দুই হৃদয়ের সন্ধি পর্ব-১৩

0
448

#দুই_হৃদয়ের_সন্ধি
#পর্বঃ১৩
#লেখিকাঃদিশা_মনি

আরিফ মুসকানের গালে ঠা’স ঠা’স করে কয়েকটা থা’প্পর বসিয়ে দিয়ে কিছু বিশ্রী গালি দিয়ে বলে,
“দুশ্চরিত্রা মেয়ে কোথাকার! এক্ষুনি বেরিয়ে যা আমার বাড়ি থেকে।”

মুসকান গালে হাত দিয়ে রক্তিম চোখে তাকায় আরিফের দিকে। বরাবরই নিজের আত্মসম্মান নিয়ে বড্ড বেশি সচেতন সে। এই নিয়ে দুই বার আরিফ তার গায়ে হাত তুলল। আগেরবার সহ্য করে নিলেও এবার আর সহ্য করতে পারল না মুসকান। আরিফ তার গালে থা’প্পর মা’রার পর সেও উলটো থা’প্পর বসিয়ে দিল আরিফের গালে। গর্জে উঠে বলল,
“আপনি নিজেকে কি ভেবেছেন টা কি? আমার গায়ে বারবার হাত তুলবেন আর আমি সহ্য করবো এমন ভাবলে আপনি ভুল ভাবছেন। আমি সেইসব মেয়েদের মধ্যে নই যারা মুখ বুজে নিজের স্বামীর সবকিছু মেনে নেবে। আমি প্রতিবাদ করতে জানি।”

আরিফ মুসকানের উদ্দ্যেশ্যে বলে,
“আপনি কত ভালো সেটা আমার জানা হয়ে গেছে। আপনার এত বড় সাহস যে আমার গায়ে হাত তুললেন। এবার তো আমি আপনাকে আর এক মুহুর্ত আমার বাড়িতে সহ্য করবো না।”

কথাটা বলেই আরিফ মুসকানের হাত ধরে টানতে টানতে বাড়ির মেইন গেইটের দিকে নিয়ে যেতে থাকে। আতিকা চৌধুরী আরিফকে আটকানোর জন্য বলে,
“আরিফ ছেড়ে দে ওকে! এসব কি হচ্ছে আমি কিছু বুঝছি না। তোরা কেন এমন করছিস?”

আরিফ আতিকা চৌধুরীর কথায় কোন কর্ণপাতই করে না। প্রচণ্ড রাগে এখন সে অন্ধপ্রায়। তাই নিজে যা ভালো মনে করবে তাই করার চেষ্টা করছে আরিফ। মুসকানও আরিফকে কোন বাঁধা দিচ্ছে না। সেও আজ এটা দেখতে চায় যে আরিফ কতোটা নিচে নামতে পারে।

আরিফ মুসকানকে বাড়ির সদর দরজার কাছে এনে জোরে একটা ধা’ক্কা দেয়। মুসকান মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। তার হাতের কিছু যায়গা ছিলে যায়৷ আরিফের রাগ তবুও যেন কমে না। আতিকা চৌধুরী আরিফের এই কাণ্ড দেখে ভীষণ রেগে যান। আরিফকে কিছু কড়া কথাও শোনান। কিন্তু আরিফের কোন হেলদোলই চোখে পড়ে না।

মুসকান দরজার বাইরে বসে থাকা অবস্থাতেই কাঁদতে শুরু করে। এত অপমানিত সে জীবনে কখনো হয়নি। এরমধ্যে হঠাৎ কেউ হাত বাড়িয়ে দেয় মুসকানকে তোলার জন্য। মুসকান মাথা তুলে কূজনকে দেখে নিজের কান্না থামায়। মুখে খুশির আমেজ ফুটিয়ে বলে,
“কূজন ভাইয়া তুমি এসেছ!”

কূজন মুসকানকে টেনে তুলে। মুসকানের মাথায় হাত রেখে বলে,
“হ্যাঁ মুসকান। তুই একদম চিন্তা করিস না। তোর কূজন ভাই চলে এসেছে। আমি তোর পাশে আছি।”

আরিফকে তখন ওভাবে রেগে চলে আসতে দেখে চয়ন ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। পরিস্থিতি কিভাবে সামলাবে সেটাই ভাবতে থাকে সে। চয়নের কাছে মনে হয় একমাত্র কূজনই সবটা ঠিক করতে পারে। তাই চয়ন কূজনকে ফোন করে। তাকে আবির আরিফের সব কথোপকথন সম্পর্কেও জানায়। আরিফ যে রেগেমেগে নিজের বাড়ির দিকে রওনা দিয়েছে সেটাও জানায় সে। সব শুনে কূজন বুঝতে পারে এখন আরিফের সব রাগ মুসকানের উপর গিয়ে পড়ে। তাই মুসকানকে রক্ষা করতে এবং আরিফের ভুল ভাবনা মেটাতেই কূজন চলে এসেছে।

কিন্তু এখানে এসে মুসকানের প্রতি আরিফের এমন ব্যবহার দেখে সে স্তম্ভিত। রাগে ক্ষোভে আরিফের দিকে এগিয়ে যায় কূজন। আরিফকে ধমক দিয়ে বলে,
“কোন সাহসে তুই মুসকানের সাথে এমন ব্যবহার করছিস?”

আরিফ কূজনের শার্টের কলার শক্ত করে ধরে উপহাসের সুরে বলে,
“তাহলে তুই চলে এসেছিস নিজের প্রেমিকাকে রক্ষা করতে।”

“ভদ্রভাবে কথা বল আরিফ। তোর বুঝতে ভুল হচ্ছে। মুসকান আমার প্রেমিকা নয়..”

“তুই আর আমার সামনে এসব সস্তার নাটক করিস না কূজন। তোর আর এই মুসকানের সব কীর্তি সম্পর্কে আমার জানা শেষ। তোরা একসাথে সংসার করতে চাস তো ফাইন। আমি কোন বাধা দেব না। তুই নিজে যা এই মেয়েটাকে।”

তাদের দুজনের কথার মাঝখানে ঢুকে পড়েন আতিকা চৌধুরী। তিনি বলেন,
“এসব কি বলছিস তুই আরিফ? আমি সত্যি বুঝতে পারছি না তুই এসব কথা কেন বলছিস আর মুসকানের সাথে এত খা’রাপ ব্যবহারও বা কেন করছিস?”

আরিফ আতিকা চৌধুরীকে আবিরের বলা সব কথাগুলো বলে। সব শুনে আতিকা চৌধুরী ভীষণ অবাক হয়ে যান। তিনি মুসকানের উদ্দ্যেশ্যে প্রশ্ন ছু’ড়ে দেন,
“আরিফ যা বলছে সেসব কি সত্যি মুসকান?”

মুসকান কিছু বলার আগেই কূজন বলে,
“আপনি বিশ্বাস করুন আন্টি আরিফ যা বলছে তা ঠিক নয়। আমি মুসকানকে বলিনি সংসার ছেড়ে দিতে। আমি তো ওকে এই সম্পর্কটাকে সুযোগ দিতে বলেছি। হ্যাঁ, এটা সত্য যে আমরা একে অপরকে ভালোবাসতাম তবে সেই ভালোবাসা অপ্রকাশিত ছিল।”

আতিকা চৌধুরী কূজনকে ইশারা করে থামিয়ে দিয়ে মুসকানের দিকে তাকিয়ে বলেন,
“আমি তোমার কাছে সবটা শুনতে চাই মুসকান। বলো তুমি কি চাও?”

মুসকান কান্নামিশ্রিত কন্ঠে বলে,
“আমি মুক্তি চাই ম্যাডাম। আপনার ছেলের থেকে মুক্তি চাই। যেই ছেলে বাসর ঘরে তার স্ত্রীকে বলে আমি আপনাকে বউ বলে মানি না, আমি আপনাকে স্ত্রীর স্বীকৃতি দেব না তার কাছ থেকে আমি কি আশা করব?”

আতিকা চৌধুরী কিছু বলার চেষ্টা করলে মুসকান আবারো বলা শুরু করে,
“আমি জানি আপনিও আমাকে ভুল বুঝবেন। কিন্তু আমার যায়গায় একবার নিজেকে বসিয়ে দেখুন না। একটা মেয়ে কত স্বপ্ন নিয়ে শ্বশুর ঘরে আসে। আমিও এসেছিলাম। কিন্তু বিয়ের পর থেকে নিজের স্বামীর মুখ থেকে এমন কথা শুনতে হয়েছে। আমার রুহির প্রতিও কোন ক্ষোভ ছিলনা কিন্তু যখন মনে হয়েছে আপনার ছেলে রুহির জন্য আমার সাথে এমন করছে তখন না চাইতেও ঐ বাচ্চাটাকে খা*রাপ কথা বলে ফেলেছি। আমি সত্যি এমনটা চাই নি। কিন্তু আপনার ছেলের ব্যবহার আমায় বাধ্য করেছে। আজ ও আবার আমার গায়ে হাত তুলল। আমি আর সহ্য করতে পারছি না এই টর্চার। একটা মানুষের তো সহ্যের একটা সীমা থাকে নাকি। সেইসব সীমা পেরিয়ে গেছে।”

কূজন আরিফকে বলে,
“দেখেছিস আরিফ তোর জন্য মেয়েটা কতটা কষ্টে আছে? আর তুই আবিরের বানানো কথা শুনে কোন কিছু বিচার না করেই ওর সাথে খারাপ ব্যবহার করলি।”

আরিফ কিছু বলল না। চুপ করে রইল। মুসকান কূজনের হাত ধরে বলল,
“ভাইয়া প্লিজ আমাকে এখান থেকে নিয়ে চলো। আমি আর এখানে থাকতে পারব না। আমি প্রতিনিয়ত ধুকে ধুকে মরছি। তুমি যদি আমাকে এখান থেকে না নিয়ে যাও তো বিষ কিনে দিয়ে যাও। আমি খেয়ে মরি। তাহলে অন্তত শান্তি পাবো।”

কূজন মুসকানকে ধমক দিয়ে চুপ করায়। আতিকা চৌধুরী বলেন,
“এসব তুমি কেমন কথা বলছ মুসকান?”

মুসকান কান্না করতে করতেই বলে,
“আমি ঠিক বলছি ম্যাডাম। সবকিছু আমার সহ্যের সীমা পেরিয়ে গেছে।”

কূজন মুসকানকে অভয় দিয়ে বলে,
“তুই আমার সাথে আমার বাসায় চল। তোকে আর এখানে থাকতে হবে না। বাসায় আম্মু আছে। আম্মু অনেক দিন থেকেই তোর কথা বলে। অনেক ভালোবাসে তো তোকে। আমি তো হোস্টেলেই থাকি। এখানে চট্টগ্রামে একটা ফ্ল্যাটে আমার পুরো পরিবার থাকে। আমি তোকে সেখানে রেখে আসব। তোকে আর এখানে থেকে অপমানিত হতে হবে না।”

মুসকান কূজনের সাথে যেতে উদ্যত হয়। আতিকা চৌধুরী আরিফকে বলে,
“তুই দাঁড়িয়ে আছি আছিস কেন? তোর স্ত্রী এভাবে চলে যাচ্ছে। তোর তো উচিৎ ওকে আটকানো।”

আরিফ গম্ভীর স্বরে বলে,
“আমি কেন কাউকে আটকাবো? যার যেখানে খুশি যাক। এমনিতেও আমি ঐ মেয়েকে নিজের লাইফে রাখতে চাইনা।”

আরিফ কিছু করবে না বুঝতে পেরে আতিকা চৌধুরী মুসকানকে আটকাতে যান। সেই মুহুর্তে মুসকান আতিকা চৌধুরীর সামনে হাতজোড় করে বলে,
“আপনার দোহাই লাগে ম্যাডাম আমায় আটকাবেন না। আপনি আমার অনেক উপকার করেছেন। আমি সেসব ভুলব না। আপনি তো আমায় নরক থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য এখানে এসেছিলেন কিন্তু এখানে আমার লাইফ আরো বেশি নরক হয়ে গেছে। দয়া করে আমায় যেতে দিন নাহলে আমি আর বাঁচবো না।”

মুসকানের কথা শুনে আতিকা চৌধুরী আর তাকে আটকান না। তিনি মুসকানের মাথায় হাত দিয়ে বলেন,
“ঠিক আছে। তুমি যা ভালো মনে করো তাই করো।”

মুসকান কূজনের হাত ধরে বিদায় নেয়। আরিফ তাদের যাওয়ার পানে রাগী চোখে তাকিয়ে নিজের রুমে চলে যায়। আর আতিকা চৌধুরী দীর্ঘ শ্বাস ফেলেন।

চলবে ইনশাআল্লাহ ✨