#দুই_হৃদয়ের_সন্ধি
#পর্বঃ১২
#লেখিকাঃদিশা_মনি
দুপুরের উত্তপ্ত আবহাওয়ায় চুল খোলা রেখে বিছানায় বসে আছে মুসকান। একটু আগেই সে গোসল করে বেরিয়েছে। ভেজা চুল শুকানোর জন্য সিলিং ফ্যানটাও চালু করে রেখেছে একদম ফুল স্পিডে।
আরিফ কিছু প্রয়োজনে রুমে এসে মুসকানকে এই অবস্থায় দেখে থ বনে যায়। মুসকানকে এই অবস্থায় বেশ লাস্যময়ী লাগছে। আরিফ মুগ্ধ নয়নে মুসকানকে দেখতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই মুসকানেরও নজর গেল আরিফের দিকে। নিজের দিকে খেয়াল করে মুসকান দেখল তার পরনে লাল রঙের সুতি কাপড়ের একটি সালোয়ার কামিজ। গায়ে কোন ওড়নাও নেই। তাই দ্রুতবেগে ওড়না গায়ে জড়িয়ে আরিফকে ঝাড়ি দিয়ে বলল,
“আপনি কখন এসেছেন? রুমে আসার আগে নক তো করতে পারেন। একটা মেয়ে যে রুমে আছে সেটা কি ভুলে গেছেন নাকি?”
“আমি আসলে..”
“থাক। আমি আপনার থেকে কোন এক্সকিউজ শুনতে চাইনা মিস্টার। আপনার যদি দরকারী কোন কাজ থাকে তাহলে সেটা করুন।”
“আমার আপনার সাথেই কিছু কথা ছিল।”
“বলুন, আমি শোনার জন্য বসেই আছি।”
“আমি কাল সারারাত আপনার বলা কথাগুলো নিয়ে ভেবেছি। অতঃপর আমি যেই সিদ্ধান্তে পৌঁছালাম তা হলো, আমি আমাদের সম্পর্কটাকে একটা সুযোগ দিতে চাই। আমার আপনাকে স্ত্রী হিসেবে মেনে নিতেও কোন অসুবিধা নেই। আমার শুধু সবটা স্বাভাবিক করার জন্য কিছুটা সময় চাই।”
মুসকান কন্ঠে রাগ ঝুলিয়ে বলে,
“আমার মনে হয় আপনি আমাকে নিয়ে খেলতে চাইছেন। আপনাকে কিছু বললেই সেই এক কথা, সময় লাগবে। আমার মনে হয় আপনি আমার প্রতি বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই। এভাবে একটা সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়না।”
আরিফ বলার মতো কিছুই খুঁজে পায়না। মুসকানের এই ধরনের চিন্তা তার মনেও বিরুপ প্রভাব ফেলে। এরমধ্যে হঠাৎ রুহি কেঁদে ওঠে। মেয়েটা হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। রুহি কেঁদে উঠতেই আরিফ দ্রুতবেগে গিয়ে মেয়েটাকে দোলনা থেকে নিজের কোলে তুলে নেয়। মুসকান এসব দেখে বিরক্ত হয়ে মনে মনে বলে,
“এই বাচ্চাটাকে নিয়েই তো উনি ব্যস্ত! নিজের স্ত্রীকে দেওয়ার মতো সময় ওনার আছে নাকি। যখনই দেখি এই বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে বসে থাকে। অসহ্যকর।”
★★★
বিকেল বেলা, সূর্যের তেজ কমে এসেছে। রুহিকে ঘুমিয়ে রেখে আরিফ একটু বেড়িয়েছে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়ার উদ্দ্যেশ্যে। একটা চা দোকানের সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে আরিফের দুই বন্ধু আবির এবং চয়ন। কূজন নিজের পারিবারিক ব্যস্ততার জন্য আজ আসতে পারে নি। নাহলে সে-ও আসত।
আরিফ সেখানে উপস্থিত হয়েই দেখতে পায় আবির ও চয়ন চা দোকানের টং এর মধ্যে বসে আছে। আরিফকে দেখামাত্রই দুজনে তার দিকে মনযোগ দেয়। আবির উঠে এসে বলে,
“আয় দোস্ত। তোর জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। চাচা, তিন কাপ দুধ চা দিন তো।”
আরিফ নাক মুখ কুচকে বলে,
“আমি দুধ চা খাবো না। আমার জন্য লাল চা দিন।”
আবির আরিফের মাথায় গাট্টা মে’রে বলে,
“কেন রে ভাই? দুধ চা খেলে কি সমস্যা? এমনিতেও তো পাঠ কাঠির মতো চেহারা।”
চয়ন চা হাতে নিয়ে ফু দিতে দিতে বলে,
“ওকে কি বলছিস! আমাদের চেহারাই বা কত ভালো। সকলকেই দেখলে তালপাতার সিপাই লাগে। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে একমাত্র কূজনেরই সুঠাম চেহারা রয়েছে। শা*লা, ব্যায়াম করে এই চেহারা বানিয়েছে।”
কূজনের প্রসঙ্গ উঠতেই আবির আরিফের উদ্দ্যেশ্যে বলে,
“তোর সাথে কূজনকে নিয়ে আমার কিছু জরুরি কথা আছে দোস্ত। যদিও আমি প্রথম প্রথম এই নিয়ে অনেক সংশয়ে ছিলাম যে তোকে বলা ঠিক হবে কিনা। কিন্তু অনেক ভেবে দেখলাম, যদি তোকে না বলি তাহলে তোর সাথে বেঈমানী করা হবে।”
আরিফ প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকায় আবিরের দিকে। তার মনের মধ্যে একসাথে অনেক প্রশ্ন ঘুরতে থাকে। আরিফ আবিরের কাধে হাত রেখে বলে,
“তোর কথা শুনে তো বেশ সিরিয়াস মনে হচ্ছে। জলদি বল।”
চয়ন আবিরকে বাধা দিয়ে বলে,
“এই আবির তুই ওকে কিছু বলিস না। শুধু শুধু ওদের মধ্যে অশান্তি হবে।”
আরিফ রেগে চয়নকে বলে,
“তুই চুপ থাক। আবির কি বলছে শুনতে দে।”
আবির কপট হাসি হাসে৷ কূজনের সাথে আগে তার কিছু বিষয় নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল৷ সেইসময় কূজন তার গায়ে হাত পর্যন্ত তুলেছিল। আজ সেইসবের প্রতিশোধ নিতে পারবে ভেবেই আবিরের পৈশাচিক আনন্দ অনুভূত হচ্ছে।
অন্যদিকে চয়ন বেশ ভয়েভয়ে তাকিয়ে রয়েছে। সে মনে করে গতকালকের কথা। কূজন যখন ক্যাম্পাসে পৌঁছে আরিফকে ফোন দেয় তখন আবির ও চয়নও তার পাশে ছিল। ফোনটা আরিফ রিসিভ না করে মুসকান রিসিভ করলে কূজন তাদের দুজনের থেকে একটু দূরে গিয়ে কথা বলতে থাকে।
আবির ও চয়ন আরিফের বাড়িতেই মুসকান এবং কূজনের অস্বাভাবিক ব্যবহার নিয়ে সন্দেহ করেছিল। তাই কৌতুহল থেকেই দুজন কূজনের কাছাকাছি যায়। যদিও চয়নের এসবে আগ্রহ ছিল না কিন্তু আবির তাকে একপ্রকার টেনে নিয়ে যায়। অতঃপর দুজনে কূজনের বলা কিছু কথা শুনে নেয়। সব কথা শুনতে না পারলেও তারা শেষের দিকে কূজনের বলা এটুকু কথা শোনে,
“আমার ভালোবাসা সম্পর্কে তোর কোন ধারণাই নেই। তুই যদি কষ্টে থাকিস তাহলে তোর হাজারবার বিয়ে হলেও আমি তোকে মেনে নিব বিনা শর্তে।”
আবির এইটুকু কথার সাথে আরো কিছু মশলা মিশিয়ে আরিফকে বলে,
“জানিস, কূজন তোর বউকে বলছিল ও যদি তোর সাথে সংসার করতে না চায় তাহলে যেন তোকে ছেড়ে ওর কাছে চলে যায়। আমার তো তোদের বাড়িতে ওদের দেখেই সন্দেহ হয়েছিলাম। পরে যখন জানতে পারি ওরা মামাতো-ফুফাতো ভাইবোন তখন তো সন্দেহ আরো পাকাপোক্ত হয়। কূজন আর তোর বউয়ের কথোপকথন শুনেই তো আমার কাছে এটা পরিস্কার হয়ে যায় যে ওদের মধ্যে লটরপটর চলছে।”
আরিফ রাগে নিজের হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নেয়। গতকাল এবং আজকের সব ঘটনা মনে করতে থাকে সে। কূজন-মুসকানের অদ্ভুত ব্যবহার। কূজনের সাথে কথা বলার পর বেলকনিতে মুসকানের বলা কথাগুলো মাথায় আসতেই আরিফের ক্রোধ বাড়তে থাকে। রাগে তার চোখ পর্যন্ত লাল হয়ে যায়। আবির আরিফের রাগী চেহারা দেখে মনে মনে খুব আনন্দ পায়। অবশেষে তার উদ্দ্যেশ্য তাহলে সফল হয়েছে।
আরিফ রাগে গজগজ করতে করতে বাড়ির দিকে রওনা দেয়। চয়ন উঠে এসে আরিফকে আটকে বলে,
“শোন তুই আবিরের কথা শুনে রাগের মাথায় কিছু করে দিস না আবার। আমাদের শোনার মধ্যে কোন ভুলও থাকতে পারে।”
আরিফ জোরে ধাক্কা দিয়ে চয়নকে নিজের সামনে থেকে সরিয়ে দিয়ে বাড়ির দিকে যেতে থাকে। চয়ন পেছন থেকে আরিফকে ডাকতে থাকে। কিন্তু সে চয়নের দিকে আর ফিরেও তাকায় না। একটি রিক্সাতে উঠে পড়ে রওনা দেয়। আরিফ চলে যাওয়ার পর চয়ন আবিরের সামনে এসে রাগ দেখিয়ে বলে,
“তুই আরিফকে এসব কেন বলতে গেলি আবির? আরিফকে দেখেছিস তুই? কি রাগী লাগছিল ওকে। এখন তো বিরাট কোন ঝামেলা হয়ে যাবে মনে হয়।”
আবির মনে মনে বলে,
“আমি তো সেটাই চাই।”
কিন্তু প্রকাশ্যে চয়নের উদ্দ্যেশ্যে বলে,
” আমি যা করেছি সেটা একদম ঠিক। বন্ধু হয়ে বন্ধুর প্রতি এতটুকু দায়িত্ব অন্তত আমাদের থাকা উচিৎ। আমাদের বন্ধুকে তার বউ আর আমাদের আরেক বন্ধু মিলে ঠকাবে আর আমরা সব জেনেও চুপ থাকব। তাহলে এটা আমাদের কেমন বন্ধুত্ব বল?”
চয়ন কিছুটা নরম হয়ে বলে,
“তবে তুই যাই বলিস এভাবে কথাটা বলা তোর উচিৎ হয়নি। আমাদের আগে কূজনের সাথে এই নিয়ে কথা বলা উচিৎ ছিল। তারপর ঠাণ্ডা মাথায় আরিফকে সব বলা দরকার ছিল।”
“তুই কূজনের হয়ে এত গলাবাজি করিস না তো। বেটার চরিত্রে যে সমস্যা সেটা আমি অনেক আগে থেকেই জানি। নিজের বন্ধুর বউয়ের দিকে নজর দেয় ছি! আমি আরিফের যায়গায় থাকলে তো ওরে মে*রে জ্যা*ন্ত কবর দিতাম।”
চয়ন আবিরকে আরো কিছু বলতে চেয়েও বলল না। বরং সে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে লাগল যেন বড় কোন ঝামেলা না হয়। আরিফ যেভাবে বাড়ির দিকে গেল দেখে তো মনে হলো আজ বড় কোন ঝামেলা হয়ে যাবে।
★★★
প্রচণ্ড রাগ নিয়ে বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করেই মুসকানের নাম ধরে চিৎকার করতে লাগল আরিফ। আরিফের ডাক শুনে আতিকা চৌধুরী, মুসকান সবাই ড্রয়িংরুমে উপস্থিত হয়। মুসকানকে দেখামাত্র রাগে থরথর করে কাপতে কাপতে তার দিকে যেতে থাকে আরিফ। মুসকান আরিফকে এভাবে দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। আতিকা চৌধুরীর পেছনে গিয়ে আশ্রয় নেয়। কিন্তু তবুও শেষ রক্ষা হয়না। রাগে নিজের বিবেক বুদ্ধি সব হারিয়ে ফেলেছে আরিফ। তাই মুসকানকে টেনে নিজের কাছে আনে। আতিকা চৌধুরী বাধা দেওয়ার আগেই মুসকানের গালে ঠা’স ঠা’স করে কয়েকটা থা’প্পর বসিয়ে দিয়ে কিছু বিশ্রী গালি দিয়ে বলে,
“দুশ্চরিত্রা মেয়ে কোথাকার! এক্ষুনি বেরিয়ে যা আমার বাড়ি থেকে।”
চলবে ইনশাআল্লাহ ✨