প্রেম প্রয়াস পর্ব-০৭

0
870

#প্রেম_প্রয়াস
#মাশফিয়াত_সুইটি(ছদ্মনাম)
পর্ব:০৭

‘ তাশফা থামো বলছি এগুলো কিন্তু ভালো হচ্ছে না। উফ ঘর কিন্তু তোমাকে গুছাতে হবে।’

– আমিও দেখবো ঘর কে গুছায়।

আবারো পূর্বের ন্যায় জামা-কাপড় আর বালিশ ছুঁড়ে মারছে রাদিফের দিকে।আর রাদিফ সেগুলো থেকে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে।

তাশফা রান্নাঘর থেকে ঘরে এসে তখনকার মতোই রাদিফকে ল্যাপটপের সামনে দেখতে পায়। বিরক্ত হয়ে গোসল সেরে এসে দুপুরের খাবারের জন্য ডাক দেয় কিন্তু রাদিফ কাজে ব্যস্ত থাকায় খেয়াল করেনি ব্যস তৎক্ষণাৎ শুরু হয়ে গেছে রাদিফের উপর আক্রমণ আলমারির কাপড় বিছানার বালিশ যা পাচ্ছে ছুঁড়ছে রাদিফ এখনো জানে না সে কি অন্যায় করেছে।

সবকিছু ছুঁড়ে মারা শেষ আর কি মারা যায় সেটাই খুঁজছে তাশফা এই সুযোগে দ্রুত রাদিফ এসে তাশফার হাত ধরে ফেলে। তাশফা ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রাদিফ ব্রু নাচিয়ে,

– সবকিছু ছুঁড়ে মারছো কেন? কি করেছি আমি?

– ঢং করা হচ্ছে? জানেন না কি করেছেন?

– তেমন কিছু করেছি বলে তো মনে হচ্ছে না,তুমি বলো কি করেছি?

– কতবার আপনাকে ডাকলাম একবারও জবাব দিয়েছেন কি আছে এতে এত আকর্ষণ কিসের?

– খেয়াল করিনি তবে তোমার উচিত ছিল জোরে ডাকার।

– জোরেই ডেকেছি কিন্তু আপনি শুনেননি কারণ আপনি বয়ড়া।

– ঠিক আছে এবার পুরো ঘরটা গুছিয়ে তারপর বাইরে আসো।

তাশফার মাথায় যেন বাজ পড়লো আহত দৃষ্টিতে,
– এত বড় ঘর একা একা কিভাবে গুছাবো?

– যেভাবে এলোমেলো করেছো সেভাবে।

– এইভাবে বলতে পারলেন একটু কষ্ট হলো না।

– না যাও গিয়ে গুছাও।

তাশফা এমনিতেই অলস প্রকৃতির এবং ফাঁকিবাজ নিজের বাড়িতে থাকতেও কখনো নিজের ঘর গুছাতো না সবসময় ছোট ভাইকে ব্লাকমেইল করে কাজ করাতো। এখনো মনে মনে ওই ফন্দি আঁটছে,’কিভাবে উনাকে দিয়ে কাজগুলো করানো যায়?’

রাদিফ তাশফার সামনে তুড়ি মেরে,
– ওইসব বাচ্চা বুদ্ধি আমার সামনে খাটাতে এসো না যাও কাজ করো।

তাশফা কাদুকাদু মুখ নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল তখনি কিছু একটা ভেবে দৌড় দিল। রাদিফ কিছুটা চমকে গেল সেও দ্রুত তাশফার পিছনে পিছনে গেল। তাশফা রাদিফের মায়ের পাশে গিয়ে বসে আছে রাদিফ রাগ দেখিয়ে,

– এখানে বসেছো কেন? যাও ঘর গুছাও।

রাদিফের মা প্রশ্ন করলেন,
– ঘরে আবার কি হয়েছে আমি তো কালই গুছিয়েছিলাম।

– হুম কিন্তু আজ তাশফা এলোমেলো করেছে গিয়ে দেখো ঘরের কি অবস্থা।

রাদিফের মা তাশফার দিকে তাকিয়ে,
– কি ব্যাপার তাশফা?

তাশফা ঠোঁট উল্টিয়ে,
– বিশ্বাস করো আন্টি আমার কোন দোষ নেই।

– তাহলে কার দোষ?(রাদিফের মা)

– তোমার ছেলের দোষ আমি উনাকে কতবার ডাকলাম কিন্তু উনি শুনলেন না সারাদিন ল্যাপটপ নিয়ে বসে ছিলেন তাই ঘর এলোমেলো হয়েছে হু।

রাদিফ তাশফাকে ধমক দিয়ে,
– পুরো দোষ আমায় দিয়ে দিলে? আমি শুনিনি বলে তুমি ঘর এলোমেলো করবে?

আচমকা তাশফা কেঁদে দিল তার এমন কাজে রাদিফ এবং রাদিফের মা হা করে তাকিয়ে আছে। তাশফা কেঁদে কেঁদে,

– আমি ঘর গুছাতে পারি না আমার ঘর আমার ছোট ভাই গুছিয়ে দিতো আর এত বড় লোক আমাকে ধমক দেয়।

– কাঁদে না তোমাকে ঘর গুছাতে হবে না মা।

– তাহলে কে গুছাবে আম্মু?(রাদিফ)

– কেন তুই গুছাবি বড় তো কম হসনি যা গিয়ে ঘর গুছা।

– এলোমেলো তো তাশফা করেছে।

– তাতে কি হয়েছে তোর বউ এলোমেলো করেছে তুই গুছাবি এটা তোর দায়িত্ব কথা না বাড়িয়ে কাজ কর গিয়ে।

– বউমা পেয়ে ছেলের সাথে অন্যায় করছো বাহ।

রাদিফ রেগে ঘরে চলে গেল।রাদিফ চলে যেতেই শাশুড়ি আর বউমা ফিক করে হেসে দিল।রাদিফ এমনিতেও খুব গুছালো একটা ছেলে তবে তাশফা একটু বেশিই এলোমেলো করে রেখেছে। কি আর করার মুখটা মলিন করে ঘর গুছাতে লেগে পড়েছে রাদিফ। তাশফা দরজায় হেলান দিয়ে,

– কি এখন কেমন লাগছে খুব তো আমায় কষ্ট দিয়েছিলেন কাঁদিয়েছেন এটাই তার শাস্তি।

রাদিফ পেছনে ঘুরে,
– আমারও সময় আসবে তখন এর শোধ নিয়ে ছাড়বো।

– হু তাশফা এসবে ভয় পায় না।

– দেখা যাবে।

– আপনি তাহলে সব গুছিয়ে আমায় ডাক দিয়েন আমার আবার দুপুরের খাওয়ার পর ঘুমানোর অভ্যাস আছে।

বলেই মুখ বাঁকিয়ে বাইরে চলে গেল তাশফা আর রাদিফ দাঁতে দাঁত চেপে আবারো কাজে মন‌ দিল।
উপায়ন্তর না পেয়ে রাকার ঘরে গিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই রাকা আড়চোখে তাকিয়ে,

– বাবাহ তাশু তুই তো একদিনেই ভাইয়ার কি অবস্থা করে দিলি এতো সাহসী হলি কিভাবে?

তাশফা একটু ভাব নিয়ে,
– কবে আবার ভিতু ছিলাম?

– ভিতু না হলেও ভাইয়ার সামনে তো বিড়াল হয়ে যেতি।

– উফ কতবার বলতে হবে তোর ভাইকে সম্মান করতাম।

– তাশু!

– ভাবী বলবি।

– পারবো না।

– অভদ্র।

– সব তুই।

তাশফা কপাল কুঁচকে তাকাতেই রাকা মেকি হেসে,
– ঝগড়া বাদ দে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা ছিল।

– কি কথা?

– দেখ তোর আর ভাইয়ার বিয়ে তো হয়েই গেছে এবার একটু বান্ধবীর দিকে ফিরে তাকা।

– যা বলার সোজাসুজি বল।

– আমার আর আরিয়ানের রিলেশন সম্পর্কে তুই তো জানিস আমরা দু’জন দু’জনকে পছন্দ করি কিন্তু ভাইয়াকে বলার সাহস নেই এমনিতেই সেদিন তোর ওই কথা থেকে সন্দেহ করছে তুই কিছু কর।

– বিয়ে হলো মাত্র একদিন আর এখনি গিয়ে এসব বললে তোর ওই ভাই আমারে মাথায় তুলে আছাড় মারবে।

– তুই এমন করলে আমার কি হবে বাবু আমি না তোর বেস্টি,দরকার হলে তুই একটু সময় নে তারপরও ভাইয়াকে রাজি করা।

– ইমোশনাল করে দিলি আচ্ছা চেষ্টা করবো।

রাকা খুশি হয়ে তাশফার গালে চুমু খেল। রাদিফ পুরো ঘর গুছিয়ে ফেলেছে, ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিছানায় শুয়ে আছে।তাশফা আর একবারও এদিকে আসেনি যত যাই বলুক রাদিফের প্রতি ভয় তার এখনো আছে।
__________________
রাত হয়ে গেছে সবাই একসঙ্গে রাতের খাবার খেয়ে ঘরে চলে গেছে।তাশফা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছে,

– আমার কি এখন উনার ঘরে যাওয়া উচিত? যদি মারে! না না না রিস্ক নেওয়া যাবে না এর থেকে আজ রাকার সঙ্গে গিয়ে ঘুমাই।

যেই বলা সেই কাজ তাশফা রাকার ঘরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই পিছন থেকে তার হাত ধরে ফেলে রাদিফ এক টান দিয়ে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে,

– আমাকে রেখে কোথায় যাওয়া হচ্ছে?

তাশফা জোরপূর্বক হেসে,
– কোথাও না।

– রাকার ঘরের দিকে যাচ্ছিলে কেন? তুমি কি আজ ওর সাথে থাকার চিন্তা করছিলে?

– ককই না তো… আসলে খাওয়ার পর হাঁটতে হয় তাই একটু হাঁটাহাঁটি করছিলাম হি হি..

রাদিফ ব্রু জোড়া কুঁচকে,
– ওহ ভালো তাহলে ঘরে চলো।

– হুম চলেন

রাদিফ আগে আগে হাঁটছে তাশফা তার পিছনে কিন্তু তাশফা তো সহজে কারো কথা শুনার মেয়ে না দৌড় দেওয়ার জন্য পেছনে ফিরতেই রাদিফ আবারো ধরে ফেলল। রাদিফ এবার তাশফাকে কোলে তুলে নিয়ে,

– বলেছি না এসব বাচ্চা বাচ্চা বুদ্ধি আমার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করবে না।

তাশফা মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে অপরাধীর ন্যায় নিচের দিকে তাকিয়ে,
– ছাড়ুন আমায় নিচে নামান।

– হ্যা নামাই তারপর আবার দৌড় দাও।

– আর দৌড় দিব না।

– তোমাকে আমার বিশ্বাস নেই।

তাশফাকে কোলে করে ঘরে নিয়ে গিয়ে বিছানায় বসিয়ে দরজা আটকে দিল রাদিফ। মুখটা গম্ভীর করে তাশফার সামনে বসতেই তাশফা ভয়ে পিছনে সরে গেল এতে রাদিফ কিছুটা মজা পেয়েছে।রাদিফ তিক্ষ্ম কন্ঠে,

– তুমি কি ভয় পাচ্ছো আমাকে?

– উহু।

– তাহলে পিছিয়ে গেলে কেন?

তাশফা কিছু বলল না,রাদিফ তাশফার হাত ধরতেই এবার আরো ভয় পেয়ে তাশফা জিজ্ঞেস করল,

– আমাকে মারলে কিন্তু আমি জোরে জোরে চিল্লাবো।

রাদিফ নিজের হাঁসিটা অনেক কষ্টে চেপে রেখেছে পুনরায় তিক্ষ্ম কন্ঠে,
– মারবো কেন? তুমি কি কোন অপরাধ করেছো?

– উহু।

– তাহলে এত ভয় কিসের?

– কোন ভয় নেই।

– ভয় না থাকলে কাছে আসো।

– সরি।

– কেন?

– আর কখনো ঘর এলোমেলো করবো না আপনার নামে আন্টির কাছে বিচারও দিবো না।

– কিন্তু আজকে তো ভুল করেই ফেললে সেটার জন্য কি শাস্তি দেওয়া যায়?

শাস্তির কথা শুনে এবার তাশফা কেঁদেই দিল তাশফার কান্না দেখে রাদিফ ভরকে গেল।
– আমি তো এখনো শাস্তি দেইনি তাহলে কাঁদছো কেন?

– পরেও হলেও দিবেন তো আপনি সত্যিই পঁচা আমার সঙ্গে সবসময় এমন করেন।

– থাক থাক কান্না করো না কোন শাস্তি দিবো না।

সাথে সাথে তাশফা হেসে,
– সত্যি!

– হুম কিন্তু তুমি এত তাড়াতাড়ি রূপ বদলাও কিভাবে? এখনি কাঁদছিলে আবার এখনি হেঁসে দিলে!

– আমি কি আপনার মত গম্ভীর নাকি? আপনি তো নিম পাতার থেকেও তেতো।

– খেয়ে দেখেছিলে নাকি?

– মানে!

– কিছু না।

– আমার ঘুম পেয়েছে আমি ঘুমালাম।

– হুম ঘুমাও তুমি ঘুমালেই শান্তি জেগে থাকলেই পাগল করে দেয়।(বিড়বিড় করে)

– কিছু বললেন আমায়?

– না কিছু বলিনি।

– ঠিক আছে গুড নাইট।

– গুড নাইট।

তাশফা চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়েছে রাদিফও আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লো।

চলবে……..