দুই হৃদয়ের সন্ধি পর্ব-১৬

0
415

#দুই_হৃদয়ের_সন্ধি
#পর্বঃ১৬
#লেখিকাঃদিশা_মনি

মুসকান অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে চলেছে। মেডিকেলে এডমিশন টেস্ট দিয়েছিল সে। আজ এডমিশন টেস্টের রেজাল্ট আসার কথা। মুসকানের বুক ক্রমান্বয়ে ধুকধুক করে চলেছে। যদিও পরীক্ষা যথেষ্ট ভালো দিয়েছে তবুও মনে খচখচানি থেকেই যায়। হাজার হোক, মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষা কোন চাট্টিখানি কথা না। লাখ লাখ মানুষ এখানে অংশগ্রহণ করে। তাদের সাথে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে গুটিকয়েক জন এই বিশেষ সুযোগ পেয়ে থাকে।

মুসকান মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে স্বরণ করে চলল অবিরাম। সাথে নিজের মৃত বাবার কথাও ভাবল। বাবার কথা মনে করতেই তার ভীষণ কষ্ট হলো৷ লোকটা ভীষণ ভালোবাসতো যে তাকে। মুসকান আজও ভাবে তার বাবা বেঁচে থাকলে তার জীবনটা আজ অন্যরকম হতো। এতটা কষ্ট পেতে হতো না তাকে।

মুসকানের এমন ভাবনার মধ্যেই আতিকা চৌধুরীর ডাকে বাইরে বেরিয়ে ড্রয়িংরুমে উপস্থিত হয় সে। মুসকানকে দেখামাত্রই আতিকা চৌধুরী এসে জড়িয়ে ধরেন তাকে। আতিকা চৌধুরী ভুবন ভোলানো হাসি দিয়ে বলেন,
“আমি জানতাম তুমি পারবে। অবশেষে তুমি আমার বিশ্বাসের মর্যাদা রেখেছ। আমাদের সকলের মাথা গর্বে উঁচু করে দিয়েছ। বি প্রিপেয়ার মুসকান টু বি ডাক্তার মুসকান।”

মুসকানের মুখে অফুরন্ত খুশির ঝিলিক ফুটে ওঠে। এই খুশি ভাষায় বলে প্রকাশ করানো যাবে না। স্বপ্ন পূরণের আনন্দ যে কল্পনাতীত। মুসকান উত্তেজিত স্বরে বলে,
“তার মানে আমার মেডিকেলে এডমিশন হয়ে গেছে? আমি এখন ডাক্তার হতে পারব! নিজের বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে পারব।”

মুসকানের আনন্দ আজ সীমানা ছাড়া। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে পৃথিবীর সবথেকে খুশি মানুষ। মুসকানের এই খুশির মাত্রা আরো বেড়ে যায় যখন আরিফ মিষ্টি কিনে নিয়ে এসে উপস্থিত হয়। অতঃপর মিষ্টির প্যাকেট থেকে মিষ্টি বের করে মুসকানকে নিজ হাতে খাইয়ে দিয়ে বলে,
“অভিনন্দন আপনাকে মুসকান। আপনি নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছেন।”

মুসকান হাসি মুখে আরিফের দিকে তাকায়। আরিফের সাথে সংসারে এখন সে পুরোপুরি মানিয়ে নিয়েছে। তাদের সম্পর্কও অনেকটা স্বাভাবিক হওয়ার পথে। যদিও বা এখনো শারীরিক ভাবে কাছে আসে নি তারা, তবে মনের সন্ধির দিকে অনেকটাই এগিয়ে এসেছে দুজনে। হয়তোবা খুব শীঘ্রই তাদের দুই হৃদয়ের সন্ধিও হতে চলেছে।

★★★
কূজন, কাবেরি বেগম ও তার বাবা আব্দুল মান্নানকে সাথে নিয়ে উপস্থিত হয়েছে চৌধুরী বাড়িতে। মুসকানের মেডিকেল এডমিশনের কথা শুনে কাবেরি বেগমই আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন মুসকানের সহিত দেখা করার জন্য। তাই তো আজ তারা সপরিবারে উপস্থিত হয়েছে।

বর্তমানে সোফায় মুসকানের ঠিক পাশেই বসে আছেন কাবেরি বেগম। মুসকানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলছেন,
“আল্লাহর কাছে দোয়া করি তুই এভাবেই নিজের জীবনে এগিয়ে যা। আর যেন তোকে পিছনে ফিরে না তাকাতে হয়।”

কূজনও মুসকানের এই সাফল্যে প্রচন্ড খুশি। নিজের স্বপ্নটা পূরণ না হলেও যে মুসকানের স্বপ্নটা পূরণ হয়েছে এটাই তাকে খুশি করে দিয়েছে। আব্দুল মান্নানও বেশ স্নেহ করেন মুসকানকে। তিনি মুসকানের এই খুশিতে আনন্দিত হয়ে বলেন,
“তোমার মেডিকেলে এডমিশনের খবর শুনে সত্যি ভীষণ আনন্দ পেয়েছি মুসকান। আজ যদি মারুফ ভাই বেঁচে থাকতেন তাহলে খুব খুশি হতেন।”

নিজের বাবার কথা মনে পড়তেই মুসকানের চোখে জল চলে আসে। কাবেরি বেগম সেটা বুঝতে পেরে বলেন,
“তুই কাঁদিস না মুসকান। আজ তো তোর খুশির দিন। ভাইয়া বেঁচে থাকলে আজ কত খুশি হতেন। আমি জানি তিনি যেখানেই আছেন তোর এই সাফল্যে ভীষণ খুশি হয়েছেন। তুই এভাবে কাঁদলে তো তার খারাপ লাগবে তাইনা?”

মুসকান সম্মতি সূচক মাথা নাড়ায়। এরমধ্যে আতিকা চৌধুরী সেখানে উপস্থিত হয়ে বলেন,
“আপনারা যে এসেছেন তাতে আমি খুব খুশি হয়েছি। মুসকান অনেকদিন থেকেই আপনাদের কথা বলতো। আরিফ কিছু কাজে বাইরে গেছে একটু পরেই ফিরবে। আপনারা কিন্তু কেউ না খেয়ে যাবেন না। আমাদের সাথে একেবারে ডিনার করে তারপর ফিরবেন।”

সকলেই খুশি হয়। অতঃপর কাবেরি বেগম আর আব্দুল মান্নানের সাথে গল্পে মেতে যান আতিকা চৌধুরী। কিছুক্ষণের মধ্যে আরিফ চলে আসলে কূজনও তার সাথে আড্ডা দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। রাতে ডিনারের পরই তারা ফিরে যায়।

★★★
রাতে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আকাশের চাঁদ দেখতে ব্যস্ত মুসকান। পূর্ণিমার চাঁদটাকেও আজ বেশি সুন্দর লাগছে। যখন আমাদের মন খুশি থাকে তখন আশেপাশের সবকিছুই একটু বেশি ভালো থাকে।

ওদিকে রুহিকে ঘুম পাড়িয়ে আরিফ এসে দাঁড়ালো মুসকানের পাশে। সামান্য কেশে নিজের উপস্থিতি জানান দিলো। মুসকান পিছু ফিরে তাকাতেই আরিফ বলে উঠলো,
“এই নিন আপনার ফোন। বারবার রিং হচ্ছিল।”

মুসকান ফোনটা হাতে নেয়। আরেকবার কল আসতেই রিসিভ করে নেয়। বিপরীত দিক থেকে কেউ ভীষণ কাতর কন্ঠে বলে ওঠেন,
“কেমন আছিস মুসকান?”

নিজের জননীর কন্ঠ চিনতে ভুল হয়না মুসকানের। এটা মরিয়ম বেগমরই ফোন। দাঁত চেপে নিজের কান্না আটকায় সে। অতঃপর বেশ কঠিন গলায় বলে,
“কেন ফোন করেছ তুমি?”

“তোর কথা হঠাৎ করে খুব মনে পড়ছিল।”

মুসকান তাচ্ছিল্য হেসে বলে,
“এখন এসব আলগা পিরিত দেখিয়ে কি হবে আম্মু? যখন তোমাকে আমার সবথেকে বেশি প্রয়োজন ছিল তখন তো তুমি আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে ছিলে। নিজের দ্বিতীয় স্বামী-সংসার নিয়ে এতোটাই ব্যস্ত হয়ে গেলে যে আমার দিকে তোমার খেয়ালই ছিল না। আমার প্র‍তি হওয়া অন্যায় অত্যাচার দেখেও না দেখার ভান করে ছিলে। এমনকি তোমার স্বামী যখন এক বয়স্ক ব্যক্তির সাথে আমার বিয়ে দিতে উদ্যত হলো তখনও চুপ ছিলে তুমি। বুকে হাত দিয়ে বলো তো আব্বুর মৃত্যুর পর মা হওয়ার কোন দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করেছ কি তুমি?”

মরিয়ম বেগম চুপ করে থাকেন। কি বলবেন তিনি? তার যে বলার মতো কিছু নেই। মুসকানের করা কোন অভিযোগই যে মিথ্যা নয়। তবুও দীর্ঘ ক্ষণের নীরবতা ভেদ করে তিনি বললেন,
“আমার হাত পা যে বাধা ছিল!”

“খুব হাস্যকর কথা বললে তুমি। আসল কথা কি জানো? তুমি আসলে চাইলেই আমার প্রতি হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারতে কিন্তু তুমি করোনি। কারণ তোমার কাছে আমার থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল তোমার নতুন সংসার। যাক গে সেসব কথা। অতীতের বিষাক্ত স্মৃতি আমি মন থেকে মুছে ফেলতে চাই। তোমাকে একটা সুখবর দেই, আমি মেডিকেলে চান্স পেয়েছি। আর কিছু বছরের মধ্যে আমি আমার বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে পারব। একজন ডাক্তার হতে পারব।”

মুসকানের কথা শুনে মরিয়ম বেগম খুশি হয়ে বলেন,
“তুই সত্যি বলছিস মুসকান? তুই সত্যি মেডিকেলে চান্স পেয়েছিস?”

“হ্যাঁ পেয়েছি৷ কিন্তু এতে তোমার কোন অবদান নেই। আমি ভুলিনি আম্মু কিভাবে তোমার দ্বিতীয় বিয়ের পর যখন তোমার স্বামী আমার পড়াশোনা বন্ধ করে দেয় তখন তুমি বিন্দুমাত্র প্রতিবাদ না করে সেসব কিছু মেনে নাও। ভাগ্যিস কিছু বছরের মধ্যে আমি ঘুরে দাঁড়িয়েছিলাম। নিজের অধিকার নিয়ে কথা বলতে শিখেছিলাম। তাই আমি এই যায়গায় পৌঁছাতে পেরেছি। যাইহোক ভালো থেকো। আমি নিজের জীবনের সুখ খুঁজে নিয়েছি। তুমিও মন দিয়ে তোমার সংসার করো। আর পারলে আমার জন্য দোয়া করো।”

“আমি সবসময় তোর জন্য দোয়া করব।”

মুসকান ফোনটা রেখে দেয়। এখন সত্যি ভীষণ কান্না পাচ্ছে তার। হঠাৎ করেই ডুকরে কেঁদে ওঠে মুসকান। আরিফ মুসকানের কান্না এসে তার একেবারে কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়। মুসকান আরিফের কাধে মাথা রেখে কাঁদতে শুরু করে। আরিফ সযত্নে মুসকানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে,
“কেঁদে নিন। কাঁদলে মন হালকা হবে। তবে এটাই কিন্তু আপনার শেষ কান্না হওয়া চাই। সামনে থেকে আমি আপনাকে সবসময় খুশি দেখতে চাই।”

চলবে ইনশাআল্লাহ ✨