#দুই_হৃদয়ে_সন্ধি
#পর্বঃ৭
#Nova_Rahman
রোদের মুখে আমার ছোট্ট বউ কথাটি শুনে, নীহারিকা একটু লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে ফেলে। রোদের পুরো কথা না শুনেই নীহারিকা নিজেকে রোদের বউ মনে করে লজ্জা পেতে থাকে।
রোদ যাওয়া পরেই নীহারিকাও মেডিক্যাল হোস্টেলে ফিরে আসে। রোদ নিজের রুমে এসে হাতের ব্যাগটা সাইডে রেখে সোজা হয়ে শুয়ে পড়ে বিছানায়।
রোদকে এইভাবে বিছানায় শুয়ে পড়তে দেখে, পাশ থেকে উদয় দৌড়ে এসে রোদের মাথায় হাত রেখে তাপমাত্রা চেক করে। না তাপমাত্রা তো ঠিকি আছে। তাহলে হঠাৎ রোদ বাসা থেকে এসে এইভাবে শুয়ে পড়ল কেনো? উদয় একটু চিন্তিত হয়ে রোদকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করলো,কি মামা! বাড়ি থেকে এসেই এইভাবে শুয়ে পড়লি যে। কোনো সমস্যা হয়েছে নাকি? কোনো সমস্যা হলে আমাকে বল। আমি সব সমস্যার সমাধান করে দিবো। উইথ আউট নো মানি।
উদয়ের এমন উদারতা দেখে রোদ শুয়া থেকে উঠে বসে। উদয়কে জাপ্টে ধরে রোদ বলতে লাগল, মাম্মা একটা বউ এনে দে। আই নিড একটা ছোট্ট কিউট বউ!, প্লিজ মামা। রোদের এমন অস্বাভাবিক কথা শুনে উদয়ের আচমকা হেঁচকি উঠে যায়। উদয় নিজেকে একটু স্বাবিক করে, রোদকে উদ্দেশ্য করে বলল, মামা এইসব কি বলছো? মাথা ঠিক আছে তোমার? বাসা থেকে এসেই বউ বউ করছো।
উদয়ের এমন খাপছাড়া প্রশ্নে রোদ বিরক্ত হয়ে উত্তর দিলো,মাথা আমার ঠিকিই আছে মামা। শুধু একটা বউ নেই। বউ হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। এখন বলো বউ এনে দিবা কি দিবা না।
উদয় বেশ বুঝতে পেরেছে, এই ছেলে সাতসকালে লাল পানি গিলে এসেছে। না হলে সকাল সকাল হোস্টেলে এসে কোন ছেলে এমন বউ বউ করে। উদয় এবার রোদের কাধে হাত রেখে, রোদকে উদ্দেশ্য করে বলল, কি মামা বাড়িতে গিয়ে এইবার কোনো ভাবির সন্ধান পেয়েছো নাকি? উদয়ের কথার বিপরীতে রোদ একটু লজ্জা পাওয়ান ভান করে হ্যাঁ সূচক মাথা দুলাল।
উদয় আরও আগ্রহ নিয়ে রোদকে জিজ্ঞেস করলো, মামা ভাবি কী দেখতে হেব্বি জোস! উদয়ের কথা শুনে রোদ ভ্রু কুঁচকে তাকাল উদয়ের দিকে। রোদ একটু ঝুঁকে এসে উদয়ের প্রশ্নের বিপরীতে উত্তর দিলো,হ্যাঁ মামা তর ভাবি দেখতে হেব্বি জোস্! এক্কেবারে খেয়ে ফেলার মতো জোস্!
হঠাৎ করে রোদকে এমন বউ পাগল হতে দেখে উদয় মানে মানে কেটে পরে এখান থেকে। বলা তো যায় না রোদ কখন উদয়ের মাঝে নিজের না হওয়া বউকে ইমেজিং করে উল্টা পাল্টা কাজ করে বসবে। উদয়ের মান ই’জ্জ’তে’র তখন সব দফারফা হয়ে যাবে। মেডিক্যালের সবাই তখন উদয়ের দিকে ইশারা করে কানাকানি করে বলবে, এইযে দেখ উদয় নামক নষ্ট ছেলেটা আসছে। যাকে রোদ নামক চকলেট বয় খেয়ে ছেড়ে দিয়েছে। কি সাং’ঘা’তি’ক!
উদয় নিজেকে রোদের বউয়ের জায়গায় রেখে ইমেজিং করে অত্নকে উঠল। রোদকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বেরিয়ে পড়ে রুম থেকে।
উদয়কে এমন হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে যেতে দেখে রোদ কুঁচকানো ভ্রু জোড়া আরো কুঁচকিয়ে ফেলে। উদয় চলে যাওয়া সাথে সাথেই রোদ আবারও চার হাত পা মেলে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে। পকেটে হাতড়ে নিজের ফোনটা নিয়ে গ্যালারিতে যায় রোদ।
তরুরদের বাড়িতে বাগানের ঐ ঘটনাটাকে রোদ ক্যামেরা বন্দী করে রেখেছিল। রোদের মনে পড়ে ঐ সময়ের কথা, যখন রোদ এক হাত দিয়ে তরুকে নিজের সাথে চেপে ধরে রেখেছিল। আর অন্য হাত দিয়ে নিজের ফোনে তরুর আর তার সুন্দর একটা ছবি ক্যামেরা বন্দী করেছিল। রোদ এক হাত দিয়ে তরুকে ধরে অন্য হাত দিয়ে সেলফি নিচ্ছিলো, আর তরু ক্যামেরার দিকে না তাকিয়ে, একমনে রোদের দিকে তাকিয়ে ছিল। তাদের সেই সুন্দর মূহুর্তের ছবিটাও ছিল মারাত্মক কিউট।
রোদ ছবিটা দেখছে আর হাসছে। রোদ ছবিটা দেখে বারংবার অবাক হয়ে ভাবছে, এই ছোট্ট মেয়েটা হৃদপিণ্ডের ডাক্তারে হৃদপিণ্ড জখম করেছে। ভাবা যায়! রোদ ছবিটা দেখল ভাবলো আর বলল,
“শোনো মেয়ে”,
তুমি নিজেও জানোনা তুমি কতটা সাং’ঘা’তি’ক লেভেলের ভ’য়া’ন’ক। আমি চাই না তোমার এই ভ’য়া’ন’ক রূপ দেখে অন্য কোনো হার্টের ডাক্তারের হার্ট চলাচল বন্ধ হয়ে যাক। তোমার ঐ ভ’য়া’ন’ক রূপে বারংবার আমি মরতে চাই। তবে নচেৎ অন্য কেউ নহে।
সারারাত পড়াশোনা করে ভোর রাতে ঘুমিয়ে পড়ে তরু। এলামের কর্কশ শব্দে ঘুম ভাঙল তরুর। শুয়ে থেকে হাতড়ে বন্ধ করলো সেটা। এলোমেলো চুলগুলো খোপা করে বিছানা থেকে নেমে আসে। অনেক সময় নিয়ে বাতরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয় তরু। ঘুমে ঢুলুঢুলু মাথাটা যেন বার বার চক্কর মারছে। ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে নিজেকে একটু পরিপাটি করে নিলো। আলমারি থেকে স্কুলের ইউনিফর্মটা বের করে সেটা পড়তে লাগল তরু। সারারাত না ঘুমানোর জন্য মাথাটা ঝিমঝিম করছে। নিজেকে একটু স্বাভাবিক করে ঘুম কাটানোর জন্য তরু জুড়ে জুড়ে চিৎকার করে গান গায়তে লাগলো___
“ দেখা হে পেহেলি বার ”
“তাল গাছের উপর মুরগির খোঁয়াড় ”
“কুত্তা নাচে বিলাই নাচে ঠ্যাং ঠ্যাংগা ঠ্যাং”
তেজ সবেমাত্র রেডি হয়ে তরুর রুমের সামনে এসে দাড়াল। বোনের মুখে ঘুরে-ফিরে সেই ডেঞ্জারাস গান শুনে আত্নকে উঠে তেজ। দুই কানে হাত দিয়ে নিজের কানের মাগফিরাত কামনা করল তেজ। পরিক্ষা শুরুর আগে এমন এক বোম ব্লাস্ট হবে জানা ছিল না তেজের। তেজ কানে হাত দিয়ে বলতে লাগল, চুপ কর আমার প্রিয় বোন। এইভাবে সেইভাবে ডেঞ্জারাস গান গেয়ে, বেচারা তর এই আবলা ভাইটাকে মেরে ফেলার ফন্দি করিস না।
রুমের বাহিরে তেজকে এইভাবে কান ধরে দাড়িয়ে তাকাতে দেখে, তরু দৌড়ে যায় ভাইয়ের কাছে। তরু গোলগোল চোখ করে তাকিয়ে তাকে তেজের দিকে। তরু যেনো আজ পৃথিবীর এক অষ্টম আশ্চর্য দেখছে। তেজ কিনা তার রুমের বাহিরে কান ধরে দাড়িয়ে রয়েছে। ব্যাপারটা হাস্যকর হলেও সত্যি। এমন একটা সুন্দর মূহুর্তকে তরু ক্যামেরা বন্দি করতে মিস করলো না।
তরু ফোনটা রেখে তেজকে উদ্দেশ্য করে বলল, তেজ ভাই আমার, কি হয়েছে তর? তুই এইভাবে আমার রুমের সামনে কান ধরে দাড়িয়ে আছিস কেনো? তুই কি আমার সাথে করা কোনো পাপের প্রায়শ্চিত্ত করছিস। এমন কোনো ঘটনা থাকলে তুই আমাকে বলতে পারিস। আমি আবার মহান মনের মানুষ। পাপিদের ক্ষমা করার মহত গুন নিয়ে জন্ম হয়েছে আমার।
তেজ কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল, বোন আমার তর মুখটা কি এক সেকেন্ডের জন্যও বন্ধ হয় না। দয়া করে তর মুখটা একটু বন্ধ কর। তুই কেনো বুঝতে পারিস না, তর মুখ দিয়ে যখনি কথা বের হয়। তখনি আমার মাথার উপর একটা বোম ব্লাস্ট হয়। আর পাপের কথা বলছিস! তর মতো যার একটা বোন আছে তার আবার পাপ লাগে। তার জীবন এমনিতেই তেজ পাতা হয়ে যাবে।
তরু হতাশ! খুবি হতাশ। তার মতো এতো সুন্দর একটা বোন থাকতেও তেজ যে কেনো আফসোস করে। এই ব্যাপারটা তরুর কাছে বোধগম্য হয় না। তরুর একটা হতাশার শ্বাস ফেলে পা বাড়াল সামনের দিকে। তেজও গেলো তরুর পিছনে পিছনে। জাহানারা চৌধুরীর সাথে দেখা করে তেজ আর তরু বেরিয়ে পরে বাসা থেকে। তাতান চৌধুরী গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল তেজ আর তরুর জন্য। তেজ আর তরু গাড়িতে বসতেই গাড়ি স্টার্ট দিলেন তাতান চৌধুরী। মেডিক্যালের সামনে এসে গাড়ি থামালেন তাতান চৌধুরী। তরু আর তেজ গাড়ি থেকে নেমে আসে। তাতান চৌধুরী ছেলে মেয়েকে বিধায় জানিয়ে গাড়ি নিয়ে চলে যায় মেডিক্যালের ভেতরে।
মেডিক্যাল থেকে পাঁচ মিনিটের দূরত্বে তেজদের স্কুল। মেডিক্যাল থেকে পাঁচ মিনিটের রাস্তা হাঁটলেই স্কুল দেখা যায়। তেজ আর তরু হাটতে হাটতে চলে আসে স্কুলে। তেজ বোনকে বিদায় দিয়ে চলে যায় ছেলের হলে। আর তরু যায় মেয়েদের হলে। তরু হলে যেতেই মেহু দৌড়ে এসে তরুকে জড়িয়ে ধরে। ঘন্টা বাজতেই স্যার চলে আসে খাতা নিয়ে। সবাই যার যার সিটে গিয়ে বসে পড়ে। প্রশ্ন দেওয়া কয়েক মিনিটের মধ্যেই সবাই নিজের মতো লিখতে শুরু করে। তরু প্রশ্ন হাতে নিয়ে দেখলো আর বলতে লাগল, আরে ভাই আজকের প্রশ্নে তো সব আনকমন আইটেম ভরপুর। কমন কোনো আইটেমেই দেখছি না।
তরু প্রশ্নটাকে হাতে নিয়ে মুচড়ে মুচড়ে একদম দলা পাকিয়ে দিয়েছে। এমন ভ’য়ং’ক’র প্রশ্ন করার অপরাধে তরু পারলে তো ইংলিশ টিচারকে মেরে তক্তা বানিয়ে দিতো। কিন্তু যতই হোক টিচারের সাথে এমন চরম লেভেলের বেয়াদবি,তরু কিছুতেই করবে না।
তাই তরু অতি শুদ্ধ ভাষা ব্যাবহার করে, ইংলিশ টিচারকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগল, শ্রদ্ধেয় স্যার এমন কঠিন প্রশ্ন করার অপরাধে আমি তো আর আপনাকে মারতে পারবো না। তাই মনে মনে আপনার পশ্চাতে চারটা লাথি। আর প্রাণের অন্তরের অন্তস্তল থেকে আপনাকে তিনটা অ/শ্লী/ল গা’লি।
পরিক্ষা শেষে তেজ তরু আর মেহু একসাথে দেখা করে মাঠে। পরিক্ষা নিয়ে বিভিন্ন আলাপ আলোচনা করে বেরিয়ে পরে স্কুল থেকে। স্কুলের একদম সামনেই মেইন রোড। তরু তেজ আর মেহুর মতো আরও অনেক স্টুডেন্ট দাড়িয়ে আছে স্কুলের মেইন গেইটের সামনে। কেউ কেউ গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছে। আবার কেউ কেউ গাড়ি পেয়ে বাড়ি চলে যাচ্ছে। তরু আর মেহু এক সাথে দাড়িয়ে কথা বলছিল। হঠাৎ করে শো শো শব্দ করে অতি দ্রুত একটা খালি ট্রাক চলে যায় তরু আর মেহুর সামনে দিয়ে। খালি ট্রাকে লুঙ্গি পড়ে দাড়িয়ে ছিল দুইটা লোক। দ্রুত বেগে ট্রাক যাওয়ায় দমকা বাতাসে দুইটা লোকের লুঙ্গি একদম আকাশে উঠে যায়।
ট্রাকের লোকদের এমন অবস্থা দেখে সকল ছাত্রছাত্রীরা এক সাথে হইহই করে উঠে। সবার এতো হইচই দেখে, হঠাৎ করে তরুর মনের কবিতা সত্তাটা জেগে উঠে। তরু তার কবিপ্রতিভা দেখাতে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই তেজ দৌড়ে এসে তরুর মুখ চেপে ধরে।
পিছনে থেকে মেহু দৌড়ে এসে দাড়াল তেজের সামনে। সকল ছাত্রছাত্রীদের পাশ খাটিয়ে মেহু ট্রাকের লোকদের উদ্দেশ্য করে বলতে লাগল,,
“আঙ্কেল! উড়ন্ত বাতাসে ”
“আপনাদের লুঙ্গি আকাশে”
“ভাগ্যিস আন্ডারওয়্যার ছিল নিচে”
“ না হলে আপনাদের মানসম্মান যেতো সব ভেসে”
তরুর মতো মেহুর মুখেও এমন ডে’ঞ্জা’রা’স কথা শুনে, তেজের এবার মাথায় না হৃদপিণ্ডে বোমা ব্লাস্ট হয়েছে। তেজ এবার তরুর মুখ থেকে হাত সরিয়ে, নিজের বুকের বা পাশটায় চেপে ধরলো। ইশশ! খুব বাজে ভাবে জখম হয়েছে হৃদপিণ্ডটা। তেজ খুব বুঝতে পারছে, তার আর বেশি দিন বাস্তবি নেই। তার আয়ু কমে আসছে। দিনকে দিন এমন অপুষ্টিকর কথা শুনলে কার বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করবে। তেজের তো এক্ষুনি মাঠির নিচে ঢুকে যেতে ইচ্ছে করছে।
মেহুর মুখে এমন উদ্ভট কবিতা শুনে সকল ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে হাসির রোল পড়ে যায়। হাসতে হাসতে রীতিমত একজন আরেক জনের গায়ে ঢলে পরছে। তেজ বিরক্ত হলেও মেহু বিষয়টাকে খুব উপভোগ করছে। তেজ এইসব সহ্য করতে না পেরে মেহু আর তরুকে রেখেই চলে আসে বাড়িতে। তরুর কাছে কোনো টাকা নেই। তরু বাড়ি আসতে গিয়ে পড়ে যায় মহা মুশকিলে। তেজ তার নিজের মায়ের পেটের ভাই হয়ে, তরুকে রেখে চলে গেছে বাড়িতে। এটা ভাবতেই তরুর রাগে দুঃখে শরীর জ্বলে উঠছে। অন্যথায় কোনো উপায় না পেয়ে মেহু আর তরু হাটা লাগায় মেডিক্যালের উদ্দেশ্যে। মেডিক্যালে এসে বাবা তাতান চৌধুরী কাছ থেকে টাকা নিয়ে বাসায় ফিরবে তরু।
তরুর যেই ভাবনা সেই কাজ। মেহুকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসে মেডিকেলের সামনে।
চলবে _ইনশাআল্লাহ