#প্রেমালিঙ্গণ
#ঊর্মি_আক্তার_ঊষা
#অন্তিম_পর্ব
সময় আর স্রোত কখনোই কারো জন্য অপেক্ষা করে না৷ তারা তাদের নিজ গতিতে এগিয়ে যায়। সময়ের সাথে সাথে ভালোবাসার গভীরতা বাড়ে। বেড়ে যায় একে অপরের প্রতি দায়িত্ববোধ। কুয়াশায় ঘেরা সরু রাস্তা দিয়ে এক জোড়া কপোত-কপোতী পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছে। দুজনের হাত একে অপরের সাথে মুষ্টিবদ্ধ। রমনীর ঢেউ খেলানো লম্বা বেনী গাঁথা চুলগুলো হেঁটে যাওয়ার সাথে সাথে নড়েচড়ে যাচ্ছে। স্বাক্ষরের পুরো পরিবার গ্রামে বেড়াতে এসেছে। আগের বার রুবির বিয়েতে এসেছিল এখন তার ছোট মামার বিয়েতে। এতোদিনে উনার সন্যাসী ট্যাগটা ত্যাগ করে ফেলেছেন৷ মন থেকে কিছু চাইলে হয়তো আল্লাহ তায়ালাও নিরাশ করেন না। বহু অপেক্ষার পর পছন্দের মানুষটাকে বিয়ে করে ঘরে তুলেছেন। অনেকদিন পর বাড়ির মানুষ গুলো আবারও একসাথে আনন্দময় সময় অতিবাহিত করছেন। সকালে ঘুম থেকে ওঠা মাত্রই স্বাক্ষর তন্দ্রাকে নিয়ে বের হয়েছিল। কুয়াশা ঘেরা একটা সুন্দর সকাল দু’জনে উপভোগ করেছে। তন্দ্রার অনেক দিনের ইচ্ছে ছিল এমন একটা কুয়াশা ঘেরা সকালে প্রিয় মানুষের মুষ্টিবদ্ধ হাতের মাঝে নিজের হাত ডুবিয়ে, গ্রামের আঁকাবাঁকা সরু রাস্তায় হাঁটবে। তন্দ্রা খুব করে উপভোগ করেছে আজকের এই সুন্দর সকালটা।
সময়ের স্বল্পতার কারণে দুদিন থেকেই স্বাক্ষরের পুরো পরিবার আবার ঢাকায় ফিরে আসে। আবারও প্রতিদিনকার মতোই নিজেদের কাজে ব্যস্ত হয়ে যায় তারা। স্বাক্ষর সবে মাত্র বাসায় ফিরেছে। তাকে দেখা মাত্রই অ্যালভিন প্রতিদিনকার মতোই “মিয়াও” করে উঠে। ড্রইং রুমে পুরো পরিবার বসে আছে। তন্দ্রা তাদের ঘরের দরজার দিকে দাঁড়িয়ে উঁকি দিয়ে দেখছে স্বাক্ষর কখন ঘরে আসবে। তন্দ্রাকে দেখা মাত্রই স্বাক্ষর বলে….
–সেজেছো যে, কোথাও দাওয়াত আছে নাকি আমাদের?
স্বাক্ষরের এমন কথায় সবাই তন্দ্রার দিকে তাকালো। সবাই হয়তো বুঝার চেষ্টা করছে, তার সাজগোজের উৎস। এদিকে তন্দ্রা চোখ রাঙিয়ে স্বাক্ষরের দিকে তাকিয়ে থাকে। লজ্জায় কারো দিকে তাকাতে পারছে না সে। সাহেরা মাহমুদ তার অবস্থা বুঝতে পেরে বলেন…
–আমি ওকে বলেছি, রেডি হয়ে থাকতে। মেয়েটাকে নিয়ে একটু বাইরে থেকে ঘুরে আয়৷
তন্দ্রা দরজা থেকে সরে দাঁড়ায়। স্বাক্ষর ঘরে আসে৷ তন্দ্রা এখনও স্বাক্ষরের দিকে রেগে রেগে তাকাচ্ছে।
–কি হয়েছে বউ? রেগে আছো কেন?
–তো কি করবো? সেজেছি ভালো কথা তাই বলে সবার সামনে বলতে হবে?
–ভুল হয়েছে বউ। ক্ষমা করে দাও।
স্বাক্ষর টাওয়াল নিয়ে ওয়াশরুমে যায় ফ্রেশ হতে। এদিকে তন্দ্রা বিছানায় বসে বসে স্বাক্ষরের ফোনে ওদের রিসেপশনের ছবি গুলো দেখে। সময় খুব তাড়াতাড়িই অতিবাহিত হয়ে যায়। স্মৃতি হয়ে রয়ে যায় কিছু মধুর মুহুর্ত। মুখ মুছতে মুছতে স্বাক্ষর ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে। মিনিট পাঁচেক সময় নিয়ে তাড়াতাড়ি করে রেডি হয়ে নেয়। স্বাক্ষর রেডি হতেই তন্দ্রাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। ড্রাইভিং সিটে বসে তন্দ্রাকে একবার দেখে নেয় স্বাক্ষর। যে কি-না জানালার দিকে মুখ করে তাকিয়ে আছে। স্বাক্ষর কিছুটা ঝুকে তন্দ্রার গায়ে শালটা ভালো করে পেচিয়ে দেয়৷ দুজনের একবার চোখাচোখি হয়ে যায়। জানালা খোলাই রেখেছে, এতে নাকি তন্দ্রার ভালো লাগে। স্বাক্ষর ড্রাইভ করতে শুরু করে। জানালা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস আসছে। বাতাসে বারবার চুলগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে। তন্দ্রা চোখ বন্ধ করে তা উপভোগ করছে তবে কপালের উপর থাকা ছোট চুলগুলো খুবই বিরক্ত করছে তাকে।
লেকের পাড়ে এসে গাড়ি থেমেছে কিছুক্ষণ আগেই৷ মাঝখানে বড় একটা লেক। এর চারিপাশে সবুজ গাছগাছালি। রাতের বেলা তা দেখা না গেলেও দিনের আলোয় এর সৌন্দর্য হয়তো আরও বেশি। লেকের কিনারায় রেলিং দেওয়া। আর রেলিং ঘেঁষে ছোট ছোট রংবেরঙের লাইট। পরিবেশটা খুবই নিরিবিলি। স্বাক্ষর আর তন্দ্রা বেশ কিছুক্ষণ একে অপরের হাত ধরে হাঁটে। এভাবেই অনেকটা সময় অতিবাহিত হয়।
স্বাক্ষর তন্দ্রাকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে আসে। রেস্টুরেন্টের মনোরম পরিবেশটা তন্দ্রাকে মুগ্ধ করছে। আজ এক এক করে তার সকল গ্লানি দূর হয়ে যাচ্ছে। ভালো লাগার এই মুহুর্ত গুলো যদি এখানেই থেমে যেত। হলেও খুব একটা মন্দ হতো না। রেস্টুরেন্টের ভেতরে অনেক কাপলও আছে। একটা ছেলে তার গার্লফ্রেন্ডকে ফুল দিচ্ছে। তন্দ্রা তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে।
ওদের খাওয়া শেষ হতেই দুজন রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে আসে। তন্দ্রা তার জায়গায় গিয়ে বসে। স্বাক্ষর ড্রাইভ করতে শুরু করে। একটা ফুলের দোকানের সামনে এসে গাড়ি থামে। স্বাক্ষর গাড়ি থেকে নামতে নিলেই তন্দ্রা বলে ওঠে…
–তোমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ফুলটাই হচ্ছি আমি। তাই দোকান থেকে ঘটা করে ফুল কিনে আনার প্রয়োজন নেই।
–ফুলের সাথে ফুলের মেলবন্ধন দেখার সাধ জেগেছে। তুমি একটু অপেক্ষা করো৷ আমি এক্ষুনি আসছি।
কিছু সময় পর স্বাক্ষর হাতে করে একগুচ্ছ গোলাপ আর বেলী ফুলের মালা হাতে করে নিয়ে আসে। বেলী ফুলের মালাটা নিজেই তন্দ্রার হাতে পড়িয়ে দেয়। গোলাপ ফুল গুলোও দিয়ে দেয় তার তন্দ্রাবতীকে৷ সাথে কপালে এক উষ্ণ ওষ্ঠদ্বয়ের স্পর্শ একে দেয়। এভাবেই দুজন আরও কিছু সময় নিজেদের মতো করে কা’টায়।
———————–
তন্দ্রার খাবারের প্রতি অনিহা খুব করে লক্ষ্য করেছেন সাহেরা মাহমুদ এবং তাহেরা মাহমুদ। এইতো সকালেও নাস্তা করার সময় একটু কিছু খেয়েই তন্দ্রা তার ঘরে চলে আসে৷ দুপুরের খাবারটাও ঠিক ভাবে খেতে পারেনি। তন্দ্রা তার ঘরের থেকে এরপর আর বের হয়নি। সারাক্ষণ শুয়ে বসেই ছিল৷ তার ভেতরে ভেতরে এক অস্বস্তি আর গুমোট অনুভূতি হচ্ছে৷ কোনো কিছুতেই যেন ভালো লাগছে না তার। বার বার গা গোলাচ্ছে আর একটু আধটু মাথাও ঘুরাচ্ছে। বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে করতে কখন যে, সে ঘুমিয়ে পড়েছে তার ইয়াত্তা নেই। রাতে স্বাক্ষর যখন ঘরে আসে তখনও তন্দ্রা বিছানায় শুয়েই ছিল। তাকে অবেলায় শুয়ে থাকতে দেখে কিছু ভ্রু কুচকায় স্বাক্ষর৷
–এই অসময়ে শুয়ে আছো কেন তন্দ্রাবতী? শরীর ঠিক আছে?
–একটু বসবে তোমার সাথে কথা ছিল।
–একটু অপেক্ষা করো। এক্ষুনি ফ্রেশ হয়ে আসছি৷
মিনিট পাঁচেক পর স্বাক্ষর ফ্রেশ হয়ে তন্দ্রার কাছে আছে। তন্দ্রার চোখ মুখে দূর্বল চাহুনি। তাকে দেখে স্বাক্ষর বুঝার চেষ্টা করে। তারপর বলে….
–হুম বলো!
–কাল আমাকে একটু হসপিটালে নিয়ে যাবে?
–কেন? কিছু হয়েছে কি?
–আসলে দুদিন ধরে খাবার খেতে পারছি না। মুখে নেওয়ার আগেই কেমন গা গুলিয়ে আসছে৷ দূর্বল থাকার কারণে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না, মাথা ঘুরায়৷
তন্দ্রা কথাগুলো খুবই মনোযোগ সহকারে শুনছিল স্বাক্ষর৷ এরপর তন্দ্রার পালস চেক করে সে৷ তন্দ্রার পি’রি’য়’ড মিস গিয়েছে দু’মাস হচ্ছে। কিন্তু এই বিষয়টি এতোদিন তার মনেও ছিল না। তারপরও একবার প্রেগন্যান্সি টেস্ট করিয়ে নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করে স্বাক্ষর। তন্দ্রাকে কিছু না বলে বাইরে কোথাও যায় সে।
প্যাকেটে করে কিছু একটা নিয়ে স্বাক্ষর ঘরে আসে। তন্দ্রা তখনও শুয়েই ছিল। প্যাকেটটা ড্রেসিং টেবিলের উপর রেখে সে ঘরের বাইরে আসে। তাহেরা মাহমুদ তখন ডাইনিং টেবিলে সবার জন্য খাবার বাড়ছিলেন।
–ছোট মা। তন্দ্রাবতীর খাবারটা প্লেটে বেড়ে দিও তো।
–ও কি এখানে খেতে আসবে না? দুপুরেও তো ভালো ভাবে কিছু খেল না।
গ্লাসে পানি ঢালতে ঢাকলে সাহেরা মাহমুদ বলেন…
–চেকআপ করে দেখিস তো বাবা; কি হয়েছে মেয়েটার।
–হুম।
স্বাক্ষর তন্দ্রার জন্য খাবার নিয়ে ঘরে চলে আসে। তন্দ্রাকে বসিয়ে নিজ হাতে খাবার খাইয়ে দেয়। কয়েকবার খাওয়ার পর তন্দ্রা আর খেতে পারে না। আবারও গা গুলিয়ে আসছে তার। যেকোনো মুহুর্তে বমি হয়ে যেতে পারে৷ স্বাক্ষর তাড়াতাড়ি করে ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখা প্যাকেট থেকে একটা টেবলেট বের করে আনে। এক গ্লাস পানি আর ঔষধটা তন্দ্রার দিকে এগিয়ে দেয়।
পরের দিন সকালে তন্দ্রা আগে ঘুম ভেঙে যায় স্বাক্ষরের৷ সে উঠে তন্দ্রাকেও ডেকে তোলে৷ তন্দ্রা আড়মোড়া ভেঙে শোয়া থেকে উঠে বসে। স্বাক্ষর কাল রাতে ফার্মেসী থেকে প্রেগন্যান্সি কিট কিনে এনেছিল, সেটা তন্দ্রা হাতে দেয়। কিছু সময় পর তন্দ্রা ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে। হাতে থাকা প্রেগন্যান্সি কিটটা স্বাক্ষরের হাতে তুলে দেয়। স্বাক্ষর একবার পূর্ণ দৃষ্টিতে চোখ বুলায় সেখানে।
–পজেটিভ এসেছে?
স্বাক্ষর কোনো উত্তর দেয় না; খুশিতে তন্দ্রাকে জড়িয়ে ধরে। বাবা হওয়ার চাইতে খুশির খবর হয়তো আর হয় না। খুশিতে এই বুঝি কেঁদে দিবে সে; এমন অবস্থা হয়েছে৷ তন্দ্রাকে বিছানায় বসিয়ে কিছু সময়ের জন্য তার পেটে আলতোভাবে মাথাটা রাখে স্বাক্ষর। এরপর আবারও মুখ তুলে তাকায় তন্দ্রার দিকে।
–বাবা হওয়ার অনুভূতিটা ঠিক কি তা বলে বুঝানো যায় না তন্দ্রাবতী। মায়েরা যেমন সন্তানকে পেটে ধারণ করে, তেমনই বাবা লালন করে বুকে। এইজন্যই হয়তো মায়ের সাথে নাড়ির টান আর বাবার সাথে থাকে আত্মার টান। বাবা হবার আনন্দে জীবনটা হঠাৎ করেই রঙিন হয়ে উঠেছে। ধন্যবাদ তোমাকে। আমাকে এই সুন্দর অনুভূতির সাথে পরিচয় করানোর জন্য।
তন্দ্রা স্বাক্ষরের কথাগুলো এতোক্ষণ খুব মনোযোগ সহকারে শুনছিল। নিজের অজান্তেই চোখ বেয়ে কয়েক ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ে। মা হওয়ার সুখটা সে যেন আজ থেকে অনুভব করতে পারছে৷ বাড়িতে ছোট একটা প্রাণ আসতে চলেছে। যখন সে পৃথিবীতে আসবে তখন তো এই পরিবারে আনন্দের সীমা থাকবে না। চোখ বন্ধ করে পেটের উপর আলতো হাত রাখে তন্দ্রা। এখানে তাদের ভালোবাসার অস্তিত্ব একটু একটু করে বড় হয়ে উঠবে৷ আধো আধো বুলিতে মাম্মা পাপা বলে ডাকবে ওদের৷ স্বাক্ষর তার চোখের পানি মুছে দিয়ে আগলে নেয় তন্দ্রাকে। তন্দ্রার প্রেগন্যান্সির খবর শুনে ওদের পরিবারে যেন খুশির বন্যা বয়ে যাচ্ছে। এরই মাঝে শুরু হয়ে গেছে, নতুন অতিথির আগমনের আপ্যায়ন ঠিক কিভাবে করবে তার প্ল্যানিং। তুলি তো কনফিউজড হয়ে আছে, নতুন অতিথি এলে তাকে ঠিক কি বলে ডাকবে! খালামণি নাকি ফূপিমণি?
বিছানার একপাশে স্বাক্ষর ঘুমিয়ে আছে। তন্দ্রা তার পাশ থেকে উঠে গিয়ে স্টাডি টেবিলে বসে। তিনটে বইয়ের নিচে পড়ে থাকা বহু পুরনো একটা ডায়েরি বের করে৷ এই ডায়েরিটা আসলে স্বাক্ষরের৷ কলেজ পড়াকালীন সময়ে সে খুব ডায়েরি লিখতো। আজ তন্দ্রারও কিছু একটা লিখতে ইচ্ছে করছে। তাই মনের ইচ্ছেকেই প্রাধান্য দেয় সে। হাতে তুলে নেয় স্বাক্ষরের প্রিয় কলমটাকে।
❝সত্যিকারের ভালোবাসার মতো ভয়ংকর ব্যাপার অন্যত্র নেই। কোনো ছেলে যখন নির্দিষ্ট কাউকে মন থেকে ভালোবাসে তখন পুরো কায়নাত ওলট পালট হয়ে গেলেও সে তাকেই চাইবে৷ এই ভালোবাসাটা হচ্ছে গুপ্ত খাজনার মতো; যে পায় সে ভাগ্যবতী। পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য হচ্ছে এক নারীতে আসক্ত পুরুষের ভালোবাসা❞
সমাপ্ত!…….