#পৌষের_কোন_এক_বিকেলে
পর্ব – ৯
অপরাজিতা অপু
পৌষের কুয়াশায় আচ্ছন্ন সকাল। ঘুম ভেঙেছে অনেক আগে কিন্তু বিছানা ছাড়তে দেরি। আমি কম্বলটা আরো ভালো করে জড়িয়ে নিলাম। এখন উঠে আমার কোন কাজ নেই। কক্সবাজার থেকে আসা প্রায় ৪ দিন হয়ে গেছে। লম্বা একটা ট্যুর দেয়ার পর সবাই টায়ার্ড। পুরো একটা দিন রেস্ট নিয়ে তারপর যে জার কাজে ফিরেছে। কিন্তু আমি এখনো আমার রোজকার রুটিনে ফিরতে পারিনি। বেশ বিদ্ধস্ত মনে হচ্ছে। ভাবী আমার ঘরের দরোজা কিঞ্চিৎ ফাঁকা করে বলল
” ঘুমাচ্ছো এখনো?”
আমি ঘুম জড়ানো কন্ঠে বললাম
” না ভাবী। ভেতরে আসো।”
” তোমাকে বাবা ডাকছেন।”
ভাবী কথা শেষ করেই দ্রুত চলে গেলো। আমি একটু অবাক হলাম। আমাকে এত সকালে কেনো বাবা ডাকছে। ফ্রেশ হয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। সোফায় দেখি বাবা আর ভাইয়া দুজনেই বসে গল্প করছে। ভাইয়াকে দেখে অবাক হলাম। আজ তো ছুটি নেই। ভাইয়া তো গতকাল থেকেই অফিস জয়েন করেছে। তাহলে আজ এই সময় বাসায় কি করছে। জিজ্ঞেস করতে যেয়েও করলাম না। বাবা আমাকে ডাকলেন তার পাশে বসতে। আমিও লক্ষ্মী মেয়ের মতো বসে পড়লাম। একবার বাবার দিকে চোখ তুলে দেখলাম বাবার চেহারা বেশ হাসিখুশি। কিছু না বোঝা আমি মাথা নিচু করে এক হাত আরেক হাতের মুঠোয় ধরে চুপচাপ বসে আছি। বাবা আমার মাথায় হাত রাখলেন। হাস্যজ্বল কণ্ঠে বললেন
” রুপম এর বাড়ি থেকে আজ ওর বাবা মা আসছে তোমাকে আংটি পরিয়ে দেবে। রুপম নাকি একটু সময় চেয়েছিল ভাবতে। তারপর সে তার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে। আমাকে একটু আগেই ফোন করেছিলো। তুমি কি বলো?”
আমার গলা শুকিয়ে এলো। রুপম এর ব্যাপারটা মাথা থেকে বেরিয়েই গিয়েছিলো। বারবার এমন টানা পোড়েনের মাঝে আমি অস্থির হয়ে উঠছি। কি করবো কি করবো না সেটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে আমি ক্লান্ত। এবার আমার মস্তিষ্ক বলছে সবকিছু ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেই। আমিও সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে বাবাকে জানিয়ে দিলাম আমার কোন আপত্তি নেই। হাফ ছেড়ে বাঁচলাম এতদিনে। বাবা কিন্তু ভীষণ খুশী। সাথে সাথেই ফোন করে জানিয়ে দিলেন তাদেরকে। তারাও জানালো দুপুরের মধ্যেই চলে আসবেন। ভাইয়া কে নিয়ে বাবা বাজারে গেলেন। মা আর ভাবী রান্নার ব্যবস্থা করছে। আমি আমার ঘরে চলে এলাম। ভাবছি রুপমের কথা। সেদিনের পর থেকে তার সাথে কোন যোগাযোগ হয়নি। সেদিন তো আমাকেই ম্যানেজ করে নিতে বলেছিল। কিন্তু আমি পারিনি। আর পেরে উঠছি না এই পরিস্থিতির সাথে। তাই এখন একটু নিশ্চিন্তে থাকতে চাই। আর এতদিনে এটা বুঝে গেছি রুপম ছেলেটা খারাপ নয়। ক্লান্ত আমি গা এলিয়ে দিলাম বিছানায়। আজ ঠান্ডার দাপট মনে হচ্ছে কমবে না। আমি কম্বলের নিচে শুয়ে গান শুনছি চোখ বন্ধ করে। সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেও এখনো রোদের দেখা মিলল না। ভাবী এসে আমাকে ডাকলো। আমি চোখ মেলে তাকালাম। ভাবী বিছানার উপরে আয়েশ করে বসে বলল
” তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”
আমিও উঠে বসলাম। কি কথা সেটা না জানলেও কি বিষয়ে কথা জিজ্ঞেস করবে সেটা বুঝতে পারছি। এই বিয়ে নিয়েই জিজ্ঞেস করবে আমাকে। আমিও তার সব প্রশ্নের জবাব দিতে প্রস্তুত। ভাবী কিছুটা সন্দিহান কণ্ঠে বললো
” রুপম ছেলেটাকে কি তোমার পছন্দ হয়েছে?”
আমি দ্বিধান্বিত চোখে তাকালাম। এখানে পছন্দ অপছন্দের কোন প্রশ্নই নেই। বিয়ে হচ্ছে মানে মেনে নিতেই হবে। কিছুটা নিষ্প্রাণ কণ্ঠে বললাম
” এখন কি আর এসব নিয়ে কথা বলার সময় আছে? আর কিছুক্ষণ পরই তো তার বাবা মা আসবেন।”
ভাবী বেশ উত্তেজিত অবস্থায় বলল
” এটা কোন কথা না। পছন্দ না হলে তুমি জোর করে কেনো বিয়ে করবে। আর আমি যা দেখেছি সেটা কিন্তু ভিন্ন কথা বলছে। তোমার কথার সাথে মিলছে না আজরা।”
আমি সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকালাম। বললাম
” কি দেখেছো ভাবী?”
” কক্সবাজারে তোমাদের দুজনকে একসাথে ঘুরতে দেখেছি। তোমরা একসাথে সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে গল্প করছিলে। তারপর সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে তুমি ওর সাথে দেখাও করতে গিয়েছিলে। সবই আমার চোখে পড়েছে। তখন ভেবেছিলাম যে বাসায় এসে তোমার সাথে কথা বলবো। কিন্তু তার আগেই ওদের দিক থেকে পজিটিভ কিছু জানিয়ে দেয়া হলো। ভাবলাম তোমরা কথা বলে হয়তো সব ঠিক করে ফেলেছো। কিন্তু তোমাকে ভীষণ কনফিউজ দেখাচ্ছে আজরা। কারণটা কি?”
আমি কথা খুজে পেলাম না। প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলতে বললাম
” ওই বিয়ের কথা উঠলেই মেয়েদের কেমন মন খারাপ লাগে। সেটা তো তুমি জানোই। তাই এমন হচ্ছে।”
” আমি সেটা জানি। কিন্তু তোমার বিষয়টা আলাদা। আমি সবটা জানতে চাই। বুঝতে চাই। আমাকে খুলে বলো। জানিনা তোমার মধ্যে কি চলছে। কিন্তু আমি মনে হয় তোমাকে হেল্প করতে পারবো।”
আমি চুপ হয়ে গেলাম। নিজের এই এলোমেলো চিন্তা ভাবনা কি করে ভাবীকে বোঝাবো। বললেই কি বুঝবে। ভাবী নাছোড়বান্দা। আমার মনের অবস্থা সে শুনেই ছাড়বে। আমিও নিরুপায় হয়ে বললাম
” আমি আসলে কিছু বুঝতে পারছি না ভাবী।”
” কি বুঝতে পারছো না?”
” এই বিয়ে নিয়ে আমার মনে অনেক শঙ্কা। ঠিক ডিসিশন নিতে পারছি না। আমার জন্য এই বিয়ে কতটুকু সুখ আনবে ভাবী। আমি কি পারবো অপরিচিত একজনের সাথে সারাজীবন কাটাতে। পারবো কি ভালো থাকতে। যদি না পারি তাহলে তো এই সম্পর্ক থেকে বেরিয়েও আসতে পারবো না। বাবা, মা, ভাইয়া তোমরা সবাই কত খুশী। আমি কেনো তোমাদের মতো এতো খুশী হতে পারছি না। মাথায় সব সময় একটা বিষয় ঘুরছে বিয়ে হলেই কি সব সমাধান হয়ে যাবে?”
ভাবী লম্বা একটা নিশ্বাস ফেলে বলল
” দেখো আজরা! আজ তোমার মনে এসব প্রশ্ন আসাটা স্বাভাবিক। কারণ আগেও তুমি একবার ধোঁকা খেয়েছো। বিশ্বাস করেও ভেংগে গেছে। তাই নতুন করে কাউকে বিশ্বাস করার মত সাহস তোমার হচ্ছে না। ভরসা করতে পারছ না তুমি। আর ভয় পাচ্ছো রুপম যদি তোমার মন মতো না হয়। যদি আবারো কষ্ট পাও। সেটাই বা সহ্য করবে কিভাবে। এসব নিয়েই তোমার মনে দ্বিধা কাজ করছে। এটা থেকে পরিত্রান পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো ছেলেটাকে সময় দাও। তার সাথে সময় কাটাও বেশি বেশি। তাকে বুঝতে চেষ্টা করো। তোমার সাথে তার মতের মিলটা কতটুকু সেটা বুঝতে চেষ্টা করো। এমনও হতে পারে অনেক বিষয় তুমি নিজেই বোঝনা। কিন্তু সে তোমাকে ভালোভাবে বুঝিয়ে দিবে।”
ভাবী থেমে গেলো। কি একটা ভেবে মুচকি হেসে বলল
” আমি যখন প্রথম তোমার ভাইয়ার সাথে কথা বলি তখন খুব ভয় পেয়েছিলাম। এমন একটা গম্ভীর মানুষের সাথে কিভাবে সংসার করবো। বাসায় তো না বলতেই পারিনি। আর সেভাবে সময় কাটানোর সুযোগ হয়নি। তাড়াহুড়ো করে বিয়েটা হয়ে গিয়েছিল। বিয়ের পরেও তোমার ভাইয়ার সাথে কথা বলতে খুব ভয় পেতাম। কি ভাববে। কি বলবো এসব নিয়ে দ্বিধায় থাকতাম সবসময়। তোমার ভাইয়া বোধহয় আমার অবস্থাটা বুঝেছিল। তাই নিজে থেকেই সহজ করে নেয়ার চেষ্টা করেছিল। আমাকে সুযোগ দিয়েছিল কথা বলার। এখন দেখো সব কেমন ঠিক হয়ে গেছে। যেখানে কথা বলতেই ভয় পেতাম সেখানে আমি এখন রাগ দেখিয়ে কথা বলি আর তোমার ভাইয়া আমাকে ভয় পায়।”
ভাবীর কথা শুনে আমি হেসে ফেললাম। ভাবীও হাসলো। অনেকদিন পর এমন হাসলাম। ভাবী হাসি থামিয়ে বলল
” আমার তেমন কথা বলার সুযোগ না থাকলেও তোমার কিন্তু আছে। তাই বলছি ছেলেটাকে একটু সুযোগ দাও। দেখবে তুমি ঠিকই বুঝতে পারছো ঠিক হচ্ছে নাকি ভুল।”
ভাবীর কথা আমার মাথায় ঢুকলো। ভাবী চলে গেলো নিজের কাজে। যাওয়ার আগে দরজায় দাড়িয়ে আরো একবার ডাকলো
” আজরা? রুপম এর সাথে কথা হয়েছে?”
আমি মাথা নাড়লাম। রুপম এর সাথে আমার কোন কথাই হয়নি। ভাবী প্রশস্ত হেসে বলল
” ছেলেটা কিন্তু ভালোই। দায়িত্ব আছে বেশ।”
ভাবীর হাসি দেখে আমি ভ্রু কুঁচকে তাকালাম। ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে জিজ্ঞেস করলাম
” তুমি এত কিছু কিভাবে জানলে?”
ভাবী এবার হেসে ফেলে বলল
” কক্সবাজার থেকে আসার পর ফোন করে তোমার খোঁজ খবর নিচ্ছিল। কেমন আছো; মনের অবস্থা কেমন এসব নিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করছিল। তারপর আবার বলল তুমি নাকি ঠিকভাবে ডিসিশন নিতে পারছো না। তাই আমাকে হেল্প করতে বলল। আর এটাও শুনে নিতে বলল তুমি তাকে পছন্দ করো কিনা।”
ভাবী আবারো হেসে উঠে চলে গেল। আমি হা করে তাকিয়ে আছি দরজার দিকে। রুপম ভাবীকে ফোন করেছিলো? এতো কিছু বলেছে? কই আমাকে তো ফোন করেনি। সেদিনের পর থেকে আমার সাথে তার কোন কথাই হয়নি অথচ সে ঠিকই ভাবীর কাছে আমার কথা জানতে চেয়েছে। মানুষটা অদ্ভুত!
চলবে