প্রিয় রোদ্দুর পর্ব-০১

0
1245

#প্রিয়_রোদ্দুর🤍
#লেখনীতে:অনুসা_রাত❤️(ছদ্মনাম)
#সূচনা পর্ব

-❝গত রাতটা স্পেশাল ছিলো রোদ্দুর। ধন্যবাদ আমাকে এত সুন্দর সময় দেয়ার জন্য!❞

রোদ্দুর স্যারের ফোনে এমন মেসেজ দেখে আমার চোখজোড়া বড় বড় হয়ে গেলো।ভালো করে তাকাতেই দেখলাম আইডির নাম ‘জোনাকি রহমান’।দিনের বেলায় জোনাকির এমন আলো দেখে আমি রিতীমত অবাক!নির্বাক!তাছাড়া রোদ্দুর স্যারের ফোনে এসব মেসেজ!ওরে খোদা রে!আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না।আমি যখন চোখ বড় বড় করে সামনের দিকে তাকিয়ে আছি ঠিক তখনই সুঠামদেহী রোদ্দুর স্যার এসে আমার সামনে বসলেন।গামছা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে আমার দিকে তাকিয়ে চোখ ছোট ছোট করে ভ্রু উঁচিয়ে বললেন,

-“এই মেয়ে তুমি এভাবে কই তাকিয়ে আছো।”

আমি বার কয়েক চোখের পলক ফেলে আনমনে বললাম,

-“দিনের বেলায় জোনাকি!”

রোদ্দুর স্যার ভ্রু কুঁচকে বললেন,

-“মানেহ!”

আমি থতমত খেয়ে তার দিকে তাকালাম।জোরপূর্বক হেসে বললাম,

-“ন..না কিছু না।কিছু না তো।হে হে হে!”

রোদ্দুর স্যারের আমার কথাটা বিশ্বাস হলো কিনা জানি না।উনি গামছাটা বিছানায় রেখে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

-“অংক করেছো?”

আমার এতক্ষণে খেয়াল হলো যে উনি আমায় অংক করতে দিয়ে ওয়াশরুমে গেছিলেন একটু ফ্রেশ হতে।আমি অংকের সমাধান ভুলে গেছি তাই সামনে থেকে খাতাটা নিতে গিয়ে চোখ পড়ে স্যারের ফোনে।তার সেটা হঠাৎ জ্বলে উঠে নোটিফিকেশন আসায়।ব্যস হয়ে গেলো।আমি চলে গেলাম মহা চিন্তায়।এখন এতকিছু ভাবার সময় নেই।আমি তৎক্ষনাৎ অংক করার চেষ্টা করে বললাম,

-“করছি তো!”

-“করছি তো মানে!এতক্ষণ কি করেছো?”

-“করছিলাম…”

-“নিশ্চয়ই সমাধানের খাতা দেখতে গিয়ে লেট করেছো।আমি দেখব না এই অংক।”

-“কিন্তু স্যার আমি তো…”

উনি আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,

-“এই টাইপের প্রায় ২০ টা অংক আছে বইয়ে।তুমি এই একই টাইপের একেকটা অংক ১০ বার করে করবে।আমি কাল দেখবো।”

-“কিহহ!”

-“কোনো সমস্যা?”(তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে)

আমার মুখে আসা গালিটা সেখানেই থেমে গেলো।কি ভয়ংকর দৃষ্টি রে বাবা।কোনদিন যেন এই দৃষ্টি দিয়েই আমাকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলে।আমি তো কিছু করলামই না।কিন্তু এতবড় শাস্তি থেকে তো বাঁচতে হবে।আমি যথাসম্ভব নিজেকে সামলে কন্ঠে অসহায়ত্ব এনে বললাম,

-“স..স্যার প্লিজ।”

স্যার আমার খাতায় হোমওয়ার্ক লিখে দিচ্ছেন।আমার দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে বললেন,

-“করে রাখবে।”

-“স্যার প্লিজ। ওকে তিনবার করে করি…”

-“১০ বার।”

-“ওকে ৫ বার।”

উনি আমার দিকে আবারো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন।আমি মনে হয় এবার হার্ট অ্যাটাক করবো।ঢোক গিলে আমি চুপচাপ মাথা নিচু করে ফেললাম।উনি যেতে যেতে বললেন,

-“কাল দেখছি তোমায়!”

উনি চলে গেলেন।আমি হাত উঁচু করে গলা টিপে ধরার মত করে এগিয়ে গিয়ে দরজা অবধি থেমে গেলাম।কাঁদো কাঁদো গলায় বললাম,

-“তোর বিয়ে হবে না।তোর কপালে বাচ্চা বউ জুটবে রোদ্দুর আবরার ইবাব!”

পরপরই দরজায় ভালো করে তাকালাম।নাহ চলে গেছে।যদি শুনে নিতো?ভেবেই আবারো মুখটা কাঁদো কাঁদো হয়ে গেলো আমার।ধ্যাত এবার অংক করতে হবে বসে বসে।এই লোকটা নিজেকে কি মনে করে!আমাকে কিসের শাস্তি দিলো এটা?নিজে কি কি করে বেড়াচ্ছে বাহিরে।ছি ছি!জোনাকির সাথে রাত-বিরেতে মানুষকে আলোকিত করতে যাচ্ছে নাকি নিজেই আলোকিত হচ্ছে আল্লাহ মালুম।ভাবছিলাম একটু ফেসবুকে ঘুরাঘুরি করবো।তার আর উপায় আছে নাকি এই বজ্জাতটা থাকতে।ভেবেই আমি মন খারাপ করে অংক করতে বসে গেলাম।

সকালে কারোর চেচামেচিতে ঘুম ভাঙলো আমার।পিটপিট করে চোখ খুলে দেখলাম টেবিলেই ঘুমিয়ে গেছিলাম আমি।ভালো করে ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলাম সময় ৯ টা।বেশিক্ষণ হয়নি ঘুমিয়েছি।আম্মু চেচাচ্ছে কলেজ যাওয়ার জন্য।বলছে,

-“অতসী, জলদী উঠ।সারারাত ফোন চাপছোস তাই তো!রোদ্দুর বলে তো আমায়,তোকে নাকি সারারাত একটিভ দেখা যায়।”

আমি পাত্তা না দিয়ে হাই তুললাম।অংকের কথা মনে পড়তেই খাতার দিকে তাকিয়ে দেখলাম সব কম্প্লিট।যাক বাঁচা গেলো।আমি খাতাটা গুছিয়ে রেখে বিছানায় ধপ করে শুয়ে পড়লাম।আহ শান্তি!ঘাড়ের ব্যাথাটা আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে। আহ এত শান্তি কেনো ঘুমে!
কিন্তু আমার এই শান্তির ঘুম নষ্ট করে আমার ফোনটা হঠাৎ কাকের মত কা কা করে উঠলো।মেজাজ গেলো চটে।ফোনটা চেক না করে কানে দিয়েই ছাড়লাম এক গালি।তারপর বললাম,

-“কোন ***বোর্ড রে!আমার শান্তির ঘুম নষ্ট করিস।”

ভেবেছিলাম ওই পাশ থেকে বান্ধবী টিনার গলা আসবে।অথচ আমার ভাবনাকে ভুল প্রমাণিত করে অপরপাশ থেকে রোদ্দুর স্যারের রাগী গলা ভেসে এলো,

-“এই বেয়াদব মেয়ে!তোমার সাহস কত বড় তুমি আমাকে এসব বলো!”

আমি লাফ দিয়ে উঠলাম।ঘুম আমার ছাদ ভেদ করে আকাশে উঠে গেছে।তাড়াতাড়ি করে ফোনটা কান থেকে সরিয়ে দেখলাম বড় বড় করে লেখা ‘দা রাক্ষস’

আমি ফোনটা বুকে নিয়ে চোখ বন্ধ করে ঢোক গিললাম।আজ আমি শেষ!ফোন থেকে শব্দ ভেসে আসছে।আমি কানে দিতেই শুনলাম উনি বলছেন,

-“আজ তোমার নামে বিচার আছে অতসী।”

আমি কাঁদো কাঁদো গলায় বললাম,

-“স..সরি স্যার।আ..আমি বুঝতে পারিনি।”

-“কি বুঝতে পারোনি তুমি!”(ধমক দিয়ে)

ওনার ধমক খেয়ে আমি কেঁপে উঠলাম।উনি আবার বললেন,

-“বলোহ!”

-“স..স..স্যার আমি ভে…ভেবেছিলাম অ..অন্য ক..কেউ!”

-“হোয়াট দা…”

-“সরি স্যার আর হবে না।”(এক নিঃশ্বাসে)

-“অন্য কেউ হলেও তুমি এমন ব্যবহার করবে?তোমার থেকে এটা আশা করিনি আমি অতসী।”

উনি আরো কিছু বলতে যাবেন তখনই পাশ থেকে মেয়লি গলা শোনা গেলো,

-“রোদ্দুর চলো ফুচকা খাই।”

উনি কান থেকে ফোন সরিয়ে মেবি কিছু বললেন।শোনা গেলো না।আমি যথাসম্ভব শোনার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলাম।উনি তারপর বললেন,

-” আসছি আজ আমি।তারপর তোমার হচ্ছে!আর কলেজ যাও না কেন তুমি?”

-” স্যার যাচ্ছি তো।”

-“রাইট নাও!”

-“উড়ে যাবো তো!”(বিরবির করে)

-“কি বললে?”(রাগী গলায়)

এই যাহ!শুনে ফেললো?কান খাড়া কেন এত!

-“ক..কই ক..কিছু না তো।”

বলেই কলটা কেটে দিলাম আমি।আজ কি হবে ভেবেই বারবার আমার বুকটা কেমন কেঁপে কেঁপে উঠছে।কিন্তু ভাববার বিষয় হলো স্যারের পাশের ওই মেয়েটা কে?এটাই কি জোনাকি?উনি কি স্যারের গার্লফ্রেন্ড? তবে উনি যে বলেছিলেন ওনার তেমন কেউ নেই।তবে কি উনি মিথ্যা বলেছিলেন?অবশ্য বলতেও পারেন।আমি সামান্য ছাত্রী।আমার কাছে মিথ্যা বললে কিইবা আসে যায়।তাছাড়া উনি যা ইচ্ছে করুক।রাক্ষস একটা।ভেবেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে রেডি হতে চলে গেলাম আমি।

-“কিরে তোর মন খারাপ কেন?এমনিতে তো অনেক বকবক করিস।”

টিনার এমন কথা শুনে আমি ওর দিকে রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করলাম।তারপর বললাম,

-“তোর জন্য ই তো! ”

টিনা আমার পাশে বসে অবাক হয়ে বললো,

-“যাহ বাবা।আমি কি করলাম।”

-“তুই ই তো।তোর জন্যই!”

-“কিন্তু আমি তো কিছু করলামই না ভাই!”

-“সকালে ওই রাক্ষসটা কল করেছিলো।”

-“রোদ্দুর ভাইয়া?”(ব্লাশিং হয়ে)

আমি ওর দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম।ও সেটা দেখে তুতলিয়ে বললো,

-“আই মিন রোদ্দুর ভাইয়া?”

এবার মুখটা একটু কুঁচকে বললো।ঢংগী মেয়ে একটা।আমাদের বাসায় যখন এসেছিলো তখন স্যারের সাথে ওর দেখা হয়েছিল তখন থেকেই নাকি ক্রাশ খেয়ে বসে আছে।আমি বুঝিনা বাবা এই লোকটাকে দেখে প্রেম প্রেম অনুভূতি আসে কিভাবে।না উনি দেখতে খারাপ না কিন্তু বিহেভিয়ার তো এত প্রেমী প্রেমী না।প্রেমী প্রেমী বিহেভিয়ার থাকা অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।টিনার ধাক্কায় আমার ঘোর কাটলো,

-“কিরে বল না!”

-“আরে আমি ঘুমের ঘোরে তুই মনে করে গালি দিয়ে দিয়েছি! ”

টিনা হা হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।আমি একে একে সব ঘটনা বললাম।ওই জোনাকির কথাও বললাম।তখনই টিনা মুখটা কাঁদো কাঁদো করে বললো,

-” অ্যাাাা!আমার ক্রাশটার গার্লফ্রেন্ড আছে।ধ্যাত ভাল্লাগে না।”

-“আরে ধূর এইসব বাদ।আমি তো ভাবছি আমাকে সামনে পেলে কি করবে আজকে।”

টিনা আমার কথাটা শুনলো নাকি জানি না।সে আপাতত আমাকে টাটা বায় বায় বলে ডিপ্রেশনে চলে যাচ্ছে। তার নাকি বুকে আঘাত লেগেছে।অথচ আমি আঘাতটা দেখতেই পারছি না।কি সাংঘাতিক!
এটা কেমন আঘাত!সে যাই হোক!আমার তো এখন এটা ভেবেই গলা শুকিয়ে যাচ্ছে যে রোদ্দুর স্যার আমায় সামনে পেলে আজ কি করবেন! বায় বায় অতসী!বায় বায়! আজ তোর কিমা হবে।আর সেই কিমা দিয়ে বার্গার খাবে রোদ্দুর আবরার ইবাব!

চলবে কি?