#প্রিয়মুখ
#ফারিহা_জান্নাত
#পর্ব১৩
হাসিব ভেবে পাচ্ছে না কি করবে।কিভাবে দেখা করবে ঝুমুরের সাথে। বার বার মনে হচ্ছে ঝুমুরের কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু কি হয়েছে কিছুই তো বুঝতে পারছে না।শুয়ে শুয়ে শুধু এসব ভেবেই যাচ্ছে।রাত প্রায়ই ১২টা বাজে। হাসিবের চোখে ঘুম নেই। কেমন জানি অস্বস্তি লাগছে। হাসিব বিছানা ছেড়ে ছাদে চলে গেলো।
ওদিকে ঝুমুর নিজের রুমের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। আজ বাবার কথা খুব মনে পড়ছে। ঝুমুরের যখন বাবার কথা মনে পড়ে তখন ছাদে গিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতে থাকে নিজের মনের লুকানো সব কষ্টের কথা। খুব ইচ্ছে করছে ছাদে যেতে।
ঝুমুর নিজের রুম ছেড়ে ছাদে চলে গেলো।ছাদের এক কোণায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে বলছে….
বাবা তোমাকে খুব মিস করছি। বাবা তুমি তো জানো আমি হাসিবকে অনেক ভালোবাসি। কিন্তু বলতে পারছি না। কেন জানি না আমার বার বার মনে হচ্ছে তোমার সাথে আমার খুব তাড়াতাড়ি দেখা হবে। আমার এমন কেন মনে হচ্ছে বলতো।
ছাদের অপর পাশে হাসিব হঠাৎ কারও গলার আওয়াজ শুনতে পেলো।তবে খুব আস্তে শুনা যাচ্ছিলো।এত রাতে ছাদে কে আসবে। হাসিব মনের ভুল ভেবে আবারও দাঁড়িয়ে থাকলো একই জায়গায়।
এদিকে ঝুমুর নিজে নিজে কথা বলেই যাচ্ছে….
বাবা তুমি তো সব দেখছো হাসিব আমাকে কতটা ভালোবাসে। কিন্তু আমি ওকে ফিরিয়ে দিচ্ছি।ওকে কষ্ট দিতে গিয়ে যে আমারও কষ্ট হচ্ছে। আমার যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে যে হাসিব সইতে পারবে না।আমি কি করবো বাবা বলে দাও না।
হাসিব আবারও খেয়াল করে দেখলো নাহ ছাদে সত্যি কেউ আছে। কে আছে দেখতে হবে বলে ছাদের অপর পাশে চলে আসলো যেখানে ঝুমুর দাঁড়িয়ে আছে।হাসিব দেখলো একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে কিছুটা অন্ধকার থাকাতে চিনতে পারছে না।হাসিব আরও কাছে আসলো আর হাসিবের পায়ের শব্দে ঝুমুর ভয় পেয়ে পিছনে তাকাতেই দেখে যে হাসিব।ঝুমুরকে দেখে হাসিব তো অবাক হয়ে যায়।যাকে দেখার জন্য মনটা ছটফট করছিলো সেই কিনা তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। হাসিব ঝুমুরের অনেকটাই কাছে আসলো কিন্তু ঝুমুর হাসিবকে এত রাতে ছাদে হঠাৎ দেখে ভয় পেয়ে মুর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে।
হাসিব বিষয়টা বুঝতে পেরে মুচকি হেসে ঝুমুরের দুই বাহু ধরে ঝাঁকি দিয়ে বলে…
…এই ঝুমুর কি হয়েছে তোমার। আরে বোকা মেয়ে আমি হাসিব।
ঝুমুর হঠাৎ করে হাসিবকে জড়িয়ে ধরে মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না(অনেক ভয় পেলে যেমনটা হয়)
আরে আমার ঝুমুর এত ভীতু হয় কি করে কথাটা বলে হাসিবও জড়িয়ে ধরে ঝুমুরকে। হাসিব মনে মনে বলে…
তোমাকে কাছে পাবার জন্য মনটা কেমন করছিলো। যদি একবার জানতে পারতে আমার কতটা কষ্ট হচ্ছিলো তোমাকে দেখতে না পেয়ে। সারারাত যদি এভাবে তোমাকে বুকের সাথে মিশিয়ে কাটিয়ে দিতে পারতাম।
একটু পর ঝুমুরের কানের কাছে হাসিব ফিসফিস করে বলে….
সারারাত কি এভাবেই জড়িয়ে ধরে থাকবে ঝুমুর।
কথাটা শুনার পর হঠাৎ ঝুমুরের নিরবতা ভেঙ্গে যায়।ঝুমুর দেখে হাসিবকে সেই শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। কিছুটা লজ্জা পেয়ে সাথে সাথে হাসিবকে ছেড়ে দিয়ে বলে…
আপনি এত রাতে চোরের মতো ছাদে কি করেন?
….চোরের মতো না আসলে যে আমার ঝুমুরের চাঁদ মুখটা দেখতে পেতাম না।
ঝুমুর কিছু না বলে ছাদ থেকে নিচে নামতেই হাসিব ঝুমুরের হাত ধরে ফেলে।
…প্লিজ ঝুমুর আরেকটু থাকো। আমাকে কি এতটাই ঘৃণা করো যে একটু কথা বলারও ইচ্ছে হয় না তোমার? আমি কি এতটাই খারাপ যে একটু কি ভালোবাসতে পারো না?
ঝুমুর হাসিবের দিকে তাকিয়ে দেখলো,কতটা অসহায় লাগছে হাসিবকে দেখতে। আজ এতটা দিন শুধু ঝুমুরকে ভালোবাসার কথা বলেই যাচ্ছে এত অবহেলা সহ্য করেও।ঝুমুরের ইচ্ছে করছে হাসিবকে বলতে, আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি,তোমাকে কষ্ট দিয়ে আমিও ভালো থাকতে পারছি না কিন্তু বলতে পারছি না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে হাসিবের সামনে।
হাসিব এভাবে ঝুমুরকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলে..
….ঝুমুর তোমার আরও সময় লাগবে ঠিক আছে অপেক্ষা করবো যত দিন বেঁচে থাকবো।কিন্তু প্লিজ ঝুমুর আমার কাছ থেকে দূরে সরে থেকো না। সহ্য করতে পারি না।তোমাকে না দেখলে যে আমার সব কিছু এলোমেলো হয়ে যায়।প্রমিস করো কখনো দূরে সরিয়ে রাখবে না আমাকে প্লিজ।
ঝুমুরেরও যে আর ইচ্ছে করছে না হাসিবকে ফিরিয়ে দিতে। আর কিছু না ভেবে হ্যাঁ বলে দেয়। হাসিবের মুখে হাসির রেখা ফুটে ওঠে। ঝুমুরের খুব কাছে এসে কপালে আলতো করে ভালোবাসার ছোঁয়া দিয়ে বলে…
….এখন থেকে আর কখনো আমার কাছ থেকে লুকিয়ে থেকো না।
…হুমমম আমি এখন যাই আর আপনিও রুমে যান অনেক রাত হয়েছে।
কথাটা শেষ করে মুচকি একটা হাসি দিয়ে ঝুমুর চলে যায়
এতদিন পর হাসিবের মন আজ অনেক খুশিতে ভরে গেছে। হাসিব বলে ওঠে …
ঝুমুর আমাকে ভালোবাসে আমি জানি কিন্তু আমার ঝুমুর বড্ড অভিমানী। একদিন এই অভিমানও ঠিক ভেঙ্গে যাবে আর আমাকে ভালোবাসা দিয়ে জড়িয়ে নিবে।
রাত শেষে ভোরের আলো ফুটতেই ঝুমুরের ঘুম ভেঙ্গে যায়। জেগে বুঝতে পারলো আস্তে আস্তে মাথা ব্যথা করছে।বিছানা ছেড়ে ঝুমুর ওঠে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে আসলো।মনে মনে ভাবছে আজ ডাক্তার দেখাতে যাবে।কিন্তু কাউকে কিছু বলা যাবে না। কোনো একটা বাহানা দিয়ে বের হতে হবে।
কিছুক্ষণ পর ঝুমুরের মা রুমে আসলো।
…কি রে ঝুমুর তোর শরীর এখন কেমন আছে?
…আমি একদম ঠিক আছি। মা আমাকে আজ একটু বের হতে হবে।
…কোথায় যাবি?
….তুমি তো জানো মা সামনে আমার ফাইনাল পরীক্ষা তাই কিছু নোট আনতে নীলার বাসায় যাবো।
…আজ না গেলে হয় না
…না মা আজকেই যেতে হবে
….ঠিক আছে কিন্তু সাবধানে থাকিস।
…আচ্ছা মা তুমি চিন্তা করো না আমার কিছু হবে না।তুমি তাহলে তাড়াতাড়ি আমার জন্য নাস্তা নিয়ে আসো।
আচ্ছা বলে ঝুমুরের মা নাস্তা আনতে চলে গেলো।আর ঝুমুর রেডি হওয়া শুরু করলো।মনে মনে বলেই যাচ্ছে…
আল্লাহ আমার যেন কঠিন কিছু না হয়।আমি যে ঠিক করেছি আমি হাসিবকে সব কিছু বলবো আমার মনে যত কথা আছে। হাসিবকে নিয়ে আমার দেখা স্বপ্নের কথা বলবো।আমি আবারও নতুন করে সব কিছু শুরু করবো।
নাস্তা করে ঝুমুর বের হয়ে গেলো। রাস্তায় এসে একটা রিকসাওয়ালাকে দেখে মামা বলে ডাক দিয়েছে।রিকসায় ওঠে কিছুটা ভয়ে আর কিছুটা সাহস নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারে দিকে যাচ্ছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাক্তারের চেম্বারের কাছে রিকসা এসে থামলো।ঝুমুর রিকসাওয়ালাকে টাকা দিয়ে চেম্বারে ডুকলো।ডুকে দেখে দুজন রোগী অপেক্ষা করছে। ঝুমুরও অপেক্ষা করছে একজন একজন করে রোগী দেখা শেষ হলে ঝুমুর ভিতরে গেলো।ডাক্তার ঝুমুরকে দেখে অবাক হয়ে বলো…
…ঝুমুর তুই এখানে!!
….হ্যাঁ ফায়াজ ভাইয়া তুমি তো আর আমাদের খবর নিবে না তাই নিজেই চলে এলাম নিজের খবর দিতে।
(ডাক্তার ফায়াজ হলো ঝুমুরের বান্ধবী নীলার বড় ভাই ফায়াজ ঝুমুরকে নিজের বোনের মতোই মনে করে)
….এবার বল আমার বোনটার কি হয়েছে?
ঝুমুর সব কিছু খুলে বলে।ডাক্তার ফায়াজ অনেকগুলো টেস্ট করতে বলে।
….ঝুমুর তুই আমার সাথে যাবি আর এক্ষুনি এই টেস্টগুলো করাতে হবে।
…ভাইয়া খুব খারাপ কিছু (সাহস যেন হারিয়ে ফেলছে)
….রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত কি করে বলবো বল।আগে তো টেস্ট করাতে হবে তাই না। চল
কথা শেষ করে ডাক্তার ফায়াজ ঝুমুরের অনকে টেস্ট করায়।টেস্ট করানো শেষ হলে….
….ঝুমুর তুই বাড়ি যা কাল আমি তোর বাড়ি গিয়ে রিপোর্ট গুলো তোকে বুঝিয়ে দিয়ে আসবো।
…না ভাইয়া বাড়ির কাউকে কিছু বলো না।সামনে একটা অনুষ্ঠান আমি চাই না আমার জন্য কারও কোনো সমস্যা হোক। আমি নিজেই আসবো রিপোর্ট নিতে(মনের মধ্যে ভয় নিয়ে)
….কিন্তু ঝুমুর
কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ঝুমুর বলে…
…তুমিই তো আমার ভাই তুমি জানলেই হবে মাকে কিছু বলার দরকার নেই। তুমি তো জানো ভাইয়া আমি ছাড়া মায়ের আর কেউ নেই। আমাকে নিয়ে তো মায়ের এমনিতেই চিন্তার শেষ নেই তাই প্লিজ ভাইয়া আমার ভালো খারাপ যাই হোক মাকে কিছু বলিও না।
….আচ্ছা তুই যা বলবি।তবে চিন্তা করিস না রিপোর্ট ভালোই আসবে
…ভাইয়া ভালো খারাপ যাই হোক আমাকে বলিও প্লিজ
কথাটা শেষ করে ঝুমুর আনমনে বের হয়ে বাড়ির দিকে রওনা দেয়।হাজারো দুশ্চিন্তা বুকে জমা হচ্ছে
চলবে…..