#ফিরে_আসার_গান
#সূচনা_পর্ব
#লেখিকাঃদিশা_মনি
“ডিভোর্সের এক মাস পার আমি জানতে পারলাম আমি মা হতে চলেছি, প্রেগ্ন্যাসি কিটে জ্বলন্ত সিগনালের দিকে তাকিয়ে আমি দীর্ঘ শ্বাস ফেলতে লাগলাম, যেই মুক্তির আশায় ঐ নরক থেকে বেরিয়ে এলাম সেই মুক্তি কি তবে মিলবে না?”
নিজের মনে কথাগুলো বিড়বিড় করতে করতে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ফ্লোরে বসে পড়লো সূচনা। সে যেন এখনো এই কথাটা মানতে পারছে না। তার বুক চিরে দীর্ঘ শ্বাস বেরিয়ে এলো।
“কেন আল্লাহ, কেন? আমাকে এই পরীক্ষায় কেন ফেললে তুমি? এমনিতেই মা বাবার অমতে বিয়ে করে ডিভোর্স নিয়ে এসেছি জন্য মা উঠতে বসতে কথা শোনাচ্ছে। এখন যদি এই কথা সামনে আসে তাহলে.. তাহলে যে আমায় ওরা শেষ করে দেবে।”।
সূচনার ভাবনার মাঝেই তার দরজায় কড়া পড়ল।
” ঠকঠক…”
“এই সূচনা কি হলো তোর? সেই কখন বাথরুমে ঢুকেছিস এখনো বের হবার কোন নামগন্ধ নেই। বলছি জলদি বাইরে আয়। আমাদেরও তো যেতে হয় নাকি।”
মায়ের গলা পেয়ে সূচনা জলদি প্রেগ্যান্সি কিটটা লুকিয়ে ফেললো। নিজের চোখের জল মুছে নিয়ে মুখটা যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে বিড়বিড় করে বলল,
“নাহ,,,এখন ভেঙে পড়লে চলবে না। আমাকে পুরো বিষয়টা সামলাতে হবে।”
অত:পর সে দ্রুত এগিয়ে এসে দরজাটা খুলে দেয়। সে দরজা খুলতেই তার মা সায়রা খাতুন বলে ওঠেন,
“কি করছিলি রে এতক্ষণ ভেতরে।”
“একটু ফ্রেশ হচ্ছিলাম মা।”
“এত সময় কেউ লাগায় ফ্রেশ হতে? বের হ এখন তাড়াতাড়ি। আমার অনেক কাজ আছে। তোর মতো সারাদিন বসে বসে খাওয়ার জো তো নেই। তুই হলি তোর বাবার একমাত্র আদরের দুলালি। তোকে কোন কথা শুনালেও তো তার সেটা হজম হয় না। তাই তো আমাদের মুখে চুনকালি মাখানোর পরও তোকে এত আদর যত্নে আবার ফিরিয়ে নিলো।”
কথাগুলো সূচনার একদম বুকে গিয়ে লাগে। তবুও সে এগুলো হজম করে নেয়।
“ঠিকই বলেছ মা। আমি আসলেই এত বাবার এত ভালোবাসা ডিজার্ভ করি না।”
বিরস মুখে সে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ায়। যেতে যেতে নিজের বাবার মুখখানি মনে করে সে বলে,
“আমায় তুমি ক্ষমা করে দিও বাবা। আমাকে নিয়ে তুমি কত স্বপ্ন দেখেছিলে..তোমার সূচনা অনেক বড় ডাক্তার হবে। কিন্তু তোমার মেয়ে তোমার কোন স্বপ্নই পূরণ করতে পারল না।”
কথাগুলো ভেবে নিজের রুমে এসে দরজা লাগিয়ে দেয় সূচনা। টেবিলে সাজানো বইগুলোর দিকে তাকিয়ে আরেকবার তাকায় ক্যালেন্ডারের দিকে। এই তো আর ক’টা দিন তারপর তার এইচএসসি পরীক্ষায় বসার কথা ছিল।
সূচনা খানম খুবই মধ্যবিত্ত একটা পরিবারের মেয়ে সে৷ মা বাবার একমাত্র সন্তান হওয়ায় ছোট থেকে সে তার বাবার নয়নের মনি। তার কোন চাহিদা, কোন শখ তার বাবা অপূর্ণ রাখে নি। সূচনার বাবা সোহেল খানের স্বপ্ন ছিল তাকে ডাক্তার বানাবে। সূচনা এসএসসি পরীক্ষায় অনেক ভালো রেজাল্ট করায় তাই সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে তাকে ঢাকায় ভিকারুননিসা কলেজে পড়তে পাঠায়। আর এখানেই যেন ছদ্মপতন ঘটে তার জীবনে। সারাজীবন মা-বাবার বুকে আগলে মানুষ হওয়া সূচনা যেন ঢাকায় গিয়ে খাঁচা থেকে সদ্য মুক্তি পাওয়া পাখির মতো ডানা মেলে উড়তে শুরু করে।
বয়ো:সন্ধির প্রভাবে ও সমবয়সী বান্ধবীদের প্ররোচনায় ঢাকার স্থানীয় এক যুবক রাব্বির সাথে রিলেশনে জড়ায় সে। রাব্বি ঢাকা কলেজের অনার্স তৃতীয় বর্ষে পড়ে। দেখতে যথেষ্ট সুদর্শন এবং সুঠামদেহী। তার উপর বেশ ভালো কবিতা বলতে পারে। তার রূপ ও কবিতা শুনে সূচনা যেন নিজের বাবা-মায়ের স্বপ্ন, নিজের ক্যারিয়ার সব ভুলে এক মরিচীকার পিছনে ছুটতে থাকে। তারপর একদিন যখন তার বাবা এই ব্যাপারে জানতে পেরে তাকে ঢাকা থেকে বাসায় নিয়ে আসে তখন সে নিজের বাবার সাথে চরম জঘন্য ব্যবহার করে।
তবে সবকিছুর সীমা অতিক্রম হয় সেদিন যেদিন সে রাতের আধারে রাব্বির হাত ধরে পালিয়ে যায়। কাজি অফিসে গিয়ে তাকে বিয়ে করে নতুন জীবন শুরু করে।
কিন্তু,,,,
এখান থেকেই যেন তার জীবনের আসল অভিশাপ শুরু হয়। শুরুতে কিছুদিন রাব্বি তাকে অনেক ভালোবাসে, অনেক আগলে রাখে। কিন্তু রাব্বির পরিবার শুরু থেকেই সূচনাকে তার যথাযথ সম্মান দেয় না। ধীরে ধীরে রাব্বিও বদলে যায়। যেই রাব্বি একসময় সূচনাকে রঙ বেরঙের স্বপ্ন দেখাত সে উঠতে বসতে সূচনাকে গালি দিতে শুরু করে,,, এমনকি সামান্য ভুলে তার চুলের মুঠি ধরে গায়ে হাত অব্দি তোলে।
ধীরে ধীরে সূচনার সামনে আরো জঘন্য সত্য বের হতে থাকে। রাব্বি ড্রাগ এডিক্ট, একাধিক মেয়ের সাথে তার অবৈধ সম্পর্ক আছে এমনকি..এমনকি সে পতিতাপল্লিতেও যাতায়াত করে। এসব সত্য সামনে আসতেই সূচনার পায়ের তলার মাটি সরে যায়।
একদিন রাব্বিকে এসব নিয়ে জেরা করায় সে সূচনাকে বাজেভাবে টর্চার করে ,, মেরে তার হাত অব্দি ভেঙে দেয়। সেদিন রাতেই নিজের এক বান্ধবীর সাহায্যে সূচনা বেরিয়ে আসে ঐ বাড়ি থেকে।
তারপর আবার নিজের বাবার দরজায় এসে হাজির হয়। সায়রা খাতুন সূচনাকে অনেক গালমন্দ করে ফিরে যেতে বললেও সোহেল খানের পিতৃহৃদয়ের অকৃত্রিম স্নেহ দিয়ে সূচনার সব ত্রুটি মাফ করে দিয়ে তাকে আপন করে নেন।
অতীতের এসব কথা মনে করেই সূচনা বলে ওঠে,
“আল্লাহ,,,তুমি আমায় তুলে নাও আল্লাহ। আমার জন্য আমার আব্বুকে আর কষ্ট দিও না।”
★★
ঢাকা শহরের বড় একটি ক্লাব,,,
চারপাশে জ্বলছে ঝিকিমিকি আলো,,,,
উচ্চশব্দে বাজছে নানা চটকদার গান।
এসবের মাঝেই এক ব্যক্তি সবার মধ্যমনি হয়ে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে। তার এক হাতে একটি দামি পিস্তল অন্য হাতে দামি হুইস্কির বোতল।
“এই পরের গান বাজাও…”
“Aaja Na Chhule Meri Chunari Sanam
Kuchh Na Main Bolun Tujhe Meri Qasam
Aayi Jawaani Sar Pe Mere
Tere Pe Kya Karun Jawaani Pe Reham
Aaja Na Chhule Meri Chunari Sanam
Kuchh Na Main Bolun Tujhe Meri Qasam
Chunari Chunari…
Chunari Chunari…”
গানটা বলতে বলতেই এক স্বল্পবাসনা তরুণী এগিয়ে এসে তার কাধে হাত রাখে।
কিন্তু যুবকটির কোন হুশই নেই সেদিকে। তার ফর্সা সুঠাম চোয়াল আচমকাই রাগে ফুলে ওঠে। সে দ্রুত মেয়েটার হাত নিজের কাধ থেকে সরিয়ে দেয়। একপ্রকার চিৎকার করে বলে,
“তোর সাহস কি করে হলো আমায় স্পর্শ করার? তুই জানিস আমি কে? একটা সস্তার বার ডান্সার হয়ে তুই আমায় স্পর্শ করিস..চল ফোট এখান থেকে।”
“মির্জা আদান কবীর? ”
হঠাৎ একটি মোলায়েম স্বর কানে আসতেই আদান ফিরে তাকায়। ভ্রু কুচকে তাকিয়ে বলে,
“আদান…শুধু আদান..এই পদবী এই পরিচয় কোন কিছুই আমি স্বীকার করি না।”
তরুণী এগিয়ে এসে বলে,
“স্বীকার করুন বা না করুন সত্য তো এটাই যে আপনি এই ঢাকা শহরের শীর্ষ ধনী মির্জা আজমাইন কবীরের একমাত্র ছেলে আদান চৌধুরী,,, নিজের DNA তো আপনি চাইলেও বদলাতে পারবেন না।”
আদান একবার ভালো করে মেয়েটিকে পরখ করে। মেয়েটির পরণে একটি পাতলা টিশার্ট এবং সাথে একটা ফিটেট জিন্স। হাতে একটি বিশাল ট্যাটু,,,মুখে হালকা লিপস্টিক বুঝা যাচ্ছে,,,
“কে তুমি? আমার ব্যাপারে এত কিছু জানো কিভাবে?”
“আমি দিব্যা পাটোয়ারী। আপনার ওয়ান এন্ড অনলি ফিয়ন্সে।”
নামটা শুনতেই আদানের মুখ কালো হয়ে যায়।
“মাই ব্যাড,,,,”
দিব্যা আত্মবিশ্বাসী হাসি হেসে বলে,
“ব্যাড আসলেই ব্যাড..আমার মতো একটা ব্যাডিকে সামলাতে হবে যে।”
চলবে ইনশাআল্লাহ….✨

