#ধুসর_আকাশ
#৬ষ্ঠ_পর্ব
#স্নিগ্ধতা_প্রিয়তা
তমাল ফোন আর সিম দুইটাই চেঞ্জ করেছে। নতুন সিম থেকে রিয়াকে আরো একবার কল করেছিল দেখা করে সবটা বলার জন্য। কিন্তু রিয়া ওর কোনো কথা না শুনেই কল কেটে দিয়েছে। তমালের সাথে ও আর কথা বলতে চায়না। এটাই স্বাভাবিক! একদিক দিয়ে দেখতে গেলে তমালতো রিয়াকে ধোঁকা দিয়েছে! আর একজন ধোঁকাবাজের সাথে কেই বা সম্পর্ক রাখতে চায়! তার উপর ও আবার বিবাহিত!
সাফিকাকে দেখলেই তমালের রিয়ার কথা মনে পড়ে যায়৷ রাগ উঠে যায়, কিন্তু অনেক কষ্টে রাগগুলোকে কন্ট্রোল করে। সাফিকাও নিজেকে যথাসম্ভব তমালের থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে।
তুষার সেই সকালে নাস্তা করে বের হয়, আর অনেক রাতে বাসায় ফেরে। সাফিকার বিষন্ন মুখটা ও দেখতে পারে না। ও বুঝতে পারে যে, সাফিকা তমালের সাথে সুখে নেই! তারপরেও কিছু করতে পারে না। সবাই জানে যে, পরিস্থিতির মুখে পড়ে তুষার সাফিকাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলো। কেউ যদি এটা জানতে পারে যে, তুষার সাফিকাকে পছন্দ করতো তাহলে ব্যাপারটা সাফিকার জন্য আরো জটিল হয়ে যাবে!
এভাবেই কেটে যায় দুই মাস! সাফিকা, তমাল আর তুষারের জন্য এই দুইমাস যেন দুই বছরের মতো! সাফিকা এখনো জানতে পারেনি যে, ওর বিয়ে ভাঙার পেছনে কে ছিলো! এরমধ্যে তমালকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলো, ও কিছু জানায়নি।
তমালের দিনগুলো বিষময় হয়ে উঠেছে৷ ওর সাথে-সাথে ও সাফিকার জীবনটাও বিষিয়ে তুলেছে! রিয়া বিয়ে করে নিয়েছে! স্বামীর সাথে প্রতিদিন ছবি আপলোড দেয়। যা তমালকে আরো জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে শেষ করে দিচ্ছে।
রিয়ার সাথে কথা বলার পর থেকে তমাল আর রাশেদের সাথে কথা বলেনি। আজ কি মনে করে রাশেদের অফিসে চলে গেলো দেখা করতে।তমালকে দেখেই রাশেদ হাসিমুখে বলল,
–“কি ব্যাপার? বিবাহিত জীবন কেমন যাচ্ছে?”
তমাল রাশেদের সামনের চেয়ারে বসে কোমল সুরে বলল,
–“তুই এমনটা কেন করলি? কেন মিথ্যে বললি?”
–“কারণ আমি রিয়াকে ভালবাসতাম! আমার আর রিয়ার মাঝখানে তুই চলে এসেছিলি! আমি প্রপোজ করার আগেই তুই ওকে প্রপোজ করে দিস! আর রিয়াও রাজি হয়ে যায়! এর আগে অনেক চেষ্টা করেছি তোদের ব্রেকাপ করানোর জন্য! কিন্তু পারিনি! এইবার এমন এক চাল দিলাম! সাপও মরলো আর লাঠিও ভাঙলো না! শুধু রিয়াকেই নয়! সবাইকে মিথ্যাটা আমিই বলেছি! চালটা যে এভাবে কাজে লেগে যাবে বুঝতে পারিনি!তুই রিয়াকে পাওয়ার আর কোনো সুযোগ রাখলাম না! এখন রিয়া সত্যিটা জেনেও কোনো লাভ নেই। তুইও বিবাহিত আর রিয়াও! আমি রিয়াকে পাইনি! তোকেও পেতে দিলাম না!”
ওর কথা শুনে তমালের প্রচন্ড রাগ হতে লাগলো! যাকে ও নিজের ভাইয়ের মতো ভাবে! সেই ওকে এতটা ঘৃণা করে! ও কখনো কল্পনাও করতে পারেনি যে, রাশেদ রিয়ার জন্য ওর সাথে এমনটা করবে! তারমানে এসবের পেছনে রাশেদ ছিলো! ওর আর রিয়ার কারণে সাফিকার জীবনটা নষ্ট হয়ে গেলো! আর ও নিজের জীবনের জন্য সাফিকাকেই দোষারোপ করে যাচ্ছিলো! সাফিকা সত্যিটা জানতে পারলে কি ওকে ক্ষমা করবে! কিন্তু এতেতো ওর কোনো হাত নেই!
রাশেদের কথা শুনে ক্ষেপে গিয়ে তমাল ওকে মারার জন্য হাত তুললো! কিন্তু রাশেদ তমালের হাতটা খপ করে ধরে ফেললো। তারপর আস্তে-আস্তে ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,
–“আমাকে মারলেই কি সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে? রিয়াকেতো আর পাবিনা! তবে যাকে পেয়েছিস সেতো রিয়ার চেয়েও সুন্দরী! তোরতো ভাগ্য খুলে দিয়েছি আমি! ওরকম রূপবতী বউ ক’জনার কপালে জোটে বল!”
তমাল নিজের রাগটাকে কন্ট্রোল করে বলল,
–“সাফিকার সম্পর্কে আর একটা কথাও বলবিনা! তোর মতো মানুষের মুখে ওর নতো নিষ্পাপ মেয়ের নাম মানায় না! ”
রাশেদ মুচকি হেসে বলল,
–“বাহ! বউকে অনেক ভালবাসিস মনে হচ্ছে! তাহলেতো রিয়ার কথা এতদিনে ভুলে যাওয়ার কথা! আমিতো ভাবলাম যে, আমাকে থ্যাংকস দিতে এসেছিস! ওপস! সরি! তুইতো এর আগে জানতিই না যে, এসব কিছুর পেছনে আমিই ছিলাম! এখন সত্যটা লুকিয়ে কোনো লাভ নেই! তাই বলে দিলাম। আমার কি যে আনন্দ লাগছে! ”
–“তুই আমাকে কখনো বন্ধু ভাবিস নি তাইনা?”
–“ভাবতাম! তবে রিয়ার সাথে রিলেশনের আগে! সবচেয়ে কাছের মানুষ ভাবতাম তোকে! নিজের ভাইয়ের মতো! কিন্তু রিয়াকে যখন প্রপোজ করলি তখন থেকে তুই আমার শত্রু হয়ে উঠেছিলি! আর তোর চাচাতো বোনের বিয়েতে আমাকে জড়িয়ে আরো বড় ভুল করেছিলি! তাদেরকে তোর সম্পর্কে মিথ্যেগুলো আমিই বলেছিলাম! তারা বিশ্বাস না করে কোথায় যাবে! কলটাতো তোর নাম্বার থেকেই করেছিলাম! তোর বাবা কি এমনি-এমনি তোর সাথেই সাফিকার বিয়ে দিতে চাচ্ছিলো! কারণ তিনিতো এটাই জানেন যে, কলটা তুই-ই করেছিলি!”
বলেই আবার হাসতে লাগলো রাশেদ। তমাল রাগে কথা বলার শক্তিটাও যেন হারিয়ে ফেলেছে। নিজের হাতটা মুঠো করে জোরে করে রাশেদের টেবিলে মারতেই টেবিলের উপরের কাঁচটা টুকরো হয়ে গেলো আর তমালের হাতের মধ্যেও কাঁচের কয়েকটা টুকরো বিধে গেলো। ওই অবস্থাতেই তমাল রাশেদের অফিস থেকে বের হয়ে গেলো। আর শেষ একটা কথাই বলল,
–“কাজটা তুই মোটেও ঠিক করিস নি রাশেদ! এই পাপের শাস্তি তোকে পেতেই হবে! এতগুলো জীবন নষ্ট করে তুই কখনো সুখী হতে পারবি না!”
রাশেদ ওর কথা শুনে তখনো হাসছে। আর বলল,
–“কাঁচটা না হয় আমি পালটে নেবো! কিন্তু তোর জীবনটাতো আর তুই পাল্টাতে পারবি না!”
রাশেদের ওখান থেকে বের হয়েই তমাল হাতের ব্যান্ডেজ করে বাসায় চলে গেলো। অফিস থেকে আজ দুপুরেই বের হয়েছিলো, তাই আজ তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরলো। আর অফিসে যাওয়ার মুড ছিলো না!
সাফিকা খাওয়া-দাওয়া শেষে একটু শুয়ে ছিলো। তরী কোচিং-এ গিয়েছে। তমালের মা নিজের রুমে শুয়ে আছেন। তুষার বাসায় নেই।
কলিংবেলের আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেলো সাফিকার।এই সময়টাতে সাধারণত কেউ আসেনা। ঘুমচোখে সাফিকা দরজা খুলেই অবাক হয়ে গেলো। তমালের ডানহাতে ব্যান্ডেজ দেখে আরো অবাক হয়ে গেলো৷ সাফিকা দরজা বন্ধ করে অস্থির হয়ে বলল,
–“হাতে কি হয়েছে? আর এত তাড়াতাড়ি ফিরলেন যে? কিছু হয়েছে?”
তমাল রুমে ঢুকতে-ঢুকতে বলল,
–“আগে রুমে যেতে দেবে নাকি এখানেই জেরা করতে থাকবে?”
তমালের এই কথা শুনে সাফিকা একদম চুপ হয়ে গেলো।
তমাল ঠিক করে নিয়েছে, আজ থেকে সাফিকার সাথে আর কখনো খারাপ ব্যবহার করবে না! রিয়া যদি বিয়ে করে নিয়ে ভালো থাকতে পারে ও কেন পারবে না! এখানে রিয়ার যেমন কোনো দোষ নেই, তেমনি সাফিকা বা তমালেরও তো কোনো দোষ নেই! তাহলে ও কেন শুধু-শুধু সাফিকাকে কষ্ট দিবে! ও নিজের জন্য সাফিকার জীবনটা নষ্ট হতে দেবে না!
রুমে ঢুকে নিজের মেজাজটাকে একটু ঠান্ডা করে সাফিকাকে উদ্দেশ্যে করে বলল,
–“এক গ্লাস ঠান্ডা পানি দিতে পারবে? খুব পিপাসা পেয়েছে!”
তমাল এই প্রথম নিজে থেকে সাফিকার কাছে কিছু চাইলো! সাফিকা খুশি মনে দৌড়ে চলে গেলো পানি আনতে!পানি এনে তমালকে দিতেই ও বলল,
–“থ্যাংকস! ”
সাফিকা অবাক হয়ে বলল,
–“কেন? ”
–“আমার জীবনে আসার জন্য!”
তমালের কথাটা শুনে সাফিকা যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলো না। অবাকের চরম সীমায় পৌঁছে গেলো ও৷ নিজের কপালে হাত দিয়ে দেখতে লাগলো যে, ও কোনো ঘোরের মধ্যে আছে কিনা! ও অসুস্থ কিনা! কিন্তু ও পুরোপুরি ঠিক আছে বুঝতে পেরে ধপ করে বিছানার উপর বসে পড়লো।
তারপর উঠে গিয়ে তমালের কপালে হাত দিয়ে দেখলো যে, ও সুস্থ আছে কিনা! তারপর অবাক হয়ে বলল,
–“আপনি কি অসুস্থ? নাকি মাথায় আঘাত লেগেছে? ড্রিঙ্কস করেননিতো? কি হয়েছে আপনার? আপনি ঠিক আছেনতো?”
তমাল সাফিকাকে এই প্রথম নিজের বুকে টেনে নিয়ে বলল,
–“তুমি এত অস্থির কেন হচ্ছো! আমি ঠিক আছি। আমি সজ্ঞানে এই কথাটা বলেছি! সত্যিই আমি ধন্য যে তোমার মতো কাউকে আমার জীবনে পেয়েছি! আমার জন্য তোমার অনেক কষ্টে কেটেছে এই কয়দিন! আমি আর তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনা! ”
তমালের হৃৎ-স্পন্দন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে সাফিকা। খুশিতে যেন আত্মহারা হয়ে গেছে ও। চোখের কোণ বেয়ে একফোঁটা সুখের নোনাজল গড়িয়ে পড়লো৷ তবে তমালের এই আকস্মিক পরিবর্তনে কিছুটা ভয়েও আছে সাফিকা! তমাল কি সত্যি রিয়াকে ভুলে ওকে আপন করে নিয়েছে! নাকি ওর মুড সুইং এর জন্য এমনটা করছে! দেখা যাবে এখন নিজেই বুকে টেনে নিচ্ছে! একটু পরেই আবার ওকে ছুড়ে ফেলে দিবে! এসব কথা মনে হতেই তমালের বুক থেকে যেন ছিটকে পড়লো সাফিকা। সাফিকার এমন করায় তমালের হাতে আঘাত লাগলো আর ও ব্যাথা পেয়ে বলল,
–“কি করছো! হাতে লাগছেতো!”
সাফিকা তমালের হাতটা নিজের হাতের মুঠির মধ্যে নিয়ে বলল,
–“সরি! আমি বুঝতে পারিনি৷ আসলে আপনার এমন ব্যাবহার দেখে আমি নিজেকে সামলাতে পারিনি! ”
তমাল মুচকি হেসে বলল,
–“হাতে কি হয়েছে তা শুনবে না? নাকি আমার কোনোকিছু নিয়ে তোমার কোনো মাথাব্যথাই নেই! ”
সাফিকা আমতা-আমতা করে বলল,
–“আপনিতো রিয়াকে ভালবাসেন! তাই…”
–“আর একবার আমাদের মাঝে কারও নাম নিবে না! আমি তোমার স্বামী! আর তুমি আমার স্ত্রী! এখন এটাই সত্য! আমি আমার অতীতগুলোকে মনে করে তোমার জীবনটাকে শেষ করে দিতে পারিনা!”
–“করুণা? নাকি ভালবাসা?”
–“তোমার যেটা মনে হবে সেটাই!”
–“আমিতো কারো করুণার পাত্রী হয়ে থাকতে চাইনা! আমি কারোর করুণা নয়, ভালবাসা চাই! আশা করি বুঝতে পেরেছেন!”
তমাল কি বলবে বুঝতে পারছে না! ভালবাসা কি এত সহজে হয়! ও কি সত্যিই সাফিকাকে ভালবাসে নাকি করুণার বশে ওকে ভালবাসতে চাইছে! ও নিজেও বুঝতে পারছে না৷ কিন্তু ও আর সাফিকাকে কষ্ট দিতে চাচ্ছে না। তাই কোনোকিছু না ভেবেই বলে দিলো,
–“ভালবাসি!”
কথাটা শুনেই সাফিকা কান্না করতে-করতে তমালের বুকে ঝাপিয়ে পড়লো। তারপর বলল,
–“আমি জানতাম আপনি একদিন না একদিন আমাকে ঠিক মেনে নিবেন! বিয়ের বন্ধনটা যে এমনি শক্ত বন্ধন! যা নির্দয়ের মনেও ভালবাসার সঞ্চার করে দেয়! এটা যে পবিত্র একটা বন্ধন! বিশ্বাস করুন আমার এতদিনের সব কষ্টগুলো হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছে আপনার একটা কথাতেই! কথা দিন, আর কখনো আপনি আপনার সিদ্ধান্ত বদলাবেন না? আর কখনো আমাকে কষ্ট দিবেন না? ”
তমাল ভাবতেই পারেনি যে সাফিকা ওকে এত সহজে গ্রহণ করে নিবে! ও ভেবেছিলো যে, সাফিকাকে মানাতে ওকে অনেক কাঠ-খড় পোড়াতে হবে! অনেক খারাপ ব্যবহার করেছে এই কয়দিনে! তমাল সাফিকাকে নিজের বুকে আরো শক্ত করে চেপে ধরে বলল,
–“হুম। কথা দিচ্ছি! আর কখনো তোমাকে কষ্ট দিবো না। তোমার ভালো থাকাই আমার ভালো থাকা! তোমার খুশিই আমার খুশি!”
–“আর আমার দুঃখগুলো? কষ্টগুলো? সেগুলোর ভাগ নিবেন না?”
–“হুম৷ তবে আমি তোমার জীবনে দুঃখ-কষ্টটাকে আর আসতে দিবো না! আমি চাই আর কোনো কষ্ট যেন তোমাকে ছুতে না পারে।”
তমাল যেমন ভাবতে পারেনি যে, সাফিকা এত তাড়াতাড়ি সব মেনে নিবে! তেমনি সাফিকাও ভাবতে পারেনি যে তমাল ওকে এত তাড়াতাড়ি ভালবেসে ফেলবে!
চলবে…..