#পদ্মফুল
#জান্নাতুল_ফারিয়া_প্রত্যাশা
|৪৭|
আজ সকাল সকালই পদ্ম তার পাঠশালার উদ্দেশ্যে বেরিয়েছে। পথিমধ্যে রোজগার মতো এক কাপ চা পান করতে ভুললো না সে। মন মেজাজ ভালো নেই, এই সময় চায়ের প্রয়োজন টা একটু বেশিই হয়।
পাঠশালায় পৌঁছে আজ আর বাচ্চাদের কাছে গেল না পদ্ম। সোজা সে গেল অনিকের অফিস রুমে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সে অনিকের অনুমতি নিল। পদ্ম কে দেখে অনিক স্বাভাবিক ভাবেই বললো,
‘আসুন।’
পদ্ম ভেতরে গিয়ে একটা চেয়ারে বসলো। অনিক লেপটপ টা সাইডে সরিয়ে পদ্ম’র দিকে তাকাল। তারপর বললো,
‘আপনি আর চাকরী টা করবেন না, তাই তো?’
পদ্ম অবাক হলো। সে ব্রু কুঁচকাল, বললো,
‘আপনি কী করে জানলেন?’
অনিক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কিন্তু এই দীর্ঘশ্বাস কে দীর্ঘ ক্লান্তি শ্বাসও বলা যায়। সে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলো। পদ্ম’র উপর গভীর দৃষ্টি ফেলে বললো,
‘আপনি আদিদ কে ভালোবাসেন। হয়তো নিজের রাগ আর অভিমানকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে উল্টো আপনি আপনার নিজের কষ্ট বাড়াচ্ছেন। ভালোবেসেও এখন স্বীকার করতে চাইছেন না। আপনাকে তো আমি সাহসী ভাবতাম, কিন্তু আজ তো মনে হচ্ছে আপনি ভীষণ ভীতু। যে ভালোবাসার কথা স্বীকার করতে পারে না সে কখনোই সাহসী হতে পারে না। আমি এই কয়দিনে আপনার প্রতি যা অনুভব করেছি তা কিন্তু বিনা দ্বিধায় আপনাকে বলে দিয়েছি। কারণ আমার মনে হয় এই জীবন টা খুব সংক্ষিপ্ত, আপনি একটা কথা বলবেন বলবেন করে ভাবতে ভাবতেই দেখবেন আপনার জীবনের পাতা ঝরার সময় চলে এসেছে। তখন আপনার আফসোস হবে, মনে হবে কেন সময় থাকতে বলেনি। তাই আমি কোনো আফসোস রাখতে চাই না। মনে যা এসেছিল বলে দিয়েছিলাম আপনাকে। আপনি না করেছেন, চলে গিয়েছেন। সবটাই স্বাভাবিক। আপনার জন্য তো আর আমার জীবন থেমে থাকবে না, তাহলে আমি কেন থেমে থাকব। তাই আমি আমার মতোই আছি। আর আপনাকে আমি এসব কথা কেন বলছি জানেন, যেন আপনার এইরকম আফসোস কখনো না হয়। কখনো যেন মনে না হয়, “ইশ, কেন সেদিন বললাম না।” দেখুন পদ্ম, আপনি আমি কেউই জীবনে একপাক্ষিক ভাবে সুখ নিয়ে বেঁচে নেই। সুখের সাথে একটা বিরাট অংশ জুড়ে আছে দুঃখও। তাই বলে কি, আমরা থমকে যাবো? পুরোটা জীবন দুঃখের শোকেই কাটিয়ে দেব? একদমই না। পরিস্থিতি যেমনই হোক তার মধ্যে থেকেও সুখটা খুঁজে বের করে নিবেন। কোনোদিন ভাববেন না, আমার জীবনে বুঝি আর সুখ আসবে না, আজীবন আমাকে এই দুঃখ নিয়েই থাকতে হবে। একটা কথা মনে রাখবেন, সুখ নিজ থেকে আসে না, সুখকে আনতে হয়। আপনার যখন যেটাতে সুখ মনে হবে, আপনি তখন ঠিক সেটাই করবেন। ডানে বামে এতকিছু ভাবতে হবে না। কী হবে এত ভেবে? জীবন একটাই পদ্ম, এই একটা জীবনেই আমাদের প্রাণ খুলে বাঁচতে হবে। এত হতাশা নিয়ে বাঁচা যায় না। এত রাগ, এত অভিমান করে কী লাভ। এসব কি আপনাকে সুখ এনে দিচ্ছে, দিচ্ছে না তো। সবকিছু ভুলে যান। যাকে ভালোবাসেন, তাকে টুপ করে বিয়ে করে নিন। জীবনে সহজ ভাবে বাঁচতে শিখুন। এত পেঁচিয়ে কোনো লাভ আছে, হু? আমার কথাগুলো ভেবে দেখবেন, পদ্ম। আশা করছি আপনার বোধগম্য হবে।’
পদ্ম কোনো জবাব না দিয়ে চুপচাপ বসে রইল। অনিক এবার একটা মোটা বাঁধাই করা খাতা বের করে বললো,
‘এখানে একটা সাইন করে দিন।’
পদ্ম খাতাটার দিকে তাকিয়ে বললো,
‘কী এটা?’
‘এখানে সাইন করলেই আপনি আজ থেকে মুক্ত। আপনাকে তখন আর এই চাকরী টা করতে হবে না।’
কথাটা বলে অনিক খাতাটা পদ্ম’র দিকে এগিয়ে দিল।পদ্ম খাতাটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো,
‘না, আমি সাইন করবো না।’
অনিক মুচকি হেসে বললো,
‘তারমানে আপনি আমার কথাগুলো বুঝতে পেরেছেন। যাক, শান্তি পেলাম। এবার আপনি আপনার বাচ্চাদের কাছে যান, ওরা আপনাকে এই কয়দিন না দেখতে পেয়ে পাগল হয়ে উঠেছে।’
পদ্ম উঠে যেতে নিয়েও আবার বসলো। বললো,
‘আচ্ছা, আদিদের কথা আপনি কী করে জানলেন?’
অনিক হালকা হেসে বললো,
‘অভি আমাকে সবকিছু বলেছে।’
পদ্ম আরো বেশি অবাক হলো এবার। অভি ভাই তো এসব ব্যাপারে কিছু জানতেন না। তাহলে উনাকে এসব কে বলেছে..ডাক্তারবাবু?
বাচ্চাদের পড়িয়ে পদ্ম আবার বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। আজ তার হেঁটে যেতে ইচ্ছে করছিল না বলে রিক্সায় চড়েছে। কিন্তু, বিরক্তিকর ব্যাপার হলো অর্ধেক পথে গিয়ে জ্যামে আটকাতে হলো তাকে। সকাল বেলা মেজাজ খারাপ থাকলে এখন তার মন ফুরফুরে। বাচ্চাদের দেখে মন হালকা হয়েছে তার আর অনিকের কথাগুলোও খুব ভালো লেগেছিল। সত্যিই তো, এই ক্ষুদ্র জীবন নিয়ে এত কিসের ভাবনা। নিজেকে সুখী রাখতে এখন থেকে সর্বস্ব টা করবে সে। তার ভাবনার মাঝেই জ্যাম টা ছাড়ল। ব্যাটারি চালিত রিক্সা টা সা সা করে ছুটে চললো। আর সেই বাতাসের দাপটে পদ্ম’র চুলগুলো উড়ছে। সেগুলো বারবার কানের পেছনে গুঁজে দিচ্ছিল সে। ভালো লাগছিল, মনটা হালকা লাগছিল তার। সে বাসায় ফিরলো। আসার পথে রাণীর জন্য ফুচকাও নিল। কালকে চ’ড় মা’রার পর থেকে মেয়েটা তার সাথে আর কথা বলছে না। মেয়েটার রাগ ভাঙাতে হবে। আর এই ফুচকাই তার একমাত্র অস্ত্র।
ফুচকা পাওয়া মাত্র সত্যি সত্যিই রাণীর সব রাগ ফুস হয়ে গেল। সে খুশিতে লাফাতে লাফাতে রান্নাঘর থেকে একটা বাটি এনে ফুচকা খেতে বসলো। পদ্ম মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রাণীর খাওয়া দেখল। রাণী পদ্ম কে সাধলও না। একাই খেল সব ফুচকা। রাণীর খাওয়া শেষ হবার পর পদ্ম বললো,
‘এখন আর আমার উপর রেগে নেই তো?’
রাণী ভাব নিয়ে বললো,
‘শুধুমাত্র ফুচকা এনেছো বলে মাফ করে দিয়েছি, নাহলে জীবনেও মাফ করতাম না।’
পদ্ম খুশি হয়ে আদর করে রাণীর গালটা টেনে ধরলো। রাণী আর কিছু বললো না। পদ্মও কিছুক্ষণ চুপ রইল। অনেক ভাবনা চিন্তার পর সে ছোট্ট একটা নিশ্বাস ছেড়ে বললো,
‘রাণী, আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
রাণী বললো,
‘জানি, তুমি পাঠশালার চাকরী টা আর করবে না। কথা তো বলতে গিয়েছিলে। তা তোমার স্যার কী বললো?’
‘আরে না, পাঠশালার কাজ আমি করবো। আমি অন্য একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
রাণী ব্রু কুঁচকালো। বললো,
‘আবার কী সিদ্ধান্ত নিয়েছো?’
পদ্ম মাথা নুইয়ে ইতস্তত কন্ঠে বললো,
‘আমি ডাক্তারবাবুকে বিয়ে করবো।’
রাণী চেঁচিয়ে উঠার আগেই পদ্ম তার মুখ চেপে ধরলো, বললো,
‘চেঁচাস না, আমাকে আগে শেষ করতে দে।’
তারপর সে রাণীর মুখ ছেড়ে দিয়ে একটু শান্ত ভাবে বসলো। বললো,
‘বিয়ে করবো তবে এত সহজে না। ডাক্তারবাবু আগে নিজে থেকে আমাকে বিয়ের প্রপোসাল দিবে, তারপর আমি উনাকে বিয়ে করবো। এর আগে না।’
খুশিতে রাণীর চোখমুখ চকচক করছে। সে আহ্লাদ মাখা কন্ঠে বললো,
‘দিবে দিবে, ডাক্তার সাহেব নিজেই তোমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিবে। আর তার ব্যবস্থা আমিই করবো।’
পদ্ম কপালে চওড়া ভাঁজ ফেলে বললো,
‘কী করবি তুই?’
রাণী ফিসফিসিয়ে বললো,
‘ইট’স সিক্রেট। বলা যাবে না।’
কথাটা বলেই রাণী খিলখিলিয়ে হাসল। আর পদ্ম বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে চেয়ে রইল রাণীর সেই হাসির দিকে।
চলবে…
#পদ্মফুল
#জান্নাতুল_ফারিয়া_প্রত্যাশা
|৪৮|
বিকেলের দিকে হঠাৎ করেই রাণীর খুব পেটে ব্যাথা উঠল। এমন ভয়ানক পেটে ব্যাথা আজ অবধি তার হয়নি। মেয়ে তো সেই ব্যাথা সহ্য করতে না পেরে চিৎকার চেঁচামেচি করে পুরো বাড়ি মাথায় তুলছে। পদ্ম কোনোভাবেই তাকে শান্ত করতে পারছে না। পেটে ব্যাথা হলে বেশি করে পানি খেতে হয়, সেই বিদ্যাও পদ্ম রাণীর উপর খাটিয়েছে। কিন্তু লাভ হয়নি, ওর ব্যাথা কমবার নামই নিচ্ছে না। রাণী আর সহ্য করতে না পেরে জোরে জোরে কাঁদছে। পদ্ম কী করবে বুঝতে পারছে না। আশেপাশে কোনো ফার্মেসীও নেই যে কোনোরকমে একটা ঔষধ এনে খাওয়াতে পারবে। পদ্ম উপায়ান্তর না দেখে একটা প্যারাসিটামল রাণীকে দিল। কিন্তু রাণী নাকি সেটা খাবে না। রাণী কাঁদতে কাঁদতে বললো, এই সামান্য ঔষধে তার পেটে ব্যাথা কমবে না, তাকে নিয়ে হসপিটালে যেতে হবে। হসপিটাল তাদের এই কলোনি থেকে অনেকটাই দূরে। পদ্ম কোনোভাবেই রাণীকে ঔষধ খাওয়াতে পারলো না। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে তাকে রাজি হতে হলো। রাণী তখন আবার বললো, সে নাকি অন্য কোনো হসপিটালে যাবে না, সে আদিদের হসপিটালে যাবে। পদ্ম এবার কোমরে হাত দিয়ে তীক্ষ্ণ কন্ঠে বললো,
‘তুই ইচ্ছে করে এসব করছিস তাই না?’
রাণী আরো জোরে কেঁদে উঠল। ফুঁপাতে ফুঁপাতে বললো,
‘তোমার কাছে আমার এই কান্না নকল মনে হচ্ছে? অবশ্য তুমি কী বুঝবে আমার কষ্ট, ব্যাথা তো আমার হচ্ছে তাই আমি জানি কতটা বেদনাদায়ক এই ব্যাথা। থাক লাগবে না, আমি এমনিই সুস্থ হয়ে যাবো। আমাকে নিয়ে কষ্ট করে আর হসপিটালে যেতে হবে না।’
রাণীর এসব সেন্টিমেন্টাল কথাবার্তা শুনে পদ্ম বিরক্ত হলেও সেটা মুখে প্রকাশ করলো না। তার মনে হচ্ছে রাণী সত্যিই নাটক করছে। কিন্তু তার অভিনয় এত নিখুঁত যে ধরার উপায় নেই।
রাণীর কান্নার বেগ বাড়লে পদ্ম কে এবার রাজি হতে হয়। সে রাণী কে নিয়ে হসপিটালে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়। পথিমধ্যে পদ্ম তাকে কাছের একটা হসপিটালে নিতে চেয়েছিল কিন্তু রাণী বাচ্চাদের মতো ঝিম ধরে রিক্সার মধ্যেই বসে থাকে। সে কোনোভাবেই নামবে না। পদ্ম কে তখন রেগে মেগে আবার রিক্সায় উঠতে হয়। ত্রিশ মিনিটের পথ পাড়ি দিয়ে তারা আদিদের হসপিটালে গিয়ে পৌঁছায়। পদ্ম রাণীকে ধরে নামিয়ে রিক্সার ভাড়া দেয়। রাণী এই প্রথম তার ডাক্তার সাহেবের হসপিটালে এসেছে। খুশিতে তার চোখ মুখ গদগদ। তবে পদ্ম’র সামনে সেটা সে প্রকাশ করছে না। সে পদ্ম কে কাঁদতে কাঁদতে বললো,
‘আপু, আমাকে তাড়াতাড়ি ভেতরে নিয়ে চলো; আমি আর এই ব্যাথা সহ্য করতে পারছি না।’
পদ্ম রাণী কে ধরে ভেতরে নিয়ে গেল। ভেতরে গিয়েই রাণী এদিক ওদিক তাকিয়ে মনে মনে আদিদ কে খুঁজতে লাগল। পদ্ম রাণীকে নিয়ে রিসিপশনে গেল। সেখানে গিয়ে সে একজন ভালো লিভার বিশেষজ্ঞের খোঁজ নিল। সেখান থেকে ডক্টরের খোঁজ নিয়ে তারা লিফট দিয়ে তিন তলায় উঠল। ডক্টরের চেম্বারের কাছে গিয়ে দেখল বেশ বড়ো সিরিয়াল। রাণী কে নিয়ে পদ্ম একটা সাইডে বসলো। রাণীর মন তো ঐদিকে হাঁসফাঁস করছে আদিদের সাথে দেখা করার জন্য। সে তখন ইনিয়ে বিনিয়ে পদ্ম কে বললো,
‘আচ্ছা আপু, ডাক্তার সাহেবের কেবিন টা কোন দিকে?’
পদ্ম ব্রু কুঁচকে ফেলল। বললো,
‘কেন?’
রাণী জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে নিতে বললো,
‘আমাকে তো ডাক্তার সাহেব দেখলেই পারতেন। অযথা এই ডাক্তারের কাছে কেন নিয়ে এসেছো?’
পদ্ম তখন চোখ মুখ কুঁচকে অত্যন্ত বিরক্ত কন্ঠে বললো,
‘উনি একজন সার্জন, রাণী। উনি আপনার পেটের চিকিৎসা করতে পারবেন না। আর সব রোগের জন্যই আলাদা আলাদা বিশেষজ্ঞ আছেন। আপনাকে শুধু আপনার ডাক্তার সাহেবের কাছেই কেন যেতে হবে, শুনি?’
রাণী জবাব না দিয়ে মুখ কালো করে বসলো। পদ্মও আর কিছু বললো না।
পদ্মদের সিরিয়াল এলো। তাদেরকে ডাকা হলে সে রাণীকে নিয়ে ভেতরে গেল। চেয়ারে বসার পর ডক্টর পেশেন্টের সমস্যা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। পদ্ম ডক্টর কে বললো, তার বোনের দুপুরের পর থেকেই অনেক পেটে ব্যাথা। কোনোভাবেই কমছে না, তাই বাধ্য হয়ে তাদের হসপিটালে আসতে হয়েছে। ডক্টর রাণীর দিকে তাকিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করতে লাগলেন, এই যেমন কখন থেকে ব্যথা শুরু হয়েছে, পেটের ঠিক কোনদিকে ব্যাথা করছে, ব্যাথা ঠিক কতটা তীব্র..ব্লা ব্লা..
রাণী কী উত্তর দিবে। সে ভোমরা মুখে ডাক্তারের প্রশ্নে উল্টা পাল্টা উত্তর দিল। ডাক্তার বুঝলেন কিনা কে জানে। তিনি কতকগুলো টেস্ট লিখে দিলেন। যার মধ্যে ছিল আলট্রাসনোগ্রাফি, ব্লাড টেস্ট আর ই সি জি। রাণী বুঝলো না পেটের সাথে বুকের কী সম্পর্ক, আলাট্রাসনোগ্রাফি টা মানানসই কিন্তু ই সি জি কেন। পদ্ম রাণীকে নিয়ে ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে বললো,
‘চল, এবার টেস্টগুলো করিয়ে আনি।’
রাণী জোরে হাঁটা ধরে বললো,
‘জীবনেও না। আজাইরা যতসব ডাক্তার। একটু কোনো অসুখ হলেই একগাদা টেস্ট ধরিয়ে দেয়। আমার কোনো পেটে ব্যাথা নেই। তাই এসব টেস্ট করানোর কোনো প্রশ্নই আসে না।’
পদ্ম ঠোঁট চেপে হাসল। বললো,
‘ওমা, তোর পেটে ব্যাথা এত তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে গেল। আমি তো ভেবেছিলাম এই পেটে ব্যাথা এই জীবনেও যাবে না। তা এত তাড়াতাড়ি কীভাবে ভালো হয়ে গেল, বলতো?’
রাণী বাঁকা চোখে তাকিয়ে বললো,
‘কেন, আমি সুস্থ হয়ে গেছি, তাতে তুমি খুশি নও?’
‘কী বলিস, খুশি না হয়ে যাবো কোথায়। তোর এত সুন্দর এক্টিং দেখে আমি জাস্ট মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেছি। এত ভালো এক্টিং কী করে করিস তুই?’
কথাটা বলেই পদ্ম হাসতে আরম্ভ করে। পদ্ম’র হাসি দেখে রাণী নাক মুখ ফুলিয়ে বলে,
‘তোমার থেকেই শিখেছি। তুমিও তো সেদিন ডাক্তার সাহেব আর তার মা’র সামনে কী সুন্দর এক্টিং করলে। কেউ তোমার এক্টিং ধরতে পারেনি। আমি তো সেদিনই শিখেছিলাম, কীভাবে এক্টিং করে মানুষকে বোকা বানাতে হয়।’
পদ্ম রাগী গলায় রাণীকে বললো,
‘মার খাবি কিন্তু, রাণী।’
‘পরে খাবো। এখন আমাকে আগে ডাক্তার সাহেবের কেবিনে নিয়ে যাও।’
পদ্ম ভাব নিয়ে বললো,
‘আমি কেন নিয়ে যাবো? এত যখন তোর উনার সাথে দেখা করার ইচ্ছা, তো তুই নিজেই খোঁজে নে না তোর ডাক্তার সাহেবের কেবিন, আমাকে বলছিস কেন?’
রাণী ভেংচি কেটে বললো,
‘ঠিক আছে, দাঁড়িয়ে থাকো তুমি এখানে। আমি একাই যাবো।’
রাণী তাড়াতাড়ি রিসিপশনে গেল। সেখান থেকে ডক্টর আদিদের কেবিনের খোঁজ বের করে ফেলল সে। খুশিতে সে লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটল সেদিকে। আদিদের কেবিনের সামনে গিয়ে দেখল সেখানেও অনেক মানুষ। সে সেখানের স্টাফের সাথে কথা বললে স্টাফ তাকে জানাল, সন্ধ্যা সাত’টার আগে আদিদের সাথে কোনোভাবেই দেখা করা যাবে না। এখন বাজে মাত্র পাঁচ টা। ছয় টা, সাত টা আরো দুই ঘন্টা। এতক্ষণ পর্যন্ত তো জীবনেও পদ্ম তার জন্য অপেক্ষা করবে না। রাণী স্টাফ কে অনেকভাবে রিকোয়েস্ট করলো, একবার তাকে ভেতরে যেতে দেওয়ার জন্য। কিন্তু স্টাফ তার কথায় পাত্তা না দিয়ে সে তার কাজে মনোনিবেশ করলো। রাণী কাঁদো কাঁদো মুখে তখন তাকিয়ে রইল আদিদের কেবিনের দরজার দিকে। পদ্ম এসে তার পেছনে দাঁড়াল। বললো,
‘কী হলো, ভেতরে যেতে দিচ্ছে না বুঝি?’
রাণী না সূচক মাথা নাড়াল। পদ্ম ঠোঁট উল্টে ভেঙানোর ভঙ্গিতে বললো,
‘আহারে!’
রাণী হতাশ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। পদ্ম স্টাফের কাছে যায়। স্টাফ তাকে দেখেই হেসে বলে,
‘ভালো আছেন, আপা?’
পদ্মও হেসে বললো,
‘জ্বি ভালো। আপনি ভালো আছেন?’
‘আমিও আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। অনেকদিন পর আপনারে দেখলাম। দেইখা অনেক ভালো লাগল। আপনি কি আদিদ স্যারের সাথে দেখা করতে আইছেন, স্যার কে বলমু?’
পদ্ম তাকে বাঁধা দিয়ে বললো,
‘না না, থাক। উনি এখন উনার পেশেন্টদের নিয়ে ব্যাস্ত। উনি ফ্রি হলেই আমরা উনার সাথে দেখা করবো।’
‘আচ্ছা, তাইলে আপনি ঐদিকে বসেন। স্যার ফ্রি হলে, আমি বলমু।’
‘ঠিক আছে। ও হ্যাঁ, আরেকটা কথা, এখানে যে একজন নার্স ছিলেন, নাম শিমু; উনি কি এখানে নেই? উনাকে দেখছি না যে?’
‘না, শিমু আপা তো এখন আর এখানে কাজ করেন না। উনি উনার ফ্যামিলি নিয়ে অন্য জায়গায় চইলা গেছেন।’
পদ্ম’র কিছুটা মন খারাপ হলো। সে আবার রাণীর কাছে ফিরে গেল। রাণী তখন রাগান্বিত কন্ঠে তাকে বললো,
‘তোমাকে স্টাফ দেখা করার কথা বলছিল আর তুমি না করে দিলে? কেন? এখন বসে থাকো দুই ঘন্টা। ধুর, ভাল্লাগেনা।’
পদ্ম গিয়ে একটা চেয়ারে বসলো। তারপর ভাবলেশহীন ভাবে জবাব দিল,
‘ভালো না লাগলে চলে যা, কে তোকে এখানে থাকতে বলেছে?’
রাণী পদ্ম’র কথায় পাত্তা না দিয়ে তার পাশে গিয়ে বসলো। তারপর তার কাঁধে মাথা রেখে বললো,
‘আমি ডাক্তার সাহেবের সাথে দেখা না করে যাবো না।’
‘কী করবি দেখা করে?’
পদ্ম তাকে প্রশ্ন করলো। রাণী জবাবে বললো,
‘তোমাকে বলা যাবে না।’
চলবে…
#পদ্মফুল
#জান্নাতুল_ফারিয়া_প্রত্যাশা
|৪৯|
আদিদ গম্ভীর গলায় বললো,
‘আপনার কী সমস্যা রাণী? আপনি চুপ করে আছেন কেন?’
রাণী ঘনঘন চোখের পল্লব ফেলল। উদ্বিগ্ন কন্ঠে বললো,
‘জানেন কী হয়েছে?’
আদিদ টেবিলের উপর কিছুটা ঝুঁকে বললো,
‘না বললে কী করে জানবো?’
রাণী মুখ কালো করে বললো,
‘ঐ অনিক পদ্ম আপুকে বিয়ের প্রপোজাল দিয়েছে। আর আমার মনে হচ্ছে, আপু বোধ হয় এই বিয়েতে রাজি হয়ে যাবে।’
আদিদ ভীষণ বিরক্ত হলো। চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বললো,
‘হোক রাজি। আমার কী তাতে।’
রাণী উত্তেজিত কন্ঠে বললো,
‘আপনার কিচ্ছু না, ডাক্তারসাহেব? আপনি না আপুকে পছন্দ করেন?’
আদিদ কপাল কুঁচকে ফেলল। ক্ষেপে গিয়ে বললো,
‘আমি কখন বলেছি আমি আপনার আপুকে পছন্দ করি?’
‘না বললেও আমি বুঝি।’
আদিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বললো,
‘আপনি বেশি বুঝেন। এত বোঝা ভালো না। তা আপনি কি এখানে একাই এসেছেন?’
রাণী মাথা নাড়িয়ে বললো,
‘না, আপুও এসেছে।’
‘তো উনি কোথায়?’
‘আপনার উনি বাইরে বসে আছেন।’
রাণীর কথা শুনে আদিদ নাকের পাল্লা ফুলিয়ে কাটকাট গলায় বললো,
‘আমার উনি কী আবার?’
রাণী জবাব না দিয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসল। আদিদ নিজেকে শান্ত করে বললো,
‘উনার কি ভেতরে আসতে অসুবিধা হচ্ছে, বাইরে বসে আছেন কেন?’
রাণী খুব সিরিয়াস ভাব নিয়ে বললো,
‘আপু বলেছে, সে নাকি দিনকে দিন খুব সুন্দর হয়ে যাচ্ছে আর তার মনে হচ্ছে আপনি নাকি তাকে দেখে প্রেমে পড়ে যেতে পারেন তাই সে আপনার সামনে আসবে না। আর আপনি তার প্রেমে পড়লে তার অনিকের কী হবে? ঐ বেচারা তো খুব কষ্ট পাবে, তাই না?’
আদিদ জানে রাণী মজা করছে। পদ্ম’র কথা বার্তার ধরণ তার জানা আছে। সে জানে পদ্ম কখনোই এভাবে বলবে না। সে তখন তার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
‘চলুন, আপনার আপুর সাথে কথা বলে আসি। দেখি, উনাকে দেখে আরো একবার প্রেমে পড়তে পারি কিনা?’
রাণী মুখ চাপড়ে হেসে বললো,
‘প্রেমে না পড়লেও আমি জোর করে ফেলে দিব।’
আদিদ সেই কথা শুনলো না। সে বাইরে গেল। গিয়ে দেখল তার কেবিনের বাইরের বেঞ্চ’টা তে পদ্ম মাথা ঝুঁকে বসে আছে। আদিদ গিয়ে তার সামনে দাঁড়াল। পকেটে দু হাত গুঁজে গম্ভীর গলায় ডেকে উঠল,
‘পদ্ম!’
হঠাৎ কারোর ডাকে চমকে উঠল সে। তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াল। আদিদ যেহেতু তার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল তাই সে উঠে দাঁড়াতেই মনে হলো সে আদিদের খুব কাছে চলে এসেছে। সঙ্গে সঙ্গে দু কদম পিছিয়ে আবার বসে পড়ল সে। আদিদ তার কান্ড দেখে বিরক্ত হলো। তীক্ষ্ণ কন্ঠে বললো,
‘সমস্যা কী আপনার?’
পদ্ম শক্ত কন্ঠে বললো,
‘আমার কী সমস্যা হবে?’
‘তাহলে এখানে কেন বসে আছেন?’
পদ্ম হঠাৎ কী উত্তর দিবে বুঝতে পারে না। এখানে কেন বসে থাকে মানুষ? এমনি। কিন্তু তার এখানে এমনি বসে থাকাটা মানায় না। সে প্রসঙ্গ পাল্টাতে বললো,
‘এখানে কি বসা মানা আছে নাকি?’
আদিদ দু হাত বুকের উপর ভাজ করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পদ্ম’র দিকে তাকাল। আদিদের এমন দৃষ্টিতে পদ্ম যেন বিব্রত বোধ করতে লাগল। সে চোখ নামিয়ে ফেলল। আদিদ বললো,
‘ভেতরে গিয়েও তো বসতে পারতেন। রাণী একা গেল অথচ আপনি গেলেন না, কেন? এত কিসের রাগ আপনার আমার উপর? এমন তো নয় আমি আপনাকে ভালোবেসে ধোঁকা দিয়েছি, আপনাকে ঠকিয়েছি। তাহলে আমার সাথে এই ব্যবহারের কারণ কী? আমাকে আপনি সেদিনও কিছু বলার সুযোগ দেননি। অপমান করেছিলেন। আপনি বলুন তো, আমি কি সত্যিই আপনার সেই অপমানের যোগ্য ছিলাম? আমি কি আপনার জন্য কিচ্ছু করেনি, পদ্ম? এইটুকু উপকারও কি আপনি আমার কাছ থেকে পাননি? আমি মানছি আমার মা বাবা অনেক অন্যায় করেছেন, তার জন্য উনারা শাস্তিও পেয়েছেন। আমার বাবা মা’রা গিয়েছেন, আর আমি সেটা জানতামই না। সেদিন জেনেছি সেটা। আমার মা একা এতদিন গ্রামে পড়েছিলেন। ছেলে, স্বামী সবাইকে হারিয়ে উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন উনি। ঐ মানুষটাকে নিয়ে আমি জোর করে শহরে আসি। মা তো, যতই অন্যায় করুক, ফেলে তো আর দিতে পারবো না। আর উনি এসেই জেদ ধরেন, আপনার সাথে দেখা করবেন, আপনার কাছে ক্ষমা চাইবেন। তাই উনাকে আমি আপনার কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমি জানতাম না উনি সেখানে গিয়ে এমন কোনো প্রস্তাব দিবেন। আর সেই প্রস্তাবের বিপরীতে যে আপনিও এতটা রিয়েক্ট করবেন সেটাও আমি আশা করিনি। আপনার মত না’ই থাকতে পারে, তাই বলে কি ওভাবে রিয়েক্ট করতে হবে? এমনটা তো নয় আমি জোর করে আপনাকে বিয়ে করছি, তাহলে? (একটু থেমে) পদ্ম, আপনি আমার কাছে আমার আর পাঁচটা পেশেন্টের মতো নন। আপনার সাথে না চাইতেও আমি অনেক কিছুর জন্য নানাভাবে জুড়ে গিয়েছি। সেদিনের আপনার ছোট্ট একটা এক্সিডেন্ট আজ আপনার আর আমার জীবনে এত বড়ো প্রভাব ফেলেছে। সেই এক্সিডেন্ট টা না হলে হয়তো কখনোই আপনার সাথে আমার পরিচয় হতো না, আর না এত সব কিছু হতো। তবে শুনেছি যা হয়, ভালোর জন্যই হয়। সবকিছুরই একটা উদ্দেশ্য আছে। হয়তো আপনার সেই এক্সিডেন্ট টাও একটা উদ্দেশ্যেই হয়েছিল। সবশেষে একটা কথাই বলতে চাই পদ্ম, আপনি যতটা স্ট্রং থাকতে পেরেছেন, আমি সেটা পারিনি, পদ্ম। বিদেশ যাওয়ার পর পরই অনেক বেশি ভেঙে পড়েছিলাম। মা, বাবা, সুজানা সবার কথা খুব মনে পড়তো। আর কেন জানি তখন আপনার জন্যও আমার মায়া হতো। চোখ ভুজলেই আপনার ভেজা চোখগুলো আমি দেখতে পেতাম। সেদিন এত কেন কেঁদেছিলেন, পদ্ম? আপনি জানেন, আপনার সেই ক্রন্দনরত চোখ আমার মনে কতটা অপরাধ বোধ জাগিয়েছিল? শান্তি পাইনি আমি, সব ছেড়ে দূরে গিয়েও শান্তি পাইনি। আর আজ মনে হচ্ছে, আমার সেই অশান্তির কারণ টা আপনি। যবে থেকে আপনার সাথে দেখা হয়েছে তবে থেকেই আমার জীবন অশান্ত হয়ে উঠেছে। এত জ্বালান কীভাবে, বলুন তো? আমি তো ভাবছি ঐ বেচারা অনিকের কথা। ছেলেটার জন্য বড্ড মায়া হচ্ছে। না জানি বিয়ের পর আপনি তার কী অবস্থা করেন!’
পদ্ম আদিদের সব কথা গিলতে পারলেও লাস্টের কথাটা গিলতে পারলো না। অনিকের বিয়ের কথা এখানে কোথ থেকে আসছে? আর অনিক কে এই ভদ্র লোক চিনলই বা কীভাবে? পদ্ম এক আকাশ বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
‘অনিক স্যার কে আপনি কীভাবে চিনেন?’
আদিদ ব্রু কুঁচকে বললো,
‘অনিক স্যার মানে?’
‘মানে, আমি যে পাঠশালাতে পড়ায় উনি সেখানকার মালিক, সেক্ষেত্রে আমার স্যার। কিন্তু আপনি উনার কথা জানলেন কী করে, অভি ভাইয়ের কাছ থেকে?’
আদিদ তখন চোখ ঘুরিয়ে রাণীর দিকে তাকাল। রাণী তাকে ইশারা দিয়ে “না” করছে। আদিদ বুঝলো ব্যাপারটা। তাই সে বললো,
‘হ্যাঁ, অভি বলেছে।’
‘আর বিয়ের কথা কী বলেছিলেন?’
আদিদ বললো,
‘কিছু না।’
পদ্ম ঠোঁট গুঁজ করে সরু চোখে তাকাল। সবকিছু কেমন যেন ঘোলাটে। সে পরক্ষণেই আবার ঠিক হলো। মনে পড়ল আদিদ তাকে এত কিছু শুনালো অথচ সে কিছু বলতেই পারেনি। সে ঝাঁঝাল কন্ঠে আদিদ কে বললো,
‘সরে দাঁড়ান।’
আদিদ দু কদম পিছিয়ে গিয়ে বললো,
‘কী হয়েছে?’
পদ্ম উঠে দাঁড়াল। চোখ মুখ শক্ত করে বললো,
‘আপনি তখন কী বলছিলেন, আমি আপনাকে জ্বালিয়েছি? আমার জন্য আপনার জীবনে অশান্তি? যত সমস্যার মূল, আমি? আর আপনি কী, দুধে ধোয়া তুলসী পাতা? আপনার জন্য আমাকে সমস্যায় পড়তে হয়নি? আমার জীবনের উপর দিয়ে কি কম ঝড় গিয়েছে? আমি কি ভালো থাকতে পেরেছি? আপনি আমাকে আরো বেশি কষ্ট দিয়েছেন। এত পাষাণ কী করে হন বলুন তো? আমাকে এত কষ্ট দিয়ে এখন সব দোষ আমাকে দিচ্ছেন? সেদিন আপনি কেন বলেছিলেন, অপেক্ষা করার কথা? কেন বলেছিলেন, আপনার ঝিলে যখন একদিন পদ্মফুল প্রয়োজন হবে তখন আপনি এই পদ্মফুলকে নিতে আসবেন, কেন? আমি তো জানতাম আপনার ঝিলে কোনো পদ্মফুলের প্রয়োজন নেই। কারণ সেই ঝিলের পানি শুকিয়ে সেখানে এখন ক্যাকটাস গাছ উঠেছে। তাই তার কথায় এখন এত কাঁটা ফুটে।’
পদ্ম’র কথা শুনে আদিদের কেন যেন খুব হাসি পাচ্ছিল। সে কোনোরকমে সেটা কন্ট্রোল করলো। তারপর ছোট্ট একটা নিশ্বাস ফেলে বললো,
‘পদ্মফুল চাইলে কিন্তু সেই ক্যাকটাস সরিয়ে নিজে তার জায়গা দখল করতে পারতো। কিন্তু আমার মনে হয়, সেই পদ্মফুল এখন অন্য কারোর ঝিলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।’
পদ্ম রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললো,
‘কী বলতে চান আপনি? সরাসরি বলুন।’
আদিদ তার দিকে কিছুটা ঝুঁকে এসে বললো,
‘বলেছি তাড়াতাড়ি বিয়ে করুন, বুড়ি হয়ে যাচ্ছেন তো।’
পদ্ম’র রাগ তড়তড়িয়ে মস্তিষ্কের স্নায়ুতে পৌঁছে গেল। সে চেঁচিয়ে উঠে বললো,
‘নিজের বয়সের হিসাব নেই আসছে আমাকে বুড়ি বলতে। আপনি তো চৌত্রিশ বছরের বুড়ো, আপনার বয়সী আপনার বন্ধুর একটা এক বছরের বাচ্চাও আছে আর আপনি এখনো বিয়েও করেনি। দেখা যাবে যে আপনার বিয়ে হয়ে বাচ্চা হতে হতে আপনার বন্ধু নাতি নাতনীদেরও মুখ দেখে ফেলবে, সেই লোক এসেছে আবার আমাকে বুড়ি বলতে।’
পদ্ম’র কথার পরপরই রাণী খুশ মেজাজে বলে উঠল,
‘এই আপু, এই বুড়ি বুড়োর কম্বিনেশন টা কিন্তু খুব মানাবে।’
পদ্ম রাণীর দিকে গরম চোখে তাকিয়ে বললো,
‘থা’প্পড় খাবি?’
রাণী মাথা নাড়িয়ে বললো,
‘না, কিছু খাবো না। আমার পেট ভরা।’
আদিদ এবার বললো,
‘রাণীর সাথে আর রাগ দেখাতে হবে না। আমার রাগ ঐ বেচারির উপর ঝেরে কী লাভ? তার চেয়ে বরং একটা সমঝোতায় যাওয়া প্রয়োজন।’
পদ্ম বিরস মুখে বলে,
‘কিসের সমঝোতা?’
আদিদ তার হাতের ঘড়ির দিকে একবার তাকাল। তারপর বললো,
‘আমার লেসার টাইম শেষ। এখন আর কোনো কথা বলতে পারছি না, সরি। কাল বিকেলে ফ্রি থাকলে বলবেন, ডিটেইলসে সবকিছু বলবো।’
এই বলে আদিদ হনহনিয়ে তার কেবিনে চলে গেল। তার যাওয়া দেখে পদ্ম ফুঁসে উঠে বললো,
‘ভাব দেখে বাঁচা যায় না।’
তারপর সে আর রাণীও বাসার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল।
চলবে…