তোমার নিরব অভিমানীনি পর্ব-১৮+১৯

0
481

#তোমার_নিরব_অভিমানীনি(১৮)
#Israt_Bintey_Ishaque(লেখিকা)
(কার্টেসি ছাড়া কপি নিষিদ্ধ)

রূপক কিছুক্ষণ এক্সারসাইজ করে সবে মাত্র বসেছে গার্ডেনের বেঞ্চে। তখন রাহা কফি হাতে এদিকে আসে। রূপক এর দিকে কফি বারিয়ে দিয়ে বলল,
—” আপনার কফি।
—” উঁহু! আপনার নয় বলো তোমার!
রাহা খানিকটা থতমত খেয়ে গেল। উসখুস করে বলল,
—” ত.. তোমার কফি।
—” উঁহু আমার না তোমার!
এমন হেঁয়ালি কথা বুঝতে পারলো না রাহা। প্রশ্নাত্তুক চোখে চেয়ে রইল। তখন একজন কাজের লোক কফি নিয়ে এসে বললেন,
—” রূপ বাবা তোমার কফি।
রূপক সৌজন্য হেসে কফি হাতে নিল। যা দেখে রাহার আশ্চার্যের শেষ নেই। যদি তার বানানো কফি নাই বা নিবে তবে কেন তাকে দিয়ে কফি বানালো? লোকটা চলে যেতে রূপক তার পাশে বসতে বলল রাহা কে। রাহা বাধ্য মেয়ের মত বসলো। তারপর রূপক বলল,
—” ওটা তুমি খাও।
রাহা একটু গম্ভীর মুখে বলল,
—” আমি কিছুক্ষণ আগেই কফি খেয়েছি।
—” আমাকে রেখে খেয়েছো বিদায় এখন আবার খাবে। নাও শুরু কর?

রাহা খানিকটা বিরক্ত হল। যা তার মুখ চোখে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। রূপক তা দেখে আড়ালে ঠোঁট কামড়ে হাসে। রাহার চোখে চোখ রেখে ইশারা করে কফি খাওয়ার জন্য। সাথে নিজেও কফির মগে চুমুক দেয়।
অগত্যা রাহাকে আবার কফির মগে চুমুক দিতেই হলো। এক চুমুক দিয়ে বসে রইল চুপটি করে। এদিকে রূপক এর কফি প্রায় শেষের দিকে। রাহা কে বসে থাকতে দেখে বলল,
—” কি হলো? খাচ্ছ না কেন? দেখ অপচয় আমি একদম পছন্দ করি না।
রাহা অবুঝের মতো নাক, চোখ বিকৃত করে বলল,
—” বিষাদ! মুখে দেওয়া যাচ্ছে না।
রূপক একটু মজা পাওয়ার হাঁসি হেঁসে বলল,
—” কেন বলোতো? কফিটা তো তুমি ই বানিয়েছো তাই না? বাই এনি চান্স তুমি কি কফি বানাতে পারো না নাকি আমার জন্য ইচ্ছে করে…
রাহা ব্যতিব্যস্থ হয়ে বলল,
—” না না ওরকম কিছু না। আমি আসলে কোন দিন বানায়নি তো তাই তেতো হয়ে গেছে।
রূপক মাথা দুলিয়ে বাঁকা হেসে বলল,
—” এবার বুঝলে তোমার বানানো কফি কেন আমি খায়নি?
রাহা মাথা নিচু করে বসে রইল চুপটি করে। মেয়ে হয়ে এই সামান্য কাজ পারে না সত্যি সে লজ্জিত, ভীষণ লজ্জিত।
রূপক হাত ঘড়ি দেখে বলল,
—” নাস্তা তৈরি হয়েছে কিনা দেখ গিয়ে! আমি নাস্তা করে বের হব।
রাহা জ্বি, আচ্ছা বলে চলে যেতে নিলে রূপক অস্ফুট গলায় বলল,
—” তিনি আমো!
রাহা থেমে বলল,
—” মানে?
—” না কিছু না যাও।
রাহা মাথা নেড়ে চলে যায় ঘরে।
________
রাদ শাহমাত আলতো করে অধরযুগল ছুঁয়ে দেয় নজরাত এর কপালে। নজরাত মুচকি হেসে আরো আড়ষ্ট ভাবে দাঁড়ায়। তার মাথায় ঘন চুল, তবে কোঁকড়ানো বলে চুল খুব বড় হয়নি। কোমড় অবধি মেঘের মতো ছড়িয়ে আছে যা থেকে টুপ টুপ করে পানি ঝরে পড়ছে।
রাদ শাহমাত দুষ্টু হেসে বলল,
—” আমাকে কি সারাজীবন বাসায় বসিয়ে রাখার পরিকল্পনা করছেন নাকি? না মানে এমনি করে যদি অফিসের লেইট হয়ে যায় তবে কি আমাকে অফিসে রাখবে? একদম ছাঁটাই করে দিবে। তখন তো বাসায় থেকে সারাক্ষণ আপনার আঁচল ধরে ঘুরে বেড়াবো।

রাদ শাহমাত এর এহেন মন্তব্যে নজরাত এর লজ্জায় রক্তিম মুখশ্রী হয়ে উঠে। রাদ শাহমাত কে ছেড়ে খানিকটা দূরে সরে বলল,
—” যান।
—” তোমার মুখে জান শুনতে কিন্তু সেই লাগে!
নজরাত তৎক্ষণাৎ মাথা তুলে বলল,
—” আমি যেতে বলেছি, অন্য কিছু নয়।
রাদ শাহমাত হেঁসে নজরাত কে একবার হাগ করে বিদায় নিয়ে চলে গেল।
নজরাত আবারো বেলকনির গ্রিল দিয়ে তার যাওয়া দেখলো।

বিকাল বেলা রাদ শাহমাত কল করে নজরাত কে বলল সে যেন তৈরি হয়ে থাকে। রাদ শাহমাত গাড়ি পাঠাবে তাকে নিয়ে যেতে। নজরাত ঠিক আছে বলে শ্বাশুড়ি মায়ের কাছে গেল। তাঁকেও তৈরি হতে বলে নিজে তৈরি হয়ে নিল।

ব‌উমার এক কথায় তৈরি হয়ে নিল সাজেদা চৌধুরী। নজরাত এর উপর পূর্ণ আস্থা আছে তার। তবে গাড়িতে বসে জিজ্ঞাসা করল,
—” আমরা কোথায় যাচ্ছি ব‌উমা?
নজরাত হেসে বলে আমি নিজেও জানি না মা। তবে আপনার খুব ভালো লাগবে।

গাড়িটা এসে থামে রাদ শাহমাত এর অফিসের সামনে। এর দু-মিনিটের মাথায় রাদ শাহমাত গাড়িতে উঠবে তখন মাকে দেখতে পেয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। খুক খুক কেশে নজরাত এর দিকে চেয়ে ক্ষীণ একটু হেসে বলল,
—” আমি সামনে বসছি।
তারপর দরজাটা পুনরায় বন্ধ করে সামনে ড্রাইভারের সাথে গিয়ে বসে। সাজেদা চৌধুরী ছেলে কে দেখে অনেকখানি অবাক হল। বুঝতে পারলো না কি হচ্ছে? কি হতে চলেছে।
নজরাত বাহিরে চেয়ে থেকে রাদ শাহমাত এর কথা মনে করে হাসে। তখন ফোনের মেসেজ টোন বেজে ওঠে। নজরাত ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখল রাদ শাহমাত এর মেসেজ। সে লিখেছে, মাকে নিয়ে আসবে বললে না কেন? নজরাত হেসে রিপ্লাই করে, আমি চেয়েছি মা ও আমার সাথে কিছু সুন্দর মুহূর্ত উপভোগ করুন।
রাদ আবারো মেসেজ দিল, তো ম্যাডাম আপনি কি করে জানেন যে আপনি সুন্দর কিছু মুহূর্ত উপভোগ করতে চলেছেন?
নজরাত তখন বলে, এগুলো নিয়ে লিখতে লিখতে বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা হয়ে গেছে!
“লিখতে লিখতে! মানে”?

নজরাত ভরকালো, দমে যাওয়া হাতে টাইপ করতে পারলো না। ফোন রেখে দিল। রাদ শাহমাত অপেক্ষা করেও আর রিপ্লাই পেল না। দেখতে দেখতে তারা একটা বিশাল বড় রেস্তরাঁর সামনে এসে পৌঁছায়। রাদ শাহমাত নিজে নেমে এসে দরজা খুলে মাকে আর নজরাত কে নামতে সাহায্য করে। তারপর তারা রেস্তোরাঁয় ঢুকে। রাদ শাহমাত আলাদা করে স্পেশাল কেবিন বুকিং করে রেখেছে। সেখানে তাদের নিয়ে গিয়ে বসায়। সাজেদা চৌধুরী এখনো একটা ঘোরের মধ্যে আছেন যেন। পাঁচ ছয় মাসে ছেলেকে এতোটা প্রাণজ্জ্বল দেখেনি তাই। তা-ও আবার নজরাত কে সাথে নিয়ে ডিনারের আয়োজন? আশ্চর্য হলেও তিনি ভীষণ খুশি।
______
ফেব্রুয়ারি মাস শেষ হয় মার্চ মাস চলমান। এখন শীতের প্রকোপ অনেকটাই কমে এসেছে। তবে বাহিরে বের হলে শীত অনুভব হয়। নদীর পানি থেকে হালকা বাতাস বইছে।
বন্ধুদের সাথে নদীর তীরে বসে আড্ডা দিচ্ছে রূপক। প্রত্যেকের হাতে হাতে কফি। হালকা শীতের মাঝে বেশ আরাম পাচ্ছে কফিতে চুমুক দিতে। রূপক এর একজন বন্ধু প্রনয় বলল,
—” ফাইনালি নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে নিজের করে পেলি বল?
আরেকজন ঠাট্টা করে বলল,
—” বাসর রাতে বিড়াল কেমন মারলি বল? হা হা হা…
রূপক ফিচেল হেসে বলল,
—” না বিড়াল মারিনি।
—” মারিসনি! সেকি কেন?
রূপক ঝুড়ির দিকে তাক করে প্লাস্টিকের কফি গ্লাস টা ঢিল ছুড়ে বলল,
—” আলাদা রুমে ছিলাম!
এ কথা শুনে বারো জোড়া চোখ বিষ্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে আছে রূপক এর দিকে। তাদের বিষ্ময়ের যেন অন্ত নেই। প্রনয় উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
—” এরকম করার কারণ কি? তুই তো মেয়েটাকে সেই কলেজ জীবন থেকে পছন্দ করিস। ভালোও বাসিস। তবে?

সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে চেয়ে আছে রূপক এর জবাব এর আশায়। রূপক এর মুখের হাসি ধীরে ধীরে মুছে গিয়ে একটু কঠোরতা ফুটল।
ভাঙা গলায় বলল,
—” দু-দুবার ও আমাকে অপমান করে বিয়েতে নাকোজ করেছে। শুধুমাত্র ভালোবাসার জন্য আমি সেই সব কিছু ভুলে ওকে বিয়ে করেছি। সব সময় আমি যে ভালোবেসে ওর অন্যায় গুলো মেনে নিব এমনটা হলে তো হয় না। আমি চাই ও আমাকে ভালোবাসুক। আমার কথা চিন্তা করুক। আর তাই কিছুদিন ওকে এভাবেই বুঝাবো আমি!

সবাই এবার নিশ্চিন্তের শ্বাস ফেলে। প্রথমে চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল। ভেবেছিল বন্ধু আবার প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে উঠলো না তো? এখন তারা নিশ্চিন্ত।
______
সেই সকালে বের হয়েছে রূপক। তার কোন হদিস নেই। এখন রাত নয়টা বেজে চার মিনিট। রাহা বিরক্ত হয়ে ফোন ইউজ করছে। নিউজ ফিড স্ক্রল করতে করতে রূপক এর আইডি ঘাঁটতে ইচ্ছে হলো তার। সার্চ করে খুঁজতে খুঁজতে একসময় পেয়ে গেল আইডি। তারপর আইডিতে ঢুকে যা দেখতে পেল তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলো না রাহা!…..

#চলবে… ইনশা আল্লাহ।

#তোমার_নিরব_অভিমানীনি(১৯)
#Israt_Bintey_Ishaque(লেখিকা)
(কার্টেসি ছাড়া কপি নিষিদ্ধ)

প্রোফাইলে রূপক এর ছবি থাকার কারণে খুব সহজেই খুঁজে পায় রাহা। রূপক এর একেকটা পোস্ট এর মাঝে মাস খানেক ফারাক। এর মানে হচ্ছে রূপক খুব কম ফেবুতে পোস্ট করে। তবে যেটা চোখে পড়ার মতো সেটা হচ্ছে গতকাল রাত বারোটায় রূপক একজন কে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে পোস্ট করেছে। আর যে আইডি কে ট্যাগ করা হয়েছে সেই আইডির নাম “রুপকথা” !
পোস্ট টা এরকম_
সুনশান-নিস্তব্ধ চারপাশে অন্ধকার, অন্ধকারে ক্যালেন্ডারের পাতায় থাকা তারিখ গুলো নিয়ম মেনেই পাল্টে যায়, বাহিরে ঝিঝি পোকার ডাক আর ঘরের ভেতরের দেওয়াল ঘড়ি টিপ্পনী শব্দ। ঘড়ির টিপ্পনী শব্দ বারো টা বাজিয়েই স্মরণ করিয়ে দিয়ে গেলো আজ নাকি খুদে লেখিকার আগমনী দিন। শুভ হোক শুভ দিন, ভাইয়ার পক্ষ থেকে জানাই “শুভ জন্মদিন “।
(এই লেখাটি নিজে লিখে আমার সেজ দুলাভাই আমার জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন, সেটাই কপি করলাম)

রাহা তৎক্ষণাৎ রুপকথা নামক আইডিতে ঢুকে গেল। ঢুকে যা বুঝলো, এই সেই রাইটার “রুপকথা” যাকে তার ভাইয়া নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসে। কিন্তু রূপক এর সাথে কি সম্পর্ক? ব্যাপারটা মোটেও খোলাসা হয় না রাহার কাছে।

একজন কাজের মেয়ে দরজায় কড়াঘাত করে বলল,
—” নতুন ভাবী? আপনারে চাচা নিচে যেতে বলেছেন।
রাহা ফোন রেখে বলল,
—” আচ্ছা আমি আসছি, তুমি যাও।
—” জ্বি আচ্ছা।

রাহা কিছুক্ষণ রুমে পায়চারি করে নিচে নেমে আসে। সাজ্জাদ হোসেন দেখে বললেন,
—” বৌমা এসো, বসো তোমার সাথে গল্প করি। নজরাত চলে যাওয়ার পর থেকে আমি বড্ড একা হয়ে গেছি বুঝলে?
রাহা হেসে বরাবর সোফায় বসে। তারপর দুঃখ প্রকাশ করে বলল,
—” আমি আপনার কষ্টটা উপলব্ধি করতে পারছি বাবা। তবে এখন আমি এসে গেছি। আপনি যখন চাইবেন তখনি আমি আপনার সাথে বসে গল্প করবো।
সাজ্জাদ হোসেন ভীষণ আনন্দিত হলেন। বাচ্চাদের মত করে বললেন,
—” সাথে কফির মগে চুমুক দিতে দিতে আরো জমে যাবে তাই না?
রাহা মুচকি হেসে মাথা উপরনিচ করে। সাজ্জাদ হোসেন সম্মতি পেয়ে কাজের মেয়ে আঁখি কে ডেকে বললেন, দুই মগ কফি বানিয়ে দিতে। এর ফাঁকে তারা বিভিন্ন কথা বলতে শুরু করে। রাহা হঠাৎ বলে,
—” রুপকথা কে? আপনি তাকে চিনে..
সাজ্জাদ হোসেন বিষ্ময় নিয়ে বললেন,
—” সেকি বৌমা তুমি জানো না নজরাত এর আসল নাম “রুপকথা”!

রাহা আকাশ সম বিষ্ময় নিয়ে দাঁড়িয়ে যায়! সাজ্জাদ হোসেন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন। তিনি কিছু বুঝতে পারছেন না। রাহা শশব্যস্তে বলল,
—” কি বলছেন বাবা?
সামান্য কম্পিত কন্ঠস্বর তার। নতচক্ষু নিয়ে অকপটে গভীর, অস্ফুট গলায় আবারো বলল,
—” তাহলে এতো কিছু মুখ বুজে সহ্য করার কারণ কি ছিল? যদি ও সেই রাইটার রুপকথাই হবে!

রাহা অস্ফুট কন্ঠের কথা কিছুই বুঝতে পারছেন না সাজ্জাদ হোসেন। তিনি স্নিগ্ধ, কোমল স্বরে বললেন,
—” বৌমা তোমার কি শরীর খারাপ করছে? রূপক কে খবর দিব?
রাহা ক্রমে বিষ্ময়ে স্থির হয়ে যাচ্ছে। চোখ ক্রমে বিস্ফোরিত হচ্ছে। মাথায় হাত রেখে ব্যগ্র গলায় বলল,
—” না বাবা আমার কিছু হয়নি। আপনি চিন্তিত হবেন না। কিছু যদি মনে না করেন আমি কি আমার রুমে যেতে পারি?
—” হ্যাঁ হ্যাঁ তাই যাও।
_________

ছেলের ভাবগতি থেকে সাজেদা চৌধুরী মনে মনে ভীষণ পুলক অনুভব করছেন। তার বুঝতে বাকি নেই ছেলে এখন ব‌উকে চোখে হারায়। তিন জনেই খাবার খাওয়া শুরু করেন। খাবার খাওয়ার মাঝে সাজেদা চৌধুরী বললেন,
—” রাদ তুই কিন্তু কিছু সুন্নাত খুব সহজেই পালন করতে পারিস।
রাদ জিজ্ঞাসু চোখে চেয়ে রইল। সাজেদা চৌধুরী ভাতের লোকমা শেষ করে বললেন,
খাবার খাওয়া শেষে এই নিয়ে কথা বলবো ইনশা আল্লাহ।
তারপর তারা খাওয়া শেষ করলো। খাওয়া শেষে রেস্তোরাঁর বেলকনিতে দাঁড়িয়ে নজরাত তার বাবা কে কল করে কথা বলে কিছুক্ষণ। বেলকনির পরিবেশটা বেশ মনমুগ্ধ। সেখানে দাঁড়িয়ে যান্ত্রিক শহরটা রঙ বেরঙের লাইটের আলোয় ঝিকমিক করতে দেখা যাচ্ছে। নজরাত রেলিং গেসে দাঁড়িয়ে সেদিকে তাকিয়ে আছে। এই ছোট্ট জীবনে আপনজনদের থেকে চাওয়ার থেকেই বেশি পেয়েছে সে। তার আর কোন বড় পাওয়া নেই। সব ইচ্ছে ই পুরুন করেছেন মহান রাব্বুল আলামীন। “আলহামদুলিল্লাহ”।
আজকের দিনে তার আগমন ঘটেছিল এই সুন্দর ভুবনে। তার প্রিয় ভাইটি রাত বারোটা বাজতেই সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। ছোট বেলায় এই দিনটি বেশ ঘটা করে পালন করা হতো। তারপর যখন নজরাত বুঝতে শিখেছে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য হ‌ওয়া শিখেছে তখন থেকে জন্মদিন পালন করা বন্ধ করে দিয়েছে নজরাত। কেননা
ইসলামে এর কোনো ভিত্তি নেই। জন্মদিন পালনের গুরুত্ব যদি ইসলামে থাকত, তা হলে সাহাবায়ে কেরাম (রা.), তাবেয়ি, তাবে তাবেইনদের থেকে এটি পালনের প্রমাণ মিলত। তারা জন্মদিন পালন করবেন তো দূরের কথা, কারও কারও জন্মসন জানা গেলেও কোন মাসের কোন তারিখে জন্মগ্রহণ করেছেন তা অবধি জানা যায়নি। এমনকি আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
_____

রূপক বাসায় ফিরে রাদ দশটা নাগাদ। সাজ্জাদ হোসেন জানান যে রাহার শরীরটা বোধ হয় ভালো না। সাথে ছেলেকে একটু কঠোরভাবে বলেন, সদ্য বিয়ে করেছ তুমি। পরিবার ছেড়ে আসা মেয়েটাকে কোথাও একটু সঙ্গ দিবে তা নয় বাহিরে ঘুরে বেড়াচ্ছ। এগুলো কি তোমার কাছে ঠিক বলে মনে হচ্ছে? ভেবে দেখ। তিনি চলে গেলে রূপক দ্রুত পায়ে উপরে উঠে। রুমের দরজা ভেজানো দেখে শব্দবিহীন ভিতরে ঢুকে। রাহা ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে চোখের পাতা বন্ধ করে আছে। রূপক ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
—” তোমার কি শরীর খারাপ করছে? বাবা বলল।
রাহা চোখ মেলে তাকায়, খুব অন্যমনা হয়ে দেওয়ালের দিকে চেয়ে রইল, জবাব দিল না। অনেকক্ষণ বাদে হঠাৎ বলল,
—” আমাকে আমার বাসায় নিয়ে যাবেন?
রূপক বিব্রত ও হতচকিত হয়ে বলল,
—” রাত তো কম হয়নি। এখন যেতে চাইছো কেন? আগামীকাল সকালে গেলে হয় না?
—” কেমন যেন পাগল পাগল লাগছে! ভালো লাগছে না।
—” বেশি খারাপ লাগছে? ডাক্তার ডাকবো কি?
—” না না তার প্রয়োজন নেই।
—” খাবার খেয়েছো?
—” খাবো না। ঘুমাবো একটু।
তারপর রাহা চেয়ার ছেড়ে টলমলে পায়ে হেঁটে বিছানায় শুয়ে পড়ল। রূপক খাবারের জন্য আর জোর করল না। তার গায়ে ব্লাঙ্কেড জড়িয়ে দিয়ে বাথরুমে গেল ফ্রেশ আসতে।

ফ্রেশ হয়ে এসে রুমের লাইট অফ করে ড্রিম লাইট জ্বালিয়ে দিল। নিজেও না খেয়ে রাহা পাশে খাটের বাজুতে বালিশের ঠেকা দিয়ে আধশোয়া হয়ে বসে। তারপর মৃদুস্বরে বলে,
—” ঘুমিয়ে পড়েছ?
রাহার থেকে কোন সারা শব্দ পেল না। তাই আর একটু গেসে বসে। রাহার মাথায় আলতো হাত রাখে। এতে খানিকটা কেপে উঠে রাহা। রূপক বুঝতে পারে রাহা ঘুমায়নি এখনো। তবে হাত সরায় না। চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলে, ঘুমাও তাহলে ভালো লাগবে।
______

হঠাৎ পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে থুতনি রাখে রাদ শাহমাত। দৃষ্টি তার নজরাত যেদিকে রেখেছে সেদিকে। নজরাত আকস্মিক এই সম্মহনে কেঁপে উঠে। পরক্ষনেই বুঝতে পারে এটা তার অর্ধাঙ্গ। প্রথমে নজরাত ই বলে পরিবেশটা বেশ মনমুগ্ধকর তাই না?
রাদ শাহমাত গাঢ় স্বরে বলে,
—” হুম, পাশে আপনি থাকবে সব সুন্দর।
আকস্মিক ওই তরল মন্তব্যে লজ্জা পেল
নজরাত। দৃষ্টি তার নত হল। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—” আজকের দিনে আপনি আমাকে অজান্তেই সারপ্রাইজ দিলেন। জানেন?
রাদ শাহমাত ভ্রু কুঁচকে তাকায় নজরাত এর দিকে। গাঢ় স্বরে প্রশ্ন করে,
—” আজকে কি ছিল?
—” আমার জন্মদিন।
বেশ চমকায় রাদ শাহমাত। নজরাত কে ছেড়ে মুখমুখী দাঁড়িয়ে বলল,
—” আগে বললেন না যে? আগে জানলে আয়োজন টা অন্যরকম করতে পারতাম।
—” তার প্রয়োজন নেই। এতেই আমি খুশি।
—” আপনি তো খুব সুখী মানুষ!
—” মানে?
—” বাদ দিন। চলুন মা ডাকছে, কি যেন বলবেন তখন বললেন।….

#চলবে… ইনশা আল্লাহ।