#নিরবে নিভৃতে
#জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব-০৭
______
লুঙ্গি হাতে নিয়ে ওয়াশরুমে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাসরিক। জীবনে কোনোদিন লুঙ্গি পরেনি সে। লুঙ্গি পরার অভিজ্ঞতা তো দূরের কথা, কিভাবে গিঁট দিতে হয় সেটাও তার জানা নেই। কিন্তু এখান থেকে বের হতে হলে লুঙ্গি পরা ছাড়া উপায় নেই। তাসরিকের ভীষণ রাগ হচ্ছে রাদিয়ার উপর। মেয়েটা ইচ্ছে করেই তাকে এভাবে ফাঁসিয়েছে এটা সে নিশ্চিত। উপায়ান্তর না পেয়ে কোনো রকমে লুঙ্গিটা পেঁচিয়ে নেয় সে। সাবধানে দরজা খুলে বাইরে বের হয়। দরজার সামনে তখন রাদিয়া ছিল। তাসরিককে দেখে সে কিছু না বলে চুপচাপ আবার ঘরে ঢুকে যায়। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বিছানায় তাসরিকের জামাকাপড় রেখে দেয়এদিকে তাসরিক এক হাতে লুঙ্গির গিঁট চেপে ধরে কোনোরকমে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাঁটার ভঙ্গি দেখলেই বোঝা যায় সে একদমই স্বস্তিতে নেই। তাসরিককে এমন অবস্থায় দেখে রাদিয়া ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর বৃথা চেষ্টা করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর পারে না হেসে ওঠে জোরে। তাসরিক রাগ দেখিয়ে বলে উঠল,
–“হাসা হচ্ছে তাই না? একবার আপনাকে হাতের কাছে পাই, তখন বুঝাবো মজা!”
রাদিয়া হাসতে হাসতেই জবাব দিল,
–“তার আগে নিজের লুঙ্গিটা সামলান, ক্যাপ্টেন সাহেব!”
তাসরিক রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে রাদিয়ার দিকে এগোতে যায়, কিন্তু হঠাৎই থেমে যায় লুঙ্গির অবস্থার কথা মনে পড়তেই। রাদিয়া নিজেই এগিয়ে এসে তার একদম কাছে দাঁড়ায়। গলা নিচু করে ফিসফিসিয়ে বলে,
–“লুঙ্গি সামলাতে পারেন না, অথচ আমাকে সামলাতে চান, ক্যাপ্টেন? আমি কিন্তু এই লুঙ্গির থেকেও বেশি ভয়ংকর…”
কথা শেষ করেই ভোঁ করে দৌড় দেয় সে। তাসরিক হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
— “ঠিক আছে মিসেস পুচকি। আমিও দেখব আপনি কতোটা ভয়ংকর।”
_______
মায়ের কাঁধে মাথা রেখে চুপচাপ বসে আছে রাদিয়া। ঘর থেকে বেরিয়ে আসার পর আর নিজের রুমে যায়নি সে। নিঃশব্দে মায়ের কাঁধে মাথা রেখে আছে, আর রুমা বেগম আলতো করে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। মায়ের কাছে বসেই যেন তার ভেতরের অশান্ত মনটা একটু শান্তি খুঁজে পায়। মা একটা আশ্রয়, একটা শান্তির জায়গা। সকল সমস্যার সমাধান, সকল ক্লান্তির অবসান। কিন্তু এই মানুষটাকেই ছেড়ে এখন থেকে থাকতে হবে এই চিন্তাটা রাদিয়ার বুকের ভেতর হাহাকার তুলছে। আজ একদিন দূরে থাকার ভাবনাতেই তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, তাহলে সারাটা জীবন কীভাবে কাটাবে?
রুমা বেগম মাঝেমধ্যে কিছু প্রশ্ন করেন, আর রাদিয়া চুপচাপ সেগুলোর উত্তর দেয়। হঠাৎ রাদিয়া মাথা তুলে মায়ের দিকে নরম চোখে তাকিয়ে ডাকল
“আম্মু…”
“বলো মা, কিছু বলবে?”
রাদিয়া একটু থেমে বলল,
“বিয়ের পর সব মেয়েকেই অন্যের বাড়ি যেতে হয় কেন?”
মেয়ের শিশুসুলভ প্রশ্ন শুনে রুমা বেগমের বুকটা হালকা ধক করে উঠল। তার মেয়েটা একেবারেই মা-পাগল মা ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারে না। তিনি নিজেকে সামলে স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন,
“এটাই তো নিয়ম, মা…”
“এটা কেমন নিয়ম আম্মু? যে পরিবারে জন্ম নিলাম, মায়ের আঁচলে বড় হলাম, বাবার হাত ধরে স্কুলে গেলাম সেই পরিবার ছেড়ে কেন চলে যেতে হবে? কেন, আম্মু?”
রুমা বেগম মলিন হেসে বললেন,
“মেয়েদের জন্মই হয় একদিন অন্যের ঘরে যাওয়ার জন্য। যেমন আমি তোমার নানুর বাড়ি ছেড়ে এখানে এসেছি তোমার নানুও তার পরিবার ছেড়ে এসেছিল। এটাই নিয়ম, মা। ”
মায়ের কথা শুনে রাদিয়া আবার তার বুকে মাথা রেখে দিল। রুমা বেগমের চোখে পানি চিকচিক করে উঠল। শাড়ির আঁচলে নিঃশব্দে চোখ মুছে তিনি তাড়াহুড়ো করে বললেন,
“হয়েছে, এবার জামাইয়ের কী লাগবে খোঁজ নাও। আমি রান্নাঘরে যাই।”
বলে দ্রুত উঠে চলে গেলেন তিনি। হয়তো নিজের বুকের ভেতরের যন্ত্রণা আর চোখের অবাধ্য জল মেয়ের কাছ থেকে লুকাতেই।
রাদিয়া সামনে টেবিলের ওপর রাখা ফোনটা হাতে নিল। এটা তারই ফোন। বিয়ের সব ঝামেলায় সে যেন ফোন নামের জিনিসটাকেই ভুলে গিয়েছিল। ডাটা অন করতেই একের পর এক নোটিফিকেশন আসতে শুরু করল ফেসবুক, মেসেঞ্জার থেকে।
রাদিয়া সেসব কথায় বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে ফেসবুকে স্ক্রল করতে থাকে। সিয়া এসে তার সামনে দাঁড়িয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
–” তোর সাথে আমার কথা আছে।”
রাদিয়া ফোন থেকে চোখ না সরিয়ে শান্তভাবে বলল,
–” জি, বলো কী বলবে।”
সিয়া রাদিয়ার পাশে বসতে বসতে বলল,
–” তোর কোচিং নিয়ে। ওখান থেকে আমাকে ফোন করেছিল। তুই যাচ্ছিস না কেন, সেটা জানতে চাইছিল।”
রাদিয়া নির্বিকার ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
–” বলে দাও, আমি আর সেখানে যাচ্ছি না।”
সিয়া বিরক্ত হয়ে রাদিয়ার ফোনটা কেড়ে নিয়ে বলল,
–“সিরিয়াস হো। সামনে তোর পরীক্ষা। এখন যদি কোচিং মিস করিস, এক্সামে কী করবি?”
রাদিয়া ঠাণ্ডা গলায় বলল,
–” পড়ব না আর।”
সিয়া ধমক দিয়ে উঠল,
–” রাদিয়া! একটা চড়ে দাঁত ফেলে দেব কিন্তু। আমি এত গুরুত্বপূর্ণ কথা বলছি, আর তুই শুনছিস না! মজা করছিস আমার সাথে। তোর না আমার মতো ভার্সিটিতে পড়ার ইচ্ছে ছিল?”
রাদিয়া এবার সোজা হয়ে সিয়ার মুখোমুখি বসল। মৃদু হাসি হেসে বলল,
–” বিয়েই তো দিয়ে দিলে, তাহলে আর পড়াশোনা করে কী করব? স্বপ্ন দেখতেই যে সেটা পুরণ করতে হবে এমন তো কথা নেই। মেয়ে হয়ে জন্মেছি তো সেক্রিফাইজ করতে। তাছাড়া ওই তো শেষমেশ রান্নাঘরেই বাসন মাজতে হবে। এখন আর অযথা পড়াশোনা করে টাকা-পয়সা খরচ করার কী দরকার? পাতিলে দুটো ঘষা দিলেই তো পরিষ্কার হয়ে যায়। এত দূর গিয়ে কষ্ট করে পড়তে যাওয়ার কী মানে আছে বলো?”
সিয়া একটু ভাবুক গলায় বলল,
— “তুই তো ওনাকে বলতে পারিস, যেন কাছাকাছি কোনো কোচিংয়ে ভর্তি করে দেয়। এই সময়টা কিন্তু তোর জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ।”
রাদিয়া ফোনটা হাতে নিতে নিতে নির্লিপ্তভাবে বলল,
“আচ্ছা, দেখি।”
সিয়া কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আবার জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা, তোর শ্বশুরবাড়ির লোকজন কেমন?”
রাদিয়া একটু থেমে বলল,
“শ্বশুর-শাশুড়ি বেশ ভালো। কিন্তু খালাশাশুড়ি আর তার মেয়েটা… কেমন যেন! আমার দিকে এমনভাবে তাকায়, মনে হয় আমি তাদের চিরশত্রু।”
সিয়া হালকা ভ্রু কুঁচকে বলল,
— “আর তোর উনি? সে কেমন?”
রাদিয়া মুখ কুচকে হেসে বলল,
— “তার কথা বাদই দে! তাকে বুঝা যেন হায়ার ম্যাথের চেয়েও কঠিন।”
দু’জনেই হেসে উঠল
তারপর রাদিয়া আলতো করে সিয়ার কোলে মাথা রেখে আদুরে গলায় বলল,
“আপু, মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দাও না… কতদিন তোমার কোলে মাথা রাখিনি।”
সিয়া মৃদু হাসল। বোনকে আরও কাছে টেনে নিয়ে তার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
রাদিয়া চোখ বন্ধ করে বিড়ালছানার মতো গুটিয়ে শুয়ে পড়ল। সেই মুহূর্তে তার সব ক্লান্তি, সব দুশ্চিন্তা যেন মিলিয়ে গেল।
________
রাদিয়া আর তাসরিক ফিরে এসেছে আজ দুদিন হলো। আশার সময় রাদিয়া মা বাবাকে ধরে খুব করে কেদেছে। তাসরিক অবাক হয়েছিল। বিয়ের দিন মেয়েরা নাকি অনেক কান্না করে অথচ রাদিয়ার চোখ দিয়ে এক ফোটাও পানি ঝড়তে দেখেনি। অথচ আজ মেয়েটা কেদেকুদে ভাসিয়ে দিয়েছে। এখানে আশার পড় থেকে শশুড় শ্বাশুড়ির সাথে বেশ সক্ষতা হয়েছে। শাশুড়ী মা যেন পারে তাকে বুকে লুকিয়ে রাখে। রাদিয়ার ও বেশ ভালো লাগে। অন্যদের শশুড় শাশুড়ী কেমন হয় জানে না কিন্তু ভাগ্য করে সে একটা পরিবার পেয়েছে। তাকে যেন পারে মাথায় করে রাখে। কিন্তু সবার সাথে সক্ষতা হলে তাসরিক নামক উন্ডাদার সাথে ভাব জমেনি তার। লোকটার মাঝে মাঝে কথা বার্তা সব মাথাত উপর দিয়ে যায়। রাদিয়া ও আর তাকে নিয়ে মাথা ঘামায়নি। এদিকে সে যেন পড়াশোনা টা কে দিব্যি ভুলতে বসেছে।
রাদিয়া বসে বসে ফোন নিয়ে বসে ফেসবুক ঘাটছিল। এমন সময় কোথেকে তাসরিক এসে সোজা রাদিয়ার সামনে দাঁড়ায়। তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে ডাক দেয়,
–“রাদিয়া।”
রাদিয়া হকচকিয়ে উঠে। বেখেয়ালে ফোনটাও পরে যায়। রাদিয়া যেন আকাশ থেকে টুপ করে পড়ে। সাথে চরম অবাক ও হয়। লোকটা তাকে তো রাদিয়া বলে সম্বোধন করে না। রেগে আছে নাকি। ভাবতে ভাবতে ফরফর করে বসা থেকে উঠে প্রশ্নসূচক চোখে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলে,
–“আমায় ডাকছিলেন?’
তাসরিক রাদিয়ার দিকে মাথা তুলে তাকালো। ভ্রুজোড়া সংকুচিত করে বলল,
— আপনি ব্যতীত এখানে আমি আর কাউকে দেখতে পাচ্ছিনা।
তাসরিকের ত্যাড়া জবাবে রাদিয়ার বিরক্ত লাগলো। গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
— “কি বলবেন দ্রুত বলুন। ”
রাদিয়ার কথায় তাসরিক মুখটা শক্ত করে ফেলল। দাঁতে দাঁত পিশে বলল,
— কি বলব মানে। আশার পর থেকে আপনাকে দেখছি। সারাদিন ফোন নিয়েই পড়ে থাকেন। সামনে যে পরিক্ষা সেটা কি ভুলে গেছেন?
–“না ভুলিনি।”
—“তাহলে?”
–” তাহলে কিছু না।”
—“কাল সকাল সকাল রেডি থাকবেন।”
রাদিয়া ভ্রু কুচকে বলল,
— “কেন রেডি হয়ে কাজ কি?”
— আপনাকে মার্কেটে বিক্রি করে দিব ইডিয়ট কোথাকার। পড়াশোনা করার ইচ্ছে আছে নাকি শুধু রান্না ঘড়ের কাজ করতে চান কোনটা?
রাদিয়া অলস ভঙ্গিতে বলল
বিয়ে যেহেতু হয়েই গেছে তাহলে আর কষ্ট করে পড়াশোনার মতো ঝামেলাকে টেনে আনার কি দরকার বলুন। আপনার কিছু চাই মানে কিছু খাবেন। আমি এখুনি এনে দিচ্ছি।
তাসরিক যেন বিরক্তির চুড়ান্তে। মেয়েটা তার সাথে ত্যাড়ামি করছে দেখে ধমকে উঠলো।
— সাট আপ রাদিয়া। আর একটা বাজে বকবক করবেন না। পড়ালেখা করবেন না মানে কি?
রাদিয়া স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
–জ্বি হ্যাঁ। করবো না। আপাতত ইচ্ছে নেই।
তাসরিক আগুনঝরা চোখে তাকিয়ে রাগান্বিত কন্ঠে বলল,
পড়বেন না মানে। আপনি পড়বেন সাথে আপনার ঘাড় ও পড়বে। দরকার পড়লে আপনার ও জামাই সহ পড়বে। কি ভেবেছেন বিয়ে সাদি হয়েছে বলে আপ্নাক্ব আমি বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াবো। তাহলে আপনার সেই স্বপ্ন আমি পানি ঢেলে দিলাম। আমার বউ যেহেতু হয়েছেন অবশ্যই আপনাকে পড়াশোনা করতে হবে। মুর্খ বউ আমার চাইনা।
— “তো নিজেই পড়ুন না।”
–“একদম চুপ করে থাকবেন। ভুলে যাবেন না আমি কে। আর ঠিক কি করতে পারি।”
রাদিয়া রেগে বলে উঠে,
— আপনি আমার সাথে জোড়াজুড়ি করছেন?
যদি মনে করেন আপনার সাথে জোড়াজুড়ি করছি তবে সেটাই। বাবা মায়ের উপর রাগ করে আপনি পড়ালেখা ছাড়তেই পারেন কিন্তু আমার জীবনের সাথে যেহেতু বেধে পড়েছেন সেহেতু আমার কথা মানতে আপনি বাধ্য। এর বাইরে আমি আর একটা কোথাও শুবতে চাইনা। মাথা সেটা ঢুকিয়ে নিন।
চলবে….

