দুই হৃদয়ের সন্ধি পর্ব-১৫

0
450

#দুই_হৃদয়ের_সন্ধি
#পর্বঃ১৫
#লেখিকাঃদিশা_মনি

মুসকান কূজনের সব কথা উপলব্ধি করার চেষ্টা করে। আর পিছন ফিরে না তাকিয়েই চৌধুরী বাড়ির সামনে এসে কলিং বেল বাজায়। এতক্ষণ মনে সাহস সঞ্চার করলেও এখন অল্প অল্প ভয় লাগছিল। আরিফ তাকে দেখে যদি আবার রিয়্যাক্ট করে। ভয় লাগছিল খুব। মুসকানের ভাবনার মধ্যেই কেউ একজন এসে দরজা খুলে দেয়। মুসকান চোখ তুলে তাকাতেই আরিফকে দেখে ভয়ে ঢোক গিলে। আরিফ রাগী চোখে তাকায় মুসকানের পানে।

মুসকানকে পুনরায় নিজের বাড়িতে ফিরতে দেখে আরিফ প্রচণ্ড অবাক হয়ে যায়। সাথে তার ভীষণ রাগও হয়। মুসকানের উপর রাগ দেখিয়ে সে চিৎকার করে বলে,
“আপনি কেন আবার আমার বাড়িতে এসেছেন? খুব তো বড় মুখ করে নিজের প্রেমিকের সাথে বেরিয়ে গেলেন। তাহলে আবার কোন মুখে এবাড়ির চৌকাঠে পা রেখেছেন?”

মুসকান আরিফের এহেন কথায় ভীষণ কষ্ট পায়। তবে আর রাগের মাথায় সিদ্ধান্ত নেয় না সে। কূজন, কাবেরি বেগমের বলা কথাগুলো চিন্তা করে সে। তারা দুজনেই তাকে পরামর্শ দিয়েছে রাগের মাথায় কোন কিছু না বলতে। বরঞ্চ ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিতে। সেই সব কথা আমলে নিয়ে মুসকান আরিফের কথার বিপরীতে বলে,
“আমি নিজের শ্বশুর বাড়িতেই এসেছি। আপনি আমাকে এভাবে বলতে পারেন না।”

“কিসের শ্বশুর বাড়ি? আপনার কাছে এই সম্পর্কের কোন মূল্য আছে নাকি?”

“এতদিন হয়তো ছিল না তবে এখন থেকে আমার কাছে এই সম্পর্কের মূল্য অনেক। আমি চাই আমার সংসার সাজাতে। আর তাই তো আমি ফিরে এসেছি।”

কথাগুলো বলতে বলতেই আরিফকে পাশ কা’টিয়ে বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করল মুসকান। আরিফ চোখ পাকিয়ে দেখতে লাগল। তন্মধ্যে আতিকা চৌধুরীও চলে এলেন সেখানে। মুসকানকে ফিরে আসতে দেখে তিনি ভীষণ খুশি হলেন। যেন এই মুহুর্তেরই অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। ত্বরিত মুসকানের কাছে এসে তিনি বলেন,
“আমি জানতাম তুমি ফিরবে। সংসারের বাঁধন যে বড় বাঁধন। কোন মেয়েই যেই এই বাঁধন অস্বীকার করতে পারে না।”

মুসকানও নিজের অবস্থান পরিস্কার করতে বলে,
“জ্বি, আপনি একদম ঠিক বলেছেন ম্যাডাম। এবার আমিও নিজের সংসারে সম্পূর্ণ মনযোগ দেব। এই পরিবারের একজন যোগ্য বউ, ওনার একজন যোগ্য সহধর্মিণী হয়ে ওঠার চেষ্টা করব।”

বলেই আরিফের দিকে তাকায় মুসকান। আরিফ চোখ ফিরিয়ে নেয়। আতিকা চৌধুরী মুসকানের মাথায় হাত রেখে বলে,
“অতীতের তিক্ত স্মৃতি ভুলে এখন তুমি সামনের দিকে মনযোগ দাও। আর হ্যাঁ, এত জলদি পাকা গিন্নি হওয়ার দায়িত্ব নেই। সামনে যে তোমার এইচএসসি পরীক্ষা সেকথা মাথায় রেখো। অনেক দিন থেকে তো পড়াশোনার সাথে সম্পর্ক নেই। জানি তুমি অনেক মেধাবী ছাত্রী তবুও প্রস্তুতি নিতে হবে। তুমি যাও আগে ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি খেতে দিচ্ছি। খেয়ে তারপর পড়তে এসো।”

“আমি ফুফির বাড়ি থেকে খেয়েই এসেছি ম্যাডাম। আপনি চিন্তা করবেন না। আমি তাহলে রুমে যাই।”

“হুম, যাও।”

মুসকান নিজের আর আরিফের রুমের দিকে যায়। মুসকান চলে যেতেই আরিফ আতিকা চৌধুরীর সামনে এসে বলে, “তুমি কেন ঐ মেয়েটাকে কিছু বললে না আম্মু? ওর ভুলগুলো ওকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর প্রয়োজন ছিল।”

আতিকা চৌধুরী শান্ত স্বরে বলেন,
“দেখো আরিফ, মানুষ মাত্রই ভুল হয়। আর মুসকানের তো বয়স কম। তাছাড়া জানিসই তো ওর পারিবারিক অবস্থা। তাই ওর মধ্যে কিছু অসম্পূর্ণতা রয়েছে। তোকে তো একটু মানিয়ে চলতে হবে বল। সব সময় তো শুধু মেয়েরাই মানিয়ে নেবে না। ছেলেদেরও তো একটু মানিয়ে নিতে হবে।”

“কি বলছ কি আম্মু তুমি? ঐ মেয়ের বয়স কম। দেখে তো মনে হয়না এই মেয়ে কলেজে পড়ে। ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট লাগে দেখলে।”

আতিকা চৌধুরী হতাশ গলায় বলেন,
“তুই আসলে মেয়েটা সম্পর্কে কিছু না জেনেই কথা বলছিস। মুসকানের মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের পর যখন ও এসএসসি দিল তারপর থেকে তো দুই বছর ওর পড়াশোনাই বন্ধ ছিল৷ ওকে বাড়ির যাবতীয় কাজ সব করতে হতো। তারপর অনেক জেদ করে কলেজে ভর্তি হয়। তাই তো ও পিছিয়ে গেছে অনেকটা। ২০ বছর বয়সে এইচএসসি দেবে মেয়েটা।”

মুসকানের জীবনের এসব কথা শুনে এবার আরিফেরও একটু খারাপ লাগতে শুরু করে। আতিকা চৌধুরী বলে ওঠেন,
“প্রত্যেক মানুষের জীবনেই কিছু ভুল থাকে। মুসকানও কিছু ভুল করেছে। তুই ওর এই ভুলের কথা ভাবার সাথে ওর পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিও মাথায় রাখিস। আর ওর সাথে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা কর। বিয়ে তো কোন ছেলেখেলা নয়। মানিয়ে চললে দেখবি একসময় তোরা দুইজন সুখী হতে পারবি।”

আরিফ আতিকা চৌধুরীর কথায় যুক্তি খুঁজে পায়। অতঃপর নিজের রুমের দিকে যায়। মুসকানের সাথে কিছু বলে নেওয়া প্রচণ্ড জরুরি। আতিকা চৌধুরী মনে মনে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করে বলেন,
“আল্লাহ তুমি দেখো, এই দুই জনের মনের মিলটা যেন হয়। দুজনে যেন একদিন এই পবিত্র বন্ধনের মর্যাদা বুঝতে পেরে একে অপরের সাথে সুখী দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করে।”

★★★
আরিফ রুমে প্রবেশ করতেই দেখতে পায় মুসকান রুহিকে নিজের কোলে নিয়ে বসে আছে। আদরে ভড়িয়ে দিচ্ছে ছোট বাচ্চাটাকে।

মুসকান রুহিকে কোলে নিয়ে বাচ্চাটার মাসুম চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকে। রুহি কি মায়াবী চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মুসকান রুহিকে নিয়ে আগে যেসব কথা বলেছিল সেসবের জন্য অনুতপ্ত বোধ করে বলে,
“ইশ, কতটা খারাপ কাজ করেছি আমি। রাগে ক্ষোভে এতটা অন্ধ ছিলাম যে, একটা ছোট বাচ্চার সম্পর্কে কিনা কি বলেছি। আমাকে তুমি ক্ষমা করে দিও আল্লাহ।”

আরিফ ধীর পায়ে এগিয়ে আসে। অতঃপর খানিকটা কাঠিন্য বজায় রেখে বলে,
“রুহি জাগল কিভাবে? আমি তো ওকে ঘুম পাড়িয়ে ছিলাম।”

মুসকান আচমকা এমন কথা শুনে থতমত খেয়ে যায়। ধীরে সুস্থে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
“আমি এসে দেখলাম ও জেগে গেছে এবং কাঁদছে। তাই কোলে নিয়ে ওর কান্না থামানোর চেষ্টা করছিলাম।”

“ওহ।”

এরপর কিছু সময় পিনপিতন নীরবতা বজায় থাকলো। আরিফ মুসকানের পাশে এসে বসল। নিজের কন্ঠে নমনীয়তা এনে বলল,
“আপনাকে আমি কিছু বলতে চাই মুসকান। আপনি মন দিয়ে আমার কথা শুনবেন।”

“আচ্ছা, শুনব।”

“আমি আগেও আপনাকে বলেছি এখন আবারো বলছি আমার কাছে আমাদের এই সম্পর্কটাকে সহজে স্বাভাবিক করার সময় লাগবে। কিন্তু আপনার ধৈর্যের অভাব এবং আবিরের কথা আমাকে রাগিয়ে দিয়েছিল। আমি রাগের মাথায় আপনার সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করে ফেলেছি। সেসবের জন্য আপনার কাছে মন থেকে ক্ষমা চাচ্ছি।”

মুসকানও অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে বলে,
“আমিও ক্ষমা চাইছি।”

আরিফ রুহিকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে বলে,
“আমি এখনো আগের কথাই বলবো। আমার সময় লাগবে। এত সহজে আমরা আদর্শ স্বামী-স্ত্রী হয়ে উঠতে পারব না। তবে ভালো বন্ধু হয়ে থাকতেই পারি।”

মুসকান মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানায়। অতঃপর দুজনেই সমস্বরে হেসে ওঠে। ছোট্ট মুসকানও তাদের সাথে তাল মিলিয়ে খিলখিল করে হাসে। সবমিলিয়ে যেন এক অপূর্ব মুহুর্তের সৃষ্টি হয়।

★★★
সময়ের স্রোত নিজের মতো এগিয়ে চলছে। মুসকান ও আরিফের সম্পর্ক এখন ভীষণ বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তারা এখন একে অপরকে অনেক ভালো বোঝে। আর কোন ঝামেলাও হয়নি তাদের মাঝে। এরমধ্যে মুসকানের এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়া হয়ে গেছে। পরীক্ষার রেজাল্টও আসা শেষ। মুসকান গোল্ডেন এ+ পেয়েছে। বাড়িতে খুশির বন্যা বয়ে গেছিল। আতিকা চৌধুরী, আরিফ দুজনেই তার এই সাফল্যে ভীষণ খুশি হয়েছে। এই সাফল্য উদযাপন করতে সবাই সপরিবারে রেস্টুরেন্টে ডিনারও করেছে। কূজনও ফোন করে মুসকানকে অভিনন্দন জানিয়েছে। সব কিছুই অনেক বেশি স্বাভাবিক। তবে মুসকান হাত পা গুটিয়ে বসে নেই। পরীক্ষার রেজাল্ট আসতে না আসতেই সে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে এডমিশনের প্রস্তুতি নিতে। মুসকানের বাবার ইচ্ছা ছিল তাকে ডাক্তার বানাবে। সেই ইচ্ছা পূরণেই বদ্ধপরিকর মুসকান। মেডিকেলে এডমিশনের প্রিপারেশন আগে থেকেই ছিল। এখন পুরোদমে প্রস্তুতি চলছে। আরিফেরও সহায়তা পাচ্ছে সে।

চলবে ইনশাআল্লাহ ✨