প্রেমোদ্দীপক পর্ব-২৬

0
1446

#প্রেমোদ্দীপক। (পর্ব-২৬)
আফিয়া খোন্দকার আপ্পিতা

চলমান যুগটাকে আধুনিকা যুগ বলা হয়। এই যুগে সবকিছুতে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। কুসংস্কারভরতি মস্তিষ্ক গুলো পরিষ্কার হয়ে অনেক দিক থেকে মানুষের ধ্যান ধারণা বদলেছে। তবে কিছু ব্যাপার এখনো পূর্ব যুগের আদলেই রয়ে গেছে, তার মধ্য একটা হলো বর্ণ বৈষম্য। এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও মানুষকে গায়ের চামড়া দিয়ে মাপা হয়। সুন্দরের পূজারীদের কাছে কোন মানুষ সাদা চামড়ার হলে তার মূল্যায়ন বেশি, কালো হলে তাকে হেয় করা হয় বেশি। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় মানুষের গায়ের চামড়া তিন ধরনের হয়, সাদা,কালো আর বাদামী। তৃতীয় রঙ বাদামী, যাকে সবাই শ্যামলা বলে। এই রঙের মানুষগুলোর মাঝে মায়ায় ঠাসা থাকে। কবি লেখকের ভাষায় সবচেয়ে মায়াবতী মানুষ হলো শ্যামবর্ণের মানুষ। ইয়াং জেনারেশনের কাছে শ্যামবর্ণটা আকর্ষণীয় মনে হলেও মুরুব্বি সমাজের কাছে এটি একবারেই অগ্রাহ্য। তৃতীয় রংটাকে ধরাই হয়না। দুটো রঙ ধরা হয়, সাদা কালো। সাদা চামড়ার মানুষদের সুন্দরের তালিকায়,আর যাদের রঙ চাপা তাদের কালো রঙের তালিকায়। বাদামীকে চাপা রঙ ধরা না হলেও আমাদের মুরুব্বি সমাজ বাদামী চেহারার মানুষজনকে কালোর তালিকায় ফেলে দেন অনায়েসে । বর্ণ বৈষম্যের শিকার হয় বেশি নারীরা এবং তা সবচেয়ে বেশি হয় গ্রামীন সমাজে। বিশেষ করে পাত্রী দেখার সময় পাত্রীর গায়ের রং সাদা হওয়া বাধ্যতামূলক হিসেবে ধরে নেন তারা। বাকিসব ছাড়া যায়, রংটা একটু ভালো না হলে হয়? ছেলে কালো হলে সমস্যা নেই কিন্তু বউটা সুন্দর হতে হবে, বউ কালো হলে ছেলেমেয়েও কালো হবে। তাদের কন্যা সন্তান যদি কালো হয়, তবে বিয়ে শাদী দিবে কীভাবে? কেউ বিয়ে করতে তো চায়না কালো মেয়েকে, সবাই চায় সুন্দর বউ। কালো বউ নিয়ে বন্ধু বান্ধব আত্মীয় স্বজনের সামনে যাওয়া যায় না, পরিচয় করিয়ে দেয়া যায় না। সমস্যাটা ব্যাপক। এত সমস্যা নিয়ে কোন ভাবেই ছেলেকে কালো মেয়ে বিয়ে করানো যায় না। এই মন মানুষিকতা সম্পন্ন মানুষ হচ্ছেন জাহানারা। তার দুই ছেলে, তাদের বেছে বেছে সুন্দরী বউ দেখে বিয়ে করিয়েছেন। ছেলে দুটো একবারে কালো সেটা ভিন্ন ব্যাপার। ছেলেদের এত দোষ ধরতে নেই। একমাত্র মেয়ে জাবিনের গায়ের রঙটাও দুধে আলতো। জাবিন ও সুন্দরের পূজারী। রূপ দেখেই একটা ছেলেকে ভালোবেসে ফেলেছে, বাকি কিছুই দেখেনি। আবেগের বশে বিয়েও করে ফেলেছে। বিয়ের কদিন পরেই টের পেল ছেলে নেশাখোর, ভাবীর সাথে পরকীয়ায় লিপ্ত। এত সুন্দরী বউ ঘরে থাকতে তারপ্রতি কোন টান নেই। এখন হায়হায় করছে। সুন্দরের পূজারী হওয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া টের পাচ্ছে, এটাও ভিন্ন ব্যাপার। নিজের ঘর ভেসে যাক, চোখ দিতে নেই, অন্যের ঘরে নুন থেকে চুন ঘষাটা মানা যায় না।

ননদের কৃতকর্মের জন্যে অনুতপ্ত নীলিমা। রাগ আর ঘৃণার জন্ম নিয়েছে মনে। কত ভাবনা আসছে মনে। ইচ্ছে করছে কয়েকটা কড়া কথা শুনিয়ে দিতে, কিন্তু বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবার ভয়ে চুপ আছে। জাহানারাকে এখন কিছু বললে কেঁদে কেটে বাড়ি মাথায় তুলবেন, নীলীমাকে যা নয় তা বলবেন। অসুস্থ মাকে ফেলে চলে যাবেন, আর আসবেন ও না। শেষে সব দোষ এসে পড়বে নীলীমার গায়ে। তিনি সুযোগ খুঁজছেন, সুযোগ পেলে মনের সব রাগ উজাড় করবেন।

তাহিয়ার ভাপা পিঠা পছন্দ। শহরে ভাপা পিঠার সেই স্বাদ কোথায়, যতটা গ্রামের তাজা গুড়ের ভাপা পিঠার? আজ ভাপা পিঠা বানানো হচ্ছে দেখে নীলিমা খুশি হয়েছেন, মেয়েটা আজ খেতে পারবে। কিছু ঝামেলাটা উড়ে এসে পড়ায় তা আর হলো কই? চাচীকে তুলে দিয়ে নিজেই পিঠা বানাচ্ছেন নীলিমা। মাঝে কত কথাই না ভাবছেন। জাহানারা এখন মায়ের কাছে, নীলিমার পাশে আছেন রেহানা। কয়েকটা ভাপা পিঠা বানিয়ে একটা প্লেটে তুলে নিলেন। পিঠা বানানোর দায়িত্ব রেহানাকে দিয়ে তিনি চললেন ছেলের ঘরের দিকে। ঘরের দরজায় নক দিলেন,
‘অভী, দরজা খুল তো।’

ভেতরে মান অভিমান পর্ব চলছে। তাহিয়ার মন খারাপের কারণ কিছুতেই ধরতে পারছেনা অভীক। তাহিয়া কিছু বলতে নারাজ। এত খারাপ কথা মুখেও আসছে না ওর। নীলিমার উপস্থিতি টের পেয়ে অভীক দূরে সরে গেল। দরজা খুলতেই নীলিমা উদ্ধিগ্ন হয়ে চাপাস্বরে প্রশ্ন করলেন,
‘তাহিয়া কী করছে? এখনো কাঁদছে?’
অভীক ভ্রু কুঁচকাল,
‘তুমি জানো ওর কান্নার কারণ?’

নীলিমা করুণ গলায় বললেন, ‘হ্যাঁ। তোদের গ্রামে আসতে বলাটাই আমার ভুল হয়েছে। গ্রামে না আসলে তাহিয়ার এত কথা শুনতে হতো না। ‘

‘কী হয়েছে বলো তো! কে কথা শুনিয়েছে ওকে?’ প্রশ্নবিদ্ধ চাহনিতে প্রশ্ন করল অভীক। নীলিমা হাত টেনে ছেলেকে বাইরে আনলেন। তারপর সন্ধ্যার ঘটনা বিশদভাবে বর্ণনা করলেন ছেলের কাছে। সব শুনে বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে গেল অভীক। মানুষকে এভাবে মাপা হয়! কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না। তারপর নিজেকে ধাতস্থ করে বলল,

‘এখানে তাহিয়ার দোষটা কোথায়? ও কি নিজের গায়ের চামড়া নিজে লাগিয়েছে? আল্লাহর প্রদত্ত চামড়া নিয়ে দুনিয়াতে এসেছে, কালো সুন্দর হওয়ার ক্ষেত্রে ওর তো হাত নেই। তবে ওকে দোষী সাব্যস্ত করা হচ্ছে কেন এটা বুঝতে পারছি না আমি। আর ফুপি নারী হয়ে তাহিয়াকে কিভাবে অপমান করতে পারল?’

নীলিমা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,

‘কালো, সুন্দর, লম্বা,বেটে, চেহারা ভালো, খারাপ এসবে মানুষের হাত না থাকা সত্ত্বেও মানুষকে দোষারোপ করা হয়। তাকে এমনভাবে দেখা হয় যেন সে অনেক বড়ো অপরাধ করেছে, অথচ সে একবারেই নির্দোষ। সব আল্লাহর সিদ্ধান্ত, আল্লাহ মানুষকে এভাবে পাঠিয়েছে। এতে মানুষের কিছু করার নেই, নিজ থেকে রং পরিবর্তনের ক্ষমতা আল্লাহ মানুষকে দেন নি। এসব না বুঝে আমাদের সমাজ মানুষকে, বিশেষ করে মেয়েদের হেয় করার জন্য উঠে লেগে থাকে। আশ্চর্যজনক ব্যাপার কী জানিস? হেয় করা সমাজের আটানব্বই ভাগই নারী। পুরুষরা নারীদের যতটুকু সম্মান করে, তার এক ভাগ ও নারীরা নারীদের করেনা। নারীরাই নারীদের শত্রু। এই যেমন আজ তোর চাচা, ফুপা সবাই তাহিয়াকে সহজভাবে নিয়েছে। সহজভাবে নিতে পারেনি তোর ফুপিসহ কতিপয় নারী। রঙের জন্য মেয়েরা যতটা অপমানিত হয়, তার বেশিরভাগ কোন না কোন নারী থেকে হয়। আমরা নারীরাই খারাপ, দোষ দিই অন্যকে। এটাই সমাজ, এটাই রীতি। এভাবে চলতে থাকবে বছরের পর বছর।

যাক গে, তুই ওকে বুঝা। কান্না থামিয়ে পিঠা খাইয়ে দে। আজ আর বেরুনোর দরকার নেই। রাতের খাবার আমি রুমেই এনে দিব। তুই ও রুম থেকে যাস না। ওকে সময় দে।’

মায়ের কথাগুলো মনে ধরল অভীকের। আসোলেই এটাই বাস্তবতা। একটা সংসারে অশান্তির কারণ থাকে নারীরা। বউয়ের শত্রু হয় শ্বাশুড়ি, শ্বশুর হয় না। কয়টা পরিবার খুঁজে পাওয়া যাবে যেখানে শ্বশুরের অত্যাচারে গৃহবধূ অতিষ্ঠ? এ সংখ্যা বেশি না। যতটা না শ্বাশুড়ির বিরুদ্ধে মামলা হয়। জামাতা আর শ্বশুরের সাথে কথা কাটাকাটি হয়না, যতটা হয় শ্বাশুড়ি পুত্রবধূর মাঝে। মায়েরা ছেলের কাছে থাকলে বৃদ্ধাশ্রমে যায় না, ছেলের বউয়ের কাছে থাকলে যায়।
কখনো বউ খারাপ, কখনো শ্বাশুড়ি খারাপ। শ্বাশুড়ি ভাবে না সে একদিন বউ ছিল, তার অসুবিধা গুলো যেন বউয়ের না হয়। বউ ভাবে না সে একদিন শ্বাশুড়ি হবে, আজ শ্বাশুড়ির সাথে খারাপ ব্যবহার করলে কাল তার পুত্রবধূ তার সাথে ও খারাপ ব্যবহার করবে।
নারীরাই একে অপরকে বুঝেনা। বুঝলে হয়তো পারিবারিক কলহের কারণে মামলার সংখ্যাটা কমে যেত। নিরাপদে থাকতো প্রতিটা গৃহবধূ, শান্তিতে থাকতো প্রতিটা ছেলে মা। একটা কঠিন বাস্তবতা হলো, নারীরাই নারীদের জীবন নরকের কারণ হয়।সবাই এমন না। তার মায়ের মতো শ্বাশুড়ি ও আছে, তার বউয়ের মতো পুত্রবধূও আছে। অভীক প্রতিটি নামাযের মোনাজাতে দোয়া করে তার জীবনের দুই নারী যাতে মিলেমিশে থাকে, কখনো তাদের মাঝে দ্বন্দ্ব না হোক। কারণ বউ আর মায়ের ঝগড়া সবচেয়ে বেশি অসহায় থাকে ছেলে। এমন দিন না আসুক, যে তাকে একদিক বাছাই করা লাগুক। প্রিয় দুই মানুষ থাকুক হাসিখুশি, সুখে থাকুক একসাথে। ওর পরিবার আর সব পরিবারের মতো না হোক। দোয়া কবুল হচ্ছে বোধহয়, নয়তো কোন শ্বাশুড়ি বউয়ের চিন্তায় এমন অস্থির হয়? ছেলেকে অনুরোধ করে বউকে সময় দিতে?

অভীক প্রসন্ন হেসে বলল,
‘তুমি চিন্তা করো না, আমি ওকে সামলে নিব।’

নীলিমা তৎক্ষনাৎ উত্তর দিলেন না। খানিক বাদে ইতস্ততভাবে জিজ্ঞেস করলেন,
‘বিয়েটা তো আমার পছন্দ মাফিক হয়েছে। এখন তাহিয়ার গায়ের রং বা ওকে নিয়ে তোর কোন সমস্যা নেই তো? ওকে নিয়ে ভালো আছিস তুই?’

অভীক ও তৎক্ষনাৎ উত্তর দিল না। তড়িৎ মন যে উত্তর দিল তা হলো,
‘ সমস্যা এটা নয় যে, হিয়ার গায়ের রং চাপা। সমস্যা হলো এটা, শ্যামবতীর রঙে ঢঙে গুনের সাগরে আমি ডুবে গেছি, এখন উঠতে পারছিনা। আয়ত্ত করা সাঁতারটাও ভুলে বসেছি। হিয়ারানীতেই মজে আছি। সমস্যা যদি হয়, এটাই সমস্যা। আর কোন সমস্যা নেই। যদিও এরচেয়ে সুন্দর সমস্যা আমার দেখা দুটো নেই। যে সমস্যা শান্তি দেয়, উপভোগ করা যায়, প্রতিনিয়ত মুগ্ধ করে যায়, চমৎকার অনুভূতি উপহার দেয়। অন্য সমস্যা মানুষের জীবন দূর্বিষহ করে দেয়, অথচ এই সমস্যা আমার জীবনটা রাঙিয়ে দিয়েছে। নিঃসন্দেহে এটাই একমাত্র সুন্দর আর চমৎকার সমস্যা। এই সমস্যা সারাজীবন বয়ে চলতে আপত্তি নেই আমার।’

মনের উত্তর তো আর সম্মুখে দাঁড়ানো শ্রদ্ধাভাজন জননীকে দেয়া যায় না। কথা বলার স্থান কাল পাত্র আলাদা থাকে, সবাইকে সব কথা বলা যায় না। অভীক খানিক সময় নিয়ে বলল,
‘ তোমার পছন্দের উপর বরাবরই আমার সন্তুষ্টি কাজ করে। এবার বোধহয় একটু বেশি কাজ করছে। তোমার পছন্দের কোন খুঁত আজ অবধি আমি পাইনি, এখনো পাচ্ছিনা। তুমি সবসময় আমার জন্য বেস্ট কিছুই বাছাই করো। তোমার মতো এত ভালো কিছু আমার চোখে পড়ে না। তাই আমার জীবনসঙ্গিনী বাছাইয়ের দায়িত্ব তোমার কাধে তুলে দিয়েছিলাম। ইদানীং মনে হচ্ছে আমি জীবনে যদি ভালো কোন কাজ করে থাকি তবে এটাই করেছি। দায়িত্ব নিজের কাধে তুলে নিলে হয়তো এত চমৎকার কাউকে নিজের জীবনে আনতে পারতাম না। এতটা ভালো থাকাও হতো না বোধহয়। ধন্যবাদ মা, তুমি চমৎকার মানুষ , তোমার পছন্দের মানুষ ও চমৎকার।’

অভীক সরাসরি বলল না তাহিয়া চমৎকার মানুষ, সরাসরি বলল না তাহিয়াকে নিয়ে ও সুখে আছে। মায়ের উদাহরণ দিতে গিয়ে ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে সব বলে দিয়ল। নীলিমা বিচক্ষণ মানুষ। কথার প্যাঁচ থেকে কথা বের করে পড়ে নিলেন অনায়েসে। এতক্ষণে তার মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠল। এ হাসিটা, স্বস্তির, আনন্দের, ভালো লাগার। এক পক্ষ থেকে ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে এবার তাহিয়ার দিকটা দেখলেই ষোলকলা পূর্ণ হবে।
তিনি প্রাণবন্ত হেসে বলল,
‘ আমি, সমাজ, রাষ্ট্র, কে কী ভাবল সেটা বড়ো কথা না, বড়ো কথা হলো স্বামী হিসেবে তুই কী ভাবিস। তোর সন্তুষ্টিটাই আসল। বাকিসব অগ্রাহ্য। পুরো দুনিয়া এক স্ত্রীর বিপক্ষে গেলেও স্বামী যদি পাশে থাকে তবে সেই স্ত্রী সব জয় করতে পারে, সবার সাথে লড়ে উঠতে পারে। তুই ওর পাশে থাকলেই হলো। বাকি কারো কথা কানে নেয়ার দরকার নেই। মানুষের কাজই হলো বিনা বেতনে অন্যকে কথা শুনানো, হেয় করা। এখন গিয়ে ওকে বুঝা। আমার লজ্জা লাগছে ওর সামনে যেতে, নয়তো আমিই যেতাম। মনে হচ্ছে আমিই যেচে ওকে অপমানের কুয়োয় ঠেলে ফেললাম। যা এখন। সেই দুপুরে কী খেয়েছে না খেয়েছে, আর খাওয়া হয়নি। পিঠা খাইয়ে দিবি। ‘ হাতে থাকা ভাপা পিঠার প্লেট ছেলের হাতে ধরিয়ে দিলেন নীলিমা।

অভীক হাসল, হাঁটা ধরল। নীলিমা পিছু ডাকলেন। অভীক পিছু ফিরলে বললেন,
‘কাল সকালে তাহিয়ার সাথে দেখা হলে ওর হাসিমুখ দেখতে চাই আমি। কিভাবে ওর মন ভালো করবি তোর ব্যাপার।
আর শুন, কখনো চুপ থাকাই শ্রেয়, আবার কখনো প্রতিবাদ না করা মানেই বিপদকে আমন্ত্রণ করা। প্রতিবাদটা সবসময় মারামারি, কাটাকাটি কিংবা ঝগড়া ঝাটির মাধ্যমে করতে হবে এমন কথা নেই। ঘড়ির কাটা ঘুরে একই জায়গা পেরিয়ে অন্য জায়গায় যায়। হাসিমুখে সুন্দরভাবে স্থান কাল পাত্র ভেবে প্রতিবাদ করা যায়, যাতে কোন তর্ক হয় না, ঝগড়া হয় না, মারামারি কাটাকাটি হয় না, কেউ টের পায় না, সেই টের পাবে যে অপমান করে এবং সবার অগোচরে সে শিক্ষা পেয়ে যায়। এই পথ খুঁজে নিজে শিখে নিস, তাহিয়াকে শিখিয়ে দিস।’

নীলিমা চলে গেলেন। অভীক দাঁড়িয়ে ভাবল কিছুক্ষণ। কথার সারমর্ম খুঁজে পেয়ে হাসল। ঘরে গিয়ে দেখল তাহিয়া কম্বল মুড়ে শুয়ে আছে। মাথাটাও ঢাকা কম্বলে। অভীক দরজা চাপিয়ে পিঠা রাখল খাটের পাশে থাকা চেয়ারের উপর। তারপর বিছানায় বসল, কম্বল সরাল। নিঃশব্দে কেঁদে যাচ্ছে মেয়েটা। অভীক ঝুকে আলতো হাতে উঠানোর চেষ্টা করল। তাহিয়া উঠল না, আবার কম্বল টেনে শুয়ে পড়ল। অভীক আলতো স্বরে বলল,
‘হিয়া, উঠো দেখি।’

তাহিয়া উঠল না। অভীক শক্তি প্রয়োগ করে স্ত্রীকে উঠে বসাল। এক হাতে আগলে নিয়ে অন্য হাতে কম্বল সরাল। চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল,
‘যা বলার ফুপি বলেছে। আমি কি কিছু বলেছি? আমি ছিলাম ওখানে? না আমি শিখিয়ে দিয়েছি, কোনটা?’
তাহিয়া নিচের দিয়ে তাকিয়ে রইল। উত্তর দিল না। অভীক বলল,
‘উত্তর দাও হিয়া।’
‘কোনটাই না। ‘ নিশ্চুপ থেকে উত্তর দিল তাহিয়া। অভীক প্রশ্ন করল,
‘তবে আমাকে শাস্তি দিচ্ছে কেন? ‘

তাহিয়া প্রশ্নবোধক চাহনি দিল। ও কিসের শাস্তি দিল? অভীক বলল,
‘এই যে বাইরের কার না কার কথা শুনে তুমি কাঁদছো, আমার সাথে কথা বলছো না, তাকাচ্ছো না, অদ্ভুত আচরণ করছো। এটা শাস্তি না? ‘

তাহিয়ার চোখে মুখে অনুতাপের ছায়া। মিনমিনে স্বরে বলল,
‘উনারা খুব বাজে কথা বলেছেন আমায়। আমি মেনে নিতে পারছিনা। ওসব কথা ভাবতেই খারাপ লাগছে আমার। এত বাজে কথা এর আগে কেউ বলে নি আমায়। আমি তো বিয়েতে রাজিও ছিলাম না, তবে উনারা কেন বলছেন আমি আপনাকে শরীর দিয়ে বশ করেছি? উনাদের মতো আপনাদের ও কি মনে হয় আমি সত্যিই আপনার জীবন শেষ করে দিয়েছি? আমি আপনার মতো দেখতে ভালো নই। কোথায় আপনি কোথায় আমি! আপনার কি আফসোস হয়?’

অভীকের গা শিউরে উঠল তাহিয়ার কথায়। কত জঘন্য ভাষা ব্যবহার করেছে এরা! সামান্য গায়ের রংয়ের জন্য! মানুষ এত নিচু নেমে গেছে। জাহানারার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ঝরে গেল নিমিষেই। চোয়াল শক্ত হলো। ইচ্ছে হলো তৎক্ষনাৎ গিয়ে কটা কথা শুনিয়ে দিতে। কিন্তু তাহিয়ার মন খারাপের মধ্যবেলায় ওকে ছেড়ে যাওয়া ঠিক হবে না ভেবে গেল না। আপাতত তাহিয়ার মন ভালো করা মূখ্যকাজ। অভীক আলতো স্বরে বলল,

‘ আমার জীবনের প্রেমময় অধ্যায়ের এক এবং একমাত্র নারী তুমিই। তোমার আগে পরে কেউ ছিল না, নেই, থাকবে ও না। তোমার প্রতি ফুপি বিরূপ ধারণা পোষণ করে, আমি নই। তোমার এই শ্যামবর্ণের চেহারাটার মাঝেই আমি আটকা পড়ি বারেবার, সেখানে আপত্তি আর আফসোসের জায়গা নেই। তুমি আমার জীবনে শেষ করোনি বরং এক নতুন অধ্যায় শুরু করেছো। আমার সাথে হিয়ারানীক মানায় বলেই আমরা ‘বিয়ে’র মতো পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি। আমার তো মনে হচ্ছে, তুমি ছাড়া কাউকেই মানাবেনা আমার সাথে, অন্তত আমি মানিয়ে নিতে পারব না। এখন আমার তুমিটাকেই লাগবে। এই শ্যামবতীটার মাঝেই আমি ডুবে থাকব সারাকাল, এই শ্যামবতীই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী। তুমি যদি সাদা চামড়ার হতে তবে হয়তো আমার মাঝে এত মুগ্ধতা কাজ করত না, যতটা এখন করে। তোমার এই রূপই সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে আমায়। কারো কথার ধার ধারি না আমি। যে যা বলুক, আমার হিয়ারানী তুমিই। তোমাকে নিয়ে, সম্পর্ক নিয়ে আমি সন্তুষ্ট, তোমারও থাকা উচিত। আর কখনো আমাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে না, আমার মনোক্ষুণ্ণ হয়।’

সুন্দর শুনাল অভীকের কথাগুলো। তাহিয়ার মনে হলো অভীকের স্বরে মন খারাপের ওষুধ মেশানো আছে। যা শ্রবণ করলেই মন খারাপ সেরে যায়। এই যে এখন অভীকের কথার মাঝেই ওর কান্না থেমে গেল। সে স্পষ্ট টের পেল জাহানারার কথার ঘা সেরে উঠতে শুরু করেছে। কষ্টের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। মনটা ভালো হয়ে যাচ্ছে। তাহিয়া উত্তর দিল না, অভীকের বুকে মাথা রেখে একটা নিঃশ্বাস ফেলল শুধু। অভীক ওর মাথায় অধর ছোঁয়াল। তারপর আবার বলল,

‘মানুষ নানান কথা বলবে, মানুষকে হেয় করাই তাদের কাজ। তুমি যদি তাদের কথা শুনে মন খারাপ করতে বসে যাও তবে তোমার সুখে থাকা হবে না। তুমি যদি তোমার অবস্থান থেকে ঠিক থাকো তবে কারো কথা কানে তুলবে না। গায়ের রংয়ে তোমার হাত নেই, এটা আল্লাহ প্রদত্ত। এখানে তুমি নির্দোষ। তুমি তোমার অবস্থান থেকে ঠিক আছো। আল্লাহ যা করেন মঙ্গলের জন্য করেন, প্রতিটা মানুষের কালো সুন্দর হওয়ার পেছনেও মঙ্গল নিহিত আছে। মানুষের উচিত নিজ রং নিয়ে সন্তুষ্টি থাকা। তা না করে মানুষের কথা ধরে খুঁত ধরতে গেলে জীবনে সুখী হওয়া যাবে না। তুমি যদি নিজের খুঁত ধরো, অন্য একজন ও তোমার দোষ ধরার সুযোগ পেয়ে যাবে। তার পরিবর্তে যদি তুমি নিজে সন্তুষ্ট থাকো, কেউ কিছু বলতে গেলে হাসি মুখে বলো যে, ‘আল্লাহ আমাকে এভাবেই পাঠিয়েছেন, এতে তো আমার হাত নেই। আল্লাহ যা দিয়েছেন তাতেই আমি সন্তুষ্ট। আমি মনে করি সবার সন্তুষ্ট থাকা উচিত।’ দেখবে পরবর্তীতে তোমাকে কিছু বলার আগে হাজারবার ভাববে, বলবেও না। এই যে তুমি ঘরে এসে কাঁদছো, এতে কোন লাভ হচ্ছে? ফুপি কি তোমার কান্না দেখছেন? ভুল বুঝতে পারছেন? কোনটাই হচ্ছে না। ফলাফল কষলে দেখা যাবে, তোমার এই কান্নাটা একবারেই অনর্থক। আবেগগুলো অপাত্রে দান করছো। কান্না যদি করতেই হয় আল্লাহর কাছে করবে। তিনি বানিয়েছেন তোমায়, রংটাও তারই দেয়া। তাকেই বলো। দেখবে তিনি সুন্দর সমাধান করে দিবেন। অনুভূতি গুলোকে কখনো অপাত্রে দান করবে না, সুপাত্রে দান করবে। নিজেকে অন্যের কাছে এতটা নিরীহ প্রকাশ করো না, নিচু মন মানুসিকতার মানুষ হেয় করার জন্য এই মানুষগুলোকেই খুঁজে। তুমি কালো সুন্দর, বাদামী যেমনই হোওনা কেন, এটা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করো না। সগর্বে বলবে, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ যা দিয়েছেন সেটাতেই খুশি আমি। আর কখনো নিজের রং নিয়ে কাঁদতে বসবে না। আমি সহজ ভাবে নিব না। আজ প্রথম বলে রাগ প্রকাশ করলাম না। ‘

লম্বা কথা শেষ করে নিঃশ্বাস ফেলল অভীক। তাহিয়া শুনে গেল। বিস্ময় কাজ করল, এভাবে কখনো ব্যাখ্যা করা হয়নি। বর্ণ নিয়ে নাখোশ না হওয়ার সিদ্ধান্ত কষল মনে। তাহিয়া মাথা তুলল, মুগ্ধঘন স্বরে বলল,
‘আপনার ভাবনা যদি সবার হতো তবে কেউ বর্ণ বৈষম্যের শিকার হতো না। পুরো দুনিয়া আমার বিপক্ষে গেলেও আপনি আমার পক্ষে থাকলে আমি সব জয় করতে পারব। আমি আপনাকে নিয়ে ভয়ে ছিলাম, হঠাৎ মনে হলো আপনি যদি আমাকে ছেড়ে চলে যান, তবে কী হবে? হারানোর ভয় জেগেছে আমার। ‘

মায়ের বলা কথার সুর স্ত্রীর মুখে দেখে হাসল অভীক।
‘ এ ক্ষেত্রে আমি তোমার প্রেমিক নই যে, সামান্য কারণে ব্রেকাপ করে দূরে সরে যাব। আমি তোমার জীবন সঙ্গী। সুখে দুঃখে পাশে থাকা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সঙ্গী। সর্বাবস্থায় সাপোর্ট করা আমার দায়িত্ব। আমি আমার দায়িত্ব পালন করে যাব। তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। এবার একটু হাসো তো দেখি। বউটাকে একটু দেখি।’ অভীকের স্বরটা শান্ত। তাহিয়ার মনে প্রশান্তি ছেয়ে গেল। ও প্রসন্ন হাসল।

ওর হাসি পরখ করে হাসল অভীক। মনটা প্রশান্তিতে ছেঁয়ে গেছে। হাত বাড়িয়ে পিঠার প্লেট হাতে নিল। অনন্যচিত্তে খাইয়ে দিল স্ত্রীকে, নিজেও খেল।

রাতের খাবারটা তাহিয়া ঘরেই খেল। তাহিয়াকে রেখে অভীক গেল চাচাদের সাথে খেতে। চাচা, চাচী, ফুপা, ফুপি, চাচাতো ভাইবোন, ফুপাতো ভাইবোন সবাই শীতলপাটিতে পাশাপাশি সারি বেধে বসল। নীলিমা, রেহামা বেড়ে দিচ্ছেন খাবার। জাহানারা বসেছে অভীকের বিপরীত দিকে। চারপাশ তাকিয়ে তাহিয়াকে খুঁজলেন। না দেখে বললেন,
‘ভাবি , তোমার পোলার বউ আহে নাই খাইতে?’

নীলিমা উত্তর দিলেন, ‘নাহ, ওর শরীরটা ভালো লাগছেনা। ঘরেই খেয়েছে।’

জাহানারা মুখ ভেংচি কাটলেন, ‘ নখরাও তো কম না। চাল চলন ও ভালা না। কী দেইখ্যা যে আনলা এই বউ! ‘

থেমে ভাতিজার উদ্দেশ্যে বললেন,
‘হ্যাঁ রে অভী, তুই ফুপিরে ফোন দিতি, হুরের মতন মাইয়্যা আইন্না দিতাম। ভাবি জোর কইরা এই মাইয়া ঝুলাইছে তোর গলায়? কেমনে রাজি হইলি? তোর লগে মানাই নাই এক্কারে। কানা আবার কালাও, দেখতে কিরাম লাগে! ‘

অভীক ভ্রু কুঁচকাল। ওর পাতে রুই মাছের লেজ তুলে দিয়েছেন রেহানা। রুই মাছের লেজে কাটা বেশি থাকা। কাটা বাছতে বাছতে বলল,
‘রূপ দিয়ে জীবন চলে না ফুপি। রূপটা ফটো ফ্রেমটা রাঙানোর জন্য লাগে, নাহয় চারদেয়ালের সংসারে গুনটারই দরকার হয়। সুন্দর মানুষ খারাপ হলে তাকে খারাপই ধরা হয়, সুন্দর বলে কি তার খারাপটাও ভালো হয়ে যায়? হয়না। এই যেমন ধরুন, তাহিয়াকে আপনি অপমান করলেন, আপনি দেখতে মাশা আল্লাহ অনেক সুন্দর। এখন আপনার সৌন্দর্য দেখে কি তাহিয়া আপনার কথাগুলো সহজ ভাবে নিতে পারবে? আমার রাগ হলে আমি কি শুধুমাত্র আপনার ফর্সা চামড়া দেখে রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারব? পারব না। কারণ ভালো ভালোই হয়, খারাপ খারাপই। এখানে রূপ দেখা হয়না। সংসার, জীবনও এভাবে চলে। সংসারটা রূপে হয়না, গুনে হয়। মায়ের গুনী মানুষ পছন্দ। তাহিয়া সেই কাতারেই পড়ে। আর মায়ের পছন্দেই আমার পছন্দ। আমি দেখে শুনেই বিয়ে করেছি। তাহিয়া রাজি ছিল না ওকেই জোর করে বিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন আলহামদুলিল্লাহ সুখে আছি। সংসারে রূপ থেকে সুখটাই আসল। তাই না মা?’

সুযোগ বুঝে হাতছাড়া করল না অভীক। ষোলকলা পূর্ণ করল। কথার রেশ আবার মায়ের দিকে টানল।
নীলিমা মুখ চেপে হাসলেন। তারপর বললেন,

‘হ্যাঁ, ঠিক তাই। রূপই সবকিছু হলে জাবিনও সুখে থাকতো। কত রূপসী মেয়েটা! কাল কে যেন বলল, ওর স্বামী নাকি পরকীয়া লিপ্ত। ঘরে সুন্দরী বউ রেখে কোন ভাবীর সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে আছে। আবার শ্বাশুড়িকে মারধরের অভিযোগ আছে না কি জাবিনের। রূপে ভার হলে মানুষকে ভারি প্রমাণ করা যায় না। জাবিনের রূপ কাজে এলো না। এত বুঝা গেল রূপই সব না। আমি ভাই, রূপে নয় গুনে বিশ্বাসী। তাহিয়ার মনটা বেশ ভালো, ও সবাইকে সুখে রাখবে, অন্তত এইটুকু বিশ্বাস রাখতে পারি। আমি, অভীক, আমার পুরো পরিবার সন্তুষ্ট ওকে নিয়ে। বাকি সবাই সম্মান না করলেও অসম্মান করতে পারবেনা। ‘

জাহানারার মুখটা চুপসে গেল। মেয়ের কথা আসায় মুখে কুলুপ এঁটেছেন তিনি। অভীকের বড়ো চাচা রাশেদ কবির বললেন,
‘ অভীকের বউ ত দেখতে শুনতে মাশা আল্লাহ। আদব কায়দা ভালা, সালাম দিয়া কতা কইল। ভাবি আপনে হক কতা কইছেন, রূপ দিয়া সংসার চলে না। ‘

বাকিরাও সায় জানালেন। জাহানারা চুপসে বসে রইলেন। অভীক খাওয়া শেষে উঠতে গিয়ে বলল,
‘ আমি মনে করি, একটা মানুষকে পছন্দ না হলে তাকে সম্মান দেয়া যায় না। কিন্তু তাকে অসম্মান করাও ঠিক না। কটু কথা বলে তাকে হেয় করাটা উচিত নয়। তার সামনে কিংবা পিছনে অশ্রাব্য ভাষা ব্যবহার করা ঠিক না, যাতে মানুষটার কোন দোষ নেই, অপবাদ দেয়া ব্যাপারের কোন সত্যতা নেই। এমন উদ্ভট কথা মানা যায় না, মানতে না পারলেই সমস্যা। মানুষের এ দিকগুলো খেয়াল রাখা উচিত। পরে আবার হিতে বিপরীত হতে পারে। আগে থেকে সতর্ক থাকা ভালো।’

অভীক চলে গেল। ওর কথার তীর কোন দিকে গেল কেউ টের পেল না। জাহানারা কথার তীরটা তার দিকে আসতে দেখলে ঠিকই। তিনি স্পষ্ট ধরতে পারলেন অভীককে তাকেই শাসিয়ে গেছে।

চলবে….

#প্রেমোদ্দীপক।
আফিয়া খোন্দকার আপ্পিতা

পর্ব-২৬। (বাড়তি অংশ)

শৈত্য প্রবাহ চলছে। ধূসর কুয়াশার ধুম্রজালে ঢেকে গেছে প্রকৃতি। কিছুই দেখা যাচ্ছেনা। চাষা ছেলে চাদর গায়ে জড়িয়ে ছুটে চলছে খেজুর গাছের দিকে। খেজুর গাছের আগা কেটে মাটির কলস বেধে এসেছে রাতে। মিষ্টি রসে ভরতি হয়ে গেছে এতক্ষণে। রস নিয়ে হাটে নিয়ে বিক্রি করে দিবে। বেশ ভালো আয় হয় এতে। রাখাল ছেলে গোয়াল থেকে গরু ছাগল বাধা রশির বাধন খুলে হাঁটা ধরেছে মাঠের দিকে। ঠান্ডার প্রকোপে রক্ত জমাট বাধার উপক্রম।
এই শীতাতপ সকালে অভীক-তাহিয়া হাঁটছে গ্রামের মেঠোপথ ধরে।
সকাল তখন সাড়ে ছ’টা। তাহিয়া ঘুমাচ্ছিল, অভীক কাঁচা ঘুম ভাঙিয়ে তুলে এনেছে। ঘুম ঘুম স্বরে তাহিয়া যখন কারণ জিজ্ঞেস করল তখন অভীক ব্যস্ত ভঙ্গিতে গায়ে লেদার জ্যাকেট চাপাতে চাপাতে উত্তর দিল,
‘ শীতে গ্রামে এসে শীতের সকাল উপভোগ না করলে গ্রামে আসাটা বৃথা। দ্রুত তৈরি হয়ে নাও।’

তাহিয়া ঘুম ঘুম চোখে কোনমতে কুর্তির উপর হুডি জড়াল। অভীক এসে উপরে চাদর আর চশমা পরিয়ে দিল। মাথায় উইন্টার ক্যাপ পরিয়ে বলল, ‘বাইরে অনেক শীত, ঠান্ডা লেগে যাবে।’

সবশেষে প্রিয়তমাকে নিয়ে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। উঠোন বাড়িতে মানুষের আনাগোনা নেই। বাড়ির রাস্তা পেরিয়ে গ্রামের মেঠোপথে নামল। তাহিয়ার চোখে ঘুম, তাকাতে পারছে না। চোখ বন্ধ করে হাটছে, অভীক ওর বাহু ধরে এগুচ্ছে। একবার পথ দেখছে, আরেকবার প্রিয়তমাকে দেখছে। চোখ বন্ধ করে হাটতে গিয়ে পড়ে যাচ্ছে না তো!

কিছুদূর এগুনোর পর তাহিয়া আধো চোখ খুলে একবার পরখ করল। আর বন্ধ করল না, পলক ফেলতে ভুলে গেল। আশ্চর্য! কী দেখছে ও! মীরার বলা সেই সকাল! দু’পাশে ধানের ক্ষেত, সোনালী ঘাসের ডগায়, সোনালি ধানের গোছা। একটু পরখ করলে দেখা যায়, প্রতিটা ধান গাছের ডগায় স্থবির শিশির বিন্দু। মাঝে মেঠোপথ। পথের দুই ধারে সারি সারি খেজুর গাছ দাঁড়িয়ে আছে অবলীলায়। প্রতিটা গাছের ডগায় একটা করে মাটির কলস বাধা। চাষা ছেলে কলস নামাচ্ছে, কেউ বা আবার কলস হাতে নিয়ে এগুচ্ছে বাড়ির দিকে, হাটের দিক। কেউ খাবে, কেউ বিক্রি করবে।
পায়ে পায়ে এগুতে এগুতে মুগ্ধচোখ পরখ করল তাহিয়া। বাংলার এই রূপটা ওর বড্ডো অচেনা, অদেখা। প্রথম দেখায় বিমুগ্ধ, বিমোহীক। শীতকালের এই নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যটা তাহিয়ার চোখ থেকে ঘুম কেড়ে নিল। আনমনে বলল,
‘কী সুন্দর! ‘

‘শীতের সকালের আসল সৌন্দর্য হলো গ্রামে। শহরে এত রূপ রঙ নেই। সামনে চলো, দেখবে আরও কত কী দেখতে পাবে!’ অভীক বলল। তাহিয়া মুগ্ধ চোখে দেখে গেল, পা বাড়াল।

মাঝে মাঝে এক দুইটা সাইকেল সাঁ সাঁ করে চলে আসছে। এরা সকাল সকাল ছাত্রছাত্রী পড়াতে যাচ্ছে। খানিক বাদে দেখা গেল, এক ঝাক বাচ্চা ছেলেমেয়ে দলবেধে গ্রামের পথ ধরে হেটে আসছে, সবার গায়ে গরম কাপড়, ছেলেদের মাথায় টুপি, মেয়েদের মাথায় ঘোমটা টানানো। বুকে একটা বই আঁকড়ে ধরা। সবার চোখ ঘুম, অথচ মুখে হাসি। হাসি আড্ডা দিতে দিতে এগুচ্ছে। তাহিয়ার সুন্দর লাগল। এদের সম্পর্কে জানতে কৌতুহলী হলো মন। ও ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
‘এত সকালে বাচ্চাগুলো কোথায় যাচ্ছে?’
‘ যাচ্ছে না আসছে। স্থানীয় মসজিদে ফজরের পর ছোটো বাচ্চাদের কুরআন শিখানো হয়। ইমাম সাহেব শেখান। বাচ্চাগুলো ওখান থেকে আসছে। ‘

তাহিয়া অবাক হলো। এমন কিছু শুনেনি ও। শহরে সাধারণত গৃহশিক্ষক রেখে কিংবা নূরানী মাদ্রাসায় ভরতি করিয়ে কুরআন শিখানো হয়। ও যখন ছোটো ছিল, তখন মাহমুদা আরবি শিক্ষক রেখে কুরআন শিখিয়েছিলেন ওকে, তুহিনকেও এভাবেই শিখানো হয়েছে। ভিন্নতা দেখেনি। এভাবে শেখানো হয় জানতো না ও। বিস্মিত স্বরে প্রশ্ন করল,
‘ আজ প্রথম শুনলাম। ভিন্ন পদ্ধতি। ‘

অভীক নিজ থেকে বলল,
‘ নব্বই দশকে এই পদ্ধতিতে বাংলাদের প্রতিটা গ্রামের প্রতিটা মসজিদে কুরআন শিখানো হতো। বিংশ শতাব্দীর শুরুতেও ছিল এ নিয়ম। তারপর প্রযুক্তির আদলে চলে আসায় মানুষ ঘর বন্দি হয়ে গেছে। মসজিদে না পাঠিয়ে গৃহশিক্ষক রেখে ঘরে পড়ায়। তবে এখনো প্রত্যন্ত গ্রামগুলো এই রীতি বজায় আছে। আমাদের গ্রামটা একবারেই প্রত্যন্ত অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। এখনো অনেক ঐতিহ্য প্রথা প্রচলিত আছে। এটাও তেমন একটা নিয়ম। ‘

কথা বলার মাঝে বাচ্চাগুলো পাঠ কাটিয়ে চলে গেল। তাহিয়া মাথা ঘুরিয়ে মায়াবী মুখ করে বলল,
‘এটুকুনি বাচ্চাগুলো ঘোমটা দিয়ে হেটে বেড়াচ্ছে। কী কিউট লাগছে! চোখে ঘুম, অথচ ঠোঁটে হাসি। কী সুন্দর! ‘

অভীক ও এদের দিকে তাকাল একবার। তারপর তাহিয়ার দিকে তাকাল। সফেদা কুর্তির উপর খয়েরী হুডি পরেছে তাহিয়া। মাথায় উইন্টার ক্যাপ, তারউপর হুডির ঘোমটা টানানো। পকেট্র হাত গুজানো। ঘুমজড়ানো ফোলা চোখ, তারউপর চশমা। মুখে ও একটা ফোলাভাব। প্রসাধনীহীন মুখটায় উৎফুল্লতার আভা,ঠোঁটের কোণে হাসি। মায়াবী লাগছে। কথা বলার ভঙ্গিটা ওর সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে। অভীক আনমনে হাসল। তারপর বলল,
‘আসোলেই কিউট’

তাহিয়া বুঝল না। ওর দৃষ্টি বাচ্চাদের যাওয়ার দিক। কয়েক কদম বাড়িয়ে বাচ্চাগুলো কুহেলিকার অন্তরালে হারাল। তাহিয়া মাথা ঘুরাল। হাঁটা ধরল।
কয়েক কদম বাড়ানোর পর রাস্তার পাশে টং দোকান চোখে পড়ল। অভীক বলল,
‘এখানকার চায়ের টেস্ট ভালোই। ট্রাই করবে?’

তাহিয়া বিস্ময়ের সাথেই সায় জানাল। রাস্তার পাশে টং দোকানে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে শীতের সকাল উপভোগ করার আনন্দটাই অনন্য, এটা আজ অনুভব করল তাহিয়া। পরিবেশটা চমৎকার, চায়ের স্বাদটাও অমৃত, পাশে বসা মানুষটাও প্রিয়তর প্রেমপুরুষ। এর চেয়ে চমৎকার স্থান কাল পাত্র আর দুটো হয়? উত্তরটা নেতিবাচক।

চায়ে চুমুক দেয়ার মাঝে অভীক জিজ্ঞেস করল,
‘ কাঁচা ঘুম থেকে তুলে আনার কাজটা ঠিক হলো?’
‘ তা আর বলতে? চমৎকার কাজ হয়েছে। না এলে কত কী মিস করতাম?’

তাহিয়া উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল। অভীক হাসল। বলল, ‘ভালো লাগছে?’
তাহিয়া উত্তর দিল না। প্রাণবন্ত হাসল। অভীক উত্তর পেয়ে গেল। বলল,
‘যাক, নিয়ে আসাটা সার্থক। ‘

চা খেয়ে উঠার সময় তাহিয়ার চা খাওয়া কাপটা চড়া দামে কিনে নিয়ে নিল অভীক। তাহিয়া ভ্রু কুঁচকাল। অনেক খুঁজে ব্যাখ্যা বের করতে পারল না। দোকানিকে বলে কাপটা ধুয়ে নিল, তার বেরিয়ে এলো অভীক। আবার হাঁটা ধরল। তাহিয়া প্রশ্ন করল,
‘কাপটা কিনে নিলেন কেন?’

অভীক হেসে বলল, ‘সারপ্রাইজ। ‘
‘কিসের সারপ্রাইজ!’ ভ্রু নাড়াল তাহিয়া। অভীক বলল,
‘বলে দিলে সারপ্রাইজ থাকল কী?’

পরাস্থ তাহিয়া কথার সারমর্ম বের করতে করতে হাঁটা ধরল। এক চাষার ছেলে কলসি হাতে ওদের পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিল। অভীক থামিয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘রস কেনা যাবে?’

ছেলেটা সায় জানাল। অভীক ছেলেটাকে টাকার পরিমাণ জিজ্ঞেস করে পরিশোধ করল। তারপর মাটির কলস থেকে এক কাপ রস ঢেলে নিল টং দোকান থেকে কিনে আনা কাপে। বাকিটা ছেলেটাকে দিয়ে নিজের বাড়িতে পাঠিয়ে দিল। ছেলেটা যেতেই কাপটা তাহিয়ার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
‘ শীতের সকালে গ্রামের রাস্তায় হাঁটতে বের হলে খেজুর রস খাওয়া বাধ্যতামূলক। খেয়ে দেখো, দারুণ স্বাদ।’

কাপ হাতে নিয়ে তাহিয়া বলল, ‘এটাই সারপ্রাইজ? ‘ অভীক সায় জানাল। তাহিয়া ইতঃপূর্বে এভাবে রস খায়নি। ইতস্ততভাবে কাপে চুমুক দিল। অমৃত স্বাদ লাগল জিহ্বায়। একবারে মিষ্টি, অন্যরকম স্বাদ। পরপর কয়েক চুমুক দিয়ে বলল,
‘মজা তো! আমি কখনো খাইনি। মীরার কাছে শুনে আমার এমন সকাল উপভোগ করার অনেক ইচ্ছে ছিল। ধন্যবাদ।’

‘তোমার ভালো লেগেছে, এতেই হবে। ধন্যবাদ লাগবেনা।’ হেসে বলল অভীক। তাহিয়া অভীকের দিকে কাপটা বাড়িয়ে দিল,
‘আপনি একটু খেয়ে দেখুন। অনেক মজা।’

অভীক মিষ্টিজাতীয় খাবার খায় না। ছোটোবেলায় একবার রস খেয়েছিল, ইদে বাড়ি এসে। তারপর আর খাওয়া হয়নি। ইচ্ছে হয়নি খেতে, আজ ইচ্ছে হলো। কাপ হাতে নিল, এক চুমুক নিল তাহিয়ার চুমুকের স্থানে। কোন এক ইসলামিক বইতে পড়েছিল, রাসূল (সাঃ) এভাবে খেতেন। এতে নাকি সাওয়াব পাওয়া যায়। চুমুক দিতে গিয়ে মনে পড়ল কথাটা। সুযোগ পেয়ে হাতছাড়া করল না অভীক। পদ্ধতি অবলম্বন করল। এতে সাওয়াব হলো, দৃশ্যটা ও সুন্দর হলো, স্ত্রী ও খুশি হলো। স্বামীদের কত সুবিধা দিয়েছেন আল্লাহ! অভীক হাসল। কাপটা তাহিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিল। তাহিয়া এক চুমুক নিল।
উৎফুল্লতার সাথে বলল,
‘আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সকাল এটা। এতদিন শুধু শুনেছি। আজ কাছ থেকে দেখলাম। এত সুন্দর কেন?’

অভীক হেসে বলল, ‘তোমার নজর সুন্দর আর নতুনত্ব মাখা বলে তোমার চোখে সব কিছু সুন্দর দেখায়। এই এলাকার কাউকে বলে দেখো, মুখ কুঁচকে বলবে, এইডায় ভালার কী আছে?’

‘আসোলেই সুন্দর। আমার তো ইচ্ছে করছে এখানেই থেকে যাই।’ আনমনে বলল তাহিয়া। অভীক মজার স্থলে বলল,
‘ ঠিক আছে। এবার যাওয়ার সময় তোমাকে রেখে যাব। তুমি স্বামীর ভিটায় সংসার সাজাবে। আমি টাকা পাঠিয়ে দিব, নিজে রেঁধে বেড়ে খাবে। গোয়াল ভরা গরু ছাগল থাকবে, মাঠভরা ধান থাকবে, খড় ভরা হাঁস মুরগী থাকবে, কোলভরা বাচ্চা থাকবে। পড়াশোনা তো হবে না। তারপর বরং পড়াশোনা বাদ দিয়ে এসব সামলাও তুমি। আমি না হয় মাসে একদিন এসে উঁকি মেরে দেখে যাব। ভালো হবে না?’

‘হাঁস মুরখী,গরু ছাগল!’ পালবে তাহিয়া! দেখলেই ভয় লাগে ওর। আঁতকে উঠে বলল,
‘ না বাবা, আমি একবারে থাকব না। মাঝে মাঝে ঘুরতে আসব তাতেই হবে। ‘

অভীক শব্দ করে হেসে বলল, ‘গ্রামীণ বউ হওয়ার শখ মিটে গেছে?’

‘শহুরে বউ হওয়ার চেয়ে গ্রামের বউ হওয়া কঠিন। কথা আর কাজ দুটোর মাত্রা বেশি থাকে। গ্রামের মানুষ একে অপরের দোষ ধরে বেশি, অজ্ঞতাবশত কত কী চাপানো হয় মানুষের উপর। আমি এতসব সইতে পারব না। নাহ, বাবা আমি শহরেই ঠিক আছি। ‘
মজার স্থলে তাহিয়া কথা বলল। অভীক বিড়বিড় করল, ‘শহর থেকে জাহানারা বেগমদের উপস্থিতি গ্রামে বেশি। এই জন্যই বোধহয় শহর থেকে গ্রামীণ নারীর জীবন কঠিন বেশি। ‘

তাহিয়া শুনল না সে কথা। আবার হাঁটা ধরল । কিছুদূর যেতেই দেখল কুয়াশার মাঝে দৃশ্যমান হলো একটা গরু। ওদের থেকে কিছুটা দূরেই রাস্তার উপর একটা গরু দাঁড়িয়ে আছে, গরুর দৃষ্টি ওদের দিকেই। মাথায় বড়ো বড়ো শিং। বাঁধন ছেড়ে পালিয়ে এসেছে বোধহয়। তাহিয়া তড়িৎ দাঁড়িয়ে গেল, চোখে মুখে ভয় দেখা দিল। তা দেখে অভীক বলল,
‘তুমি দাঁড়াও, আমি তাড়িয়ে দিয়ে আসি।’

অভীক কদম বাড়াল। তাহিয়া ওর জ্যাকেট ধরে ফেলল। যেতে বাধা দিয়ে বলল,
‘যাবেন না, আপনাকে কামড় দিবে।’

তাহিয়ার চোখে ওর জন্য চিন্তা দেখে ভালো লাগছে অভীকের। ও হেসে বলল,
‘গরু কামড়ায় না, গুতো দেয়। ‘

‘যাই হোক। আপনি যাবেন না। শুনেছি, এগুলো খুব ভয়ংকর হয়। গুতো দিয়ে নাকি নাড়িভুড়ি বের করে ফেলে। প্লিজ, আপনি যাবেন না! একদম না। আপনার কিছু হলে আমি মরেই যাব।’ ভীত মনে কত কী বলে গেল তাহিয়া। অভীক আবার হাসল। আজ এত ভালো লাগছে কেন? প্রিয়জনের চোখে চিন্তার রেখাও সুন্দর দেখায়, প্রশান্তি টানে।

‘আরে, কিছু হবে না তো! কাছে গিয়ে একটু তাড়ালেই মাঠে চলে যাবে। তারপর আমরা অনায়েসে রাস্তা পেরিয়ে যেতে পারব। তুমি দাঁড়াও, আমি যাব আর আসব।’
অভীক যেতে নিল। তাহিয়া আটকাল। শক্ত করে ওর বাহু খামচে ধরে রাখল। শাসনের সুরে বলল,
‘বিপদ বলে কয়ে আসেনা। আঘাত করে ফেললে কী করবেন? আমি কোন রিস্ক নিতে চাইছিনা। যাবেন না মানে যাবেন না। কোন ঘুরাটুরা লাগবে না, অনেক ঘুরেছি। এবার বাড়ি ফিরব। দরকার হলে কাল আবার আসব। এখন চলুন।’

তাহিয়ার কড়ার সুরের শাসনটা এত মধুর শোনাল কেন? এত ভালো লাগল কেন অভীকের? স্বামীদের শাসন থেকে স্ত্রীদের শাসনে যত্ন আর কোমলতার পরিমাণ বেশি থাকে বলে? হতে পারে। অভীক কথা বাড়াল না। সম্পর্কে একে অপরের মন পেতে হলে শুধু যে স্ত্রী স্বামীর কথা অনুযায়ী চলবে এমনটা নয়, স্বামীদের ও স্ত্রীর কথা শুনতে হয়, সে অনুযায়ী চলতে হয়। এটাকে সমাজ খারাপ বললেও ইসলাম বাহ্বা দেয়। অভীকের কথা বাড়াতে ইচ্ছে হলো না। সে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
‘যথাজ্ঞা হৃদয় রানী মহাশয়া।’

তাহিয়া স্বামীর হাত ধরেই ফিরতি পথে পা বাড়াল।
কিছুদূর হেটে পিছু ফিরে চাইল, নাহ, গরুটাকে দেখা যাচ্ছে না। হাফ ছাড়ল তাহিয়া । ভয় কেটে গেছে ওর। নিশ্চিন্তমনে হাঁটছে ও। পাশে অভীক হাঁটছে, প্রশান্ত মনে। জীবনে কত হাজার সকাল পার করেছে, এতটা সুন্দর এতটা প্রশান্তিদায়ক, এতটা প্রেমময় সকাল দুটো পায়নি। আজই প্রথম। আজই শেষ না হোক, চলতে থাকুক।

তাহিয়ার মনটা ফুরফুরে। প্রকৃতি উপভোগ করতে করতে এগুচ্ছে। আকস্মিক কী ভেবে অভীকের দিকে তাকিয়ে একটা চমৎকার প্রশ্ন রাখল,
‘আমি বিয়ের কথা কলেজে জানিয়ে দিই?’

অভীক অবাক হয়ে চাইল কিছুক্ষণ। তারপর বিস্তৃত হাসল। বলল,
‘ কেউ যদি মজা করে? ‘
‘আমি পরোয়া করিনা। আমি বিয়ে করেছি, চুরি করিনি যে ভয় পাব। ‘

দৃঢ়স্বরে বলল তাহিয়া। অভীক এই সময়ের সাথে মিলাল বিয়ের দিনে ওদের সাক্ষাতের কথা। যখন ও বলেছিল সবাইকে জানিয়ে দিবে, তখন তাহিয়ার চেহারা ভয়ে রক্তশূন্য হয়ে গিয়েছিল। অথচ আজ সেই তাহিয়াই দৃঢ়স্বরে বলছে লোক জানানোর কথা, কারো কথার কানে তুলে না সে। মানুষটা কি বদলেছে? নাহ, বদলায় নি। আগের মানুষটাই আছে। মানুষ বদলায় না, সময় বদলায়, অনুভুতি বদলায়। তখন সব বদলে যায়। এই যে এখন বদলে গেছে।
আজ আনন্দরা ঝাকে ঝাকে আসছে অভীকের ভাগ্য ভান্ডারে।
সেই আনন্দে আন্দোলিত হয়ে অভীক আবার প্রশ্ন করল,
‘এত তাড়াতাড়ি লোক জানাজানির ভয় শেষ হলো কীভাবে? ‘

‘আপনি থাকতে দিয়েছেন?’ প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্ন করল তাহিয়া। অভীক হাসল আবার। ভ্রু উঁচিয়ে প্রশ্নপর্বের চেইন টানল,
‘ আমি দিই নি?’

তাহিয়া সন্দেহী চোখে তাকিয়ে বলল,
‘তা নয়তো কী? আমি তো বিয়েতে রাজিই ছিলাম না, বিয়ের কদিনেই কিভাবে কিভাবে যেন হিপনোটিজম করে ফেলেছেন আমায়। অবনী আপুর বাসায় নিয়ে মায়ায় বশ করে জীবনটাকে আপনিময় করে ফেলেছেন। তারপর তো আমার আমিটাই বিলীন হয়ে গেছে, কীসব পাগলামী করে যাচ্ছি। এতে আমি নিরপরাধ, আপনিই অপরাধী।’

অভীক সুন্দর ভঙ্গিমায় বলল, ‘এই অপরাধে অপরাধী হয়ে অপরাধবোধ থেকে আমার অপরাধ আমি স্বীকার করছি সজ্ঞানে, অনায়েসে। কারণ এর চেয়ে সুন্দর অপরাধ আর দুটো নেই। আমি সারাজীবন এই অপরাধে অপরাধী হয়ে থাকতে চাই।’

‘আমিই অপরাধী করে যাব। যাক গে, এখন উত্তর দিন, সবাইকে জানিয়ে দিব আমি আপনার হওয়ার কথা?’
আগ্রহী হয়ে জানতে চাইল তাহিয়া। অভীক ভ্রু কুঁচকাল। মেয়েটা আজকাল একটু বেশি সুন্দর করে কথা বলছে না? এভাবে কথা বলার কি খুব দরকার? মায়ার পাহাড় বানাচ্ছে, পরে এই মায়া ওকে শাসন করতে দিবে না। ফলাফল, পরীক্ষায় খারাপ করবে।
অভীক দায়সারা উত্তর দিল,

‘ তোমার ইচ্ছে হলে দিতে পারো। আমার আপত্তি নেই। জোরও নেই। এটা তোমার নিজস্ব মতামত। ‘

অথচ ওর ভেতরটা জানে, তাহিয়ার সিদ্ধান্তে কতটা খুশি হয়েছে ও। এই দিনটার অপেক্ষা করছিল বিয়ের আগ থেকে। বাইরে বের হলে তাহিয়ার অসম্মান নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় থাকে প্রতিনিয়ত। এই বুঝি ওদের একসাথে দেখে কেউ খারাপ ভেবে বসল, তাহিয়াকে খারাপ বলে ফেলল। এবার নিশ্চিন্তে থাকা যাবে। অভীক স্বস্তির নিঃশ্বাসটা ফেলল খুব সচেতনে, যাতে তাহিয়া টের না পায়।

কথা বলতে বলতে বাড়ির দরজায় এসে থামল ওরা। বাড়ির গেটে একটা ধূসর কার দাঁড় করানো। কারটার দিকে চোখ যেতেই অভীক আকস্মিক শব্দ করে হেসে উঠল। তাহিয়া কারণ জিজ্ঞেস করলে বলল,
‘গাড়িটা দেখছি।’
‘তো এতে হাসির কী আছে? ‘
‘গাড়িটা কার জানো?’
‘নাহ, কার?’
‘তানভীর ভাইয়ের। ‘

তানভীর ভাই মানে তো অবনীর স্বামী। উনি এসেছেন? উনার আসা মানে অয়নের ও আসা। তাহিয়া হাঁটা থামিয়ে দিল। বলল,
‘আমি বাড়ি যাব না। একদম না।’

অভীক হাসতে হাসতে বলল, ‘আরে চলো, সুন্দর একটা দৃশ্য দেখা হবে আমার।’

তাহিয়া দাঁড়িয়ে থেকে বলল,
‘আমি আবার যাব ওদিকে। আজ বাড়িই ফিরব না। আপনার ওই পাজি ভাগ্নের সামনে পড়ব না আমি। কিসব কথা বলে আমার লজ্জা লাগে। বাড়ি ভরতি লোক, সবার সামনে আমি লজ্জায় পড়ব। আমি যাব না।’

‘কী বলে? আমায় বলো দেখি আমিও একটু লজ্জা পাই।’ না জানার ভান করল অভীক। তাহিয়া কপট রাগ দেখিয়ে বলল,

‘ পারব না। আপনার ভাগ্নে আপনি ম্যানেজ করুন । আমি নেই। আমি গেলাম।’ তাহিয়া যে পথে এসেছিল সে পথে হাঁটা ধরল। অভীক অনুসরণ করল স্ত্রীকে।
হাসি চেপে বলল,
‘ অয়ন এবার জন্মদিনে তোমার কাছে উপহার চাওয়ার পর আমার কাছ থেকে ও উপহার নেয়নি। আমি মোটরবাইকার কিনে দিয়েছিলাম, ফেরত দিয়েছে। নিবে না, ওর বোনই লাগবে। আমার উত্তর ওর পছন্দ না, মামীর কাছ থেকে উত্তর ও লাগবে, বোন ও লাগবে। একটা বোন দিয়ে দাও, এত করে বলছে। ‘

অভীককে পরখ করে তাহিয়া চোখ রাঙাল,
‘আপনি ও মজা করছেন?’

‘একদম না।’ হাসি থামিয়ে বলল অভীক। তাহিয়া হাঁটার গতি বাড়াল। অভীক বলল,
‘আরে বাড়ি চলো, সবাই বোধহয় আমাদের অপেক্ষা করছে।’
‘যাব না।’
‘যাবে।’ অভীকের দৃঢ় স্বর। তাহিয়া চোখ ছোটো ছোটো করে বলল, ‘আমি যাব না। ‘
‘আমি নিয়ে যাব।’
‘কিভাবে?’

অভীক বাঁকা হাসল,
‘ যেভাবে বহুবছর আগে নিয়েছিলাম সেভাবে।’

তাহিয়া বুঝল না। জন্মের পর অভীকের সাথে ওর তো দেখাই হয়নি বলতে গেলে। অভীক থাকতো হোস্টেলে, হলে। মাহমুদার বাসায় আসতো না কখনো। রেজাউল সাহেবের চাকরিসূত্রে অভীকরা থাকত টাঙ্গাইল, তাহিয়ারা তার বিপরীত দিক। দুরত্বের কারণে দুই বান্ধবীর দেখা হতো না। অনেক বছর পর রেজাউল আহমেদের চাকরিসূত্রে ওদের শহরে এসেছিল। তখন তাহিয়া বেশ বড়ো। নীলিমার বাসায় যেত না, মাহমুদা একাই যেতেন আসতেন, অভীক ও আসতো না। কলেজে পড়াকালীন সময়েই জেনেছে অভীক যে নীলিমার ছেলে। এর আগে অভীককে ভালো করে চিনত ও না। তবে অভীক কখনকার কথা বলছেন? তাহিয়া ভ্রু কুঁচকাল।
থেমে প্রশ্ন করল,
‘কলেজে যাওয়ার আগে তো আমাদের দেখাই হয়নি। তবে আপনি কী ইঙ্গিত দিচ্ছেন?’

‘ কলেজে যাওয়ার বহু আগে ও কিন্তু আমাদের দেখা হয়েছে।’

‘ প্রথম কবে এবং কোথায় দেখা হয়েছিল?’ প্রশ্নবিদ্ধ চাহনিতে প্রশ্ন করল তাহিয়া। অভীক ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে বলল,
‘ যখন তুমি ভুবনে পা রেখেছিলে তার কয়েক ঘন্টা পরে দেখা হয়েছে আমাদের। হাসপাতালের বেবি সিটে। আন্টিকে দেখতে গিয়ে আমাকে তোমার সিটের কাছে নিয়ে মা বললেন, ‘এটা তোর মাহমুদা আন্টির মেয়ে। আমাদের প্রিন্সেস। ‘ তুমি তখন ঘুমাচ্ছিলেন। ছোটো ছোটো হাত পা, মায়াভরা চেহারা ভীষণ সুন্দর লাগছিল। আমি গালটা ছুঁয়ে দিলাম। ওমনি পুরো দুনিয়া কাঁপিয়ে কান্না জুড়ে দিয়েছিলে তুমি। ‘

তাহিয়া অবাক চোখ চাইল অভীকের পানে। এসব কথা জানত না ও। অভীক আবার বলল,

‘ আমি কানে হাত দিয়ে মাকে জিজ্ঞেস করলাম, ”প্রিন্সেস এত কান্না করে কেন।” মা বলল আমার কোলে আসার জন্য কান্না করছিলে। তারপর যখন কোলে নিলাম তখন আমার পুরো মুখে নখের আঁচড় বসিয়ে লাল করে দিয়েছো, চুল টেনে ছিঁড়েছো । যখন ছাড়াতে গেলাম হাত ধরে ফেললে, আর ছাড়লেই না। এই যে কোলে উঠা, হাত ধরাধরি এসবে তুমিই আগে ছিলে। আমি নিরীহ মানুষ। আমি বৈধতার পরেই এগিয়েছি।’

তাহিয়া বিশ্বাস করল না। বলল,
‘ আমাকে রাগানোর জন্য আপনি বানিয়ে ও বলতে পারেন। প্রমাণ কী?’

অভীক পকেট থেকে ফোন বের করল। গ্যালারি ঘেটে এক ছবি স্ক্রিনে এনে বলল,
‘এই দেখো প্রমাণ।’

তাহিয়া ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল। লাল জামা পরা একটা নবজাতক শিশু কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আট দশবছরের একটা ছেলে। বাচ্চাটা এক হাতে ছেলেটার মুখ খামচে ধরেছে, আরেক হাতে চুল টানছে।ছেলেটা চোখমুখ কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছে। কোলের বাচ্চাকে তাহিয়া চিনে। বাচ্চা ও নিজেই। মাহমুদার একটা এলবাম ভরতি ওর এই বয়সের ছবি। একটা ছবি ওর রুমের দেয়ালে ও ফটো ফ্রেমে আটকানো আছে। সেম এইরকম লাল জামা গায়ে দেয়া। তাহিয়া তড়িৎ ফোন ফেরত দিল। দায়সারা উত্তর দিল,
‘আমি ছোটো ছিলাম, এত কথা জানতাম না কি!’

অভীক মজা করেই গেল। আরেকটা ছবি বের করে বলল,
‘ তোমার নজর আমার উপর বোধহয় তখনই পড়েছে, কিভাবে তাকিয়ে ছিলে দেখো! দেখলেই কোলে উঠা, কিসমিস দেয়া খামছি দেয়া, আমাদের বাসায় গেলে আমার রুমে দৌড়ে চলে যাওয়া, আমার জিনিসপত্রের উপর নজর দেয়া এসব বউ বউ ধরণের আচরণ করতে শুরু থেকেই। আমিই অবুঝ ছিলাম, বুঝতাম না। তখন ভাবতাম এগুলো সাধারণ ব্যাপার। এখন বুঝতে পারছি, ঘটনা অন্য কিছু। ‘

অভীক হাসছে। তাহিয়া আড়চোখে একবার চাইল স্ক্রিনে। কোলাজ করা কয়েকটা ছবি, একটায় অভীকের দিকে তাকিয়ে আছে তাহিয়া, অভীক অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। ছবিটা তাহিয়াদের বাসায়। যখন ওর বয়স এক থেকে দেড় মাস। তার পরের ছবিটা যখন তাহিয়া বসে তখনকার। তাহিয়া একটা খেলনা কারে বসে আছে, কারটা ওর নয়। জায়গাটাও অপরিচিত। তাহিয়া ভ্রু কুঁচকাল, বলল,
‘এটা কোথায়?’
‘আমার রুমে। দেখো, কিভাবে আমার খেলনা দখল করেছো তুমি। এই দখদারিত্বের স্বভাব বেশ পুরনো তোমার। কখনো গাড়ি, কখনো ম…

কথা সম্পূর্ণ করল না অভীক। মাঝপথে থেমে গেল। তাহিয়া ওর অগোচরে হাসল। অভীক প্রসঙ্গ পাল্টাল। গাড়ির পাশে ভাঙা কয়েকটা গাড়ি। অভীক তা দেখিয়ে বলল,
‘এগুলো সব তুমি ভেঙেছো। যতবার আমাদের বাসায় যেতে আমার খেলনা ভেঙে আসতে। ‘

আরেকটা ছবিতে ছোট্টো শিশুকন্যা অভীকের গালে চুমু খাচ্ছে। এটা সম্ভবত তাহিয়ার এক বছর বয়সের ছবি। নীলিমাদের টাঙ্গাইলের বাসায় মেয়েকে নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিল মাহমুদা। এরপর ওদের আর দেখা হয়নি। ছবিটা ইঙ্গিত করে অভীক বলল,
‘ তুমি মানুষটা তো সুবিধার না হিয়া। আমার মতো অবুঝ বাচ্চার সাথে কিসব করছিলে! ‘

তাহিয়া হাঁটা ধরল, কথা ঘুরাল, ‘ছবি গুলো আপনার কাছে ছিল এতদিন?’
‘না, মায়ের কাছে ছিল। আমার চোখে পড়েছে কদিন আগে। আমি অবাক হয়েছিলাম যখন দেখলাম, তোমার খেয়াল এদিক ওদিক যাওয়ার সময়টা অনেক আগেই শুরু হয়েছিল।’

অভীকের ঠোঁটের সেই ভিন্ন, অর্থবহ হাসি। শৈশবে নিজের কাজে নিজেই লজ্জা পাচ্ছে তাহিয়া, এত বছর পর!

তাহিয়ার লজ্জারাঙা মুখ দেখা হয়ে গেছে। আর বাড়ানো ঠিক হবে না। অভীক কথা ঘুরাল,
‘ বেলা হয়ে যাচ্ছে। রাতে ও কিছু খেলেনা। ক্ষিধে পেয়েছে নিশ্চয়ই? এবার বাড়ি চলো হিয়া, নাস্তা করবে। আপু ভাইয়া অপেক্ষা করছে। এবার যাওয়া উচিত।’

‘আমি যাব না।’ দৃঢ়স্বর তাহিয়ার। অভীক আবার মজার পাল্লায় হাত ফেলল। বলল,
‘কোলে করে নিতে হবে? ‘
‘না।’
‘ইচ্ছে হলে বলো। আগের মতো কেঁদে ভাসাতে হবে না। আমি এমনিই নিব। এখান থেকে কোলে তুলে অয়নের সামনে নিয়ে নামাব।’
অভীক কোলে নিতে উদ্যত হলো। এটা অভিনয় মাত্র। ও এখন কোলে নিবে না, এতটা ফিল্মি নয় ও। আর তাহিয়া যে কোলে উঠবে না এটাও ওর অজানা নয়। ওর কথা সত্য প্রমাণ করে তাহিয়া ওকে বাধা দিয়ে সরে দাঁড়াল। বাড়ি ভরতি লোক, এতক্ষণে সবাই উঠে পড়েছে। কতগুলো শ্বশুর, শ্বাশুড়ি, দেবর, ননদ ওদের সামনে বাড়ির বউ কোলে চড়বে! ভাবতেই তাহিয়ার লজ্জা লাগল। এই লোককে বিশ্বাস নেই, কোলে নিয়ে যেতে পারবেন অনায়েসে, লজ্জার ভাগিদার ওকেই হতে হবে। তারচেয়ে ভালোয় ভালোয় একা যাওয়া যাক।
এমন ভাবনা থেকে ফিরতি পথে হাটা ধরল তাহিয়া।। মনে মনে দোয়া পড়ল, আল্লাহ অয়ন যেন এখন ঘুমিয়ে থাকে। উদ্ভট আবদার না করে।

কিন্তু হায়! বাড়িতে ঢুকতেই সর্বপ্রথম দেখা হলো অয়নের সাথে। ভণিতা ছাড়াই আবদার জুড়ে বসল বাচ্চাটা।

চলবে….