবে বুঝি? জীবনের সবচেয়ে বড় পাপ করেছি আপনাকে বিয়ে করে! আপনি একটা লম্পট! চরিত্রহীন!
চোখমুখ রা’গে অপমানে অস্বাভাবিক জ্বলজ্বল করছে নজরাত এর। রাদ শাহমাত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আজকে প্রথম নজরাত কে এমন রুপে দেখছে সে। শান্ত শিষ্ট মেয়েটা ভীষণ ক্ষেপে গেছে তাকে দমানো খুব কঠিন কাজ। নজরাত আর দাঁড়াল না। ছাদে গিয়ে কিছুক্ষণ তার উত্তপ্ত মাথাটিকে ঠান্ডা করল। তারপর স্থির মাথায় ভাবতে বসল।
কিছুক্ষণ শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে কিছু ভাবলো। তারপর রুমে ফিরে এসে রাদ শাহমাত কে কোথাও দেখতে না পেয়ে। সাজেদা চৌধুরীর কাছে যাওয়া ধরল। এই একটা মানুষ যখন স্নেহের স্বরে কিছু বলে তখন নজরাত একদম শান্ত হয়ে যায়। নতুন করে তার পরিকল্পনা মাফিক এগিয়ে যায়।
—” মা কি করছেন?
সাজেদা চৌধুরী বেলকনিতে দাঁড়িয়ে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। নজরাত এগিয়ে গিয়ে বলল,
—” মা এই ঠান্ডার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন যে?
—” মনটা বিষন্নতায় ছেয়ে আছে ব‌উমা তাই বাহিরের ঠান্ডা গায়ে লাগছে না।
—” কেন মা? আমাকে বলুন আপনার মন খারাপ কেন?
—” তোমার জন্য আমার খারাপ লাগে ব‌উমা। আমি যে পাপ করেছি আমার ছেলের সাথে বিয়ে…
নজরাত সাজেদা চৌধুরী কে মাঝ পথে থামিয়ে দিয়ে বলল,
—” মা প্লিজ। এভাবে বলবেন না। আমাকে আর কটা দিন সময় দিন। তাছাড়া এসব চিন্তা না করে। রাহার কথা ভাবুন। বিয়ের দিন তো ঘনিয়ে আসছে। কিভাবে কি করতে হবে তা তো পরিকল্পনা করে ঠিক করতে হবে তো নাকি?
—” তুমি যেখানে আছো সেখানে আমার চিন্তা কিসের? আমি নিশ্চিত মনে আছি তুমি আছো বলে।
নজরাত ক্ষীণ একটু হাসে।
_____

রাদ শাহমাত লাইব্রেরী কক্ষে রাখা ডিবানে শুয়ে আছে। নজরাত তার খাতা পত্র রাখা গোল টেবিলে বসে কিছুক্ষণ কি সব লিখল। তারপর রাদ শাহমাত এর দিকে নির্নিশেষ চোখে চেয়ে বলল,
—” আপনি কি রুপকথা কে বিয়ে করছেন?
রাদ শাহমাত কপাল থেকে হাতটা নামিয়ে তাকায় নজরাত এর দিকে। তারপর শূন্য দৃষ্টিতে উপরের দিকে তাকিয়ে বলল,
—” না। ও একটা ফেইক। আমি কখনো ওর ছায়া ও সহ্য করতে পারবো না। আমাকে ঠকিয়েছে ওই মেয়ে।
—” আমি সবটা শুনেছি। যা বুঝলাম আপনি কখনো কোন মানুষ কে ভালোবাসেন নি। ভালোবেসেছেন শুধু সাহিত্য কে।
রাদ শাহমাত উঠে বসে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নজরাত এর দিকে। নজরাত আবারো বলে,
—” যেদিন কোন মানুষ কে ভালোবাসতে পারবেন সেদিন ই তাকে নিজের করে পাবেন। তা না হলে নয়।
—” আমি আর কাউকে ভালোবাসতে পারবো না। সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে!
—” যেমন?
রাদ শাহমাত বিরস মুখে বলে,
—” যাকে আমার স্বপ্নের রানী ভেবেছিলাম সেই আসলে ফেইক। যাকে ভালোবেসে এতো দূর সেই বিবাহিত। এই সব কিছুর মাঝে ঘরে স্ত্রী রেখে মরীচিকার পেছনে দৌড়ে বেরিয়েছি। পাপ করেছি যার কঠিন শাস্তি পেতে হবে আমাকে। এতো কিছুর পরেও কোন মুখে কাউকে ভালোবাসবো আমি?

নজরাত গভীর দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে স্নেহভরে বলল,
—” ফিরে আসুন আল্লাহর পথে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। নিয়মিত সালাত আদায় করুন তাহলে অন্তর কুলসিত হবে না ইনশা আল্লাহ।
—” আমার এতো গুলো পাপ কি ক্ষমা করবেন আল্লাহ তা’আলা? আমি যে আমার মায়ের সাথেও বেয়াদবি করেছি যার কোন মাফ হয় না। তাই বলছি আপনি নতুন করে জীবন শুরু করুন। আপনি ভালো কাউকে ডিজার্ভ করেন।
—” আপনি একটা কাপুরুষ!
—” হুম জানি।
—” এভাবে চললে হয় না। আমি আপনি একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। তাই বলছি,
আল্লাহর কাছে একনিষ্ঠ চিত্তে ক্ষমা প্রার্থনা করলে তিনি ক্ষমা করে দেবেন। কেননা আল্লাহপাক কোরআনের শতাধিক আয়াতে নিজেকে ক্ষমাশীল বলে ঘোষণা করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমার বান্দাদের জানিয়ে দাও যে নিশ্চয়ই আমি অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও অপরিসীম দয়ালু।[১]

অন্য আয়াতে তিনি বলেন, ‘এর পরেও কি তারা আল্লাহর দিকে ফিরে আসবে না (অর্থাৎ তাওবা করবে না) এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে না? অথচ আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াবান।[২]

বান্দার প্রতি আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ অসীম। আল্লাহ বলেন, ‘বলো, হে আমার বান্দারা! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছ, আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ সমুদয় পাপ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।[৩]

ক্ষমা লাভের উপায় : কোরআন ও হাদিসে আল্লাহর ক্ষমা লাভ করার অনেক উপায় বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্যে কয়েকটি উপায় এখানে উল্লেখ করা হলো—

ঈমান ও নেক কাজ : যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে ও নেক আমল করবে, আল্লাহ তাদের ক্ষমার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘যারা ঈমান আনে ও সত্কর্ম করে, আল্লাহ তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ক্ষমা ও মহাপুরস্কারের।[৪]

—” আপনি কি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছেন?
রাদ শাহমাত এর এহেন জিজ্ঞাসাবাদে নজরাত এর খুব হাসি পাচ্ছে। বিয়ের এতো গুলো মাস পর তার স্বামী নামক মানুষটি জিজ্ঞাসা করছে সে মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছে কিনা? খুবই হাস্যকর ব্যাপার….
_______
রেফারেন্স:
[১](সুরা হিজর, আয়াত : ৪৯)
[২](সুরা মায়েদা, আয়াত : ৭৪)
[৩](সুরা জুমার, আয়াত : ৫৩)
[৪](সুরা ফাতহ, আয়াত : ২৯; সুরা মায়েদা, আয়াত : ৯)
______

#চলবে… ইনশা আল্লাহ।

#তোমার_নিরব_অভিমানীনি(১৫)
#Israt_Bintey_Ishaque(লেখিকা)
(কার্টেসি ছাড়া কপি নিষিদ্ধ)

আমরা মুসলিম তাই মাদ্রাসায় পড়াশোনা করি কিংবা জেনারেল লাইনে পড়াশোনা করি না কেন আমাদের ইসলামীক জ্ঞান অর্জন করা আবশ্যক। এবং ইসলামের বিধান অনুযায়ী জীবন যাপন করা আবশ্যক। তাই এই প্রশ্ন অহেতুক বলে আমার মনে হয়।

রাদ শাহমাত অনিমেষ চাহনিতে চেয়ে রইল নজরাত এর দিকে। এই মুখশ্রীর দিকে তাকালে চোখ জুড়িয়ে যায় অথচ সে কিনা ভুল করেও মেয়েটার দিকে তাকাতো না।
নজরাত এর দৃষ্টি নত তবুও উপলব্ধি করতে পারছে রাদ শাহমাত তার দিকেই তাকিয়ে আছে। এতে খানিকটা অস্বস্তি বোধ হচ্ছে নজরাত এর তবুও কিছু বলছে না সে। উঠে গিয়ে বুক সেলফ থেকে সাতকাহন ব‌ইটা নিল।
বিভিন্ন ঝামেলার কারণে এখনো অবধি ব‌ইটা পড়ে শেষ করতে পারেনি নজরাত। ঠিক করল আজকে শেষ করবেই।
নজরাত ব‌ইয়ে মনোযোগ দিলে, দুজনের মাঝে নিরবতা বিরাজ করে। রাদ শাহমাত পূর্বের ন্যায় বসে থাকে ডিবানে। মাঝে মাঝে খেয়াল করে নজরাত মুচকি মুচকি হাসছে। নিশ্চয়ই গল্পের কোনো কাহিনী নিয়ে হাসছে।
যা দেখতে মন্দ লাগছে না তার। ইচ্ছে করছে এমনি করে দেখে জীবন পার করতে। কি অদ্ভুত ইচ্ছে!

পঁয়ত্রিশ মিনিটের মত পেরিয়ে গেল। কাছের একটা মসজিদ থেকে আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে মুখরিত হতেই নজরাত মাথায় কাপড় দিল। এশার নামায এর আযান হচ্ছে।
নজরাত ব‌ই বন্ধ করে আযান এর ধ্বনিতে মনোযোগী হল। সবটাই অবলোকন করে চলেছে রাদ শাহমাত। আযান শেষে রাদ শাহমাত বলল,
—” খেয়াল করলাম আযানের সময় আপনি ঠোঁট নেড়ে কিছু বলছেন।
—” হুম। আযানের জবাব দিচ্ছিলাম।
—” জবাব! মানে?
নজরাত টেবিলে হাত ভর করে রেখে তার উপর থুতনি ঠেকিয়ে বলল,
—” প্রশ্ন, আযানের জবাব কিভাবে দিতে হয়?
উত্তর: মুয়াজ্জিন আযানে যা যা বলবে তাই বলতে হবে, শুধুমাত্র হাইয়্যা আলাস সালাহ ও হাইয়্যা আলাল ফালাহ বললে জবাবে সেটা না বলে বলতে হবে ” লা হাউলা ওয়ালা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ।”
অর্থ:- আল্লাহর প্রেরণা দান ছাড়া পাপ থেকে ফিরার এবং সৎকাজ করার শক্তি নেই।

এটা হচ্ছে আযানের জবাব দেওয়ার পদ্ধতি।

প্রশ্ন: আযানের জবাব দিলে কি প্রতিদান পাওয়া যাবে?
উত্তর: রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, “যে ব্যক্তি খালেস অন্তরে আযানের জবাব দেয়, তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়। [১]
সুবহান আল্লাহ! জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়।
মাত্র ২ /৩ মিনিটে এতো সহজে করা যায় এমন একটা আমল হেলাফেলা করে বাদ দেওয়া ঠিক হবে না। আর এর জন্য তো আলাদা করে কোনো দোয়া মুখস্থ করতে হচ্ছে না। শুধু মুয়াজ্জিনের সাথে সাথে অন্তরে বিশ্বাস ও খেয়াল রেখে কথাগুলো বলা।
★ আযানের জবাব দেওয়ার পরে যে একবার দরুদে ইব্রাহিম ও এর পরে আযানের যেই সূরা আছে তা পাঠ করে তার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শাফায়াত করা জরুরি হয়ে পড়ে।

রাদ শাহমাত সবটা মনোযোগ দিয়ে শুনে। তারপর চলে যায় কক্ষ ছেড়ে। নজরাত ব‌ই গুছিয়ে রেখে নিজের রুমের দিকে এগুলে রাহার সাথে দেখা হয়। রাহা চোখে দুষ্টু হেসে বলল,
—” দু’জনে কি করছিলে হুম? নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে ভাব হয়ে গেছে?
—” সে আশায় বালি। তোমার নিরামিষ মার্কা ভাই এতো সহজে পটবে না বুঝলে? এর জন্য অনেক ব্যাগ পেতে হবে আমাকে।
নজরাত এর কথায় রাহা করুন দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। নজরাত ফিচেল হেসে বলল,
—” মন খারাপ করো না। নামায পড়েছো?
—” উঁহু না।
—” চলো একসাথে পড়বো?
নজরাত খুশী হয়ে বলল,
—” আচ্ছা চলো।

রাদ শাহমাত মসজিদে গিয়েছে নামায পড়তে। এ কথা কেউ জানে না। সাজেদা চৌধুরী জানতে পারলে হয়তো খুশীতে কেঁদে দিতেন।
নজরাত এর কথা গুলো শুনে রাদ শাহমাত এর কিছুটা হলেও পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। ঠিক করেছে আজকের এশার নামায দিয়েই শুরু করবে নতুন করে। যতদিন বেঁচে থাকবে ততদিন রাব্বে কারিমের ইবাদত পালন করার চেষ্টা করবে ইনশা আল্লাহ। এই মিছে দুনিয়ার মোহে আকৃষ্ট হয়ে কতোই না পাপ করেছে। তবে নজরাত এর কথায় ভরসা পেয়েছে সে। নজরাত কোরআন এর আয়াতের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছিল,
আল্লাহ বলেন, ‘যে কেউ দুষ্কর্ম করে অথবা স্বীয় জীবনের প্রতি অবিচার করে, অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থী হয়, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল ও দয়ালু পাবে। [২]

নামায পড়ে ফাঁকা রাস্তায় উদ্দেশ্যহীন ভাবে হেঁটে চলে রাদ। গন্তব্য তার অজানা। আজকাল পা’প গুলো কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে তাকে। শীতের প্রকোপে চারিদিকে অন্ধকার শুধু তার অবস্থানে রাস্তার নিয়ন আলোয় মৃদু আলোকিত। হাঁটতে হাঁটতে অনেক খানি চলে এসেছে। আর সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি পাচ্ছে না। শীতের তান্ডবে শরীর ঠান্ডা বরফের মতো জমে গেছে। পা দুটো অবশ হয়ে আসছে।

গভীর রাতে বাসায় ফিরলে দরজা খুলে দিল নজরাত। রাদ শাহমাত বাসায় ফিরছে না বলে ড্রয়িং রুমে সোফায় বসে বসে ব‌ই পড়ছিল সে। তাই রাদ শাহমাত কে বেশিক্ষণ দরজার বাহিরে অপেক্ষা করতে হলো না।

রাদ শাহমাত এর শরীর শীতে কাঁপছিল। নজরাত লক্ষ্য করে কোমল স্বরে বলল,
—” এই শীতের মধ্যে বাহিরে কি করছিলেন? নিশ্চয়ই এখন শরীর খারাপ করছে? আপনি তাড়াতাড়ি রুমে যান। আমি কফি বানিয়ে এক্ষুনি আসছি।
প্রতিউত্তরে রাদ শাহমাত কিছু বলল না, কোন রকম শরীর টাকে বয়ে নিয়ে গেল রুম পর্যন্ত। তারপর কম্বল গায়ে জড়িয়ে শুয়ে পড়লো। কিছুক্ষণের মধ্যে নজরাত কফি হাতে রুমে এসে রাদ শাহমাত কে ডেকে তুলে। এই মুহূর্তে গরম কফির ভীষণ প্রয়োজন ছিল তার। কফি খাওয়ার পর নজরাত বিষন্ন গলায় বলল,
—” এখন কেমন বোধ হচ্ছে? আগের থেকে বেটার লাগছে?
রাদ শাহমাত খানিকটা উদাস হয়ে ভাবলো,
—” এই মেয়েটা কি সত্যি মানুষ? নাকি মানুষ রুপি জীন, পরী!
নানা রকম অদ্ভুতুড়ে, উল্টো পাল্টা চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খায় রাদ শাহমাত এর।
_______
দেখতে দেখতে রাহা আর রূপক এর বিয়ের দিন ঘনিয়ে এলো। এ পর্যন্ত একটা কথাও রূপক রাহা’র সাথে বলেনি। রাহা বুঝতে পারে রূপক পূর্বের ঘটনা গুলো নিয়ে রে’গে আছে এখনো। রাহা ঠিক করে বিয়ের পর রূপক এর অভিমান ঠিক ভাঙ্গিয়ে নিবে।

দুই পরিবারে বিয়ের তোরজোর চলছে। ঘর সাজানো থেকে শুরু করে শপিং করা সব কিছু। নজরাত কোন দিক সামলাবে ভেবে পায় না। এদিকে এ বাড়ির বউ অন্য দিকে বাবার বাসায় মেয়ে বলতে কেউ নেই। রাদ শাহমাত ব্যাপারটা বুঝতে পেরে চাপা জরুরি গলায় বলল,
—” আমি এই দিকে সামলে নিব। আপনি বরং ও বাড়ি চলে যান। আপনার বাসায় তো তেমন কেউ নেই। তাদের এই মুহূর্তে আপনাকে খুব প্রয়োজন।
নজরাত এর স্বপ্নাচ্ছন্নের মতো লাগলো। স্নিগ্ধ ও গভীর এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রাদ শাহমাত এর দিকে। তার এমন গাড় দৃষ্টিতে বেসামাল বেচারা রাদ শাহমাত। এই মুহূর্তে একটু দুষ্টুমি করতে ইচ্ছা হলো তার। তাই
শুকনো কাশি দিয়ে বলল,
—” বড় বড় চোখ দুটো দিয়ে যেভাবে তাকিয়ে আছেন মনে হয় যেন ভয় দেখানোর ফন্দি আঁটছেন!
রাদ শাহমাত এর এহেন মন্তব্যে নজরাত এবার তার ঘন কালো পল্লব গুলো বার কয়েক ঝাপটায়। নেত্রজোড়া ছোট ছোট করে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। এদিকে রাদ শাহমাত তার স্ত্রীর একেক বার একেক রকম রুপ দেখে বিমোহিত হয়ে, মুগ্ধ নয়নে, অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
______
নজরাত শ্বাশুড়ি মায়ের থেকে অনুমতি নিয়ে বাবার বাসায় চলে আসে। নজরাত কে দেখতে পেয়ে সাজ্জাদ হোসেন ভীষণ আনন্দিত হলেন। বাড়িতে বিয়ে অথচ কারো কোন আনন্দ উচ্ছ্বাস নেই। এমন হলে তো বিয়ে বলে মনে হয় না। এখন মেয়ে এসে গেছে, পুরো বাড়িটা আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠবে। নজরাত এসেই বাবার থেকে সব কিছু জেনে নিচ্ছে কি কি কাজ সারা হয়েছে ইতিমধ্যে। আর কি কি বাকি আছে। তারপর ভাইয়া কে সারপ্রাইজ দিতে তার রুমে গিয়ে চিৎকার করে উঠল। সকাল সকাল এমন অপ্রত্যাশিত ঘটনায় চমকে লাফিয়ে উঠে রূপক। অসহায় দৃষ্টিতে বোনের দিকে তাকিয়ে থাকে। সেই ছোট্ট বেলার মতো বোনটা তার আরামের ঘুম খানা ভেঙ্গে দিল….
______
রেফারেন্স:-
[১] (সহিহ মুসলিম,হাদিস ৩৮৫)
[২] (সুরা নিসা, আয়াত : ১১০)
______
#চলবে… ইনশা আল্লাহ।

(আসসালামু আলাইকুম।
রি-চেক করা হয় না, তাই ভুল গুলো মার্জিত ভাষায় ধরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ রইল।)