#দুই_হৃদয়ের_সন্ধি
#পর্বঃ১৪
#লেখিকাঃদিশা_মনি
মুসকান কূজনের সাথে তার বাসার সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ বুলিয়ে দেখছে চারদিকটা। এখানে আসার সময় কূজনের কাছে সে শুনেছে কূজন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার পর নাকি তার বাবাও নিজের বিজনেসের জন্য এখানে চলে আসেন। অতঃপর এখানেই এই ফ্ল্যাট কিনে তারা সপরিবারে বসবাস করতে থাকে। কূজনের আর কোন ভাই বোন নেই। সে তার মা-বাবার একমাত্র ছেলে। তাই তাকে নিয়ে তাদের অনেক আশাও রয়েছে।
কূজন মুসকানকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাকে উদ্দ্যেশ্য করে বলে,
“কি হলো দাঁড়িয়ে আছিস কেন? চল ভেতরে যাই।”
মুসকান কিছুটা নিচু স্বরে বলে,
“আমার কেমন জানি লাগছে। এভাবে হঠাৎ তোমাদের বাসায় আসলাম! তখন হয়তো আমার মাথা গরম ছিল। কিন্তু এখন আমি উপলব্ধি করতে পারছি যে এভাবে ঝোকের বসে এখানে চলে আসা আমার উচিৎ হয়নি। একটু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা উচিৎ ছিল। আরিফও আমাকে বলেছিলেন ওনার কিছুটা সময় লাগবে। সব ঠিকই ছিল। জানিনা হঠাৎ করে কিভাবে সব এলোমেলো হয়ে গেল!”
কূজন হাতদুটো বুকের মধ্যিখানে ভাজ করে গম্ভীর স্বরে বলে,
“কিছু মনে করিস না আমি তোকে কিছু কথা বলব। জানি কথাগুলো শুনতে তোর অনেক খারাপ লাগবে তবে আমার মনে হয় তোকে এই কথাগুলো বলা ভীষণ ভাবে জরুরি। দেখ, তুই এমন অসহায় পরিস্থিতিতে ছিলি আরিফ তোকে বাড়ি থেকে বের করে দিচ্ছিল এইজন্য আমি মানবিকতার কথা বিবেচনায় তোকে এখানে নিয়ে এসেছি। তবে আমার মনে হয়, আরিফের এমন রূঢ় ব্যবহারের জন্য তোর দায়টা কোনভাবে অস্বীকার করা যায়না। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে আরিফের উচিৎ হয়নি আবিরের কথা শুনে তোর সাথে এমন করা কিন্তু এটাও একটা ফ্যাক্ট যে, তুই যদি আগে থেকে এমন আচরণ না করতি তাহলে আরিফ এত সহজে তোকে সন্দেহ করত না।”
মুসকান লজ্জায় মাথা নিচু করে দাঁড়ায়। তার ভুল গুলো এখন সে উপলব্ধি করতে পারছে বেশ ভালো ভাবেই। লজ্জা করছে ভীষণ সাথে রাগও হচ্ছে নিজের উপর। আরিফ মুসকানকে এভাবে লজ্জা পেতে দেখে বলে,
“তবে এই কথাও ঠিক যা হওয়ার হয়ে গেছে। এখন আর কারো দোষ গুণ দেখে লাভ নেই। তোর জীবনের সিদ্ধান্ত তো আর আমি নেব না। তোর সিদ্ধান্ত আমি সম্পূর্ণ তোর উপরেই ছেড়ে দিলাম। তুই যা ভালো করিস কর। তবে যদি আমার কাছে পরামর্শ চাস তাহলে আমি বলব তুই আরিফের সাথে কথা বলে সবকিছু মিটমাট করে নে। তোর একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হয়েই আমি কথাটা বললাম। কারণ আমি তোর ভালো চাই।”
মুসকান কূজনের দিকে তাকায়। দেখতে পায় যে কূজন তার দিকে তাকিয়ে নেই। মুসকানের মুখে মলিন হাসি ফুটে ওঠে। সে এখন বুঝতে পারছে কূজন তার থেকে দূরে থাকতে চাইছে। আর এটাই স্বাভাবিক। কূজনের মতো এমন ব্যক্তিত্ববান একজন পুরুষ আবেগ নয় বিবেক দিয়েই তো বিবেচনা করবে সবকিছু। এটা ঠিক যে শুরুর দিকে সে মুসকানকে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে অনেক কিছু বলে ফেলেছিল তবে এখন সে বুঝতে পারছে তার এত কিছু বলা উচিৎ হয়নি। কারণ এটা অস্বীকার করার কোন সুযোগই নেই যে কূজনের আগমনের কারণেই মুসকান এবং আরিফের সম্পর্কের এতটা অবনতি ঘটেছে। আজ যদি কূজন তাদের মাঝে না আসত তাহলে হয়তোবা তাদের মধ্যে সবকিছু স্বাভাবিক থাকত।
এসব ভাবনার মাঝেই কূজন মুসকানের উদ্দ্যেশ্যে বলে ওঠে,
“চল বাসায় যাই। বাসায় গিয়ে ঠান্ডা মাথায় ভেবে তুই যা সিদ্ধান্ত নেবার নিস।”
মুসকান কূজনের কথায় সায় জানিয়ে মাথা দুদিকে দোলায়। কূজন সামনে এগোয়। মুসকান তার পিছুপিছু যেতে থাকে। লিফটে করে ফ্ল্যাটের চতুর্থ তলায় ওঠে দুজনে। সেখানেই কূজনদের আবাস। বাসার কাছে এসেই কলিং বেলে চাপ দেয় কূজন। তার কিছু সময়ের মধ্যেই মধ্যবয়সী এক নারী এসে দরজাটা খুলে দেয়। তিনি আর কেউ নন কূজনের মা এবং মুসকানের ফুফু কাবেরি বেগম। দরজা খুলে কূজনকে দেখে তিনি সামান্য অবাক হয়ে বলেন,
“কিরে, এই সময় হঠাৎ তুই কোথা থেকে উদয় হলি?”
কূজন মৃদু হেসে বলে,
“আমার সাথে কে এসেছে সেটা তো দেখো।”
কাবেরি বেগম কূজনের পাশে তাকাতেই তার দৃষ্টিগোচর হয় মুসকানকে। সাথে সাথেই বিস্ময় ভাব ফুটে ওঠে তার চোখেমুখে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে বিস্ময়তা কাটিয়ে উঠে তিনি ছুটে চলে যান মুসকানের কাছে। মুসকানকে জড়িয়ে ধরে আবেগাপ্লুত হয়ে বলে ওঠেন,
“আমি ঠিক দেখছি তো! মুসকান তুই এসেছিস?”
মুসকানও নিজের ফুফুর আলিঙ্গনে আড়ষ্ট হয়ে বলে,
“জ্বি, ফুফু। আমি এসেছি তোমার কাছে।”
কাবেরি বেগমের চোখে জল চলে আসে। এতদিন পরে নিজের ভাইঝিকে দেখে তার ছোট ভাইয়ের কথা মনে পড়ে যায়। একদম বাবার মতোই দেখতে হয়েছে মেয়েটা। সেই চোখ- সেই নাক। সবেতেই মিল। মুসকানের কপালে চুমু খেয়ে তিনি বলেন,
“কেমন আছিস মা? এত শুকিয়ে গেছিস কেন? এতদিন কি এই বুড়ি ফুফির কথা মনে পড়ে নি?”
মুসকান অভিমানী গলায় বলল,
“কেন মনে পড়বে না ফুফি? আমার সবসময় তোমার কথা মনে পড়ত জানো?”
“সেতো বুঝতেই পারছি। এইজন্য তো এতদিন কোন খোঁজ নেসনি।”
“তুমিও তো খোঁজ নাওনি ফুফি।”
“আমি তোর খোঁজ নিয়েছিলাম রে। কিন্তু তোর মা-ই তো চেয়েছিল আমরা যেন তোদের সাথে সব যোগাযোগ বন্ধ করে দেই। নতুন বিয়ের পরে আগের শ্বশুর বাড়ির সকলের সাথেই সে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।”
কূজন দুজনের কথার মধ্যে ফোড়ন কে’টে বলে,
“তোমরা কি এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই আলাপ করবে? ভিতরে চলো বসে সব আলাপ করি।”
কাবেরি বেগম জিভ কে’টে বলেন,
“একদম ঠিক বলেছিস তুই। আমিও না এতদিন পর মেয়েটার দেখা পেলাম আর ওকে নিজের বাসাতেও আসতে বললাম না। মুসকান তুই ভেতরে চল। বাসায় গিয়ে তোর সাথে কোন কথা বলব। অনেক গল্প জমে আছে যে।”
মুসকান মৃদু এসে নিজের ফুফুর সাথে ভেতরে যায়। কূজনও যায় পিছুপিছু।
★★★
নিজের ফুফুর সাথে নানান রকম গল্পে মুসকানের সময় যেতে লাগল। কথায় কথায় কাবেরি বেগম মুসকানের বিয়ে এবং তার পরবর্তী সব ঘটনাও জানতে পারলেন। যদিওবা মুসকান কৌশলে কূজনের প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেল। সব শুনে তিনি মুসকানকেই কথা শুনিয়ে বললেন,
“তোর এভাবে নিজের শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে চলে আসা উচিৎ হয়নি। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িই তো মেয়েদের সব। নাহয় তোর জামাইয়ের সাথে একটু ঝামেলাই হয়েছে তাই বলে তুই এভাবে চলে আসবি? না, না এটা একদম ঠিক কাজ করিস নি।”
মুসকান নতমস্তকে বলে,
“হ্যাঁ ফুফি। এখন আমি নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছি। আমি এখনই ও-বাড়িতে ফিরে যাব।”
কাবেরি বেগম আহ্লাদী সুরে বলেন,
“তা তো যাবিই। কিন্তু যাওয়ার এত তাড়া কেন? এতদিন পর তোর দেখা পেলাম। আমি নিজের হাতে তোর জন্য কত রকমের রান্না করেছি। সেসব খেয়ে তারপর যা।”
মুসকান মৃদু হেসে নিজের ফুফির দিকে তাকায়।
★★★
খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকিয়ে মুসকান কাবেরি বেগমের সাথে বসেছিল। কিছুটা ভেবেচিন্তে সে বলে,
“ফুফি, আমি তাহলে এখন যাই। রাত হয়ে যাচ্ছে।”
“যাই বলতে নেই বল আসি। শোন, এখন যেহেতু তোর মা আর কোন ঝামেলা করতে পারবে না তাই আমার সাথে কিন্তু যোগাযোগ রাখবি। আর মাঝে মাঝেই এভাবে চলে আসবি।”
মুসকান মুচকি হেসে বলে,
“আমি তো আসবোই। তুমিও আমার শ্বশুর বাড়িতে চলে যেও কূজন ভাইয়ার সাথে।”
“তা তো যেতেই হবে। তোর ফুফা কিছু কাজে কক্সবাজারে গেছেন। তোকে কত স্নেহ করতেন লোকটা। তোর সাথে দেখা হয়েছে জানলে খুশিও হবেন। এরপর যখন আমি তোর শ্বশুর বাড়ি যাব তখন ওনাকে নিয়েই যাব।”
মুসকান উঠে দাঁড়ায়৷ কাবেরি বেগম স্নেহের সাথে তাকে বুকে জড়িয়ে নেন। অতঃপর বিদায় দেন। কূজনের সাথে মুসকান রওনা দেয়। সারা রাস্তা তাদের মধ্যে কোন কথা হয়না। আরিফের বাড়ির সামনে এসে কূজন গাড়ি থামায়। অতঃপর মুসকানের উদ্দ্যেশ্যে বলে,
“যা নিজের সংসার সাজা। বিয়ে একটি পবিত্র সম্পর্ক মুসকান। এই সম্পর্কের মর্যাদা দিতে শেখ। এখন যতোই যাই হোক দেখবি এক না এক সময় আল্লাহর কৃপায় তোর আর আরিফের মিল মোহাব্বত হবে। তোদের দুই হৃদয়ের সন্ধিও হবে। শুধু তোকে একটু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে।”
চলবে ইনশাআল্লাহ ✨