#ধুসর_আকাশ
#সূচনা_পর্ব
#স্নিগ্ধতা_প্রিয়তা
–“বাবা, আমি এই মেয়েকে বিয়ে করতে পারবো না।তুমি প্লিজ আমাকে আর জোর করো না। যাকে বিয়ে করবো তাকে যদি ভালই না বাসতে পারি তাহলে সেই বিয়ে করে কি লাভ বলো? আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, তুমি নিশ্চয়ই চাইবে না যে, তোমার এত আদরের ভাতিজি কষ্টে থাকুক? ”
আজ প্রথম নিজের বাবার বিরুদ্ধে এতগুলো কথা বলল তমাল। ওর কথাগুলো শেষ হতে না হতেই ওর বাবা কষে একটা থাপ্পড় মারলেন। তারপর রাগে গজরাতে গজরাতে বললেন,
–“বিয়ে যখন করবিই না তাহলে ওর বিয়েটা ভেঙে কেন দিলি? বল, উত্তর দে আমার কথার। তুই যদি ওকে ভালই না বাসিস তাহলে বরকে ফোন করে কেন বলেছিস যে, তোর সাথে সাফিকার রিলেশন আছে? বল? ”
তমাল এইবার ভীষণ রেগে গেছে। ওর বাবার সামনে রাগটাকে কন্ট্রোল করার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না! দাঁতে দাঁত চেপে তমাল বলল,
–“তোমরা আমার কথা বিশ্বাস কেন করছো না? আমি বরকে কোনো কল করিনি, আর নাতো কিছু বলেছি। আর সাফিকার সাথে রিলেশনের কথা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনা! তোমরা সবাই জানো যে, ওই মেয়েটাকে আমি দুই চোখে সহ্য করতে পারি না! তাকে ভালবাসা বা বিয়ে করাতো দূরে থাক!”
–“এইজন্যইতো আমার সন্দেহ তোর উপর! তুই ছাড়া এই বিয়ে কেউ ভাংতে পারে না। যবে থেকে সাফিকাকে এখানে এনেছি তবে থেকেই তুই মেয়েটাকে সহ্য করতে পারিস না! তুই ওর বিয়ে ভাঙার জন্য এমন একটা জঘন্য কাজ করবি আমি ভাবতেও পারিনি! তোকে নিজের ছেলে ভাবতেও ঘৃণা লাগছে।”
–“বাবা! তুমি তোমার ছেলেকে এই চেনো! তোমার মনে হয় আমি এই ঘৃণিত কাজটা করতে পারি? আমি সিওর ওই ছেলেটাই বিয়ে করবে না। তাই এতসব ফন্দি আটছে। এমন একটা মেয়েকে কেইবা বিয়ে করতে চাইবে! জ্বলজ্যান্ত একটা রোবট! প্রথমে সুন্দরী দেখে হ্যাঁ বলে দিলেও পরে হয়তো ওর ব্যবহার দেখে, ওর সাথে কথা বলে আফসোস হচ্ছিল যে, এমন একটা মেয়েকে কি করে বিয়ে করবে!”
–“তমাল! তুই এত বড় একটা অন্যায় করার পরেও বড়বড় কথা বলে যাচ্ছিস! লজ্জা করছে না তোর? তোর জন্য সাফিকার জীবনটা আমি নষ্ট হতে দেবো না! এইসব শোনার পর আর কেউ রাজি হবে ওকে বিয়ে করতে! আমি তোর মতামত শুনতে চাইনি! আমি শুধুমাত্র আমার মতামত জানাচ্ছি।”
–“বাবা তুমি সাফিকাকে জিজ্ঞেস করে দেখো! আর আমার সাথে বিয়ে দিলে ও আরো দুঃখী হবে! তুমি বুঝতে পারছো না! আমি কিছুতেই ওকে হ্যাপি রাখতে পারবো না। বাবা প্লিজ! তুমি জেনেশুনে ওই মেয়েটার সাথে আমার জীবনটাও নষ্ট করে দিওনা। ওর জন্য আরো ভালো পাত্র পাওয়া যাবে! প্লিজ বাবা!”
–“ভালো পাত্র! আজকে মান-সম্মান না থাকলে তুই ভালো পাত্র দিয়ে কি করবি? এইভাবে তোর কারণে ওর বিয়ে ভেঙে গেছে শুনলে কোন ভালো পাত্র ওকে বিয়ে করতে রাজি হবে বল? আর সব আত্মীয়-স্বজনের কাছে আমার মুখ দেখানোর মতো ব্যবস্থা রেখেছিস তুই? আজ তোদের বিয়ে না হলে সবার সামনে মুখ দেখাতে পারবো ভেবেছিস?”
–“বাবা তুমি মান-সম্মানের কথা ভেবে আমাদের দুজনের জীবন-ই এভাবে শেষ করে দিতে পারো না! এতে কেউ সুখী হবো না। তুমি বরং সাফিকাকেই জিজ্ঞেস করো৷ আমি ১০০% সিওর ও নিজেও আমাকে বিয়ে করতে চাইবে না! আমি কথা দিচ্ছি, সাফিকা রাজি থাকলে আমি ওকে বিয়ে করে নিবো। ”
কথাগুলো বলেই তমাল ভাবতে লাগলো যে, সাফিকা নিশ্চয়ই ওকে বিয়ে করতে রাজি হবেনা। যদিও ফোনটা ও করেনি! কিন্তু যেই করে থাক, নামতো ওর-ই নিয়েছে! কে হতে পারে যে, ওকে এত বাজেভাবে ফাসিয়ে দিয়েছে! কিন্তু ও যে বলে দিলো যে, সাফিকা রাজি থাকলে ও ওকে বিয়ে করে নিবে! সাফিকা যদি সত্যি রাজি হয়ে যায় ওকে বিয়ে করতে! তাহলে?? নাহ! যে করেই হোক এখন সাফিকাকে মানাতে পারলেই ওর বাবার এই বাজে সিদ্ধান্তটা থেকে ও মুক্তি পাবে।
এতক্ষন তমাল ওর বাবা ফিরোজ সাহেবের সাথে তর্ক করছিলো ওর চাচাতো বোন সাফিকাকে নিয়ে। সাফিকা গ্রামের মেয়ে৷ ওদের ওখানে নরমাল একটা কলেজ থেকে অনার্সটা কমপ্লিট করেছে।ওর বাবা কৃষিকাজ করে। জমিজমা অনেক আছে। সাফিকারা দু’বোন৷ কোনো ভাই নেই। ওর ছোটবোন সানিয়া এইবার কলেজে উঠলো। তমালের বাবা ভাতিজিকে নিজের কাছে এনেছিলো বিয়ে দেওয়ার জন্য। পাত্র ব্যাংকে চাকরি করে। সবকিছু ঠিকঠাক ছিলো।
কিন্তু কেন জানি তমাল সাফিকাকে দেখতেই পারতো না! এই কথাটা সবাই জানতো।কিন্তু আজ সাফিকার বিয়ে ছিল। হঠাৎ বরের বাবা ফোন করে জানায় যে, তমাল নাকি উনাদের ফোন করে জানিয়েছে যে, সাফিকার সাথে তমালের সম্পর্ক ছিলো। শুধু তাই নয়, তমাল নাকি এটাও জানিয়েছে যে, সাফিকা প্রেগন্যান্ট! শেষের কথাটা এককান-দুইকান হতে-হতে সবার কাছে পৌঁছে গেছে। সবাই এসব নিয়েই আলোচনা করছে।
তমালের ভাষ্যমতে এই ফোনটা ও করেনি! কিন্তু ওর বাবার বিশ্বাস যে, এই ফোনটা ওই করেছে! তমাল ভীষণ রেগে আছে। নিজের বাবাই যেখানে ওকে বিশ্বাস করছে না! সেখানে অন্যকেউ ওকে কি বিশ্বাস করবে! সাফিকার উপর ও রাগে ফেটে পড়ছে!
সাফিকার মা কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছেন। গ্রামের সহজ-সরল মানুষ! শহরে এসেছিল নিজের মেয়েকে ভালভাবে বিয়ে দিতে, কিন্তু সেটা যে তাদের জীবনের বড় ভুল হবে তা ভাবতে পারেনি! সবাই জানে যে, এসব মিথ্যা! কিন্তু আত্মীয়দের মুখ কি করে বন্ধ করবে! সবাই সাফিকাকে ছি-ছি করছে! কয়দিনের জন্য চাচার বাড়ি এসেই চাচাতো ভাইয়ের সাথে এসব! সাফিকার বাবা খুব চিন্তায় আছে৷ এক মেয়ের বিদায় নিয়েই যদি এতকিছু হয়ে যায়! তাহলে উনি উনার ছোট মেয়ের বিয়ে দিবেন কি করে!
তমালের গার্লফ্রেন্ড আছে। ওদের চার বছরের রিলেশনশিপ! ওকে ছাড়া তমাল আর কাউকে বিয়ে করতে পারবে না। আর তাছাড়া গ্রামের সহজ-সরল ন্যাকা টাইপের মেয়ে দেখলেই তমালের গা জ্বালা করে। এই কারণেই সাফিকাকে ওর পছন্দ নয়! সবসময় বাধ্য মেয়ের মতো সবার হুকুমের আশায় থাকে! যে যা বলে তা অক্ষরে-অক্ষরে পালন করে! নিজস্বতা বলতে কিছুই নেই এই মেয়ের। আর তাকে নাকি ও ভালবাসে! কথাগুলো ভাবতেই গা ঘিনঘিন করে উঠে তমালের।
তমালরা দুই ভাই, আর এক বোন। ওর ভাই তুষার মাস্টার্স করছে আর ছোটবোন তরী সানিয়ার সমান, সবে কলেজে উঠল। তমালরা মাঝেমধ্যে গ্রামে যেতো৷ তবে সাফিকা এই প্রথম ওদের বাসায় এসেছিলো। এর আগেও তমাল সাফিকাকে পছন্দ করতো না। কেমন যেন মরা-মরা টাইপের মনে হয় সাফিকাকে ওর!
হঠাৎ সাফিকার মায়ের কান্না বেড়ে গেলো। সবার ছোটাছুটিও বেড়ে গেলো৷ তমাল আর ওর বাবাও সেদিকে ছুটে গেলো। সাফিকা ঘরের দরজা লাগিয়ে দিয়েছে৷ কারো বুঝতে বাকি রইলো না যে, ও কি করতে চলেছে। তমালের বাবা তমালকে শাসাতে লাগলো,
–“যদি সাফিকার কিছু হয়ে যায়, আমি তোকে কখনো ক্ষমা করব না৷ আমি ভুলে যাবো যে, তুষার ছাড়া আমার আরেকটা ছেলে ছিলো! ”
তমাল সবার সাথে দরজায় ধাক্কা দিতে লাগলো আর বলতে লাগলো,
–“সাফিকা! তুমি কি পাগল হয়ে গেছো! মানুষের কথায় নিজের জীবন কেন শেষ করতে চাচ্ছো তুমি! আমি বলছি দরজা খোলো৷ দেখো তুমিও জানো আর আমিও জানি যে, আমাদের মধ্যে কোন সম্পর্ক নেই! তাহলে তুমি কেন নিজেকে শেষ করে দিতে চাইছো! টেস্ট করালেইতো সব প্রমাণ হয়ে যাবে!”
কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে সবাই আরো বেশি চিন্তা করতে লাগলো। সবাই দরজা ভাঙার প্রস্তুতি নিতে লাগলো।
তমালের বাবা তখন বলতে লাগলেন,
–“সাফিকা মামনি! তুই দরজা খোল। তমাল-ই তোকে বিয়ে করবে। আমার বাড়ি থেকে তোর কোনো অসম্মান আমি হতে দেবো না। আমি কথা দিচ্ছি, আজ থেকে তুই এ বাড়িতেই থাকবি। আমিও দেখবো কে তোকে অসম্মান করে কথা বলে! আমি বেঁচে থাকতে কেউ তোকে একটা কথাও শুনাতে পারবে না। তমাল রাজি হয়েছে। ও বলেছে যে, তুই রাজি থাকলেই ও তোকে বিয়ে করবে। আমাদের আর টেনশন বাড়াস না মা। দরজাটা খোল!”
ফিরোজ সাহেব কথাগুলো বলার সাথে-সাথেই সাফিকা দরজা খুলে বের হয়ে আসলো। বউয়ের সাজে পুরো অপ্সরীর মতো দেখতে লাগছে সাফিকাকে! এইরকম একটা মেয়ের বিয়েতেও যে এত কাহিনী হতে পারে তা কে জানতো!
এতক্ষণ সবাই এটা নিয়ে কানাঘুষা করছিলো যে, তমালের মতো একটা ছেলে এমন একটা জঘন্য কাজ কি করে করতে পারলো! তাও আবার নিজেরই চাচাতো বোনের সাথে! আর এখন বিয়েও করতে চাইছে না! কি ছেলেরে বাবা!
অথচ যখনি শুনেছে যে, তমাল সাফিকাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে, তখনি আবার বলতে শুরু করলো, দেখেছো আজকালের ছেলে-মেয়েদের কাজ-কর্ম! পাপ করে আবার স্বীকারও করে! আরে ভাই বিয়েই যখন করবি আগে জানালেই পারতি! পারিবারিকভাবেই বিয়ে দিয়ে দিতো! এত নাটক করার কি দরকার ছিলো!
আসলে মানুষের কাজ-ই হচ্ছে অন্যের সমালোচনা করা! কে কেমন তা না জেনেই সবাই মন্তব্য করা শুরু করে! ঘটনাটা আদৌ সত্য কিনা তা যাচাই করার প্রয়োজনও বোধ করে না!
সাফিকা বের হতেই ওর মা-বাবা ওর কাছে ছুটে গেলো। ওর মা কান্না করতে-করতে ওকে জড়িয়ে ধরে বলল,
–“মা তুই আমাদের কথা না ভেবেই কি করতে যাচ্ছিলি! তুই যদি এমন করিস আমাদের কি হবে বল? তুই না আমাদের সাহসী কন্যা! আমি জানি মানুষের কথায় তুই এমন কোন কাজ করবি না! আমি কালকেই তোকে গ্রামে নিয়ে যাবো! তুই যা চাস তাই হবে! ”
সাফিকা একফোঁটা কান্নাও করেনি। বরপক্ষ আসবে না শোনার পর থেকে চুপ হয়ে আছে। একটু আগেই ও যখন দেখলো যে, ওর জন্য ওর চাচা নিজের ছেলের সাথেই তর্ক করছেন তখন ব্যাপারটা ওর কাছে খুব খারাপ লাগছিলো, তাই দরজা বন্ধ করেছিলো একটু একা থাকার জন্য! কিন্তু সবাই যে উল্টাপাল্টা ভাববে এটা ওর মাথাতেই আসেনি।
ওর মায়ের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সাফিকা বলল,
–“মা তোমরা কি ভাবছিলে বলোতো! আমি কেন সুইসাইড করবো? আমিতো কোনো দোষ করিনি! যে দোষ করেছে শাস্তিতো তার পাওয়ার কথা! আর তোমার কি মনে হয়, এখন গ্রামে গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে? এই খবরটা কি গ্রামে পৌঁছায়নি? সমস্যা থেকে পালালেই তা সমাধান হয়ে যায় না। সমস্যাকে মোকাবিলা করতে হয়। এটা আমার জীবন! আমার সমস্যা! তাই সমাধানটাও আমাকেই খুঁজতে হবে৷ তোমরা একদম চিন্তা করো না!”
সাফিকার মুখে এমন কথা শুনে নিন্দুকেরা আরো কানাঘুষা শুরু করে দিলো৷ কিন্তু সাফিকার সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ও সোজা তমালের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
সাফিকার মাত্র বলা কথাগুলো শুনে তমাল যেন হাঁ হয়ে গেছে। ও কল্পনাও করতে পারেনি যে, সাফিকা এত সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলতে পারে! তমাল এটা ভেবে খুশি হলো যে, সাফিকা নিশ্চয়ই খুব বুদ্ধিমতী একটা মেয়ে হবে! আর ও নিশ্চয়ই নিজের জীবন নষ্ট করার জন্য তমালকে বিয়ে করতে চাইবে না! কারণ ফোনটা তমাল না করে থাকলেও সবাই জানে যে, ফোনটা ওই করেছিলো। সে অনুযায়ী ওর মতো একটা ছেলেকে সাফিকা নিশ্চয়ই বেছে নিবেনা বিয়ে করার জন্য! ওর জীবনের সমস্যা ও নিজেই সলভ করবে!
কিন্তু সাফিকা ওর দিকে যতই এগিয়ে আসছে তমালের হার্টবিট ততই বাড়ছে। সাফিকাকে ও একটা নরম মেয়ে ভেবেছিলো! কিন্তু ওতো একটা সাহসী মেয়ে বলেই মনে হচ্ছে এখন। সাফিকা তমালের একদম সামনে এসে থেমে গেলো। তমাল ভাবছে যে, এইবার হয়তো সাফিকা ওকে একটা থাপ্পড় দিয়ে জানতে চাইবে যে, ও ওর সাথে এমনটা কেন করলো!
কিন্তু সাফিকা ওকে অবাক করে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
–“আপনি কি সত্যিই আমাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছেন?”
চলবে