#দুই_হৃদয়ে_সন্ধি
#পর্বঃ৪
#Nova_Rahman
চৌধুরী বাড়িতে আজ আত্মীয় স্বজনের ভীড় জমেছে। চৌধুরী বাড়ি আজ সজ্জিত হয়েছে নতুন রূপে। ইফতারের দাওয়াতে আজ সকল আত্নীয় স্বজন চৌধুরী বাড়িতে এসেছে। ছোট ছোট বাচ্চারা এদিক সেদিক দৌড়াদৌড়ি করছে। বড়রা বসে বসে গল্পগুজব করছে।
জাহানারা চৌধুরী আর তরু মিলে রান্নাঘরে আত্মীয়দের জন্য ঘরোয়া ইফতারের আয়োজন করছে। একা হাতে মেয়েকে নিয়ে রান্না করতে অনেক বেগ পোহাতে হচ্ছে জাহানারা চৌধুরীর। বড় জা কে একা একা কাজ করতে দেখে রান্নাঘরে ছুটে আসেন মিলি চৌধুরী। জাহানারা চৌধুরী সম্পর্কে মিলি চৌধুরীর বড় জা হয়। ভাগ বন্টনের পরে তারা আলাদা বাসায় থাকেন। ছেলে তিহানকে বাহিরে খেলতে পাঠিয়ে দিয়ে রান্না ঘরে আসে মিলি। বড় জ’য়ের হাতে হাতে সাহায্য করে দিচ্ছেন মিলি চৌধুরী। এতে করে কাজের চাপ কম পড়ায় স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন জাহানারা চৌধুরী।
__ডয়িং রুমের সোফায় বসে পায়ের উপর পা তুলে টিভি দেখছে তাতান চৌধুরীর বোন লাবণ্য মাহতাব ও তার মেয়ে লারা মাহতাব। দুনিয়া এপিঠ ওপিঠ হয়ে যাচ্ছে তারপরেও এই মা মেয়ের অহংকারী বড়লোকি স্বভাব পরিবর্তন হচ্ছে না। এইতো কয়দিন আগে অবৈধ ব্যবসার জন্য লাবণ্যর স্বামীকে পুলিশ গ্রেফতার করে।
ভাঁজে আপ্ত করা হয় অবৈধ ব্যবসার কালো টাকা। সকল অর্থ সম্পত্তি সরকারের আন্ডারে চলে যায়। লাবণ্য ঐ দিন সাহায্যের জন্য দৌড়ে আসে বড় ভাই তাতান চৌধুরীর কাছে। তাতান চৌধুরী বোনের এমন দূর্দশা দেখতে না পেরে কিছু টাকা তুলে দেয় লবণ্যের হাতে। এসপি বন্ধুর সাহায্যে, বাবার পরিচয় গোপন করে লবণ্যের বড় ছেলে রাজ মাহতাবকে পুলিশ কনস্টেবলের চাকরিও পায়িয়ে দেয় তাতান চৌধুরী। এতো কিছুর পরেও লাবণ্য ও তার ছেলে মেয়ের স্বভাব পরিবর্তন হয়নি। জাহানারা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের কাজে মনোযোগি হোন।
‘তাতান সাহেবের দুই ভাই এক বোন। তাতান চৌধুরী বড়। বোন লাবণ্য মেজো, আর ছোট ভাই তাসিফ চৌধুরী মিলেই তাদের ছোট্ট সংসার ছিল। বর্তমানে তাসিফ চৌধুরী তার ছেলে ও বউকে নিয়ে অন্য বাসায় তাকে। বোন মিলি বাবার দেওয়া একটা বাসায় বর্তমানে ছেলে মেয়েকে নিয়ে থাকছে। স্বামীর বলতে কিছুই নেই তার।’
তাতান চৌধুরী, ছেলে তেজ ও ছোট ভাই তাসিফ চৌধুরীকে নিয়ে বেরিয়ে পরে ইফতার বিতরণের উদ্দেশ্যে। চৌধুরী ভিলা থেকে কিছুটা দূরে একটা বস্তি আছে। বস্তির মানুষগুলো দিন আনে তো দিন খায়। হতদরিদ্র মানুষগুলোর পক্ষে দূর্লভ্যের এই বাজারে অল্প আয়ে পরিবারের জন্য ভালো খাবার জোগান দেওয়া সম্ভব হয়ে উঠে না। হতদরিদ্র এই মানুষ গুলোরও ইচ্ছে করে ইফতারিতে একটু ভালো খাবার খাবে। কিন্তু সাধ্যের মধ্যে হয়তো ভালো খাবার ভাগ্যে জুটে না। __
_মিটিট পাঁচেকর মধ্যেই গাড়ি এসে তামল বস্তির মূল ফটকে। পাশের মেইন রোডে কয়জন ষাটোর্ধ্ব বয়সের লোক রাস্তা মেরামতের কাজ করছে। তাতান সাহেব গাড়ি থেকে নামতেই, রাস্তার কাজ ফেলে রেখে ক’জন লোক দৌড়ে আসে তাতান সাহেবের নিকটে। গামে জবজবে ভেজা পড়নের ফতুয়া, হাতে পায়ে অজস্র ময়লা নিয়ে তাতান সাহেবকে জড়িয়ে ধরে এক বৃদ্ধ লোক। তাতান সাহেবও হেসে তাকে বুকে জড়িয়ে নেন। এই মানুষ গুলোর সাথে তাতান সাহেবের যেনো আত্নার মিল আছে। তাই তো নিরদ্বিধায় মানুষ গুলো তাকে জড়িয়ে ধরছে।__
সবার সাথে কুশল বিনিময় করে ইফতার বন্টনের কাজ শুরু করা হয়। একে একে সবার হাতে আজকের ইফতার সহ এক মাসের খাবার তুলে দেওয়া হয়। ব্যাগ নিয়ে অপর প্রান্তের মানুষটা যখন মন খুলে হাসে। তখন মনে হয় , এই তো আমার জন্য একজন মানুষ হাসছে। তখন নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হয়। তাতান চৌধুরীর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। ঐ দুখিনীদের হাসতে দেখে তাতান সাহেব নিজেও হাসেন।
“এই তো শান্তি, চোখের শান্তি, মনের শান্তি, শুধু শান্তি আর শান্তি।”
__ইফতার সামনে নিয়ে বসে আছে চৌধুরী বাড়ির সবাই। কিচ্ছুক্ষণ আগেই ইফতার বন্টনের কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরেছে তাতান চৌধুরী। আর মাত্র আধঘন্টা বাকি আছে আযান দেওয়ার। তাতান সাহেব একবার দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন তো আরেকবার সদর দরজার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করছেন। প্রান প্রিয় বন্ধর এখন এসে পৌছায়নি । __
তরু টেবিলের এক কোনায় চুপচাপ বসে রয়েছে। চঞ্চল মেয়ের চঞ্চলতা আজকে যেনো বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। ইফতারির প্লেট থেকে আলুর চপ সরানোর বিন্দু মাত্র প্রয়াস চালাচ্ছে না সে।
“ ঐ রক্তিম সূর্যের প্রখর রশ্মি যেনো আজ নিমিয়ে গেছে।”
“ তরুর বুকের শহরে আজ রক্তক্ষরণ হচ্ছে কোনো এক অজানা অনুভূতির কারনে।”
তরু যখন থেকে জানতে পেরেছে, তার বাবার বন্ধুর ছেলের সাথে তার বিয়ে ঠিক করে রাখা হয়েছে সেই সূদুর অতীত কাল থেকে। তখন থেকেই তরু চুপচাপ হয়ে পড়েছে।
“ তরুর মনে কোনো এক অজানা অনুভূতি বার বার জানান দিচ্ছে। তরু তুই তর বাবার বন্ধুর ছেলেকে বিয়ে করতে পারিস না। তুই অন্য কাউকে ভালোবাসিস। তর মন অন্য কারো জন্য পুলোকিত হয়।”
“কে সে? কে সেই মানব?”
__রোদ?
তরু নিজের মনকে নিজেই প্রশ্ন করে। আমি কি রোদকে ভালোবাসি? আমার মনের অজানা অনুভূতিরা কী রোদকে নিয়ে ভাবে?
পরক্ষণেই মনে হলো। না না না এ হতে পারে না।
‘তরু আবার নিজের মনকে প্রশ্ন করে। আচ্ছা প্রেম কী প্রথম সাক্ষাৎতে হয়? হয় না তো! তাহলে? তহলে কেনো আমার বেহায়া মন বার বার রোদকে নিয়ে ভাবছে। ’
তরুর ভাবনার মাঝেই এক কর্কশ শব্দে গাড়ির হর্ণ বেজে উঠলো। তাতান সাহেব বসা থেকে উঠে দাড়ালেন। ঠোঁটের কোণে দেখা মিলল এক চিলতে হাসির রেখা।
‘চৌধুরী বাড়ির সবার দৃষ্টি এখন সদর দরজার দিকে। তাতান সাহেবের বয়সী একজন লোক মিষ্টির পেকেট হাতে নিয়ে বাসায় প্রবেশ করল। তাতান সাহেব দৌড়ে গিয়ে প্রাণ প্রিয় বন্ধু আরহান হাওলাদার রিক কে জড়িয়ে ধরলো। একে একে চৈতালি হাওলাদার ও তার মেয়ে রোদসী হাওলাদার একা বাড়িতে প্রবেশ করলো। জাহানারা চৌধুরীও সবার সাথে কুশল বিনিময় করল। জাহানার চৌধুরী রোদসীর গাল টেনে দিয়ে বলল, বাহ্ রোদসী তুই তো দেখি অনেক বড় হয়ে গেছিস। প্রতিত্তোরে রোদসী শুধু হাসলো।’
ইফতার করার জন্য একে একে সবাই টেবিলে বসলো। তাতান সাহেব বন্ধু রিক সাহেব কে উদ্দেশ্য করে বলল, তা রিক আমার মেয়ের জামাই কোথায়? তাকে তো দেখছি না।__
রিক সাহেব বন্ধুর পিঠে একটা চাপড় দিয়ে বলল, বন্ধু এতো উতলা হয়ো না। তোমার মেয়ের জামাই গাড়ি পার্ক করে আসছে। তরু শুধু নিরব দর্শকের মতো সব দেখে যাচ্ছে।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যে সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত এক সূদর্শন ছেলে চৌধুরী বাড়িতে প্রবেশ করে। আবারও একবার সবার দৃষ্টি যায় সদর দরজার দিকে। তরু অবাক নয়নে তাকিয়ে রয়েছে পাঞ্জাবি পরিহিত লোকটির দিকে । তরুর অস্পষ্ট সুরে দুটি বাক্য উচ্চারণ করলো। ডাক্তার সাহেব!__
তরু আর কিছুই বলতে পারলো না। তার আগেই রোদ পাঞ্জাবির হাতা গোটাতে গোটাতে সবার সামনে এসে দাড়াল। রোদ একে একে সবার সাথে কুশল বিনিময় করল। লারা এক নয়নে তাকিয়ে রয়েছে রোদের দিকে। হ্যান্ডস্যাক করতে গিয়ে লারা তার হাত দিয়ে রোদের হাত চেপে ধরে রেখেছে। রোদ লারার চোখের সামনে তুড়ি বাজিয়ে বলল, মিস লারা হাতটা ছাড়েন। রোজা রমজানের মাসে চোখ দিয়ে একটা ছেলেকে ইভটিজিং করতে বিবেকে বাধছে না। লারা কিছটাু লজ্জা পেয়ে রোদের হাতটা ছেড়ে দেয়।
সবশেষে তরুর পালা আসে। রিক সাহেব তুরুর দিকে ইশারা করে বলল, এই যে দেখো রোদ। এই হচ্ছে আমাদের বাড়ির বউমা তুর তায়ত্বীম তরু। রোদ তরুর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে হতভম্ব হয়ে পড়ে। এ কাকে দেখছে রোদ। এ তো সে! রোদ অস্পষ্ট সুরে উচ্চারণ করল, এ তো সেই ডেঞ্জারাস মেয়ে!
তাতান সাহেব তরুর পাশে একটা চেয়ার টেনে দেয় রোদকে বসার জন্য। রোদ চেয়ারে বসে তরুর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। রোদকে এইভাবে নিজের দিকে তাকাতে দেখে তরু একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো। নিজেকে একটু স্বাভাবিক করে তরু রোদকে উদ্দেশ্য করে বলল, কি ডাক্তার সাহেব এইভাবে তাকিয়ে আছেন কেনো? কিছু বলবেন।
রোদ হ্যাঁ সূচক মাথা দোলায়। তরু চোখ দিয়ে ইশারা করে বলল,বলুন ডাক্তার সাহেব কি বলবেন? রোদ অনুমতি পেয়ে তরুর দিকে একটু ঝুকে এসে তরুকে প্রশ্ন করল। তুমি তো চৌধুরী বাড়ির মেয়ে। তাহলে ঐদিন মেডিক্যালের সামনে ফকিরের মতো ঘুরঘর করছিলে কেনো? তরু একটু ঝুকে এসে রোদের কানে ফিসফিস করে বলল, বাবার টাকা কমে যাচ্ছে ডাক্তার সাহেব। তাই মেডিক্যালের সামনে গিয়েছিলাম ভিক্ষা করতে।
রোদ খুব ভালো করে জানে এই মেয়ের মুখ দিয়ে কখন ভালো কথা বের হবে না। ত্যাঁড়া ত্যাঁড়া কথা বলাতেই তার পরিচয়। রোদ কথা না বাড়িয়ে খাবার খাওয়াতে মনোযোগি হয়। তরু যেনো হাফ ছেড়ে বাঁচে। এই লোকটার কাছে আসলে তরুর হার্টবিট অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে যায়। দুই দিনের পরিচয়ে একটা মানুষের প্রতি এতো মায়া কেমনে কাজ করে, তা জানা নেই তরুর।
বাসার কাজে একটু বাহিরে গিয়েছিল তেজ। বাসায় ফিরে হাওলাদার বাড়ির সবাইকে দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ল সে। তেজ দৌড়ে গিয়ে রোদের পাশের চেয়ারটাই ধপ করে বসে পড়ে । তরু রোদকে না চিনলেও তেজ রোদকে অনেক আগে থেকেই চিনে।
তেজ এবার রোদের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল,রোদকে দেখলো আর বলল, মাই গড ব্রো! তুমি তো চিকনা হয়ে আরো হ্যান্ডসাম হয়ে গেছো। তোমাকে এখন পুরো চিকনা চামেলকা ওয়াও ওয়াও লাগছে!
তেজের কথার বিপরীতে রোদ হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করল, চিকনা চামেলকা! চিকনা চামেলকা এটার মানে কী তেজ?
তেজ এবার রোদকে উদ্দেশ্য করে বলল, আরে ব্রো তুমি ঐ গানটা শোনোনি?
চিকনি চামেলি!
রূপবতী রূপসী, জোয়ান ছ্যাংড়া সপ্নের পরী
তেজের কথার বিপরীতে রোদ হ্যাঁ সূচক মাথা দোলায়। তেজ এবার রোদকে বলল, এখন তুমি তো ছেলে ব্রো! তোমাকে তো আর চিকনি চামেলি বলতে পারবো। কারন তোমাকে যদি এখন আমি চিকনি চামেলি বলে সম্মোধন করি। তাহলে তো তোমার জেন্ডার পরিবর্তন হয়ে যাবো ব্রো। আমি চাই বা আমার ভাইকে কেউ ঐসব বলুক। তাইতো চিকনা চামেলকা ওয়াও ওয়াও বললাম।
তেজের যুক্তি শোনে রোদের খাবার গলায় আটকে যায়। তাতান সাহেব এক গ্লাস পানি এগিয়ে দেয় রোদের দিকে। গলগল করে এক গ্লাস পানি শেষ করে ফেলে রোদ। দমটা এক্ষুনি বেরিয়ে আসছিল। কি সাং’ঘা’তি’ক কথাবার্তা! দুনিয়ায় যত ডে/ঞ্জা/রা/স কথাবার্তা আছে সব মনে হয় এই দু’ভাই বোনের মাথা উগলে দেওয়া হয়েছে। রোদ ভেবে পাচ্ছে না। কি সাং’ঘা’তি’ক এদের চিন্তাভাবনা।
তাতান সাহেব ছেলেকে দমক দিয়ে বলল, খাবার খাওয়ার সময় এতো কথা বলো কেনো? তেজ বাবার দমক খেয়ে এবার চুপচাপ খাবার খাওয়াতে মনোযোগি হয়। তরু এদের কান্ড দেখে মিটমিট করে হাসছে।
ইফতার শেষে সবাই নামজ পড়ে ডয়িং রুমে আসে আড্ডা দিতে। তাতান সাহেব এতোদিন পর প্রাণ প্রিয় বন্ধুকে পেয়ে কথার ঝুলি খুলে বসে। দুই বন্ধুর কথা যেনো আজ শেষেই হচ্ছে না। ঘড়িতে এখন রাত আট টা বাজে। চৈতালি হাওলাদার স্বামীকে তাড়া দেয় বাড়ি ফিরবার জন্য। রিক সাহেব হঠাৎতেই তাতান সাহেবকে কথার মাঝ পথে থামিয়ে দিয়ে বলতে লাগল,
‘তাতান রাত অনেক হয়েছে। এখন আমাদের এখন বাড়ি ফিরতে হবে।’
রিক সাহেবের এহেন কথায় তাতান চৌধুরী ছ্যাৎ করে উঠে। আঙুল উঁচিয়ে রিক সাহেবের সামনে গিয়ে এক প্রকার শাসিয়ে উত্তর দেয়, আজকে তোমরা কোথাও যাচ্ছো না। আজকে তোমরা সবাই এই বাড়িতেই থাকবে। রিক সাহেব কিছু বলতে যাবে তার আগেই তাতান চৌধুরী হাত উচিয়ে রিক সাহেবকে থামিয়ে দিলো।
‘আর বলতে লাগলো, আমি আর একটা কথাও শুনতে চাই না।’
বন্ধুর কথার বিপরীতে আর কোনো কথা খুজে পেলো না রিক সাহেব। বন্ধুর জোড়াজুড়িতে রিক সাহেব আজকে চৌধুরী ভিলায় থাকার সিদ্ধান্ত নেয়।
‘সারাদিনের ব্যস্তার পর ক্লান্তিতে সবার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। সবাই বিশ্রাম নিতে নিজ নিজ কক্ষে চলে যায়। আজকে রোদ তাকবে তেজের কামরায়। আর রোদসী থাকবে তরুর কামরায়।’
এই কয়েক মিনিটের মধ্যেই তরু আর রোদসী খুব ভালো ফ্রেন্ড হয়ে গেছে। রোদসী হাতের মোবাইলটা নিয়ে বেলকনিতে চলে যায়। বেলকনিতে যাওয়ার আগে তরুকে বলে গিয়েছে সে যেনো ঘুমিয়ে পড়ে। তার এখন একটা কাজ আছে। রোদসী কাজ শেষ করে পরে ঘুমাবে। তরু আর কথা বাড়ায়নি। এমনিতেই তরুর আজকে একটা মিশন আছে। খুব ইম্পর্ট্যান্ট মিশন সেটা। তেজ আর মেহু তাকে না জানিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম করছে। এ সত্যি আর মেনে নেওয়া যাচ্ছে না না না। আজকে তরু হাতে নাতে ধরবে তেজ আর মেহুকে।
রোদ কোনো জামাকাপড় নিয়ে আসেনি। এজন্য তেজ তার এক সেট জামা এনে দেয় রোদকে। ওয়াশরুমে গিয়ে অনেক সময় নিয়ে ফ্রেশ হয় রোদ। পাঞ্জাবি পাল্টে তেজের দেওয়া গেঞ্জি আর প্যান্ট পড়ে বেরিয়ে আসে রোদ।__
সারাদিন কাজ করাই ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিছানায় লেটকা মেরে পড়ে থাকে তেজ। দিন দুনিয়ায় খবর আজকে সে রাখবে না। আজকে শুধু ঘুম আর ঘুম।
তেজকে ঘুমাতে দেখে রোদ আর ডেকে বিরক্ত করল না। রোদ তার মোবাইটা নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে পরে বাগানের উদ্দেশ্যে। রোদ এ বাড়িতে আসার সময় দেখেছিল বাগানটা বিশাল বড়। বহু প্রজাতির ফুল গাছ বাগান জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। বাসার ভিতর বড্ড বোরিং লাগছে। তাই বাসা থেকে বেরিয়ে বাগানের আসে রোদ ফ্রেশ হাওয়া গায়ে মাখতে।
“বাগানটা ঘুরে ঘুরে দেখছিল রোদ। কিছুটা পথ অতিক্রম করতেই রোদের বড্ড হিসু চাপ দেয়। রোদ পাশেই একটা ঝোপ দেখতে পায়। দৌড়ে গিয়ে ঝোপের আড়ালেই বসে পরে ইম্পর্ট্যান্ট কাজ সারতে।”
“তরু ফোনের ফ্লাশ অন করে, আস্তে করে পা টিপে টিপে বাগানে আসে। তরু মিনমিন করে বলতে লাগল, আজকে তেজকে হাতে নাতে ধরবই ধরবো। তেজ আজকে তকে ধরতে পারলে তুই শ্যাষ শ্যাষ শ্যাষ!”
“তরু হাঁটতে হাঁটতে বাগানের শেষ প্রান্তে চলে আসে। হঠাৎতেই তরুর চোখ যায় পাশের একটা ঝোপে। ঝোপের আড়ালে কি যেনো একটা নড়াচড়া করছে। তরু শ’য়’তা’নি হাসি দিয়ে বলতে লাগল, তেজ আজকে তুই সত্যি সত্যি শ্যাষষষষ!”
__ তরু এক দৌড় দিয়ে ঝোপের কাছে চলে আসে। তরু দেখতে পেলো ঝোপের আড়ালে কেউ একজন বসে আছে। তরু ঝোপরে আড়ালে তেজকে মনে করে একটা শ’য়’তা’নি হাসি দিয়ে হাত পা নাচিয়ে গান গায়তে লাগল,__
“ হেই চাঁদনী রাতে বদনা হাতে ”
কুত্তা দিলো ডাক, আরে আমি তো অবাক!
আকস্মিক পিছন থেকে এমন ভয়ংকর গলার সাউন্ড শোনে হকচকিয়ে যায় রোদ। রোদের বুঝতে আর বাকি রইল না পিছনের ডে/ঞ্জা/রা/স ব্যক্তিটি কে। রোদ কোনো রেসপন্স না করে এভাবেই বসে থাকে। ঝোপরে আড়ালের ব্যক্তিটির থেকে কোনো রেসপন্স না পেয়ে তরু আবার গান গায়তে লাগল,____
“ দেইক্কে লাইছি কইয়া দিমু,”
“হেই দেইক্কে লাইছি কইয়া দিমু”
তুমি বাগানে বসে প্রেম করছ!
রোদ তার ইম্পরট্যান্ট কাজ শেষ করে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। প্যান্টের চেইন লাগিয়ে তরুর দিকে ফিরল। তেজের জায়গায় রোদকে দেখে তরুর গলা শুকিয়ে মরুভূমির হয়ে গেছে। হাসি হাসি মুখটা নিমিষেই চুপসে গিয়েছে। তরু খুব বুঝতে পারছে সে সাং’ঘা’তি’ক এক কান্ড বাধিয়ে ফেলেছে। এখন কি হবে ভাবতেই তরুর শরীর ঝংকার দিয়ে উঠছে।
রোদ দু পা হেটে তরুর দিকে একটু ঝুকে এলো। রোদকে নিজের এতো কাছে দেখে হার্টবিট অস্বাভাবিক ভাবে বাড়তে থাকে তরুর। দৌড় দেওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুুত করে নেয় তরু। আল্লার নাম নিয়ে তরু যেইনা দৌড় দিতে গেলো, তার আগেই রোদ হেঁচকা টানে তরুকে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়।
তরুর হাত পা অনবরত কাপছে। শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। রোদকে দেখলেই তরুর অবস্থা এমনিতেই খারাপ হয়ে যায়। এখন রোদকে নিজের এতো কাছে দেখে দম বন্ধ হয়ে আসছে তরুর। দুই হাতে ধাক্কা দিয়ে রোদকে নিজের থেকে একটু সরানোর বৃথা চেষ্টা করল তরু। __
রোদ এবার তরুকে উদ্দেশ্য করে বলল, নিজের শক্তি অপচয় করে কেনো লাভ নেই। আমি না চাইলে তুমি এমনিতেও আমার কাছ থেকে যেতে পারবে না। রোদ এবার তরুকে চোখ টিপ মেরে জিজ্ঞেস করল, তা ঐ সময় তুমি কি জানি দেখেছিলে তরু! সবাইকে বলবে বলছিলে। আমাকেও একটু বলো কি ইম্পরট্যান্ট জিনিস ছিল সেটা। আমিও একটু দেখি।
ভয়কে সাইডে রেখে তরুর এখন লজ্জায় কান গরম হয়ে যাচ্ছে। কি নির্লজ্জ লোকরে বাবা। রোদ আবার কিছু বলতে যাবে, তার আগেই তরু দু-হাত দিয়ে রোদের মুখ চেপে ধরে। তরু এবার রোদকে উদ্দেশ্য করে বলল, চুপ করুন অসভ্য লোক। আপনার মুখ এমন লাগামহীন কেনো? লাজ লজ্জা কি সব নর্দমায় ভাসিয়ে দিয়েছেন।
রোদ এবার তরুর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল, তরুকে দেখল আর বলল, ম্যাডাম! আপনি হয়তো ভুলে গেছেন আমি একজন মেডিক্যাল স্টুডেন্ট। আর মেডিক্যাল স্টুডেন্টদের লজ্জা শরম বলতে কিছু থাকে না। সব লজ্জা শরম বিসর্জন দিয়ে মেডিক্যালে ভর্তি হয়েছি আমি। এখন তোমার আর আমার মধ্যে যা আছে, আর ভবিষ্যতে যা হবে। সব কিছুই হবে খুল্লাম খুল্লাই। মিস তরু প্রস্তুত হয়ে যান মিসেস হাওলাদার হওয়ার জন্য।
চলবে ____ইনশাআল্লাহ