দুই_হৃদয়ে_সন্ধি পর্ব-০৮

0
332

#দুই_হৃদয়ে_সন্ধি
#পর্ব_৮
#Nova_Rahman

দীর্ঘ পাঁচ মিনিটের রাস্তা অতিক্রম করে মেডিকেলর সামনে এসে দাড়াল তরু। রোজা রেখে টাকফাটা রোদের মধ্যে পাঁচ মিনিটের রাস্তাটাকে বাংলাদেশ থেকে ভারতের মধ্যেকার দূরত্ব মনে হচ্ছে।

তরু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাশের দোকান থেকে একটা মাক্স কিনে সেটা পড়ে নিলো মুখে। স্কুল থেকে বাসা বেশি দূরে না হলেও, রোজা রেখে বাসা পর্যন্ত হেটে যাওয়া তরুর পক্ষে সম্ভব বলে মনে হয় না। শহরের ভেতর বাসা হওয়ার দরুন গাড়ির বাড়া অত্যন্ত বেশি। তাই উপায় না পেয়ে বাবার কাছে আসা।

ভাবনা থেকে বেরিয়ে ক্লান্ত শরীর নিয়ে টালমাটাল পা ফেলে মেডিকেলে প্রবেশ করলো তরু। শরীরে সর্বশক্তি যেনো চুষে নিয়েছে সূর্যিমামা। পা দু’টো নাড়ছে তো নড়ছে না।

একটার পর একটা সিড়ি বেয়ে তরু এসে দাড়াল দ্বিতীয় ফ্লোরে কর্ণারের ক্লাস রুমের সামনে। বাবা, তাতান চৌধুরীর কন্ঠস্বর ভেসে আসছে ক্লাস রুম থেকে। তরু একটা জানালা খুলে উঁকি মেরে ক্লাস রুমের ভিতরকার পরিস্থিতি বুঝার চেষ্টা করলো। তাতান চৌধুরী হোয়াইট বোর্ডের সাথে একটা কঙ্কাল ঝুলিয়ে, পাশের একটা টিভি স্ক্রিনের মধ্যে মানুষের শরীরের ভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের বিষয় নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের সাথে আলোচনা করছেন। সামনে বসা মেডিকেল স্টুডেন্ট গুলো খুব মনযোগ সহকারে, তাতান চৌধুরীর কারানো ক্লাসটাকে বুঝার চেষ্টা করছে। মনযোগ একটু এদিকে সেদিক হলেই গুরুত্বপূর্ণ টপিক মিস করে যাবে সবাই।
ছাত্রছাত্রীদের এমন মমযোগ সহকারে ক্লাস করতে দেখে, তাতান চৌধুরীও খুব গুরুত্ব সহকারে স্টুডেন্টদের টপিক বুঝাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

তরু কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থেকে বুঝতে পারলো। বাবা, তাতান চৌধুরী আজকে মেডিকেল স্টুডেন্টদের খুব ইম্পরট্যান্ট ক্লাস করাচ্ছেন। এখানে ক্লাস চলাকালীন বাবার কাছে টাকা চাইতে গিয়ে ক্লাসের পরিবেশ নষ্ট করার কোনো মানেই হয় না। তরু কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থাকলো। পরক্ষণেই কিছু একটা ভেবে দ্রুত পা চালিয়ে নিচে চলে আসলো তরু। হসপিটালে প্রত্যেক ডাক্তারের আলাদা করে বরাদ্দকৃত একটা কেবিন থাকে।। যেখানে বসে ডাক্তাররা রোগী দেখে। তরু হাটতে হাটতে একটা কেবিনের সামনে এসে দাড়াল। যেখানে দরজার উপরের নেইম-প্লেটে বড় করে ড.তাতান চৌধুরী লেখা। তরু বুঝতে পারলো এটাই তার বাবার কেবিন। তরু শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে কাঁচে দরজাটা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করলো। হাতের ফাইলটা রেখে, একটা চেয়ার টেনে সেটাই বসে পড়লো তরু। শরীর ক্লান্ত থাকায় টেবিলের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে তরু।

ক্লাস শেষ করে ড. তাতান চৌধুরী গায়ের এপ্রোনটা খুলে হাতে নিয়ে, বন্ধু ড. এহসানের সাথে গল্প করতে করতে নিচে আসে। বন্ধুকে বিদায় দিয়ে নিজের বরাদ্দকৃত কেবিনে চলে আসেন তাতান চৌধুরী। একটানা তিন ঘন্টা ক্লাস করানোর জন্য বড্ড ক্লান্ত লাগছে শরীরটা। কেবিনে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে রানিংয়ে যাবে রোগী দেখতে। দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করতেই, নিজের বরাদ্দকৃত কেবিনে কাউকে অনুমতি ব্যতিত বসে তাকতে দেখে কিছুটা অবাক হলেন তাতান চৌধুরী।

এক পা দু’পা করে সামনে এগিয়ে গেলো তাতান চৌধুরী। সামনে বসা ব্যাক্তিটিকে এক নজর দেখেই চিনে ফেললেন তাতান চৌধুরী। তরু সচরাচর হসপিটালে আসে না। তরুর মতে হসপিটাল হলো অশান্তির জায়গা। যেখানে আসলে শুধু মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর আপন মানুষ হারানোর হাহাকার শোনা যায়। তাতান চৌধুরী মেয়েকে অনেক বার বুঝিয়েছেন। আম্মু সবকিছুর যেমন ইতিবাচক দিক আছে ঠিক তেমন নেতিবাচক দিকও আছে। হসপিটালে আসলে যেমন আপনজন হারানোর আত্মচিৎকার শোনা যায়। ঠিক তেমন সদ্য জন্ম নেওয়া একটা নবজাতক শিশুকে পাওয়ার আনন্দে একটানপরিবারে হাসি মুখও দেখা যায়। তাই সবকিছু বিচার করতে হলে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই দিক নিয়েই বিচার করতে হবে।

তাতান চৌধুরী মেয়েকে এইভাবে তার কেবিনে বসে থাকতে দেখে কিছুটা চিন্তিত হলেন। কাছে গিয়ে মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন। বড্ড আদরের মেয়ে তার। হঠাৎ করে মেয়েকে হসপিটালে দেখে একটু চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। মাথায় হাত রাখার পর একটু চিন্তা মুক্তা হলেন তাতান চৌধুরী। না মেয়ের শরীর খারাপ হয়নি। তাতান চৌধুরী এবার আস্তে করে তরুকে উদ্দেশ্য করে ডাকতে লাগলো, বাবার ডাকে আস্তেধীরে পিটপিট করে চোখ মেলে তাকালো তরু। বাবাকে সামনে দেখে দুইহাত দিয়ে তরু জড়িয়ে ধরলো তাতান চৌধুরীকে।
তাতান চৌধুরীও হেসে একহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরেছেন মেয়েকে।
তরু এবার বাবাকে ছেড়ে দিয়ে গাল ফুলিয়ে বসে থাকে। মেয়েকে হঠাৎ এইভাবে গাল ফুলিয়ে বসে থাকতে দেখে, তাতান চৌধুরী কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়েন। মেয়েকে নিজের দিকে ফিরিয়ে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কিছু হয়েছে আম্মু? বাবার কথার বিপরীতে তরু হ্যাঁ সূচক মাথা দুলালো। তাতান চৌধুরী এবার কিছুটা সিরিয়াস হয়ে মেয়েকে প্রশ্ন করলো, কি হয়েছে আম্মু? তাড়াতাড়ি বলো আমায়।
বাবা তাতান চৌধুরীর অনুমতি পেয়ে তেজের বিরুদ্ধে তরু তার অভিযোগের ঝুলি খুলে বসে। তেজের বিরুদ্ধে বাবার কাছে ইনিয়ে বিনিয়ে বিচার দিলো তরু। যেটা হয়েছে সেটাও বলেছে, আবার যা হয়নি তা বানিয়ে বলেছে। এক কথায় কেইস শক্ত হতে হবে। একদম ঢিলে ঢালা হলে চলবে না। একটু ঢিলে হলেই হাত ফসকে বেরিয়ে যাবে তেজ।

কর্কশ শব্দে পাশে রাখা তাতান চৌধুরীর মুঠো ফোনটা বেজে উঠে। তাতান চৌধুরী ফোনটা হাতে নিয়ে, তরুকে আশ্বাস দিয়ে বলল, আম্মু তুমি কিছুক্ষণ এখানে বসো। আমি ফোনে কথা বলা শেষ করে, তোমাকে বাসায় ড্রপ করে দিয়ে আসবো। বাবার কথার বিপরীতে তরু শুধু হ্যাঁ সূচক মাথা দুলালো। তাতান চৌধুরী ফোন নিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে যেতেই, তরু আবার সেই আগের মতোই টেবিলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে। এখন একটু ঘুম দরকার। তরু হায় তুলে আবার সেই আগের মতোই ঘুমিয়ে পড়ে।

তাতান চৌধুরী একটু দূরে গিয়ে ফোনটা রিসিভ করলো। তাতান চৌধুরী কল রিসিভ করে,অপর প্রান্তের ব্যাক্তিটিকে সুন্দর করে সালাম দিলেন। তাতান চৌধুরীর সালামের বিপরীতে, অপর প্রান্তের সিনিয়র ডাক্তার সুন্দর ভাবে সালামের উত্তর দিলেন। কুশল বিনিময়ের পরে সিনিয়র ডাক্তার তাতান চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে বলল, তাতান আজকে রাতে একটা ক্রিটিকাল রোগী সার্জারী হবে। তাই সকল ডাক্তারদের নিয়ে একটা বোর্ড মিটিংয়ের ব্যবস্তা করেছি আমি। সেখানে তোমাকেও থাকতে হবে। এক ঘন্টার ভিতরে মিটিং শুরু হবে। তাই, এই মূহুর্তে তোমাকে হসপিটাল ছেড়ে কোথাও না যাওয়ার অনুরোধ রইলো।

সিনিয়র ডাক্তারের অনুরোধে না করতে পারেননি তাতান চৌধুরী। ইচ্ছে না থাকবার সর্তেও রাজি হতে হলো। এখন মূল কথা হলো, মেয়েকে বাড়ি পাঠাতে হবে। নিজেও যেতে পারবে না, আবার মেয়েকে একাও যেতে দিতে ইচ্ছে করছে না। পরক্ষণেই কিছু একটা ভেবে মুচকি হাসেন তাতান চৌধুরী। পকেট থেকে মুঠো ফোনটা বের করে, কল দিলো রোদের কাছে।

সবেমাত্র গোসল করে বের হয়েছে রোদ। ককর্শ শব্দে মুঠো ফোনটা বেজে উঠতেই, সেটা হাতে তুলে নিলো রোদ। ফোনের স্ক্রিনে শ্বশুর মশাই নামটা জ্বলজ্বল করছে। হাতের তোয়ালেটা রেখে তড়িঘড়ি করে কল রিসিভ করলো রোদ। তিন-চার বার রিং হওয়ার পর কল রিসিভ হওয়ায়, তাতান চৌধুরী তড়িঘড়ি করে বলে উঠে।
মেয়ের জামাই একটু সাহায্য লাগবে তোমার। না হওয়া শ্বশুর মাশাইয়ের মুখে, মেয়ে জামাই ডাক শোনে হতভম্ব হয়ে পড়ে রোদ। বারংবার মেয়ের জামাই কথাটা কানে বাজছে রোদের। ইসস! ইহা কি মধুর শব্দ বলে বুঝানো যাবে না। রোদ নিজেকে একটু স্বাভাবিক করে উত্তর দিলো, হ্যাঁ শ্বশুর মাশাই বলেন, আমি কি সাহায্য করতে পারি আপনার। নিজের মতো করে রোদকে উত্তর দিতে শোনে তাতান চৌধুরী শরীর দুলিয়ে হাসলেন।

তাতান চৌধুরী এবার রোদকে উদ্দেশ্য করে বলল,
রোদ, বর্তমানে আমার আন্ডারে থাকা একটা ইম্পর্ট্যান্ট জিনিস, তোমাকে আমার বাড়িতে গিয়ে রেখে আসতে হবে। আমার এখন একটা জরুরি মিটিংয়ে যেতে হবে। আমি যেতে পারছি না। তাই আমার হয়ে তোমাকে কাজটা করে দিতে হবে।
তাতন চৌধুরীর কথার বিপরীতে রোদ হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলো, সেই জিনিসটা কি শ্বশুর মশাই? তাতান চৌধুরী এবার রোদের প্রশ্নের বিপরীতে হেসে উত্তর দিলো, আমার কেবিনে গেলেই সেই ইম্পর্ট্যান্ট জিনিসটা কি, সেটা দেখতে পারবেন জামাই। রোদ মাথা চুলকে উত্তর দিলো, ঠিক আছে যাচ্ছি।
তাতান চৌধুরী কল কেটে দেওয়ার আগে রোদকে উদ্দেশ্য করে বলল, শোন জামাই! টেবিলের ড্রয়ারে আমার গাড়ির চাবি আছে। আমার গাড়িটা নিয়ে যেয়েও সাথে করে কেমন।
রোদ এবারও তাতান চৌধুরীর সাথে হ্যাঁ তে হ্যাঁ বলল।

রোদ তাড়াতাড়ি জামাকাপড় পড়ে রেডি হয়ে চলে যায় তাতান চৌধুরীর বরাদ্দকৃত কেবিনে। কাঁচের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা মিললো এক ঘুমন্ত পরীর। রোদ তাকাল,দেখল আর থমকালো। পরক্ষণেই নিজের বুকের বা পাশটায় হাত রেখে কারো অস্তিত্ব অনুভব করলো। ইসস! কি মারাত্মক সেই অনুভূতি।

রোদ দীপ্ত পায়ে হেটে একেবারে তরুর সামনে এসে দাড়াল। একটা চেয়ার টেনে তরুর সামনাসামনি বসলো। আস্তে করে মাক্সটা সরাতেই দেখা মিললো গামে জবুথবু হয়ে ভেজা তরুর মায়াময় মুখশ্রী। কিছু চুল এসে তরুর মুখে লেপ্টে রয়েছে। তরুর মুখে পড়ে থাকা এলোমেলো চুলগুলোকে রোদ হাতের সাহায্যে এক সাইড করে দিলো। রোদ একটু ঝুঁকে এসে তরুর ঘুমন্ত মুখশ্রীতে ফু দিয়ে তরুকে জ্বালাতে থাকলো। আচমকা কারো গরম নিঃশ্বাস মুখের উপর আঁচড়ে পড়ায়, তরুর ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে। পিটপিট করে চোখ মেলে তরু তাকালো সামনে বসা অনাকাঙ্খিত ব্যাক্তিটির দিকে।

তরু তাকালো দেখলো আর থমকাল। একি! এই লোক এখানে কি করছে। তরুকে এইভাবে থাকিয়ে তাকতে দেখে রোদ ভ্রু নাচিয়ে তরুকে জিজ্ঞেস করলো, কি ম্যাডাম! এইভাবে কি দেখছেন আমাকে ? বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে কিন্তু এই আহনাফ হাওলাদার রোদের প্রেমে পড়ে যাবেন। আই নো আই লুক লাইক বিউটিফুল বয়। তরু আবাকের উপর অবাক হচ্ছে। তরু ভ্রু কুঁচকে রোদকে প্রশ্ন করলো..

“আচ্ছা ডাক্তার সাহেব, নিজের রূপে প্রশংসা কেউ নিজে করে।”
রোদ একটু ঝুঁকে এসে তরুকে বললো, তার মানে তুমি মানছো যে আমি দেখতে সুন্দর।
তরু বিরক্ত হয়ে উত্তর দিলো,,এখানে মানামানির কি আছে। সুন্দরকে সুন্দর বলবো না তো কি কালাচাঁদ বলবো।
তরুর কথা শোনে রোদের কুঁচকানো ভ্রু আরো কুচকে যায়। রোদ কপালে আঙুল ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে তরুকে জিজ্ঞেস করলো, তরু তুমি তোমার ভবিষ্যত সুন্দর জামাইকে কালাচাঁদ বলে ডাকবে, এ অন্যায় কিন্তু আল্লাহ সহ্য করবে না।
তরু হালকা হেসে রোদের নাক টেনে দিয়ে বলল, উঁহু ডাক্তার সাহেব, কালাচাঁদ না, আমি আমার ভবিষ্যত জামাইকে সুন্দরচাঁদ বলে ডাকবো। তরুর কথার বিপরীতে রোদ ফিক করে হেসে দেয়।

রোদ নিজেকে একটু স্বাভাবিক করে তরুকে উদ্দেশ্য করে বলল, তরু শ্বশুর মশাইয়ের একটা জরুরী মিটিং পড়ায়, উনি তোমাকে বাসায় দিয়ে আসতে পারবে না। তাই আমাকে আসতে হলো। রোদের ভবিষ্যত বউ বলে কথা। একটু তো দায়িত্ব নিতেই হবে। চলো।

টেবিলের ড্রয়ার থেকে গাড়ির চাবিটা নিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে যায় রোদ। রোদকে যেতে দেখে তরুও ফাইলটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। তরু আসতেই গাড়ির দরজা খুলে দেয় রোদ। তরু হাতের ফাইলটা পেছনের সিটে রেখে রোদের পাশে এসে বসে। তরু এসে বসতেই গাড়ি স্টার্ট দেয় রোদ। বাহিরের শীতল বাতাসে তরুর চুলগুলো উড়ে এসে বারবার মুখে আঁচড়ে পড়ছে। তরু বিরক্ত হয়ে বার বার চুলগুলো সরিয়ে দিচ্ছে। লুকিং গ্লাসে তরুর এমন বিরক্তিমার্কা মুখ দেখে রোদ ঠোঁট এলিয়ে হাসে।

হঠাৎ রোদ কিছু একটা ভেবে তরুকে ডাক দিলো। রোদের ডাকে তরু রোদের দিকে ফিরে তাকাল। রোদ এবার তরুকে উদ্দেশ্য করে বলল, তরু ঐ যে সামনের রাস্তাটা দেখছো, ঐ রাস্তা দিয়ে কিছু পথ গেলে একটা জঙ্গল পাওয়া যাবে। আর ঐ বড় অন্ধকার জঙ্গলের ভিতরে নব্বই দশকের পুরনো একটা ভাঙ্গা বাড়ি আছে। খুবিই শুনশান সেই বাড়িটা।
রোদের কথার বাচনভঙ্গি দেখে তরু ভয় পেয়ে রোদের দিকে একটু চেপে বসে। তরু একটু সাহস নিয়ে রোদকে উদ্দেশ্য করে বলে, তো এখন আমি কি করবো?

তরুর কথার বিপরীতে রোদ তরুকে উদ্দেশ্য করে বলল, ঐ যে সিনেমায় দেখো না, ভিলেন জোর করে নায়িকাকে তুলে নিয়ে যায়। আর নিয়ে গিয়ে এমন জঙ্গলের ভেতরে শুনশান বাড়িতে বন্ধী করে রাখে। আর সুযোগ বুঝে নায়িকার সাথে জোরজবরদস্তি করে। আই মিন ইজ্জত লুটে নেওয়ার চেষ্টা করে।

রোদের কথার বিপরীতে তরু চিৎকার দিয়ে বলতে লাগল, চুপ করুন অসভ্য লোক। এমন অসভ্য মার্কা কথা জন্য আমি আপনার মুখে তালা লাগিয়ে দিবো। আমি ভেবেছিলাম আপনি ভুতের কথা বলছেন। আর এখন দেখছি আপনি এমন লুচ্চা মার্কা কথাবার্তা বলছেন। ছিহ!
ডাক্তার সাহেব আপনি কি জানেন, আপনি একজন চরম লেভেলের অসভ্য লোক।
রোদ তরুর দিকে একটু ঝুঁকে এসে বলতে লাগল, কেনো মেয়ে তুমি কি আজকে জানলে, আমি যে চরম লেভেলের অসভ্য। আর এতো সভ্য হয়ে কি করবো? আর ভবিষ্যত বউয়ের কাছে এতো সভ্য হলে বংশে বাতি জ্বলবেনা।

তরু আঙ্গুল উঁচিয়ে রোদকে উদ্দেশ্য করে বলল, দেখুন আমি কিন্তু ভয় পেয়েছিলাম। আর আপনি তখন থেকে অসভ্য মার্কা কথা বলেই যাচ্ছেন।
রোদ এবার তরুকে চোখটিপ মেরে বলল, কেনো ভয় পেয়েছিলে তরু? মানে আমি যদি তোমাকে এই নির্জন রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে কিছুমিছু করে বসতাম তার জন্য।
তরু নিজেকে স্বাভাবিক রাখবার বৃথা চেষ্টা করছে। তরু যে রোদের এমন অসভ্য আচারনে ভয় পেয়েছে এ কথা কোনক্রমেই বুঝতে দেওয়া চলবে না। না হলে রোদ তার অসভ্যতামির চরম লেভেলে চলে যাবে। তখন রোদকে সামলাতে হিমশিম খেতে হবে।

তরু এবার কোনো কথা না বলে চুপচাপ বসে থাকে। তরুকে এমন চুপচাপ বসে তাকতে দেখে রোদ তরুকে উদ্দেশ্য করে বলল, কি হলো মেয়ে চঞ্চলহরিণী চুপচাপ বসে আছো যে। তরু তার ত্যাড়া স্টাইলে ত্যাঁড়াভাবে উত্তর দিলো। আমার ইচ্ছে করছেনা।

রোদ এবার প্রসঙ্গ ঘুড়িয়ে তরুকে উদ্দেশ্য করে বলল, তা তরু তোমার মাথার চুল এতো ছোট কেনো? রোদের কথার বিপরীতে তরু উত্তর দিলো, আমার চুল লম্বা না হলে আমি কি করবো। কেনো আপনার কাছে ছোট চুল ভালো লাগেনা?
তরুর কথার বিপরীতে রোদ উত্তর দিলো, হুম ভালো লাগে। তবে লম্বা চুলে মেয়েদের বেশি সুন্দর লাগে। রোদকের কথার বিপরীতে তরু মন খারাপ করে বলল, কেনো,আমাকে বুঝি ছোট চুলে সুন্দর লাগে না? তরুর এমন বাচ্চামো দেখে রোদ তরুর দিকে একটু ঝুকে এসে বলতে লাগলো, লম্বা চুলে মেয়েদের সুন্দর লাগে আর ছোট চুলে তোমাকে ওভার সুইট লাগে। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে তোমাকে খেয়ে ফেলি। কিন্তু এখন সংযমের মাস চলছে। তাই খাওয়া দাওয়া বাদ দিয়ে তোমাকে দেখেই যাচ্ছি।
তবে তুমি চাইলে আমি রোজার পরে ট্রাই করতে পারি। এমনিতেও তুমি আমার ভবিষ্যত বউ হবে। বিয়ের আগে কিছু মিছু হলে সমস্যা নেই। বিয়ের পর ইয়াম্মি ইয়াম্মি টাইমে তোমাকে আর অস্বস্তিতে পড়তে হবে না। দেখলে আমি কত জনদরদি ডাক্তার।

তরু দুই হাত দিয়ে কান চেপে ধরে রোদকে উদ্দেশ্য করে বলল, চুপ করুন অসভ্য লোক । আমি আর আপনার এমন অসভ্য মার্কা কথাবার্তা নিতে পারছি না। রোদ কিছুটা হতাশ হয়ে বলল, আমার ভালোবাসা পূর্ণ কথাকে তুমি অসভ্যতামি বলছো। বিয়ের পর যখন সত্যি সত্যি অসভ্যতামি করবো তখন কি করবে তরু। তরু এবার চিৎকার করে বলে উঠলো, আল্লাহ তুমি মাটি ফাঁক করে দাও,আমি ভেতরে ঢুকে যায়। রোদ তরুকে থামিয়ে দিয়ে বলতে লাগলো, আল্লাহ তরুকে এখনি নিয়ে যেয়ো না। আমি তরুকে এখনও বিয়ে করিনি।
তরু এবার রোদের কলার চেপে ধরে বলতে লাগলো, আমি আপনাকে বিয়ে করবো না ডাক্তার সাহেব,এই আকাশ, বাতাস,গ্রহ, নক্ষত্রকে সাক্ষী রেখে বিয়ের আগেই আমি আপনাকে তালাক দিলাম। এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক। শ্যাষ! শ্যাষ! শ্যাষ!

চলবে_ইনশাআল্লাহ

[ ভুল হলে ক্ষমা করবেন]