নিরালায় ভালোবাসি পর্ব-২৪+২৫

0
526

নিরালায় ভালোবাসি
কলমে : তুহিনা পাকিরা
২৪ .

রাতের দিকে হসপিটাল গুলো সবে গভীর ঘুমে বলা যেতে পারে। চারিদিকে একটা স্তব্ধতা বিরাজ করছে। তবে মাঝে মাঝে অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ কানে প্রবেশ করতে না করতেই পেশেন্ট এর পরিবারের একটা জটলা কানে আসছে। কয়েক মুহূর্তে তাও স্তব্ধ।
রাত আড়াইটার দিকে হসপিটালের একটা চেম্বারে বসে রয়েছে নীরব আর ইচ্ছে। পাশে ধীর ও আছে। সাইডের একটা সোফায় ইপশি ঘুমে মগ্ন। আর তাকে গাইড করে দাঁড়িয়ে রয়েছে রজত। এতো রাতে ডক্টর পাওয়া একেই মুশকিল। তাও এক ডক্টর থাকায় সুবিধা হয়েছে।

– ” আরে ডক্টর আস্তে, লাগছে তো আমার। ”

গত আধা ঘন্টা ধরে নীরবের গলায় এক উক্তি, যে ওর লাগছে। ডক্টরের ও এইবার ভীষন রাগ হলো। একেই তো এতো রাত তার উপর ডিস্টার্ব করে চলেছে।

– ” থামুন তো মশাই। হয়ে গেছে। এই তো ব্যান্ডেজ করে দিয়েছি। এতোই যখন ভয়, তবে মারপিট করেন কি জন্যে। তাও আবার রাতে।”

নীরব ব্যথায় কপাল কুঁচকে ফেললো। সামনের চেয়ারে বসা ইচ্ছে ওর দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। নীরবের কাছে এটা নতুন না। যখনই নীরব কোনো কিছুতে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে ডক্টরের শরণাপন্ন হয়েছে, প্রতিবারই ইচ্ছে নীরবের দিকেই তাকিয়ে থাকে। তার একটাই কারণ নীরব ইনজেকশনে খুব ভয় পায়। তাই তো ডক্টর কে দেখার সাথে সাথে ইনজেকশনের ভয়ে কুই কুই করে।

ইচ্ছের কপালে অল্প একটু আঘাত লাগায় ডক্টর সেখানে ব্র্যান্ডেড লাগিয়ে দিয়েছে। সেই থেকেই ও বসে রয়েছে। নীরবের এমন কান্ডকারখানা দেখতে দেখতে বেচারি টায়ার্ড। তার থেকে ওর মাথায় ব্যথা লাগলেই বরং ভালো ছিল। ইচ্ছে থেকে থেকে বারবার হাই তুলছে আর নীরবের কুঁচকে যাওয়া কপালের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

– ” এই ইনজেকশনটা নিয়ে আপনি এখান থেকে যান মশাই। আমার আর ভালো লাগছে না। ডিউটি শেষে বাড়ি যেতেও পারছিনা। ”

তেতে ওঠে নীরব। একহাতে কপাল চেপে বলে, ” এ আবার কেমন ডক্টর যে পেশেন্টের সঙ্গে এমন বিহেব করছেন। ভালো করে কথা বলা যায় না। ”

– ” আহ্, নীরব চুপ কর। এই যে তোকে এতক্ষণ ধরে সহ্য করছে এই অনেক। আমার তো আমার বোনের জন্যে কষ্ট হচ্ছে। না জানি তোর মতো এমন ভিতু ছেলের সঙ্গে ও কাটাবে কীকরে?”

ধীরের পিঠে ধুম করে একটা ঘুষি মারলো নীরব। “সারা জীবন বোন বোন না করে একটু বোনের বর, বর তো করতেই পারিস!”

-” নীরব তোমরা এসো। ইপশির ঘুমটা ভেঙেছে। ওকে আমি বাড়ি দিয়ে আসি না হলে পরে মুশকিল হবে। ”

নীরব ইশারায় রজতকে যেতে বললো। ইপশি ঘুম ঘুম চোখে চারিদিক দেখতে দেখতে বেরিয়ে গেলো। এই মুহূর্তে ওর লাগবে ওর নিজের ঘরের বিছানা। সেখানে গিয়ে না ঘুমালে ঘুম হবে বলে মনে হয় না।

– ” আরে ইপশি, ভালো করে একটু চলো। পড়ে যাবে তো!”

যেতে যেতে ইপশি রজতকে জড়িয়ে ধরলো। ঘুমঘুম জড়ানো গলায় বলল, ” কোলে নাও। ”

ঘাবড়ে গেল রজত। বলে কী এই মেয়ে? কোলে নাও মানে কী?

– ” ইপশি আমাদের বিয়ে হোক তোমাকে তখন কোলে নেবো। এখন লক্ষ্মী মেয়ের মত চলো দেখি। ”

——————–

– ” ধুর ডক্টর বোঝেন না কেনো, আমি ইনজেকশন নেবো না। মানে নেবো না। ”

– ” দেখুন মশাই অনেক বকছেন কিন্তু। ইনজেকশন না নিয়ে এইখান থেকে এক পাও নড়বেন না বলে দিলাম।”

-” ধীর ওনাকে বলে দে আমি ইনজেকশন নেবো না।”

ডক্টর ও অসম্ভব জেদ নিয়ে বললো, ” আমিও এখান থেকে আপনাকে যেতে দেবো না। এই যে আপনার হাত ধরলাম এই হাত আর ছাড়ছি না।”

নীরব বেচারা যেনো খাদে পড়ে রয়েছে। যার কাছে সব থেকে ভয়ঙ্কর বস্তু ইনজেকশন তাকে বলে কিনা এটাই এখন নিতে হবে। নেবে না ও। কেনো নেবে? কিছুতেই না। ঘ্যাট হয়ে এক জায়গায় বসে রয়েছে সে।

এই সবের মাঝে অসহ্য লাগছে ইচ্ছের। একেই হসপিটালের উগ্র গন্ধে গা গুলিয়ে ওঠে। তার উপর এইভাবে বসে থাকা ওর আর সহ্য হচ্ছে না। সারাদিন না খেয়ে শরীরটা কেমন গুলোছে। এখানে ঔষুধের গন্ধে ওর আর থাকা পসিবল না। তাই হুড়মুড় করে চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেলো ইচ্ছে।

– ” আরে কোথায় যাচ্ছিস? দাঁড়া আমি আসছি। ”

নীরবের দিকে একবার অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বেরিয়ে গেলো ধীর। যার অর্থ, এইবার অন্তত ইনজেকশনটা নে ভাই।

– ” আপনি কি এইবার এখান থেকে যাবেন? ”

– “যেতে তো অবশ্যই চাই। কিন্তু আপনিই তো ইনজেকশনের দোহাই দিয়ে রেখে দিয়েছেন। বউটা আমার রেগে গেছে বোধহয়। তাই দেখলেন না কেমন ভাবে চলে গেলো। নিন এই উটকো ঝামেলার কাজ মিটিয়ে আমাকে ছাড়ুন।”

ডক্টর প্রেসক্রিপশন লিখতে লিখতে বললো, ” সে আমার অনেকক্ষণ দেওয়া হয়ে গেছে। আপনি খেয়াল করেননি। আর আপনার ব্যাথাও লাগেনি। শুধু শুধু ভয় পাওয়ার অভিনয় দেখলাম। তবে হাতে কিঞ্চিৎ ব্যথা হতেই পারে। ”

নীরব অবাক হয়ে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বললো, ” কখন দিলেন?”

– ” যখন নিজের বউয়ের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে ছিলেন। সেই মুহূর্তে। এখন আসুন। আর শুনুন, ঘরে সুন্দর বউ রেখে বাইরে মারপিট করতে যান কোন সাহসে। বউয়ের হাতের মার খাবেন। তাতে আলাদা মজা আছে। দেখবেন ধোলাই তারাই করবে। আবার সেবাও তারা করবে। ”

উঠে দাঁড়ালো নীরব। ফিচেল হেসে ডক্টর কে বললো, ” আপনি কি তবে বউয়ের সঙ্গে মারপিট করেন? কে বেশি মার খায়, আপনি?”

প্রশ্নটা করেই বাইরের দিকে ছুট দিয়েছে ও। এর উত্তরটা অতি সহজে নাও পাওয়া যেতে পারে। হয় দেখা যাবে ডক্টর খুব খুশি হয়ে উত্তর দেবে। আর নাহলে রেগে যেতেই পারে। কী দরকার সব প্রশ্নের উত্তর জেনে।

নীরব দের গাড়ি যখন ওদের পাড়ায় আসে তখন প্রায় সাড়ে তিনটার কাছাকাছি। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা যাবে অনেকে উঠে জগিং এ বেরিয়ে গিয়েছে। গাড়ি থেকে নীরব আর ইচ্ছে নামতে ধীর গাড়িটা গ্যারেজ করতে নিয়ে যায়। দুই বাড়িরই তখন সদর দরজা খোলা। বাইরের আলোগুলোও জ্বলছে। হয়তো সকলে জেগে ওদের অপেক্ষাই করছে।

ইচ্ছে চুপচাপ ধীরের অপেক্ষা করছিল। কিন্তু ধীরের আসতে দেরী দেখে ও বাড়ির দিকে পা বাড়ালো। ওর পাশাপাশি হাঁটছে নীরব। মুখ ফুটে ইচ্ছেকে কিছু বলতে চাইছে ও। কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হচ্ছে। এইবার সাহস করে ইচ্ছের হাতটা ধরতে যেতেই, নীরবের হাত ইচ্ছের আঙ্গুল ছুঁয়ে বেরিয়ে গেলো। ইচ্ছে সোজা নিজের বাড়িতে ঢুকে গেলো। নীরবের বাড়িতে ও যাবে না আর।

ক্যাবলার মত দুই বাড়ির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থেকে মুখ ফুলালো নীরব। পিছন থেকে ধীর এসে ওর কাঁধে হাত রেখে বলল, ” যা নিজের বাড়ি যা। ইচ্ছে ওর বাড়িতেই থাকবে। এতো সব প্ল্যান আমাদের না বলার শাস্তি স্বরূপ বউ লেস কয়দিন ঘোর। ভালো লাগবে। ”

নীরবকে কিছু বলতে না দিয়ে ধীর বাড়ির দিকে এগিয়ে গেলো। পড়ে কী ভেবে পিছন ফিরে বললো, ” আমার মা, কাকা , কাকিমা তোদের বাড়িতেই আছে। একটু ডেকে বলে দিস বাড়ি আসতে। আমরা এসে গেছি। চল ফুট। ”

সিটি দিতে দিতে ধীর নিজের বাড়িতে চলে গেল। কেবল নীরব চুপ করে ওর কথা গুলো গিললো ছোটো বাচ্চার মতো। যেনো ছোট্ট একটা বাবু একা একা হাঁটছে রাস্তা দিয়ে। পায়ের কাছে পড়ে থাকা ছোটো ইটের টুকরোটা শর্ট মারতে মারতে নীরব নিজের বাড়িতে চলে গেল।

( চলবে )

নিরালায় ভালোবাসি
কলমে : তুহিনা পাকিরা
২৫ .

আজকের দিনটা অন্যরকম। তার কারণ একটাই, আজ হোলি অর্থাৎ রঙের উৎসব। রাস্তায় সকল বাচ্চারা অতপ্রেতে লুকিয়ে রয়েছে। যেই কাউকে তারাহুরো করে যেতে দেখছে তাকেই রঙে ভরিয়ে দিচ্ছে। আর আম জনতার আজকের দিনটা প্রতিবারই আফসোসেই কাটে। প্রতিবারই যতই তারা আগে থাকতে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে রাখুক না কেনো দেখা যাবে সেই হোলির দিন সেই কিছু না কিছু আনতে দোকানে ছুটতে হয়। আর যারা বাড়িতে লুকিয়ে থাকে আজকের দিনে, তাদের ব্যবস্থা হয় অন্যরকম। দেখা যাবে তুমি নিশ্চিন্তে রান্নাঘরে মাংসটা জমপেশ করে কষছো। সেই মুহূর্তে তোমারই পাড়ার তোমরাই পাশের বাড়ির কাকিমা এসে তোমাকে রঙে ডুবিয়ে তোমাকে সঙ্গে করে অপর বাড়িতে হানা দেবে। এইতো কিছুক্ষণ আগেই নীচ থেকে ইচ্ছের মা, জেঠিমার চিৎকারের শব্দ আসছিল। তার কারণ পাশের বাড়ির সব জেঠিমা, কাকিমা মিলে তাদের রঙ মাখাতে এসেছে। তৃপ্তি নতুন বউ, তাকেও কেউ ছাড়েনি। সবাই মিলে বগল ডাবা করে পাশের বাড়িতে গিয়েছে। এই একদিক দিয়ে ইচ্ছে আছে বেশ ভালো। গত পাঁচদিন ধরে জ্বরে পুড়ে বিছানাতেই ওর স্থান এখন। সেই দিন বাড়িতে ফেরার পর থেকেই মেয়ের ধুম জ্বর। একেই তো ভয় পেয়েছিল, তার উপর যতদিন কলেজ গিয়েছে রোজ একটা না একটা আইসক্রিম খেয়ে সর্দি বাড়িয়েছে। নীরব যখন ইচ্ছের শরীর খারাপ দেখলো ভীষন রেগে গিয়েছিল। প্রচণ্ড বকা খেতে গিয়েও ইচ্ছে বেঁচে গিয়েছে ধীরের জন্যে। বাড়ির কাউকেই নীরবের প্ল্যানের সম্পর্কে ধীর বলেনি। তাই সবাই এটাই জানে যে, নীরব ইচ্ছের সাথে থাকতে চায় না বলেই ওকে সুবীরের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিল। ব্যাস কেউ আর নীরবকে সাপোর্ট করছে না। উল্টে ইচ্ছের কাছে যেতেও দিচ্ছে না। বিশেষ করে নীরবের মা তো ইচ্ছের কাছেই রয়ে গেছে। যাতে তার ছেলে এখানে না আসতে পারে। তবে নীরব মা কে লুকিয়ে বেশ কয়েকবার ইচ্ছেকে দেখতে গিয়েছিল। কিন্তু ইচ্ছে তো জ্বরের মধ্যেও রাগ দেখিয়ে নীরবের দিকে ফিরেও তাকায়নি। এমনকি নীরব ওর হাত ধরেছিল বলে সেইদিন কেউ ওকে ঔষধ খাওয়াতে অবধি পারেনি। পড়ে নীরব আর আসবে না বলে তবে ইচ্ছের কাছ থেকে গেছে। আর আসেনি।

বিছানায় এইদিক সেইদিক করতে করতে উঠে বসলো ইচ্ছে। পায়ের কাছে গায়ের চাদরটা কুণ্ডলী পাকিয়ে গিয়েছে। গা টা ইচ্ছের বড্ড ম্যাজম্যাজ করছে। মাথাও ভার হয়ে রয়েছে। গায়ে এখনও হালকা হালকা জ্বর অনুভব করছে ইচ্ছে। কিন্তু এই ভাবে শুয়ে থাকতে ওর ভালো লাগছে না। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে নেমে বারান্দার গ্রীলে গিয়ে মাথা ঠেকালো ইচ্ছে। নীচে এখনও রঙের খেলা চলছে। প্রত্যেককে এক একটা ভূতের চেয়ে বেশি লাগছে। ছোটো ছোটো বাচ্চা গুলো কাওকে না পেয়ে নিজেরাই নিজেদের রঙ মাখিয়ে ঘুরছে। অনেকে আবার রঙের বালতিতে বেলুন ভর্তি রঙ জোগাড় করছে। ইচ্ছের ছোটবেলার কথা মনে পড়ছে। আগে কতো মজা হতো। নীরব প্রতিবার ইচ্ছের বালতির রঙ নিয়ে পালিয়ে যেত। আর ইচ্ছে কাঁদতে কাঁদতে নীরবের বাড়িতে চলে যেত, ওর মাকে বলতে। বিচার দিয়ে আসার পথে নীরবের মায়ের হাতের নাড়ু, মোয়া নিয়ে এক গাল হেসে এসে নীরবকে ভেংচি কেটে নিজের বাড়িতে চলে যেত স্নান করতে। প্রতিবারের এক রুটিন। কথা গুলো ভাবতে ভাবতেই ইচ্ছের মুখে হাসি খেলে গেলো। হুট করেই আজ কেমন ওর সাজতে ইচ্ছে করলো। কেনো করলো কে জানে। হয়তো কিছুক্ষণ আগে ফোনে শান্তিনিকেতনের ভিডিও দেখেও হতে পারে। আবার গতকাল কলেজের বসন্ত উৎসবের জন্যেও হতে পারে। কাল তো জ্বরের জন্য ও কলেজে যেতেই পারেনি। সব মেয়েরা শাড়ি পরে এসেছিল। রঙ খেলেছে একসাথে। তাছাড়া নাচ, গান ও হয়েছে।

চট করে ঘরে ছুটলো ইচ্ছে। কতকটা মাতালের মতো, টলতে টলতে। আসলে জ্বরের ঘোর ওর এখনও কাটেনি। আলমারি খুলতে হলো না। সোফাতেই একটা লাল, হলুদ শাড়ি পরে ছিল। ওই শাড়িটাই পরনের চুড়িদারের উপর জড়িয়ে পরে নিলো ইচ্ছে। কিন্তু কেমন একটা দেখতে লাগলো ওর নিজের কাছে। সদ্য জ্বর ছাড়া শরীরটা একেই তো রুগ্ন লাগছে, তার উপর মাথা দিয়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। বোধ হয় জ্বর ছাড়ছে। ইস্, চোখ গুলোও বড্ড ভিতর দিকে ঢুকে গেছে। মনটা চট করে খারাপ হয়ে গেলো ইচ্ছের। কিন্তু ড্রেসিং টেবিলে থাকা ছোটো ছোটো পুতি দেওয়া মুক্তোর মালাটা দেখে যেনো চোখ জোড়া চক চক করে উঠলো। চট করে হারটা গলায় পড়ে ফুলের ট্রে থেকে একটা হলুদ গাঁদা কানের পিছনে গুঁজে দিলো ইচ্ছে। এইবার আর নিজেকে আয়নায় দেখতে মন চাইলো না ওর। এবারও যদি খারাপ লাগে দেখতে, থাকনা কী দরকার। নিজের যদি এইভাবে সাজতে মন চায় ক্ষতি তো নেই। ইচ্ছে যদি প্রেমিক হতো তবে নিজের প্রেমিকাকে অবশ্যই বলতো, একদিন শাড়ির সাথে একটা হার পড়ে কানের পিছনে গাঁদা ফুল গুঁজে দিও। আমার খুব ভালো লাগে। কিন্তু বলা যখন হবে না। নিজের ক্ষেত্রেই শ্রেয়।

বাইরে থেকে ” পিকু” , ” পিকু” শব্দ শুনে ইচ্ছের মনটা খুশি হয়ে গেলো। ওর বারান্দায় বুঝি আজ ইরা এসেছে! কথাটা ভেবেই আবার বারান্দায় গেলো ইচ্ছে। ইরা তো আর নেই। ওকে তো ইচ্ছে নিজেই ছেড়ে দিয়েছে। ও তবে কোথা থেকে এলো।

হ্যাঁ বারান্দায় সত্যিই ইরা এসেছে। এতক্ষণ ” পিকু” বলে ইচ্ছেকেই ডাকছিল। ইচ্ছে পরম মমতায় ইরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই ইরা উড়ে গিয়ে নীরবদের বারান্দায় চলে গেল। ইচ্ছের মনটা খারাপ হয়ে গেলো। কী দরকার ইরার নীরবের বারান্দায় যাবার। কে ও? ইচ্ছে তো ওর বেশি আপন, নীরব তো কম। ওর একদম নীরবের কাছে যাওয়া উচিত হয়নি। ইরা নির্ঘাত জানে না নীরব কতো বাজে! ইচ্ছেকে তো নীরব রোজ কষ্ট দেয়। ওর সাথে দেখা করতে অবধি আসে না। একদিন না ওকে দেখে রাগে ঔষধ খায়নি সেই দিন থেকে তো ইচ্ছে নামক মেয়েটাকে ভুলে গেছে। এই সব তো জানা কথা ঘ্যাম খাচ্ছে বেশি। আজ ইচ্ছে যদি কথা বলতে পারতো তাহলে ওর ঘ্যাম খাওয়া ছুটিয়ে দিতো।

ওই অবস্থাতেই নীরব দের বাড়ি ছুটলো ইচ্ছে। ইরাকে ঐখানে কিছুতেই থাকতে দেবে না ও। নিজের কাছে রাখবে। নীরবের কাছে থাকলে নীরবের মতো হবে। দেখা যাবে ইচ্ছেকে কোনদিন ভুলে যাবে।

রাস্তার বাচ্চা গুলোর দিকে তাকাতে হয়নি। তারা ইচ্ছেকে পাগলের মতো টলতে টলতে ছুটতে দেখে ওরাও ওদের মত সরে গিয়েছে। আসলে পুরোটাই ফলস। আসল খেলা তো দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা ব্যাক্তির। যার হাতের জাদুতে সকলে সম্মানের সঙ্গে ইচ্ছেকে যাবার রাস্তা করে দিয়েছে।

উপরে গিয়ে সোজা নীরবের ঘরের দিকে ছুটেছে ইচ্ছে। না কেউ নেই। বাড়ি সম্পূর্ণ ফাঁকা বলতে গেলে। আসলে নীরবই বাড়িতে নেই। বারান্দার খাঁচার মাথার দিকে ইরা বসে বসে ” পিকু” বলে চলেছে। ইচ্ছেকে হাত বাড়িয়ে ইরাকে কোলে তুলে নিয়ে অভিমানী দৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকাতেই চোখ পড়লো বারান্দার গ্রীলে হেলান দেয়া নীরবের দিকে। নীরব তো ইচ্ছের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। আজ কি নেশা হবার দিন? তাহলে তো এই মেয়েটার নেশায় পড়ে গেছে নীরব। সদ্য জ্বর ছাড়া ঘামের বিন্দু জমা মুখটা নীরবকে বড্ড কাছে টানছে। পরনের সাদা পাঞ্জাবির পকেটে একহাত পুরে নীরব বলে উঠলো,

“বসন্তেরই উষ্ণ দুপুরে
ধুম জ্বর ছাড়া বিন্দু বিন্দু ঘর্ম মাখা শরীরে
নির্জীব তোমার যখন, একখানি হলুদ শাড়িতে
হলুদিয়া পাখি সাজতে মন চায়।
আমি তখন দূর এক বারান্দার পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে
তোমার ইচ্ছেটাকে উপলব্ধি করি। ”

প্রতিটা শব্দে নীরব ইচ্ছের দিকে এগিয়ে গেলো। শেষ মুহূর্তে নীরব যখন ঠিক ইচ্ছের সামনে,, সেই মুহূর্তে ইচ্ছের মাথাটা দুই হাতে ধরে ইচ্ছের চুলের মাঝে নিজের ওষ্ঠদ্বয় স্পর্শ করলো নীরব। পুনরায় বলে উঠলো,

“ফুলের ট্রে তে থাকা কতো না ফুলের মাঝে
তুমি যখন একখানি হলুদ গাঁদাকে
তোমার কানে পরম মমতায় গুঁজে দাও।
আমার মন তখন আনচান করে বলে ওঠে
তোমার মাথায় উষ্ণ এক চুম্বন এঁকে দিতে।

তোমার গলায় দোলা ওই ছোটো পুঁতির
মালাগুলোকে হিংসে হয় খুব।
একবার তোমায় কাছে পেলে
অতিতুচ্ছ ওই মালাকে এক টানে ছিঁড়ে দেবো আমি।
একটা একটা করে তোমার শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া মালাটার অহংকারকে নিঃশেষ করবো আমি।”

ইচ্ছের গলার মালাটা সত্যিই অহংকার ত্যাগ করে ইচ্ছের শাড়ির ভাঁজ দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে মেঝেতে পড়ে গেলো। নীরব পকেট থেকে লাল আবিরের প্যাকেট থেকে একমুঠো আবির নিয়ে ইচ্ছের দুই গালে লাগিয়ে দিয়ে বলে উঠলো,

“কানের পাশের ছোটো ছোটো চুল গুলো থেকে যখন ঘামের বিন্দু গুলো তোমার গাল বেয়ে ঝরে যাবে,
নির্জীব তোমার দুই গালে লাল আবিরের
পরশ ছোঁয়াতে কেঁপে উঠবে তুমি।

আমার বসন্তের রঙিন মন বলে
ভালোবাসায় জড়িয়ে ধরতে।
তোমার সদ্য জ্বর ছাড়া
উষ্ণ-ঘর্মাক্ত শরীরে মিশে যেতে মন চায়।”
– ” আমি কি তোকে জড়িয়ে ধরতে পারি?”

বারান্দার গ্রীলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ইচ্ছে। যেনো গ্রিলের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। নীরবের প্রতিটা শব্দ ওর হৃদয়ে কম্পনের সৃষ্টি করছিল। কোনো এক লজ্জার স্রোত ওকে গভীর সমুদ্রে যেনো টেনে নিয়ে গিয়েছে। নীরব কবিতা শেষে ইচ্ছের দিকে তাকিয়ে হেসে কথাটা বলতেই ইচ্ছে নীরবের বুকে মিশে যায়। ভালোবাসার মানুষটাকে আর একবার দুই হাত বাড়িয়ে আহ্বান করে। আজ তো ভালোবাসতে মানা ,,

———————–

ডাইরির পৃষ্ঠার পরের পাতাটা ওল্টানোর আগেই তাথৈ এর হাত থেকে ডায়রিটা কেড়ে নেয় ইচ্ছে।

– ” ও বৌদি, দাও না ওটা পড়ি। আর তো একটু খানি বাকি। দাও না! ”
ঘাড় নেড়ে ডাইরিটা নিয়ে ঘরে ঢোকে ইচ্ছে। যার অর্থ, আর না তাথৈ। এই টুকুই ইনাফ তুই যা পড়েছিস।

ইচ্ছের পিছনে তাথৈ ও আসে। আর এসেই এক আবদার বৌদি ডায়রিটা দাও। ইচ্ছে অবশ্য ততক্ষনে ডায়রি ড্রয়ারে পুরে চাবি দিয়ে দিয়েছে।

সময়ের দিক থেকে অনেক কিছু পরিবর্তন হয়েছে। এই যে তাথৈ এখন ইচ্ছেকে আর” ইচ্ছে দি” না বলে “বৌদি” বলছে। আরও অনেক কিছুই হয়েছে। সবার ভালোবাসা গুলো বেড়েছে। তার উপর আজ তো নীরব , ইচ্ছের বাড়ি লোক জনে সমাগম বলা যেতে পারে। কিছু একটা আছে আজ। আসলে ছিল। একটু আগেই সব শেষ হয়েছে। এই ততক্ষণ তাথৈ পুরোনো সম্পর্ক গুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল। দেখছিল হয়তো ভালোবাসার মাপকাঠি। কিংবা ইচ্ছের ভালোবাসার জোর।

( চলবে )
{ বিঃ : ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।}