প্রাণেশ্বর পর্ব-১৫+১৬

0
452

#প্রাণেশ্বর
#জান্নাতুল_ফারিয়া_প্রত্যাশা
১৫।

‘আব্বার পরিবার রাজি হলেও, আম্মার পরিবার বসেন ঘোর আপত্তি করে। উনারা কোনোভাবেই নিজের মেয়ের বিয়ে কোনো হিন্দু ছেলের সাথে দিবেন না। এইদিকে আম্মা আব্বাও তাঁদের সিদ্ধান্তে অটল। বিয়ে করলে একে অন্যকে করবেন, নয়তো করবেন’ই না। আব্বা বলেছিলেন, এই বিয়ে করতে না কি বিশাল যুদ্ধ করতে হয়েছে তাঁদের। এবং দীর্ঘ এক বছরের যুদ্ধ শেষে দুজন বিয়ে করতে পেরেছিলেন। আর সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হলো, বিয়ের পর কখনোই তাঁরা তাঁদের ধর্ম নিয়ে কোনো সমস্যায় পড়েনি। আব্বা আব্বার ধর্ম পালন করেছেন, আর আম্মা আম্মার। কেউ কারোর ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেননি। আর আমাদের ভাই বোনদেরও এই ব্যাপারে যথেষ্ঠ স্বাধীনতা ছিল, আমাদের পছন্দ মতো আমরা ধর্ম নিয়েছি। কেউ কোনো জোর জবরদস্তি করেননি।’

তনুকা অবাক হয়ে শুনল সব। স্বাভাবিক ভাবেই বিস্মিত হলো সে। চোখ পিটপিট করে জিজ্ঞেস করল,

‘আপনি মুসলিম তো?’

‘হ্যাঁ, আমি আর রেনু দুজনেই মুসলিম। তবে আমার ছোট ভাই রাদাভ, ও হিন্দু।’

‘আপনার একটা ছোট ভাইও আছে?’

‘হ্যাঁ, আমার থেকে দু বছরের ছোট।’

‘সে কোথায়? দেখেনি যে?’

‘দেশের বাইরে, পড়াশোনা করছে।’

‘ওহ। আর আপনার কাকা কাকী কি সবাই হিন্দু?’

‘মেঝ কাকা হিন্দু, তবে বাবার মতোই এক মুসলিম মেয়েকে বিয়ে করেছেন। তবে ছোট কাকা কাকী দুজনেই হিন্দু।’

‘উনাদের কোনো ছেলে মেয়ে নেই?’

‘মেঝ কাকার একটা মেয়ে আছে, আর ছোট কাকার কোনো বাচ্চা-কাচ্চা নেই।’

‘মেঝ কাকার মেয়ে কোথায়?’

‘কাকাই ভালো জানেন।’

‘মানে?’

তনুকা ভ্রু কুঁচকাল। মেহতাব বলল,

‘কাকা পড়াশোনার জন্য কোথাও একটা পাঠিয়েছেন, তবে কোথায় পাঠিয়েছেন তা আমি জানি না।’

তনুকা ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইল কতক্ষণ। মনে মনে কেবল একটাই কথা আওড়াল, “এই পরিবারটা বড্ড অদ্ভুত!”

তনুকার নিষ্পলক চাহনি দেখে মেহতাব হেসে বলল,

‘খুব অবাক হইতেছ, বিবিজান? আরো অনেক কিছু জানার আছে যে, অল্পতেই এত অবাক হইলে চলব?’

তনুকা নির্বাক চাহনি ভেঙে বলল,

‘আর কী জানার আছে?’

‘আস্তে ধীরে জানবে সব। সবে তো এসেছ, এখনই এত তাড়া কীসের?’

প্রায় এক ঘন্টার মতো ঝিম মেরে শুয়েছিল তনুকা। তার পাশেই মেহতাব ঘুমে। কিন্তু তার চোখে নিদ্রার কোনো ছিটে ফোটার রেশও নেই। যখনই মনে হয়, সব সহজ তখনই একরাশ জটিলতা এসে হামলে পড়ছে। এই পরিবার এত জটিল কেন? হিন্দু মুসলিমে সব গুলিয়ে যাচ্ছে যেন। অথচ সে এখানে আসার পর থেকে কাউকেই কোনো ধর্ম’ই মানতে দেখেনি। আম্বিরা বেগমকে এক ওয়াক্তও নামাজ পড়তে দেখেনি সে, আবার ছোট কাকী বা কাকাদের কাউকে পূজো দিতে দেখেনি। তাহলে বুঝবে কী করে এক পরিবারে ধর্মের এত অমিল। আর তার বাবা কি বিয়ের আগে এইসব কিছূ জানতেন না? জেনে বুঝে এমন প্যাঁচাল পরিবারে কেউ মেয়ের বিয়ে দেয়? নিশ্চয়ই বাবাকে আগে থেকে কিছু জানানো হয়নি। সব দোষ ঐ ঘটকের, বিয়ের আগে রষিয়ে রষিয়ে কথা বলে বাবার কান একেবারে ঝালাপালা করে দিয়েছিলেন, তাই তো অন্ধের মতো চোখ বুজে এই অদ্ভুত পরিবারে মেয়ের বিয়ে দিয়ে বসেছেন তিনি।

তনুকা অশান্ত মন নিয়ে উঠে বসল। বাবার সাথে একবার কথা বলা দরকার। বাবা তো আজকাল নিজ থেকে আর কলই দিচ্ছে না, বিয়ে দিয়ে মেয়েকে একদম পর করে দিয়েছেন যেন।
সে এসে বারান্দায় দাঁড়ায়। কাল অবধি যেখানে গ্রিল ছিল না, আজ সেখানে থাই গ্লাস লাগানো হয়েছে। লোকটা কখন এসব করেছে কে জানে?

বাবার নাম্বারে পরপর অনেকগুলো কল দেয় তনুকা। কিন্তু, প্রতিবারই নাম্বার বন্ধ বলে। অন্য আরেক সিমেও কল দেয়, সেটাও বন্ধ। না পেরে তাই বাবার বাড়ির কাজের খালাকে কল দেয়, আশ্চর্যজনক ব্যাপার খালার নাম্বারও বন্ধ। উপায়ান্তর না পেয়ে গাড়ির ড্রাইভারকেও কল দিতে ভুল করে না। ভাগ্য সহায় ছিল বলে, এই নাম্বারটা খোলা পায় সে। ড্রাইভার কল তুলে বলে, তার বাবা গতকাল আমেরিকা গিয়েছেন, কখন ফিরবেন সে জানে না। তনুকা অবাক হয়, এভাবে না জানিয়ে বাবা আমেরিকা গেলেন কেন? প্রশ্নখানা ড্রাইভারকে জিজ্ঞেসও করে, তবে ড্রাইভার সঠিক কোনো উত্তর দিতে পারে না। বিষন্ন হয়ে কল কাটে সে। কী হলো বাবার? তাকে না জানিয়েই বিদেশ পাড়ি জমালেন কেন? তনুকার হুট করেই কান্না পাচ্ছে খুব। এই বিয়ে হবার পর থেকে কিচ্ছু ঠিক হচ্ছে না তার সাথে। চারদিকে অস্বস্তি এক পরিবেশ যেন। কাউকে ভরসা করতে পারছে না, উদ্ভট লাগছে সবকিছু। কোনো কিছুর সঠিক সংজ্ঞা মেলাতে পারছে না। পাগল পাগল লাগছে ভীষণ। তনুকা কেঁদেই ফেলল। সচরাচর সে কাঁদে না। তবে আজ সবকিছু একটু বেশিই এলোমেলো, চোখ ভেঙে কান্না নেমেছে তাই। কান্নার শব্দ না এলেও কী করে যেন মেহতাব টের পেয়ে গেল। অস্থির ভঙিতে তনুকার শিউরে এসে দাঁড়াল সে। মিহি আওয়াজে জিজ্ঞেস করল,

‘কাঁদছ কেন, তনু?’

মেহতাবের এহেন মোলায়েম স্বরে কান্নারা যেন আরো প্রশ্রয় পেল তার। এবার একেবারে দলবল বেঁধে নামল তারা। মেহতাবের অস্থিরতার মাত্রাও তড়ান্নিত হলো তাই। বিচলিত হয়ে জিজ্ঞেস করল,

‘এই কী হয়েছে বলবে তো, কাঁদছো কেন এভাবে? কেউ কিছু বলেছে তোমায়?’

তনুকা মাথা নাড়িয়ে বলে,

‘বাবা আমাকে না জানিয়ে আমেরিকা চলে গিয়েছেন।’

উত্তর শুনে নিশ্বাস ছাড়ে মেহতাব। ক্ষণ কালের জন্যই যেন দম ফুরিয়ে আসছিল তার। তনুকার মাথার উপর হাত ঠেকিয়ে বলল,

‘এইটুকু একটা ব্যাপারে কেউ এত কাঁদে? হয়তো অফিসের কোনো জরুরি কাজে গিয়েছেন, তোমাকে জানানোর সুযোগ পাননি।’

‘তাই বলে, এভাবে চলে যাবেন? একবারও আমার দুশ্চিন্তার কথা ভাববেন না? এখন যে আমার কষ্ট হচ্ছে।’

মেহতাব এক পল ভেবে বলল,

‘তোমার কষ্ট কমানোর দারুণ একটা উপায় আমার জানা আছে।’

তনুকা কান্না থামিয়ে জিজ্ঞেস করল,

‘কী?’

‘চলো।’

‘কোথায়?’

‘গেলেই দেখবে, চলো।’

মেহতাব তনুকার হাত আঁকড়ে তাকে কোথাও একটা নিয়ে চলল। তনুকা নির্ভয়ে হেঁটে চলল তার সাথে। মেহতাবের বড়ো পায়ের কদমের সাথে তাল মিলিয়ে চলা কষ্টসাধ্য, তাও চেষ্টা চালিয়ে ছোট পায়ে দৌড়াচ্ছে তনুকা।

মেহতাব তাকে নিয়ে থামল মহলের পেছনের বাগানে। ফুলের বাগান এটা। চারদিকে এত ফুল দেখে তনুকার মন সহসাই ঝলমলিয়ে ওঠে। অস্থির চোখে এদিক ওদিক দেখে সে। মেহতাব বলে,

‘একবার উপরে দেখো, বিবিজান।’

তনুকা মাথা উঁচু করে চাইতেই দেখল, শুভ্র আকাশ তলে গোলাপী বাগানবিলাসের প্রকান্ড এক মেলা বসেছে যেন। সে তো এতক্ষণ এটা খেয়ালই করেনি। চোখে পড়া মাত্রই খুশিতে সব অস্থিরতা মিইয়ে যায়। চোখের পল্লব বার কয়েকবার ঝাপটে আমোদ গলায় বলে উঠে,

‘কী চমৎকার!’

‘বাগানবিলাস তোমার পছন্দ, তাই না?’

‘কী করে জানলেন?’

‘এইটুকু জানি আমি।’

তনুকা আবার উপরের দিকে চাইল। দুহাত মুঠো করে চিবুকের নিচে রেখে বলল,

‘পুরো গাছটাকে ধরে নিয়ে রুমে চলে যেতে ইচ্ছে করছে। এত রঙিন চারদিক।’

তনুকা ফুল পাড়তে হাত উঁচু করল সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু ডালগুলো উপরে বলে, নাগাল পেল না সে। মেহতাবের দিকে অসহায় চোখে চাইল। বলল,

‘একটা ছোট্ট ডাল ভেঙে দিবেন।’

মেহতাব কিঞ্চিৎ হাসল। এগিয়ে এসে তার দু পা আঁকড়ে ধরে উপরে তুলল তাকে। ভয়ে খানিকটা ঘাবড়ে গেল তনুকা। মেহতাবের কাঁধ ভর করে ভীত সুরে জিজ্ঞেস করল,

‘কী করছেন? পড়ে যাব তো।’

মেহতাব হেসে বলল,

‘তোমার স্বামীকে এতটা অক্ষম ভেবো না, বিবিজান। ষাট কেজির অধিক ওজন আমি বহন করতে পারি।’

তনুকা ভয় না পেলেও এবার লজ্জা পায়। মেহতাব উপর করে ধরাতে তার মুখ এখন তনুকার উদর বরাবর। তাই না চাইতেও সেখানে তার মুখাবয়বের স্পর্শ টের পাচ্ছে সে। মেহতাব বলল,

‘এবার যত খুশি ডাল ভাঙো, বিবিজান। ভয় নেই, পড়বে না।’

তনুকা ফের চাইল উপরের দিকে। ডালগুলো এবার অতি নাগালে তার। হাত বাড়িয়ে ফুলগুলো ছুঁয়ে দেয় সে। দ্রুত কিছু ফুল সমেত ডাল ভেঙে হাতে নেয়। নিচের দিকে চেয়ে বলে,

‘এবার নামিয়ে দিন।’

মেহতাব বোধ হয় শুনল না। সে নিমিষ চেয়ে রইল কেন যেন। তনুকা ঢোক গিলল। মিহি আওয়াজে বলল,

‘মেহতাব, নামান।’

এবার শুনল সে। নামিয়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। জিজ্ঞেস করল,

‘খুশি হয়েছ?”

তনুকার অধর কোণে প্রস্ফুটিত হলো এক চমৎকার হাস্যরেখা। বলল,

‘হ্যাঁ, খুব।’

চলবে…..

#প্রাণেশ্বর
#জান্নাতুল_ফারিয়া_প্রত্যাশা
১৬।

তনুকার হাত হতে এক সূক্ষ ফুল ছিঁড়ে তার কানে গুঁজে দিল মেহতাব। তারপর হাত নামিয়ে স্পর্শ করল তার কপোল। স্মিত সুরে ঠোঁট নাড়িয়ে বলল,

‘ফুলের রাজ্যের চমৎকার রাণীটি আজ আমার মহলে, আমার চোখের সামনে; মনে হচ্ছে আমার জন্ম বৃথা যায়নি।’

লজ্জায় মাথা নোয়ায় তনুকা। আরক্ত হয় কপোলযুগল। অল্পতেই তাকে সংকুচিত হতে দেখে মুচকি হাসে মেহতাব। বলে,

‘এত লজ্জা পাচ্ছো কেন, বিবিজান? আমি কি কিছু করেছি?’

তনুকা সুর হারাল। কথার শব্দ গুছাতে না পেরে চেয়ে রইল কেবল। মেহতাব তারদিকে আরেকটু অগ্রসর হলো। তার অন্য হাত গিয়ে ঠেকল তনুকার কোমরে। তনুকা ঢোক গিলল। শরীরের রক্ত আচমকা চমে যাচ্ছে বলে মনে হলো তার। ঠোঁট কাঁপছে মৃদু ছন্দে। হাতের ফুলগুলোকে চেপে ধরল শক্ত করে। মেহতাবের হাতের বিস্তৃতি আরেকটু সচল হতেই অস্থিরতায় গায়ে কাটা দিয়ে উঠল তার। মেহতাব আলতো স্পর্শে তনুকার চুল সরিয়ে কপালে তার ওষ্ঠ ছোঁয়াল। চোখ বুজল তনুকা। তবে কিছু বলল না। শরীরের কম্পন এতে বৃদ্ধি পেল যেন। মেহতাব ঠোঁট সরিয়ে পূর্ণ মনোযোগে দেখল তাকে। চোখ আটকাল তার। এক জোড়া রক্তিম শুষ্ক চামড়ায় যেন খুঁজে পেল নিজের সমস্ত সুখ। তবে এত কাছে থেকেও সেই সুখকে স্পর্শ করার সাহস সে পাচ্ছে না। মস্তিষ্ক মানলেও, বেহায়া মন মানতে নারাজ। সে এক ইঞ্চি এগিয়ে গিয়ে আবার পিছিয়ে যায়। মনে পড়ে, তনুকা তাকে এখনও সম্মতি দেয়নি। সে মেয়েটার সাথে জোর খাটাতে পারে না। তাই বিষন্ন মনে সরে দাঁড়ায়। নিরেট স্বরে বলে,

‘চলো ঘাটে গিয়ে বসি।’

তনুকার ভ্রু যুগলের মাঝখানে কিঞ্চিৎ ভাঁজের দেখা মেলে। সে কি তবে বিরক্ত? কেন? মেহতাব বারংবার নিকটে এসেও ফিরে যাচ্ছে বলে? সে তো এমন বেশরম ছিল না। তবে বিয়ের পর এসব চিন্তা কেন আসছে? মানুষটা তার স্বামী বলে?
তনুকা নিশ্বাস ফেলে জোরে। গুমোট সুরে বলে,

‘চলুন।’

পানি থেকে এক সিঁড়ি উপরে বসে মেহতাব আর তনুকা। তার দরুন পা তাদের দীঘির জলে ডুবন্ত। মিষ্টি বিকেল। মৃদু বাতাসের অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে তাই। সূর্য ইতিমধ্যেই হেলে পড়েছে পশ্চিমে। ঘাটের চারদিকের নারকেল গাছগুলো থেকে থেকে শব্দ করে পাতা নাড়াচ্ছে। তাদের পড়ন্ত প্রতিবিম্ব ঢেউ খেলানো উন্মুক্ত দীঘিতে চমৎকার লাগছে তনুকার। সে এক দৃষ্টিতে পানি দেখছে। মেহতাবও তাই। দুজনের মাঝে দূরত্বও বেশ। তনুকা আরো কিছুক্ষণ সময় পাড় করে মৃদু সুরে বলল,

‘আমার সম্পর্কে আপনি কতটুকু জানেন?’

মেহতাব চাইল। এক পল ভেবে বলল,

‘যতটুকু জানলে একজন অপরিচিত মেয়েকে বিয়ে করা যায়, ততটুকুই।’

‘আমার যে বাগানবিলাস পছন্দ, সেটা কী করে জানলেন?’

‘এক দেখাতেই আমাদের বিয়ে হয়। বিয়ের দিন তোমার এক বান্ধবীর সাথে আমার কথা হয়েছিল, তার কাছ থেকেই জেনেছি।’

‘আমাকে এত পছন্দ কেন হলো আপনার? আমি তো আহামরি সুন্দরী নয় যে, এক দেখাতেই প্রেমে পড়ে যাবেন।’

‘প্রেমে পড়তে রূপ লাগে, তবে ভালোবাসতে রূপ লাগে না। আমি তোমার প্রেমে পড়েনি, ভালোবাসায় মজেছি।’

তনুকা নিমিষ চেয়ে থাকল। জিজ্ঞেস করল,

‘এত অল্প সময়ে এত ভালোবাসা? পরে যদি আফসোস হয়?’

কিঞ্চিৎ হাসে মেহতাব। বলে,

‘আমার নিজের উপর ভরসা আছে। আজ অবধি কোনো ভুল সিদ্ধান্ত আমি নেই নি।’

তনুকা মৃদু হাসল। সামনের দিকে চেয়ে বলল,

‘আমার কাছে কেন যেন মনে হয়, আপনি যতটা সহজ ভাবে নিজেকে প্রকাশ করছেন, আপনি মানুষটা ততটাও সহজ নন। আপনার ভেতরটা বেশ জটিল।’

‘এমন মনে হওয়ার কারণ?’

‘জানি না। মনে হয় কেবল। তবে এমনটা নাও হতে পারে।’

ফিচেল স্বরে মেহতাব বলল,

‘আবার হতেও পারে।’

তনুকা চকিতে চাইল। মেহতাব হেসে বলল,

‘অবাক হচ্ছো কেন? আমি তো চাই, তুমি আমাকে নিয়ে ভাবো; আমার চিন্তায় মাথা ব্যথা করুক। তাও তোমার সঙ্গ আমি হারাতে চাই না।’

তনুকা নির্বাক বসে রইল কিছুক্ষণ। এরপর বলল,

‘আযান দিবে, চলুন বাসায় যাই।’

‘চলো।’

_________

সন্ধ্যার চা নিয়ে তনুকা তার শাশুড়ির রুমের দরজায় আওয়াজ তুলল। বলল,

‘ভেতরে আসব, মা।’

‘এসো।’

চা নিয়ে ভেতরে আসে তনুকা। চায়ের কাপ আস্তে করে টেবিলে রাখে। প্রসন্ন স্বরে বলে,

‘সবাই বসার ঘরে চা নাস্তা করেছেন, আপনি আজ আসেননি কেন, মা?’

আম্বিরা বেগমের হাতে একটা বই ছিল। সে বইটা দুইদিকে ছড়িয়ে উল্টো করে বিছানায় রেখে বলল,

‘মনটা ভালো না, তাই বের হতে ইচ্ছে করেনি। ঘরে চা নিয়ে এসে ভালো করেছ। এখানে এসে বসো।’

তনুকা মৃদু হেসে শাশুড়ির পাশে জায়গা নিল। আম্বিরা বেগম চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন,

‘চা তুমি বানিয়েছ?’

‘জি, মা।’

‘ভালো হয়েছে।’

প্রশংসা শুনে খুশির মাত্রা বাড়ল তার। শাশুড়ি মা আরেক চুমুক চা খেয়ে বললেন,

‘শুনো বউমা, আমার অবর্তমানে এই মহল তোমার। এই মহলের উপর শকুনের চোখ কিন্তু আরো আগ থেকেই ছিল, এতদিন আমি আগলে রেখেছিলাম। এখন বয়স হয়েছে, বুদ্ধি কমেছে; সব সামলাতে কষ্ট হয়। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আজ থেকে সব দায়িত্ব আমি তোমাকে দিব।’

এই বলে তিনি নিজের আঁচলের কোণ থেকে এক বিশাল চাবির গোঁছা খুলে হাতে নিলেন। তনুকা ড্যাবড্যাব করে চেয়ে দেখছে। তিনি আলগোছে তনুকার এক হাত তুলে চাবির গোঁছা রাখলেন সেখানে। বললেন,

‘আমার মহল সামলানোর দায়িত্ব আজ থেকে তোমার।’

তনুকা বিস্ফোরিত চোখে চাবির গোঁজা খানা দেখল। হাতে নিয়েই মনে হলো, ভীষণ ভার। যেখানে সে এই সামান্য চাবির ভার সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে সে এই বিশাল মহল কী করে সামলাবে? তাই সে ইতস্তত সুরে বলল,

‘মা, আমি পারব না।’

‘পারব না বলে কোনো শব্দ হয় না, তনুকা। মানুষ চাইলে সব পারে। তোমাকেও পারতে হবে।’

‘কিন্তু, মা..’

‘উঁহু, আর কোনো কথা নয়। এটা কিন্তু আমার অনুরোধ না, আমার আদেশ। আর তুমি নিশ্চয়ই আমার আদেশ অমান্য করবে না।’

তনুকা পড়ল মহা বিপদে। একটা স্বাধীন মুক্ত পাখিকে খাঁচায় বেঁধে তার মাথায় বিশাল বোঝা চাপিয়ে দিলে কি সে সামলাতে পারবে? তনুকা কি এতকিছু সামলেছে কখনো? নিজের আলাদা একটা স্বাধীন জীবনে পড়াশোনা ব্যতিত আর কোনো চিন্তা ছিল না তার। অথচ, এখন এক পাহাড় সমান দায়িত্ব কাঁধে বয়ে বাকি জীবন কাটাতে হবে। এই দুঃখ কাকে বোঝাবে সে?

‘কী হলো, আমার আদেশ শুনবে না।’

উপায়ান্তর না পেয়ে রাজী হতে হলো তাকে। আম্বিরা বেগম খুশি হলেন খুব। তার কপালে চুমু খেয়ে বললেন,

‘আমি জানি তুমি পারবে। আমার পরে এই মহলের একমাত্র যোগ্য উত্তরাধিকারী কেবল তুমি।’

তনুকা মৃদু হেসে মাথা নোয়াল। ভাবল, আদৌ পারবে তো সে। আম্বিরা বেগম অনেক কিছু বোঝালেন তাকে। কথার মাঝে সাবধান বাণীও ছুড়লেন বেশ। চোখ কান খোলা রাখতে বললেন। শকুনদের থেকে নিজেকে রক্ষা করার বিভিন্ন কৌশল শেখালেন। সেসব মাথার উপর দিয়ে গেল তনুকার। কিছু না বুঝেই, হু হা করে সমানে তাল মিলিয়েছে শুধু। কথা শেষ হতেই মনে হলো, মাথা ভার ভার লাগছে। একটু পরে নির্ঘাত মাথা ব্যথাও শুরু হবে।

আম্বিরা বেগম স্বস্তির শ্বাস ফেলে বললেন,

‘তোমার উপর সব দায়িত্ব নিয়ে আমি নিশ্চিন্ত। এবার রুমে যাও তুমি। রাতের খাবারের সময় কথাটা আমি বাড়ির বাকি সবাইকেও জানিয়ে দিব।’

তনুকা উঠে দাঁড়াল। বিছানা থেকে চায়ের কাপটা তোলার সময় হঠাৎ সেখানে রাখা বইয়ে চোখ আটকাল তার। বইয়ের নাম, “খু’নের সাতকহন”। বইয়ের নাম দেখে অবাক না হয়ে পারল না তনুকা। এই বয়সে এসে তার শাশুড়ি মা এমন খু’ন টুন নিয়ে বই কেন পড়ছেন, আশ্চর্য।

চলবে…